📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইউসুফ আ. কারাগারে

📄 ইউসুফ আ. কারাগারে


যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া হলো। তা করা হলো এজন্য, যাতে আযিযে মিসরের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম থেকে রক্ষা পান এবং অপরাধীকে কেউ অপরাধী না বলতে পারে।
তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, 'হযরত ইউসুফ আ.-এর ইলম ও আমলের জ্যোতি কারাগারেও গোপনীয় থাকতে পারে নি। কারাগারের রক্ষক ইউসুফ আ.-এর শিষ্যত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন কারাগারের যাবতীয় আইন-শৃঙ্খলার বিধান ও সমাধান তাঁর হাতে ছেড়ে দিলো। ফলে কারাগার সম্পূর্ণরূপে তাঁর স্বাধীন পরিচালনাধীন চলে এলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওখানেও তাঁর যাবতীয় কাজে সৌভাগ্যবান করে দিলেন।
পবিত্র কুরআন থেকেও এই বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর কারণ হলো এই, সেকালের কারগারগুলোর অবস্থার প্রেক্ষিতে হযরত ইউসুফ আ.-কাছে বন্দিদের অবাধ যাতায়াত এবং তাঁরা মহত্ব ও সৎ চরিত্রের স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, কারাগারে ইউসুফ আ.-এর পবিত্র গুণাবলির যথেষ্ট খ্যাতি ছিলো।

যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া হলো। তা করা হলো এজন্য, যাতে আযিযে মিসরের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম থেকে রক্ষা পান এবং অপরাধীকে কেউ অপরাধী না বলতে পারে।
তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, 'হযরত ইউসুফ আ.-এর ইলম ও আমলের জ্যোতি কারাগারেও গোপনীয় থাকতে পারে নি। কারাগারের রক্ষক ইউসুফ আ.-এর শিষ্যত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন কারাগারের যাবতীয় আইন-শৃঙ্খলার বিধান ও সমাধান তাঁর হাতে ছেড়ে দিলো। ফলে কারাগার সম্পূর্ণরূপে তাঁর স্বাধীন পরিচালনাধীন চলে এলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওখানেও তাঁর যাবতীয় কাজে সৌভাগ্যবান করে দিলেন।
পবিত্র কুরআন থেকেও এই বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর কারণ হলো এই, সেকালের কারগারগুলোর অবস্থার প্রেক্ষিতে হযরত ইউসুফ আ.-কাছে বন্দিদের অবাধ যাতায়াত এবং তাঁরা মহত্ব ও সৎ চরিত্রের স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, কারাগারে ইউসুফ আ.-এর পবিত্র গুণাবলির যথেষ্ট খ্যাতি ছিলো।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দাওয়াত ও তাবলিগ

📄 দাওয়াত ও তাবলিগ


ঘটনাক্রমে হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে আরো দুজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করলো। তাদের মধ্যে একজন বাদশাহর শরাব পরিবেশনকারী ছিলো, আর দ্বিতীয়জন ছিলো বাদশাহর পাকশালার দারোগা। একদিন এই বন্দি দুজন
ইউসুফ আ.-এর খেদমতে হাজির হলো। তাদের মধ্যে শরাব পরিবেশনকারী বললো, আমি এই স্বপ্ন দেখেছি যে আমি শরাব প্রস্তুর করার জন্য আঙ্গুর নিংড়ে রস বের করছি। দ্বিতীয়জন বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি মাথার ওপর রুটির খাঞ্চা বহন করছি আর পাখিরা তা থেকে খাচ্ছে।
হযরত ইউসুফ আ. নবীর পুত্র ছিলেন। ইসলাম প্রচারের রুচি তাঁর স্নায়ুমণ্ডলীর সঙ্গে সংমিশ্রিত ছিলো। তা ছাড়া আল্লাহপাক তাঁকেও নবুওতের জন্য মনোনীত করেছিলেন। তাই সত্যধর্ম প্রচারই ছিলো তাঁর জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যদিও তিনি কারাগারে ছিলেন, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্যকে তিনি কী করে ভুলতে পারেন? আর যদিও তিনি দুখ-দুর্দশায় ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার বিষয়টি ভুলে থাকেন তা কেমন করে সম্ভব হতে পারে? এ-সময়টিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে নম্রতা ও মুহাব্বতের সঙ্গে তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে যেসব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, তার মধ্য থেকে নিঃসন্দেহে এটাই এক প্রকার ইলম যা তিনি আমাকে দান করেছেন। তোমাদের কাছে তোমাদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য-দ্রব্য আসার আগেই আমি তোমাদের স্বপ্নের ফলাফল বলে দেবো। তবে আমি তোমাদেরকে একটি কথা বলছি। তোমরা তা ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো এবং বোঝার চেষ্টা করো।
'আমি ওইসব মানুষের ধর্ম অবলম্বন করি নি যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে না এবং আখেরাতের প্রতিও অবিশ্বাসকারী। আমি আমার পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ-ইয়াকুব, ইসহাক ও ইবরাহিম আলাইহিমুস সালাম-এর ধর্মের অনুসরণ করেছি। আমি কখনো এমন করতে পারি না যে, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো বস্তুকে শরিক সাব্যস্ত করি। এটা আল্লাহপাকের একটি অনুগ্রহ; এই অনুগ্রহ তিনি আমার প্রতি করেছেন এবং আরো বহু মানুষের প্রতি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।'
'বন্ধুগণ, তোমরা এ-কথা ভেবে দেখেছো কি, ভিন্ন ভিন্ন একাধিক উপাস্য হওয়া উত্তম না আল্লাহ তাআলা, যিনি এক ও সবার ওপর পরাক্রমশালী? তোমরা তাঁকে ছাড়া আর যাদের ইবাদত করছো, তাদের স্বরূপ এর চেয়ে আর বেশি কিছু নয় যে, তারা কেবল কয়েকটি নাম। এগুলোকে তোমাদের বাপ-দাদারা মনগড়া স্থির করে নিয়েছে। এগুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা কখনো কোনো সনদ নাযিল করেন নি। সর্বময় কর্তৃত্ব তো একমাত্র আল্লাহর।
হাতেই রয়েছে। তিনি এই নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। এটাই সত্যধর্ম, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ নির্বোধ, তা জানে না।'
এই ঘটনাকে পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে এভাবে— يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ) مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سورة يوسف)
'হে কারা-সঙ্গীদ্বয়, ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতগুলো নামের নামের ইবাদত করছো, যে-নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছো। এগুলোর কোনো প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নি। বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন কেবল তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করতে; এটাই শাশ্বত (ও সরল) দীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩৯-৪০
হেদায়েত ও নসিহতের এই পয়গামের পর হযরত ইউসুফ আ. কারাসঙ্গী দুজনের স্বপ্নের ফলাফল বর্ণনার প্রতি মনোযোগ প্রদান করলেন। তিনি বললেন:
'বন্ধুগণ, তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি দেখেছে যে সে আঙ্গুর নিংড়ে রস বের করছে, সে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় বাদশাহর শরাব পরিবেশনে নিযুক্ত হবে। আর যেজন মাথার ওপর রুটি বহন করতে দেখেছে তাকে শূলে চড়ানো হবে। পাখিরা তার মাথার মগজ ঠুকরে ঠুকরে খাবে। যে-বিষয়ে তোমরা প্রশ্ন করেছিলে তা নির্ধারিত হয়ে পড়েছে। (বাদশহর) সিদ্ধান্তও এটাই।'
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে— يَا صَاحِبَي السِّجْنِ أَمَا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا وَأَمَا الْآخَرُ فَيُصْلَبْ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ () وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا
اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'হে কারা-সঙ্গীদ্বয়, তোমাদের দুইজনের একজন তার প্রভুকে শরাব পান করাবে এবং অপরজন শূলবিদ্ধ হবে; এরপর তার মস্তক থেকে পাখি আহার করবে। যে-বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছে তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।' ইউসুফ তাদের মধ্য থেকে যে মুক্তি পাবে মনে করলো, তাকে বললো, 'তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।' কিন্তু শয়তান ওকে ওর প্রভুর কাছে তার বিষয়ে বলার কথা ভুলিয়ে দিলো; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থাকলো।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪১-৪২]
কথিত আছে যে, শরাব পরিবেশনকারী ও পাকশালার দারোগার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো যে, তারা পানীয় ও খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে বিষ মিশিয়েছিলো। তদন্ত সমাপ্ত হওয়ার পর পাকশালার দারোগার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলো আর শরাব পরিবেশনকারী নির্দোষ সাব্যস্ত হলো। হযরত ইউসুফ আ. তাদের স্বপ্নের ফল বর্ণনা করার পর শরাব পরিবেশনকারী খালাস পাবে মনে করে বললেন, اذكرني عِنْدَ رَبِّكَ 'তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা উল্লেখ করো।' কিন্তু সে মুক্তি পেয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর নিজের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে ইউসুফ আ.-এর কথা তার মনেই থাকলো না। তার মনে পড়লো না যে সে কারাগারে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলো। শয়তান তার মস্তিষ্ক থেকে সে-কথা ভুলিয়ে দিয়েছিলো। এভাবে ইউসুফ আ.-কে কয়েক বছর কারাগারেই থাকতে হলো।
এখানে অধিকাংশ তাফসিরকারের সারমর্ম এই: اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ বাক্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর উদ্দেশ্য ছিলো, তুমি বাদশাহকে বলো যে, একজন নির্দোষ ও নিরপরাধ মানুষকে অযথাই অপরাধী সাব্যস্ত করে কারগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এ-ধরনের ব্যাখ্যার পর তাঁরা এরূপ সূক্ষ্ম তর্ক উত্থাপন করেন যে, বিপদ ও প্রয়োজনের সময় যদিও মানুষ থেকে মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করা যথার্থ চেষ্টা ও আল্লাহরভক্তির বিরোধী নয়, কিন্তু তারপরও حسنات الأبرار سيئات المقربين 'নেককার বান্দাদের কোনো কোনো ভালো কাজও আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের জন্য ভালো কাজ নয়।' এ-বক্তব্য
অনুযায়ী, হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহামানবের পক্ষে এটা সঙ্গত ছিলো না যে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব উপকরণসমূহের ওপরও ভরসা রাখেন। বাদশাহর কাছে নিজের দুঃখ-দুর্দশা দূরীকরণের জন্য প্রার্থনা করেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলার ফয়সালা এটাই নির্ধারিত হলো যে, তাঁকে আরো কয়েক বছর কারাগারে রেখে দেবেন। শয়তান শরাব পরিবেশনকারীকে এমনভাবে ভুলিয়ে দিলো যে, সে হযরত ইউসুফের কথা কিছুই উল্লেখ করতে পারলো না।
ইবনে জারির আত-তাবারি ও ইবনে মাসউদ আল-বাগাবি প্রাচীন কালের কোনো মুহাক্কিক আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি ‘ঐট’ শব্দে। সর্বনামটির দ্বারা হযরত ইউসুফ আ.-কেই উদ্দেশ্য করেন এবং এই অর্থ করেন, শয়তান ইউসুফকে ভুলিয়ে দিলো যে, তাঁর পক্ষে বাদশাহর সাহায্যের জন্য শরাব পরিবেশনকারীকে বলে দেয়া সঙ্গত কাজ নয়। কিন্তু ইবনে কাসির এই ব্যাখ্যাকে কঠোরভাবে খণ্ডন করে দিয়েছেন এবং এই তাফসিরকে ভুল সাব্যস্ত করেছেন। সামনে তাওরাত থেকে এ-প্রসঙ্গে যা-কিছু উদ্ধৃত করা হয়েছে, মনে করা হয় যে, ওই তাফসিরের ভিত্তি তাওরাতের ওইসব বর্ণনার ওপরই স্থাপিত।
উল্লিখিত তাফসিরের বিপরীত কোনো মুফাস্সির বলেন, ইউসুফ আ.-এর এই বাক্যটির মর্মার্থ এই যে, হযরত ইউসুফ আ. বলেছেন, বাদশাহর সামনে আমার কথা উল্লেখ করে বলো, এমন এক ব্যক্তি আমাদেরকে এইভাবে সত্যধর্মের শিক্ষা প্রদান করছে, তার নিজের ধর্মকে আমাদের ধর্ম থেকে পৃথক বলছে এবং তা প্রতিপাদনে উত্তম প্রমাণও পেশ করছে। তাঁরা এই তাফসিরের বিশুদ্ধতার পক্ষে নিদর্শন বর্ণনা করেন যে, এখানে পবিত্র কুরআনে ইউসুফ আ. ও তাঁর দুজন কারাসঙ্গীর মধ্যে মাত্র দুটি বিষয়ের আলোচনাই পাওয়া যাচ্ছে। একটি বিষয় হলো ইসলামের দাওয়াত ও তাবলিগ আর অপর বিষয়টি হলো স্বপ্ন ও তার ফলাফল বর্ণনা। তৃতীয় কোনো বিষয়ের ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই। অর্থাৎ কোনা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে এ-কথা প্রকাশ পায় না যে, হযরত ইউসুফ আ. সেই দুই ব্যক্তির সামনে নিজের কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন এবং এদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সুতরাং আগেভাগে উল্লেখ করা ব্যতীত এভাবে বলা ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা উল্লেখ করো’ বাক্যে অস্পষ্টতার কী অর্থ? ত ছাড়া হযরত ইউসুফ আ.-এর
কারাগার থেকে বের হয়ে আসার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা যদি এমনই হতো, তাহলে শরাব পরিবেশনকারীর স্মরণ হওয়ার পর এবং বাদশাহর স্বপ্নের ফল বলে দেয়ার পর বাদশাহ যখন তাঁর কারামুক্তির নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ বের হয়ে এলেন না কেনো? এবং তিনি কেনো বাইরের অবস্থার অনুসন্ধান ও তদন্ত করার দাবি পেশ করলেন? এই তদন্ত তো পরেও হতে পারতো এবং পবিত্রতা ও নির্দোষিতার মীমাংসা কারগারের বাইরে এসেও করা যেতো। আয়াতগুলোর পর্যায়ক্রমিক সন্নিবেশের প্রতি লক্ষ করলে এই তাফসিরই অগ্রগণ্যতা পাওয়ার যোগ্য।

টিকাঃ
১. * তাওরাত, আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৯, আয়াত ৩৩।
২. * তাওরাত, আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪০, আয়াত ১।

ঘটনাক্রমে হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে আরো দুজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করলো। তাদের মধ্যে একজন বাদশাহর শরাব পরিবেশনকারী ছিলো, আর দ্বিতীয়জন ছিলো বাদশাহর পাকশালার দারোগা। একদিন এই বন্দি দুজন
ইউসুফ আ.-এর খেদমতে হাজির হলো। তাদের মধ্যে শরাব পরিবেশনকারী বললো, আমি এই স্বপ্ন দেখেছি যে আমি শরাব প্রস্তুর করার জন্য আঙ্গুর নিংড়ে রস বের করছি। দ্বিতীয়জন বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি মাথার ওপর রুটির খাঞ্চা বহন করছি আর পাখিরা তা থেকে খাচ্ছে।
হযরত ইউসুফ আ. নবীর পুত্র ছিলেন। ইসলাম প্রচারের রুচি তাঁর স্নায়ুমণ্ডলীর সঙ্গে সংমিশ্রিত ছিলো। তা ছাড়া আল্লাহপাক তাঁকেও নবুওতের জন্য মনোনীত করেছিলেন। তাই সত্যধর্ম প্রচারই ছিলো তাঁর জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। যদিও তিনি কারাগারে ছিলেন, কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্যকে তিনি কী করে ভুলতে পারেন? আর যদিও তিনি দুখ-দুর্দশায় ছিলেন, কিন্তু আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার বিষয়টি ভুলে থাকেন তা কেমন করে সম্ভব হতে পারে? এ-সময়টিকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে নম্রতা ও মুহাব্বতের সঙ্গে তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে যেসব বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, তার মধ্য থেকে নিঃসন্দেহে এটাই এক প্রকার ইলম যা তিনি আমাকে দান করেছেন। তোমাদের কাছে তোমাদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য-দ্রব্য আসার আগেই আমি তোমাদের স্বপ্নের ফলাফল বলে দেবো। তবে আমি তোমাদেরকে একটি কথা বলছি। তোমরা তা ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো এবং বোঝার চেষ্টা করো।
'আমি ওইসব মানুষের ধর্ম অবলম্বন করি নি যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে না এবং আখেরাতের প্রতিও অবিশ্বাসকারী। আমি আমার পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ-ইয়াকুব, ইসহাক ও ইবরাহিম আলাইহিমুস সালাম-এর ধর্মের অনুসরণ করেছি। আমি কখনো এমন করতে পারি না যে, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কোনো বস্তুকে শরিক সাব্যস্ত করি। এটা আল্লাহপাকের একটি অনুগ্রহ; এই অনুগ্রহ তিনি আমার প্রতি করেছেন এবং আরো বহু মানুষের প্রতি করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।'
'বন্ধুগণ, তোমরা এ-কথা ভেবে দেখেছো কি, ভিন্ন ভিন্ন একাধিক উপাস্য হওয়া উত্তম না আল্লাহ তাআলা, যিনি এক ও সবার ওপর পরাক্রমশালী? তোমরা তাঁকে ছাড়া আর যাদের ইবাদত করছো, তাদের স্বরূপ এর চেয়ে আর বেশি কিছু নয় যে, তারা কেবল কয়েকটি নাম। এগুলোকে তোমাদের বাপ-দাদারা মনগড়া স্থির করে নিয়েছে। এগুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা কখনো কোনো সনদ নাযিল করেন নি। সর্বময় কর্তৃত্ব তো একমাত্র আল্লাহর।
হাতেই রয়েছে। তিনি এই নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না। এটাই সত্যধর্ম, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ নির্বোধ, তা জানে না।'
এই ঘটনাকে পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে এভাবে— يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ) مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطَانٍ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سورة يوسف)
'হে কারা-সঙ্গীদ্বয়, ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতগুলো নামের নামের ইবাদত করছো, যে-নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছো। এগুলোর কোনো প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নি। বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই। তিনি আদেশ দিয়েছেন কেবল তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করতে; এটাই শাশ্বত (ও সরল) দীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩৯-৪০
হেদায়েত ও নসিহতের এই পয়গামের পর হযরত ইউসুফ আ. কারাসঙ্গী দুজনের স্বপ্নের ফলাফল বর্ণনার প্রতি মনোযোগ প্রদান করলেন। তিনি বললেন:
'বন্ধুগণ, তোমাদের মধ্যে যে-ব্যক্তি দেখেছে যে সে আঙ্গুর নিংড়ে রস বের করছে, সে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় বাদশাহর শরাব পরিবেশনে নিযুক্ত হবে। আর যেজন মাথার ওপর রুটি বহন করতে দেখেছে তাকে শূলে চড়ানো হবে। পাখিরা তার মাথার মগজ ঠুকরে ঠুকরে খাবে। যে-বিষয়ে তোমরা প্রশ্ন করেছিলে তা নির্ধারিত হয়ে পড়েছে। (বাদশহর) সিদ্ধান্তও এটাই।'
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে— يَا صَاحِبَي السِّجْنِ أَمَا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا وَأَمَا الْآخَرُ فَيُصْلَبْ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ () وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِنْهُمَا
اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ فَأَنْسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'হে কারা-সঙ্গীদ্বয়, তোমাদের দুইজনের একজন তার প্রভুকে শরাব পান করাবে এবং অপরজন শূলবিদ্ধ হবে; এরপর তার মস্তক থেকে পাখি আহার করবে। যে-বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছে তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।' ইউসুফ তাদের মধ্য থেকে যে মুক্তি পাবে মনে করলো, তাকে বললো, 'তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো।' কিন্তু শয়তান ওকে ওর প্রভুর কাছে তার বিষয়ে বলার কথা ভুলিয়ে দিলো; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বছর কারাগারে থাকলো।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪১-৪২]
কথিত আছে যে, শরাব পরিবেশনকারী ও পাকশালার দারোগার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো যে, তারা পানীয় ও খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে বিষ মিশিয়েছিলো। তদন্ত সমাপ্ত হওয়ার পর পাকশালার দারোগার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলো আর শরাব পরিবেশনকারী নির্দোষ সাব্যস্ত হলো। হযরত ইউসুফ আ. তাদের স্বপ্নের ফল বর্ণনা করার পর শরাব পরিবেশনকারী খালাস পাবে মনে করে বললেন, اذكرني عِنْدَ رَبِّكَ 'তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা উল্লেখ করো।' কিন্তু সে মুক্তি পেয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর নিজের কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো যে ইউসুফ আ.-এর কথা তার মনেই থাকলো না। তার মনে পড়লো না যে সে কারাগারে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলো। শয়তান তার মস্তিষ্ক থেকে সে-কথা ভুলিয়ে দিয়েছিলো। এভাবে ইউসুফ আ.-কে কয়েক বছর কারাগারেই থাকতে হলো।
এখানে অধিকাংশ তাফসিরকারের সারমর্ম এই: اذْكُرْنِي عِنْدَ رَبِّكَ বাক্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর উদ্দেশ্য ছিলো, তুমি বাদশাহকে বলো যে, একজন নির্দোষ ও নিরপরাধ মানুষকে অযথাই অপরাধী সাব্যস্ত করে কারগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এ-ধরনের ব্যাখ্যার পর তাঁরা এরূপ সূক্ষ্ম তর্ক উত্থাপন করেন যে, বিপদ ও প্রয়োজনের সময় যদিও মানুষ থেকে মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করা যথার্থ চেষ্টা ও আল্লাহরভক্তির বিরোধী নয়, কিন্তু তারপরও حسنات الأبرار سيئات المقربين 'নেককার বান্দাদের কোনো কোনো ভালো কাজও আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের জন্য ভালো কাজ নয়।' এ-বক্তব্য
অনুযায়ী, হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহামানবের পক্ষে এটা সঙ্গত ছিলো না যে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার সঙ্গে সঙ্গে পার্থিব উপকরণসমূহের ওপরও ভরসা রাখেন। বাদশাহর কাছে নিজের দুঃখ-দুর্দশা দূরীকরণের জন্য প্রার্থনা করেন। সুতরাং আল্লাহ তাআলার ফয়সালা এটাই নির্ধারিত হলো যে, তাঁকে আরো কয়েক বছর কারাগারে রেখে দেবেন। শয়তান শরাব পরিবেশনকারীকে এমনভাবে ভুলিয়ে দিলো যে, সে হযরত ইউসুফের কথা কিছুই উল্লেখ করতে পারলো না।
ইবনে জারির আত-তাবারি ও ইবনে মাসউদ আল-বাগাবি প্রাচীন কালের কোনো মুহাক্কিক আলেম থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি ‘ঐট’ শব্দে। সর্বনামটির দ্বারা হযরত ইউসুফ আ.-কেই উদ্দেশ্য করেন এবং এই অর্থ করেন, শয়তান ইউসুফকে ভুলিয়ে দিলো যে, তাঁর পক্ষে বাদশাহর সাহায্যের জন্য শরাব পরিবেশনকারীকে বলে দেয়া সঙ্গত কাজ নয়। কিন্তু ইবনে কাসির এই ব্যাখ্যাকে কঠোরভাবে খণ্ডন করে দিয়েছেন এবং এই তাফসিরকে ভুল সাব্যস্ত করেছেন। সামনে তাওরাত থেকে এ-প্রসঙ্গে যা-কিছু উদ্ধৃত করা হয়েছে, মনে করা হয় যে, ওই তাফসিরের ভিত্তি তাওরাতের ওইসব বর্ণনার ওপরই স্থাপিত।
উল্লিখিত তাফসিরের বিপরীত কোনো মুফাস্সির বলেন, ইউসুফ আ.-এর এই বাক্যটির মর্মার্থ এই যে, হযরত ইউসুফ আ. বলেছেন, বাদশাহর সামনে আমার কথা উল্লেখ করে বলো, এমন এক ব্যক্তি আমাদেরকে এইভাবে সত্যধর্মের শিক্ষা প্রদান করছে, তার নিজের ধর্মকে আমাদের ধর্ম থেকে পৃথক বলছে এবং তা প্রতিপাদনে উত্তম প্রমাণও পেশ করছে। তাঁরা এই তাফসিরের বিশুদ্ধতার পক্ষে নিদর্শন বর্ণনা করেন যে, এখানে পবিত্র কুরআনে ইউসুফ আ. ও তাঁর দুজন কারাসঙ্গীর মধ্যে মাত্র দুটি বিষয়ের আলোচনাই পাওয়া যাচ্ছে। একটি বিষয় হলো ইসলামের দাওয়াত ও তাবলিগ আর অপর বিষয়টি হলো স্বপ্ন ও তার ফলাফল বর্ণনা। তৃতীয় কোনো বিষয়ের ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই। অর্থাৎ কোনা ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে এ-কথা প্রকাশ পায় না যে, হযরত ইউসুফ আ. সেই দুই ব্যক্তির সামনে নিজের কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন এবং এদিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সুতরাং আগেভাগে উল্লেখ করা ব্যতীত এভাবে বলা ‘তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা উল্লেখ করো’ বাক্যে অস্পষ্টতার কী অর্থ? ত ছাড়া হযরত ইউসুফ আ.-এর
কারাগার থেকে বের হয়ে আসার ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা যদি এমনই হতো, তাহলে শরাব পরিবেশনকারীর স্মরণ হওয়ার পর এবং বাদশাহর স্বপ্নের ফল বলে দেয়ার পর বাদশাহ যখন তাঁর কারামুক্তির নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ বের হয়ে এলেন না কেনো? এবং তিনি কেনো বাইরের অবস্থার অনুসন্ধান ও তদন্ত করার দাবি পেশ করলেন? এই তদন্ত তো পরেও হতে পারতো এবং পবিত্রতা ও নির্দোষিতার মীমাংসা কারগারের বাইরে এসেও করা যেতো। আয়াতগুলোর পর্যায়ক্রমিক সন্নিবেশের প্রতি লক্ষ করলে এই তাফসিরই অগ্রগণ্যতা পাওয়ার যোগ্য।

টিকাঃ
১. * তাওরাত, আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৩৯, আয়াত ৩৩।
২. * তাওরাত, আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪০, আয়াত ১।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ফেরআউনের স্বপ্ন

📄 ফেরআউনের স্বপ্ন


হযরত ইউসুফ আ.-এর এই ঘটনা মিসরের ফেরআউনের যুগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই খান্দানটি উচ্চতর বংশ হিসেবে আমালিকা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ইতিহাসে এদেরকে হিসুস নামে অভিহিত করা হয়েছে। এদের আদি মূল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এরা রাখালদের একটি গোত্র ছিলো। নতুন যুগের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই গোত্রটি আরব থেকে এসেছিলো। মূলে এরা যাযাবর আরবদেরই একটি শাখা ছিলো। তা ছাড়া প্রাচীন কিবতি ও আরবি ভাষার পারস্পরিক সাদৃশ্য এদের আরব হওয়ার অতিরিক্ত প্রমাণ।
মিসরের ধর্মীয় চিন্তাধারার ভিত্তিতে তাদের (হিসুস সম্প্রদায়ের) উপাধি ছিলো ফারা। কেননা, মিসরীয় দেবতাদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও পবিত্র দেবতা ছিলো آمن راع 'আ-মান রা' (সূর্যদেবতা)। তৎকালীন বাদশাহ সূর্যদেবতার অবতার এবং فراع 'ফারা' নামে আখ্যায়িত হতো। এই ফারাকেই হিব্রু ভাষায় فارعن 'ফা-রাআন' এবং আরবি ভাষায় فرعون 'ফেরআউন' বলা হতো। হযরত ইউসুফ আ.-এর সময়কার ফেরআউনের নাম ঐতিহাসিকগণ 'রাইয়ান' বলেছেন। মিসরীয় বর্ণনাসমূহে তাকে 'আ-ইয়ুনি' নামে অভিহিত করা হয়েছে।
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ. তখনো কারাগারেই আছেন। ইতোমধ্যে সেই যুগের ফেরআউন একটি স্বপ্ন দেখলো: সাতটি খুব মোটাতাজা স্থূলকায় গাভী এবং সাতটি কৃশকায় গাভী। কৃশকায় ও দুর্বল গাভীগুলো মোটাতাজা ও স্থূলকায় গাভীগুলোকে গিলে ফেললো। আরো দেখলো, সাতটি সতেজ ও সবুজ শস্যের শীষ আর সাতটি শুষ্ক শস্যেল শীষ। শুষ্ক শীষগুলো সতেজ শীষগুলোকে খেয়ে ফেললো। বাদশাহ ভোরে শয্যা ত্যাগ করে অত্যন্ত অস্থির ও বিচলিত হয়ে পড়লো। এমন বিচিত্র ও আশ্চর্যজনক স্বপ্নের জন্য তার খুব অস্থিরতা হতে লাগলো। তৎক্ষণাৎ সে দরবারের উপদেষ্টার কাছে স্বপ্নটি বর্ণনা করে তার ফলাফল জানতে চাইলো। সভাসদগণও তা শুনে বিচলিত ও অস্থির হয়ে পড়লো। যখন কেউই এই স্বপ্নের সমাধান করতে পারলো, তখন নিজেদের অক্ষমতা ও অজ্ঞতা গোপন করার জন্য বললো, বাদশাহ, এটা কোনো স্বপ্ন নয়, মনে বাজে কল্পনা। এর নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। আমরা প্রকৃত স্বপ্নের ব্যাখ্যা তো বলতে পারি; কিন্তু মনে বাজে কল্পনাসমূহের সমাধান দিতে পারি না।
ফেরআউন সভাসدদের এই জবাবে তৃপ্ত হতে পারলো না। এ-সময় বাদশাহর শরাব পরিবেশনকারীর নিজের স্বপ্ন ও ইউসুফ আ.-এর ব্যাখ্যার কথা স্মরণ হলো। সে বাদশাহর দরবারে আরজ করলো, আমাকে একটু অবকাশ দিলে আমি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা এনে দিতে পারি। বাদশাহর অনুমতি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সে কারাগারের উদ্দেশে ছুটলো এবং ইউসুফ আ.-কে বাদশাহর স্বপ্ন-
বৃত্তান্ত শোনালো। সে বললো, আপনি এর সমাধান দিন। কেননা আপনি সততা ও পবিত্রতার উজ্জ্বল প্রতীক। আপনিই এই স্বপ্নের ফলাফল বলতে পারবেন। এটা বিচিত্র নয় যে, যিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, আমি যখন সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে যাবো, তিনি আপনার সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা উপলব্ধি করবেন।
হযরত ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ও আত্মমর্যাদাবোধের পূর্ণতা এবং উচ্চ মর্যাদার কথা চিন্তা করুন— শরাব পরিবেশনকারীকে তিরস্কারও করলেন না এবং কয়েক বছর যাবৎ তাঁর কথা ভুলে থাকার কারণে ধমকও দিলেন না। ইলম বিতরণেও তিনি কার্পণ্য করলেন না। এমনও ভাবলেন না যে জালিমরা বিনাদোষে আমাকে কারাগারে আবদ্ধ করে রেখেছে। তারা যদি এই স্বপ্নের সমাধান না পেয়ে ধ্বংসাপ্রাপ্ত হয় সেটাই ভালো। সেটাই তাদের শাস্তি। না, এ-ধরনের কাজ তিনি করলেন না। তৎক্ষণাৎ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। নিজের পক্ষ থেকে এ-প্রসঙ্গে সঠিক তদবিরও বলে দিলেন। শরাব পরিবেশনকারীকে পূর্ণরূপে আশ্বস্ত করে বললেন:
'এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা এর তার ভিত্তিতে তোমাদের যা করতে হবে তা হলো— তোমরা এক নাগাড়ে সাত বছর ফসল ফলাবে এবং এই সাত বছর হবে তোমাদের সচ্ছলতার বছর। খেতের ফসল কাটার সময় যখন আসবে, সারা বছরের খাদ্যের জন্য যে-পরিমাণ শস্যের প্রয়োজন তা পৃথক করে ফেলবে। অবশিষ্ট শস্যগুলোকে তাদের শীষের মধ্যেই রেখে দিয়ো। শীষের মধ্যে রেখে দিলে সেগুলো কীট-পতঙ্গ থেকে সংরক্ষিত থাকবে এবং নষ্টও হবে না। এই সাত বছরের পর আর সাতটি বছর আসবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের এবং দুঃখ-দুর্দশার। এই সাত বছর তোমাদের পূর্বসঞ্চিত সমস্ত শস্য নিঃশেষ করে দেবে। এরপর আবার একটি বছর আসবে যখন যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। খেতের ফসল বেশ সবুজ ও সতেজ হবে। মানুষ নানা প্রকার ফল ও বীজ থেকে প্রচুর পরিমাণে রস ও তেল আহরণ করবে। অর্থাৎ, মোটাতাজা গাভীগুলো ও সতেজ শীষগুলো সচ্ছলতার সাত বছর আর দুর্বল ও কৃশকায় গাভীগুলো ও শুষ্ক শীষগুলো দুর্ভিক্ষ ও দুঃখ-দুর্দশার সাত বছর। যা সচ্ছলতার সাত বছরে উৎপন্ন শস্য খেয়ে নিঃশেষ করবে।
পবিত্র কুরআন উপরিউক্ত বিষয়টি ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে—
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنُبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تُحْصِنُونَ )) ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'তোমরা একাধারে সাত বছর ফসল চাষ করবে। এরপর তোমরা যে-শস্য কাটবে তার মধ্যে যে-সামান্য পরিমাণ তোমরা (সারাবছর) খাবে, তা ব্যতীত সব শস্য শীষসহ রেখে দেবে; এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, এই সাত বছর, যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে লোকে তা (সচ্ছল অবস্থার সাত বছরে সঞ্চিত ও রক্ষিত খাবে; কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা (বীজ ইত্যাদির জন্য) সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। তারপর আসবে এক বছর, সে- বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াবে। [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪৭-৪৯]
এটা পবিত্র কুরআনে আলঙ্কারিক মার্জিত ও অলৌকিক কালাম—একই বাক্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্নফল বর্ণনা এবং সে-সম্পর্কিত তদবির একসঙ্গেই বর্ণনা করে দিয়েছে। এতে কথার মধ্যে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন পড়ে নি।
শরাব পরিবেশনকারী বাদশাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে এসব বিবরণ শোনালো। বাদশাহ ইতোপূর্বে তার মুখে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রশংসার কয়েকটি বাণী শুনেছিলো। স্বপ্নফল বর্ণনার বিষয়টি দেখে বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর ইলম, জ্ঞান, উচ্চ মর্যাদা স্বীকার করে নিলেন এবং অ-দেখা বস্তুকে দেখতে চাওয়ার মতো আগ্রহী হয়ে বললেন, এমন ব্যক্তিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
অবস্থা শুনে হযরত ইউসুফ আ. কারাগার থেকে বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, এভাবে কারাগার থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য তো আমি প্রস্তুত নই। তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে বলো, তিনি যেনো এই বিষয়টির অনুসন্ধান করেন সেই স্ত্রীলোকদের কী
হয়েছিলো যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিলো? প্রথমে এ-বিষয়টি পরিষ্কার হোক যে, তারা ছল-চাতুরি ও ষড়যন্ত্র করেছিলো আর মহান প্রতিপালক তো তাদের প্রবঞ্চনা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক অবগতই আছেন।
হযরত ইউসুফ আ. বিনা দোষে বিনা অপরাধে কয়েক বছর যাবৎ কারারুদ্ধ ছিলেন এবং বিনা কারণে তাঁকে কয়েদি বানানো হয়েছিলো। এখন বাদশাহ যখন দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে মুক্তির সুসংবাদ শুনালেন, উচিত ছিলো তখন তিনি আনন্দচিত্তে উৎফুল্ল হয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। কিন্তু এই কাজ তিনি করলেন না; বরং তিনি বিষয়ের অনুসন্ধান দাবি করলেন। এর কারণ, হযরত ইউসুফ আ. নবী বংশের সন্তান ছিলেন এবং তিনি নিজেও ছিলেন একজন মনোনীত নবী। এজন্য তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানের পূর্ণ মাত্রারই অধিকারী। তিনি ভাবলেন, আমি যদি বাদশাহর আমার প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার কারণে মুক্তি পেয়ে যাই তাহলে এটা আমার প্রতি বাদশাহর করুণা ও মেহেরবানি বলে বিবেচিত হবে। অথচ আমার নির্দোষিতা ও পবিত্রতা পর্দার অন্তরালে থেকে যাবে। আর এভাবে কারাগার থেকে মুক্ত হলে কেবল আত্মসম্মানবোধেই আঘাত লাগবে না, বরং দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের মহা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা আমার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। সুতরাং, এখনই আসল ব্যাপারটি সামনে উপস্থিত করার এবং সত্য প্রকাশিত হওয়ার উপযুক্ত সময়।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের বর্ণিত হাদিসে আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ-ঘটনাটির উল্লেখ করে ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ও দৃঢ়তার খুব প্রশংসা করেছেন এবং এটাকে বিনয় ও নতির শেষ সীমা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السَّجْنِ طُولَ مَا لَبِثَ يُوسُفُ لَأَجَبْتُ الدَّاعِيَ
'আমি যদি এত দীর্ঘকাল কারাগারে অবস্থান করতাম, যত দীর্ঘকাল ইউসুফ আ. কারাগারে ছিলেন, তবে তৎক্ষণাৎ আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম (কারাগার থেকে বের হয়ে আসতাম)।
এখানে এ-বিষয়টিও লক্ষ করার যোগ্য যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারটি আযিযে মিসরের স্ত্রীর সঙ্গে ঘটলেও তিনি তা উল্লেখ করেন নি; বরং তিনি
সেই মিসরীয় রমণীদের কথা বললেন যারা হাত কেটে ফেলেছিলো। হযরত ইউসুফ আ. কেনো এমন করলেন? এর দুটি কারণ ছিলো: একটি এই যে, হযরত ইউসুফ আ. যদিও আযিযে মিসরের স্ত্রীর কারণেই অধিক কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু কারাগারে প্রেরণের ক্ষেত্রে সেই রমণীদেরও ষড়যন্ত্র ছিলো। কেননা, তাদের মধ্যে প্রত্যেকেই হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রতি আশিক ছিলো এবং তাঁকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য অভিলাষী ছিলো। অবশেষে বিফল মনোরথ হওয়ার পর সবাই মিলে আযিযে মিসরের স্ত্রীকে ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে এবং সেটাকে কাজে পরিণত করে ছেড়েছে। এ-কারণেই কারাগারে প্রেরণের ঘটনা সেই রমণীদের ঘটনার পরে ঘটেছিলো। দ্বিতীয় কারণ এই যে, হযরত ইউসুফ আ. মনে করতেন, আযিযে মিসর আমার সঙ্গে যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করেছেন, আমাকে সম্মান দিয়েছেন এবং মর্যাদা প্রদান করেছেন। সুতরাং এটা সঙ্গত নয়, আমি তাঁর স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে তাঁর অপমান ও দুর্নামের কারণ ঘটাই।
মোটকথা, বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর কথা শুনে সেই রমণীদেরকে ডেকে পাঠালেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্য ও পরিষ্কারভাবে বলো, তোমরা যে ইউসুফকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছিলে সে বিষয়টির প্রকৃত তথ্য কী? তারা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো-
حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ
'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, (আল্লাহ না করুন) আমরা তার মধ্যে কোনো দোষ (অসৎ প্রবৃত্তি) দেখি নি।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১।
নারীদের এই সমাবেশে আযিযে মিসরের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন আর প্রেমের আগুনে কাঁচা ছিলেন না; পাকা হয়ে উজ্জ্বল স্বর্ণে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি অপমান ও দুর্নামের ভয়কে অতিক্রম করে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন দেখলেন যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর আকাঙ্ক্ষা হলো সত্য ও প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয়ে পড়ুক, তখন তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই বলে উঠলেন-

টিকাঃ
১. এই ঘটনা তাওরাতে নিম্নোক্ত বাক্যসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে: 'তখন ইউসুফ আ. বললেন, এর ব্যাখ্যা এই যে, মনে করো, এই তিনটি ডাল তিনটি দিন। এখন থেকে তিনদিনের মধ্যে বাদশাহ তোমার মামলার রায় প্রদান করবেন এবং তোমাকে পুনরায় চাকরির পদ প্রদান করবেন। পূর্বে যেমন তুমি ফেরআউনের শরাব পরিবেশনকারী ছিলে, তেমনি আবারো তুমি শরাবের পেয়ালা ফেরআউনের হাতে দিবে। আর যখন তোমার অবস্থা ভালো তখন আমরা কথা স্মরণ করো এবং আমাকে এই কারগার থেকে মুক্তি দেয়াইও। কেননা, কাফেলার লোকেরা আমাকে ইরানিদের দেশ থেকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছে এবং এখানেও আমি এমন কোনো কাজ করি নি যে, তারা আমাকে এই কারগারে রেখে দেবে। ১০
২. ১০ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪০, আয়াত ১২-১৫।
৩. ১১ তরজুমানুল কুরআন: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬।
৪. ১" ফেরআউন।
৫. يَعْصرُون শব্দটির অর্থ ফল নিংড়ে রস বের করবে। এখানে তা বাগধারারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ প্রচুর ভোগ-বিলাস করবে।
৬. * সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৩৭২।

হযরত ইউসুফ আ.-এর এই ঘটনা মিসরের ফেরআউনের যুগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই খান্দানটি উচ্চতর বংশ হিসেবে আমালিকা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ইতিহাসে এদেরকে হিসুস নামে অভিহিত করা হয়েছে। এদের আদি মূল সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, এরা রাখালদের একটি গোত্র ছিলো। নতুন যুগের অনুসন্ধানে জানা যায়, এই গোত্রটি আরব থেকে এসেছিলো। মূলে এরা যাযাবর আরবদেরই একটি শাখা ছিলো। তা ছাড়া প্রাচীন কিবতি ও আরবি ভাষার পারস্পরিক সাদৃশ্য এদের আরব হওয়ার অতিরিক্ত প্রমাণ।
মিসরের ধর্মীয় চিন্তাধারার ভিত্তিতে তাদের (হিসুস সম্প্রদায়ের) উপাধি ছিলো ফারা। কেননা, মিসরীয় দেবতাদের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও পবিত্র দেবতা ছিলো آمن راع 'আ-মান রা' (সূর্যদেবতা)। তৎকালীন বাদশাহ সূর্যদেবতার অবতার এবং فراع 'ফারা' নামে আখ্যায়িত হতো। এই ফারাকেই হিব্রু ভাষায় فارعن 'ফা-রাআন' এবং আরবি ভাষায় فرعون 'ফেরআউন' বলা হতো। হযরত ইউসুফ আ.-এর সময়কার ফেরআউনের নাম ঐতিহাসিকগণ 'রাইয়ান' বলেছেন। মিসরীয় বর্ণনাসমূহে তাকে 'আ-ইয়ুনি' নামে অভিহিত করা হয়েছে।
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ. তখনো কারাগারেই আছেন। ইতোমধ্যে সেই যুগের ফেরআউন একটি স্বপ্ন দেখলো: সাতটি খুব মোটাতাজা স্থূলকায় গাভী এবং সাতটি কৃশকায় গাভী। কৃশকায় ও দুর্বল গাভীগুলো মোটাতাজা ও স্থূলকায় গাভীগুলোকে গিলে ফেললো। আরো দেখলো, সাতটি সতেজ ও সবুজ শস্যের শীষ আর সাতটি শুষ্ক শস্যেল শীষ। শুষ্ক শীষগুলো সতেজ শীষগুলোকে খেয়ে ফেললো। বাদশাহ ভোরে শয্যা ত্যাগ করে অত্যন্ত অস্থির ও বিচলিত হয়ে পড়লো। এমন বিচিত্র ও আশ্চর্যজনক স্বপ্নের জন্য তার খুব অস্থিরতা হতে লাগলো। তৎক্ষণাৎ সে দরবারের উপদেষ্টার কাছে স্বপ্নটি বর্ণনা করে তার ফলাফল জানতে চাইলো। সভাসদগণও তা শুনে বিচলিত ও অস্থির হয়ে পড়লো। যখন কেউই এই স্বপ্নের সমাধান করতে পারলো, তখন নিজেদের অক্ষমতা ও অজ্ঞতা গোপন করার জন্য বললো, বাদশাহ, এটা কোনো স্বপ্ন নয়, মনে বাজে কল্পনা। এর নির্দিষ্ট কোনো অর্থ নেই। আমরা প্রকৃত স্বপ্নের ব্যাখ্যা তো বলতে পারি; কিন্তু মনে বাজে কল্পনাসমূহের সমাধান দিতে পারি না।
ফেরআউন সভাসدদের এই জবাবে তৃপ্ত হতে পারলো না। এ-সময় বাদশাহর শরাব পরিবেশনকারীর নিজের স্বপ্ন ও ইউসুফ আ.-এর ব্যাখ্যার কথা স্মরণ হলো। সে বাদশাহর দরবারে আরজ করলো, আমাকে একটু অবকাশ দিলে আমি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা এনে দিতে পারি। বাদশাহর অনুমতি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সে কারাগারের উদ্দেশে ছুটলো এবং ইউসুফ আ.-কে বাদশাহর স্বপ্ন-
বৃত্তান্ত শোনালো। সে বললো, আপনি এর সমাধান দিন। কেননা আপনি সততা ও পবিত্রতার উজ্জ্বল প্রতীক। আপনিই এই স্বপ্নের ফলাফল বলতে পারবেন। এটা বিচিত্র নয় যে, যিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন, আমি যখন সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে যাবো, তিনি আপনার সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা উপলব্ধি করবেন।
হযরত ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ও আত্মমর্যাদাবোধের পূর্ণতা এবং উচ্চ মর্যাদার কথা চিন্তা করুন— শরাব পরিবেশনকারীকে তিরস্কারও করলেন না এবং কয়েক বছর যাবৎ তাঁর কথা ভুলে থাকার কারণে ধমকও দিলেন না। ইলম বিতরণেও তিনি কার্পণ্য করলেন না। এমনও ভাবলেন না যে জালিমরা বিনাদোষে আমাকে কারাগারে আবদ্ধ করে রেখেছে। তারা যদি এই স্বপ্নের সমাধান না পেয়ে ধ্বংসাপ্রাপ্ত হয় সেটাই ভালো। সেটাই তাদের শাস্তি। না, এ-ধরনের কাজ তিনি করলেন না। তৎক্ষণাৎ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। নিজের পক্ষ থেকে এ-প্রসঙ্গে সঠিক তদবিরও বলে দিলেন। শরাব পরিবেশনকারীকে পূর্ণরূপে আশ্বস্ত করে বললেন:
'এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা এর তার ভিত্তিতে তোমাদের যা করতে হবে তা হলো— তোমরা এক নাগাড়ে সাত বছর ফসল ফলাবে এবং এই সাত বছর হবে তোমাদের সচ্ছলতার বছর। খেতের ফসল কাটার সময় যখন আসবে, সারা বছরের খাদ্যের জন্য যে-পরিমাণ শস্যের প্রয়োজন তা পৃথক করে ফেলবে। অবশিষ্ট শস্যগুলোকে তাদের শীষের মধ্যেই রেখে দিয়ো। শীষের মধ্যে রেখে দিলে সেগুলো কীট-পতঙ্গ থেকে সংরক্ষিত থাকবে এবং নষ্টও হবে না। এই সাত বছরের পর আর সাতটি বছর আসবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের এবং দুঃখ-দুর্দশার। এই সাত বছর তোমাদের পূর্বসঞ্চিত সমস্ত শস্য নিঃশেষ করে দেবে। এরপর আবার একটি বছর আসবে যখন যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। খেতের ফসল বেশ সবুজ ও সতেজ হবে। মানুষ নানা প্রকার ফল ও বীজ থেকে প্রচুর পরিমাণে রস ও তেল আহরণ করবে। অর্থাৎ, মোটাতাজা গাভীগুলো ও সতেজ শীষগুলো সচ্ছলতার সাত বছর আর দুর্বল ও কৃশকায় গাভীগুলো ও শুষ্ক শীষগুলো দুর্ভিক্ষ ও দুঃখ-দুর্দশার সাত বছর। যা সচ্ছলতার সাত বছরে উৎপন্ন শস্য খেয়ে নিঃশেষ করবে।
পবিত্র কুরআন উপরিউক্ত বিষয়টি ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে—
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدْتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنُبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تُحْصِنُونَ )) ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'তোমরা একাধারে সাত বছর ফসল চাষ করবে। এরপর তোমরা যে-শস্য কাটবে তার মধ্যে যে-সামান্য পরিমাণ তোমরা (সারাবছর) খাবে, তা ব্যতীত সব শস্য শীষসহ রেখে দেবে; এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, এই সাত বছর, যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে লোকে তা (সচ্ছল অবস্থার সাত বছরে সঞ্চিত ও রক্ষিত খাবে; কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা (বীজ ইত্যাদির জন্য) সংরক্ষণ করবে তা ব্যতীত। তারপর আসবে এক বছর, সে- বছর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সে বছর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াবে। [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪৭-৪৯]
এটা পবিত্র কুরআনে আলঙ্কারিক মার্জিত ও অলৌকিক কালাম—একই বাক্যে হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্নফল বর্ণনা এবং সে-সম্পর্কিত তদবির একসঙ্গেই বর্ণনা করে দিয়েছে। এতে কথার মধ্যে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন পড়ে নি।
শরাব পরিবেশনকারী বাদশাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন করে এসব বিবরণ শোনালো। বাদশাহ ইতোপূর্বে তার মুখে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রশংসার কয়েকটি বাণী শুনেছিলো। স্বপ্নফল বর্ণনার বিষয়টি দেখে বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর ইলম, জ্ঞান, উচ্চ মর্যাদা স্বীকার করে নিলেন এবং অ-দেখা বস্তুকে দেখতে চাওয়ার মতো আগ্রহী হয়ে বললেন, এমন ব্যক্তিকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
অবস্থা শুনে হযরত ইউসুফ আ. কারাগার থেকে বাইরে আসতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, এভাবে কারাগার থেকে বাইরে যাওয়ার জন্য তো আমি প্রস্তুত নই। তুমি তোমার প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে বলো, তিনি যেনো এই বিষয়টির অনুসন্ধান করেন সেই স্ত্রীলোকদের কী
হয়েছিলো যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিলো? প্রথমে এ-বিষয়টি পরিষ্কার হোক যে, তারা ছল-চাতুরি ও ষড়যন্ত্র করেছিলো আর মহান প্রতিপালক তো তাদের প্রবঞ্চনা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক অবগতই আছেন।
হযরত ইউসুফ আ. বিনা দোষে বিনা অপরাধে কয়েক বছর যাবৎ কারারুদ্ধ ছিলেন এবং বিনা কারণে তাঁকে কয়েদি বানানো হয়েছিলো। এখন বাদশাহ যখন দয়াপরবশ হয়ে তাঁকে মুক্তির সুসংবাদ শুনালেন, উচিত ছিলো তখন তিনি আনন্দচিত্তে উৎফুল্ল হয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। কিন্তু এই কাজ তিনি করলেন না; বরং তিনি বিষয়ের অনুসন্ধান দাবি করলেন। এর কারণ, হযরত ইউসুফ আ. নবী বংশের সন্তান ছিলেন এবং তিনি নিজেও ছিলেন একজন মনোনীত নবী। এজন্য তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাবোধ ও আত্মসম্মানের পূর্ণ মাত্রারই অধিকারী। তিনি ভাবলেন, আমি যদি বাদশাহর আমার প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার কারণে মুক্তি পেয়ে যাই তাহলে এটা আমার প্রতি বাদশাহর করুণা ও মেহেরবানি বলে বিবেচিত হবে। অথচ আমার নির্দোষিতা ও পবিত্রতা পর্দার অন্তরালে থেকে যাবে। আর এভাবে কারাগার থেকে মুক্ত হলে কেবল আত্মসম্মানবোধেই আঘাত লাগবে না, বরং দীনের দাওয়াত ও তাবলিগের মহা গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা আমার জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য। সুতরাং, এখনই আসল ব্যাপারটি সামনে উপস্থিত করার এবং সত্য প্রকাশিত হওয়ার উপযুক্ত সময়।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের বর্ণিত হাদিসে আছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ-ঘটনাটির উল্লেখ করে ইউসুফ আ.-এর ধৈর্য ও দৃঢ়তার খুব প্রশংসা করেছেন এবং এটাকে বিনয় ও নতির শেষ সীমা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন—
وَلَوْ لَبِثْتُ فِي السَّجْنِ طُولَ مَا لَبِثَ يُوسُفُ لَأَجَبْتُ الدَّاعِيَ
'আমি যদি এত দীর্ঘকাল কারাগারে অবস্থান করতাম, যত দীর্ঘকাল ইউসুফ আ. কারাগারে ছিলেন, তবে তৎক্ষণাৎ আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম (কারাগার থেকে বের হয়ে আসতাম)।
এখানে এ-বিষয়টিও লক্ষ করার যোগ্য যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারটি আযিযে মিসরের স্ত্রীর সঙ্গে ঘটলেও তিনি তা উল্লেখ করেন নি; বরং তিনি
সেই মিসরীয় রমণীদের কথা বললেন যারা হাত কেটে ফেলেছিলো। হযরত ইউসুফ আ. কেনো এমন করলেন? এর দুটি কারণ ছিলো: একটি এই যে, হযরত ইউসুফ আ. যদিও আযিযে মিসরের স্ত্রীর কারণেই অধিক কষ্ট পেয়েছিলেন, কিন্তু কারাগারে প্রেরণের ক্ষেত্রে সেই রমণীদেরও ষড়যন্ত্র ছিলো। কেননা, তাদের মধ্যে প্রত্যেকেই হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রতি আশিক ছিলো এবং তাঁকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য অভিলাষী ছিলো। অবশেষে বিফল মনোরথ হওয়ার পর সবাই মিলে আযিযে মিসরের স্ত্রীকে ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছে এবং সেটাকে কাজে পরিণত করে ছেড়েছে। এ-কারণেই কারাগারে প্রেরণের ঘটনা সেই রমণীদের ঘটনার পরে ঘটেছিলো। দ্বিতীয় কারণ এই যে, হযরত ইউসুফ আ. মনে করতেন, আযিযে মিসর আমার সঙ্গে যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করেছেন, আমাকে সম্মান দিয়েছেন এবং মর্যাদা প্রদান করেছেন। সুতরাং এটা সঙ্গত নয়, আমি তাঁর স্ত্রীর নাম উল্লেখ করে তাঁর অপমান ও দুর্নামের কারণ ঘটাই।
মোটকথা, বাদশাহ ইউসুফ আ.-এর কথা শুনে সেই রমণীদেরকে ডেকে পাঠালেন। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, সত্য ও পরিষ্কারভাবে বলো, তোমরা যে ইউসুফকে তোমার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছিলে সে বিষয়টির প্রকৃত তথ্য কী? তারা সবাই সমস্বরে বলে উঠলো-
حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ
'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, (আল্লাহ না করুন) আমরা তার মধ্যে কোনো দোষ (অসৎ প্রবৃত্তি) দেখি নি।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১।
নারীদের এই সমাবেশে আযিযে মিসরের স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখন আর প্রেমের আগুনে কাঁচা ছিলেন না; পাকা হয়ে উজ্জ্বল স্বর্ণে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি অপমান ও দুর্নামের ভয়কে অতিক্রম করে অনেক দূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যখন দেখলেন যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর আকাঙ্ক্ষা হলো সত্য ও প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হয়ে পড়ুক, তখন তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই বলে উঠলেন-

টিকাঃ
১. এই ঘটনা তাওরাতে নিম্নোক্ত বাক্যসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে: 'তখন ইউসুফ আ. বললেন, এর ব্যাখ্যা এই যে, মনে করো, এই তিনটি ডাল তিনটি দিন। এখন থেকে তিনদিনের মধ্যে বাদশাহ তোমার মামলার রায় প্রদান করবেন এবং তোমাকে পুনরায় চাকরির পদ প্রদান করবেন। পূর্বে যেমন তুমি ফেরআউনের শরাব পরিবেশনকারী ছিলে, তেমনি আবারো তুমি শরাবের পেয়ালা ফেরআউনের হাতে দিবে। আর যখন তোমার অবস্থা ভালো তখন আমরা কথা স্মরণ করো এবং আমাকে এই কারগার থেকে মুক্তি দেয়াইও। কেননা, কাফেলার লোকেরা আমাকে ইরানিদের দেশ থেকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছে এবং এখানেও আমি এমন কোনো কাজ করি নি যে, তারা আমাকে এই কারগারে রেখে দেবে। ১০
২. ১০ তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৪০, আয়াত ১২-১৫।
৩. ১১ তরজুমানুল কুরআন: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৬।
৪. ১" ফেরআউন।
৫. يَعْصرُون শব্দটির অর্থ ফল নিংড়ে রস বের করবে। এখানে তা বাগধারারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ প্রচুর ভোগ-বিলাস করবে।
৬. * সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৩৭২।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সুস্থতত্ত্ব

📄 সুস্থতত্ত্ব


ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ আর-রাযি রহ. বলেন, হযরত ইউসুফ আ. আল্লাহ তাআলার সত্য পয়গাম্বর এবং নিষ্পাপ নবী ছিলেন। সুতরাং তিনি সব ধরনের মলিনতা থেকে পবিত্র ছিলেন। তাঁর পবিত্র জীবনের একটি একটি মুহূর্তকেও কোনো প্রকারের অপবিত্রতা স্পর্শ করতে পারে নি। আল্লাহ তাআলার অদ্ভুত মহিমা লক্ষ করুন, ইউসুফ আ.-এর ঘটনার সঙ্গে যতগুলো মানুষ জড়িত তাদের সবার মুখ থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর সত্তার পবিত্রতা ও নির্দোষিতা স্বীকার করিয়ে নিলেন। প্রবাদ আছে— الفضل ما شهدت به الأعداء ‘উত্তম বিষয় তা-ই যা শত্রুর মুখে প্রকাশ পায়।’
আচ্ছা, হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনার সঙ্গে জড়িত লোক কারা? তাঁরা হলেন, আযিযে মিসর, আযিযে মিসরের স্ত্রী, শহরের নিমন্ত্রিত রমণীগণ, আযিযে মিসরের স্ত্রীর আত্মীয়—এই কয়জন মানুষই কোনো-না-কোনোভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তসাপেক্ষে বিষয়টির সঙ্গে জড়িত। এঁদের মধ্যে প্রথমে দৃষ্টিপথে পড়ে যান আযিযে মিসরের স্ত্রীর আত্মীয়। তিনি জ্ঞানবিজ্ঞের মতো জামা ছিন্ন হওয়ার বিষয়টির মীমাংসা দিয়ে হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতা প্রকাশ করেন এবং স্ত্রীলোকটিকে অপরাধী সাব্যস্ত করেন। তারপর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হওয়ার পর আযিযও স্বীকার করেন যে, ইউসুফ নিষ্পাপ, নির্দোষ ও পবিত্র। তা ছাড়া তিনি يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا 'ইউসুফ, তুমি বিষয়টি ক্ষমা করো বা উপেক্ষা করো' বলে ওজরও পেশ করেন এবং নিজের সম্মান রক্ষা করার জন্য এখানেই ব্যাপারটি সমাপ্ত করার আবেদন জানান। তৃতীয় সারিতে আছেন শহরের নিমন্ত্রিত রমণীগণ। বাদশাহ যখন জনাকীর্ণ
দরবারে হযরত ইউসুফের ব্যাপারে তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁরা নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন—
حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ
'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, আমরা তার মধ্যে কোনো দোষ দেখি নি। (আল্লাহ না করুন, আমরা ইউসুফ থেকে কোনো অসৎ প্রবৃত্তি দেখি নি।)' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১)
এভাবে আল্লাহপাক হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতার ওপর সীলমোহর মেরে দিলেন। এইসব সাক্ষ্য-প্রমাণ হযরত ইউসুফ আ.-এর আত্মীয় স্বজন ও পক্ষসমর্থক লোকদের মাধ্যমে ছিলো না; বরং অপরিচিত আযিযে মিসরের স্ত্রীর গোত্র ও বংশের লোকদের দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছিলো। তারপরও এ-ধারণা বা সন্দেহের উদ্রেক হতে পারতো যে, এ-ঘটনায় ইউসুফ আ.-এর অবশ্যই কিছু-না-কিছু দোষ-ত্রুটি থাকা বিচিত্র নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার বিরাট দয়া ও অনুগ্রহ ছিলো এই যে, তিনি নিজের পবিত্র বান্দার পবিত্রতা ঘোষণা এবং সে-সম্পর্কে খারাপ ধারণার নাম পর্যন্ত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে জনাকীর্ণ সমাবেশের সামনে স্বয়ং অপরাধীর দ্বারা অপরাধ স্বীকার করিয়ে দিলেন। তাঁরই মুখে হযরত ইউসুফের সততা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য প্রদান করিয়ে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে দিলেন। বাদশাহর দরবারে আযিযে মিসরের স্ত্রী এ-কথা বলতে বাধ্য হলেন যে—
الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَا وَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ
'এখন সত্য প্রকাশিত হলো, আমিই তাকে (তার নিজের ব্যাপারে) ফুসলিয়েছিলাম, (এবং কোনো সন্দেহ নেই যে,) সে তো সত্যবাদী।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১)
ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (سورة الجمعة)
'তা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন এবং আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।' [সুরা জুমআ: আয়াত ৪।

ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ আর-রাযি রহ. বলেন, হযরত ইউসুফ আ. আল্লাহ তাআলার সত্য পয়গাম্বর এবং নিষ্পাপ নবী ছিলেন। সুতরাং তিনি সব ধরনের মলিনতা থেকে পবিত্র ছিলেন। তাঁর পবিত্র জীবনের একটি একটি মুহূর্তকেও কোনো প্রকারের অপবিত্রতা স্পর্শ করতে পারে নি। আল্লাহ তাআলার অদ্ভুত মহিমা লক্ষ করুন, ইউসুফ আ.-এর ঘটনার সঙ্গে যতগুলো মানুষ জড়িত তাদের সবার মুখ থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর সত্তার পবিত্রতা ও নির্দোষিতা স্বীকার করিয়ে নিলেন। প্রবাদ আছে— الفضل ما شهدت به الأعداء ‘উত্তম বিষয় তা-ই যা শত্রুর মুখে প্রকাশ পায়।’
আচ্ছা, হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনার সঙ্গে জড়িত লোক কারা? তাঁরা হলেন, আযিযে মিসর, আযিযে মিসরের স্ত্রী, শহরের নিমন্ত্রিত রমণীগণ, আযিযে মিসরের স্ত্রীর আত্মীয়—এই কয়জন মানুষই কোনো-না-কোনোভাবে অনুসন্ধান ও তদন্তসাপেক্ষে বিষয়টির সঙ্গে জড়িত। এঁদের মধ্যে প্রথমে দৃষ্টিপথে পড়ে যান আযিযে মিসরের স্ত্রীর আত্মীয়। তিনি জ্ঞানবিজ্ঞের মতো জামা ছিন্ন হওয়ার বিষয়টির মীমাংসা দিয়ে হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতা প্রকাশ করেন এবং স্ত্রীলোকটিকে অপরাধী সাব্যস্ত করেন। তারপর প্রকৃত অবস্থা প্রকাশিত হওয়ার পর আযিযও স্বীকার করেন যে, ইউসুফ নিষ্পাপ, নির্দোষ ও পবিত্র। তা ছাড়া তিনি يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا 'ইউসুফ, তুমি বিষয়টি ক্ষমা করো বা উপেক্ষা করো' বলে ওজরও পেশ করেন এবং নিজের সম্মান রক্ষা করার জন্য এখানেই ব্যাপারটি সমাপ্ত করার আবেদন জানান। তৃতীয় সারিতে আছেন শহরের নিমন্ত্রিত রমণীগণ। বাদশাহ যখন জনাকীর্ণ
দরবারে হযরত ইউসুফের ব্যাপারে তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তাঁরা নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন—
حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوءٍ
'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, আমরা তার মধ্যে কোনো দোষ দেখি নি। (আল্লাহ না করুন, আমরা ইউসুফ থেকে কোনো অসৎ প্রবৃত্তি দেখি নি।)' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১)
এভাবে আল্লাহপাক হযরত ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতার ওপর সীলমোহর মেরে দিলেন। এইসব সাক্ষ্য-প্রমাণ হযরত ইউসুফ আ.-এর আত্মীয় স্বজন ও পক্ষসমর্থক লোকদের মাধ্যমে ছিলো না; বরং অপরিচিত আযিযে মিসরের স্ত্রীর গোত্র ও বংশের লোকদের দ্বারাই সম্পন্ন হয়েছিলো। তারপরও এ-ধারণা বা সন্দেহের উদ্রেক হতে পারতো যে, এ-ঘটনায় ইউসুফ আ.-এর অবশ্যই কিছু-না-কিছু দোষ-ত্রুটি থাকা বিচিত্র নয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলার বিরাট দয়া ও অনুগ্রহ ছিলো এই যে, তিনি নিজের পবিত্র বান্দার পবিত্রতা ঘোষণা এবং সে-সম্পর্কে খারাপ ধারণার নাম পর্যন্ত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে জনাকীর্ণ সমাবেশের সামনে স্বয়ং অপরাধীর দ্বারা অপরাধ স্বীকার করিয়ে দিলেন। তাঁরই মুখে হযরত ইউসুফের সততা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য প্রদান করিয়ে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে দিলেন। বাদশাহর দরবারে আযিযে মিসরের স্ত্রী এ-কথা বলতে বাধ্য হলেন যে—
الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَا وَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ
'এখন সত্য প্রকাশিত হলো, আমিই তাকে (তার নিজের ব্যাপারে) ফুসলিয়েছিলাম, (এবং কোনো সন্দেহ নেই যে,) সে তো সত্যবাদী।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫১)
ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (سورة الجمعة)
'তা আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করে থাকেন এবং আল্লাহ বড়ই অনুগ্রহশীল।' [সুরা জুমআ: আয়াত ৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00