📄 হযরত ইউসুফ আ. মিসরে
খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর পূর্বে মিসরকে সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্রভূমি মনে করা হতো। ওখানকার শাসক ছিলো আমালিকা গোত্রের হিকসুস। যেসময় হযরত ইউসুফ আ. কিনআন থেকে যাযাবর জাতির ক্রীতদাস হয়ে মিসরে প্রবেশ করলেন, তখন মিসরের রাজধানী ছিলো রাআমাসিস। এটা খুব সম্ভব ওই স্থানে অবস্থিত ছিলো যেখানে আজ 'সান' নামক বসতিটি আবাদ রয়েছে। ভৌগলিক বিবরণ অনুযায়ী এই স্থানটি পুবদিকে নীলনদের কাছে বলে কথিত। ফুতিফার ছিলেন মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং এক মর্যাদাবান গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি ঘুরতে বের হয়ে মিসরের বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ-সময় ইউসুফ আ.-এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। তিনি অতি সাধারণ মূল্যে তাঁকে ক্রয় করে নেন।
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, মিসরীয়রা তৎকালে নিজেদেরকে বিশ্বের সেরা সুসভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতি বলে মনে করতো। তারা মরুবাসী যাযাবর গোত্রগুলোকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতো। নিজেদের শহরে তাদের সঙ্গে অস্পৃশ্যের মতো ব্যবহার করতো। এই গোত্রগুলোর মধ্যেই একটি গোত্র ইবরাহিমি বংশের স্মারক হয়ে কিনআনে বসবাস করতো। কিনআনে শহুরে পরিবেশ এবং স্থায়ী অধিবাসের নামচিহ্ন পর্যন্ত ছিলো না। শিকারের ওপর তাদের জীবনযাপন নির্ভর করতো। খড়ের ছাউনিযুক্ত ছোট ছোট কুটিরে তারা বসবাস করতো। আর বকরি-ভেড়ার তাদের ধন-সম্পদ।
এমতাবস্থায় ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার অভাবনীয় কর্মকাণ্ড দেখুন। একজন গ্রামীণ মানুষ, তিনি আবার অল্প বয়স্ক ক্রীতদাস। তিনি একজন সুসভ্য, সংস্কৃতিবান, ধনাঢ্য ও আড়ম্বরপূর্ণ ব্যক্তির ঘরে ঠাঁই পান। তখন তিনি নিজের নিষ্পাপ জীবন, ধৈর্য ও গাম্ভীর্য, বিশ্বস্ততা এবং যোগ্যতার পবিত্র গুণাবলির বদৌলতে তাঁর প্রভুর চোখের জ্যোতি ও প্রাণের মালিক হয়ে ওঠেন। ফুতিফার তাঁর স্ত্রীকে বলেন, কুরআনের ভাষায়- أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا
'এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করো, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপেই গ্রহণ করতে পারি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)
এটা কী কারণে হলো? ইউসুফ আ.-এর মধ্যে এই পছন্দীয় চরিত্র ও স্বভাব কোথা থেকে এলো? একজন গ্রামীণ সন্তান কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন? একজন ক্রীতদাস কোন মুরব্বি থেকে এই পবিত্র স্বভাবের অধিকারী হলেন। এই প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআন জবাব দিচ্ছে- وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (سورة يوسف)
'সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো, আমি তাকে হেকমত ও জ্ঞান দান করলাম (মীমাংসার ক্ষমতা ও ইলম) এবং এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২২)
যাইহোক। ফুতিফার হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচার-ব্যবহার করেন নি; বরং আপন সন্তানের মতো সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাখলেন এবং নিজের জমিদারি, ধন-দৌলত ও গৃহজীবনের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাঁর ওপর সোপর্দ করে দিলেন। এটা যেনো কিনআনের একজন
পশুপালকের ওপর অদূর ভবিষ্যতে যে রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হবে তারই সূচনা। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَكَذَلِكَ مَكَّنَا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سورة يوسف)
'এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সে-দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)
টিকাঃ
১. ° হিজাযি।
📄 আযিযের মিসরের স্ত্রী এবং ইউসুফ আ.
একজন বিখ্যাত সুফি ইবনে আতাউল্লাহ আস-সিকান্দারির উক্তি : ربما كمنت المنن في المحن
'অধিকাংশ সময়ই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দয়া বিপদাপদের মধ্যে নিহিত থাকে।' হযরত ইউসুফ আ.-এর গোটা জীবনটাই এই উক্তিরই বাস্তবায়ন-ক্ষেত্র। শৈশবকালের প্রথম বিপদ তাঁকে কিনআনের গ্রাম্য জীবন থেকে বের করে তাহযিব ও তামান্দুনের কেন্দ্রভূমি মিসরের এক অভিজাত ও শ্রেষ্ঠ পরিবারের মালিক বানিয়ে দিলো। একেই বলে 'দাসত্বের মধ্যে থেকে প্রভুত্ব করা'।
এখন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ও আরো কঠিন পরীক্ষা শুরু হলো। হযরত ইউসুফ আ. তখন পূর্ণযৌবনে পদার্পণ করেছেন। রূপ ও সৌন্দর্যের এমন কোনো দিক ছিলো না যা তাঁর মধ্যে ছিলো না। তিনি ছিলেন মাধুর্য ও কমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। চেহারা ছিলো চন্দ্র ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায়-সোহাগার মত কাজ করছিলো। এসব গুণাবলি ছিলো তাঁর সবসময়ের সঙ্গী।
আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের হৃদয়কে আর বশে রাখতে পারলেন না। হযরত ইউসুফের রূপশিখার ওপর পতঙ্গের মতো কুরবান হতে লাগলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রপৌত্র, হযরত ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর চোখের জ্যোতি, নবী পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রদীপ, নবুওতের পদের জন্য মনোনীত। এমন মহাপুরুষের দ্বারা কেমন করে সম্ভব ছিলো যে
তিনি অপবিত্র ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হন এবং আযিযের স্ত্রীর অপবিত্র মনস্কামনা পূর্ণ করেন?
কিন্তু মিসরের সেই স্বাধীনা রমণী যখন দেখলেন, এভাবে হযরত ইউসুফের ওপর জাদু ক্রিয়া করছে না, তখন একদিন তিনি উন্মত্ত হয়ে ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ইউসুফ আ.-কে পীড়পীড়ি করতে শুরু করলেন—আমার কামবাসনা পূর্ণ করো। হযরত ইউসুফ আ.-এর জন্য এই সময়টুকু ছিলো কঠিন পরীক্ষার সময়। আযিযের স্ত্রী রাজ পরিবারের উদ্ভিন্ন যৌবনা রমণী, সৌন্দর্যশিখামণ্ডিত রক্তিম চেহারা, প্রেয়সী নয় বরং প্রেমিক, রূপ ও সাজ-সজ্জার এক অসহনীয় প্রদর্শনী, প্রেয়সীসুলভ ভাবভঙ্গির চাহনি। আর এদিকে হযরত ইউসুফ আ. নিজেও রূপবান নবযুবক, রূপ-সৌন্দর্যের মাধুর্যের সঙ্গে পরিচিত। সব দরজা বন্ধ। অভিভাবক ও প্রভুর ভয়ের ব্যাপারে মিসরের রানি নিজেই দায়িত্বশীল। কিন্তু এতসব অনুকূল অবস্থা হযরত ইউসুফের হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কি আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রতি বাসনা জাগিয়ে তুলেছিলো? তাঁর অন্তর কি শান্তভাব ত্যাগ করে অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যে অধীর হয়ে উঠেছিলো? তাঁর নফস কি হৃদয়জগতে একমুহূর্তের জন্য কম্পন সৃষ্টি করেছিলো? না, কখনোই নয়। তার পরিবর্তে বরং পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার প্রতিমূর্তি, নবুওতের আমানতদার, আল্লাহ তাআলার ওহি অবতীর্ণ হওয়ার স্থল এমন দুটি চিত্তাকর্ষক ও শক্তিশালী দলিল দ্বারা মিসরের সেই নারীকে বুঝিয়েছিলেন, যা হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো ব্যক্তিত্বের দ্বারাই সম্ভব ছিলো। যাঁর শিক্ষা ও প্রতিপালক সরাসরি আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে থেকেই হয়েছে।
তিনি আযিযে মিসরের স্ত্রীকে জবাব দিলেন, এটা অসম্ভব। আমি আল্লাহপাকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তাঁরই নাফরমানি করবো যাঁর মহাপ্রতাপশালী নাম 'আল্লাহ' এবং যিনি সমগ্র সৃষ্টজগতের মালিক? আর আমি কি আমার সেই মুরব্বি আযিযে মিসরের আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করবো যিনি আমাকে ক্রীতদাসরূপে রাখার পরিবর্তে এই সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন? যদি আমি এমন অশ্লীল কর্ম করি তাহলে তো জালিম বলে সাব্যস্ত হবো। আর জালিমদের জন্য পরিণামে কখনো মঙ্গল নেই।
কিন্তু আযিযে মিসরের ওপর এই নসিহতের কোনো ক্রিয়াই হলো না। বরং তিনি তাঁর কামনাকে কার্যকরী রূপদানের ওপরই গোঁ ধরে থাকলেন। তখন
হযরত ইউসুফ আ. তাঁর প্রতিপালকের সেই বুরহান বা প্রমানের প্রতি লক্ষ করে, যা তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলেন-
وَراوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ () وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (سورة يوسف)
'সে (ইউসুফ আ.) যে-স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলো সে (স্ত্রীলোকটি) তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করলো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো ও বললো, 'এসো।' (এসো, আমার কাছে এসো।) সে বললো, 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।' সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিলো এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তো যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন' প্রত্যক্ষ করতো (যদি আল্লাহপাকের প্রমাণ দেখতে না পেতেন)। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা (অসৎ ইচ্ছা ও নির্লজ্জতা) থেকে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত (খাঁটি) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৩-২৪]
একজন বিখ্যাত সুফি ইবনে আতাউল্লাহ আস-সিকান্দারির উক্তি : ربما كمنت المنن في المحن
'অধিকাংশ সময়ই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দয়া বিপদাপদের মধ্যে নিহিত থাকে।' হযরত ইউসুফ আ.-এর গোটা জীবনটাই এই উক্তিরই বাস্তবায়ন-ক্ষেত্র। শৈশবকালের প্রথম বিপদ তাঁকে কিনআনের গ্রাম্য জীবন থেকে বের করে তাহযিব ও তামান্দুনের কেন্দ্রভূমি মিসরের এক অভিজাত ও শ্রেষ্ঠ পরিবারের মালিক বানিয়ে দিলো। একেই বলে 'দাসত্বের মধ্যে থেকে প্রভুত্ব করা'।
এখন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ও আরো কঠিন পরীক্ষা শুরু হলো। হযরত ইউসুফ আ. তখন পূর্ণযৌবনে পদার্পণ করেছেন। রূপ ও সৌন্দর্যের এমন কোনো দিক ছিলো না যা তাঁর মধ্যে ছিলো না। তিনি ছিলেন মাধুর্য ও কমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। চেহারা ছিলো চন্দ্র ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায়-সোহাগার মত কাজ করছিলো। এসব গুণাবলি ছিলো তাঁর সবসময়ের সঙ্গী।
আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের হৃদয়কে আর বশে রাখতে পারলেন না। হযরত ইউসুফের রূপশিখার ওপর পতঙ্গের মতো কুরবান হতে লাগলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রপৌত্র, হযরত ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর চোখের জ্যোতি, নবী পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রদীপ, নবুওতের পদের জন্য মনোনীত। এমন মহাপুরুষের দ্বারা কেমন করে সম্ভব ছিলো যে
তিনি অপবিত্র ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হন এবং আযিযের স্ত্রীর অপবিত্র মনস্কামনা পূর্ণ করেন?
কিন্তু মিসরের সেই স্বাধীনা রমণী যখন দেখলেন, এভাবে হযরত ইউসুফের ওপর জাদু ক্রিয়া করছে না, তখন একদিন তিনি উন্মত্ত হয়ে ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ইউসুফ আ.-কে পীড়পীড়ি করতে শুরু করলেন—আমার কামবাসনা পূর্ণ করো। হযরত ইউসুফ আ.-এর জন্য এই সময়টুকু ছিলো কঠিন পরীক্ষার সময়। আযিযের স্ত্রী রাজ পরিবারের উদ্ভিন্ন যৌবনা রমণী, সৌন্দর্যশিখামণ্ডিত রক্তিম চেহারা, প্রেয়সী নয় বরং প্রেমিক, রূপ ও সাজ-সজ্জার এক অসহনীয় প্রদর্শনী, প্রেয়সীসুলভ ভাবভঙ্গির চাহনি। আর এদিকে হযরত ইউসুফ আ. নিজেও রূপবান নবযুবক, রূপ-সৌন্দর্যের মাধুর্যের সঙ্গে পরিচিত। সব দরজা বন্ধ। অভিভাবক ও প্রভুর ভয়ের ব্যাপারে মিসরের রানি নিজেই দায়িত্বশীল। কিন্তু এতসব অনুকূল অবস্থা হযরত ইউসুফের হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কি আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রতি বাসনা জাগিয়ে তুলেছিলো? তাঁর অন্তর কি শান্তভাব ত্যাগ করে অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যে অধীর হয়ে উঠেছিলো? তাঁর নফস কি হৃদয়জগতে একমুহূর্তের জন্য কম্পন সৃষ্টি করেছিলো? না, কখনোই নয়। তার পরিবর্তে বরং পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার প্রতিমূর্তি, নবুওতের আমানতদার, আল্লাহ তাআলার ওহি অবতীর্ণ হওয়ার স্থল এমন দুটি চিত্তাকর্ষক ও শক্তিশালী দলিল দ্বারা মিসরের সেই নারীকে বুঝিয়েছিলেন, যা হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো ব্যক্তিত্বের দ্বারাই সম্ভব ছিলো। যাঁর শিক্ষা ও প্রতিপালক সরাসরি আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে থেকেই হয়েছে।
তিনি আযিযে মিসরের স্ত্রীকে জবাব দিলেন, এটা অসম্ভব। আমি আল্লাহপাকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তাঁরই নাফরমানি করবো যাঁর মহাপ্রতাপশালী নাম 'আল্লাহ' এবং যিনি সমগ্র সৃষ্টজগতের মালিক? আর আমি কি আমার সেই মুরব্বি আযিযে মিসরের আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করবো যিনি আমাকে ক্রীতদাসরূপে রাখার পরিবর্তে এই সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন? যদি আমি এমন অশ্লীল কর্ম করি তাহলে তো জালিম বলে সাব্যস্ত হবো। আর জালিমদের জন্য পরিণামে কখনো মঙ্গল নেই।
কিন্তু আযিযে মিসরের ওপর এই নসিহতের কোনো ক্রিয়াই হলো না। বরং তিনি তাঁর কামনাকে কার্যকরী রূপদানের ওপরই গোঁ ধরে থাকলেন। তখন
হযরত ইউসুফ আ. তাঁর প্রতিপালকের সেই বুরহান বা প্রমানের প্রতি লক্ষ করে, যা তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলেন-
وَراوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ () وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (سورة يوسف)
'সে (ইউসুফ আ.) যে-স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলো সে (স্ত্রীলোকটি) তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করলো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো ও বললো, 'এসো।' (এসো, আমার কাছে এসো।) সে বললো, 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।' সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিলো এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তো যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন' প্রত্যক্ষ করতো (যদি আল্লাহপাকের প্রমাণ দেখতে না পেতেন)। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা (অসৎ ইচ্ছা ও নির্লজ্জতা) থেকে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত (খাঁটি) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৩-২৪]
📄 وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا বাক্যের তাফসির
মুফাস্সিরগণ এই আয়াতটির বিভিন্ন প্রকার তাফসির করেছেন। কিন্তু উপরে আমি যে-অর্থ করলাম তা-ই এই স্থানের সর্বাপেক্ষা অধিক উপযোগী। পবিত্র কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ঘটনায় আযিযে মিসরের স্ত্রীর অপবাদই বর্ণনা করেছে। পক্ষান্তরে হযরত ইউসুফ আ.-এর বেলায় বর্ণনা করেছে পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদার কথা। সুতরাং হযরত ইউসুফ আ.-এর مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি,
তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না' কথাটি বলার পর এই অর্থই এখানে স্থানোপযোগী হতে পারে যে, ইউসুফ আ.-এর মুখে 'বুরহানে রব' (আল্লাহ তাআলার প্রমাণ) শোনার পরও যখন আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের জেদ থেকে বিরত হলেন না এবং কামনা পূর্ণ করার ব্যাপারেই গোঁ ধরে থাকলেন, তখন হযরত ইউসুফ আ. তাঁর কামনাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বুরহানে রবের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কামনার আদৌ পরোয়া করলেন না। ফল হলো এই, ইউসুফ আ. তাঁর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং আযিযে মিসরের স্ত্রীও তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলেন।
এই তাফসিরই সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে প্রকৃত অবস্থাকে প্রকাশ করছে। পবিত্র কুরআনে এর দৃষ্টান্ত হলো হযরত মুসা আ.-এর মায়ের আলোচনা সম্পর্কে নিম্নলিখিত আয়াতটি-
وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (سورة القصص)
'মুসা-জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। যাতে সে আস্থাশীল হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিতো। (কাজেই তিনি মুসা আ.-এর রহস্য প্রকাশ করতে পারেন নি।)' (সুরা কাসাস: আয়াত ১০)
এমনিভাবে হযরত ইউসুফ আ.-এর ক্ষেত্রেও অর্থ এই হয় যে, যদি ইউসুফ আ. আল্লাহ তাআলার প্রমাণ লাভ না করতেন, তবে তিনি অসদিচ্ছা করে ফেলতেন; কিন্তু তিনি অসদিচ্ছা করেন নি। কারণ তিনি সেই বুরহানে রব দেখেছিলেন।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, সেই বুরহানে রব বা আল্লাহর প্রমাণ কী ছিলো যা পবিত্র কুরআন এ-ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে? তার জবাব এই যে, পবিত্র কুরআন তার সময়োচিত ও স্থানোচিত মার্জিত ও অলৌকিক ভাষায় নিজেই এমনভাবে বিষয়টি বর্ণনা করে দিয়েছে যে, এখানে প্রশ্নের কোনো অবকাশই থাকে না। দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর হযরত ইউসুফ আ. আযিযের স্ত্রীকে যে-জবাব দিয়েছিলেন, এমন জটিল পরিস্থিতিতে এর চেয়ে উত্তম
জবাব আর কী হতে পারে? সুতরাং এটাই সেই বুরহানে রব যা হযরত ইউসুফ আ.-কে দান করা হয়েছিলো এবং যা ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতাকে নিষ্কলুষ রেখে দিয়েছে। এ-কারণেই পবিত্র কুরআন তার পরে বেশ জোরোশোরে বর্ণনা করেছে-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
'এমনিভাবে আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার জন্য নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৪]
অর্থাৎ হযরত ইউসুফ আ. এ-জাতীয় অসদিচ্ছা থেকে এ-কারণে পবিত্র থাকলেন যে, প্রথম থেকেই আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্রতার ফয়সালা করে রেখেছিলেন। সুতরাং তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা আল্লাহ তাআলার দায়িত্বে থাকার পর এটা কেমন করে সম্ভব হতে পারে যে, সেই পবিত্রতার বিপরীতে অপবিত্রতার গন্ধও তাঁর মধ্যে পাওয়া যায়? এটা ছিলো সম্পূর্ণ অসম্ভব। মূলকথা এই যে, হযরত ইয়াকুব আ.-এর ছবি দৃষ্ট হওয়া এবং তাঁর ইঙ্গিতে নিষেধ করা; ফেরেশতা প্রকাশিত হয়ে ইউসুফ আ.কে ওই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা; অথবা আযিযে মিসরের ঘরে রক্ষিত মূর্তির ওপর তাঁর স্ত্রীর পর্দা ফেলে দেয়া এবং তা থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর উপদেশ লাভ করা- এই কয়েকটি এবং এ-জাতীয় যাবতীয় ব্যাখ্যার বিপরীতে 'বুরহানে রব'-এর উত্তম তাফসির হলো যা স্বয়ং পবিত্র কুরআনের বাক্য ও বর্ণনাক্রম থেকে প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ ১. ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমানের সত্যিকারের কল্পনা বা মনঃছবি; ২. অপ্রকৃত বা রূপকার্থক মুরব্বির অনুগ্রহকে অনুগ্রহ বলে বুঝতে পারা এবং বিশ্বস্ততাগুণ। আযিযে মিসর হযরত ইউসুফ আ. সম্পর্কে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, একে সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে রেখো। হযরত ইউসুফ আ. এ-কথার প্রতি লক্ষ করেই আযিযের স্ত্রীকে বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে যিনি (আযিযে মিসর) আমাকে মর্যাদার সঙ্গে থাকার স্থান করে দিয়েছেন এবং সম্মান দিয়েছেন, এটা কেমন করে সম্ভব হবে যে, আমি তাঁর আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে লোকচক্ষুতে হেয় ও অপদস্থ করি?
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ. যখন দরজার দিকে দৌড়ালেন, আযিযে মিসরের স্ত্রীও তাঁর পেছনে পেছনে দৌড়ালেন। কোনোভাবে দরজা খুলে গেলো। দরজার সামনেই দেখতে পেলেন আযিযে মিসর ও তাঁর স্ত্রীর চাচাতো
ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। এই রমণীর ইশক তখনো ছিলো অপরিপক্ব। তাই তিনি সঠিক অবস্থা বর্ণনা করতে সক্ষম হলেন না; বরং তিনি প্রকৃত সত্য গোপন করার উদ্দেশে ক্রোধান্বিত হয়ে বলতে লাগলেন, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে যে-ব্যক্তি এমন কুকর্মের ইচ্ছা পোষণ করে তার সাজা কারাগার বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রবঞ্চনা ও প্রতারণামূলক উক্তি শুনে বললেন, এটা তো তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন। প্রকৃত অবস্থা এই যে, তিনি নিজেই আমার সঙ্গে অসদিচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু আমি কোনোভাবে তাঁয় ইচ্ছায় সাড়া দিই নি এবং পালিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। তিনি আমার পেছনে পেছনে দৌড়ে এসেছেন এবং আপনাকে সামনে দেখে মিথ্যা বলতে শুরু করলেন।
আযিযে মিসরের স্ত্রীর চাচতো ভাই অত্যন্ত মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন এবং চতুরও ছিলেন। তিনি বললেন, ইউসুফের জামা দেখতে হবে। তা যদি সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীলোকটি সত্যবাদী আর যদি তা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে তাহলে ইউসুফের কথাই সত্য এবং স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদী। দেখা গেলো ইউসুফ আ.-এর জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া। আযিযে মিসর প্রকৃত অবস্থা বুঝে ফেললেন। কিন্তু নিজের সম্মান ও মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে বিষয়টির যবনিকা টেনে দিয়ে বললেন, ইউসুফ, তুমি সত্যবাদী এবং এই নারীর ব্যাপারটি ক্ষমা করো। এই বিষয়টিকে এখানেই শেষ করে দাও। এরপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, এসব তোমারই প্রবঞ্চনা ও ধোঁকা। তোমাদের স্ত্রী জাতির ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা অত্যন্ত জটিল। নিঃসন্দেহে তুমিই অপরাধী। সুতরাং তুমি তোমার এই কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং মাফ চাও।
পবিত্র কুরআন ঘটনাটি ব্যক্ত করছে এভাবে-
وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ () قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبْلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ () وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ () فَلَمَّا رَأَى قَمِيصَهُ قُدَّ
مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ إِنَّ كَيْدِكُنَّ عَظِيمٌ () يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ (سورة يوسف)
'তারা উভয়ে (হযরত ইউসুফ আ. এবং আযিযে মিসরের স্ত্রী) দৌড়ে দরজার দিকে গেলো এবং স্ত্রীলোকটি পেছন থেকে তার জামা ছিঁড়ে ফেললো, তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার কাছে পেলো। স্ত্রীলোকটি বললো, 'যে তোমার পরিবারের সঙ্গে কুকর্ম কামনা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্যকোনো মর্মন্তুদ শান্তি ব্যতীত আর কী দণ্ড হতে পারে?' ইউসুফ বললো, 'সেই আমার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছিলো।' স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলো, 'যদি তার জামার সামনের দিক থেকে ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী; কিন্তু তার জামا যদি পেছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী।' গৃহস্বামী যখন দেখলো যে, তার (ইউসুফের) জামা পেছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়েছে তখন সে বললো, 'নিশ্চয় এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ। হে ইউসুফ, তুমি তা উপেক্ষা করো (ব্যাপারটি ক্ষমা করো) এবং হে নারী, তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো; তুমিই তো অপরাধী।' [সুরা ইউসুফ : আয়াত ২৫-২৯।
আযিযে মিসর অপমানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি এখানে খতম করে দিলেও আসল বিষয় কিন্তু গোপন থাকলো না। এক এক করে শহরের অভিজাত পরিবারগুলোর সব স্ত্রীলোকই এটার চর্চা করতে লাগলো যে, আযিযে মিসরের স্ত্রী কত নির্লজ্জ! নিজের দাসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এত উচ্চ মর্যাদাবতী নারীর দাসের সঙ্গে মেলামেশা! ধীরে ধীরে এই গোপনীয় নিন্দচর্চার খবর আযিযে মিসরের স্ত্রীর কাছেও পৌছে গেলো।
অভিজাত নারীদের সমালোচনা তাঁর জন্য অত্যন্ত মনঃপীড়াদায়ক হলো। তিনি সংকল্প করলেন, অবশ্যই এর প্রতিশোধ নিতে হবে এবং এমনভাবে প্রতিশোধ নিতে হবে, যাতে তারা আমাকে যে-ব্যাপারে ভর্ৎসনা করছে, তাদেরকেও সে- ব্যাপারে লিপ্ত করে দেয়া যায়। এসব চিন্তা করে তিনি একদিন শহরের অভিজাত পরিবারের এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের স্ত্রীগণকে নিমন্ত্রণ করলেন। তাঁরা সবাই এসে দস্তরখানে বসলেন এবং খাদ্য গ্রহণের জন্য ছুরি হাতে
নিলেন। যেনো গোশত, লেবু ইত্যাদি বস্তু কাটতে পারেন। তখন আযিযে মিসরের স্ত্রী ইউসুফকে ঘর থেকে বাইরে আসার জন্য নির্দেশ করলেন। হযরত ইউসুফ আ. প্রভুপত্নীর আদেশে বাইরে বের হয়ে এলেন। উপস্থিত রমণীরা ইউসুফ আ.-এর রূপ-লাবণ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং তাঁর দীপ্তিমান চেহারার দীপ্তি ও জ্যোতিতে এতটাই প্রভাবিত হলেন যে, ছুরি দিয়ে আহার্য বস্তু কাটার পরিবর্তে নিজেদের হাতই কেটে ফেললেন। অজ্ঞাতসারে হঠাৎ তাঁরা বলে উঠলেন, কে বলে ইনি মানুষ? ইনি তো নুরের পুতুল এবং সম্মানিত ফেরেশতা। তাঁদের এই অবস্থা দেখে আযিযে মিসরের স্ত্রী খুবই আনন্দিত বোধ করলেন। তিনি নিজের সফলতা ও অন্য নারীদের পরাজয় দেখে বলতে লাগলেন, ইনিই তো সেই ক্রীতদাস যাঁর প্রতি ইশক ও মুহাব্বতের ব্যাপারে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনার উপযুক্ত মনে করেছো। বিদ্রূপবাণের লক্ষ্যস্থল করে রেখেছো। এখন তাকে দেখে তোমাদের অবস্থা এমন কেনো? তোমরা বলো, আমার এই ইশক সঙ্গত না-কি অসঙ্গত? আর তোমাদের তিরস্কার ঠিক ছিলো না-কি বেঠিক?
এই ঘটনা কুরআনের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتَاهَا عَنْ نَفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ ( ) فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَكَةٌ وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ سِكِينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ () قَالَتْ فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ ( سورة يوسف)
'আর (সেই বিষয়টির চর্চা শহরে খুব প্রসারিত হয়ে পড়লো এবং) শহরে কয়েকজন নারী বললো, 'আযিযের (গৃহস্বামীর নাম বা পদবি) স্ত্রী তার যুবক দাস থেকে অসৎকর্ম কামনা করছে, (তাকে সে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে) প্রেম তাকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে দেখছি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।' স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনলো তখন সে তাদের ডেকে পাঠালো, তাদের জন্য (বিস্তৃত) আসন প্রস্তুত করলো, (যথারীতি)
তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিলো এবং ইউসুফকে বললো, 'এদের সামনে বের হও।' তারপর তারা যখন তাকে দেখলো, তার গরিমায় অভিভূত হলো (তারা তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করলো) এবং নিজেদের হাত কেটে ফেললো। (হঠাৎ) তারা (চিৎকার করে) বললো, 'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা।' সে (আযিযের স্ত্রী) বললো, 'এ-ই সে যার সম্পর্কে তোমরা আমার নিন্দা করেছো। (ইনিই সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করেছো।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩০-৩২)
আযিযে মিসরের স্ত্রী এটাও বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে আমি তার হৃদয়কে বশে আনতে চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু সে সংযমহীন হয় নি। তারপরও আমি এটা বলে দিচ্ছি, সে যদি শেষ পর্যন্ত আমার কথা মান্য না করে, অর্থাৎ আমার বাসনা পূর্ণ না করে, তাহলে তার অবস্থা অবশ্যই এমন হবে যে, তাকে কারাগারে আবদ্ধ থাকতে হবে এবং সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَلَئِنْ لَمْ يَفْعَلْ مَا أَمْرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِنَ الصَّاغِرِينَ (سورة يوسف)
'আমি তো তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছি। (তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছি।) কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে; আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে কারারুদ্ধ হবেই এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩২)
হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর এসব কথা শুনলেন। তা ছাড়া তিনি নিজের ব্যাপারে অন্য রমণীদেরও হাবভাব দেখতে পেলেন। তখন প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আল্লাহ, এই নারীরা আমাকে যে-বিষয়ের প্রতি আহ্বান করছে, তার তুলনায় আমি কারাগারে বসবাস করাকে হাজারগুণ শ্রেয় মনে করি। যদি আপনি আমাকে সাহায্য না করেন এবং তাদের ষড়যন্ত্র থেকে আমাকে রক্ষা না করেন, তবে এটা বিচিত্র নয় যে, আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে
যাবো।' আল্লাহ তাআলার দরবারে হযরত ইউসুফ আ.-এর এই দোয়া কবুল হলো এবং আল্লাহ সেই রমণীদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও ছলনাকে নস্যাৎ করে দিলেন। সফলতার মুকুট হযরত ইউসুফ আ.-এর মাথার ওপরই থাকলো। পবিত্র কুরআনে বিষয়টির বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে-
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجَاهِلِينَ () فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُnَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'হে আমার প্রতিপালক, এই নারীরা আমাকে যার প্রতি আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা থেকে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' তখন তার প্রতিপালক তার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' [সুরা ইউসুফ : আয়াত ৩৩-৩৪।
এই ঘটনায় একটি বাক্য উল্লেখ আছে যে, وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ 'নিমন্ত্রিত রমণীরা নিজেদের হাত কেটে ফেললো।' সাধারণভাবে মুফাস্সিরগণ সবাই এই বাক্যের তাফসির তাফসির করেন এমন যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর রূপ-ঔজ্জ্বল্য দর্শনে আত্মহারা হয়ে রমণীদের অবস্থা বাস্তবিকই এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, তাঁদের নিজেদের সত্তা সম্পর্কে কোনো খেয়ালই ছিলো না। ফলে তাঁরা কাটবার বস্তুর পরিবর্তে আপন আপন হাতই কেটে ফেললেন। কিন্তু কোনো কোনো আধুনিক মুফাস্সির বলেন, উপরিউক্ত তাফসির যথার্থ নয়। তাঁর মতে, মিসরীয় রমণীদের এটাও একটা ছলনা ও কুটিলতা ছিলো। তাঁরা ইউসুফ আ.-কে নিজেদের দিকে আকর্ষিত করার জন্য বলতে চাচ্ছিলেন, আমরা তোমার রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি এতটাই মোহিত যে, তোমার চেহারা দর্শন করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জ্ঞান ও অনুভূতি লোপ পেয়ে গিয়েছে। ফলে আমরা আমাদের হাত যখম করে ফেলেছি। এই তাফসিরের সমর্থনে তিনি প্রমাণস্বরূপ এই আয়াত পেশ করেছেন: وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ
যদি তাদের ছলনা থেকে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' অর্থাৎ হযরত ইউসুফ আ. তাঁদের হাত কেটে ফেলার অবস্থাকে কাইদ (ষড়যন্ত্র) বলে ব্যক্ত করেছেন। যদি এটা অনিচ্ছাকৃত অবস্থা হতো তবে তাঁরা নির্দোষ সাব্যস্ত হতেন। এমতাবস্থায় রমণীদের কর্মপদ্ধতিকে ষড়যন্ত্র নামে আখ্যায়িত করার অর্থ কী? ত ছাড়া যখন মিসরের বাদশাহ হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগার থেকে বের করে আনার নির্দেশ প্রদান করলেন, তখনো হযরত ইউসুফ আ. বলেছিলেন-
اِرْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ (سورة يوسف)
'তুমি তোমার প্রভুর (বাদশহর) কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো যে-নারীরা হাত কেটে ফেলেছিলো তাদের অবস্থা কী? নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্যক অবগত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫০।
আযিযে মিসরের কাছে হযরত ইউসুফ আ.-এর সততা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিলো। তাঁর কোনো ধরনের ইচ্ছা ছিলো না যে ইউসুফ আ.-এর কোনো ক্ষতি হোক। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর কাঁধে ইশক ও প্রেমের ভূত বেশ সাংঘাতিকভাবেই চেপে বসেছিলো। যখন তিনি দেখলেন, খোশামোদ, ছল-চাতুরি, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রে, কোনো প্রকারেই তাঁর উদ্দেশ্য হাসিল হচ্ছে না, তখন তিনি হুমকি-ধমকি দিয়ে কার্যোদ্ধার করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তা সত্ত্বেও যখন দৃঢ়তার পর্বতে কোনো কম্পন সৃষ্টি হলো না। আযিযে মিসর ইউসুফ আ.-এর সততার যাবতীয় নিদর্শন দেখা ও বুঝা সত্ত্বেও নিজের স্ত্রীর অপমান ও দুর্নাম হচ্ছে দেখে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, ইউসুফকে এক নির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটক করে রাখা হোক। যেনো এই বিষয়টির কথা মানুষের মন থেকে মুছে যায় এবং এই নিন্দাচর্চা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে হযরত ইউসুফ আ.-কে জেলখানায় যেতে হলো।
এ-ক্ষেত্রে হযরত শাহ আবদুল কাদির মুহাদ্দিস দেহলবি রহ. লিখেছেন, ইউসুফ আ. তাঁর দোয়ার সঙ্গে এটাও বলেছিলেন, 'তাদের এই নির্লজ্জতার আহ্বানের মোকাবিলায় কারাগারই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।' তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে তো স্ত্রীলোকদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেন; কিন্তু তাঁর অদৃষ্টে কারগার নির্ধারণ করে দিলেন। তাঁর উচিত ছিলো এই বাক্যটি না
বলা। বরং তাঁর উচিত ছিলো পরীক্ষা ও দুঃখ-দুর্দশাকে আহ্বান না করা। হযরত শাহ দেহলবি সাহেব (নাউওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু)-এর এই সূক্ষ্ম কথাটিকে শক্তিশালী করার জন্য অপর একজন তত্ত্বজ্ঞানী মুফাস্সির একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাঁর মর্মার্থ এই : এক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে দোয়া করতো-
اللهم إني أسئلك الصبر 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ধৈর্য প্রার্থনা করছি।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটির এই দোয়া শুনে বললেন, 'কেনো তুমি বিপদ-আপদ প্রার্থনা করছো? এটা না করে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপত্তায় রাখার প্রার্থনা কেনো করছো না?'
এই দুইজন বুযুর্গের উচ্চ মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে যদিও তাঁদের কথার ওপর সমালোচনা করতে আমার সাহস হচ্ছে না, তারপরও হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো একজন উচ্চস্তরের নবীর জীবনের এই মহৎকাজকে একটি তত্ত্বকথার সামনে কুরবান হয়ে যেতে দেখে আর থাকা গেলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي নারীরা আমাকে যার প্রতি আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়' বাক্যটিতে তাঁর মর্যাদার উচ্চতা, আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য, দীন ও আমলে দৃঢ়তা, সত্যের ওপর দৃঢ় সংকল্প এবং আল্লাহর বিধানে সন্তুষ্ট থাকা ও আত্মসমর্পণের গুণাবলির এমন অনুপম প্রকাশ রয়েছে, যা তাঁর মতো উচ্চশ্রেণির নবীরই কাজ।
গভীরভাবে চিন্তা করুন, আযিযে মিসরের স্ত্রী-গৃহকর্ত্রী খোশামোদ ও ছল-চাতুরির এমন কোনো পন্থা নেই যা তিনি হযরত ইউসুফ আ-কে বশীভূত করার জন্য ব্যবহার করেন নি। তাতে বিফল হওয়ার পর অবশেষে অন্য রমণীদেরও সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সর্বপ্রকারের কৌশল ইউসুফ আ.-এর ওপর প্রয়োগ করেছেন; কিন্তু তাঁরা বিফলই রয়ে গেছেন। সবশেষে আযিযের স্ত্রী এই হুমকি দিলেন যে, ইউসুফ আ. হয়তো তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ করবেন, অন্যথায় তাঁকে কারাগারে আবদ্ধ থাকতে হবে। এ-অবস্থায় একজন আল্লাহভক্ত বান্দা, সৎকর্মে দৃঢ়সংকল্প ও আস্থায় অবিচল ব্যক্তি এবং আল্লাহর ভীতিকে সমগ্র সৃষ্টির ক্রোধ ও কোপের
ওপর প্রধান্য প্রদানকারী মানুষ এর চেয়ে উত্তম জবাব আর কী দিতে পারতেন যে, হে আল্লাহ, আমি এই গর্হিত ও নির্লজ্জ কাজের মোকাবিলায় কারগারকেই প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার প্রদান করছি। কারাগার ও বন্দিদশা আমি মঞ্জুর করতে রাজি আছি; কিন্তু আপনার নাফরমানি ও অবাধ্যতা আমি কিছুতেই মঞ্জুর করবো না। কেউ কি এ-কথা বলতে পারেন যে, এটা কারাগারের জন্য প্রার্থনা, বন্দি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ, দুঃখ ও দুর্দশাকে আহ্বান? কখনো নয়। বরং এখানে তো সূক্ষ্ম উপায়ে এমন কথা বলা হচ্ছে যা সত্যের ঘোষণা এবং আল্লাহর দরবারে পৌঁছার সঠিক স্তর।
হযরত ইউসুফ আ. এটাও পছন্দ করেন নি যে, আযিযে মিসরের পত্নীকে সম্বোধন করেন অথবা নিমন্ত্রিত রমণীদের তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ প্রদান করেন; বরং তিনি তাঁর আল্লাহকে ডাকলেন। কিন্তু তিনি সেসব বিভ্রান্ত ও অসৎ স্বভাবের রমণীদের কাছে এ-বিষয়টি প্রকাশ করে দেয়া জরুরি মনে করলেন, যেভাবে তোমাদের ছল-চাতুরি, প্রবঞ্চনা ও খোশামোদ বিফল হয়েছে, তেমনি তোমাদের হুমকি-ধমকি ও শাস্তিও আমার সত্যের সংকল্প ও আল্লাহর সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষাকে বাতিল করতে পারবে না। আযিযে মিসরের স্ত্রী বলেছেন, 'ইউসুফ হয়তো আমার মনস্কাম পূর্ণ করবে, অন্যথায় তাকে কারাগারে বন্দিদশা বরণ করতে হবে।' সুতরাং আমি তাঁর অসদিচ্ছার মোকাবিলায় কারগারকেই লক্ষবার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবো।
مِمَّا يَدْعُونَنِي السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ
এখন বলুন, এই সত্যের ঘোষণা ও দৃঢ়তা প্রকাশের সঙ্গে সেই দোয়ার কী সম্পর্ক যাতে এক ব্যক্তি অনর্থক নিজের জন্য 'ধৈর্য' প্রার্থনা করে নিজের দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হওয়ার আহ্বান করছিলো? এই ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষাও ছিলো না, বিপদ-আপদও ছিলো না; বরং অযথা বালা-মুসিবত ডেকে আনছিলো। আর ইউসুফ আ.-এর ক্ষেত্রে পরীক্ষা মস্তকের ওপর, বিপদ বিদ্যমান, শাস্তিরও হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে, আপদ নাযিল করার ভীতিপ্রদর্শন করা হচ্ছে, এমন নিদারুণ অবস্থায় কি শুধু এই জবাব দেয়াই যথেষ্ট হতো যে, হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন? আর কিছুই বলার প্রয়োজন ছিলো না? যদি এমনই হতো, তবে পরীক্ষা, সঙ্কট,
বালা-মুসিবতের সময় দৃঢ়তা ও সত্যের ঘোষণা, সাহসিকতা ও নির্ভীকতা এবং দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ-মত্ততার সামনে আল্লাহর কালিমাকে উচ্চ করে ধরার সবক কে শেখাতেন? দৃঢ় সংকল্পের জীবন-যাপনের পদ্ধতি কে বলে দিতেন? বাতিলের সামনে দুঃসাহসিকতার শিক্ষা কার কাছ থেকে পাওয়া যেতো এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যের অবস্থা কে সৃষ্টি করতো?
টিকাঃ
১. * এখানে 'তিনি' অর্থে আল্লাহ, ভিন্নমতে আযিযে মিসর অর্থাৎ স্ত্রীলোকটির স্বামী।
২. * -এর আভিধানিক অর্থ দলিল। এখানে 'নিদর্শন' অথবা প্রতিপালক কর্তৃক প্রদত্ত বিবেকের
৩. b তাদেরকে ফলমূল পরিবেশন করা হয়েছিলো এবং সেগুলোকে কেটে খেতে ছুরি দেয়া হয়েছিলো।
৪. * মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তরজুমানুল কুরআন, সুরা ইউসুফ।
মুফাস্সিরগণ এই আয়াতটির বিভিন্ন প্রকার তাফসির করেছেন। কিন্তু উপরে আমি যে-অর্থ করলাম তা-ই এই স্থানের সর্বাপেক্ষা অধিক উপযোগী। পবিত্র কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এই ঘটনায় আযিযে মিসরের স্ত্রীর অপবাদই বর্ণনা করেছে। পক্ষান্তরে হযরত ইউসুফ আ.-এর বেলায় বর্ণনা করেছে পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদার কথা। সুতরাং হযরত ইউসুফ আ.-এর مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি,
তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না' কথাটি বলার পর এই অর্থই এখানে স্থানোপযোগী হতে পারে যে, ইউসুফ আ.-এর মুখে 'বুরহানে রব' (আল্লাহ তাআলার প্রমাণ) শোনার পরও যখন আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের জেদ থেকে বিরত হলেন না এবং কামনা পূর্ণ করার ব্যাপারেই গোঁ ধরে থাকলেন, তখন হযরত ইউসুফ আ. তাঁর কামনাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বুরহানে রবের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর কামনার আদৌ পরোয়া করলেন না। ফল হলো এই, ইউসুফ আ. তাঁর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং আযিযে মিসরের স্ত্রীও তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করলেন।
এই তাফসিরই সন্দেহের ঊর্ধ্বে থেকে প্রকৃত অবস্থাকে প্রকাশ করছে। পবিত্র কুরআনে এর দৃষ্টান্ত হলো হযরত মুসা আ.-এর মায়ের আলোচনা সম্পর্কে নিম্নলিখিত আয়াতটি-
وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَى فَارِغًا إِنْ كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَنْ رَبَطْنَا عَلَى قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (سورة القصص)
'মুসা-জননীর হৃদয় অস্থির হয়ে পড়েছিলো। যাতে সে আস্থাশীল হয় তার জন্য আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিলে সে তার পরিচয় তো প্রকাশ করেই দিতো। (কাজেই তিনি মুসা আ.-এর রহস্য প্রকাশ করতে পারেন নি।)' (সুরা কাসাস: আয়াত ১০)
এমনিভাবে হযরত ইউসুফ আ.-এর ক্ষেত্রেও অর্থ এই হয় যে, যদি ইউসুফ আ. আল্লাহ তাআলার প্রমাণ লাভ না করতেন, তবে তিনি অসদিচ্ছা করে ফেলতেন; কিন্তু তিনি অসদিচ্ছা করেন নি। কারণ তিনি সেই বুরহানে রব দেখেছিলেন।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, সেই বুরহানে রব বা আল্লাহর প্রমাণ কী ছিলো যা পবিত্র কুরআন এ-ক্ষেত্রে উল্লেখ করেছে? তার জবাব এই যে, পবিত্র কুরআন তার সময়োচিত ও স্থানোচিত মার্জিত ও অলৌকিক ভাষায় নিজেই এমনভাবে বিষয়টি বর্ণনা করে দিয়েছে যে, এখানে প্রশ্নের কোনো অবকাশই থাকে না। দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়ার পর হযরত ইউসুফ আ. আযিযের স্ত্রীকে যে-জবাব দিয়েছিলেন, এমন জটিল পরিস্থিতিতে এর চেয়ে উত্তম
জবাব আর কী হতে পারে? সুতরাং এটাই সেই বুরহানে রব যা হযরত ইউসুফ আ.-কে দান করা হয়েছিলো এবং যা ইউসুফ আ.-এর পবিত্রতাকে নিষ্কলুষ রেখে দিয়েছে। এ-কারণেই পবিত্র কুরআন তার পরে বেশ জোরোশোরে বর্ণনা করেছে-
كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ
'এমনিভাবে আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখার জন্য নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৪]
অর্থাৎ হযরত ইউসুফ আ. এ-জাতীয় অসদিচ্ছা থেকে এ-কারণে পবিত্র থাকলেন যে, প্রথম থেকেই আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্রতার ফয়সালা করে রেখেছিলেন। সুতরাং তাঁর পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতা আল্লাহ তাআলার দায়িত্বে থাকার পর এটা কেমন করে সম্ভব হতে পারে যে, সেই পবিত্রতার বিপরীতে অপবিত্রতার গন্ধও তাঁর মধ্যে পাওয়া যায়? এটা ছিলো সম্পূর্ণ অসম্ভব। মূলকথা এই যে, হযরত ইয়াকুব আ.-এর ছবি দৃষ্ট হওয়া এবং তাঁর ইঙ্গিতে নিষেধ করা; ফেরেশতা প্রকাশিত হয়ে ইউসুফ আ.কে ওই কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা; অথবা আযিযে মিসরের ঘরে রক্ষিত মূর্তির ওপর তাঁর স্ত্রীর পর্দা ফেলে দেয়া এবং তা থেকে হযরত ইউসুফ আ.-এর উপদেশ লাভ করা- এই কয়েকটি এবং এ-জাতীয় যাবতীয় ব্যাখ্যার বিপরীতে 'বুরহানে রব'-এর উত্তম তাফসির হলো যা স্বয়ং পবিত্র কুরআনের বাক্য ও বর্ণনাক্রম থেকে প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ ১. ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর প্রতি ঈমানের সত্যিকারের কল্পনা বা মনঃছবি; ২. অপ্রকৃত বা রূপকার্থক মুরব্বির অনুগ্রহকে অনুগ্রহ বলে বুঝতে পারা এবং বিশ্বস্ততাগুণ। আযিযে মিসর হযরত ইউসুফ আ. সম্পর্কে তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন, একে সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে রেখো। হযরত ইউসুফ আ. এ-কথার প্রতি লক্ষ করেই আযিযের স্ত্রীকে বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে যিনি (আযিযে মিসর) আমাকে মর্যাদার সঙ্গে থাকার স্থান করে দিয়েছেন এবং সম্মান দিয়েছেন, এটা কেমন করে সম্ভব হবে যে, আমি তাঁর আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে লোকচক্ষুতে হেয় ও অপদস্থ করি?
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ. যখন দরজার দিকে দৌড়ালেন, আযিযে মিসরের স্ত্রীও তাঁর পেছনে পেছনে দৌড়ালেন। কোনোভাবে দরজা খুলে গেলো। দরজার সামনেই দেখতে পেলেন আযিযে মিসর ও তাঁর স্ত্রীর চাচাতো
ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। এই রমণীর ইশক তখনো ছিলো অপরিপক্ব। তাই তিনি সঠিক অবস্থা বর্ণনা করতে সক্ষম হলেন না; বরং তিনি প্রকৃত সত্য গোপন করার উদ্দেশে ক্রোধান্বিত হয়ে বলতে লাগলেন, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে যে-ব্যক্তি এমন কুকর্মের ইচ্ছা পোষণ করে তার সাজা কারাগার বা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে? হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রবঞ্চনা ও প্রতারণামূলক উক্তি শুনে বললেন, এটা তো তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন। প্রকৃত অবস্থা এই যে, তিনি নিজেই আমার সঙ্গে অসদিচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু আমি কোনোভাবে তাঁয় ইচ্ছায় সাড়া দিই নি এবং পালিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। তিনি আমার পেছনে পেছনে দৌড়ে এসেছেন এবং আপনাকে সামনে দেখে মিথ্যা বলতে শুরু করলেন।
আযিযে মিসরের স্ত্রীর চাচতো ভাই অত্যন্ত মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন এবং চতুরও ছিলেন। তিনি বললেন, ইউসুফের জামা দেখতে হবে। তা যদি সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীলোকটি সত্যবাদী আর যদি তা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে তাহলে ইউসুফের কথাই সত্য এবং স্ত্রীলোকটি মিথ্যাবাদী। দেখা গেলো ইউসুফ আ.-এর জামা পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া। আযিযে মিসর প্রকৃত অবস্থা বুঝে ফেললেন। কিন্তু নিজের সম্মান ও মর্যাদার দিকে লক্ষ রেখে বিষয়টির যবনিকা টেনে দিয়ে বললেন, ইউসুফ, তুমি সত্যবাদী এবং এই নারীর ব্যাপারটি ক্ষমা করো। এই বিষয়টিকে এখানেই শেষ করে দাও। এরপর তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, এসব তোমারই প্রবঞ্চনা ও ধোঁকা। তোমাদের স্ত্রী জাতির ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা অত্যন্ত জটিল। নিঃসন্দেহে তুমিই অপরাধী। সুতরাং তুমি তোমার এই কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং মাফ চাও।
পবিত্র কুরআন ঘটনাটি ব্যক্ত করছে এভাবে-
وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِنْ دُبُرٍ وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَنْ يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ () قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَنْ نَفْسِي وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِنْ أَهْلِهَا إِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ قُبْلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ () وَإِنْ كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِنْ دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ () فَلَمَّا رَأَى قَمِيصَهُ قُدَّ
مِنْ دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِنْ كَيْدِكُنَّ إِنَّ كَيْدِكُنَّ عَظِيمٌ () يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَذَا وَاسْتَغْفِرِي لِذَنْبِكِ إِنَّكِ كُنْتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ (سورة يوسف)
'তারা উভয়ে (হযরত ইউসুফ আ. এবং আযিযে মিসরের স্ত্রী) দৌড়ে দরজার দিকে গেলো এবং স্ত্রীলোকটি পেছন থেকে তার জামা ছিঁড়ে ফেললো, তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার কাছে পেলো। স্ত্রীলোকটি বললো, 'যে তোমার পরিবারের সঙ্গে কুকর্ম কামনা করে তার জন্য কারাগারে প্রেরণ অথবা অন্যকোনো মর্মন্তুদ শান্তি ব্যতীত আর কী দণ্ড হতে পারে?' ইউসুফ বললো, 'সেই আমার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছিলো।' স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিলো, 'যদি তার জামার সামনের দিক থেকে ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী; কিন্তু তার জামا যদি পেছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী।' গৃহস্বামী যখন দেখলো যে, তার (ইউসুফের) জামা পেছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়েছে তখন সে বললো, 'নিশ্চয় এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ। হে ইউসুফ, তুমি তা উপেক্ষা করো (ব্যাপারটি ক্ষমা করো) এবং হে নারী, তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো; তুমিই তো অপরাধী।' [সুরা ইউসুফ : আয়াত ২৫-২৯।
আযিযে মিসর অপমানের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি এখানে খতম করে দিলেও আসল বিষয় কিন্তু গোপন থাকলো না। এক এক করে শহরের অভিজাত পরিবারগুলোর সব স্ত্রীলোকই এটার চর্চা করতে লাগলো যে, আযিযে মিসরের স্ত্রী কত নির্লজ্জ! নিজের দাসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। এত উচ্চ মর্যাদাবতী নারীর দাসের সঙ্গে মেলামেশা! ধীরে ধীরে এই গোপনীয় নিন্দচর্চার খবর আযিযে মিসরের স্ত্রীর কাছেও পৌছে গেলো।
অভিজাত নারীদের সমালোচনা তাঁর জন্য অত্যন্ত মনঃপীড়াদায়ক হলো। তিনি সংকল্প করলেন, অবশ্যই এর প্রতিশোধ নিতে হবে এবং এমনভাবে প্রতিশোধ নিতে হবে, যাতে তারা আমাকে যে-ব্যাপারে ভর্ৎসনা করছে, তাদেরকেও সে- ব্যাপারে লিপ্ত করে দেয়া যায়। এসব চিন্তা করে তিনি একদিন শহরের অভিজাত পরিবারের এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের স্ত্রীগণকে নিমন্ত্রণ করলেন। তাঁরা সবাই এসে দস্তরখানে বসলেন এবং খাদ্য গ্রহণের জন্য ছুরি হাতে
নিলেন। যেনো গোশত, লেবু ইত্যাদি বস্তু কাটতে পারেন। তখন আযিযে মিসরের স্ত্রী ইউসুফকে ঘর থেকে বাইরে আসার জন্য নির্দেশ করলেন। হযরত ইউসুফ আ. প্রভুপত্নীর আদেশে বাইরে বের হয়ে এলেন। উপস্থিত রমণীরা ইউসুফ আ.-এর রূপ-লাবণ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং তাঁর দীপ্তিমান চেহারার দীপ্তি ও জ্যোতিতে এতটাই প্রভাবিত হলেন যে, ছুরি দিয়ে আহার্য বস্তু কাটার পরিবর্তে নিজেদের হাতই কেটে ফেললেন। অজ্ঞাতসারে হঠাৎ তাঁরা বলে উঠলেন, কে বলে ইনি মানুষ? ইনি তো নুরের পুতুল এবং সম্মানিত ফেরেশতা। তাঁদের এই অবস্থা দেখে আযিযে মিসরের স্ত্রী খুবই আনন্দিত বোধ করলেন। তিনি নিজের সফলতা ও অন্য নারীদের পরাজয় দেখে বলতে লাগলেন, ইনিই তো সেই ক্রীতদাস যাঁর প্রতি ইশক ও মুহাব্বতের ব্যাপারে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনার উপযুক্ত মনে করেছো। বিদ্রূপবাণের লক্ষ্যস্থল করে রেখেছো। এখন তাকে দেখে তোমাদের অবস্থা এমন কেনো? তোমরা বলো, আমার এই ইশক সঙ্গত না-কি অসঙ্গত? আর তোমাদের তিরস্কার ঠিক ছিলো না-কি বেঠিক?
এই ঘটনা কুরআনের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتَاهَا عَنْ نَفْسِهِ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ ( ) فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَكَةٌ وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهُنَّ سِكِينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ () قَالَتْ فَذَلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ ( سورة يوسف)
'আর (সেই বিষয়টির চর্চা শহরে খুব প্রসারিত হয়ে পড়লো এবং) শহরে কয়েকজন নারী বললো, 'আযিযের (গৃহস্বামীর নাম বা পদবি) স্ত্রী তার যুবক দাস থেকে অসৎকর্ম কামনা করছে, (তাকে সে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে) প্রেম তাকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে দেখছি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।' স্ত্রীলোকটি যখন তাদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনলো তখন সে তাদের ডেকে পাঠালো, তাদের জন্য (বিস্তৃত) আসন প্রস্তুত করলো, (যথারীতি)
তাদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিলো এবং ইউসুফকে বললো, 'এদের সামনে বের হও।' তারপর তারা যখন তাকে দেখলো, তার গরিমায় অভিভূত হলো (তারা তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করলো) এবং নিজেদের হাত কেটে ফেললো। (হঠাৎ) তারা (চিৎকার করে) বললো, 'অদ্ভুত আল্লাহর মাহাত্ম্য, এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা।' সে (আযিযের স্ত্রী) বললো, 'এ-ই সে যার সম্পর্কে তোমরা আমার নিন্দা করেছো। (ইনিই সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে তোমরা আমাকে ভর্ৎসনা করেছো।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩০-৩২)
আযিযে মিসরের স্ত্রী এটাও বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে আমি তার হৃদয়কে বশে আনতে চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু সে সংযমহীন হয় নি। তারপরও আমি এটা বলে দিচ্ছি, সে যদি শেষ পর্যন্ত আমার কথা মান্য না করে, অর্থাৎ আমার বাসনা পূর্ণ না করে, তাহলে তার অবস্থা অবশ্যই এমন হবে যে, তাকে কারাগারে আবদ্ধ থাকতে হবে এবং সে লাঞ্ছিত ও অপদস্থ হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
وَلَقَدْ رَاوَدْتُهُ عَنْ نَفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ وَلَئِنْ لَمْ يَفْعَلْ مَا أَمْرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِنَ الصَّاغِرِينَ (سورة يوسف)
'আমি তো তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছি। (তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছি।) কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে; আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে কারারুদ্ধ হবেই এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩২)
হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর এসব কথা শুনলেন। তা ছাড়া তিনি নিজের ব্যাপারে অন্য রমণীদেরও হাবভাব দেখতে পেলেন। তখন প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আল্লাহ, এই নারীরা আমাকে যে-বিষয়ের প্রতি আহ্বান করছে, তার তুলনায় আমি কারাগারে বসবাস করাকে হাজারগুণ শ্রেয় মনে করি। যদি আপনি আমাকে সাহায্য না করেন এবং তাদের ষড়যন্ত্র থেকে আমাকে রক্ষা না করেন, তবে এটা বিচিত্র নয় যে, আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে
যাবো।' আল্লাহ তাআলার দরবারে হযরত ইউসুফ আ.-এর এই দোয়া কবুল হলো এবং আল্লাহ সেই রমণীদের যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও ছলনাকে নস্যাৎ করে দিলেন। সফলতার মুকুট হযরত ইউসুফ আ.-এর মাথার ওপরই থাকলো। পবিত্র কুরআনে বিষয়টির বর্ণনা দেয়া হয়েছে এভাবে-
قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجَاهِلِينَ () فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُnَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (سورة يوسف)
'ইউসুফ বললো, 'হে আমার প্রতিপালক, এই নারীরা আমাকে যার প্রতি আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়। আপনি যদি তাদের ছলনা থেকে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' তখন তার প্রতিপালক তার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তাকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' [সুরা ইউসুফ : আয়াত ৩৩-৩৪।
এই ঘটনায় একটি বাক্য উল্লেখ আছে যে, وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ 'নিমন্ত্রিত রমণীরা নিজেদের হাত কেটে ফেললো।' সাধারণভাবে মুফাস্সিরগণ সবাই এই বাক্যের তাফসির তাফসির করেন এমন যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর রূপ-ঔজ্জ্বল্য দর্শনে আত্মহারা হয়ে রমণীদের অবস্থা বাস্তবিকই এমন হয়ে গিয়েছিলো যে, তাঁদের নিজেদের সত্তা সম্পর্কে কোনো খেয়ালই ছিলো না। ফলে তাঁরা কাটবার বস্তুর পরিবর্তে আপন আপন হাতই কেটে ফেললেন। কিন্তু কোনো কোনো আধুনিক মুফাস্সির বলেন, উপরিউক্ত তাফসির যথার্থ নয়। তাঁর মতে, মিসরীয় রমণীদের এটাও একটা ছলনা ও কুটিলতা ছিলো। তাঁরা ইউসুফ আ.-কে নিজেদের দিকে আকর্ষিত করার জন্য বলতে চাচ্ছিলেন, আমরা তোমার রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি এতটাই মোহিত যে, তোমার চেহারা দর্শন করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জ্ঞান ও অনুভূতি লোপ পেয়ে গিয়েছে। ফলে আমরা আমাদের হাত যখম করে ফেলেছি। এই তাফসিরের সমর্থনে তিনি প্রমাণস্বরূপ এই আয়াত পেশ করেছেন: وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ
যদি তাদের ছলনা থেকে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বো এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হবো।' অর্থাৎ হযরত ইউসুফ আ. তাঁদের হাত কেটে ফেলার অবস্থাকে কাইদ (ষড়যন্ত্র) বলে ব্যক্ত করেছেন। যদি এটা অনিচ্ছাকৃত অবস্থা হতো তবে তাঁরা নির্দোষ সাব্যস্ত হতেন। এমতাবস্থায় রমণীদের কর্মপদ্ধতিকে ষড়যন্ত্র নামে আখ্যায়িত করার অর্থ কী? ত ছাড়া যখন মিসরের বাদশাহ হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগার থেকে বের করে আনার নির্দেশ প্রদান করলেন, তখনো হযরত ইউসুফ আ. বলেছিলেন-
اِرْجِعْ إِلَى رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ (سورة يوسف)
'তুমি তোমার প্রভুর (বাদশহর) কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো যে-নারীরা হাত কেটে ফেলেছিলো তাদের অবস্থা কী? নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্যক অবগত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫০।
আযিযে মিসরের কাছে হযরত ইউসুফ আ.-এর সততা প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিলো। তাঁর কোনো ধরনের ইচ্ছা ছিলো না যে ইউসুফ আ.-এর কোনো ক্ষতি হোক। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর কাঁধে ইশক ও প্রেমের ভূত বেশ সাংঘাতিকভাবেই চেপে বসেছিলো। যখন তিনি দেখলেন, খোশামোদ, ছল-চাতুরি, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রে, কোনো প্রকারেই তাঁর উদ্দেশ্য হাসিল হচ্ছে না, তখন তিনি হুমকি-ধমকি দিয়ে কার্যোদ্ধার করতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তা সত্ত্বেও যখন দৃঢ়তার পর্বতে কোনো কম্পন সৃষ্টি হলো না। আযিযে মিসর ইউসুফ আ.-এর সততার যাবতীয় নিদর্শন দেখা ও বুঝা সত্ত্বেও নিজের স্ত্রীর অপমান ও দুর্নাম হচ্ছে দেখে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, ইউসুফকে এক নির্দিষ্টকালের জন্য কারাগারে আটক করে রাখা হোক। যেনো এই বিষয়টির কথা মানুষের মন থেকে মুছে যায় এবং এই নিন্দাচর্চা বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে হযরত ইউসুফ আ.-কে জেলখানায় যেতে হলো।
এ-ক্ষেত্রে হযরত শাহ আবদুল কাদির মুহাদ্দিস দেহলবি রহ. লিখেছেন, ইউসুফ আ. তাঁর দোয়ার সঙ্গে এটাও বলেছিলেন, 'তাদের এই নির্লজ্জতার আহ্বানের মোকাবিলায় কারাগারই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়।' তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে তো স্ত্রীলোকদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেন; কিন্তু তাঁর অদৃষ্টে কারগার নির্ধারণ করে দিলেন। তাঁর উচিত ছিলো এই বাক্যটি না
বলা। বরং তাঁর উচিত ছিলো পরীক্ষা ও দুঃখ-দুর্দশাকে আহ্বান না করা। হযরত শাহ দেহলবি সাহেব (নাউওয়ারাল্লাহু মারকাদাহু)-এর এই সূক্ষ্ম কথাটিকে শক্তিশালী করার জন্য অপর একজন তত্ত্বজ্ঞানী মুফাস্সির একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তাঁর মর্মার্থ এই : এক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে দোয়া করতো-
اللهم إني أسئلك الصبر 'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ধৈর্য প্রার্থনা করছি।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটির এই দোয়া শুনে বললেন, 'কেনো তুমি বিপদ-আপদ প্রার্থনা করছো? এটা না করে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপত্তায় রাখার প্রার্থনা কেনো করছো না?'
এই দুইজন বুযুর্গের উচ্চ মর্যাদার প্রতি লক্ষ করে যদিও তাঁদের কথার ওপর সমালোচনা করতে আমার সাহস হচ্ছে না, তারপরও হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো একজন উচ্চস্তরের নবীর জীবনের এই মহৎকাজকে একটি তত্ত্বকথার সামনে কুরবান হয়ে যেতে দেখে আর থাকা গেলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলতে হয় যে, হযরত ইউসুফ আ.-এর السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي নারীরা আমাকে যার প্রতি আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে অধিক প্রিয়' বাক্যটিতে তাঁর মর্যাদার উচ্চতা, আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য, দীন ও আমলে দৃঢ়তা, সত্যের ওপর দৃঢ় সংকল্প এবং আল্লাহর বিধানে সন্তুষ্ট থাকা ও আত্মসমর্পণের গুণাবলির এমন অনুপম প্রকাশ রয়েছে, যা তাঁর মতো উচ্চশ্রেণির নবীরই কাজ।
গভীরভাবে চিন্তা করুন, আযিযে মিসরের স্ত্রী-গৃহকর্ত্রী খোশামোদ ও ছল-চাতুরির এমন কোনো পন্থা নেই যা তিনি হযরত ইউসুফ আ-কে বশীভূত করার জন্য ব্যবহার করেন নি। তাতে বিফল হওয়ার পর অবশেষে অন্য রমণীদেরও সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের মাধ্যমে সম্ভাব্য সর্বপ্রকারের কৌশল ইউসুফ আ.-এর ওপর প্রয়োগ করেছেন; কিন্তু তাঁরা বিফলই রয়ে গেছেন। সবশেষে আযিযের স্ত্রী এই হুমকি দিলেন যে, ইউসুফ আ. হয়তো তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ করবেন, অন্যথায় তাঁকে কারাগারে আবদ্ধ থাকতে হবে। এ-অবস্থায় একজন আল্লাহভক্ত বান্দা, সৎকর্মে দৃঢ়সংকল্প ও আস্থায় অবিচল ব্যক্তি এবং আল্লাহর ভীতিকে সমগ্র সৃষ্টির ক্রোধ ও কোপের
ওপর প্রধান্য প্রদানকারী মানুষ এর চেয়ে উত্তম জবাব আর কী দিতে পারতেন যে, হে আল্লাহ, আমি এই গর্হিত ও নির্লজ্জ কাজের মোকাবিলায় কারগারকেই প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার প্রদান করছি। কারাগার ও বন্দিদশা আমি মঞ্জুর করতে রাজি আছি; কিন্তু আপনার নাফরমানি ও অবাধ্যতা আমি কিছুতেই মঞ্জুর করবো না। কেউ কি এ-কথা বলতে পারেন যে, এটা কারাগারের জন্য প্রার্থনা, বন্দি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ, দুঃখ ও দুর্দশাকে আহ্বান? কখনো নয়। বরং এখানে তো সূক্ষ্ম উপায়ে এমন কথা বলা হচ্ছে যা সত্যের ঘোষণা এবং আল্লাহর দরবারে পৌঁছার সঠিক স্তর।
হযরত ইউসুফ আ. এটাও পছন্দ করেন নি যে, আযিযে মিসরের পত্নীকে সম্বোধন করেন অথবা নিমন্ত্রিত রমণীদের তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ প্রদান করেন; বরং তিনি তাঁর আল্লাহকে ডাকলেন। কিন্তু তিনি সেসব বিভ্রান্ত ও অসৎ স্বভাবের রমণীদের কাছে এ-বিষয়টি প্রকাশ করে দেয়া জরুরি মনে করলেন, যেভাবে তোমাদের ছল-চাতুরি, প্রবঞ্চনা ও খোশামোদ বিফল হয়েছে, তেমনি তোমাদের হুমকি-ধমকি ও শাস্তিও আমার সত্যের সংকল্প ও আল্লাহর সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষাকে বাতিল করতে পারবে না। আযিযে মিসরের স্ত্রী বলেছেন, 'ইউসুফ হয়তো আমার মনস্কাম পূর্ণ করবে, অন্যথায় তাকে কারাগারে বন্দিদশা বরণ করতে হবে।' সুতরাং আমি তাঁর অসদিচ্ছার মোকাবিলায় কারগারকেই লক্ষবার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করবো।
مِمَّا يَدْعُونَنِي السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ
এখন বলুন, এই সত্যের ঘোষণা ও দৃঢ়তা প্রকাশের সঙ্গে সেই দোয়ার কী সম্পর্ক যাতে এক ব্যক্তি অনর্থক নিজের জন্য 'ধৈর্য' প্রার্থনা করে নিজের দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হওয়ার আহ্বান করছিলো? এই ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষাও ছিলো না, বিপদ-আপদও ছিলো না; বরং অযথা বালা-মুসিবত ডেকে আনছিলো। আর ইউসুফ আ.-এর ক্ষেত্রে পরীক্ষা মস্তকের ওপর, বিপদ বিদ্যমান, শাস্তিরও হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে, আপদ নাযিল করার ভীতিপ্রদর্শন করা হচ্ছে, এমন নিদারুণ অবস্থায় কি শুধু এই জবাব দেয়াই যথেষ্ট হতো যে, হযরত ইউসুফ আ. আযিযে মিসরের স্ত্রীর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন? আর কিছুই বলার প্রয়োজন ছিলো না? যদি এমনই হতো, তবে পরীক্ষা, সঙ্কট,
বালা-মুসিবতের সময় দৃঢ়তা ও সত্যের ঘোষণা, সাহসিকতা ও নির্ভীকতা এবং দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ-মত্ততার সামনে আল্লাহর কালিমাকে উচ্চ করে ধরার সবক কে শেখাতেন? দৃঢ় সংকল্পের জীবন-যাপনের পদ্ধতি কে বলে দিতেন? বাতিলের সামনে দুঃসাহসিকতার শিক্ষা কার কাছ থেকে পাওয়া যেতো এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যের অবস্থা কে সৃষ্টি করতো?
টিকাঃ
১. * এখানে 'তিনি' অর্থে আল্লাহ, ভিন্নমতে আযিযে মিসর অর্থাৎ স্ত্রীলোকটির স্বামী।
২. * -এর আভিধানিক অর্থ দলিল। এখানে 'নিদর্শন' অথবা প্রতিপালক কর্তৃক প্রদত্ত বিবেকের
৩. b তাদেরকে ফলমূল পরিবেশন করা হয়েছিলো এবং সেগুলোকে কেটে খেতে ছুরি দেয়া হয়েছিলো।
৪. * মাওলানা আবুল কালাম আযাদ, তরজুমানুল কুরআন, সুরা ইউসুফ।
📄 ইউসুফ আ. কারাগারে
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া হলো। তা করা হলো এজন্য, যাতে আযিযে মিসরের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম থেকে রক্ষা পান এবং অপরাধীকে কেউ অপরাধী না বলতে পারে।
তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, 'হযরত ইউসুফ আ.-এর ইলম ও আমলের জ্যোতি কারাগারেও গোপনীয় থাকতে পারে নি। কারাগারের রক্ষক ইউসুফ আ.-এর শিষ্যত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন কারাগারের যাবতীয় আইন-শৃঙ্খলার বিধান ও সমাধান তাঁর হাতে ছেড়ে দিলো। ফলে কারাগার সম্পূর্ণরূপে তাঁর স্বাধীন পরিচালনাধীন চলে এলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওখানেও তাঁর যাবতীয় কাজে সৌভাগ্যবান করে দিলেন।
পবিত্র কুরআন থেকেও এই বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর কারণ হলো এই, সেকালের কারগারগুলোর অবস্থার প্রেক্ষিতে হযরত ইউসুফ আ.-কাছে বন্দিদের অবাধ যাতায়াত এবং তাঁরা মহত্ব ও সৎ চরিত্রের স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, কারাগারে ইউসুফ আ.-এর পবিত্র গুণাবলির যথেষ্ট খ্যাতি ছিলো।
যাইহোক। হযরত ইউসুফ আ.-কে কারাগারে প্রেরণ করা হলো। একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দোষী, একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে অপরাধী বানিয়ে দেয়া হলো। তা করা হলো এজন্য, যাতে আযিযে মিসরের স্ত্রী অপমান ও দুর্নাম থেকে রক্ষা পান এবং অপরাধীকে কেউ অপরাধী না বলতে পারে।
তাওরাতে বর্ণিত আছে যে, 'হযরত ইউসুফ আ.-এর ইলম ও আমলের জ্যোতি কারাগারেও গোপনীয় থাকতে পারে নি। কারাগারের রক্ষক ইউসুফ আ.-এর শিষ্যত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন কারাগারের যাবতীয় আইন-শৃঙ্খলার বিধান ও সমাধান তাঁর হাতে ছেড়ে দিলো। ফলে কারাগার সম্পূর্ণরূপে তাঁর স্বাধীন পরিচালনাধীন চলে এলো। আল্লাহ তাআলা তাঁকে ওখানেও তাঁর যাবতীয় কাজে সৌভাগ্যবান করে দিলেন।
পবিত্র কুরআন থেকেও এই বর্ণনার সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর কারণ হলো এই, সেকালের কারগারগুলোর অবস্থার প্রেক্ষিতে হযরত ইউসুফ আ.-কাছে বন্দিদের অবাধ যাতায়াত এবং তাঁরা মহত্ব ও সৎ চরিত্রের স্বীকৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, কারাগারে ইউসুফ আ.-এর পবিত্র গুণাবলির যথেষ্ট খ্যাতি ছিলো।