📄 কিনআনের কূপ
মোটকথা, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা মাঠে খেলাধুলা করার বাহানা ইউসুফ আ.-কে মাঠে নিয়ে গেলেন। পূর্বের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা তাঁকে এমন একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলেন যাতে পানি ছিলো না। তা দীর্ঘকাল শুষ্ক অবস্থায় ছিলো। ভাইয়েরা বাড়িতে ফেরার সময় ইউসুফ আ.-এর জামায় কোনো জন্তুর রক্ত মাখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হযরত ইয়াকুব আ.-এর কাছে এসে বললেন, আব্বা, আপনাকে আমাদের সত্যতা বিশ্বাস করানোর জন্য যতই চেষ্টা করি না কেনো, আপনি কখনো তা বিশ্বাস করবেন না। আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতায় একে অন্যের আগে গন্তব্যস্থানে পৌছানোর চেষ্টায় মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো।
হযরত ইয়াকুব আ. ইউসুফ আ.-এর জামাটি দেখলেন। তাতে রক্ত মাখানো আছে ঠিকই; কিন্তু কোথাও কোনে ছেঁড়া ছিলো না। কিংবা জামার আঁচলও ফাঁড়া ছিলো না। ইয়াকুব আ. সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারলেন। কিন্তু তাঁদেরকে ধমক দেয়া বা তিরস্কার করা, নিন্দা করা, ঘৃণা করা বা অপদস্থ করা—কিছুই করলেন না। বরং তিনি নবীসুলভ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি, ধৈর্য ও মার্জনার সুরে বললেন, প্রকৃত অবস্থা গোপন করার চেষ্টা সত্ত্বেও তোমরা তা গোপন করতে পারো নি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— وَجَاءُوا عَلَى قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ (سورة يوسف) 'তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিলো। সে (ইয়াকুব) বললো, 'না, (তোমরা যা বলছো তা কখনোই নয়) তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছো, সে-বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (তাঁর কাছেই আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ১৮।
📄 ইউসুফ আ. ও দাসত্ব
এখানে পিতা ও পুত্রদের মধ্যে এ-ধরনের কথাবার্তা চলছিলো আর ওদিকে হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে ভিন্ন ঘটনা ঘটলো। হেজাযের ইসমাইলি
বংশের একটি কাফেলা শাম (সিরিয়া) থেকে দুগন্ধি-দ্রব্যাদি, সজ-মসলা ইত্যাদি বোঝাই করে মিসরে যাচ্ছিলো। কূপ দেখে তারা পানির জন্য বালতি ফেললো। ইউসুফ আ. মনে করলেন, হয়তো ভাইদের অন্তরে দয়ার সঞ্চার হয়েছে। কাজেই তিনি বালতি ধরে লটকে থাকলেন। বণিকগণ বালতি উঠিয়ে ইউসুফ আ.-কে দেখেই চিৎকার করে বলে উঠলো-
يَا بُشْرَى هَذَا غُلَامٌ
'কী সুখবর! এ যে এক কিশোর! (আমাদের হস্তগত হলো!)
তাওরাতে বর্ণিত আছে, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা যখন ইসমাইলি কাফেলাকে দেখলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন যে, ইউসুফকে কূপ থেকে উঠিয়ে এই বণিকদের কাছে বিক্রি করে ফেলো। কিন্তু এর আগেই ইসমাইলি বণিকরা ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে বের করে তাদের দাস বানিয়ে ফেলেছে। আর জ্যেষ্ঠ ভাই রাওবিন যখন কূপের কাছে পৌছে দেখতে পেলেন যে ইউসুফ ওখানে নেই, কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলেন। রাওবিনকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন ইয়াহুদা। রাওবিন প্রথম থেকেই এই ধারণায় ছিলেন যে, ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে বের করে এনে চুপে চুপে পিতার হাতে সোপর্দ করে দেবেন। এ-কারণেই তিনি ইউসুফকে হত্যা করে ফেলার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন।
এখানে কোনো কোনো মুফাস্সির লিখেছেন যে, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরাই তাঁকে কূপ থেকে বের করে ইসমাইলি বণিক কাফেলার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুফাস্সিসরিনের এই বক্তব্যের সঙ্গে পবিত্র কুরআনও একমত নয়, তাওরাতও একমত নয়; বরং উভয়ের বর্ণনার দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে, কাফেলার বণিকেরাই ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে উত্তোলন করে তাদের দাস বানিয়ে নিয়েছিলো।
একইভাবে বিখ্যাতগ্রন্থ 'কাসাসুল আম্বিয়া'র সংকলক তাওরাতের উপরিউক্ত বর্ণনায় আলোচ্য কাফেলা সম্পর্কে ভুল বুঝেছেন। তা এই যে, তিনি তাদেরকে ইসমাইলি ও মাদয়ানি দুটি ভিন্ন ভিন্ন কাফেলা মনে করেছেন। অথচ এটা ঠিক নয়। বরং বিষয় এই যে, এই কাফেলাটিই ছিলো শাম থেকে
মিসর গমনকারী কাফেলা। তারা বংশগত দিক থেকে ইসমাইলি এবং দেশের হিসেবে মাদয়ানি' ছিলো।
📄 হযরত ইউসুফ আ. মিসরে
খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর পূর্বে মিসরকে সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্রভূমি মনে করা হতো। ওখানকার শাসক ছিলো আমালিকা গোত্রের হিকসুস। যেসময় হযরত ইউসুফ আ. কিনআন থেকে যাযাবর জাতির ক্রীতদাস হয়ে মিসরে প্রবেশ করলেন, তখন মিসরের রাজধানী ছিলো রাআমাসিস। এটা খুব সম্ভব ওই স্থানে অবস্থিত ছিলো যেখানে আজ 'সান' নামক বসতিটি আবাদ রয়েছে। ভৌগলিক বিবরণ অনুযায়ী এই স্থানটি পুবদিকে নীলনদের কাছে বলে কথিত। ফুতিফার ছিলেন মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং এক মর্যাদাবান গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি ঘুরতে বের হয়ে মিসরের বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ-সময় ইউসুফ আ.-এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। তিনি অতি সাধারণ মূল্যে তাঁকে ক্রয় করে নেন।
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, মিসরীয়রা তৎকালে নিজেদেরকে বিশ্বের সেরা সুসভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতি বলে মনে করতো। তারা মরুবাসী যাযাবর গোত্রগুলোকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতো। নিজেদের শহরে তাদের সঙ্গে অস্পৃশ্যের মতো ব্যবহার করতো। এই গোত্রগুলোর মধ্যেই একটি গোত্র ইবরাহিমি বংশের স্মারক হয়ে কিনআনে বসবাস করতো। কিনআনে শহুরে পরিবেশ এবং স্থায়ী অধিবাসের নামচিহ্ন পর্যন্ত ছিলো না। শিকারের ওপর তাদের জীবনযাপন নির্ভর করতো। খড়ের ছাউনিযুক্ত ছোট ছোট কুটিরে তারা বসবাস করতো। আর বকরি-ভেড়ার তাদের ধন-সম্পদ।
এমতাবস্থায় ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার অভাবনীয় কর্মকাণ্ড দেখুন। একজন গ্রামীণ মানুষ, তিনি আবার অল্প বয়স্ক ক্রীতদাস। তিনি একজন সুসভ্য, সংস্কৃতিবান, ধনাঢ্য ও আড়ম্বরপূর্ণ ব্যক্তির ঘরে ঠাঁই পান। তখন তিনি নিজের নিষ্পাপ জীবন, ধৈর্য ও গাম্ভীর্য, বিশ্বস্ততা এবং যোগ্যতার পবিত্র গুণাবলির বদৌলতে তাঁর প্রভুর চোখের জ্যোতি ও প্রাণের মালিক হয়ে ওঠেন। ফুতিফার তাঁর স্ত্রীকে বলেন, কুরআনের ভাষায়- أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا
'এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করো, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপেই গ্রহণ করতে পারি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)
এটা কী কারণে হলো? ইউসুফ আ.-এর মধ্যে এই পছন্দীয় চরিত্র ও স্বভাব কোথা থেকে এলো? একজন গ্রামীণ সন্তান কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন? একজন ক্রীতদাস কোন মুরব্বি থেকে এই পবিত্র স্বভাবের অধিকারী হলেন। এই প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআন জবাব দিচ্ছে- وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (سورة يوسف)
'সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো, আমি তাকে হেকমত ও জ্ঞান দান করলাম (মীমাংসার ক্ষমতা ও ইলম) এবং এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২২)
যাইহোক। ফুতিফার হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচার-ব্যবহার করেন নি; বরং আপন সন্তানের মতো সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাখলেন এবং নিজের জমিদারি, ধন-দৌলত ও গৃহজীবনের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাঁর ওপর সোপর্দ করে দিলেন। এটা যেনো কিনআনের একজন
পশুপালকের ওপর অদূর ভবিষ্যতে যে রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হবে তারই সূচনা। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَكَذَلِكَ مَكَّنَا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سورة يوسف)
'এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সে-দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)
টিকাঃ
১. ° হিজাযি।
📄 আযিযের মিসরের স্ত্রী এবং ইউসুফ আ.
একজন বিখ্যাত সুফি ইবনে আতাউল্লাহ আস-সিকান্দারির উক্তি : ربما كمنت المنن في المحن
'অধিকাংশ সময়ই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দয়া বিপদাপদের মধ্যে নিহিত থাকে।' হযরত ইউসুফ আ.-এর গোটা জীবনটাই এই উক্তিরই বাস্তবায়ন-ক্ষেত্র। শৈশবকালের প্রথম বিপদ তাঁকে কিনআনের গ্রাম্য জীবন থেকে বের করে তাহযিব ও তামান্দুনের কেন্দ্রভূমি মিসরের এক অভিজাত ও শ্রেষ্ঠ পরিবারের মালিক বানিয়ে দিলো। একেই বলে 'দাসত্বের মধ্যে থেকে প্রভুত্ব করা'।
এখন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ও আরো কঠিন পরীক্ষা শুরু হলো। হযরত ইউসুফ আ. তখন পূর্ণযৌবনে পদার্পণ করেছেন। রূপ ও সৌন্দর্যের এমন কোনো দিক ছিলো না যা তাঁর মধ্যে ছিলো না। তিনি ছিলেন মাধুর্য ও কমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। চেহারা ছিলো চন্দ্র ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায়-সোহাগার মত কাজ করছিলো। এসব গুণাবলি ছিলো তাঁর সবসময়ের সঙ্গী।
আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের হৃদয়কে আর বশে রাখতে পারলেন না। হযরত ইউসুফের রূপশিখার ওপর পতঙ্গের মতো কুরবান হতে লাগলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রপৌত্র, হযরত ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর চোখের জ্যোতি, নবী পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রদীপ, নবুওতের পদের জন্য মনোনীত। এমন মহাপুরুষের দ্বারা কেমন করে সম্ভব ছিলো যে
তিনি অপবিত্র ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হন এবং আযিযের স্ত্রীর অপবিত্র মনস্কামনা পূর্ণ করেন?
কিন্তু মিসরের সেই স্বাধীনা রমণী যখন দেখলেন, এভাবে হযরত ইউসুফের ওপর জাদু ক্রিয়া করছে না, তখন একদিন তিনি উন্মত্ত হয়ে ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ইউসুফ আ.-কে পীড়পীড়ি করতে শুরু করলেন—আমার কামবাসনা পূর্ণ করো। হযরত ইউসুফ আ.-এর জন্য এই সময়টুকু ছিলো কঠিন পরীক্ষার সময়। আযিযের স্ত্রী রাজ পরিবারের উদ্ভিন্ন যৌবনা রমণী, সৌন্দর্যশিখামণ্ডিত রক্তিম চেহারা, প্রেয়সী নয় বরং প্রেমিক, রূপ ও সাজ-সজ্জার এক অসহনীয় প্রদর্শনী, প্রেয়সীসুলভ ভাবভঙ্গির চাহনি। আর এদিকে হযরত ইউসুফ আ. নিজেও রূপবান নবযুবক, রূপ-সৌন্দর্যের মাধুর্যের সঙ্গে পরিচিত। সব দরজা বন্ধ। অভিভাবক ও প্রভুর ভয়ের ব্যাপারে মিসরের রানি নিজেই দায়িত্বশীল। কিন্তু এতসব অনুকূল অবস্থা হযরত ইউসুফের হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কি আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রতি বাসনা জাগিয়ে তুলেছিলো? তাঁর অন্তর কি শান্তভাব ত্যাগ করে অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যে অধীর হয়ে উঠেছিলো? তাঁর নফস কি হৃদয়জগতে একমুহূর্তের জন্য কম্পন সৃষ্টি করেছিলো? না, কখনোই নয়। তার পরিবর্তে বরং পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার প্রতিমূর্তি, নবুওতের আমানতদার, আল্লাহ তাআলার ওহি অবতীর্ণ হওয়ার স্থল এমন দুটি চিত্তাকর্ষক ও শক্তিশালী দলিল দ্বারা মিসরের সেই নারীকে বুঝিয়েছিলেন, যা হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো ব্যক্তিত্বের দ্বারাই সম্ভব ছিলো। যাঁর শিক্ষা ও প্রতিপালক সরাসরি আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে থেকেই হয়েছে।
তিনি আযিযে মিসরের স্ত্রীকে জবাব দিলেন, এটা অসম্ভব। আমি আল্লাহপাকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তাঁরই নাফরমানি করবো যাঁর মহাপ্রতাপশালী নাম 'আল্লাহ' এবং যিনি সমগ্র সৃষ্টজগতের মালিক? আর আমি কি আমার সেই মুরব্বি আযিযে মিসরের আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করবো যিনি আমাকে ক্রীতদাসরূপে রাখার পরিবর্তে এই সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন? যদি আমি এমন অশ্লীল কর্ম করি তাহলে তো জালিম বলে সাব্যস্ত হবো। আর জালিমদের জন্য পরিণামে কখনো মঙ্গল নেই।
কিন্তু আযিযে মিসরের ওপর এই নসিহতের কোনো ক্রিয়াই হলো না। বরং তিনি তাঁর কামনাকে কার্যকরী রূপদানের ওপরই গোঁ ধরে থাকলেন। তখন
হযরত ইউসুফ আ. তাঁর প্রতিপালকের সেই বুরহান বা প্রমানের প্রতি লক্ষ করে, যা তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলেন-
وَراوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ () وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (سورة يوسف)
'সে (ইউসুফ আ.) যে-স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলো সে (স্ত্রীলোকটি) তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করলো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো ও বললো, 'এসো।' (এসো, আমার কাছে এসো।) সে বললো, 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।' সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিলো এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তো যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন' প্রত্যক্ষ করতো (যদি আল্লাহপাকের প্রমাণ দেখতে না পেতেন)। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা (অসৎ ইচ্ছা ও নির্লজ্জতা) থেকে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত (খাঁটি) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৩-২৪]
একজন বিখ্যাত সুফি ইবনে আতাউল্লাহ আস-সিকান্দারির উক্তি : ربما كمنت المنن في المحن
'অধিকাংশ সময়ই আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ ও দয়া বিপদাপদের মধ্যে নিহিত থাকে।' হযরত ইউসুফ আ.-এর গোটা জীবনটাই এই উক্তিরই বাস্তবায়ন-ক্ষেত্র। শৈশবকালের প্রথম বিপদ তাঁকে কিনআনের গ্রাম্য জীবন থেকে বের করে তাহযিব ও তামান্দুনের কেন্দ্রভূমি মিসরের এক অভিজাত ও শ্রেষ্ঠ পরিবারের মালিক বানিয়ে দিলো। একেই বলে 'দাসত্বের মধ্যে থেকে প্রভুত্ব করা'।
এখন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ও আরো কঠিন পরীক্ষা শুরু হলো। হযরত ইউসুফ আ. তখন পূর্ণযৌবনে পদার্পণ করেছেন। রূপ ও সৌন্দর্যের এমন কোনো দিক ছিলো না যা তাঁর মধ্যে ছিলো না। তিনি ছিলেন মাধুর্য ও কমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। চেহারা ছিলো চন্দ্র ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায়-সোহাগার মত কাজ করছিলো। এসব গুণাবলি ছিলো তাঁর সবসময়ের সঙ্গী।
আযিযে মিসরের স্ত্রী নিজের হৃদয়কে আর বশে রাখতে পারলেন না। হযরত ইউসুফের রূপশিখার ওপর পতঙ্গের মতো কুরবান হতে লাগলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রপৌত্র, হযরত ইসহাক ও ইয়াকুব আ.-এর চোখের জ্যোতি, নবী পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রদীপ, নবুওতের পদের জন্য মনোনীত। এমন মহাপুরুষের দ্বারা কেমন করে সম্ভব ছিলো যে
তিনি অপবিত্র ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হন এবং আযিযের স্ত্রীর অপবিত্র মনস্কামনা পূর্ণ করেন?
কিন্তু মিসরের সেই স্বাধীনা রমণী যখন দেখলেন, এভাবে হযরত ইউসুফের ওপর জাদু ক্রিয়া করছে না, তখন একদিন তিনি উন্মত্ত হয়ে ঘরের সব দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং ইউসুফ আ.-কে পীড়পীড়ি করতে শুরু করলেন—আমার কামবাসনা পূর্ণ করো। হযরত ইউসুফ আ.-এর জন্য এই সময়টুকু ছিলো কঠিন পরীক্ষার সময়। আযিযের স্ত্রী রাজ পরিবারের উদ্ভিন্ন যৌবনা রমণী, সৌন্দর্যশিখামণ্ডিত রক্তিম চেহারা, প্রেয়সী নয় বরং প্রেমিক, রূপ ও সাজ-সজ্জার এক অসহনীয় প্রদর্শনী, প্রেয়সীসুলভ ভাবভঙ্গির চাহনি। আর এদিকে হযরত ইউসুফ আ. নিজেও রূপবান নবযুবক, রূপ-সৌন্দর্যের মাধুর্যের সঙ্গে পরিচিত। সব দরজা বন্ধ। অভিভাবক ও প্রভুর ভয়ের ব্যাপারে মিসরের রানি নিজেই দায়িত্বশীল। কিন্তু এতসব অনুকূল অবস্থা হযরত ইউসুফের হৃদয়ে এক মুহূর্তের জন্যও কি আযিযে মিসরের স্ত্রীর প্রতি বাসনা জাগিয়ে তুলেছিলো? তাঁর অন্তর কি শান্তভাব ত্যাগ করে অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যে অধীর হয়ে উঠেছিলো? তাঁর নফস কি হৃদয়জগতে একমুহূর্তের জন্য কম্পন সৃষ্টি করেছিলো? না, কখনোই নয়। তার পরিবর্তে বরং পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার প্রতিমূর্তি, নবুওতের আমানতদার, আল্লাহ তাআলার ওহি অবতীর্ণ হওয়ার স্থল এমন দুটি চিত্তাকর্ষক ও শক্তিশালী দলিল দ্বারা মিসরের সেই নারীকে বুঝিয়েছিলেন, যা হযরত ইউসুফ আ.-এর মতো ব্যক্তিত্বের দ্বারাই সম্ভব ছিলো। যাঁর শিক্ষা ও প্রতিপালক সরাসরি আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে থেকেই হয়েছে।
তিনি আযিযে মিসরের স্ত্রীকে জবাব দিলেন, এটা অসম্ভব। আমি আল্লাহপাকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি তাঁরই নাফরমানি করবো যাঁর মহাপ্রতাপশালী নাম 'আল্লাহ' এবং যিনি সমগ্র সৃষ্টজগতের মালিক? আর আমি কি আমার সেই মুরব্বি আযিযে মিসরের আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করবো যিনি আমাকে ক্রীতদাসরূপে রাখার পরিবর্তে এই সম্মান ও মর্যাদা দান করেছেন? যদি আমি এমন অশ্লীল কর্ম করি তাহলে তো জালিম বলে সাব্যস্ত হবো। আর জালিমদের জন্য পরিণামে কখনো মঙ্গল নেই।
কিন্তু আযিযে মিসরের ওপর এই নসিহতের কোনো ক্রিয়াই হলো না। বরং তিনি তাঁর কামনাকে কার্যকরী রূপদানের ওপরই গোঁ ধরে থাকলেন। তখন
হযরত ইউসুফ আ. তাঁর প্রতিপালকের সেই বুরহান বা প্রমানের প্রতি লক্ষ করে, যা তিনি উল্লেখ করেছেন, পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানিয়ে দিলেন-
وَراوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَنْ نَفْسِهِ وَغَلَقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ () وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَنْ رَأَى بُرْهَانَ رَبِّهِ كَذَلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ (سورة يوسف)
'সে (ইউসুফ আ.) যে-স্ত্রীলোকের ঘরে ছিলো সে (স্ত্রীলোকটি) তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করলো এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিলো ও বললো, 'এসো।' (এসো, আমার কাছে এসো।) সে বললো, 'আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি (আযিযে মিসর) আমার প্রভু; তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফলকাম হয় না।' সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিলো এবং সেও তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তো যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন' প্রত্যক্ষ করতো (যদি আল্লাহপাকের প্রমাণ দেখতে না পেতেন)। আমি তাকে মন্দ কাজ ও অশ্লীলতা (অসৎ ইচ্ছা ও নির্লজ্জতা) থেকে বিরত রাখার জন্য এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে ছিলো আমার বিশুদ্ধচিত্ত (খাঁটি) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২৩-২৪]