📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন এবং ইউসুফ আ.-এর ভাইগণ

📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন এবং ইউসুফ আ.-এর ভাইগণ


এই ঘটনাগুলোর সারমর্ম এই যে, হযরত ইয়াকুব আ. নিজের সব সন্তান-সন্ততির মধ্যে হযরত ইউসুফ আ.-কে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। তাই হযরত ইউসুফের প্রতি হযরত ইয়াকুব আ.-এর প্রেমমিশ্রিত ঈর্ষক ও মুহাকাতও ইউসুফ আ.-এর ভাইদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও অসহনীয় ছিল এবং
তাঁরা সবসময় এই ভাবনাতেই নিরত থাকতেন যে, হয়তো তাঁরা ইয়াকুব আ.-এর হৃদয় থেকে এই ভালোবাসা দূর করে দিতে পারবেন। অথবা হযরত ইউসুফ আ.-কেই নিজেদের পথ থেকে সরিয়ে দেবেন। তাহলে সবকিছুরই অবসান ঘটে যাবে।
সেই ভাইদের হিংসাত্মক মনোভাবের ওপর অতিরিক্ত একটি চাবুক পড়লো। তা হলো, হযরত ইউসুফ আ. স্বপ্নে দেখলেন যে, এগারোটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্র তাঁর সামনে সিজদা করছে। হযরত ইয়াকুব আ. প্রিয়পুত্রের এই স্বপ্ন-সংবাদ শুনে তাঁকে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন, তুমি এই স্বপ্ন দ্বিতীয়বার কারো সামনে বর্ণনা করো না। এমন না হয় যে, তা শুনে তোমার ভাইয়েরা তোমার প্রতি দুর্ব্যবহার শুরু করে দেয়। কেননা, শয়তান সবসময় মানুষের পেছনে লেগে আছে আর তোমার স্বপ্নের ফল অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কার।
পবিত্র কুরআন এই ঘটনাটি ব্যক্ত করেছে এভাবে- إِذْ قَالَ يُوسُفُ لأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْ كَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ () قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ () وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَى أَبَوَيْكَ مِنْ قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
'স্মরণ করো, যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলো, 'হে আমার পিতা, আমি তো দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্রকে, দেখেছি তাদেরকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায়।' সে বললো, 'হে আমার বৎস, তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না; করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। এভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (স্বপ্নফল বর্ণনা) শিক্ষা দেবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তা (নবুওতের
নেয়ামত) পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪-৬] এখানে তাওরাত ও কুরআন মাজিদের বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য ও বিরোধ পরিলক্ষিত হয়।
ক. পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে, হযরত ইউসুফ আ. যখন নিজের স্বপ্ন হযরত ইয়াকুব আ.-কে শুনিয়েছিলেন, তখন ওখানে তাঁর অন্য ভাইয়েরা উপস্থিত ছিলেন না। আর তাওরাত বলে, এ-ব্যাপারটি ইউসুফ আ.-এর ভাইদের উপস্থিতিতেই ঘটেছিলো।
খ. কুরআন বলছে যে, হযরত ইয়াকুব আ. এই স্বপ্নের কথা শুনে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রতি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁকে নবুয়ত ও আল্লাহ প্রদত্ত ইলমের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তাওরাত বলছে, ইয়াকুব আ. এই স্বপ্নের কথা শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এই স্বপ্ন-বর্ণনায় তোমার উদ্দেশ্য হয়তো এই যে, আমি ও তোমার মা এবং তোমার ভাইয়েরা তোমার সামনে সিজদায় পতিত হই।
ঘটনাবলির এই পর্যায়ক্রমের প্রেক্ষিতে, যা সামনে গিয়ে পবিত্র কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনায় ঐক্যরূপ ধারণ করে, এটা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, পবিত্র কুরআনের বর্ণনাই সঠিক ও সত্য। তা ছাড়া স্বভাবগত চাহিদা এটাই দাবি করে যে, ইউসুফ আ. নিজের এই স্বপ্নটিকে ভাইদের থেকে আলাদা হয়ে বর্ণনা করেন এবং হযরত ইয়াকুব আ. পুত্রের এই স্বপ্ন শুনে আনন্দিত হন। কেননা, সব পিতাই আপন সন্তানের পদোন্নতি ও মর্যাদার উচ্চতা কামনা করেন। বিশেষ করে, হযরত ইয়াকুব আ. নবী হওয়ার কারণে স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ইউসুফ আ.-এর জন্য যে-উচ্চ মর্যাদা দেখছিলেন তা শত-সহস্র সুখ ও আনন্দের কারণ ছিলো। মনঃকষ্ট ও দুঃখের কারণ নয়।
অবশেষে একদিন হিংসার প্রজ্জ্বলিত আগুন হযরত ইউসুফ আ.-এর ভাইদেরকে ইউসুফ আ.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে বাধ্যই করে ছাড়ালো। পবিত্র কুরআন তা বর্ণনা করছে এইভাবে-
لَقَدْ كَانَ فِي يُوسُفَ وَإِخْوَتِهِ آيَاتٌ لِلسَّائِلِينَ () إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ () اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ
أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِنْ بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ () قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَالْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ 'ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
স্মরণ করো, তারা বলেছিলো, 'আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ ও তার ভাই- ই (বিনইয়ামিন আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে। তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো স্থানে (দূরদেশে) ফেলে আসো, ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি কেবল তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে (তাঁর মনোযোগ কেবল তোমাদের প্রতিই নিবদ্ধ হবে) এবং তারপর তোমরা ভালো মানুষ হয়ে যাবে।' তাদের মধ্যে একজন বললো, 'তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো না এবং যদি কিছু করতেই চাও তবে তাকে কোনো কূপের গভীরে নিক্ষেপ করো, যাত্রীদলের কেউ (কোনো পথিক) তাকে তুলে নিয়ে যাবে।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৭-১০।
এই পরামর্শের পর তাঁরা সবাই একত্র হযরত ইয়াকুব আ.-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। তাঁরা তাঁদের পিতাকে বললেন, আপনি ইউসুফকে আমাদের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে পাঠান না কেনো? আমাদের ওপর কি আপনার বিশ্বাস নেই। তার সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অধিক সংহত আর কে হতে পারে?
قَالُوا يَا أَبَانَا مَا لَكَ لَا تَأْمَنَّا عَلَى يُوسُفَ وَإِنَّا لَهُ لَنَاصِحُونَ () أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (سورة يوسف) 'তারা এসে বললো, 'হে আমাদের পিতা, ইউসুফের ব্যাপারে তুমি আমাদের বিশ্বাস করছো না কেনো, অথচ আমরা তো তার শুভাকাঙ্ক্ষী? তুমি আগামীকাল তাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ করো, সে তৃপ্তিসহকারে খাবে এবং খেলাধুলা করবে। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করবো।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ১১-১২।
হযরত ইয়াকুব আ. বুঝতে পারলেন তাঁদের মনে দূরভিসন্ধি রয়েছে। তাঁরা হযরত ইউসুফের অনিষ্ট সাধনের জন্য পেছনে লেগেছেন। কিন্তু তিনি পরিষ্কার কথায় তাঁর সে মনোভাব প্রকাশ করলেন না। কেননা, তাতে তাঁর পুত্ররা বিগড়ে গিয়ে ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে প্রকাশ্য শত্রুতা করতে হয়তো যেত। আর তিনি এটাও ভাবলেন যে, ইশারা-ইঙ্গিত করলে হয়তো তাঁরা নিজেদের অত্যাচারী ষড়যন্ত্র থেকে বিরত হতে পারেন। কাজেই তিনি ইঙ্গিতে তাঁদের সামনে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে দিলেন, বাস্তবিকই তিনি ইউসুফের ব্যাপারে তোমাদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করছি। পবিত্র কুরআনে তা ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে—
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَن تَذْهَبُواْ بِهِ وَأَخَافُ أَن يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ (সূরা ইউসুফ)
‘সে (ইয়াকুব) বললো, ‘এটা আমাকে কষ্ট দেয় (দুঃখিত ও চিন্তান্বিত করে) যে, তোমরা তাকে (তোমাদের সঙ্গে) নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী (অসতর্ক) থাকবে।’ [সূরা ইউসুফ: আয়াত ১৩] ইয়াকুব আ.-এর এ-কথা শুনে ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা সম্বন্ধে বলে উঠলো—
لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَّخَاسِرُونَ (সূরা ইউসুফ)
‘আমরা একটি সংঘবদ্ধ দল হওয়া সত্ত্বেও তাকে যদি নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তই হবো। (আমরা তো তাহলে সবকিছুই হারালাম।) [সূরা ইউসুফ: আয়াত ১৪] এ-জায়গায় তাওরাতের বর্ণনা এই যে, হযরত ইয়াকুব আ. নিজেই নিজের অধীনে ইউসুফ আ.-কে তাঁর ভাইদের সঙ্গে ময়দানে খেলাধুলা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো তাওরাতের এই বর্ণনাকে ভুল প্রমাণ করছে।

টিকাঃ
১. এখানে احادیث স্বপ-বৃত্তান্ত বোঝানো হচ্ছে।
২. হযরত ইউসুফ আ. ও তাঁর ছোটভাই বিনইয়ামিন শৈশবে মাতৃহারা হওয়ায় ইয়াকুব আ. তাদেরকে অধিক স্নেহ করতেন। তা ছাড়া ইউসুফের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আল্লাহ তাঁকে অবহিত করেছিলেন। এ-কারণে তিনি ইউসুফের লালন-পালনের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কিনআনের কূপ

📄 কিনআনের কূপ


মোটকথা, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা মাঠে খেলাধুলা করার বাহানা ইউসুফ আ.-কে মাঠে নিয়ে গেলেন। পূর্বের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা তাঁকে এমন একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলেন যাতে পানি ছিলো না। তা দীর্ঘকাল শুষ্ক অবস্থায় ছিলো। ভাইয়েরা বাড়িতে ফেরার সময় ইউসুফ আ.-এর জামায় কোনো জন্তুর রক্ত মাখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হযরত ইয়াকুব আ.-এর কাছে এসে বললেন, আব্বা, আপনাকে আমাদের সত্যতা বিশ্বাস করানোর জন্য যতই চেষ্টা করি না কেনো, আপনি কখনো তা বিশ্বাস করবেন না। আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতায় একে অন্যের আগে গন্তব্যস্থানে পৌছানোর চেষ্টায় মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো।
হযরত ইয়াকুব আ. ইউসুফ আ.-এর জামাটি দেখলেন। তাতে রক্ত মাখানো আছে ঠিকই; কিন্তু কোথাও কোনে ছেঁড়া ছিলো না। কিংবা জামার আঁচলও ফাঁড়া ছিলো না। ইয়াকুব আ. সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারলেন। কিন্তু তাঁদেরকে ধমক দেয়া বা তিরস্কার করা, নিন্দা করা, ঘৃণা করা বা অপদস্থ করা—কিছুই করলেন না। বরং তিনি নবীসুলভ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি, ধৈর্য ও মার্জনার সুরে বললেন, প্রকৃত অবস্থা গোপন করার চেষ্টা সত্ত্বেও তোমরা তা গোপন করতে পারো নি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— وَجَاءُوا عَلَى قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ (سورة يوسف) 'তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিলো। সে (ইয়াকুব) বললো, 'না, (তোমরা যা বলছো তা কখনোই নয়) তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছো, সে-বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (তাঁর কাছেই আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ১৮।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইউসুফ আ. ও দাসত্ব

📄 ইউসুফ আ. ও দাসত্ব


এখানে পিতা ও পুত্রদের মধ্যে এ-ধরনের কথাবার্তা চলছিলো আর ওদিকে হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে ভিন্ন ঘটনা ঘটলো। হেজাযের ইসমাইলি
বংশের একটি কাফেলা শাম (সিরিয়া) থেকে দুগন্ধি-দ্রব্যাদি, সজ-মসলা ইত্যাদি বোঝাই করে মিসরে যাচ্ছিলো। কূপ দেখে তারা পানির জন্য বালতি ফেললো। ইউসুফ আ. মনে করলেন, হয়তো ভাইদের অন্তরে দয়ার সঞ্চার হয়েছে। কাজেই তিনি বালতি ধরে লটকে থাকলেন। বণিকগণ বালতি উঠিয়ে ইউসুফ আ.-কে দেখেই চিৎকার করে বলে উঠলো-
يَا بُشْرَى هَذَا غُلَامٌ
'কী সুখবর! এ যে এক কিশোর! (আমাদের হস্তগত হলো!)
তাওরাতে বর্ণিত আছে, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা যখন ইসমাইলি কাফেলাকে দেখলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন যে, ইউসুফকে কূপ থেকে উঠিয়ে এই বণিকদের কাছে বিক্রি করে ফেলো। কিন্তু এর আগেই ইসমাইলি বণিকরা ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে বের করে তাদের দাস বানিয়ে ফেলেছে। আর জ্যেষ্ঠ ভাই রাওবিন যখন কূপের কাছে পৌছে দেখতে পেলেন যে ইউসুফ ওখানে নেই, কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলেন। রাওবিনকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন ইয়াহুদা। রাওবিন প্রথম থেকেই এই ধারণায় ছিলেন যে, ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে বের করে এনে চুপে চুপে পিতার হাতে সোপর্দ করে দেবেন। এ-কারণেই তিনি ইউসুফকে হত্যা করে ফেলার ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন।
এখানে কোনো কোনো মুফাস্সির লিখেছেন যে, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরাই তাঁকে কূপ থেকে বের করে ইসমাইলি বণিক কাফেলার কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুফাস্সিসরিনের এই বক্তব্যের সঙ্গে পবিত্র কুরআনও একমত নয়, তাওরাতও একমত নয়; বরং উভয়ের বর্ণনার দ্বারা এটাই বোঝা যায় যে, কাফেলার বণিকেরাই ইউসুফ আ.-কে কূপ থেকে উত্তোলন করে তাদের দাস বানিয়ে নিয়েছিলো।
একইভাবে বিখ্যাতগ্রন্থ 'কাসাসুল আম্বিয়া'র সংকলক তাওরাতের উপরিউক্ত বর্ণনায় আলোচ্য কাফেলা সম্পর্কে ভুল বুঝেছেন। তা এই যে, তিনি তাদেরকে ইসমাইলি ও মাদয়ানি দুটি ভিন্ন ভিন্ন কাফেলা মনে করেছেন। অথচ এটা ঠিক নয়। বরং বিষয় এই যে, এই কাফেলাটিই ছিলো শাম থেকে
মিসর গমনকারী কাফেলা। তারা বংশগত দিক থেকে ইসমাইলি এবং দেশের হিসেবে মাদয়ানি' ছিলো।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইউসুফ আ. মিসরে

📄 হযরত ইউসুফ আ. মিসরে


খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বছর পূর্বে মিসরকে সংস্কৃতি ও সভ্যতার কেন্দ্রভূমি মনে করা হতো। ওখানকার শাসক ছিলো আমালিকা গোত্রের হিকসুস। যেসময় হযরত ইউসুফ আ. কিনআন থেকে যাযাবর জাতির ক্রীতদাস হয়ে মিসরে প্রবেশ করলেন, তখন মিসরের রাজধানী ছিলো রাআমাসিস। এটা খুব সম্ভব ওই স্থানে অবস্থিত ছিলো যেখানে আজ 'সান' নামক বসতিটি আবাদ রয়েছে। ভৌগলিক বিবরণ অনুযায়ী এই স্থানটি পুবদিকে নীলনদের কাছে বলে কথিত। ফুতিফার ছিলেন মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং এক মর্যাদাবান গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি ঘুরতে বের হয়ে মিসরের বাজারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ-সময় ইউসুফ আ.-এর প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে। তিনি অতি সাধারণ মূল্যে তাঁকে ক্রয় করে নেন।
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে যে, মিসরীয়রা তৎকালে নিজেদেরকে বিশ্বের সেরা সুসভ্য ও সংস্কৃতিবান জাতি বলে মনে করতো। তারা মরুবাসী যাযাবর গোত্রগুলোকে অত্যন্ত হীন ও তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতো। নিজেদের শহরে তাদের সঙ্গে অস্পৃশ্যের মতো ব্যবহার করতো। এই গোত্রগুলোর মধ্যেই একটি গোত্র ইবরাহিমি বংশের স্মারক হয়ে কিনআনে বসবাস করতো। কিনআনে শহুরে পরিবেশ এবং স্থায়ী অধিবাসের নামচিহ্ন পর্যন্ত ছিলো না। শিকারের ওপর তাদের জীবনযাপন নির্ভর করতো। খড়ের ছাউনিযুক্ত ছোট ছোট কুটিরে তারা বসবাস করতো। আর বকরি-ভেড়ার তাদের ধন-সম্পদ।
এমতাবস্থায় ইউসুফ আ.-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার অভাবনীয় কর্মকাণ্ড দেখুন। একজন গ্রামীণ মানুষ, তিনি আবার অল্প বয়স্ক ক্রীতদাস। তিনি একজন সুসভ্য, সংস্কৃতিবান, ধনাঢ্য ও আড়ম্বরপূর্ণ ব্যক্তির ঘরে ঠাঁই পান। তখন তিনি নিজের নিষ্পাপ জীবন, ধৈর্য ও গাম্ভীর্য, বিশ্বস্ততা এবং যোগ্যতার পবিত্র গুণাবলির বদৌলতে তাঁর প্রভুর চোখের জ্যোতি ও প্রাণের মালিক হয়ে ওঠেন। ফুতিফার তাঁর স্ত্রীকে বলেন, কুরআনের ভাষায়- أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَى أَنْ يَنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا
'এর থাকার সম্মানজনক ব্যবস্থা করো, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্ররূপেই গ্রহণ করতে পারি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)
এটা কী কারণে হলো? ইউসুফ আ.-এর মধ্যে এই পছন্দীয় চরিত্র ও স্বভাব কোথা থেকে এলো? একজন গ্রামীণ সন্তান কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন? একজন ক্রীতদাস কোন মুরব্বি থেকে এই পবিত্র স্বভাবের অধিকারী হলেন। এই প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআন জবাব দিচ্ছে- وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (سورة يوسف)
'সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হলো, আমি তাকে হেকমত ও জ্ঞান দান করলাম (মীমাংসার ক্ষমতা ও ইলম) এবং এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করি।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ২২)
যাইহোক। ফুতিফার হযরত ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে ক্রীতদাসের মতো আচার-ব্যবহার করেন নি; বরং আপন সন্তানের মতো সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাখলেন এবং নিজের জমিদারি, ধন-দৌলত ও গৃহজীবনের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাঁর ওপর সোপর্দ করে দিলেন। এটা যেনো কিনআনের একজন
পশুপালকের ওপর অদূর ভবিষ্যতে যে রাজ্য পরিচালনার ভার অর্পিত হবে তারই সূচনা। এজন্যই আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَكَذَلِكَ مَكَّنَا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِمَهُ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَى أَمْرِهِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (سورة يوسف)
'এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সে-দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবার জন্য। আল্লাহ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অবগত নয়।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ২১)

টিকাঃ
১. ° হিজাযি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00