📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 পবিত্র কুরআনে হযরত ইউসুফ আ.-এর উল্লেখ

📄 পবিত্র কুরআনে হযরত ইউসুফ আ.-এর উল্লেখ


পবিত্র কুরআন হযরত ইউসুফ আ.-এর নাম ছাব্বিশ বার উল্লেখ করেছে। তার মধ্যে চব্বিশ বার কেবল সুরা ইউসুফে, এক জায়গায় সুরা আনআমে এবং এক স্থানে সুরা মুমিনুনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর তিনি এই গৌরবও অর্জন করেছেন যে, তাঁর প্রপিতামহ হযরত ইবরাহিম আ.-এর মতো তাঁর নামেও পবিত্র কুরআনে একটি সুরা (সুরা ইউসুফ) নাযিল হয়েছে। এতে হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনাবলি সম্পর্কে অনেক নসিহত ও উপদেশের সমাবেশ ঘটেছে।
সুরা সুরার নাম আয়াত ৬. সুরা আনআম ৮৪ ১২ সুরা ইউসুফ ৪,৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১৭, ২১, ২৯, ৪৬, ৫১, ৫৬, ৫৮, ৬৯, ৭৩, ৭৬, সুরা সুরার নাম আয়াত ৮০, ৮৪, ৮৫, ৮৭, ৮৯, ৯০, ৯৪, ৯৯ ৪০ সুরা মুমিনুন ৩৪

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 সূরা ইউসুফ

📄 সূরা ইউসুফ


পবিত্র কুরআন সুরা ইউসুফের ঘটনাকে 'আহসানুল কাসাস' বলেছে। কারণ এই একটি ঘটনায় যে-পরিমাণ উপদেশ রয়েছে, যে-পরিমাণ নসিহত, হেকমত ও ওয়াজ নিহিত রয়েছে, অন্যকোনো সুরায় একই স্থানে তা এতবেশি পরিমাণে নেই। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনাটি তার নিজের বৈশিষ্ট্যের কারণে এক বিচিত্র ও চিত্তাকর্ষক কাহিনি এবং কালের উত্থান-পতনের একটি জ্বলন্ত স্মৃতি। এই একজনমাত্র ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বহু সম্প্রদায়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া এবং বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া, পতন ও উত্থানের এমন একটি সবাক চিত্র, যা কোনো ব্যাখ্যা ও বিস্তারিত বর্ণনার মুখাপেক্ষী নয়। এটা যাযাবর গোত্রে এমন এক অদ্বিতীয় ও অমূল্য মুক্তার বিস্ময়কর ইতিহাস, আল্লাহ তাআলার অসীম শক্তির অলৌকিকতা যাঁকে সেকালের বড় বড় সত্য জাতির পথ প্রদর্শনের জন্য এবং তাদের ওপর শাসকসুলভ ক্ষমতাপ্রয়োগের জন্য মনোনীত করেছে এবং নবুওতের মর্যাদা দান করেছে।
পবিত্র কুরআন তাওরাতের মতো কিচ্ছা-কাহিনি বর্ণনা অথবা ব্যক্তি ও জাতিসমূহের ঐতিহাসিক অবস্থাবলির আলেখ্যপুঞ্জ নয়; বরং কুরআন যে-ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বর্ণনা করে, তার সামনে একটিমাত্র উদ্দেশ্য থাকে, তা হলো উপদেশ ও নসিহত।
হযরত ইউসুফ আ.-এর ঘটনায় অনুপম ও তুলনাহীন উপদেশ ও শিক্ষা নিহিত আছে। যেমন: সৎপথ প্রদর্শন ও হেদায়েতের গুরুত্ব, পরীক্ষা ও দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে ধৈর্য ও দৃঢ়তা, আল্লাহ আদেশ-নিষেধের প্রতি সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের দৃষ্টান্ত পেশ, ব্যক্তি ও জাতির উত্থান ও পতনের ঘটনাবলি, আল্লাহ তাআলার ইনসাফ ও রহমতের বৈচিত্র্যময় কর্মকাণ্ড, মানবসুলভ ত্রুটি-বিচ্যুতি ও পদস্খলন, তার পরিণতি ও পরিণাম, নিষ্পাপতা ও সংযমের বিস্ময়কর ক্রিয়াশীলতা ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে তা 'আহসানুল কাসাস' (সর্বোত্তম কাহিনি) এবং অতীত গ্রন্থরাশির এমন সুন্দর পৃষ্ঠা যা নিজের সৌন্দর্যে অদ্বিতীয় ও একক বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
পবিত্র কুরআন বলছে— الٓرٰ تِلْكَ اٰيٰتُ الْكِتٰبِ الْمُبِيْنِ (ۚ) إِنَّا أَنْزَلْنٰهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُوْنَ (ۚ) نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هٰذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِيْنَ (سورة يوسف)
'আলিফ-লাম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত। আমি অবশ্যই অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায় কুরআনরূপে, যাতে তোমরা তা বুঝতে পারো। আমি তোমার কাছে উত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি, ওহীর মাধ্যমে তোমার কাছে এই কুরআন প্রেরণ করে; যদিও এর পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।' (সূরা ইউসুফ : আয়াত ১-২)
সূরা ইউসুফের শানে-নুযুল সম্পর্কে হাদিসের রেওয়ায়েতসমূহ এবং মুফাসসির উলামায়ে কেরামের উক্তিসমূহের সারমর্ম এই, মক্কা কাফেররা একবার রাসুল কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ইহুদিদের সঙ্গে আলোচনা করলো যে, আমরা তো এই ব্যক্তির ব্যাপারে অস্থির ও অপারগ হয়ে পড়লাম। (আমাদেরকে কিছু পরামর্শ দিন।) এ-কথা শুনে ইহুদিরা তাদেরকে বললো, নবুওতের দাবিদার এই লোকটিকে কিতাব থেকে উজাড় করা গনি তোমরা তাকে এই প্রশ্ন করো যে, ইয়াকুব আ.-এর সন্তান-সন্ততি শাম (সিরিয়া) থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মিসরে গেলো কেনো? আর ইউসুফ আ.-সম্পর্কিত ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ কী? এই ব্যক্তি সত্যিকারের নবী না হলে কখনো এসব জিজ্ঞাসার জবাব দিতে পারবে না।
মক্কার কাফেররা ইহুদিদের পরামর্শ অনুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই দুটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলো। তিনি আল্লাহর ওহীর মাধ্যমে তাদেরকে সবকিছু শুনিয়ে দিলেন, যা সূরা ইউসুফে বর্ণিত আছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন এবং ইউসুফ আ.-এর ভাইগণ

📄 হযরত ইউসুফ আ.-এর স্বপ্ন এবং ইউসুফ আ.-এর ভাইগণ


এই ঘটনাগুলোর সারমর্ম এই যে, হযরত ইয়াকুব আ. নিজের সব সন্তান-সন্ততির মধ্যে হযরত ইউসুফ আ.-কে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন। তাই হযরত ইউসুফের প্রতি হযরত ইয়াকুব আ.-এর প্রেমমিশ্রিত ঈর্ষক ও মুহাকাতও ইউসুফ আ.-এর ভাইদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও অসহনীয় ছিল এবং
তাঁরা সবসময় এই ভাবনাতেই নিরত থাকতেন যে, হয়তো তাঁরা ইয়াকুব আ.-এর হৃদয় থেকে এই ভালোবাসা দূর করে দিতে পারবেন। অথবা হযরত ইউসুফ আ.-কেই নিজেদের পথ থেকে সরিয়ে দেবেন। তাহলে সবকিছুরই অবসান ঘটে যাবে।
সেই ভাইদের হিংসাত্মক মনোভাবের ওপর অতিরিক্ত একটি চাবুক পড়লো। তা হলো, হযরত ইউসুফ আ. স্বপ্নে দেখলেন যে, এগারোটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্র তাঁর সামনে সিজদা করছে। হযরত ইয়াকুব আ. প্রিয়পুত্রের এই স্বপ্ন-সংবাদ শুনে তাঁকে কঠোরভাবে নিষেধ করে দিলেন, তুমি এই স্বপ্ন দ্বিতীয়বার কারো সামনে বর্ণনা করো না। এমন না হয় যে, তা শুনে তোমার ভাইয়েরা তোমার প্রতি দুর্ব্যবহার শুরু করে দেয়। কেননা, শয়তান সবসময় মানুষের পেছনে লেগে আছে আর তোমার স্বপ্নের ফল অত্যন্ত স্পষ্ট ও পরিষ্কার।
পবিত্র কুরআন এই ঘটনাটি ব্যক্ত করেছে এভাবে- إِذْ قَالَ يُوسُفُ لأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْ كَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ () قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوٌّ مُبِينٌ () وَكَذَلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِنْ تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَى آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَى أَبَوَيْكَ مِنْ قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
'স্মরণ করো, যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিলো, 'হে আমার পিতা, আমি তো দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্রকে, দেখেছি তাদেরকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায়।' সে বললো, 'হে আমার বৎস, তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না; করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। এভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা (স্বপ্নফল বর্ণনা) শিক্ষা দেবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তা (নবুওতের
নেয়ামত) পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪-৬] এখানে তাওরাত ও কুরআন মাজিদের বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য ও বিরোধ পরিলক্ষিত হয়।
ক. পবিত্র কুরআন বর্ণনা করছে, হযরত ইউসুফ আ. যখন নিজের স্বপ্ন হযরত ইয়াকুব আ.-কে শুনিয়েছিলেন, তখন ওখানে তাঁর অন্য ভাইয়েরা উপস্থিত ছিলেন না। আর তাওরাত বলে, এ-ব্যাপারটি ইউসুফ আ.-এর ভাইদের উপস্থিতিতেই ঘটেছিলো।
খ. কুরআন বলছে যে, হযরত ইয়াকুব আ. এই স্বপ্নের কথা শুনে হযরত ইউসুফ আ.-এর প্রতি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁকে নবুয়ত ও আল্লাহ প্রদত্ত ইলমের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন। কিন্তু তাওরাত বলছে, ইয়াকুব আ. এই স্বপ্নের কথা শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এই স্বপ্ন-বর্ণনায় তোমার উদ্দেশ্য হয়তো এই যে, আমি ও তোমার মা এবং তোমার ভাইয়েরা তোমার সামনে সিজদায় পতিত হই।
ঘটনাবলির এই পর্যায়ক্রমের প্রেক্ষিতে, যা সামনে গিয়ে পবিত্র কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনায় ঐক্যরূপ ধারণ করে, এটা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, পবিত্র কুরআনের বর্ণনাই সঠিক ও সত্য। তা ছাড়া স্বভাবগত চাহিদা এটাই দাবি করে যে, ইউসুফ আ. নিজের এই স্বপ্নটিকে ভাইদের থেকে আলাদা হয়ে বর্ণনা করেন এবং হযরত ইয়াকুব আ. পুত্রের এই স্বপ্ন শুনে আনন্দিত হন। কেননা, সব পিতাই আপন সন্তানের পদোন্নতি ও মর্যাদার উচ্চতা কামনা করেন। বিশেষ করে, হযরত ইয়াকুব আ. নবী হওয়ার কারণে স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ইউসুফ আ.-এর জন্য যে-উচ্চ মর্যাদা দেখছিলেন তা শত-সহস্র সুখ ও আনন্দের কারণ ছিলো। মনঃকষ্ট ও দুঃখের কারণ নয়।
অবশেষে একদিন হিংসার প্রজ্জ্বলিত আগুন হযরত ইউসুফ আ.-এর ভাইদেরকে ইউসুফ আ.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে বাধ্যই করে ছাড়ালো। পবিত্র কুরআন তা বর্ণনা করছে এইভাবে-
لَقَدْ كَانَ فِي يُوسُفَ وَإِخْوَتِهِ آيَاتٌ لِلسَّائِلِينَ () إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَى أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ () اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ
أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِنْ بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ () قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَالْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ 'ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।
স্মরণ করো, তারা বলেছিলো, 'আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ ও তার ভাই- ই (বিনইয়ামিন আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে। তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো স্থানে (দূরদেশে) ফেলে আসো, ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি কেবল তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে (তাঁর মনোযোগ কেবল তোমাদের প্রতিই নিবদ্ধ হবে) এবং তারপর তোমরা ভালো মানুষ হয়ে যাবে।' তাদের মধ্যে একজন বললো, 'তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো না এবং যদি কিছু করতেই চাও তবে তাকে কোনো কূপের গভীরে নিক্ষেপ করো, যাত্রীদলের কেউ (কোনো পথিক) তাকে তুলে নিয়ে যাবে।' (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৭-১০।
এই পরামর্শের পর তাঁরা সবাই একত্র হযরত ইয়াকুব আ.-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। তাঁরা তাঁদের পিতাকে বললেন, আপনি ইউসুফকে আমাদের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে পাঠান না কেনো? আমাদের ওপর কি আপনার বিশ্বাস নেই। তার সংরক্ষণের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অধিক সংহত আর কে হতে পারে?
قَالُوا يَا أَبَانَا مَا لَكَ لَا تَأْمَنَّا عَلَى يُوسُفَ وَإِنَّا لَهُ لَنَاصِحُونَ () أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ (سورة يوسف) 'তারা এসে বললো, 'হে আমাদের পিতা, ইউসুফের ব্যাপারে তুমি আমাদের বিশ্বাস করছো না কেনো, অথচ আমরা তো তার শুভাকাঙ্ক্ষী? তুমি আগামীকাল তাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ করো, সে তৃপ্তিসহকারে খাবে এবং খেলাধুলা করবে। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করবো।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ১১-১২।
হযরত ইয়াকুব আ. বুঝতে পারলেন তাঁদের মনে দূরভিসন্ধি রয়েছে। তাঁরা হযরত ইউসুফের অনিষ্ট সাধনের জন্য পেছনে লেগেছেন। কিন্তু তিনি পরিষ্কার কথায় তাঁর সে মনোভাব প্রকাশ করলেন না। কেননা, তাতে তাঁর পুত্ররা বিগড়ে গিয়ে ইউসুফ আ.-এর সঙ্গে প্রকাশ্য শত্রুতা করতে হয়তো যেত। আর তিনি এটাও ভাবলেন যে, ইশারা-ইঙ্গিত করলে হয়তো তাঁরা নিজেদের অত্যাচারী ষড়যন্ত্র থেকে বিরত হতে পারেন। কাজেই তিনি ইঙ্গিতে তাঁদের সামনে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে দিলেন, বাস্তবিকই তিনি ইউসুফের ব্যাপারে তোমাদের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করছি। পবিত্র কুরআনে তা ব্যক্ত করা হয়েছে এভাবে—
قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَن تَذْهَبُواْ بِهِ وَأَخَافُ أَن يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ (সূরা ইউসুফ)
‘সে (ইয়াকুব) বললো, ‘এটা আমাকে কষ্ট দেয় (দুঃখিত ও চিন্তান্বিত করে) যে, তোমরা তাকে (তোমাদের সঙ্গে) নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী (অসতর্ক) থাকবে।’ [সূরা ইউসুফ: আয়াত ১৩] ইয়াকুব আ.-এর এ-কথা শুনে ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা সম্বন্ধে বলে উঠলো—
لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَّخَاسِرُونَ (সূরা ইউসুফ)
‘আমরা একটি সংঘবদ্ধ দল হওয়া সত্ত্বেও তাকে যদি নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তই হবো। (আমরা তো তাহলে সবকিছুই হারালাম।) [সূরা ইউসুফ: আয়াত ১৪] এ-জায়গায় তাওরাতের বর্ণনা এই যে, হযরত ইয়াকুব আ. নিজেই নিজের অধীনে ইউসুফ আ.-কে তাঁর ভাইদের সঙ্গে ময়দানে খেলাধুলা করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাগুলো তাওরাতের এই বর্ণনাকে ভুল প্রমাণ করছে।

টিকাঃ
১. এখানে احادیث স্বপ-বৃত্তান্ত বোঝানো হচ্ছে।
২. হযরত ইউসুফ আ. ও তাঁর ছোটভাই বিনইয়ামিন শৈশবে মাতৃহারা হওয়ায় ইয়াকুব আ. তাদেরকে অধিক স্নেহ করতেন। তা ছাড়া ইউসুফের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আল্লাহ তাঁকে অবহিত করেছিলেন। এ-কারণে তিনি ইউসুফের লালন-পালনের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কিনআনের কূপ

📄 কিনআনের কূপ


মোটকথা, ইউসুফ আ.-এর ভাইয়েরা মাঠে খেলাধুলা করার বাহানা ইউসুফ আ.-কে মাঠে নিয়ে গেলেন। পূর্বের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা তাঁকে এমন একটি কূপের মধ্যে ফেলে দিলেন যাতে পানি ছিলো না। তা দীর্ঘকাল শুষ্ক অবস্থায় ছিলো। ভাইয়েরা বাড়িতে ফেরার সময় ইউসুফ আ.-এর জামায় কোনো জন্তুর রক্ত মাখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হযরত ইয়াকুব আ.-এর কাছে এসে বললেন, আব্বা, আপনাকে আমাদের সত্যতা বিশ্বাস করানোর জন্য যতই চেষ্টা করি না কেনো, আপনি কখনো তা বিশ্বাস করবেন না। আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতায় একে অন্যের আগে গন্তব্যস্থানে পৌছানোর চেষ্টায় মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ একটি নেকড়ে বাঘ এসে ইউসুফকে উঠিয়ে নিয়ে গেলো।
হযরত ইয়াকুব আ. ইউসুফ আ.-এর জামাটি দেখলেন। তাতে রক্ত মাখানো আছে ঠিকই; কিন্তু কোথাও কোনে ছেঁড়া ছিলো না। কিংবা জামার আঁচলও ফাঁড়া ছিলো না। ইয়াকুব আ. সঙ্গে সঙ্গেই প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারলেন। কিন্তু তাঁদেরকে ধমক দেয়া বা তিরস্কার করা, নিন্দা করা, ঘৃণা করা বা অপদস্থ করা—কিছুই করলেন না। বরং তিনি নবীসুলভ জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি, ধৈর্য ও মার্জনার সুরে বললেন, প্রকৃত অবস্থা গোপন করার চেষ্টা সত্ত্বেও তোমরা তা গোপন করতে পারো নি।
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে— وَجَاءُوا عَلَى قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنْفُسُكُمْ أَمْرًا فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ (سورة يوسف) 'তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিলো। সে (ইয়াকুব) বললো, 'না, (তোমরা যা বলছো তা কখনোই নয়) তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়। তোমরা যা বলছো, সে-বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (তাঁর কাছেই আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।' [সুরা ইউসুফ: আয়াত ১৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00