📄 আলোচ্য ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত
এক. মানুষ যখন জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে কোনো আকিদা বা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে নেয় এবং তা তার অন্তরে দৃঢ়মূল হয়ে তার আত্মার সঙ্গে মিশে যায় এবং তার বুকের মধ্যে পাথরে খোদাই করার মতো কঠিনভাবে খোদিত হয়ে যায়, তখন তার চিন্তা ও কল্পনা, তার ভাবনা ও বিবেচনা এবং ওই বিশ্বাসে তার নিমজ্জিত থাকা এমন স্তরের শক্তিশালী ও দৃঢ় হয়ে ওঠে যে, বিশ্বের কোনো আকস্মিক ঘটনা, কোনো কঠিন থেকে কঠিন বিপদও তাকে তার স্থান থেকে নড়াতে পারে না। সে ওই বিশ্বাসের জন্য নিশ্চিত মনে আগুনে লাফিয়ে পড়ে, বিনা দ্বিধায় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্ভয়ে শূলিকাষ্ঠে চড়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এ-ব্যাপারে হযরত ইবরাহিম আ.-এর দৃঢ় সংকল্প ও অবিচলতার দৃষ্টান্ত একটি জীবন্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দুই. সত্যকে রক্ষা করার জন্য এমন প্রমাণ পেশ করা উচিত যা শত্রু এবং মিথ্যার পূজকের অন্তরে অন্তঃস্থলে পৌঁছে যায় এবং সে সত্যকে মুখে যদিও স্বীকার না করে, কিন্তু তার অন্তর সত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে যায়। বরং কোনো কোনো সময় মুখও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। কুরআন মাজিদের নিম্নোক্ত আয়াত এ-মূল তত্ত্বটিই ঘোষণা করছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
'তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করো উত্তম পন্থায়। [সুরা আন-নাহল : আয়াত ১২৫]
তিন. নবী ও রাসুলগণের কর্মপন্থা হলো, তাঁরা ঝগড়া ও বিতর্কে তর্কশাস্ত্রের পথ মাড়ান না। তাঁদের দলিল ও প্রমাণসমূহের ভিত্তি অনুভবগ্রাহ্য বস্তু এবং চাক্ষুষ দর্শনের ওপর হয়ে থাকে; অর্থাৎ সহজবোধ্য যুক্তি ও জ্ঞানের ওপর। হযরত ইবরাহিম আ.-এর কওমের জনসাধারণের সঙ্গে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজা সম্পর্কিত বিতর্ক এবং নমরুদের সঙ্গে বিতর্ক তার স্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রমাণ।
চার. কোনো সত্য বিষয়কে প্রমাণিত করার জন্য দলিলের মধ্যে বিরোধী পক্ষে বাতিল আকিদাকে কাল্পনিকভাবে মেনে নেয়া সেই বাতিল আকিদা ও মিথ্যাকে স্বীকার করে নেয়া নয়; বরং এটিকে 'শত্রু পক্ষকে পরাভূত করার জন্য সাময়িকভাবে বাতিলকে মেনে নেয়া' বা 'মাআরিয' বা 'পরোক্ষ ইঙ্গিত' বলা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রমাণ পেশ বিপক্ষকে নিজেদের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করে ছাড়ে। হযরত ইবরাহিম আ. জনসাধারণের সঙ্গে বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রমাণের এ-দিকটিই অবলম্বন করেছিলেন এবং তা মূর্তিপূজারীদেরকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলো যে, মূর্তি কোনো অবস্থাতেই শোনেও না, জবাবও দিতে পারে না।
পাঁচ. যদি কোনো মুসলমানের পিতা-মাতা উভয়ই মুশরিক হয় এবং কোনোক্রমেই শিরক থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের শিরকি জীবনের প্রতি অসন্তুষ্ট ও পৃথক থেকে তাদের সঙ্গে পার্থিব কর্মকাণ্ডে ও আচার-আচরণে এবং আখেরাতের উপদেশ ও নসিহতে সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। কঠোর ও কর্কশ ব্যবহার করা উচিত নয়। আযারের সঙ্গে হযরত ইবারিহম আ.-এর ব্যবহার এবং আবু তালেবের সঙ্গে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্মপদ্ধতি এ-বিষয়ে অকাট্য ও সুনিশ্চিত প্রমাণ।
ছয়. যদি মুমিনের অন্তর বিশুদ্ধ আকিদার ওপর নিশ্চিন্তে মুখ ও অন্তরের ঐক্যের সঙ্গে ঈমান রাখে; কিন্তু চাক্ষুষ দর্শন অনুভব করার জন্য কিংবা যথার্থ বিশ্বাসের স্তর লাভ করার উদ্দেশ্যে কোনো ঈমান ও বিশ্বাসের মাসআলাসমূহ প্রশ্ন ও অন্বেষণ পথ অবলম্বন করে এবং অন্তরের তৃপ্তির প্রার্থী হয়, তবে এই জিজ্ঞাসা সন্দেহ ও কুফর নয়; বরং প্রকৃত ঈমান। হযরত ইবরাহিম আ. জাবাতের মাধ্যমে এই তত্ত্ব পরিশুদ্ধ হয়ে যায়।
সাত. দস্তরখানের সম্প্রসারণ যদি লোক দেখানোর জন্য না হয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদার প্রেক্ষিতে অতিথিসেবায় অন্তরের আনন্দ ও চিত্তের প্রশান্তি লাভ হয়, তবে দানশীল স্বভাবগুলোর মধ্যে এটি খুবই ফলপ্রসূ বলে গণ্য হয় এবং তা ‘হৃদয়ের বদান্যতা’ বা ‘অন্তরের উদারতা’ নামে অভিহিত হয়।
এই মহাগুণটি হযরত ইবরাহিম আ.-এর আত্মার মৌলিক গুণে পরিণত হয়েছিল এবং এটা ছিলো তাঁর স্বভাবগত গুণ। অতিথি আপ্যায়ন, দস্ত রখানের সম্প্রসারণ এবং আগন্তুক অতিথিদেরকে সম্মান করা—এ জাতীয় গুণগুলো হযরত ইবরাহিম আ.-এর মধ্যে ‘উচ্চস্তরের দৃষ্টান্ত’-এর সীমা পর্যন্ত পৌঁছেছিলো।
কোনো কোনো কিতাবে হযরত ইবরাহিম আ.-এর অতিধিপ্রিয়তায়ের বিবরণ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। একবার হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর চিরন্তন অভ্যাস অনুযায়ী কোনো অতিথির অপেক্ষায় মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেননা, মেহমান ব্যতীত তাঁর দস্তর খানও বিছানো হতো না এবং তিনি আহারও গ্রহণ করতেন না। এ-সময় একজন অতি দুর্বল বৃদ্ধ লোককে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেলো। লোকটির কোমর বাঁকা হয়ে গিয়েছিলো এবং সে লাঠির ওপর ভর করে অনেক কষ্টে পথ চলছিলো। হযরত ইবরাহিম আ. লোকটির সামনে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁকে আনন্দের সঙ্গে সাহায্য করে নিয়ে এলেন। দস্তরখানা বিছানো হলো, খাদ্যদ্রব্য সাজানো হলো। আহারপর্ব শেষ হলে হযরত ইবরাহিম আ. বললেন, সেই একমাত্র প্রতিপালকের শোকর আদায় করো যিনি আমাদেরকে এসব নেয়ামত দান করেছেন। বৃদ্ধ লোকটি রাগান্বিত হয়ে বললো, তোমার একমাত্র প্রতিপালক কে? তাকে আমি চিনি না। আমি আমার মা'বুদের (মূর্তির) শোকর আদায় করে থাকি। তা আমার গৃহে রক্ষিত আছে। বৃদ্ধের এই জবাব হযরত ইবরাহিম আ.-এর মনে খুব কষ্ট দিলো। তিনি তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হযরত ইবরাহিম আ.-এর অন্তরে এই অশোভনীয় কাজের জন্য অনুশোচনার উদ্রেক হলো। তিনি ভাবলেন, যে-একমাত্র প্রতিপালকের শোকর আমি এই বৃদ্ধ লোকটির মাধ্যমে আদায় করাতে চেয়েছিলাম, তাঁর শান তো এই যে, তিনি এই বৃদ্ধকে তার দীর্ঘ আয়ুষ্কালব্যাপী অনবরত নানাবিধ নেয়ামত প্রদান করে আসছেন এবং তার মূর্তিপূজা ও কুফরের কারণে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে একবেলার জন্যও তার ওপর রিযিকের দরজা বন্ধ করে দেন নি। তবে আমার কি অধিকার ছিলো যে, সে আমার কথা অমান্য করা এবং আল্লাহর বাণী গ্রহণ না করার কারণে ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে আমার ঘর থেকে বের করে দিলাম।
এই ঘটনা ঐতিহাসিক বিচারে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, তা কিন্তু এই সত্যটি ঘোষণা করছে যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর বদান্যতা ও উদারতার ওই উচ্চতা-যা 'প্রকৃত উচ্চ দৃষ্টান্ত' পর্যন্ত পৌছেছিলো-ছিলো এক দৃষ্টান্ত এবং তা মানুষের মুখে মুখে প্রবাদ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। নিঃসন্দেহে তার এই চিন্তা ছিলো সত্যের পয়গাম এবং ইসলামের দাওয়াতে সর্বোত্তম আদর্শ।
আট. আল্লাহ তাআলা যেসব মহাপুরুষকে নিজের সত্য প্রচারের জন্য মনোনীত করে থাকেন তাঁদের সামনে আল্লাহর মুহাব্বত ও সততা ব্যতীত অন্যকোনো বস্তু অবশিষ্টই থাকে না। এ-কারণে প্রথম থেকেই তাঁদের মধ্যে এই যোগ্যতা প্রদান করা হয় যে, তাঁরা শৈশবকাল থেকে তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে উজ্জ্বলরূপে পরিদৃষ্ট হন এবং আল্লাহর রাস্তায় পরীক্ষা ও দুঃখ-দুর্দশাকে সহ্য করে ধৈর্য ও সন্তুষ্টির উত্তম আদর্শ স্থাপন করেন থাকেন। হযরত ইসমাইল আ.-এর ঘটনাটি এই বক্তব্যের প্রমাণের জন্য উপযুক্ত সাক্ষ্য এবং হাজার হাজার উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত।
নয়. হযরত লুত আ. যদিও হযরত ইবরাহিম আ.-এর ভাতিজা ছিলেন এবং তাঁর অনুগামীও ছিলেন, কিন্তু তিনি নবুওত লাভ করেছিলেন এবং তাঁকে আল্লাহ তাআলার দূত বানিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাই সাদুম ও আমুরায় সব ধরনের বিপদ এবং বিদেশে শত্রুদের কবলে নানা প্রকারের কষ্ট ভোগ সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেছেন। নিজের সম্মানিত চাচা ও খান্দানের সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা করতেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশাবলির সামনে সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের প্রমাণ দিয়েছেন। এটা সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের মাকাম।
📄 হযরত ইবরাহিম আ.-এর ইন্তিকাল
[হযরত ইবারহিম আ. বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতে বাধ্যর্কে উপনীত হলেন। তখন তিনি তাঁর পুত্রদেরকে আহ্বান করে বললেন, প্রিয় বৎসগণ, দয়াময় আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য ইসলামকে দীনরূপে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা মহান আল্লাহর অনুগত্য স্বীকার পূর্বে মৃত্যুবরণ করো না। সবসময় আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা রাখবে। বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে। বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার মানুষকে তাঁর আনুগত্যের প্রতি আকর্ষণ করে থাকেন। ধৈর্যহারা হলে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভে সক্ষম হয় না। সুতরাং তোমরা বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশার সময় ধৈর্য ধারণ করবে এবং কল্যাণ ও মঙ্গলের সময় আল্লাহর শোকর আদায় করবে।
অনন্তর একবার হযরত আযরাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-কাছে এলেন। ইবরাহিম আ. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আযরাইল, তুমি কি আমার প্রাণ বের করে নিয়ে যেতে এসেছো? আযরাইল আ. বললেন, হ্যাঁ। ইবরাহিম আ. তখন বললেন, তুমি আমার রবকে জিজ্ঞেস করো, কেউ কি কখনো প্রাণপ্রিয় বন্ধুর প্রাণ হরণ করে? তিনি যে আমার প্রাণ হরণের নির্দেশ দিয়েছেন? তৎক্ষণাৎ আযরাইলের প্রতি প্রত্যাদেশ হলো, তুমি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করো, সে কি কখনো এমন কথা শুনেছে যে, বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে বন্ধু তাতে অসম্মত হয়?
এ-কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আ.-এর মধ্যে এক অপূর্ব ভাবের উদয় হলো। তিনি আযরাইলকে বললেন, অতি সত্বর তোমার কর্তব্য পালন করো। আমি আমার রবের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আযরাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রাণ বের করে নিলেন। তখন ইবরাহিম আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো পঁচিশ বছর। তাঁর লাশ মুবারক জেরুজালেমে (বাইতুল মুকাদ্দাসে) সমাহিত করা হয়।
সংকলিত