📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কয়েকটি বিষয়

📄 কয়েকটি বিষয়


এক. উপরিউক্ত আয়াতসমূহে হযরত লুত আ.-এর এই বাক্যগুলো রয়েছে-
"এরা আমার কন্যা, তোমাদের জন্য এরা পবিত্র।" هَؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ
"একান্তই যদি তোমরা কিছু করতে চাও তবে আমার এই কন্যারা রয়েছে।" هَؤُلَاءِ بَنَاتِي إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ
অর্থাৎ হযরত লুত আ. তাঁর কওমের ভিড় ও চিৎকার এবং মেহমানদেরকে তাদের হাতে সোপর্দ করে দেয়ার দাবিতে অপারগ হয়ে বললেন, 'তোমরা এই মেহমানদের বিরক্ত করো না। যদি নফসের স্বাভাবিক কামনা পূর্ণ করতে চাও, তবে এই আমার কন্যাগণ বিদ্যমান রয়েছে, তারা তোমাদের জন্য পবিত্র।' হযরত লুত আ.-এর এ-কথার অর্থ কী? একজন নিষ্পাপ ও মর্যাদাবান মানুষ, যিনি আবার আল্লাহর নবীও, কেমন করে এটা পছন্দ করতে পারেন যে, তিনি নিজের নিষ্পাপ কন্যাদেরকে নির্লজ্জ ও অপবিত্র চরিত্রের মানুষদের সামনে পেশ করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে গবেষক উলামায়ে কেরام বিভিন্ন জবাব দিয়েছেন:
ক. হযরত লুত আ. একজন নবী। প্রত্যেক নবীই নিজ নিজ সম্প্রদায়ের পিতা হয়ে থাকেন। কওম মুসলমান হয়ে তাঁর অনুসারী হোক কিংবা তাঁকে অবিশ্বাস করে তাঁর থেকে বিমুখ এবং তাঁর অবাধ্যই থাকুক, উভয় অবস্থায় তারা সবাই তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বাসী অনুসারীরা উম্মতে ইজাবাত এবং অবিশ্বাসকারীরা উম্মতে দাওয়াত নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এ-কারণে উম্মতের সব সদস্যবৃন্দ আম্বিয়ায়ে কেরামের সন্তান-সন্ততি হয়ে থাকে। নবী ও রাসুল তাঁদের রুহানি অর্থাৎ আধ্যাত্মিক পিতা।
সুতরাং হযরত নুহ আ.-এর উদ্দেশ্য ছিলো এই, হে হতভাগার দল, তোমাদের ঘরে ঘরে এগুলো আমার কন্যা তোমাদের জীবনসঙ্গিনীরূপে রয়েছে এবং তোমাদের জন্য তারা বৈধ। তবে তোমরা তাদেরকে ছেড়ে এই অভিশপ্ত ও অপবিত্র কাজের ওপর হটকারিতা করছো কেনো? এমন করো না।
নাউযুবিল্লাহ, তাঁর উদ্দেশ্য এমন ছিলো না যে তিনি তাঁর নিজের ঔরসজাত কন্যাদেরকে লোকদের সামনে পরিবেশন করছেন।
খ. তাওরাত এবং অন্যান্য রেওয়ায়েতের মাধ্যমে জানা গেছে যে, মাত্র তিনজন ফেরেশতা হযরত ইবরাহিম আ.-কে ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ প্রদান করার পর লুত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য এসেছিলেন। সুতরাং এটা অসম্ভব যে, মাত্র তিনজনের উদ্দেশে গোটা বসতির সমস্ত মানুষ, যাদের সংখ্যা ছিলো হাজার হাজার, কামার্ত হয়ে দৌড়ে এসেছিলো।
বরং আসল কথা হলো এই, সেই কওমের দুইজন সরদার ছিলো। তারা দুজনেই লুত আ.-এর মেহমানদেরকে তলব করেছিলো। কওমের অবশিষ্ট লোকেরা তাদের সরদারকে এই অশ্লীল কুকর্মে সাহায্য করার জন্য ওখানে এসে একত্র হয়েছিলো। আর হযরত লুত আ.-এর দুই কন্যা ছিলেন অবিবাহিতা। তাই তিনি ওই দুই সরদারকে বুঝালেন যে, তোমরা তোমাদের এই অপবিত্র ও নিকৃষ্ট দাবি থেকে নিবৃত্ত হও। আমি আমার কন্য দুজনকে তোমাদের সঙ্গে বিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু তারা পরিষ্কার ভাষায় এই প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালো এবং বললো, লুত, তুমি জানো যে নারীদের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।
গ. হযরত লুত আ. নিঃসন্দেহে এই বাক্যটি তাঁর নিজের কন্যাদের সম্পর্কেই বলেছিলেন। কিন্তু তা সেই বুযুর্গ ব্যক্তির কথার মতো ছিলো যিনি কোনো লোককে অন্যায়ভাবে প্রহৃত হতে দেখে অত্যাচারী প্রহারকারীকে বললেন, ওকে মেরো না, তার পরিবর্তে আমাকে মারো। অথচ তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, সে কখনো এমন দুঃসাহস করবে না। কেননা, সে তাঁর চেয়ে কনিষ্ঠ কিংবা তাঁর অধীন। অতএব, ওই বুযুর্গের উদ্দেশ্য ছিলো যেমন জালিম প্রহারকারীকে লজ্জা ও শরম দেয়া, তেমনি হযরত লুত আ.-ও তাদেরকে লজ্জা ও শরম দেয়ার জন্য এবং তাদের অপরকর্মের ওপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত করার জন্য ওই বাক্যগুলো বলেছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, এই দুর্ভাগারা এদিকে আগ্রহও প্রকাশ করবে না এবং কাজেও তারা এমনটি করবে না। ইমাম রাযি, ইস্পাহানি, আবুস সাউদ এই ব্যাখ্যাকেই পছন্দ করেছেন। এটিই আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জারের অভিমত। কিন্তু আমার মতে প্রথম ব্যাখ্যাটি অধিক বিশুদ্ধ এবং গ্রহণযোগ্য। প্রথম ব্যাখ্যার ব্যাপারে আল্লামা আবদুল ওয়াহ্হাবের 'এই মতটি দুর্বল'-এমন কথা বলা ঠিক নয়। তাঁর যুক্তি হলো, এটা কেমন করে সম্ভব হতে পারে যে, হযরত লুত আ. ওইসব কাফের নারীকে নিজের কন্যা বলে স্বীকার করে নেন? আমার কথা হলো, তা এ-কারণে সম্ভব যে, আমি প্রথম জবাবেই বলে এসেছি, নবী নিষ্পাপ। নবী সমস্ত উম্মতের রুহানি পিতা হয়ে থাকেন, যাদের প্রতি তিনি প্রেরিত হয়েছেন। এটা একটি স্বতন্ত্র কথা যে, যেসব উম্মত নবীর প্রতি ঈমান আনে এবং তাঁর অনুসরণ করে, তাঁরা ওই নবীকে প্রদত্ত সৌভাগ্য ও কল্যাণ থেকে লাভবান হয়। আর যারা অবিশ্বাস করে তারা সেই সৌভাগ্য ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। তা ছাড়া বর্তমানেও এই প্রথা আছে যে, মুসলিম ও কাফের নির্বিশেষে মুরব্বি শ্রেণির মানুষেরা কমবয়স্ক বালিকাদেরকে 'কন্যা' বা 'বেটি' বলে থাকেন।
দুই. হযরত লুত আ. যখন দেখলেন তাঁর কওমের লোকেরা তাঁর মেহমানদের সঙ্গে দুশ্চরিত্রমূলক কাজের জন্য গোঁ ধরেছে, লজ্জা-শরম প্রদানে তাদের ওপর কোনো ক্রিয়াই হচ্ছে না এবং লজ্জা, মানবতা, আখলাক ও মনুষ্যত্বের নামে দোহাই দিয়েও কোনো ফল হচ্ছে না, তখন তিনি অস্থির চিত্তে বলে উঠলেন—
لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ
"তোমাদের ওপর যদি আমার শক্তি থাকতো অথবা আমি আশ্রয় নিতে পারতাম কোনো সুদৃঢ় স্তম্ভের! (কী ভালো হতো! যদি তোমাদের সঙ্গে মোকাবিলা করার শক্তি আমার থাকতো কিংবা কোনো মহাশক্তিমান আশ্রয়কেন্দ্রের আশ্রয় লাভ করতে পারতাম।)"
এখানে 'সুদৃঢ় স্তম্ভ' বা 'শক্তিমান আশ্রয়কেন্দ্র' বলতে তিনি কী উদ্দেশ্য করেছেন? হযরত লুত আ. কি (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ তাআলার অসীম ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতেন না? যার ফলে তিনি অপর কোনো শক্তিশালী আশ্রয়কেন্দ্রের আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন?
সহিহ বুখারির রেওয়ায়েত সুন্দরভাবে এই জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে দিয়েছে। ওই রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
يَغْفِرُ اللهُ لِلُوطُ إِنْ كَانَ لَيَأْوِي إِلَى رُكْنِ شَدِيدٍ
'আল্লাহ তাআলা লুতকে ক্ষমা করুন। (কেননা, তাঁকে এত বেশি অস্থির ও বিচলিত হতে হয়েছিলো যে,) তিনি সুদৃঢ় স্তম্ভের বা শক্তিশালী আশ্রয়কেন্দ্রের আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন।' ৭০
হাদিসটির অর্থ হলো, হযরত লুত আ. আল্লাহকে ভুলে অন্যকোনো শক্তির প্রার্থনা করেন নি; বরং তিনি এমন করুণ অবস্থায় ছিলেন, যখন তাঁর মনে এই আকাঙ্ক্ষা হলো যে, কী ভালো হতো যদি আল্লাহ তাআলা এ-সময় আমাকে শক্তি দান করতেন আর আমি এখনই এই হতভাগ্যদেরকে তাদের অশ্লীল কর্মকাণ্ডের মজা দেখিয়ে দিতে পারতাম! ফলে 'মহাশক্তিমান আশ্রয়কেন্দ্র' অর্থাৎ তাঁর প্রতিপালক তাঁকে সাহায্য করলেন। ফেরেশতারা তাঁর কাছে আগমনের রহস্য প্রকাশ করে দিলেন এবং তাঁকে সান্ত্বনা ও প্রশান্তি প্রদান করে বললেন যে, আপনি অস্থির-পেরেশান হবেন না। কিছুক্ষণ পরেই এই হতভাগারা তাদের কৃত কুকর্মের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
তিন. কোনো কোনো মুফাস্সির لَوْ أَنْ لِي بكُمْ قَوْةً বাক্য (کُمْ) সর্বনামটির লক্ষ্যস্থল ফেরেশতাদেরকে বুঝেছেন এবং তাঁর এর এই অর্থ করেন যে, (যেহেতু হযরত লুত আ. তখন অপরিচিত অতিথি তিনজনকে মানুষই মনে করেছিলেন, এ-কারণে) হযরত লুত আ. বললেন, 'কী ভালো হতো যদি তোমরা সংখ্যায় এত অধিক হতো যে ওদের মোকাবিলায় আমি তোমাদের মাধ্যমে শক্তিপ্রাপ্ত হতাম। এজন্যই ফেরেশতারা হযরত আ.- এর এই আকুল বাণী শুনে বললেন-
يَا لُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصْلُوا إِلَيْكَ "হে লুত, নিশ্চয় আমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রেরিত ফেরেশতা। তারা কখনোই তোমার কাছে পৌঁছতে পারবে না। [সুরা হুদ: আয়াত ৮১]
তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত লুত আ. পরিবারবর্গসহ সাদুম থেকে হিজরত করে 'যাওআর' অথবা 'যাগার' নামক বসতির দিকে চলে গিয়েছিলেন। যাগার বসতি সাদুমের কাছাকাছিই ছিলো। সূর্যোদয়ের পর তারা যখন ওখান থেকে সাদুমের দিকে তাকালেন, দেখলেন ওখানে ধ্বংস ও বিনাশের চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই নেই। হযরত লুত আ. এরপর যাগার জনপদও ত্যাগ করলেন এবং তারই কাছাকাছি এক পাহাড়ের ওপর গিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে থাকলেন। ওই পাহাড়েই তাঁর ইন্তেকাল হয়।

টিকাঃ
৬৯. মূল কিতাব ২৬৯।
৭০. সহিহ বুখারি: হাদিস ৩৩৭৫।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইবরাহিম আ. মুজাহিদে আদিয়া

📄 হযরত ইবরাহিম আ. মুজাহিদে আদিয়া


উপরিউক্ত ধারাবাহিক ঘটনাবলি থেকে অনেক উপদেশ ও শিক্ষা অর্জিত হওয়া ছাড়াও সবচেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রকাশ পায়। তা হলো হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্ব নবুওত ও রিসালাতের পদেও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এমনিতে তো আল্লাহ তাআলার প্রত্যেক নবীই তাওহিদ ও একত্ববাদের আহ্বানকারী ও প্রচারক এবং কুফর ও শিরকের বিরোধিতাকারী ও শত্রু। এ-কারণেই আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম-এর শিক্ষাসমূহের মধ্যে এ-দুটি বিষয় ব্যাপক। বরং রুহানি দাওয়াত এবং পথপ্রদর্শনের মূল ভিত্তি শুধু এই দুটি বিষয়ের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু হযরত ইবরাহিম আ.-ই কেবল এই বিশিষ্টতা অর্জন করেছিলেন যে, এই পৃথিবীতে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যাঁকে তাওহিদ ও একত্ববাদের পথে কঠিন থেকে কঠিন পরীক্ষাসমূহ এবং ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর বিপদসমূহের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আর তিনি ওইসব পরীক্ষা ও বিপদাপদের মোকাবিলা করে সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন।
এক. গভীরভাবে চিন্তা করুন, বার্ধক্য এবং নৈরাশ্যের বয়সে হাজার হাজার দোয়া এবং লাখ লাখ আরজু-আবেদন করার পর আল্লাহ তাআলা এক পুত্র সন্তান দান করলেন। পুত্র তখনো দুগ্ধপোষ্য, সেই সময়েই আল্লাহ তাআলার আদেশ হলো-শিশুপুত্রকে এবং তার মাকে তোমার ঘর থেকে পৃথক করে দাও এবং ধু-ধু প্রান্তরে ও খেত-খামারহীন অনাবাদ পাথুরে ভূমিতে, যেখানে পানি ও তৃণলতার নামচিহ্ন পর্যন্ত, তাদের দুজনকে নিয়ে গিয়ে রেখে আসো। এরপর কী হলো? হযরত ইবরাহিম আ. কি এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করলেন? আল্লাহর আদেশপালনে কোনো ধরনের ওজর পেশ করলেন? না, কখনো না। বরং তৎক্ষণাৎ বিনা দ্বিধায়, বিনা আপত্তিতে তাঁদেরকে মক্কার পাথুরে ভূমিতে নিয়ে গিয়ে রেখে এলেন।
দুই. এরপর সেই শিশু যখন জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে উপনীত হলো এবং পিতা-মাতার চোখের জ্যোতি ও মনের সুখ লাভের কারণ হলো, তখন আবার ইবরাহিম আ.-এর প্রতি আল্লাহ তাআলার আদেশ হলো, তোমার এই পুত্রকে আমার নামে কুরবানি করে দাও এবং নিজের আত্মত্যাগ ও আনুগত্যের প্রমাণ দাও।
এমন নিদারুণ সময়ে একজন চরম পর্যায়ের অনুগত এবং সর্বোচ্চ স্তরের আজ্ঞাবহ ব্যক্তিরও ঈমান ও ইয়াকিনের নৌকা কেমন ঘূর্ণিপাকে পতিত হয়-তা পাঠক নিজেই অনুমান করুন। এরপর ইবরাহিম আ.-এর প্রতি লক্ষ করুন, আল্লাহ তাআলার যে-ওহি স্বপ্নাকারে তাঁর কাছে এলো, তিনি তার কোনো অপব্যাখ্যা করলেন না, তার জন্য কোনো ছল-চাতুরি বা কৌশলেরও কল্পনা করলেন না। ভোরে উঠেই কলজের টুকরোকে সঙ্গে নিলেন এবং আল্লাহর আদেশ পালনে তাঁর মানবসুলভ শক্তিতে যা-কিছু করার সাধ্য ছিলো তার সবকিছুই করলেন। এভাবে সাধারণ মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধিকে হতভম্ব করে দেয়া বিশ্বস্ততা ও আল্লাহভক্তির প্রমাণ দিলেন।
তিন. তৃতীয় কঠিন পরীক্ষা সে-সময়ে হয়েছিলো যখন তাঁর পিতা, তাঁর সম্প্রদায় ও তৎকালীন রাজা সবাই একমত হয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, ইবরাহিম হয় তা সত্য প্রচার থেকে বিরত হোক, অন্যথায় তাকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে ছাই-ভস্ম করে দেয়া হোক। তবে জালিমদের এই সিদ্ধান্ত ও ঐকমত্য কি ইবরাহিম আ.-এর কদমকে টলমল করে দিয়েছিলো? না, বরং তিনি দৃঢ় সংকল্পের পাহাড় হয়ে তাঁর আগের স্থানেই অটল থাকলেন এবং প্রথম থেকেই যে-দৃঢ়তার সঙ্গে সত্যের পয়গাম ও হেদায়েতের বাণী শুনাচ্ছিলেন সেভাবেই শুনাতে থাকলেন। শত্রুরা যা বলেছিলো, শেষ পর্যন্ত তারা তা করেই দেখলো এবং তাঁকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করলো। কিন্তু ইবরাহিম আ.-এর শান্তভাবের মধ্যে বিন্দুমাত্র পার্থক্য দেখা গেলো না। অবশ্য ইবরাহিম আ.-এর প্রতিপালক শত্রুদের শত্রুতা এবং তাদের সব ধরনের ষড়যন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন। তাই জ্বলন্ত আগুনের শিখাসমূহ তাঁর জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে গিয়েছিলো। এভাবে হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর মহাশক্তিশালী রক্ষকের ছায়াতলে থেকে আখেরাতে সৌভাগ্য ও কল্যাণ অব্যাহত রেখে সবসময়ের জন্য আল্লাহর বান্দাদেরকে আলোকিত করতে থাকলেন। ফলে তাঁর সৎসাহস এবং আল্লাহর প্রতি আহ্বান আগের চেয়ে আরো তীব্র হয়ে উঠলো।
এসব কঠিন পরীক্ষা এবং সেগুলোতে দৃঢ়তার পরিচয় প্রদান ছাড়াও হযরত ইবরাহিম আ.-এর এই বিশেষত্ব ছিলো যে, তিনি শিরক ও তাওহিদের বিপরীতমুখী জীবনের জন্য এমন একটি পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন, যা তাঁরই মতো মহান মর্যাদার অধিকারী নবীর শানের উপযোগী ছিলো। অর্থাৎ তিনি প্রতিমাপূজা ও নক্ষত্রপূজার খণ্ডন ও অবমাননায় এবং তাদের নিন্দনীয়তা প্রকাশ করে এ-কথা বলেছিলেন-
إِنِّي وَجَهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি (কারো দ্বারা সৃষ্ট নন, বরং তিনিই) আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন (এবং যাঁর আদেশ অনুযায়ী আসমান-জমিন ও সমস্ত সৃষ্ট বস্তুসমূহ চলছে) এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।" (সুরা আন'আম: আয়াত ৭৯।
হযরত ইবরাহিম আ.-এর এই উক্তির অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলাকে কল্পনা করার দুটি পথ রয়েছে: একটি সঠিক পথ, অপরটি ভুল পথ। ভুল পথটি হলো, আগে থেকেই এমন বিশ্বাস তৈরি করে নেয়া হয় যে, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা এবং খুশি রাখা এবং তাঁর উপাসনা ও আরাধনার জন্য প্রতিমাসমূহ এবং নক্ষত্রমণ্ডলীর পূজা করতে হবে। কারণ এসব আত্মা যখন আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে, তখন তারাই আল্লাহকে আমাদের প্রতি রাজি-খুশি ও সন্তুষ্ট করে দেবে। এই আকিদা ও বিশ্বাসের নামই শিরক ও সাবিয়িত্যাত। কারণ, এসব আকিদা-বিশ্বাস অনুসারে ইবাদত ও উপাসনার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য, যা কেবল একক সত্তার জন্য নির্দিষ্ট থাকা উচিত ছিলো, অন্যদের জন্যও যৌথ ও সাধারণ হয়ে পড়ে এবং এটাই শিরকের স্বরূপ।
এর বিপরীতে সঠিক পথ হলো, এই জ্ঞান ও বিশ্বাসকে আকিদা বানিয়ে নেয়া হয় যে আল্লাহ তাআলার সম্মতি ও সন্তুষ্টি অর্জন করার পন্থা এটা ছাড়া আর কোনোটি নয় যে, কেবল তাঁরই ইবাদত করা হবে, তাঁকেই প্রয়োজন পূরণকারী, রিযিক প্রদানকারী, অভাব মোচনকারী এবং মুশকিল আসানকারী বিশ্বাস করতে হবে। উপকার ও ক্ষতি, সুস্থতা ও ব্যাধি, দরিদ্রতা ও ধনাঢ্যতা, রিযিকের সঙ্কীর্ণতা ও সচ্ছলতা, মৃত্যু ও জীবন— মোটকথা সমস্ত বিষয়ে তাঁকে এবং একমাত্র তাঁকেই মালিক ও স্বাধীন ক্ষমতাবান মেনে নেয়া হবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির পরিচয় লাভের জন্য তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসুলগণের হেদায়েত ও নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করতে হবে। অন্য কথায় বলা যায় যে, আল্লাহকে রাজি-খুশি রাখা এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করার জন্য দেবী ও দেবতাদেরকে মাধ্যম বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই; বরং শুধু সেই একক সত্তার ইবাদত-বন্দেগিকে জীবনের মূলধন বানিয়ে নেয়া হবে। এই আকিদার নামই ইসলাম বা হানিফি ধর্ম।
সুতরাং প্রথম দিন থেকেই হযরত ইবরাহিম আ. প্রথম পন্থাটিকে শিরক সাব্যস্ত করিয়া ধর্মীয় দ্বিতীয় পন্থাটিকে ইসলাম ও হানিফি ধর্ম নাম দিয়ে উভয় পন্থার মধ্যে স্বতন্ত্র পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন। আর এই পার্থক্যটুকু এমনভাবে গৃহীত হয়েছে যে, পরবর্তী সব নবী ও রাসূলের শিক্ষা ও দাওয়াতের ভিত্তি ও বুনিয়াদকে এই নামেই অভিহিত করা হয়েছে। এমনকি খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শেষ পয়গামের নামও হানিফি ধর্ম এবং তাঁর অনুসারীদের নাম ‘মুসলিম’ সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন : কুরআন মজিদ বলছে—
مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا (سُورَةُ النِّسَاءِ) مَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ
‘তার অপেক্ষা দীনে কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে (মুসলিম হয়) এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে? (ইবরাহিমের ধর্মের অনুসরণ করে যিনি হানিফ ছিলেন।) এবং আল্লাহ ইবরাহিমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।’ [সূরা নিসা : আয়াত ১২৫]
مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَذَا (سُورَةُ الْحَجِّ)
‘এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ)। তিনি পূর্বেই তোমাদের নামকরণ করেছিলেন মুসলিম এবং এই কিতাবেও (সেই নামই পছন্দ করা হয়েছে)।' [সূরা হজ্জ : আয়াত ৭৮]
এটাই একমাত্র কারণ যে, সূরা ইবরাহিমের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাতে সকল আম্বিয়ায়ে কেরামের আবির্ভাব, তাঁদের অবস্থাবলি, বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং পরিণতি ও ফলাফল সমষ্টিগতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এবং বলা হয়েছে যে, নবীগণের হেদায়েতের দাওয়াত কবুলকারী ও প্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যে পার্থক্য কী? আর ভালো-মন্দ, আনন্দ ও বিরোধিতা, মেনে নেয়া ও অবিশ্বাস করার মধ্যে কি পার্থক্য? ‘গায়রুল্লাহ্’র অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্যের খুশি থাকারও কোনো স্থান আছে না-কি শুধু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির মধ্যে প্রকৃত ঈমান নিহিত রয়েছে?
অতএব, ইবরাহিম আ.-এর বিশেষত্বের প্রতি সমষ্টিগতভাবে লক্ষ করলে নিঃসন্দেহে এ-কথা বলা সঠিক মনে হয় যে, সব নবী ও রাসুলের পবিত্র জীবনে হযরত ইবরাহিম আ.-এর স্থান 'মুজাদ্দিদে আম্বিয়া' রাসুলের স্থান।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আলোচ্য ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত

📄 আলোচ্য ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত


এক. মানুষ যখন জ্ঞান ও বিশ্বাসের আলোকে কোনো আকিদা বা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করে নেয় এবং তা তার অন্তরে দৃঢ়মূল হয়ে তার আত্মার সঙ্গে মিশে যায় এবং তার বুকের মধ্যে পাথরে খোদাই করার মতো কঠিনভাবে খোদিত হয়ে যায়, তখন তার চিন্তা ও কল্পনা, তার ভাবনা ও বিবেচনা এবং ওই বিশ্বাসে তার নিমজ্জিত থাকা এমন স্তরের শক্তিশালী ও দৃঢ় হয়ে ওঠে যে, বিশ্বের কোনো আকস্মিক ঘটনা, কোনো কঠিন থেকে কঠিন বিপদও তাকে তার স্থান থেকে নড়াতে পারে না। সে ওই বিশ্বাসের জন্য নিশ্চিত মনে আগুনে লাফিয়ে পড়ে, বিনা দ্বিধায় সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নির্ভয়ে শূলিকাষ্ঠে চড়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এ-ব্যাপারে হযরত ইবরাহিম আ.-এর দৃঢ় সংকল্প ও অবিচলতার দৃষ্টান্ত একটি জীবন্ত ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দুই. সত্যকে রক্ষা করার জন্য এমন প্রমাণ পেশ করা উচিত যা শত্রু এবং মিথ্যার পূজকের অন্তরে অন্তঃস্থলে পৌঁছে যায় এবং সে সত্যকে মুখে যদিও স্বীকার না করে, কিন্তু তার অন্তর সত্যকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়ে যায়। বরং কোনো কোনো সময় মুখও ইচ্ছার বিরুদ্ধে সত্য ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকতে পারে না। কুরআন মাজিদের নিম্নোক্ত আয়াত এ-মূল তত্ত্বটিই ঘোষণা করছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
'তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হেকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করো উত্তম পন্থায়। [সুরা আন-নাহল : আয়াত ১২৫]
তিন. নবী ও রাসুলগণের কর্মপন্থা হলো, তাঁরা ঝগড়া ও বিতর্কে তর্কশাস্ত্রের পথ মাড়ান না। তাঁদের দলিল ও প্রমাণসমূহের ভিত্তি অনুভবগ্রাহ্য বস্তু এবং চাক্ষুষ দর্শনের ওপর হয়ে থাকে; অর্থাৎ সহজবোধ্য যুক্তি ও জ্ঞানের ওপর। হযরত ইবরাহিম আ.-এর কওমের জনসাধারণের সঙ্গে মূর্তিপূজা ও নক্ষত্রপূজা সম্পর্কিত বিতর্ক এবং নমরুদের সঙ্গে বিতর্ক তার স্পষ্ট ও উজ্জ্বল প্রমাণ।
চার. কোনো সত্য বিষয়কে প্রমাণিত করার জন্য দলিলের মধ্যে বিরোধী পক্ষে বাতিল আকিদাকে কাল্পনিকভাবে মেনে নেয়া সেই বাতিল আকিদা ও মিথ্যাকে স্বীকার করে নেয়া নয়; বরং এটিকে 'শত্রু পক্ষকে পরাভূত করার জন্য সাময়িকভাবে বাতিলকে মেনে নেয়া' বা 'মাআরিয' বা 'পরোক্ষ ইঙ্গিত' বলা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রমাণ পেশ বিপক্ষকে নিজেদের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করে ছাড়ে। হযরত ইবরাহিম আ. জনসাধারণের সঙ্গে বিতর্কের ক্ষেত্রে প্রমাণের এ-দিকটিই অবলম্বন করেছিলেন এবং তা মূর্তিপূজারীদেরকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছিলো যে, মূর্তি কোনো অবস্থাতেই শোনেও না, জবাবও দিতে পারে না।
পাঁচ. যদি কোনো মুসলমানের পিতা-মাতা উভয়ই মুশরিক হয় এবং কোনোক্রমেই শিরক থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের শিরকি জীবনের প্রতি অসন্তুষ্ট ও পৃথক থেকে তাদের সঙ্গে পার্থিব কর্মকাণ্ডে ও আচার-আচরণে এবং আখেরাতের উপদেশ ও নসিহতে সম্মান ও ইজ্জতের সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। কঠোর ও কর্কশ ব্যবহার করা উচিত নয়। আযারের সঙ্গে হযরত ইবারিহম আ.-এর ব্যবহার এবং আবু তালেবের সঙ্গে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্মপদ্ধতি এ-বিষয়ে অকাট্য ও সুনিশ্চিত প্রমাণ।
ছয়. যদি মুমিনের অন্তর বিশুদ্ধ আকিদার ওপর নিশ্চিন্তে মুখ ও অন্তরের ঐক্যের সঙ্গে ঈমান রাখে; কিন্তু চাক্ষুষ দর্শন অনুভব করার জন্য কিংবা যথার্থ বিশ্বাসের স্তর লাভ করার উদ্দেশ্যে কোনো ঈমান ও বিশ্বাসের মাসআলাসমূহ প্রশ্ন ও অন্বেষণ পথ অবলম্বন করে এবং অন্তরের তৃপ্তির প্রার্থী হয়, তবে এই জিজ্ঞাসা সন্দেহ ও কুফর নয়; বরং প্রকৃত ঈমান। হযরত ইবরাহিম আ. জাবাতের মাধ্যমে এই তত্ত্ব পরিশুদ্ধ হয়ে যায়।
সাত. দস্তরখানের সম্প্রসারণ যদি লোক দেখানোর জন্য না হয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদার প্রেক্ষিতে অতিথিসেবায় অন্তরের আনন্দ ও চিত্তের প্রশান্তি লাভ হয়, তবে দানশীল স্বভাবগুলোর মধ্যে এটি খুবই ফলপ্রসূ বলে গণ্য হয় এবং তা ‘হৃদয়ের বদান্যতা’ বা ‘অন্তরের উদারতা’ নামে অভিহিত হয়।
এই মহাগুণটি হযরত ইবরাহিম আ.-এর আত্মার মৌলিক গুণে পরিণত হয়েছিল এবং এটা ছিলো তাঁর স্বভাবগত গুণ। অতিথি আপ্যায়ন, দস্ত রখানের সম্প্রসারণ এবং আগন্তুক অতিথিদেরকে সম্মান করা—এ জাতীয় গুণগুলো হযরত ইবরাহিম আ.-এর মধ্যে ‘উচ্চস্তরের দৃষ্টান্ত’-এর সীমা পর্যন্ত পৌঁছেছিলো।
কোনো কোনো কিতাবে হযরত ইবরাহিম আ.-এর অতিধিপ্রিয়তায়ের বিবরণ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। একবার হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর চিরন্তন অভ্যাস অনুযায়ী কোনো অতিথির অপেক্ষায় মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেননা, মেহমান ব্যতীত তাঁর দস্তর খানও বিছানো হতো না এবং তিনি আহারও গ্রহণ করতেন না। এ-সময় একজন অতি দুর্বল বৃদ্ধ লোককে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেলো। লোকটির কোমর বাঁকা হয়ে গিয়েছিলো এবং সে লাঠির ওপর ভর করে অনেক কষ্টে পথ চলছিলো। হযরত ইবরাহিম আ. লোকটির সামনে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁকে আনন্দের সঙ্গে সাহায্য করে নিয়ে এলেন। দস্তরখানা বিছানো হলো, খাদ্যদ্রব্য সাজানো হলো। আহারপর্ব শেষ হলে হযরত ইবরাহিম আ. বললেন, সেই একমাত্র প্রতিপালকের শোকর আদায় করো যিনি আমাদেরকে এসব নেয়ামত দান করেছেন। বৃদ্ধ লোকটি রাগান্বিত হয়ে বললো, তোমার একমাত্র প্রতিপালক কে? তাকে আমি চিনি না। আমি আমার মা'বুদের (মূর্তির) শোকর আদায় করে থাকি। তা আমার গৃহে রক্ষিত আছে। বৃদ্ধের এই জবাব হযরত ইবরাহিম আ.-এর মনে খুব কষ্ট দিলো। তিনি তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধকে ঘর থেকে বের করে দিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই হযরত ইবরাহিম আ.-এর অন্তরে এই অশোভনীয় কাজের জন্য অনুশোচনার উদ্রেক হলো। তিনি ভাবলেন, যে-একমাত্র প্রতিপালকের শোকর আমি এই বৃদ্ধ লোকটির মাধ্যমে আদায় করাতে চেয়েছিলাম, তাঁর শান তো এই যে, তিনি এই বৃদ্ধকে তার দীর্ঘ আয়ুষ্কালব্যাপী অনবরত নানাবিধ নেয়ামত প্রদান করে আসছেন এবং তার মূর্তিপূজা ও কুফরের কারণে তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে একবেলার জন্যও তার ওপর রিযিকের দরজা বন্ধ করে দেন নি। তবে আমার কি অধিকার ছিলো যে, সে আমার কথা অমান্য করা এবং আল্লাহর বাণী গ্রহণ না করার কারণে ক্রোধান্বিত হয়ে তাকে আমার ঘর থেকে বের করে দিলাম।
এই ঘটনা ঐতিহাসিক বিচারে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, তা কিন্তু এই সত্যটি ঘোষণা করছে যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর বদান্যতা ও উদারতার ওই উচ্চতা-যা 'প্রকৃত উচ্চ দৃষ্টান্ত' পর্যন্ত পৌছেছিলো-ছিলো এক দৃষ্টান্ত এবং তা মানুষের মুখে মুখে প্রবাদ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিলো। নিঃসন্দেহে তার এই চিন্তা ছিলো সত্যের পয়গাম এবং ইসলামের দাওয়াতে সর্বোত্তম আদর্শ।
আট. আল্লাহ তাআলা যেসব মহাপুরুষকে নিজের সত্য প্রচারের জন্য মনোনীত করে থাকেন তাঁদের সামনে আল্লাহর মুহাব্বত ও সততা ব্যতীত অন্যকোনো বস্তু অবশিষ্টই থাকে না। এ-কারণে প্রথম থেকেই তাঁদের মধ্যে এই যোগ্যতা প্রদান করা হয় যে, তাঁরা শৈশবকাল থেকে তাঁদের সমসাময়িকদের মধ্যে উজ্জ্বলরূপে পরিদৃষ্ট হন এবং আল্লাহর রাস্তায় পরীক্ষা ও দুঃখ-দুর্দশাকে সহ্য করে ধৈর্য ও সন্তুষ্টির উত্তম আদর্শ স্থাপন করেন থাকেন। হযরত ইসমাইল আ.-এর ঘটনাটি এই বক্তব্যের প্রমাণের জন্য উপযুক্ত সাক্ষ্য এবং হাজার হাজার উপদেশমূলক দৃষ্টান্ত।
নয়. হযরত লুত আ. যদিও হযরত ইবরাহিম আ.-এর ভাতিজা ছিলেন এবং তাঁর অনুগামীও ছিলেন, কিন্তু তিনি নবুওত লাভ করেছিলেন এবং তাঁকে আল্লাহ তাআলার দূত বানিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাই সাদুম ও আমুরায় সব ধরনের বিপদ এবং বিদেশে শত্রুদের কবলে নানা প্রকারের কষ্ট ভোগ সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করেছেন। নিজের সম্মানিত চাচা ও খান্দানের সাহায্য চাওয়ার পরিবর্তে কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা করতেন। তিনি আল্লাহর নির্দেশাবলির সামনে সন্তুষ্টি ও আত্মসমর্পণের প্রমাণ দিয়েছেন। এটা সান্নিধ্যপ্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের মাকাম।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইবরাহিম আ.-এর ইন্তিকাল

📄 হযরত ইবরাহিম আ.-এর ইন্তিকাল


[হযরত ইবারহিম আ. বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতে বাধ্যর্কে উপনীত হলেন। তখন তিনি তাঁর পুত্রদেরকে আহ্বান করে বললেন, প্রিয় বৎসগণ, দয়াময় আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য ইসলামকে দীনরূপে মনোনীত করেছেন। সুতরাং তোমরা মহান আল্লাহর অনুগত্য স্বীকার পূর্বে মৃত্যুবরণ করো না। সবসময় আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা রাখবে। বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ করবে। বিপদ-আপদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার মানুষকে তাঁর আনুগত্যের প্রতি আকর্ষণ করে থাকেন। ধৈর্যহারা হলে মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভে সক্ষম হয় না। সুতরাং তোমরা বিপদ ও দুঃখ-দুর্দশার সময় ধৈর্য ধারণ করবে এবং কল্যাণ ও মঙ্গলের সময় আল্লাহর শোকর আদায় করবে।
অনন্তর একবার হযরত আযরাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-কাছে এলেন। ইবরাহিম আ. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আযরাইল, তুমি কি আমার প্রাণ বের করে নিয়ে যেতে এসেছো? আযরাইল আ. বললেন, হ্যাঁ। ইবরাহিম আ. তখন বললেন, তুমি আমার রবকে জিজ্ঞেস করো, কেউ কি কখনো প্রাণপ্রিয় বন্ধুর প্রাণ হরণ করে? তিনি যে আমার প্রাণ হরণের নির্দেশ দিয়েছেন? তৎক্ষণাৎ আযরাইলের প্রতি প্রত্যাদেশ হলো, তুমি আমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করো, সে কি কখনো এমন কথা শুনেছে যে, বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে বন্ধু তাতে অসম্মত হয়?
এ-কথা শুনে হযরত ইবরাহিম আ.-এর মধ্যে এক অপূর্ব ভাবের উদয় হলো। তিনি আযরাইলকে বললেন, অতি সত্বর তোমার কর্তব্য পালন করো। আমি আমার রবের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। সঙ্গে সঙ্গে আযরাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রাণ বের করে নিলেন। তখন ইবরাহিম আ.-এর বয়স হয়েছিলো একশো পঁচিশ বছর। তাঁর লাশ মুবারক জেরুজালেমে (বাইতুল মুকাদ্দাসে) সমাহিত করা হয়।
সংকলিত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00