📄 লূত আ. ও ইবরাহিম আ.
ইতোপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে যে হযরত লুত আ. হযরত ইবারহিম আ.- এর ভ্রাতৃপুত্র ছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিলো হারান। হযরত লুত আ. শৈশবে হযরত ইবরাহিম আ.-এর তত্ত্বাবধানের প্রতিপালিত হন। এ- কারণেই তিনি এবং হযরত সারা রা. ইবরাহিমি মিল্লাত বা ধর্মের পূর্বেকার মুসলমান এবং তাঁরা 'সাবেকিন আওয়ালিন' অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির অগ্রগামীদের অন্তর্ভুক্ত।
সুরা আনকাবুতে উল্লেখ করা হয়েছে-
فَآمَنَ لَهُ لُوطٌ وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرٌ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (سورة العنكبوت) 'লুত তার (হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রতি অর্থাৎ মিল্লাতে ইবরাহিম- এর) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো। ইবরাহিম বললো, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে হিজরত (দেশ ত্যাগ) করছি। তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।' [সুরা আনকাবুত: আয়াত ২৬]
হযরত লুত আ. ও তাঁর স্ত্রী হযরত ইবরাহিম আ.-এর সব হিজরতে সবসময়ই তাঁর সঙ্গে ছিলেন। হযরত ইবরাহিম আ. যখন মিসরে ছিলেন তখনো তাঁরা তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিসরে অবস্থানকালে তাঁদের উভয়েরই যথেষ্ট পরিমাণ সামান ও আসবাবপত্র ছিলো এবং গৃহপালিত পশুর বড় বড় পাল ছিলো। এ-কারণে তাঁদের রাখাল ও রক্ষীদের মধ্যে বিশেষ বিবাদ লেগেই থাকতো। হযরত ইবরাহিম আ.-এর রাখালেরা চাইতো, আমার পশুপাল এই চারণভূমি থেকে আগে তাদের খাবার গ্রহণ করুক। আর লুত আ.-এর রাখালেরা চাইতো যে, তাদের দাবি অগ্রগণ্য মনে করা হোক। হযরত ইবরাহিম আ. এই অবস্থা বুঝতে পেরে হযরত লুত আ.- এর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তাঁরা উভয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, পারস্পরিক সম্পর্ক, সদ্ভাব, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির স্থায়িত্ব বহাল রাখার জন্য এটাই সমীচীন হবে যে, হযরত লুত আ. মিসর থেকে হিজরত করে ওরদুনের পূর্বাঞ্চল সাদুম ও আমুরায় চলে যাবেন এবং ওখানে অবস্থান করে হানিফি ধর্মের প্রচার করতে থাকবেন এবং হযরত ইবরাহিম আ.-এর নবীসুলভ সত্যতা প্রচার করতে থাকবেন। এদিকে হযরত ইবরাহিম আ. পুনরায় ফিলিস্তিনে ফিরে যান এবং ওখানে অবস্থান করে ইসলামের শিক্ষা ও প্রচারকে সমুন্নত করতে থাকেন।
টিকাঃ
* হিজরত দুই প্রকারের হয়ে থাকে : ওয়াতানি ও রুহানি। এখানে দু-ধরনের হিজরতই উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলার দীনের হেফাজতের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়া হিজরতে ওয়াতানি অর্থাৎ বাসস্থানের পরিবর্তন। আর পূর্বপুরুষের পৌত্তলিক ধর্ম পরিত্যাগ করে ইবরাহিমি বা হানিফি ধর্ম অবলম্বন করা হিজরতে রুহানি।
📄 সাদুম
ওরদুনের যে-প্রান্তে বর্তমানে মৃতসাগর বা লুত সাগর অবস্থিত, এটাই সেই স্থান যেখানে সাদুম ও আমুরা গোত্র দুটির বসতিগুলো বিদ্যমান ছিলো। এর নিকটবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বিশ্বাস ছিলো যে, সম্পূর্ণ এই অঞ্চল, যা এখন সমুদ্ররূপে দৃশ্যমান, কোনো এককালে তা শুষ্কভূমি ছিলো এবং তার ওপর শহর বিদ্যমান ছিলো। সাদুম ও আমুরা সম্প্রদায়গুলোর বসতি এই জায়গাতেই ছিলো। প্রথম থেকে এখানে কোনো সমুদ্র ছিলো না; কিন্তু যখন লুত আ.-এর সম্প্রদায়ের ওপর আল্লাহর আযাব এলো, এই ভূখণ্ড চারশো মিটার সমুদ্রের নিচে তলিয়ে গেলো এবং পানি উপরে উথলে উঠলো। তখন এই এলাকা সমুদ্ররূপ ধারণ করে। এইজন্য এর নাম হয়েছে মৃতসাগর বা লুত সাগর। ওই বাসিন্দাদের বিশ্বাস ঠিক হোক আর ভুল হোক, সবসময় এটা মৌলিক সত্য বিষয় যে, এই মৃতসাগরেরই তীরের ওপর সেই ঘটনাটি ঘটেছিলো যা 'লুত সম্প্রদায়ের আযাব' নামে অভিহিত। বিগত দুই বছরের ভূ-তত্ত্বানুসন্ধান মৃতসাগরের তীরে লুত সম্প্রদায়ের বসতিসমূহের কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে এই জ্ঞান ও বিশ্বাসের সামনে আত্মসমর্পণ করেছে।
📄 হযরত লূত আ.-এর সম্প্রদায়
সাদুমে এসে হযরত লুত আ. বসবাস শুরু করলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, সাদুমের অধিবাসীরা অশ্লীল কার্যকলাপ এবং নাফরমানিমূলক কর্মকাণ্ডে ভয়াবহভাবে লিপ্ত। ভাবগতি এমন যে, "সবকিছুর রক্ষক আল্লাহ তাআলার দরবারে তা থেকে নিরাপত্তা কামনা করছি।" দুনিয়াতে এমন কোনো খারাপ কাছ ছিলো না যা তারা করতো না এবং পৃথিবীতে এমন কোনো ভালো কাজ ছিলো না যা তাদের মধ্যে পাওয়া যেতো। যাবৎ দুনিয়ার অবাধ্য, নাফরমান, হীনস্বভাব ও মন্দ চরিত্রের সম্প্রদায়গুলোর অন্যান্য দোষ ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড ছাড়াও লুত আ.-এর সম্প্রদায় একটি কলুষিত কুকর্ম আবিষ্কার করেছিলো। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের কামরিপু চরিতার্থ করার জন্য স্ত্রীলোকদের পরিবর্তে শ্মশ্রুবিহীন বালকদের সঙ্গে মেলামেশা করতো। দুনিয়ার সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে তখনো পর্যন্ত কোথাও ওই কুকর্মটির প্রচলন ছিলো না। এরাই সেই হতভাগ্য কওম যারা এই অপবিত্র কর্মটির আবিষ্কার করেছিলো। এই কুকর্মটি লেওয়াতাত (সমকামিতা) নামে কুখ্যাত।
আর এর চেয়ে ভয়াবহ ইতরতা, নিকৃষ্টতা ও নির্লজ্জতা এই ছিলো যে, তারা নিজেদের এই অপকর্মকে দোষ মনে করতো না এবং প্রকাশ্যভাবে গর্বের সঙ্গে তা চরিতার্থ করতো।
কুরআন মাজিদে তার বর্ণনা এসেছে-
وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ () إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ (سورة الأعراف) '(আর স্মরণ করুন লুতের ঘটনা।) আমি লুতকেও পাঠিয়েছিলাম। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিলো, "তোমরা এমন (অশ্লীল) কুকর্ম করছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করে নি। তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্য (কামরিপু চরিতার্থ করার জন্য) নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন করো, (সুনিশ্চিত কথা যে,) তোমরা তো সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়। [সুরা আ'রাফ : আয়াত ৮০-৮১]
আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার বলেন, আমি একটি হিব্রু সাহিত্যপুস্তকে তাদের কিছু অপকর্মের অবস্থা পাঠ করেছি। তার সারমর্ম হলো : সাদুমবাসীদের এই অভ্যাস ছিলো যে তারা বহিরাগত ব্যবসায়ী ও বণিকদের পণ্যদ্রব্যকে এক নতুন ও অভিনব পন্থায় লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতো। তাদের পদ্ধতি ছিলো এই : বিদেশ থেকে কোনো বণিক সাদুমে এসে যাত্রাবিরতি করলে তার মালামাল দেখার বাহানায় প্রত্যেক ব্যক্তি অল্প অল্প পরিমাণ হাতে উঠিয়ে নিতো এবং উঠিয়ে নিয়েই চলে যেতো। নিরীহ বণিক বেচারা অস্থির ও উদ্বিগ্ন হয়ে বসে থাকতো। সে যদি তার পণ্যদ্রব্য বিনষ্ট হওয়ার অভিযোগ করতো এবং কান্নাকাটি শুরু করতো
📄 হযরত লূত আ. এবং সত্যের দাওয়াত
এসব অবস্থায় হযরত লুত আ. তাদেরকে তাদের এই নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার জন্য তিরস্কার করলেন এবং সম্মান পবিত্রতার জীবনযাপন করার জন্য উৎসাহ প্রদান করলেন। সুন্দর সম্বোধন ও কথাবার্তা এবং নম্রতার সঙ্গে যত উপায়ে তাদের বোঝানো সম্ভব ছিলো, সব উপায়েই তাদের বোঝালেন। তাদেরকে উপদেশ ও নসিহত প্রদান করলেন। অতীতকালের সম্প্রদায়গুলোর বিভিন্ন অসৎ ও অপকর্মের পরিণাম উল্লেখ করে তাদের সামনে শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত পেশ করলেন। কিন্তু হতভাগ্যদের ওপর কোনো ক্রিয়াই হলো না। বরং তার হিতে বিপরীত হলো এবং তারা বলতে লাগলো-
وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ (سورة الأعراف)
'জবাবে তার সম্প্রদায় শুধু বললো, "এদেরকে (হযরত লুত আ. ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং অনুসারীদেরকে) তোমাদের জনপদ থেকে বহিষ্কৃত করো, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়। (নিঃসন্দেহে তারা খুবই পবিত্র লোক।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ৮২]
"এরা নিঃসন্দেহে খুবই পবিত্র লোক" বাক্যটি হযরত লুত আ.-এর পরিবারকে লক্ষ করে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা বিদ্রূপাত্মকভাবেই বলেছে। তারা যেনো হযরত লুত আ.-এর খান্দানের উদ্দেশে রহস্য ও উপহাস করতো যে তারা অতি পবিত্রতার দাবিদার। আমাদের বসতিতে এমন লোকদের কী কাজ? অথবা দয়াবান উপদেশ প্রদানকারীর মুরব্বিসুলভ উপদেশে ক্রোধান্বিত হয়ে বলতো, যদি আমরা অপবিত্র ও নির্লজ্জ হই আর তারা পবিত্র হয়ে থাকে, তবে আমাদের বসতির সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক? তাদেরকে এখান থেকে বের করে দাও।
হযরত লুত আ. আর একবার তাদেরকে ভরা জনসমাবেশে নসিহত করে বললেন, তোমাদের এতটুকু অনুভূতিও নেই যে তোমরা বুঝতে পারো পুরুষদের সঙ্গে নির্লজ্জতার সম্পর্ক, রাহাজানি, লুটতরাজ এবং এ-জাতীয় চারিত্রিক অশ্লীল ও অপকর্মগুলো অত্যন্ত খারাপ কাজ। তোমরা জনবহুল মজলিসে এসব কাজ করছো। অপকর্মগুলোর করার পর লজ্জিত হওয়ার পরিবর্তে তোমরা সেগুলোর আলোচনা শুনিয়ে থাকো। যেনো সেগুলো আদর্শমূলক দেখাবার মতো কাজ, যা তোমরা সম্পন্ন করেছো। কুরআন মাজিদ তা ব্যক্ত করেছে এভাবে-
أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ (سورة العنكبوت)
"তোমরাই তো পুরুষে উপগত হচ্ছো (তাদের সঙ্গে কুকর্ম করছো), তোমরাই তো রাহাজানি করে থাকো এবং তোমরাই তো নিজেদের বৈঠকে (ও পরিবারবর্গের বর্গের সামনে) প্রকাশে ঘৃণ্য কর্ম করে থাকো।" [সুরা আনকাবুত: আয়াত ২৯]