📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত ইবরাহিম আ. এবং যাকুন ইয়াকিনের অন্বেষণ

📄 হযরত ইবরাহিম আ. এবং যাকুন ইয়াকিনের অন্বেষণ


মধ্যস্থলে হযরত ইসমাইল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা এসে পড়েছিলো। তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে দেয়া সঙ্গত মনে হলো। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়। তা ছাড়া এই ঘটনাগুলোও হযরত ইবরাহিম আ.-এর জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং যথাস্থানেই এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহিম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থার প্রতি মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তত্ত্ব অন্বেষণ ও অনুসন্ধানে হযরত ইবরাহিম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিলো। তিনি প্রতিটি বস্তুর গূঢ় তত্ত্ব পর্যন্ত পৌঁছতে পারার চেষ্টা করাকে তাঁর জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তিনি বস্তুরাশির তত্ত্বাবলির মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।
পিতা আযার, কওমের জনসাধারণ এবং নমরুদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময় তাঁর এই স্বভাবগত রুচির পরিচয় ভালোভাবেই পাওয়া গেছে। এ-কারণে হযরত ইবরাহিম আ. 'মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া' সম্পর্কে আল্লাহপাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করেন, অনুগ্রহ করে আমাকে একটু দেখান।' আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহিম, তুমি কি এ-বিষয়টির ওপর ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস রাখো না?' ইবরাহিম আ. তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, 'কেনো বিশ্বাস রাখবো না? আমি দ্বিধাহীনভাবে এর ওপর ঈমান রাখি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকিনের বিরোধী নয় এই জন্য যে, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের (আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিনের) প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা এই যে, আমাকে দিব্য চোখে দেখিয়ে দিন মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার আকৃতি ও রূপ কেমন হবে।' আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, 'আচ্ছ, যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে তবে কয়েকটি পাখি নিয়ে এসো এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে দাও। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাকো।' হযরত ইবরাহিম আ. সেভাবেই কাজ করলেন। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে থেকে পাখিগুলোকে ডাক দিলেন। তখন পাখিগুলোর দেহের খণ্ডগুলো পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেলো এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহিম আ.-এর কাছে উড়ে চলে এলো। কুরআন মাজিদের সুরা বাকারায় উল্লিখিত ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (سورة البقرة) '(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিম বললো, "হে আমার প্রতিপালক, কীভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করো আমাকে দেখাও।" তিনি বললেন, "তবে কি তুমি (এই বিষয়ে) বিশ্বাস করো না (ঈমান রাখো না)?" সে বললো, "কেনো করবো না, তবে এটা কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য (আমি কেবল আত্মার তৃপ্তি চাই)।" তিনি বললেন, "তবে চারটি পাখি নাও এবং তাদেরকে তোমার বশীভূত করে নাও। তারপর তাদের এক-এক অংশ এক-এক পাহাড়ে রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক দাও, তারা দ্রুতগতিতে (দৌড়ে) তোমার কাছে আসবে। জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা বাকারা: আয়াত ২৬০]
প্রাথমিক যুগের উলামায়ে কেরাম থেকে এই আয়াতের তাফসির এমনই বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শরিফের কোনো কোনো রেওয়ায়েতও এই তাফসিরেরই সমর্থন করছে। সুতরাং যারা এ-বিষয়টির অসাধারণত্বের প্রতি লক্ষ করে এই আয়াতগুলো নানা ধরনের ব্যাখ্যা করে অনর্থক উক্তিসমূহ বর্ণনা করেছেন সেগুলো দৃষ্টিপাত করার যোগ্য নয়। আমি ইতোপূর্বে বলেছি যে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিচিত্র ও বিস্ময়কর কাহিনি রচনায় দুর্বল রেওয়ায়েতসমূহের ওপর নির্ভর করে ভিত্তিহীন কথায় বিশ্বাস করা যেমন ভুল পথ, তেমনি এটাও বিভ্রান্তিকর পথ যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে যেসব মুজিযার কথা কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ইবারত সহিহ হাদিসের বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায় সেগুলোকেও শুধু এইজন্য অবিশ্বাস করা হয় বা মনগড়া ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, যাতে জ্ঞান ও দর্শনের দাবিদার বস্তুবাদীরা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও জ্ঞানের প্রতি বিদ্রূপ করবে এবং তা নিয়ে উপহাস করবে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বনি কাতুরা

📄 বনি কাতুরা


হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হযরত সারা রা. ও হযরত হাজেরা রা. ছাড়াও আরো একটি বিয়ে করেছিলেন। সেই স্ত্রীর নাম ছিলো কাতুরা। তাঁর গর্ভ থেকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর ছয় পুত্র জন্মগ্রহণ করেছিলো।
তাওরাতে বলা হয়েছে—
"আর ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) আরো এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর নাম ছিলো কাতুরা। তাঁর গর্ভ থেকে যামরান, ইয়াকসান, মাদ্দান, মাদয়ান, ইয়াশবাক ও শাওহা জন্মগ্রহণ করেন। ইয়াকসানের ঔরসে দুই পুত্র সাবা ও দুওয়ান জন্মগ্রহণ করেন। আর আসুরি, লাতুসি ও লুওয়াই তাদের সন্তান ছিলো। আর মাদয়ানের সন্তান ছিলো পাঁচজন: আইফা, গাফার, খায়ুক, আবিদা ও দাআ। এঁদের সবাই ছিলেন বনি কাতুরা বংশের।"৬২
মাদয়ানের বংশধরেরা তাদের বসতিকে নিজেদের পূর্বপুরুষ মাদয়ানের নামে মাদায়েন নামকরণ করেছিলো। এরাই আসহাবে মাদয়ান নামে অভিহিত হয়েছে। আর হযরত ইবরাহিম আ.-এর পৌত্র দুওয়ানের বংশধর 'আসহাবুল আইকাহ' নামে বিখ্যাত হয়েছে। এরাই আসহাবে মাদয়ান ও আসহাবুল আইকাহ নামের দুটি সম্প্রদায়। এদের হেদায়েতের জন্য হযরত শুআইব আ.-কে নবীরূপে পাঠানো হয়। এটা হলো কাতাদা রা.-এর রেওয়ায়েত। বর্তমান কালে কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তার তাহকিক তার বিপরীত। হাফেয ইবনে কাসির ইসহাবে মাদয়ান ও আসহাবুল আইকাহকে একই সম্প্রদায় হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এই তথ্যই প্রণিধানযোগ্য। বিস্তারিত বিবরণ হযরত শুআইব আ.-এর ঘটনায় আসবে।

টিকাঃ
৬২. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যয়, অনুচ্ছেদ ২৫, আয়াত ১-৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00