📄 খৎনা
হযরত ইসহাক আ. ৮ দিনের বয়সে উপনীত হলে হযরত ইবরাহিম আ. শিশুর খৎনা করিয়ে দিলেন। তাওরাতে বলা হয়েছে: "আর ইবরাহিম আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর পুত্র ৮ দিন বয়স্ক ইসহাককে খৎনা করিয়ে দিলেন।"৬০
ইসহাক আসলে মূল উচ্চারণের বিবেচনায় (يصحق) ইয়াসহাক)। এটি হিব্রু ভাষার শব্দ; এর আরবি অনুবাদ (يضحك) ইয়াদহাকু) অর্থাৎ হাসছে।
আল্লাহর ফেরেশতারা যখন একশো বছর বয়স্ক ইবরাহিম আ.-কে এবং নব্বই বছর বয়স্ক সারা রা.-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন, তখন হযরত ইবরাহিম আ. একে বিস্ময়কর ব্যাপার মনে করেছিলেন। হযরত সারাও এই সংবাদ শুনে হেসে উঠেছিলেন। এ- কারণেই পুত্রের এই নাম মনোনীত হয়েছে। বা এই নাম এ-কারণে রাখা হয়েছে যে, হযরত ইসহাকের জন্ম হযরত সারার আনন্দ ও খুশির কারণ হয়েছিলো।
আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী يضحك (ইয়াদহাকু) فعل مضارع-এর রূপ। আরববাসীদের মধ্যে সবসময় এই প্রথা বিদ্যমান ছিলো যে তারা فعل مضارع-এর রূপকে নাম হিসেবে ব্যবহার করতো। যেমন: ইয়ারাব, ইয়ামলেক জাতীয় নাম আরবে বেশ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ রয়েছে।
টিকাঃ
৬০. তাওরাত, অনুচ্ছেদ ২১, আয়াত ৪।
📄 হযরত ইসহাক আ.-এর বিয়ে
কুরআন মাজিদে এ-সম্পর্কে কোনো উল্লেখ নেই। অবশ্য তাওরাতে এ- প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ কাহিনি আলোচিত হয়েছে। তার সারমর্ম এই: হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর বাঁদির পুত্র আল-ইয়ারায দেমাশকিকে বললেন, আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, ইসহাকের বিয়ে কখনো আমি ফিলিস্তিনের সেই কিনআনি বংশে করাবো না। আমার ইচ্ছা হলো, নিজের খান্দান ও পিতামহের বংশের মধ্যে তার বিয়ে করাবো। সুতরাং তুমি সাজ-সরঞ্জাম নিয়ে যাও এবং 'ফাদ্দানে আরাম'-এ আমার ভাই বতুইল বিন নাহুরের কাছে এই পয়গাম পৌঁছে দাও, সে যেনো নিজের কন্যার বিয়ে আমার পুত্র ইসহাকের সঙ্গে করিয়ে দেয়। যদি সে সম্মত হয় তবে তাকে এটাও বলো যে, আমি ইসহাককে আমার কাছ থেকে দূরে যেতে দিতে চাই না। সে যেনো তার কন্যাকে তোমার সঙ্গে রওয়ানা করিয়ে দেয়।
আল-ইয়ারায হযরত ইবরাহিম আ.-এর নির্দেশ অনুযায়ী 'আরাম' অভিমুখে যাত্রা করলেন। গন্তব্য স্থানের বসতির কাছে পৌঁছলে তাঁর উটটিকে বসালেন। উদ্দেশ্য, আগেভাগেই অবস্থা জেনে নেবেন। আল- ইয়ারায যেখানে তাঁর উট বসিয়েছিলেন তার কাছেই হযরত ইবরাহিম আ.-এর ভাই বতুইল বিন নাহুরের খান্দান বসবাস করতো। আল- ইয়ারায সবেমাত্র প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখনই তিনি এক সুন্দর বালিকাকে দেখতে পেলেন। সে পানির কলসি ভরে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। আল- ইয়ারায তার কাছে পানি চাইলে সে তাঁকে পানি পান করালো। বালিকা তাঁর উটকেও পানি পান করালো এবং তাঁর অবস্থা জিজ্ঞেস করলো। আল-ইয়ারায বতুইলের পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বালিকাটি বললো তিনি আমার বাবা। সে আল-ইয়ারাযকে অতিথি হিসেবে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলো। বাড়িয়ে পৌছে সে তার ভাই লাবানকে অতিথির কথা জানালো।
লাবান আল-ইয়ারাকে খুব সমাদর করলেন এবং তাঁর আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। আল-ইয়ারা হযরত ইবরাহিম আ.-এর পয়গام শোনালেন। লাবান এই পয়গام শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি অনেক সাজ-সরঞ্জাম সঙ্গে দিয়ে তাঁর বোন রাফকাকে আল-ইয়ায়ের সঙ্গে রওয়ানা করিয়ে দিলেন।
📄 হযরত ইসহাক আ.-এর সন্তান-সন্ততি
রাফকার গর্ভে হযরত ইসহাক আ.-এর যমজ দুই পুত্র যথাক্রমে ঈসু ও ইয়াকুব জন্মগ্রহণ করেন। তখন হযরত ইসহাক আ.-এর বয়স ছিলো ষাট বছর। ইসহাক আ. ঈসুকে বেশি স্নেহ করতেন এবং রাফকা ইয়াকুবকে বেশি ভালোবাসতেন। ঈসু শিকারি ছিলেন। তিনি বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে শিকারের গোশত এনে দিতেন। ইয়াকুব তাঁবুতেই থাকতেন। একদিন ঈসু ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে এসে ইয়াকুবকে বললেন, আমি ক্লান্ত, আর শিকারও পাওয়া যায় নি। তুমি তোমার খাদ্য মটর ও লেন্স থেকে আমাকেও কিছু খেতে দাও। ইয়াকুব বললেন, ফিলிஸ்தিনবাসীদের প্রথা এই যে, জ্যেষ্ঠ পুত্রই মিরাস পেয়ে থাকে। সুতরাং পিতার ওয়ারিস হতে তুমি। তুমি যদি সেই অধিকার ত্যাগ করো তবে আমি তোমাকে খানা খাওয়াবো। ঈসু বললেন, আমার সেই মিরাসের কোনো পরোয়া নেই। তুমিই আমার পিতার ওয়ারিস হও। তখন ইয়াকুব তাঁর ভাই ঈসুকে খানা খাওয়ালেন।
একবার হযরত ইসহাক আ. (যখন তিনি অতি বৃদ্ধ এবং তাঁর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে) ইচ্ছা পোষণ করলেন যে, ঈসুকে বরকত প্রদান করবেন। তিনি তাঁকে বললেন, যাও, শিকার করে আনো এবং উত্তম খানা পাকিয়ে আমার সামনে পরিবেশন করো। রাফকা এ-কথা শুনে মনে মনে বললেন, ইয়াকুব এই বরকত প্রাপ্ত হোক। তৎক্ষণাৎ তিনি ইয়াকুবকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি উত্তম খানা পাকিয়ে তোমার পিতার সামনে উপস্থিত করো এবং বরকতের দোয়া চাও। ইয়াকুব নাম না বলে তা-ই করলেন এবং হযরত ইসহাক আ. থেকে বরকতের দোয়া লাভ করলেন। এরপর ঈসু ঘরে এসে বিস্তারিত ঘটনা জানতে পারলেন। তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং ইয়াকুবের প্রতি হিংসা পোষণ করতে শুরু করলেন। রাফকা ইয়াকুবকে পরামর্শ দিলেন, তুমি এখান থেকে কিছুদিনের জন্য তোমার মামা লাবানের কাছে চলে যাও। ইয়াকুব স্ত্রীর কথামতোই কাজ করলেন। মামার কাছে গিয়ে কিছুদিন অতিবাহিত করলেন। একাদিক্রমে মামা লাবানের দুই কন্যা লা'সাহ ও রাহিলকে বিয়ে করলেন। ৬১
এই রেওয়ায়েতটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে নির্ভরের খুবই অযোগ্য। তাতে যে-চারিত্রিক জীবন উপস্থাপিত হয়েছে তা তাওরাতের অন্যান্য বিকৃত ও পরিবর্তিত রেওয়ায়েতের মতো আম্বিয়াকে কেরাম আলাইহিমুস সালাম এবং তাঁদের বংশের মর্যাদার উপযোগী নয়। কিন্তু এতে এই সম্মানটুকু অবশ্যই পাওয়া যায় যে, ইয়াকুব আ.-এর মামা বাড়িতেই তাঁর বিয়ে হয়েছিলো এবং তিনি এক দীর্ঘকাল পর্যন্ত ওখানে ছিলেন।
আর ইসু পলায়ন করে তাঁর চাচা হযরত ইসমাইল আ.-এর কাছে চলে গেলেন। ওখানে তাঁর কন্যা বাশামা বা বাসেমা অথবা মুহাল্লাতকে (যে-নামই শুদ্ধ হয়) বিয়ে করলেন। তা ছাড়াও তিনি আরো বেশ কয়েকটি বিয়ে করলেন। এরপর ইসু তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে 'সাঈর' নামক স্থানে চলে গেলেন এবং ওখানেই তাঁদের বাসস্থান স্থির করে নিলেন। তিনি ওখানে আদওয়াম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। এ-কারণে তাঁর বংশধরগণ বনি-আদওয়াম নামে প্রসিদ্ধ হলো।
টিকাঃ
৬১. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৬৪, আয়াত ১-৬৫।
📄 হযরত ইবরাহিম আ. এবং যাকুন ইয়াকিনের অন্বেষণ
মধ্যস্থলে হযরত ইসমাইল আ. ও হযরত ইসহাক আ.-এর আলোচনা এসে পড়েছিলো। তাই তাঁদের দুজনের ঘটনাবলি বিস্তারিত বর্ণনা করে দেয়া সঙ্গত মনে হলো। যাতে ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি না হয়। তা ছাড়া এই ঘটনাগুলোও হযরত ইবরাহিম আ.-এর জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সুতরাং যথাস্থানেই এগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। এখন হযরত ইবরাহিম আ.-এর জীবনের অবশিষ্ট অবস্থার প্রতি মনোযোগ দেয়া যেতে পারে।
বস্তুসমূহের স্বরূপ বা মূল তত্ত্ব অন্বেষণ ও অনুসন্ধানে হযরত ইবরাহিম আ.-এর স্বভাবগত রুচি ছিলো। তিনি প্রতিটি বস্তুর গূঢ় তত্ত্ব পর্যন্ত পৌঁছতে পারার চেষ্টা করাকে তাঁর জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্য মনে করতেন। যাতে তিনি বস্তুরাশির তত্ত্বাবলির মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর সত্তা, তাঁর একত্ব এবং তাঁর অসীম ক্ষমতা সম্পর্কে দিব্য বিশ্বাস লাভের পর বাস্তব বিশ্বাস লাভ করতে পারেন।
পিতা আযার, কওমের জনসাধারণ এবং নমরুদের সঙ্গে বিতর্ক করার সময় তাঁর এই স্বভাবগত রুচির পরিচয় ভালোভাবেই পাওয়া গেছে। এ-কারণে হযরত ইবরাহিম আ. 'মৃত্যুর পর জীবিত হওয়া' সম্পর্কে আল্লাহপাকের দরবারে প্রার্থনা জানালেন, আপনি কেমন করে মৃতদেরকে জীবন দান করেন, অনুগ্রহ করে আমাকে একটু দেখান।' আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আ.-কে বললেন, হে ইবরাহিম, তুমি কি এ-বিষয়টির ওপর ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস রাখো না?' ইবরাহিম আ. তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, 'কেনো বিশ্বাস রাখবো না? আমি দ্বিধাহীনভাবে এর ওপর ঈমান রাখি। কিন্তু আমার এই প্রার্থনা ঈমান ও ইয়াকিনের বিরোধী নয় এই জন্য যে, আমি দৃঢ় জ্ঞানমূলক বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে দিব্য বিশ্বাস এবং বাস্তব বিশ্বাসের (আইনুল ইয়াকিন ও হাক্কুল ইয়াকিনের) প্রার্থী। আমার আকাঙ্ক্ষা এই যে, আমাকে দিব্য চোখে দেখিয়ে দিন মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার আকৃতি ও রূপ কেমন হবে।' আল্লাহ তাআলা তখন বললেন, 'আচ্ছ, যদি তুমি চাক্ষুষ দেখতে তবে কয়েকটি পাখি নিয়ে এসো এবং তাদেরকে খণ্ড খণ্ড করে সামনের পাহাড়ের ওপর রেখে দাও। এরপর দূরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে ডাকো।' হযরত ইবরাহিম আ. সেভাবেই কাজ করলেন। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে থেকে পাখিগুলোকে ডাক দিলেন। তখন পাখিগুলোর দেহের খণ্ডগুলো পৃথক পৃথকভাবে তৎক্ষণাৎ নিজেদের আকৃতিতে এসে গেলো এবং জীবিত হয়ে হযরত ইবরাহিম আ.-এর কাছে উড়ে চলে এলো। কুরআন মাজিদের সুরা বাকারায় উল্লিখিত ঘটনাটি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (سورة البقرة) '(স্মরণ করুন) যখন ইবরাহিম বললো, "হে আমার প্রতিপালক, কীভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করো আমাকে দেখাও।" তিনি বললেন, "তবে কি তুমি (এই বিষয়ে) বিশ্বাস করো না (ঈমান রাখো না)?" সে বললো, "কেনো করবো না, তবে এটা কেবল আমার চিত্তের প্রশান্তির জন্য (আমি কেবল আত্মার তৃপ্তি চাই)।" তিনি বললেন, "তবে চারটি পাখি নাও এবং তাদেরকে তোমার বশীভূত করে নাও। তারপর তাদের এক-এক অংশ এক-এক পাহাড়ে রেখে দাও। এরপর তাদেরকে ডাক দাও, তারা দ্রুতগতিতে (দৌড়ে) তোমার কাছে আসবে। জেনে রাখো যে, নিশ্চয় আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা বাকারা: আয়াত ২৬০]
প্রাথমিক যুগের উলামায়ে কেরাম থেকে এই আয়াতের তাফসির এমনই বর্ণিত হয়েছে। হাদিস শরিফের কোনো কোনো রেওয়ায়েতও এই তাফসিরেরই সমর্থন করছে। সুতরাং যারা এ-বিষয়টির অসাধারণত্বের প্রতি লক্ষ করে এই আয়াতগুলো নানা ধরনের ব্যাখ্যা করে অনর্থক উক্তিসমূহ বর্ণনা করেছেন সেগুলো দৃষ্টিপাত করার যোগ্য নয়। আমি ইতোপূর্বে বলেছি যে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিচিত্র ও বিস্ময়কর কাহিনি রচনায় দুর্বল রেওয়ায়েতসমূহের ওপর নির্ভর করে ভিত্তিহীন কথায় বিশ্বাস করা যেমন ভুল পথ, তেমনি এটাও বিভ্রান্তিকর পথ যে, আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে যেসব মুজিযার কথা কুরআন মাজিদের স্পষ্ট ইবারত সহিহ হাদিসের বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায় সেগুলোকেও শুধু এইজন্য অবিশ্বাস করা হয় বা মনগড়া ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, যাতে জ্ঞান ও দর্শনের দাবিদার বস্তুবাদীরা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও জ্ঞানের প্রতি বিদ্রূপ করবে এবং তা নিয়ে উপহাস করবে।