📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 যমযম

📄 যমযম


হযরত হাজেরার গর্ভ থেকে হযরত ইসমাইল আ.-এর জন্মগ্রহণ করা হযরত সারার জন্য অত্যন্ত মনঃপীড়াদায়ক হলো। হযরত ইবরাহিম আ. প্রথম ও বড় স্ত্রী আগে থেকেই গৃহের কর্ত্রী ছিলেন। আর হাজেরা হলেন ইবরাহিম আ.-এর ছোট স্ত্রী এবং সারার খেদমতগার। এসব কারণে মানবিক স্বভাবের তাড়নায় ইসমাইল আ.-এর জন্মগ্রহণ হযরত সারার জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ালো। ফলে হযরত সারা হযরত ইবরাহিম আ.- এর কাছে জিদ করে বসলেন, হাজেরা ও তার শিশুপুত্র আমার চোখের সামনে যেনো না থাকে। তাদেরকে ভিন্ন কোনো স্থানে নিয়ে যাওয়া হোক।
এই জিদ হযরত ইবরাহিম আ.-এর কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় মনে হলো। কিন্তু আল্লাহপাক তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, হাজেরা, ইসমাইল ও তোমার জন্য এতেই কল্যাণ যে সারার কথা মেনে নাও। 'আর সারা দেখলেন যে, মিসর দেশীয় হাজেরার পুত্র, যা সে ইবরাহিমের ঔরস থেকে প্রসব করেছে, খিল খিল করে হাসছে, তখন তিনি ইবরাহিম আ.-কে বললেন, এই বাঁদির পুত্র আমার পুত্র ইসহাকের সঙ্গে ওয়ারিস হবে না। নিজের পুত্রের উদ্দেশে এ-ধরনের উক্তি হযরত ইবরাহিম আ.- এর কাছে খুবই খারাপ মনে হলো। আল্লাহ ইবরাহিম আ.-কে বললেন, তোমার পুত্র ও তোমার বাঁদি সম্পর্কে সারার ওই উক্তিটি যেনো তোমার খারাপ মনে না হয়। সারা তোমাকে যা বলেছে তার প্রতিটি কথার আওয়াজের প্রতি কর্ণপাত করো কারণ তোমার বংশ ইসহাক থেকেই তাঁদেরকে রেখে গেলেন। স্থানটি তখন অনাবাদ ও জনমানবহীন বিরান ছিলো। পানিরও নামগন্ধ পর্যন্ত ছিলো না। তাই হযরত ইবরাহিম আ. এক মশক পানি ও এক থলে খেজুর তাঁদের কাছে রেখে গেলেন।
তারপর মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রওয়ানা হলেন। হযরত হাজেরা রা. তাঁর পেছনে পেছনে এ-কথা বলতে বলতে চললেন, হে ইবরাহিম, আপনি আমাদেরকে এই উপত্যকায় কোথায় ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? এখানে কোনো মানুষও নেই, কোনো সহায়ও নেই, দুঃখ-কষ্টের কোনো সঙ্গীও নেই। হাজেরা রা. অনবরত এসব কথা বলে চললেন; কিন্তু ইবরাহিম আ. নীরবেই চলে যাচ্ছিলেন। অবশেষে হযরত হাজেরা রা. জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার রবই কি আপনাকে এমন আদেশ করেছেন?" তখন ইবরাহিম আ. বললেন, "হ্যাঁ, তা আমার রবের আদেশেই হয়েছে।” এ-কথা শুনে হাজেরা বললেন, “যদি আল্লাহরই হুকুম হয়ে থাকে তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি আমাদেরকে ধ্বংস ও বরবাদ করবেন না। এরপর তিনি ফিরে এলেন। হযরত ইবরাহিম আ. চলতে চলতে একটি টিলার ওপর এমন স্থানে পৌঁছলেন যে তাঁর পরিবারবর্গ (হযরত হাজেরা রা. ও হযরত ইসমাইল আ.) তাঁর দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তখন তিনি বর্তমান কা'বাগৃহের তৎকালীন শূন্যস্থানের দিকে মুখ করে এবং দুই হাত তুলে এই দোয়া করলেন-
رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقُهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ (سورة إبراهيم)
“হে আমার প্রতিপালক, (আপনি দেখছেন যে,) আমি আমার বংশধরদের কতিপয়কে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় (যেখানে খেত-কৃষ্টির নামচিহ্নও নেই) তোমার পবিত্র গৃহের কাছে, হে আমার প্রতিপালক, এইজন্য যে, তারা যেনো সালাত কায়েম করে (যেনো এই সম্মানিত ঘরটি তাওহিদের উপাসনাকারীদের থেকে শূন্য না থাকে)। অতএব তুমি (নিজ অনুগ্রহ ও দয়ায়) কিছু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দিয়ে (জমিন থেকে উৎপন্ন শস্যাদির মাধ্যমে) তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করো, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।" [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৭]
হাজেরা কয়েকদিন পর্যন্ত মশ্ক থেকে পানি এবং স্তন থেকে খেজুর ধুয়ে খাইয়ে শিশুপুত্র ইসমাঈলকে দুধ পান করালেন। অবশেষে এমন সময় এলো যখন পানিও থাকলো না, খেজুরও থাকলো না। তখন তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। যেহেতু তিনি তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত ছিলেন, তাই তাঁর বুকের দুধও শুকিয়ে গিয়েছিল। ফলে শিশু ইসমাঈলও তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত থাকলো। অবস্থা যখন অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করলো এবং শিশু ইসমাঈল অস্থির হয়ে পড়লো, তখন হাজেরা রা. ইসমাঈলকে রেখে দূরে গিয়ে বসলেন। যেনো এমন নিদারুণ সময়ে প্রাণতুল্য পুত্রের মুমূর্ষু দশা নিজের চোখে দেখতে না হয়। কিন্তু একটা তোবে তিনি নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করলেন। হয়তো আল্লাহর কোনো বান্দাকে দেখতে পাবেন অথবা পানি দেখতে; কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না। এরপর শিশুপুত্রের ভালোবাসায় অস্থির হয়ে দৌড়ে তার কাছে এলেন, আবার অপরদিকে নিকটবর্তী পাহাড় মারওয়ার ওপর আরোহণ করলেন। ওখানেও যখন কিছুই দেখতে পেলেন না; আবারো দৌড়ে উপত্যকায় শিশুপুত্রের কাছে চলে এলেন। এভাবে সাতবার এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে দৌড়ালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই জায়গায় পৌঁছে বললেন, “এটাই সেই ‘সাফা ও মারওয়ার মধ্যস্থলে দৌঁড় (সাঈ)’ যা হজের সময় হাজিরা করে থাকে।” সর্বশেষ যখন হযরত হাজেরা মারওয়া পাহাড়ের উপরে ছিলেন, তখন তাঁর কানে একটি আওয়াজ এলো। তিনি চমকে উঠলেন এবং মনে মনে ডাকছে, কান পাতলেন, আবারো সেই আওয়াজ শুনলেন। হাজেরা বললেন, “যদি তুমি কিছু সাহায্য করতে পারো তবে সামনে আসো। আমি তোমার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।” এরপর তিনি দেখলেন আল্লাহর ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল আ.। ফেরেশতা তাঁর পায়ের গোড়ালি দিয়ে সেই স্থানে আঘাত করলেন, যেখানে বর্তমানে যমযম কূপ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সেই স্থান থেকে পানি উঠলে উঠতে লাগলো। হযরত হাজেরা রা. তা দেখে পানির চারদিকে বাঁধ বাঁধতে লাগলেন; কিন্তু পানি উঠলে উঠতেই থাকলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই জায়গায় পৌঁছে বললেন, “আল্লাহ তাআলা ইসমাঈলের মাতার প্রতি রহম করুন, যদি তিনি যমযমকে এভাবে না রুখতেন এবং তার চারপাশে বাঁধ না বাঁধতেন তাহলে আজকে তা এক মহা শক্তিশালী ঝরনায় পরিণত হতো।" হযরত হাজেরা পানি পান করলেন এবং তারপর ইসমাইলকে দুধ পান করালেন। ফেরেশতা হযরত হাজেরাকে বললেন, দুশ্চিন্তা ও ভয় করো না। আল্লাহ তোমাকে এবং তোমার এই শিশুপুত্রকে ধ্বংস করবেন না। এটা বাইতুল্লাহ শরিফের স্থান। তা নির্মাণ করার দায়িত্ব এই শিশু ও তাঁর পিতা হযরত ইবরাহিম আ.-এর অদৃষ্টে নির্ধারিত হয়েছে। এ-কারণে আল্লাহ এই বংশকে ধ্বংস করবেন না। বাইতুল্লাহর সেই স্থানটি কাছেই দেখা যাচ্ছিলো; কিন্তু পানির স্রোত ডান দিকের ও বাম দিকের সেই অংশকে বরাবর করে যাচ্ছিলো।
সে-সময়েই বনি জুরহামের একটি গোত্র ওই উপত্যকার কাছে এসে থামলো। তারা দেখলে কিছুটা দূরেই পাখি উড়ছে। জুরহাম গোত্রের লোকেরা বললো, এটা পানির লক্ষণ। ওখানে অবশ্যই পানি আছে। জুরহামিরা এসে হযরত হাজেরার কাছে ওই স্থানের বসবাস করার অনুমতি প্রার্থনা করলো। হযরত হাজেরা বললেন, অবস্থান করতে পারো, তবে পানিতে মালিকানাস্বত্বের অংশীদার হতে পারবে না। জুরহামিরা আনন্দের সঙ্গে তা মেনে নিলো এবং ওখানেই বসবাস করতে শুরু করলো। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হাজেরা নিজেও পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও সঙ্গলাভ করতে চাচ্ছিলেন। কেউ যেনো ওখানে এসে বসবাস করে। তাই তিনি আনন্দের সঙ্গে বনি জুরহামকে ওখানে বসবাস করার অনুমতি দিলেন। জুরহামিরা লোক পাঠিয়ে নিজ নিজ বংশের অবশিষ্ট লোকরদেরকে ওখানে নিয়ে এলো। তারা ওখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করতে লাগলো। এদের মধ্যেই হযরত ইসমাইল আ. থাকতেন এবং খেলাধুলা করতেন। জুরহামি লোকদের থেকে তাদের ভাষা শিখতেন। ইসমাইল আ. বড় হয়ে উঠলে তাঁর চাল-চলন এবং তাঁর সৌন্দর্য ও কান্তি জুরহামিদের খুব পছন্দ হলো। তারা নিজ বংশের এক কন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে করিয়ে দিলো। এর কিছুকাল পরেই হযরত হাজেরা রা.-এর ইন্তেকাল হলো। হযরত ইবরাহিম আ. প্রায়শই তাঁর পরিবারকে দেখার জন্য ওখানে আসতেন। তিনি একবার ওখানে এলেন। তখন ইসমাইল আ. ঘরে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, জীবিকার অন্বেষণে বাইরে গেছেন। ইবরাহিম আ. জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের দিনকাল চলছে কীভাবে? ইসমাইলের স্ত্রী বললেন, খুব বিপদ-আপদ ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলছে এবং আমরা অত্যন্ত দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে আছি। ইবরাহিম আ. এসব কথা শুনে বললেন, ইসমাঈলকে আমার সালাম বলো এবং তাঁকে বলো, তোমার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে ফেলো। ইসমাঈল আ. ঘরে ফিরে এসে ইবরাহিম আ.-এর নবূওতের নূরের আভাস পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেউ এসেছিলেন কি? তাঁর স্ত্রী সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন এবং ইবরাহিম আ.-এর নির্দেশের কথা শোনালেন। ইসমাঈল আ. তিনি আমার পিতা ইবরাহিম ছিলেন। তাঁর পরামর্শ হলো আমি যেনো তোমাকে তালাক প্রদান করি। সুতরাং আমি তোমাকে বিবাহ-বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলাম।
ইসমাঈল আ. এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। আবার একদিন ইবরাহিম আ. ইসমাঈল আ.-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর ঘরে তাশরিফ আনলেন এবং আগের মতোই তাঁর স্ত্রীকে জীবনজীবিকার কথা জিজ্ঞেস করলেন। ইসমাঈল আ.-এর স্ত্রী বললেন, আল্লাহপাকের শুকরিয়া, আমাদের দিনাতিপাত ভালোই চলছে। ইবরাহিম আ. জিজ্ঞেস করলেন, খাদ্য কী? ইসমাঈল আ.-এর স্ত্রী বললেন, গোশত। ইবরাহিম আ. জিজ্ঞেস করলেন, পান করো কী? ইসমাঈল আ.-এর স্ত্রী বললেন, পানি। ইবরাহিম আ. দোয়া করলেন, হে আল্লাহ, তাঁদের গোশত ও পানিতে বরকত দান করো। এরপর বিদায়কালে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, তোমার স্বামীকে বলো, সে যেনো তার গৃহের চৌকাঠ সুরক্ষিত রাখে। হযরত ইসমাঈল আ. ঘরে ফিরে এলে তাঁর স্ত্রী যাবতীয় ঘটনা শোনালেন এবং ইবরাহিম আ.-এর নির্দেশের কথাও বললেন। ইসমাঈল আ. বললেন, ইনি আমার পিতা ইবরাহিম আ.। তাঁর নির্দেশ এই যে, তুমিই যেনো গোটা জীবন আমার জীবনসঙ্গিনী থাকো।
এই দীর্ঘ হাদিসটি সহিহ বুখারির কিতাবুল ক্’ইয়া (স্বর্গ অধ্যায়) এবং কিতাবুল আম্বিয়া (নবীগণ অধ্যায়) দু-জায়গাতেই উদ্ধৃত করা হয়েছে। রেওয়ায়েত দুটি থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, হযরত ইসমাঈল আ. কৃষি-ফসলহীন উপত্যকায় অর্থাৎ মক্কায় শুন্যাণালী অবস্থায় পৌঁছে ছিলেন।
কিছু সাঈদ সুলাইমান নবি তাঁর ‘আদ্দুর কুরআন’ গ্রন্থে তাওরাতের রেওয়ায়েত হতে এ কথা লিখেছেন যে, হযরত ইসমাইল আ. জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে পৌছেছিলেন। তিনি কুরআন মাজিদের নিম্নলিখিত আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করছেন—
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ () فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ () فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ (سورة الصافات)
“হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ (পুত্র) সন্তান দান করো।” সুতরাং আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি (ধৈর্যশীল) পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। এরপর সে যখন তাঁর পিতার সঙ্গে কাজ করার (দৌড়ানোর) মতো বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহিম বললো, “বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন, তোমার অভিমত কী বলো?” সে বললো, “হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।” [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১০০-১০২]
وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ () وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مُبِينٌ (سورة الصافات)
'আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের, সে ছিলো এক নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও; তাদের বংশধরদের মধ্যে কতিপয় সৎকর্মপরায়ণ এবং কতিপয় নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।' [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১১২-১১৩]
رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ
“হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার বংশধরদের কতিপয়কে বসবাস করালাম (খেত-খামারহীন) অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের কাছে।” [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৭]
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَهَبْ لِي عَلَى الْكِبَرِ إِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ (سورة إبراهيم)
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনে থাকেন।" [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৯]
সাইয়িদ সুলাইমান নদবি উপরিউক্ত আয়াতগুলো থেকে এভাবে প্রমাণ গ্রহণ করেন যে, সুরা আস-সাফফাতের প্রথম আয়াতটিতে 'তার সঙ্গে দৌড়ানোর/কাজ করার বয়সে পৌঁছেলো' কথা থেকে বুঝা যায় ইসমাইল আ. জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে উপনীত হওয়া পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম আ.-এর সঙ্গে ছিলেন। আর শেষের আয়াতটি এ-কথা প্রমাণ করে যে, ইসহাক আ. তখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ইসমাইল আ. ইসহাক আ. থেকে ১৩ বছরের বড় ছিলেন। তা ছাড়া সুরা ইবরাহিমের আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায়, ইসমাইল আ.-কে যখন মক্কায় আনা হলো তখন তিনি জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে উপনীত হয়েছিলেন। এ-কারণেই তো ইবরাহিম আ. তাঁর দোয়ার মধ্যে দু-পুত্রের কথাই উল্লেখ করেছেন।
এই প্রমাণ গ্রহণের জন্য সাইয়িদ সুলাইমান নদবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির হাদিসটিকে ইসরাইলি রেওয়ায়েত বলে সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু সাইয়িদ সাহেবের এই দাবি সঠিক নয় এবং তাঁর পেশকৃত আয়াতগুলো দ্বারা তার সমর্থনও পাওয়া যায় না।
প্রথমত, এ-কারণে যে, সুরা আস-সাফফাতে فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْي যখন তাঁর সঙ্গে কাজ করার/ দৌড়াবার বয়সে উপনীত হয়েছেন' কথার 'ইসমাইল আ. ইবরাহিম আ.-এর ছায়াতলে ফিলিস্তিনেই প্রতিপালিত হয়েছেন' অর্থ গ্রহণ করা তখনই শুদ্ধ হতে পারতো যদি এই বাক্যের পরে আয়াতের মধ্যে অন্যকোনো বাক্যে হযরত ইসমাইল আ.-এর মক্কায় পৌঁছা সম্পর্কে উল্লেখ করা না হতো। তাহলে হযরত ইসমাইল আ.-এর কুরবানির সঙ্গে সঠিক সম্বন্ধস্থাপন হতে পারতো। কেননা, ইসলামের সকল উলামায়ে কেরام এ-বিষয়ে একমত এবং সাইয়িদ সুলাইমান সাহেবও এ-কথা মানেন যে, কুরবানির ঘটনাটি হযরত ইসমাইল আ.-এর মক্কার জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর আয়াতে বলা হয়েছে যে, ইসমাইল আ. যখন জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে উপনীত হলেন তখন তাঁর পিতা তাঁর কাছে নিজের স্বপ্ন-বৃত্তান্ত বর্ণনা করেন। সুতরাং সাইয়িদ সাহেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই আয়াতে বেশ গোলমাল পরিলক্ষিত হয়। অথচ এটা কুরআন মাজিদের বক্তব্য-পদ্ধতি ও বর্ণনা-রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত যে, একই আয়াতের মধ্যে এমন গোলমাল সৃষ্টি করা, যাতে অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি জীবনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।
দ্বিতয়ত, এ-কারণে যে, সুরা আস-সাফফাতের মধ্যে ইসমাইল আ. সম্পর্কে যে-ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা 'যবহে আযিম' অর্থাৎ কুরবানির ঘটনা, মক্কায় পৌঁছার ঘটনা নয়। অবশ্য কুরবানির ঘটনাটি নিঃসন্দেহে ইসমাইল আ.-এর জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সে উপনীত হওয়ার সময়কার ঘটনা এবং ইসহাক আ. তখন জন্মগ্রহণ করেছেন।
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, হযরত ইবরাহিম আ. যদিও হাজের রা. ও ইসমাইল আ.-কে মক্কার মরুপ্রান্তরে ত্যাগ করে এসেছিলেন, কিন্তু তিনি পিতা ছিলেন, নবী ছিলেন; কীভাবে তিনি স্ত্রী ও পুত্রকে ভুলে থাকতে পারতেন এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে কীভাবে বিমুখ হতে পারতেন? তিনি প্রায়শই ওই পানি ও তৃণহীন প্রান্তরে আসতেন এবং তাঁর পরিবারবর্গের দেখাশোনা করে থাকতেন। فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ আর আয়াতটির অর্থ এটাই। সুতরাং হযরত ইসহাক আ.-এর সুসংবাদের উল্লেখ সম্পূর্ণ যথাস্থানেই করা হয়েছে। সাইয়িদ সুলাইমান সাহেব নিজে তাওরাতের একটি আয়াতকে খণ্ডন করে বলছেন:
"তাওরাতে এ-কথার উল্লেখ নেই যে হযরত ইবরাহিম আ.-ও সঙ্গে এসেছিলেন। কিন্তু এমন হতভাগ্য কে আছে যে তার প্রিয় শিশুকে, যার জন্মের জন্য সে আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করেছে, আল্লাহর দরবারে যার জীবিত থাকার জন্য দোয়া করেছে, সেই স্নেহের শিশুকে নিঃসঙ্গ করে পানি ও তৃণলতাহীন মরুময় স্থানে চিরকালের জন্য যেতে দেবে?" এমনিভাবে সুরা ইবরাহিম-এর আয়াতে عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ 'আপনার সম্মানিত ঘরের কাছে' কথাটির পরে এই বাক্য রয়েছে-
رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ
"হে আমার প্রতিপালক, এইজন্য যে, তারা যেনো সালাত কায়েম করে। অতএব তুমি কিছু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও।” [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৭]
এ থেকে বোঝা যায়, হযরত ইবরাহিম আ.-এর এই দোয়া বাইতুল্লাহ শরিফ নির্মিত হওয়ার পরের ঘটনা। আর আয়াতের পূর্বাপর সম্পর্ক স্পষ্টভাবে এটাকেই বুঝাচ্ছে। এই আয়াতে নামায কায়েম করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হজের প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে এতে। এই আয়াতে এখানকার অধিবাসীদের জন্য রিযিকের সচ্ছলতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পাচ্ছে। আর এসব বিষয়ের প্রার্থনা তখনই সমীচীন হতে পারে যখন বাইতুল্লাহ শরিফ পূর্ণ নির্মিত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। অবশ্য আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের রেওয়ায়েতেও এই দোয়াটির উল্লেখ রয়েছে। তা থেকে বোঝা যায়, নিজের বংশধরকে এখানে রেখে যাওয়ার সময় হযরত ইবরাহিম আ. যে-দোয়া করেছিলেন, সেটাও এই দোয়ার কাছাকাছি ছিলো। এ-কারণে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা.-এর রেওয়ায়েতে প্রমাণস্বরূপ এই আয়াতটিকে উদ্ধৃত করে দেয়া হয়েছে। এই অর্থ এই নয়, এটাই অবিকল সেই দোয়া, যে-দোয়া ইবরাহিম আ. তখন করেছিলেন। আর তাতে হযরত ইসহাকেরও উল্লেখ ছিলো। যেখানে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. নিজেই বর্ণনা করছেন যে, এই ঘটনা স্তন্যপানকালীন ঘটনা, সেখানে তিনি কীভাবে এ-কথা বলতে পারেন যে, ইবরাহিম আ. তখন এমন দোয়া করেছিলেন, যার শেষের দিকে হযরত ইসমাইলের সঙ্গে হযরত ইসহাকের জন্মেরও উল্লেখ রয়েছে?
তৃতীয়ত, এই অনবাদ ভূখণ্ডের প্রতিটি খণ্ডে ও আনাছে-কানাছে লবণাক্ত পানি ছাড়া মিঠা পানির নামগন্ধও নেই। আধুনিক যুগে নতুন নতুন যন্ত্রপাতির সাহায্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও ওখানাকার মাটি থেকে মিঠা পানি বের করা অসম্ভব বিষয়ই থেকে গেছে। তবে যমযমের অস্তিত্ব ওখানে কেমন করে হলো? ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দিক থেকে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ-সম্পর্কে কুরআন মাজিদের আয়াত কিছুই বলে না; কিন্তু সহিহ বুখারিতে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত এই দুটি হাদিস এই কূপটির অস্তিত্বের ইতিহাস বর্ণনা করছে। হাদিস দুটিতে হযরত ইসমাইল আ. তখন স্তন্যপায়ী শিশু ছিলেন বলে প্রকাশ পাচ্ছে। আর তাওরাতেও ওই ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা ওইসব আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যা থেকে হযরত ইসমাইল আ. দুগ্ধপোষ্য শিশু বলে প্রকাশ পাচ্ছে।
যাইহোক। যদিও হযরত ইসমাইল আ. কোন্ বয়সে মক্কায় পৌছেছিলেন তা কুরআন মাজিদের কোনো আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় না, কিন্তু সহিহ বুখারির রেওয়ায়েতসমূহ বলে যে, সেই সময়টা ছিলো হযরত ইসমাইল আ.-এর মাতৃস্তন পানের সময়। আর এটাই সঠিক। সুতরাং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদিসটি ইসরাইলি রেওয়ায়েতের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং ওহির ব্যাখ্যাকার হাদিসের বর্ণিত বিস্তারিত বিবরণই বিশুদ্ধ বর্ণনা।

টিকাঃ
৩৬. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২১, আয়াত ৯-১২।
৩৭. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২১, আয়াত ১৩।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 জবহে আযিম বা কুরবানি

📄 জবহে আযিম বা কুরবানি


সাধারণ মানুষের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার মুআমালা যেমন হয়, আল্লাহপাকের দরবারে সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মহাপুরুষদের সঙ্গে তাঁর মুআমালা তেমন হয় না। তাঁদেরকে পরীক্ষা এবং বিপদাপদের কঠিন থেকে কঠিনতম ধাপসমূহ অতিক্রম করতে হয়। আর প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর জন্য জান সোপর্দ করে দেয়া, আত্মসমর্পণ করা এবং আল্লাহর আদেশের প্রতি সম্মতি ও সন্তুষ্টির পরিচয় দিতে হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামকে তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা ও বিপদাপদে নিপতিত করা হয়।
হযরত ইবরাহিম আ.-ও উচ্চ মর্যাদাবান নবী ও রাসুল ছিলেন। এজন্য তাঁকেও বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা ও বিপদাপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে এবং তিনি মর্যাদার উচ্চতার প্রেক্ষিতে বরাবরই পরীক্ষায় সফলকাম প্রমাণিত হয়েছেন।
তখন তাঁকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো তখন তিনি যে-চূড়ান্ত ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরে যে-সন্তুষ্টির প্রমাণ দিয়েছে, যে-দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অটল থেকেছে তা কেবল তাঁরই যোগ্য কাজ ছিলো। এরপর যখন হযরত হাজেরা রা. ও হযরত ইসমাইল আ.-কে মক্কার অনাবাদ পাথুরে ভূমিতে ছেড়ে আসার নির্দেশ দেয়া হলো তাও সাধারণ পরীক্ষা ছিলো না। সেটা ছিলো কঠিন পরীক্ষার সময়। বার্ধক্য ও বুড়ো বয়সের নানা ধরনের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র, দীর্ঘ দিবস ও রজনীর প্রর্থনার ফল এবং পরিবারের আশার আলো ইসমাইলকে কেবল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে পানি ও তৃণলতাহীন মরু প্রান্তরে ছেড়ে দিয়ে আসছেন। একবার পেছনে ফিরেও তার দিকে তাকাচ্ছেন না, পাছে এমন না হয় যে, পিতৃস্নেহ উথলে ওঠে এবং আল্লাহর আদেশ পালনে কোনো প্রকার ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটে যায়।
এই দুটি কঠিন পরীক্ষার মঞ্জিল অতিক্রম করার পর একটি তৃতীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে, যা ছিলো আগের দুই পরীক্ষার চেয়েও অধিক পিত্ত বিগলনকারী ও হৃদয়বিদারক পরীক্ষা। এটাই একাধারে তিন রাত ইবরাহিম আ. স্বপ্নে দেখছেন যে, আল্লাহ তালাআ বলছেন, হে ইবরাহিম, তুমি আমার রাস্তায় তোমার একমাত্র পুত্রকে কুরবানি করো।
আম্বিয়ায়ে কেরামের স্বপ্ন 'সত্য স্বপ্ন' এবং আল্লাহর ওহি হয়ে থাকে। সুতরাং হযরত ইবরাহিম আ. সম্মতি ও আত্মসমর্পণের মূর্ত প্রতীক হয়ে সত্বর আল্লাহর আদেশ যথাসম্ভব পালনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু এ-বিয়ষটি একা নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো না; বরং এই পরীক্ষার অন্য একটি অংশ ছিলো তাঁর পুত্র, যাঁকে কুরবানি করার আদেশ দেয়া হয়েছে। তাই তিনি পুত্রের কাছে স্বপ্নের বৃত্তান্ত এবং আল্লাহপাকের নির্দেশ বর্ণনা করলেন। পুত্র ছিলেন হযরত ইবরাহিম আ.-এর মতো মুজাদ্দিদে আম্বিয়ার পুত্র। তৎক্ষণাৎ তিনি আত্মসমর্পণের মস্তক অবনত করে দিলেন এবং বললেন, এটাই যদি আল্লাহ ইচ্ছা হয়ে থাকে, হবে ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে সহনশীল পাবেন। এই কথোপকথনের পর পিতা-পুত্র নিজেদের কুরবানি পেশ করার জন্য অরণ্যের দিকে যাত্রা করলেন। পিতা পুত্রের সম্মতি পেয়ে জবাইয়ের পশুর মতো পুত্রের হাত-পা বেঁধে ফেললেন। ছুরি ধার দিলেন এবং পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে জবাই করতে উদ্যত হলেন। তৎক্ষণাৎ হযরত ইবরাহিম আ.-এর ওপর আল্লাহর ওহি নাযিল হলো: হে ইবরাহিম, তুমি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছো। নিঃসন্দেহে এটা বড় কঠিন পরীক্ষা ছিলো। এখন পুত্রকে ছেড়ে দাও এবং তোমার কাছে এই দুম্বাটি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পুত্রের পরিবর্তে সেটিকে জবাই করো। আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে এভাবেই বিনিময় প্রদান করে থাকি। হযরত ইবরাহিম আ. পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখতে পেলেন, ঝোপের কাছে একটি দুম্বা দাঁড়িয়ে আছে। ইবরাহিম আ. আল্লাহর শোকর আদায় করে সেই দুম্বাটিকে জবাই করলেন।
এটাই সেই কুরবানি যা আল্লাহর দরবারে এমনভাবে কবুল হয়েছে যে স্মৃতিস্মারক হিসেবে তা সবসময়ের জন্য ইবরাহিমি মিল্লাতের প্রতীক সাব্যস্ত হয়ে থাকলো এবং আজো প্রতি বছর যিলহজ মাসের দশ তারিখে ইসলামি বিশ্বে এই প্রতীকটি পালন করা হয়।
কিন্তু এই পূর্ণ ঘটনার মধ্য থেকে এ-কথা প্রমাণিত হলো না যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর সন্তানদের মধ্যে কুরবানির পাত্র কে—ইসমাইল আ. না ইসহাক আ.?
কুরআন মাজিদ যদিও যাকে জবাই করা হয়েছে তার নাম উল্লেখ করে নি, কিন্তু যেভাবে ঘটনাটি আলোচনা করেছে, তা থেকে বাধাহীনভাবে প্রকাশ পায় যে, কুরআন মাজিদের আয়াত ইসমাইল আ.-কেই 'যবিহ' বা কুরবানির পাত্র বলছে। এবং এটাই সঠিক ও প্রকৃত তথ্য।
সুরা আস-সাফফাতে এই ঘটনাকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে—
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ () فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ () فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ )) فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ () وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ ) قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ () إِنْ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ () وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ () وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ () سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ () كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (( إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ () وَبَشِّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ نَبِيًّا منَ الصَّالِحِينَ () وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِمَا مُحْسِنٌ وَظَالِمٌ لِنَفْسِهِ مبين (سورة الصافات)
"হে আমার প্রতিপালক, আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ (পুত্র) সন্তান দান করো।” সুতরাং আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। এরপর সে যখন তাঁর পিতার সঙ্গে কাজ করার মতো বয়সে উপনীত হলো তখন ইবরাহিম বললো, "বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন, তোমার অভিমত কী বলো?" সে বললো, "হে আমার পিতা, আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।" যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলো এবং ইবরাহিম তার পুত্রকে কাত করিয়ে শায়িত করলো, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, "হে ইবরাহিম, তুমি স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে!"- এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয় ইহা ছিলো এক স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে মুক্ত করলাম এক কুরবানির বিনিময়ে। আমি তা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি। ৪০ ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এইভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। সে ছিলো আমার মুমিন বান্দাদের অন্যতম। আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের (জন্মের), সে ছিলো এক নবী, সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও; তাদের বংশধরদের মধ্যে কতিপয় সৎকর্মপরায়ণ এবং কতিপয় নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।' [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১০০-১১৩]
এই আয়াতগুলোতে হযরত ইবরাহিম আ.-এর দুই পুত্রের সুসংবাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম পুত্রের নাম নেয়া হয় নি; শুধু ধৈর্যশীল বালক বলেই তাঁর মহান কুরবানির ঘটনা আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় পুত্রের সুসংবাদ নাম উল্লেখ করেই প্রদান করা হয়েছে: "আমি তাকে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করলাম।" আর এটা স্বতসিদ্ধ বিষয় যে, ইবরাহিম আ.-এর দুই পুত্র ইসমাইল ও ইসহাকের মধ্যে ইসমাইল বয়সে বড় এবং ইসহাক ছোট। সুতরাং শেষে আয়াতে যখন নাম উল্লেখ করেই ছোট পুত্রের কথা বর্ণনা করা হলো তখন প্রথম আয়াত হযরত ইসমাইল ছাড়া আর কার আলোচনা হতে পারে? নিঃসন্দেহে তিনি হযরত ইসমাইল আ.। তিনিই বলেছিলেন, "নিশ্চয় আমাকে সহনশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।" এবং তাঁকেই ইবরাহিম আ. কাত করে শুইয়ে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি "আমি তাকে মুক্ত করলাম এক কুরবানির বিনিময়ে"-এর মর্যাদা লাভ করেছিলেন। তা ছাড়া বিষয় এই যে, কেবল কুরআন মাজিদই ইসমাইলকে 'জবাইয়ের পাত্র' বলে না; বরং তাওরাতের আয়াতসমূহে গভীর দৃষ্টিতে পাঠ করলে বুঝা যাবে, তাওরাত এটাই বলে যে, ইসমাইল আ. এবং কেবল ইসমাইল আ.-ই 'জবাইর পাত্র'।
"এসব কথার পর আল্লাহ ইবরাহিমকে পরীক্ষা করলেন। তিনি তাঁকে বললেন, তুমি তোমার পুত্রকে, হ্যাঁ, তোমার একমাত্র পুত্রকে, যাকে তুমি অত্যন্ত স্নেহ করো-ইসহাককে সঙ্গে নাও এবং মুরিয়া নামক স্থানে যাও। তাকে ওখানকার পাহাড়গুলো থেকে একটির ওপর রাখো, যা আমি তোমাকে বলে দেবো। 'পুড়িয়ে ফেলা'র অনুরূপ কুরবানির জন্য তাকে উৎসর্গ করো।"৪১
"তখন পুনরায় আল্লাহর ফেরেশতা আসমানের ওপর থেকে ইবরাহিমকে ডেকে বললো, আল্লাহপাক বলেন, যেহেতু তুমি এরূপ কাজ করেছো, এবং নিজের পুত্র, একমাত্রই পুত্র, আফসোস করো না। আমি আমার সত্তার খসম খাচ্ছি। আমি বরকত দিতেই তোমাকে বরকত দিবো।"৪২
তাওরাতের এসব বাক্যের চিহ্নিত অংশগুলো-তোমার একমাত্র পুত্র এবং নিজের একমাত্র পুত্র-এর প্রতি লক্ষ করুন এবং তাওরাতের পূর্বোক্ত আয়াতগুলো পাঠ করুন যাতে ইসমাইল আ.-কে হযরত ইবরাহিম আ.-এর একমাত্র পুত্র বলা হয়েছে। [একমাত্র পুত্র বলার] কারণ এই যে, হযরত ইসমাইল আ.-এর বয়স যখন তেরো বছর, তখন হযরত ইসহাক আ. জন্মগ্রহণ করেন। এ থেকে কি এ-কথা পরিষ্কার বুঝা যায় না যে, 'যবিহ' বা 'কুরবানির পাত্র' হওয়া সন্তানটিকে বনি ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করার জন্য এটা লোভাত্মক অযৌক্তিকতা, যা ইহুদি জাতিকে এই পরিবর্তনের প্রতি উৎসাহিত করেছে যে, তারা ওই বাক্যে 'একমাত্র পুত্র'-এর সঙ্গে ইসহাক আ.-এর নামটি অযথা যোগ করে দিয়েছে? সুতরাং এই সংযোজন তাওরাতের বর্ণনাসমূহেরও বিরোধী এবং কুরআন মাজিদের বর্ণনারও বিরোধী। এবং তা নিশ্চিতভাবে প্রকৃত ঘটনা ও প্রকৃত সত্যেরও বিপরীত।
যাইহোক। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে 'আল্লাহর উদ্দেশে কুরবানির পাত্র' হওয়ার মহান মর্যাদা হযরত ইসমাইল আ.-এর জন্যই নির্ধারিত ছিলো।
ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (سورة الجمعة) 'তা আল্লাহরই অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আল্লাহ তো মহা অনুগ্রহশীল।' [সুরা জুমআ: আয়াত ৪]
অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ইসলামের কতিপয় আলেমকেও এই ভ্রমে আক্রান্ত দেখা যাচ্ছে যে ইসমাইল আ. কুরবানির পাত্র ছিলেন না ইসহাক আ. কুরবানির পাত্র ছিলেন। এ-প্রসঙ্গে তাঁরা যেসব প্রমাণ পেশ করছেন, আফসোস, ওইসব প্রমাণের ক্ষেত্রে আমরা তাঁদের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। কেননা, তাঁদের প্রমাণগুলোর ভিত্তি ও বুনিয়াদ কেবল কল্পনা ও ধারণার ওপর স্থাপিত; কোনো দৃঢ় বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। যেমন: তাদের একটি বড় প্রমাণ এই যে, সুরা আস-সাফফাতের উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে প্রথম আয়াত فَبَشِّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ সুতরাং আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।'-এর মধ্যে কোনো নাম উল্লেখ করা হয় নি এবং তার পরের আয়াতগুলোতে সেই ধৈর্যশীল পুত্রের কুরবানি সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে وَبَشَّرْنَاهُ بِإِسْحَاقَ 'আমি তাকে ইসহাকের (জন্মের) সুসংবাদ দিয়েছিলাম।' তাহলে কি সেই غُلَامٍ حَلِيمٍ বা স্থিরবুদ্ধি পুত্রও এই ইসহাক নয়? কিন্তু আপনি নিজেই অনুমান করুন এটা কত বড় ভুল প্রমাণ। প্রথমত, এই আয়াতগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক অনুধাবন করুন। তারপর চিন্তা করুন 'আমি তাকে এক স্থিরবুদ্ধি পুত্রের সুসংবাদ দিলাম' বাক্যের পরে 'আমি তাকে ইসহাকের (জন্মের) সুসংবাদ দিয়েছিলাম' বাক্যটিকে সংযোজক অব্যয়ের মাধ্যমে যেভাবে পৃথক করে দেয়া হয়েছে তাতে কি আরবি ব্যাকরণ অনুসারে এই দুটি বাক্যে উল্লেখিত ব্যক্তিদ্বয়কে একই ব্যক্তি সাব্যস্ত করার কোনো অবকাশ আছে? বিশেষত, যখন তাঁদের উভয়ের সুসংবাদ উল্লেখ করার সঙ্গে সঙ্গে পৃথক পৃথকভাবে তাঁদের গুণাবলিও বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। 'কাসাসুল আম্বিয়া' কিতাবের রচয়িতা আল্লামা আবদুল ওয়াহহাব নাজ্জার এ-ক্ষেত্রে وَبَارَكْنَا عَلَيْهِ وَعَلَى إِسْحَاقَ ‘আমি তাকে বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাককেও' আয়াতে عَلَيْهِ শব্দের সর্বনামটির উদ্দেশ্য ذبیح অর্থাৎ কুরবানির পাত্র বলেছেন এবং তিনি এর অনুবাদ করেছেন এমন: আমি বরকত নাযিল করেছি সেই-এর ওপর এবং ইসহাকের ওপর। তিনি এই দাবি করেছেন, পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করার পর ইসহাক আ.-এর সুসংবাদ প্রদানের উল্লেখ এ-কথার অকাট্য প্রমাণ যে, কুরবানির ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুত্র ইসহাক ব্যতীত অন্যকেউ, ইসহাক নন; বরং তিনি কেবল ইসমাইল আ.-ই হতে পারেন।
তা ছাড়া এই ঘটনাটি মক্কার অনতিদূরে 'মিনা' নামক স্থানে ঘটেছিলো। তাওরাতের এই বাক্য—একমাত্র পুত্র—এ-কথার জ্বলন্ত সাক্ষ্য যে, ইসমাইল আ.-এর কুরবানি পর্যন্ত ইসহাক আ.-এর জন্ম হয় নি। সুতরাং তাওরাতের এই ঘটনাকে 'মুরিয়ার' নিকট বলা ওইরকমের পরিবর্তন, যা থেকে তাওরাতের কোনো অধ্যায়ই মুক্ত নয়। আর উল্লিখিত সত্যের অবিশ্বাস বাস্তব সত্যেরই অবিশ্বাস।
এ-বিষয়টি যদিও অত্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে, কিন্তু আমি এখানে কেবল জরুরি বিষয়গুলোর আলোচনা করেই ক্ষান্ত হচ্ছি।

টিকাঃ
৩৮. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৭, আয়াত ২৩-২৫।
৩৯. তা ছিলো একটি দুম্বা, যা বেহেশত থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো।
৪০. ঈদুল আযহায় কুরবানির রীতি প্রবর্তিত করে।
৪১. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২২, আয়াত ১-২।
৪২. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২২, আয়াত ১৫-১৬।
৪৩. তাওরাতের পরিবর্তন ও বিকৃত সম্পর্কে জানতে মাওনালা রহমতুল্লাহ কিরানবি (কুদ্দিসা সিররুহু) কর্তৃক রচিত اظہار الحق গ্রন্থটির পাঠ প্রণিধানযোগ্য।
৪৪. এ-বিষয় মাওলানা আবদুল হামিদ সাহেব রহ. রচিত الرأى النجيح في من هو الذبيح পুস্তিকাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সংকলন।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 কা’বাগৃহ নির্মাণ

📄 কা’বাগৃহ নির্মাণ


হযরত ইবরাহিম আ. ফিলিস্তিনে অবস্থান করলেও সবসময়ই ইসমাইল আ. ও হযরত হাজেরা রা.-কে দেখার জন্য মক্কায় আসতেন। এই সময়ের মধ্যে হযরত ইবরাহিম আ.-এর প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ এলো : কা'বাতুল্লাহ নির্মাণ করো। হযরত ইবরাহিম আ. হযরত ইসমাইল আ.-এর সঙ্গে আলোচনা করে পিতা-পুত্র মিলে বাইতুল্লাহ শরিফের নির্মাণকাজ শুরু করে দিলেন।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. তাঁর সহিহুল বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ফাতহুল বারি'র ৮ম খণ্ডের ১৩৮ পৃষ্ঠায় রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন। যা থেকে প্রকাশ পায় যে, বাইতুল্লাহ শরিফের ভিত্তি প্রথমে আদম আ.-এর হাতে স্থাপিত হয়েছিলো। ফেরেশতারা তাঁকে সেই স্থানটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে কা'বাগৃহ নির্মিত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হাজার হাজার বছরে ঘটনাবলি বহুকাল আগেই সেটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। অবশ্য হযরত ইবরাহিম আ.-এর কালে নিশ্চিহ্ন গৃহটি একটি টিলা বা মাটির ঢিবির আকারে বিদ্যমান ছিলো। আল্লাহর ওহি হযরত ইবরাহিম আ.-কে এই স্থানটির কথা বলে দিয়েছিলো। তিনি হযরত ইসমাইল আ.-এর সহায়তায় তা খুঁড়তে শুরু করলেন। প্রাচীন নির্মাণের ভিত্তিমূল দেখা যেতে লাগলো। সেই ভিত্তিমূলের ওপরই হযরত ইবরাহিম আ. কর্তৃক বাইতুল্লাহ শরিফ নির্মিত হলো। কিন্তু কুরআন মাজিদ বাইতুল্লাহ নির্মাণের আলোচনা ইবরাহিম আ. থেকেই শুরু করেছে এবং তার পূর্ববর্তী অবস্থার কোনো আলোচনা করে নি।
সারকথা হলো, কা'বাগৃহ নির্মাণের পূর্বে সমগ্র বিশ্বে এবং পৃথিবীর আনাচে-কানাচে প্রতিমাসমূহ এবং নক্ষত্রমণ্ডলীর পূজার জন্য মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিলো। আর ওইসব মূর্তি ও নক্ষত্রের নামে বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করা হতো।
মিসরবাসীদের ওখানে সূর্যদেবতা, ইযদারিস, ইযিয়াস, হুরিয়াস এবং বাআ'ল দেবতা সবার নামেই মন্দির ছিলো। আশুরিরা বাআ'ল দেবতার মন্দির নির্মাণ করেছিলো এবং ধাতু ও প্রস্তর দ্বারা আবুল হাওল (স্ক্রিংস)- এর প্রতিকৃতি নির্মাণ করে রেখেছিলো। এতে তার দৈহিক মহত্বের বিকাশ ঘটিয়েছিলো। কিনআনি সম্প্রদায় প্রসিদ্ধ দুর্গ বাআ'লা বাক্কের ভেতরে সেই বাআ'লের মন্দির নির্মাণ করেছিলো। তা আজ পর্যন্ত স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ বিদ্যমান আছে। গাররাহ-এর অধিবাসীরা 'দাস্তুন' নামক মসনদেবীর মন্দিরে দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্যসমূহ অর্পণ করত। তার মসনদেবীর আকৃতি বানিয়েছিলো মানুষের আর দেহ বানিয়েছিলো মাছের। আর্য্যগণ সূর্যদেবতার সঙ্গে চন্দ্রদেবীর আকৃতি বানিয়ে পূজা করতো। এটির জন্য তারা জাঁকজমকপূর্ণ বিরাট মন্দির নির্মাণ করেছিলো। পারসিকরা আগুনের পবিত্রতা ঘোষণা করে অগ্নিপূজা আরম্ভ করেছিলো। রোমানরা মসিহ আ. এবং কুমারী মারইয়াম আ.-এর মূর্তি বানিয়ে তাদের গির্জাসমূহকে অলঙ্কৃত করেছিলো। আর হিন্দুস্থানের অধিবাসীরা মহাত্মা বুদ্ধদেব, শ্রী রামচন্দ্র, শ্রী মহাবীর, শ্রী মহাদেবকে দেবতা ও অবতার মনে করে কালীদেবী, শীতলাদেবী, সীতাদেবী, পার্বতীদেবী নামে হাজার হাজার মূর্তির পূজা জন্য কেমন কেমন বিরাট বিরাট মন্দির নির্মাণ করেছে। হারদোয়ার (হরিদ্বার), প্রয়াগ, কাশী, পুরী, টেকশালা, সাঁচী এবং বুদ্ধগয়ার মতো তীর্থস্থানসমূহ তার জ্বলন্ত সাক্ষ্য বহন করছে।
কিছু সেগুলোর বিপরীতে কেবল এক আল্লাহর ইবাদত এবং তাঁর একত্বের অঙ্গীকার করে মস্তক অবনত করার জন্য, অথবা এরূপ বলুন, আল্লাহ তা'আলার একত্বের সমুন্নত মস্তক প্রকাশ করার জন্য গোটা দুনিয়ার মূর্তির আড্ডাগুলোর মধ্যস্থলে যে-প্রথম গৃহ আল্লাহর ঘর নামে অভিহিত হলো তা এই ‘বাইতুল্লাহ শরীফ’।
কবি ইকবাল বলেন—
بد দুনিয়ামে গর সবছে হ্যায় পেলা খাদাকা খলিল এক মেমার থা ইস বনা কা
‘ইবরাহিম খলিল যে-গৃহের একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন, তা-ই সমগ্র বিশ্বের বুকে সর্বপ্রথম ইবাদতখানা, যা ‘আল্লাহর ঘর’ নামে অভিহিত হয়েছে।’
কুরআন মজিদ বলছে—
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِّلْعَالَمِينَ (سورة آل عمران)
‘নিশ্চয় মানবজাতির জন্য (আল্লাহকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে) সর্বপ্রথম যে-গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তা তো বাক্কায় (মক্কার অপর নাম বাক্কা), তা (পুরোপুরি) বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী।' (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৯৭)
এবারের নির্মাণের এই মর্যাদা রয়েছে যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর মতো আল্লাহর বন্ধু, অতি উচ্চ মর্যাদাবান নবী এর রাজমিস্ত্রি। আর হযরত ইসমাইল আ.-এর মতো নবী ও আল্লাহর যবিহ (আল্লাহর নামে কুরবানির জন্য উৎসর্গিত) তাঁর জোগাড়ে। পিতা ও পুত্র বাইতুল্লাহর নির্মাণকাজে রত আছেন। যখন কা'বাগৃহের দেয়ালগুলো গাঁথতে গাঁথতে উপরে উঠে গেলো এবং সম্মানিত পিতার হাত উপরে পাথর গাঁথতে অক্ষম হয়ে গেলো তখন আল্লাহর নির্দেশে একটি পাথরকে ভারারূপে ব্যবহার করা হলো। হযরত ইসমাইল আ. নিজের হাতে এটিকে ধরে রাখতেন এবং হযরত ইবরাহিম আ. এর ওপর দাঁড়িয়ে পাথর গেঁথে যেতেন। এই ভারাই সেই স্মৃতিচিহ্ন যা আজো মাকামে ইবরাহিম নামে পরিচিত। এখন যেখানে হাজরে আসওয়াদ (কৃষ্ণ পাথর) লাগানো রয়েছে, যখন নির্মাণকাজ এই সীমায় পৌঁছলো তখন হযরত জিবরাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-কে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন এবং কাছের একটি পাহাড় থেকে হাজরে আসওয়াদকে, যা জান্নাত থেকে আনীত পাথর বলে কথিত, সুরক্ষিত অবস্থায় বের করে তার সামনে রেখে দিলেন, যেনো তা যথাস্থানে লাগিয়ে দেয়া হয়।
বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর নির্মিত হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ.-কে বললেন, এটা ইবরাহিমি দীনের কেবলা এবং আমার সামনে মস্তক অবনত করার প্রতীক। সুতরাং এটিকে একত্ববাদের কেন্দ্র সাব্যস্ত করা হলো। হযরত ইবরাহিম আ. ও ইসমাইল আ. তখন দোয়া করলেন, আল্লাহ তাআলা যেনো তাদেরকে এবং তাদের সন্ত নিদেরকে সালাত কায়েম করা এবং যাকাত প্রদান করার হেদায়েত দান করেন। এসব বিধানের ওপর দৃঢ়তা ও স্থায়িত্বও দান করেন। তা ছাড়া তাদের জন্য নানা ধরনের ফল, মেওয়া ও রিযিকের বরকত দান করেন।
আর সমগ্র বিশ্বের দিগ-দিগন্তের বাসিন্দাদের মধ্য থেকে হেদায়েতপ্রাপ্তদের দলকে এদিকে আকৃষ্ট করে দেন, যেনো তারা দূর-দূরান্ত থেকে এসে হজের কাজগুলো আদায় করে এবং হেদায়েত ও সৎপথপ্রাপ্তির এই কেন্দ্রস্থলে একত্র হয়ে নিজেদের জীবনের সৌভাগ্য লাভ করে।
কুরআন মাজিদ বাইতুল্লাহ শরিফ নির্মাণকালে হযরত ইবরাহিম ও ইসমাইল আ.-এর মুনাজাত, সালাত কায়েম করা এবং হজের করণীয় কার্যাবলী সম্পন্ন করার জন্য আগ্রহ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ এবং বাইতুল তাওহিদ বা একত্ববাদের কেন্দ্রস্থল হওয়ার ঘোষণা জায়গায় জায়গায় উল্লেখ করেছে। তার মহত্ব ও উচ্চ মর্যাদাকে নতুন নতুন বর্ণনাশৈলীতে নিম্নোক্ত আয়াতগুলোতে ব্যক্ত করেছে-
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بَبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَالَمِينَ () فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَقَامُ إِبْرَاهِيمَ وَمَنْ دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ (سورة آل عمران)
'নিশ্চয় মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে-গৃহ (আল্লাহর ইবাদতের ইবাদতখানা ও কেন্দ্ররূপে) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তা তো (এ ইবাদতখানাই) বাক্কায় (মক্কার অপর নাম বাক্কা), তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। তাতে (সত্যধর্মের) অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, (যেমন) মাকামে ইবরাহিম, (অর্থাৎ ইবরাহিম আ.-এর দাঁড়াবার ও ইবাদত করার স্থান যা ওই সময় থেকে আজ পর্যন্ত নিঃসন্দেহে প্রসিদ্ধ ও নির্দিষ্ট রয়েছে।) আর (তার মধ্যে এ-বিষয়টিও যে,) যে-কেউ সেখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ (নিরপত্তা ও হেফাজতের মধ্যে এসে যাবে)। আর (তার মধ্যে এটাও যে,) মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য। এবং কেউ (এই সত্যকে) প্রত্যাখ্যান করলে (এই সেই স্থানের পবিত্রতা ও ফযিলতের প্রতি বিশ্বাস না করলে সে জেনে রাখুক), নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (তিনি নিজের কাজের জন্য কোনো ব্যক্তি বা দলের মুহতাজ বা মুখাপেক্ষী নন।)' (সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৯৭-৯৮]
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنَا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ () وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقَ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ باللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ قَالَ وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ (( وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيلُ رَبُّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ )) رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةٌ لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ () رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الحكيم (سورة البقرة)
'আর সেই সময়কে স্মরণ করো, যখন (মক্কার) ওই গৃহকে (কা'বাগৃহকে) মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল বানিয়েছিলাম (এবং নির্দেশ দিয়েছিলাম), "তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে (চিরকালের জন্য) সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ করো।" এবং ইবরাহিম ও ইসমাইলকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে (সবসময়) পবিত্র রাখতে আদেশ দিয়েছিলাম। (কুফর ও নাফরমানির অসূচিতার মাধ্যমে অপবিত্র করো না।) স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম বলেছিলেন, "হে আমার প্রতিপালক, একে (এই স্থানটিকে, যা দুনিয়ার আবাদ ও উর্বর ভূখণ্ডগুলো থেকে দূরে এবং সজীবতা ও সতেজতা থেকে একেবারে বঞ্চিত) নিরাপদ (শান্তি ও নিরাপত্তার) শহর করো, আর এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে তাদেরকে ফলমূল থেকে জীবিকা প্রদান করো।" (ইবরাহিমের প্রার্থনার জবাবে) তিনি বললেন, (তোমার প্রার্থনা মঞ্জুর করা হলো এবং এখানকার অধিবাসীদের মধ্য থেকে) যে-কেউ কুফরি করবে তাকেও কিছুকালের জন্য (জীবিকার সরঞ্জামাদি দিয়ে) জীবনোপভোগ করতে দেবো, তারপর তাকে জাহান্নামের (কৃতকর্মের) শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করবো (যে-হতভাগ্যরা নেয়ামতের পথ ত্যাগ করে আযাবের পথ অবলম্বন করে, তবে তাদের সে-পথ কতই না মন্দ) এবং কত নিকৃষ্ট তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল! স্মরণ করো, (সেটা ছিলো কী গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবমণ্ডিত সময়) যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবা'গৃহের প্রাচীর তুলছিলো তখন (তাদের হাত তো কাজ করছিলো এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্তরে ও মুখে) তারা (এই দোয়া) বলেছিলো, "হে আমাদের প্রতিপালক, (আপনার দুজন দুর্বল বান্দা আপনার পবিত্র নামে এই গৃহের ভিত্তি স্থাপন করছি) আমাদের এই কাজ গ্রহণ করো, নিশ্চয় তুমি (দোয়াসমূহের) সর্বশ্রোতা, (এবং দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে) সর্বজ্ঞাতা। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত করো এবং আমাদের বংশধর থেকে তোমার এক অনুগত উম্মত বানিও (আপনার দয়া ও অনুগ্রহে আমাদেরকে এই তাওফিক দান করুন যেনো আমরা সত্যিকারের মুসলিম অর্থাৎ আপনার হুকুমের অনুগত হয়ে যাই)। আমাদেরকে ইবাদতের (সঠিক) নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও (আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন)। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (আপনিই একমাত্র সত্তা যিনি আপন রহমতে ক্ষমা করে থাকেন, যাঁর 'রহিম'সুলভ ক্ষমা সীমাহীন)। হে আমাদের প্রতিপালক, (আপনার দয়া ও অনুগ্রহে) তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসুল প্রেরণ করো, যে তোমার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তেলাওয়াত করবে; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে (নিজের নবীসুলভ শিক্ষা ও উপদেশের মাধ্যমে তাদের অন্তরসমূহকে পরিষ্কার ও মার্জিত করবে)। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [সুরা বাকারা: আয়াত ১২৫-১২৯]
وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَنْ لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهَّرُ بَيْتِي للطائفين وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ () وَأَذَنْ فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ () لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَة الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعَمُوا الْبَائِسِ الْفَقِير () ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفْتَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ وَلْيَطُوفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ () ذَلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمْ حُرُمَاتُ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَهُ عِنْدَ رَبِّهِ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ () حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِينَ بِهِ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ ( ذَلِكَ وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ () لَكُمْ فِيهَا مَنَافِعُ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ مَحِلُّهَا إِلَى الْبَيْتِ الْعَتِيقِ (سورة الحج)
'এবং স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা), যখন আমি ইবরাহিমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই গৃহের (সঠিক) স্থান, (তখন নির্দেশ দিয়েছিলাম,) "আমার সঙ্গে কোনো শরিক স্থির করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে এবং যারা সালাতে দাঁড়ায়, রুকু ও সিজদা করে (ইবাদতে তৎপর হয়)। এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে (সব ধরনের যানবাহনে আরোহণ করে), তারা আসবে (দুনিয়ার যাবতীয়) দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে, (এই জন্য আসবে) যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্ত থেকে যা রিযিক দান করেছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (সেগুলোকে কুরবানি করাকালে) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। এরপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ ও অভাবগ্রস্তকে আহার করাও। এরপর তারা যেনো তাদের (দৈহিক) অপরিচ্ছন্নতা দূর করে (ইহরাম ভঙ্গ করে পোশাক খুলে ফেলে) এবং তাদের মানত পূর্ণ করে এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের। এটাই বিধান এবং কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র অনুষ্ঠানগুলোর (এবং আল্লাহর নির্ধারিত সম্মানিত বস্তুগুলোর) সম্মান করলে তার প্রতিপালকের কাছে তার জন্য এটাই উত্তম। আর (এটা স্মরণ রাখো যে,) তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ জন্ত- ওইগুলো ব্যতীত যা তোমাদের শোনানো হয়েছে (কুরআন মাজিদে অবৈধ বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে)। সুতরাং তোমরা বর্জন করো মূর্তিপূজার অপবিত্রতা এবং দূরে থাকো মিথ্যা কথন থেকে, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে এবং তাঁর কোনো শরিক না করে (এই ইবাদতগুলো করো); এবং যে-কেউ আল্লাহর শরিক করে সে যেনো আকাশ থেকে পড়লো, এরপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো, কিংবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করলো। এটাই আল্লাহর বিধান এবং (স্মরণ রেখো) কেউ আল্লাহর নির্দেশনাবলিকে সম্মান করলে তা তার হৃদয়ের তাকওয়াসঞ্জাত (অন্তরের পরহেযগারিমূলক বিষয়সমূহের অন্তর্গত)। এইসব আন'আম তোমাদের জন্য নানাবিধ উপকার রয়েছে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য; এরপর তাদের কুরবানির স্থান প্রাচীন গৃহের কাছে (কা'বাগৃহের কাছে পৌঁছে তাদেরকে কুরবানি করতে হবে)। [সুরা হজ: আয়াত ২৬-৩৩]
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافَ فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ كَذَلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ (سورة الحج)
'এবং (দেখো) উটকে (যাকে দূর-দূরান্ত থেকে এই হজের স্থানে আনা হয়) আমি করেছি আল্লাহর (ইবাদতের) নিদর্শনগুলোর অন্যতম; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান অবস্থায় তাদের ওপর তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো (তাদের জবাই করার সময়)। যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় (জবাই করা হয়ে যাবে) তখন তোমরা তা থেকে আহার করো এবং আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকে এবং যাচঞাকারী অভাবগ্রস্তকে; এইভাবে আমি ওদেরকে (জন্তগুলোকে) তোমাদের অধীন (বশীভূত) করে দিয়েছি যাতে তোমরা (আমার অনুগ্রহের) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (স্মরণ রেখো) আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত; বরং পৌছায় তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি, হৃদয়ের একনিষ্ঠতা)। ৫৪ এইভাবে তিনি এদেরকে (চতুষ্পদ জন্তুগুলোকে) তোমাদের অধীন (বশীভূত) করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এবং এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে পথপ্রদর্শন করেছেন; সুতরাং তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মপরায়ণদেরকে (তাদের আমল কবুল হওয়ার সুসংবাদ রয়েছে)।' [সুরা হজ: আয়াত ৩৬-৩৭]

টিকাঃ
৪৫. যে-পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ইবরাহিম আ. কা'বাগৃহ নির্মাণ করেছিলেন।
৪৬. তাওয়াফ: কা'বাগৃহ প্রদক্ষিণ করাকে তাওয়াফ বলা হয়। এটি হজের একটি বিশেষ রুকন।
৪৭. কিছুকালের জন্য বিশেষ নিয়মে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মসজিদে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকাকে 'ইতিকাফ' বলে। রমযান মাসের শেষ ইতিকাফ পালন করা সুন্নতে কেফায়া।
৪৮. রুকু ও সিজদা সালাতের দুটি রুকন।
৪৯. যিলহজ মাসের প্রথম দশদিন। ভিন্নমতে কুরবানির দিনগুলোতে।
৫০. اليت العتيق-এর দ্বারা আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রাচীন গৃহ অর্থাৎ কা'বাঘরকে বোঝায়। জালালাইন, কাশশাফ, সাফওয়াতুল বায়ান।
৫১. আন'আম দ্বারা উট, গরু, মেষ, ছাগল এবং অন্যান্য অহিংস্র ও রোমন্থনকারী জন্তুকে বুঝায়; যথা: হরিণ, নীলগাই, মহিষ ইত্যাদি। কিন্তু ঘোড়া, গাধা এগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়।
৫২. হারাম-এর সীমানার মধ্যে।
৫৩. উটকে দাঁড়ানো অবস্থায় তার বুকের অগ্রভাগে ছুরি বসিয়ে জবাই করতে হয়। একে নাহর/নহর বলে।
৫৪. وفى ধাতু থেকে নির্গত: অর্থ কষ্টদায়ক বস্তু থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ ভীতিপ্রদ বস্তু থেকে আত্মরক্ষা করা। ইসলামি পরিভাষায় পাপাচার থেকে আত্মরক্ষা করা বা আল্লাহভীতির নাম তাকওয়া। রাগিব ইসফাহানি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, একবার হযরত উমর রা. হযরত উবায় বিন কাব রা.-কে তাকওয়ার ব্যাখ্যা দিতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি জবাবে বলেছিলেন, 'আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথ অতিক্রম করেছেন?' হযরত উমর রা. বললেন, 'হ্যাঁ।' 'আপনি তখন কী করেছিলেন?' উবায় রা. জিজ্ঞেস করলেন। উমর রা. বললেন, 'আমি সাবধানতা অবলম্বন করে দ্রুতগতিতে ওই পথ অতিক্রম করেছিলাম।' হযরত উবায় বিন কা'ব রা. বললেন, 'এটাই তাকওয়া'। [তাফসিরুল কুরতুবি)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00