📄 হযরত ইসমাইল আ.-এর জন্ম
হযরত ইবরাহিম আ. তখন পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর বাসগৃহের মালিক এক বাঁদির গর্ভজাত গোলাম আল-ইয়ারায দিমাশকি। একদিন হযরত ইবরাহিম আ. একটি সন্তানের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করলেন এবং তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। এই মর্মে তাওরাতে বর্ণিত আছে :
"ইবরাহিম বললেন, হে খোদা, আপনি কি আমাকে দান করবেন। আমি তো সন্তানহীন জীবন কাটাচ্ছি। আমার গৃহের মালিক আল-ইয়ারায। এরপর একদিন ইবরাহিম বললেন, আপনি আমাকে সন্তান দিলেন না, দেখুন, আমার বাঁদির গর্ভজাত গোলাম আমার উত্তরাধিকারী হবে। তখন তাঁর ওপর আল্লাহর বাণি নাযিল হলো। আল্লাহ বললেন, এই গোলাম তোমার উত্তরাধিকারী হবে না; বরং যে-সন্তান তোমার ঔরস থেকে জন্মগ্রহণ করবে সে-ই তোমার উত্তরাধিকারী হবে।"
এই প্রার্থনা এইভাবে কবুল হলো যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত হাজেরা রা. গর্ভবতী হলেন। যেমন তাওরাতে উল্লেখ করা হয়েছে :
"আর (উল্লিখিত প্রার্থনার পর) তিনি হাজেরার নিকট গেলেন এবং তিনি (হাজেরা) গর্ভধারণ করলেন।"৩১
হযরত সারা রা. যখন এটা জানতে পারলেন, তিনি মনুষসুলভ স্বভাব ও প্রকৃতির তাড়নায় হযরত হাজেরার প্রতি ঈর্ষান্বিত হলেন। তিনি হযরত হাজেরাকে নানা প্রকারে উত্ত্যক্ত করতে লাগলেন। হযরত হাজেরা বাধ্য হয়ে তাঁর কাছ থেকে চলে গেলেন। এই ঘটনা সম্পর্কে তাওরাত বলছে :
"আর আল্লাহর ফেরেশতারা তাঁকে (হযরত হাজেরাকে) প্রান্তরে পানির এক ঝরনার কাছে পেলেন। এটি সেই ঝরনা যা 'ছুররে' পথের পাশে অবস্থিত। ফেরেশতারা বললেন, হে সারার খেদমতগার হাজেরা, তুমি এখানে কোথা থেকে এলে? তুমি কোন দিকে যাচ্ছো? হাজেরা বললেন, আমি বিবি সারার কাছ থেকে পালিয়ে এসেছি। আল্লাহর ফেরেশতারা বললেন, তুমি বিবি সারার কাছে ফিরে যাও এবং তাঁর আনুগত্য করো ও খেদমতগার থাকো। এরপর আল্লাহর ফেরেশতা বললেন, আমি তোমার সন্তান অনেক বেশি বাড়িয়ে দেবো। এমনকি সংখ্যাধিক্যের কারণে তাদের গণনাও করা যাবে না। আল্লাহর ফেরেশতা আরো বললেন, তুমি গর্ভবতী। তুমি একটি পুত্র সন্তান জন্মদান করবে। তার নাম রেখো ইসমাইল। আল্লাহ তাআলা তোমার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনেছেন। তোমার সেই পুত্রটি হবে যাযাবর শ্রেণির লোক। তার হাত হবে সবার বিরোধী এবং তার বিরোধী হবে সবার হাত। সে তার সব ভাইয়ের সামনে বসবাস করবে।"৩২
হযরত হাজেরা রা. সেই স্থানে ফেরেশতাদের সঙ্গে কথোপকথন করলেন। সেই স্থানে একটি কূপ ছিলো। হযরত হাজেরা স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ সেই কূপটির নাম রাখলেন 'জীবদ্দশায় দৃষ্ট ব্যক্তির কূপ'। কিছুকাল পরেই হযরত হাজের পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। ফেরেশতাদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে তাঁর নাম রাখা হলো ইসমাইল।
"আর হাজেরা ইবরাহিমের জন্য পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। ইবরাহিম হাজেরাপ্রসূত সেই পুত্রের নাম রাখলেন ইসমাঈল। আর যখন হাজেরার গর্ভ থেকে তাঁর পুত্র ইসমাইল জন্মগ্রহণ করলেন, তখন ইবরাহিমের বয়স ছিলো ৮৬ বছর।"৩৩
আল্লাহপাক ইসমাইলের পর হযরত ইবরাহিম আ.-কে ইসহাকের সুসংবাদ প্রদান করলেন। কিছুটা পরেই তার বিস্তারিত বিবরণ আসবে। কিন্তু ইবরাহিম আ. সেই সুসংবাদের জন্য খুব বেশি আনন্দ প্রকাশ করলেন না। তার পরিবর্তে তিনি এই প্রার্থনা করলেন:
"আর ইবরাহিম আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা জানালেন, আমি আশা করি, ইসমাইল যেনো তোমার কাছে জীবিত থাকে।৩৪
আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম আ.-এর প্রার্থনার জবাব দিলেন:
"ইসমাইল সম্পর্কে আমি তোমার প্রার্থনা শুনলাম। দেখো, আমি তাকে বরকত দান করবো। তার সন্তান হবে অনেক। তাকে অনেক বেশি বাড়িয়ে দেবো এবং তার বংশে বারোজন সরদার জন্মলাভ করবে। আর আমি তাকে এক বিরাট সম্প্রদায়ে পরিণত করবো।
اسماعیل শব্দটি اسمع এবং ایل শব্দ দুটির সমন্বয়ে গঠিত একটি যুক্ত শব্দ। হিব্রু ভাষায় ایل শব্দের অর্থ 'আল্লাহ'। আরবি سمع এবং হিব্রু شماع শব্দের একই অর্থ : শুনো। যেহেতু হযরত ইসমাইল আ.-এর জন্মের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ.-এর দোয়া শুনেছিলেন এবং হযরত হাজেরা রা. ফেরেশতার মাধ্যমে সুসংবাদ পেয়েছিলেন, তাই তাঁর এই নাম রাখা হয়েছিলো। হিব্রু ভাষায় এর উচ্চারণ ایل شماع (শিমা'ইল)।
টিকাঃ
৩০. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৫, আয়াত ২-৪।
৩১. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ৭, ১২।
৩২. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ৭, ১২।
৩৩. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৬, আয়াত ১৫, ১৬।
৩৪. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৭, আয়াত ১৮।
৩৫. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৭, আয়াত ২০।
📄 হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর
হযরত ইসমাইল আ.-এর বংশধর সম্পর্কে কুরআন মাজিদ বা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসে বিস্তারিত কোনো আলোচনা করা হয় নি। অবশ্য তাওরাত তাঁর সন্তানদের নামসমূহকে পৃথক পৃথক ব্যাখ্যার সঙ্গে উল্লেখ করেছে। তাওরাতের বর্ণনা অনুসারে হযরত ইসমাইল আ.-এর বারোজন পুত্র ছিলেন। তাঁরা বারো সরদার নামে অভিহিত ও প্রসিদ্ধ ছিলেন এবং তারা আরবের ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের আদি পুরুষ হয়েছেন। আর হযরত ইসমাইল আ.-এর একজনমাত্র কন্যা ছিলেন। তাঁর নাম ছিলো বাশামাহ বা মুহাল্লাত। "আর ইবরাহিমের পুত্র ইসমাইল, যাকে সারার বাঁদি মিসরীয় হাজেরা ইবরাহিমের জন্য প্রসব করেছিলো, তার বংশপরিচয় এই আর এই হলো ইসমাইলের পুত্রদের নাম :- এদের নামানুসারে ইসমাইলের বংশের শাখা-প্রশাখা বিভক্ত হয়েছিলো-নাবায়ুত, কিদার, ওবাইল, হিশাম, মিশমা, রুমাহ, মানশা, ই'দার, তিমা, ইয়াতুর, নাফিশ, কিদামা এই বারোজন ইসমাইলের পুত্র। তাদের বসতি ও দুর্গসমূহের মধ্যে তাদের নাম এরূপই। তারা নিজেদের বারোটি গোত্রের বারোজন সরদার ছিলেন।"৫৫
এদের নাবেত বা নাবায়ুত এবং কিদার নামের বড় দুই পুত্র বেশ বিখ্যাত। তাওরাতের মধ্যে এই দুইজনের উল্লেখ খুব বেশি দেখা যায় এবং আরব ইতিহাসবেত্তাগণও তাঁদের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করে থাকেন। ইনিই সেই নাবেত বা নাবায়ুত যাঁর বংশধরগণ "আসহাবুল হিজর' নামে অভিহিত ও বিখ্যাত হয়েছিলো। এই দুইজন ব্যতীত বাকি দশ ভাই এবং তাঁদের বংশের অবস্থার পরিচয় খুবই কম পাওয়া যায়।
টিকাঃ
৫৫. তাওরাত: আবির্ভাব অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ২৫, আয়াত ১২-১৬।
📄 কুরআন মাজিদে হযরত ইসমাইল আ.-এর আলোচনা
কুরআন মাজিদে বহুবার হযরত ইসমাইল আ.-এর আলোচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে শুধু এক জায়গায় তাঁর গুণাবলি বর্ণিত হয় নি। সে- আয়াতটি তাঁর 'যবিহ' হওয়ার বর্ণনাসম্বলিত আয়াত। আর দুই জায়গায় সুসংবাদ প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যাতে হযরত ইবরাহিম আ.-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। আর সুরা মারইয়ামে তাঁর নাম উল্লেখ করে তাঁর উৎকৃষ্ট গুণাবলির পরিচয় দেয়া হয়েছে-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا () وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّه مَرْضِيًّا (سورة مريم)
'স্মরণ করো এই কিতাবে (কুরআন মাজিদে) ইসমাইলের কথা, নিশ্চয় সে ছিলো প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং সে ছিলো রাসুল, নবী; সে তার পরিজনবর্গকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিতো এবং সে ছিলো তাঁর প্রতিপালকের সন্তোষভাজন (পছন্দনীয় ও প্রিয়)।' [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৫৪-৫৫]
📄 হযরত ইসমাইল আ.-এর ইন্তেকাল
হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম ১৩৬ বছর বয়সে উপনীত হলে মৃত্যুবরণ করেন। ইন্তেকালের সময় তাঁর সামনে তাঁর সন্তান-সন্ততি ও বংশধরগণ বহু বিস্তৃতি লাভ করেছিলো। তারা হিজায, শাম (সিরিয়া), ফিলিস্তিন এবং মিসর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। তাওরাতের এক জায়গায় ইঙ্গিত রয়েছে যে, হযরত ইসমাইল আ. ফিলিস্তিনেই সমাহিত হয়েছেন। এখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছিলো। আর আরব ইতিহাসবেত্তাগণ বলেন, তিনি এবং তাঁর মাতা হাজেরা রা. বাইতুল্লাহ শরিফের পাশেই সমাহিত রয়েছেন।