📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 দ্বিতীয় মাকাম

📄 দ্বিতীয় মাকাম


সুরা শুআরায় উপদেশ ও অন্তরদৃষ্টির প্রসঙ্গে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম-এর দাওয়াত, হেদায়েত ও সৎপথ প্রদর্শনের যে-আলোচনা রয়েছে, তার মধ্যে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আলোচনাও রয়েছে। হযরত ইবরহিম আ. তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর একত্বের শিক্ষা এবং কুফর ও শিরকের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তুষ্টির উৎসাহ প্রদান করছেন। এ-অবস্থাতেই তিনি আল্লাহর সত্তার একত্ব ও গুণাবলি সুন্দরভাবে বর্ণনা করে ধীরে ধীরে এক ও অদ্বিতীয় রবের দরবারে দোয়ার হাত প্রসারিত করছেন। যেনো তিনি ভিন্ন এক পদ্ধতিতে তাঁর কওমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এবাদতকারী বানাবার চেষ্টা করছেন। হযরত ইবরাহিম আ. দোয়া করতে করতে আল্লাহর দরবারে আবেদন জানাচ্ছেন—
وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ (سورة الشعراء)
'এবং আমাকে লাঞ্ছিত করো না পুনরুত্থান দিবসে।' (হে আল্লাহ, মানুষকে যেদিন পুনরায় জীবিত করে উঠানো হবে সেদিন আমাকে অপদস্থ করো না।) [সুরা শুআরা: আয়াত ৮৭]
এই আয়াতটির ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারি তাঁর 'আল-জামিউস সহিহ' কিতাবে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। হাদিসটি 'কিতাবুত তাফসিরে' সংক্ষিপ্ত আকারে এবং 'কিতাবুল আম্বিয়াতে' বিস্তারিতরূপে বর্ণিত হয়েছে। কিতাবুত তাফসিরে উদ্ধৃত হাদিসটির অনুবাদ নিচে দেয়া হলো:
"হযরত ইবরাহিম আ. কিয়ামতের দিন তাঁর পিতাকে বিষণ্ণ অবস্থায় এবং মলিন চেহারায় দেখে বলবেন, হে আমার প্রতিপালক, পৃথিবীতে আপনি আমার এই দোয়া কবুল করে নিয়েছিলেন যে, আর যেদিন মানুষকে পুনরায় জীবিত করে উঠানো হবে, সেদিন আপনি আমাকে অপমানিত করবেন না। তবে আজ আমার এই অপমান কেনো—নিজের পিতাকে এমন অবস্থায় দেখছি? আল্লাহ তাআলা বলবেন, ইবরাহিম, আমি কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি।"
আর কিতাবুল আম্বিয়াতে এই হাদিসটির সঙ্গে নিম্নবর্ণিত কথাগুলো যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে:
"যখন ইবরাহিম আ. কিয়ামতের দিন তাঁর পিতাকে ব্যাকুল ও অস্থির এবং মলিন চেহারাবিশিষ্ট দেখবেন, পিতাকে সম্বোধন করে বলবেন, আমি কি আপনাকে বার বার বলেছিলাম না যে, আমার হেদায়েতের পথের বিরোধিতা করবেন না। আযার বলবে, যা হওয়ার তা হয়েছে। আজকের দিনে আমি আর তোমার বিরোধিতা করবো না। তখন হযরত ইবরাহিম আ. আল্লাহপাকের দরবারে আরজ করবেন, হে আমার প্রতিপালক, আপনি পৃথিবীতে আমার এই দোয়া কবুল করে নিয়েছিলেন যে, وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ ) পারে যে, আমার পিতা আযার আপনার রহমত থেকে দূরত্বের শেষ সীমায় রয়েছেন। আল্লাহ বলবেন, আমি নিশ্চয় কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি। এরপর গায়েব থেকে আওয়াজ আসবে, (অন্যান্য রেওয়ায়েতে আছে, আল্লাহ নিজেই ডেকে বলবেন,) হে ইবরাহিম, তোমার পায়ের নিচে তাকাও, কী দেখা যাচ্ছে? হযরত ইবরাহিম আ. দেখবেন, ময়লায়-তলানো কবরের লাশখেকো একটি বিড়াল পায়ের ওপর লুটাচ্ছে। ফেরেশতারা সেটার পায়ে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
কিয়ামতের দিন আযারে কী অবস্থা হবে, সংক্ষিপ্ত হাদিসটিতে সেই ছবি অঙ্কিত হয়েছে। তা অবিকল কুরআনের সূরা আবাসা এবং সেই আয়াগুলোর তাফসির, যাতে কিয়ামতের দিন কাফেরদের এমন অবস্থা বর্ণিত হয়েছে—
وَوُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ عَلَيْهَا غَبَرَةٌ (( تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ (( أُولَئِكَ هُمُ الْكَفَرَةُ الْفَجَرَةُ (سورة عبس)
'এবং অনেক মুখমণ্ডল সেই দিন হবে ধূলিধূসর, সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা। এরাই কাফের ও পাপাচারী।' (সুরা আবাসা: আয়াত ৪০-৪২] আর সুরা ইউনুসে মুমিন ও জান্নাতবাসীদের ক্ষেত্রে এমন অবস্থা হবে না বলে বলা হয়েছে—
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا الْحُسْنَى وَزِيَادَةٌ وَلَا يَرْهَقُ وُجُوهَهُمْ قَتَرٌ وَلَا ذِلَّةٌ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ (سورة يونس)
'যারা মঙ্গলকর কাজ করে তাদের জন্য আছে মঙ্গল এবং আরো অধিক। কালিম ও হীনতা তাদের মুখমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। [সুরা ইউনুস: আয়াত ২৬] দীর্ঘ হাদিসটিতে দুটি নতুন কথা বলা হয়েছে। একটি কথা হলো, হযরত ইবরাহিম আ. আযারের এই অবস্থা দেখে আল্লাহ তাআলার দরবারে ওই দোয়া করবেন, যা আম্বিয়া আলাইহিস সালাম-এর দোয়াসমূহের মতো কবুল হয়েছিলো এবং এর অর্থ এই হবে যে, পিতার অপমান প্রকৃতপক্ষে আমারই অপমান। দ্বিতীয় কথা হলো, আল্লাহপাক আযারকে মৃত ব্যক্তির লাশখেকো বিড়ালের আকৃতিতে রূপান্তর করে দেবেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই হাদিসের অংশগুলোর ওপর আলোচনা করে বলেছেন, আল্লাহপাক আযারের আকৃতি এইজন্য পরিবর্তন করে দেবেন, যাতে আযারকে মানুষের আকৃতিতে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে দেখলে হযরত ইবরাহিম আ.-এর অন্তরে যে-দুঃখ ও কষ্ট হতো তা না হয়। আর তিনি তার এমন বিভৎস-কুৎসিত রূপ দেখে তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করেন এবং তাঁর স্বভাব সেটার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। আর আযারকে মড়াখেকো বিড়ালের আকারে রূপান্তরিত করার এই কারণ বর্ণনা করেছেন যে, প্রাণীতত্ত্ববিদদের মতে উল্লিখিত বিড়াল আবর্জনায় তলানোও আবার হিংস্র জন্তুদের মধ্যে সবচেয়ে নির্বোধও। আযার মূর্তিপূজক হওয়ায় অপত্রিতার আবর্জনার মধ্যে নিমজ্জিত ছিলো এবং হযরত ইবরাহিম আ.-এর পেশকৃত দলিল প্রমাণ এবং আল্লাহর একত্বের উজ্জ্বল প্রমাণসমূহ স্বীকার না করার নির্বোধও ছিলো। তাই আল্লাহ তাআলার বিধান 'কর্মফল দেয়া হবে সেই জাতীয় কর্ম দ্বারা'-এর প্রতি লক্ষ করে আযার এরই উপযুক্ত ছিলো যে সে একটি অপবিত্র এবং নির্বোধ হিংস্র জন্তুর আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে।
কিন্তু বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইসমাইল এই রেওয়ায়েতটিকে ত্রুটিযুক্ত এবং ভর্ৎসনার উপযোগী মনে করেন এবং সনদের বিশুদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রাবির জ্ঞানবুদ্ধির দুর্বলতার কারণে তা গ্রহণ করেন না। তিনি বলেন: এই হাদিসে এই দুর্বলতা রয়েছে যে, এতে হযরত ইবরাহিম আ.-এর ওপর (নাউযুবিল্লাহ) এই দোষ আসে যে, তিনি আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে ওয়াদা খেলাফ করার সন্দেহ করছেন। সে-কারণেই তো এ-ধরনের প্রশ্ন করছেন। অথচ হযরত ইবরাহিম আ. অতি উচ্চ স্তরের আম্বিয়ায়ে কেরামের অন্তর্ভুক্ত। তিনি নিঃসন্দেহে জানতেন, আল্লাহ কখনো ওয়াদা খেলাফ করেন না।
إِنَّ اللَّهَ لَا يُخْلِفُ الْمِيعَادَ (سورة آل عمران) 'নিশ্চয় আল্লাহ ওয়াদার খেলাফ করেন না।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৩]
সুতরাং, ইবরাহিম আ.-এর দিকে এ-ধরনের কথার সম্পর্ক আরোপ করা নিশ্চিতভাবেই ঠিক নয়। তিনি আযারের শিরকি জীবন এবং মৃত্যুর বিষয় অবগত থেকে কোনোক্রমেই এ-ধরনের প্রার্থনা করতে পারেন না।
ইসমাইল ছাড়াও অন্য মুহাম্মদিসগণও এই দীর্ঘ রেওয়ায়েতটির বিষয়ে সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলেন, এই রেওয়ায়েতটি বাহ্যত কুরআনের খেলাফ। কেননা, আল্লাহপাক সুরা তওবায় হযরত ইবরাহিম আ. সম্পর্কে বলেছেন-
وَمَا كَانَ اسْتِغْفَارُ إِبْرَاهِيمَ لِأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَوْعِدَة وَعَدَهَا إِيَّاهُ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُوٌّ للَّهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ إِنْ إِبْرَاهِيم لأَوَّاة حليم (سورة التوبة) 'ইবরাহিম তার পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলো, তাকে এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো বলে; (তিনি মাগফেরাত কামনার ব্যাপারে তাঁর পিতাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।) এরপর যখন ইহা তার কাছে (ওহির মাধ্যমে) স্পষ্ট হলো যে, সে আল্লাহর শত্রু (অর্থাৎ পরিণামেও সে কাফেরই থাকবে) তখন ইবরাহিম তার সম্পর্ক ছিন্ন করলো। (সম্পর্কহীনতার ঘোষণা করে দিলেন।) ইবরাহিম তো কোমল-হৃদয়, সহনশীল। [সুরা তাওবা: আয়াত ১১৪]
এ-আয়াতটি এ-কথা ব্যক্ত করছে যে, হযরত ইবরাহিম আ. দুনিয়াতেই জানতে পেরেছিলেন, তাঁর পিতার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর শত্রুই ছিলেন এবং এই শত্রুতার ওপরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো। তাই তিনি দুনিয়াতেই তার নিজের অসন্তোষ এবং সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন এবং বলে দিয়েছিলেন, আল্লাহর শত্রুর সঙ্গে আল্লাহর বন্ধুর কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে না। তাহলে, এই অবস্থার পর রেওয়ায়েতটির এই বিষয়বস্তু কেমন করে শুদ্ধ হতে পারে?
ইবনে হাজার আসকালানি উপরিউক্ত দুই ধরনের সমালোচনা উদ্ধৃত করার পর সেগুলোর জবাব দিচ্ছেন এভাবে:
হযরত ইবরাহিম আ. তাঁর পিতার প্রতি কখন অসন্তুষ্টি ও নিঃসম্পর্কতা ঘোষণা করেছিলেন-এ-প্রসঙ্গে দুটি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে। ১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে ইবনে জারির রা. বিশুদ্ধ সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন, যখন কুফর ও শিরকের অবস্থায় আযারের মৃত্যুর হয়ে গেলো, তখন হযরত ইবরাহিম আ.-এর নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মালো যে, আযার আল্লাহর শত্রুরূপে মৃত্যুবরণ করেছে। তাই তিনি আযারের সঙ্গে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার যে-ওয়াদা করেছিলেন তা ত্যাগ করলেন এবং তার প্রতি অসন্তুষ্টি ও সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে দিলেন। ২. এই রেওয়ায়েতও ইবনে জারির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আযারের প্রতি হযরত ইবরাহিম আ.-এর অসন্তোষ এবং নিঃসম্পর্কতা ঘোষণা করার বিষয়টি দুনিয়াতে নয়, কিয়ামতের দিন ঘটবে। আর তা এভাবে ঘটবে যেমন পূব-উল্লিখিত রেওয়ায়েতটিতে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ, যখন আযারের আকৃতি পরিবর্তন করে মড়াখেকো বিড়ালে পরিণত করা হলো, তখন হযরত ইবরাহিম আ. দৃঢ় বিশ্বাস করলেন যে, এখন আর পিতার জন্য মাগফেরাতের দোয়া করার অবকাশ মোটেই বাকি নেই।
ত্রুটি আলোচনা ও সমালোচনা প্রতি লক্ষ্য রেখে রেওয়ায়েত দুটির মধ্যে ঐক্য রক্ষা করার উপায় এই যে, ইবরাহিম আ. যদিও দুনিয়াতেই আযারের শিরকি মৃত্যু দেখে তার প্রতি অসন্তুষ্টি ও সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু যখন কিয়ামতের ময়দানে পিতার করুণ অবস্থা দেখবেন, তখন তার দয়া-গুণটি উথলে উঠবে এবং প্রাকৃতিক তাড়নাতেই তিনি মাগাফেরাত কামনার দিকে অগ্রসর হবেন। পরে আল্লাহপাক আযারকে বিড়ালে রূপান্তরিত করে দিলে ইবরাহিম আ. তার পরিণাম সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়বেন এবং বুঝতে পারবেন যে, নিশ্চিতভাবেই তার মাগফেরাতের কোনো উপায় নেই। তাই সেই পাকড়াও করার দিনেও দ্বিতীয়বার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করে দেবেন।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির এই জবাবের সারমর্ম এই যে, কুরআন মাজিদ হযরত ইবরাহিম আ.-এর বিশেষ বিশেষ গুণাবলির মধ্যে এই গুণটিরও উল্লেখ করেছে যে, إِبْرَاهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ )ইবরাহিম কোমল- হৃদয়, দয়ার্দ্র)। এই গুণটির বিভিন্ন প্রকাশস্থলের মধ্যে একটি হলো আযারের মৃত্যু শিরক ও কুফরের ওপর হওয়া এবং দুনিয়াতেই তার প্রতি ইবরাহিম আ.-এর অসন্তুষ্টি এবং সম্পর্কহীনতার ঘোষণা সত্ত্বেও (যার উল্লেখ কুরআনের সুরা তওবার মধ্যে বিদ্যমান) যখন তিনি কিয়ামতের দিন আযারকে আযাবের এই দুরবস্থায় দেখবেন )عَلَيْهَا غَبَرَةٌ تَرْهَقُهَا قَتَرَةٌ / অনেক মুখমণ্ডল সেই দিন হবে ধূলিধূসর, সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা), তাঁর দয়া ও করুণা উথলে উঠবে এবং এই উচ্চ স্তরের নবীদের মতো প্রকৃত অবস্থা অবগত থেকেও তাঁর প্রকৃতগত স্বভাব এ- পর্যায়ে এসে পৌঁছবে যে তিনি আযারের জন্য মাগফেরাত কামনা করতে উদ্যত হয়ে উঠবেন। যখন দেখবেন যে, আযারের শিরকি জীবনের কোনো একটি শাখা বা অবস্থাকেও তাঁর জন্য সুপারিশ করার উসিলারূপে গ্রহণ করা যাচ্ছে না, তখন তাঁর নিজের সেই দোয়াটির আশ্রয় গ্রহণ করবেন, যা দুনিয়াতেই চিরকালের জন্য কবুল হয়েছিলো। পিতার অপমানকে নিজের অপমানরূপে প্রকাশ করে আল্লাহর দরবারে সেই ওয়াদাটির কথা উল্লেখ করবেন। কিন্তু আল্লাহ এর উত্তরে 'আমি কাফেরদের জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছি' বলে হযরত ইবরাহিম আ.-এর মনোযোগ এদিকে আকর্ষণ করবেন যে, নিজের এই স্বভাবগত দয়া ও করুণা সত্ত্বেও তোমার এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, এটা আমলের দুনিয়া নয়; বরং এটা কর্মফলের দিন এবং ইনসাফের পাল্লা প্রতিষ্ঠিত। এর জন্য আমার অপরিবর্তনীয় বিধি-নিয়ম চিরতরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, 'কাফের ও মুশরিকদের জন্য জান্নাতে কোনো স্থান নেই।'
আর বিষয় এই যে, কাফেরদের অপমান কখনো মুমিনদের জন্য অপমানের কারণ হতে পারে না। তাদের উভয়ের মধ্যে দুনিয়ার সম্পর্কের বন্ধন যত দৃঢ়ই থাকুক না কেনো। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর হেকমত এমন অবস্থা সৃষ্টি করে দেবে যে হযরত ইবরাহিম আ.-এর ওপর দুশ্চিন্তা ও দুঃখের কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট থাকবে না। যে-কারণে তাঁর স্বভাবগত আবেগপ্রবণতা তাঁকে মাগফেরাতের দোয়া করার জন্য প্রস্তুত করেছিলো। যেমন, আযারকে হিংস্র বিড়ালের আকৃতিতে রূপান্তরিত করা হবে। যে-কারণে হযরত ইবরাহিম আ.-এর পবিত্র ও সুস্থ প্রকৃতি তা দেখে ঘৃণা করতে থাকবে।
সারকথা, হযরত ইরাহিম আ.-এর এই প্রার্থনা এজন্য ছিলো না যে, (নাউযুবিল্লাহ) তিনি আযারের সেই অবস্থাকে আল্লাহর ওয়াদার খেলাফ মনে করছেন। বরং তাঁর প্রাকৃতিক ও স্বভাবগত আবেগ ও তাড়নার কারণে এই প্রার্থনা করেছিলেন। যদিও তা পরিণামফলকে পরিবর্তন করতে পারতো না, কিন্তু তা অবশ্যই সেই মহান ব্যক্তিত্বের সৎ উদ্দীপনা ও দয়াগুণকে উজ্জ্বলতর করার কারণ।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির এই জবাব ইসমাইল ও অন্য মুহাদ্দিসিনে কেরামের সমালোচনাকে নিঃসন্দেহে বিশেষভাবে হালকা করে দিয়েছে। তারপরও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির সংক্ষিপ্ত হাদিসটি ব্যতীত অন্য দীর্ঘ হাদিসটির কোনো কোনো অংশ অবশ্য লক্ষ্যণীয়। হাফেজে হাদিস ইমাদুদ্দিন বিন কাসির সম্ভবত এই রেওয়ায়েতগুলোকে তাঁর তাফসিরের কিতাবে বর্ণনা করার পর সংক্ষিপ্ত হাদিসটিকে গ্রহণ করে সহিহ বুখারির কিতাবুল আম্বিয়াতে উদ্ধৃত দীর্ঘ হাদিসটির ওপর তাফাররুদ বা নিঃসঙ্গতার এবং সুনানে নাসায়ির হাদিসটির ওপর গরিব (অপরিচিত) ও মুনকার (অস্বীকৃত) হওয়ার ত্রুটি আরোপ করছেন। বিখ্যাত মুহাদ্দিস কিরমানিও এ-বিষয়টিকে প্রশ্ন ও উত্তরের আকাশে পেশ করে তার সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। তা যথাস্থানে প্রণিধানযোগ্য।

টিকাঃ
* ফাতহুল বারি: অষ্টম খণ্ড, কিতাবুল আম্বিয়া।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00