📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আলোচ্য বিষয়

📄 আলোচ্য বিষয়


এই জায়গায় পৌঁছে আরো একবার এ-কথা বলে দেয়া জরুরি মনে হয় যে, আমাদের আলোচ্য বিষয় এই নয় যে, (নাউযুবিল্লাহ) বাস্তবিক অর্থেই হযরত ইবরাহিম আ. মিথ্যা বলেছেন। কারণ কুরআন মাজিদের অকাট্য দলিল এবং আলোচ্য রেওয়ায়েতগুলো ছাড়াও অন্যান্য হাদিসের স্পষ্ট বাক্যসমূহ ইবরাহিম আ.-কে নবী, পয়গাম্বর ও রাসুল বলে আখ্যায়িত করেছে এবং তাঁর বৈশিষ্ট্যমূলক গুণাবলি সিদ্দিক, মনোনীত, হেদায়েতকৃত, হানিফ ও আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ বলে প্রমাণ করেছে। তা ছাড়া উপরিউক্ত হাদিসেও এ-কথা বর্ণিত আছে যে, তাঁর এই কথাগুলো ছিলো আল্লাহর দীনের হেফাজতের জন্য ও শত্রুদের প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে; কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য বা সুবিধা হাসিলের জন্য ছিলো না। সুতরাং এক মুহূর্তের জন্যও এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ বা ইতস্তত করার অবকাশ নেই যে, ইবরাহিম আ. থেকে মিথ্যা ততটুকুই দূরে রয়েছে, যেমন দিবস থেকে রাত ও আলো থেকে অন্ধকার। সন্দেহাতীতভাবে তিনি একজন নিষ্পাপ নবী এবং সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে পবিত্র।
অবশ্য এখানে আলোচ্য বিষয় এই যে, উপরিউক্ত দুটি সহিহ হাদিসে এই তিনটি কথা সম্পর্কে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এত উচ্চ মর্যাদাশীল মহান নবীর ক্ষেত্রে 'মিথ্যা' শব্দটি কেনো ব্যবহার করলেন। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র সত্তা ধর্ম ও ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সন্দেহ ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে দূর করার কারণ, জটিলতা ও সন্দেহ সৃষ্টিকারী নয়। বিশেষত, যখন এ-তিনটি কথাই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবেও মিথ্যা নয়, প্রকৃত অর্থে তো নয়-ই।
নিঃসন্দেহে হযরত সারা রা. হযরত ইবরাহিম আ.-এর ধর্মীয় বোন ছিলেন এবং স্ত্রী-সম্পর্কের মাধ্যমে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব-সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় না। তা ছাড়া আল্লামা ইবনে কাসির ও অন্যান্য ইতিহাসবেত্তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী সারা রা. হযরত ইবরাহিম আ.-এর চাচা হারানের কন্যা ছিলেন। তাই তিনি চাচাতো বোনও ছিলেন। আর অসুস্থতা বিষয়ে সন্দেহাতীতভাবে এটা বলা যায়, তাঁর মন-মানসিকতা ও মেজাযের অবস্থা অবশ্যই কিছুটা অস্বাভাবিক ছিলো, যদিও কঠিন কোনো ব্যাধি না হোক। সুতরাং তাঁর 'আমি অসুস্থা বা পীড়িত' কথা সবদিক থেকেই শুদ্ধ ও সত্য ছিলো। এর এতেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, বিতর্কসুলভ কথাবার্তার আকারেই শত্রুকে নিরুত্তর করে দেয়ার জন্য বলেছিলেন, বরং তাদের এই বড় মূর্তিই এই কাজ করেছে। এটি ইলম বা জ্ঞানের জগতে কোনোভাবেই মিথ্যা ছিলো না। তাহলে হাদিসসমূহে কেনো এভাবে ব্যক্ত করা হলো?
এই জিজ্ঞাসার জবাবে ইসলামের উলামায়ে কেরাম দু-ধরনের মত অবলম্বন করেছেন:
১। এই হাদিসগুলো 'খবরে ওয়াহেদ' (মাত্র একজন রাবি (বর্ণনাকারী) কর্তৃক বর্ণিত)। সুতরাং সাহসের সঙ্গে এটা বলে দেয়া দরকার যে, যদিও এই রেওয়ায়েতগুলো সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের রেওয়ায়েত এবং এ-কারণে সেগুলো 'মশহুর' হাদিসের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে; কিন্তু রাবি এই রেওয়ায়েতগুলোতে কঠিন ভুল করেছেন। সুতরাং, কখনো এগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, একজন নবীর প্রতি মিথ্যার সম্পর্ক আরোপ করার পরিবর্তে রাবিদের ভুল স্বীকার করা অনেকগুণে উত্তম এবং বিশুদ্ধ কর্মপন্থা।
ইমাম আবু বকর মুহাম্মদ আর-রাযি রহ.-এর ঝোঁক এ-মতের প্রতিই এবং এ-মতই অবলম্বন করেছেন।
২। অকাট্য ও সুনিশ্চিত আকিদা এই যে, নবী ও রাসুলের প্রতি মিথ্যার সম্পর্ক আরোপ করা কোনো অবস্থাতেই জায়েয নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ হাদিসসমূহে, যা 'মাশহুর' ও 'মুতাওয়াতির' হাদিসের পর্যায়ে পৌছে গেছে, এ-ধরনের কোনো সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, যা নবীর নবুওতের মর্যাদার পরিপন্থী, তবে সেই হাদিসগুলোকে বিশুদ্ধ মেনে নিয়ে সেগুলোর বিশেষ বিশেষ বাক্যগুলোর এমন ব্যাখ্যা করা উচিত যাতে মূল বিষয়টির ওপরও আঘাত না আসে এবং সহিহ ও বিশুদ্ধ হাদিসকেও অস্বীকার করা না হয়। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম শরিফের এই হাদিসগুলো যেহেতু সর্বজন কর্তৃক গৃহীত ও আদৃত হওয়ার ফলে বিশুদ্ধতা ও প্রসিদ্ধির সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যাকে 'খবরে ওয়াহেদ' বলে গণ্য করা যায় না, তাই এই হাদিসগুলোকে প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে না। এখানে বরং 'তিনটি মিথ্যা'যুক্ত বাক্যের এই ব্যাখ্যা করা উচিত যে, 'মিথ্যা' শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে 'এমন কথা যা কোনো বিশুদ্ধ ও পবিত্র উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।' কিন্তু সম্বোধিত ব্যক্তি সে-কথার ওই অর্থ/উদ্দেশ্য বুঝতে পারে নি, যা আসলে বক্তা বুঝাতে চেয়েছেন। বরং সে ওই কথাগুলোর অর্থ নিজের মনের ইচ্ছা অনুসারে বুঝে নিয়েছে। আর 'মিথ্যা' শব্দের এমন অর্থ কেবল হযরত ইবরাহিম আ.-এর ঘটনার জন্য আবিষ্কার করা হয় নি; বরং অলঙ্কারশাস্ত্রের পরিভাষায় একে 'মাআরিদ' অর্থাৎ ইশারা-কেনায়ার প্রকারসমূহের অন্ত র্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে। বিশুদ্ধভাষী ও বাগ্মী ব্যক্তিদের কথা-বার্তায় এটা বেশ প্রচলিত আছে।
এভাবে ব্যাখ্যা করলে হাদিসগুলোকে অবিশ্বাস বা অস্বীকার করারও প্রয়োজন থাকে না এবং নবীর সত্যতার বিষয়টিও যথাস্থানে বিনাদ্বিধায় ও সন্দেহাতীতভাবে সঠিক থাকে। আমাদের এ-বক্তব্যকে দৃঢ়ীকরণের জন্য বলা যায়, শাফাআতের হাদিসের এই শব্দগুলো- ما منها كذبة إلا ما حل الله بهما عن دين / হযরত ইবরাহিম আ.-এর এই তিনটি মিথ্যার মধ্যে প্রত্যেকটিই আল্লাহর দীনের হেফাজতের জন্য বলা হয়েছিলো- আমাদের উপরিউক্ত ব্যাখ্যার সমর্থন করছে। ইসলামের অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত এটিই। তাঁরা ইমাম রাযি ও তাঁর সমমতাবলম্বী উলামায়ে কেরামের মতকে বিশুদ্ধ ও সঠিক বলে স্বীকার করেন না।
মিসরের বিখ্যাত আলেম আবদুল ওয়াহ্হাব নাজ্জার তাঁর 'কাসাসুল আম্বিয়া' গ্রন্থে ইমাম রাযির সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি মিসরের তৎকালীন উলামায়ের কেরামের অভিমতের বিরুদ্ধে (যা মূলত জমহুর উলামায়ে কেরামের সমর্থনে নাজ্জারের মতের সমালোচনার আকারে প্রকাশ করা হয়েছে) যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে লিখেছেন। তাতে তিনি হযরত ইবরাহিম আ. ও সারা রা.-এর ঘটনাটিকে অস্বীকার করেছেন।

টিকাঃ
২০ : জামে' আল উসূল ফী আহাদীসির রাসূল : ৬৩১৮।
২১ শব্দটির অর্থ সম্প্রদায়। এখানে এর অর্থ অর্থাৎ তিনি একাই একটি জাতি ছিলেন। অর্থাৎ একটি জাতির প্রতীক ছিলেন।—ইমাম রাযি, কাশশাফ, জালালাইন ইত্যাদি।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 এই লেখকের মত

📄 এই লেখকের মত


কিন্তু এ-দুটি অভিমত থেকে ভিন্ন সহজ ও পরিষ্কার পন্থা আছে। সহিহ হাদিসের প্রতি অবিশ্বাস বা অস্বীকার [প্রথম মত] এবং সেগুলোর শব্দসমূহের হালকা ও দুর্বল ব্যাখ্যা [দ্বিতীয় মত] করা ব্যতীতই বিষয়টির মীমাংসা এমনভাবে করা হবে, যাতে আসল বিষয় অর্থাৎ 'নবীর নিষ্পাপতা'র ওপর কোনো ত্রুটি আসতে না পারে এবং এ-ধরনের ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানী অপপ্রয়োগকারীরা, নবীর হাদিস নিয়ে বিদ্রূপকারীরাও ধর্মদ্রোহিতার দুঃসাহস করতে না পারে।
এই সংক্ষিপ্ত কথাটির বিস্তারিত বিবরণ এই : 'নবীর নিষ্পাপতা' বিষয়টি নিঃসন্দেহে ধর্মের মূলনীতি এবং আকিদা-বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্তর্গত; বরং দীন ও ধর্মের সত্য-প্রতিপাদনের ভিত্তি ও বুনিয়াদ এই একটি বিষয়ের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। তার কারণ হলো, কোনো কোনো অবস্থায় নবী ও রাসুলও মিথ্যার কোনো না কোনো পন্থা অবলম্বন করতে পারেন, চাই তা সত্যের সহায়তার জন্যই হোক—এ-কথা স্বীকার করে নেয়ার পর তাঁর আনীত সমস্ত শিক্ষা থেকে এই পার্থক্য উঠে যাবে যে, সেগুলোর মধ্যে কোন্ অংশ তার প্রকৃত অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর কোন্ অংশ মিথ্যার রঙে রঞ্জিত। আর এটা যদি মেনে নেয়া হয়, তাহলে দীন আর দীন থাকে না।
এ-কারণে কুরআন মাজিদের এই অকাট্য আকিদা 'নবীর নিষ্পাপতা' নিজ স্থানে একটি সুদৃঢ় ও অবিচল আকিদা। সুতরাং যা-কিছু এই আকিদার সত্যতার ওপর দোষ আরোপের কারণ হবে, তা হয়তো নিজ থেকে প্রত্যাখ্যাত এবং অস্বীকৃত হওয়ার যোগ্য হবে অথবা নিজের বর্ণনার বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য দায়ী হবে। সুতরাং অকাট্য আকিদাকে তার নিজ স্থান থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে না। বিরোধী বস্তুটিকেই হয় ওই আকিদার অনুরূপ হতে হবে, অন্যথায় লোপ পেতে হবে।
এমনিভাবে এ-বিষয়টিও সর্বজন স্বীকৃত যে, কুরআন মাজিদের তাফসির ও ব্যাখ্যা কেবল আরবি ভাষা বা অভিধানের মাধ্যমেই করা যেতে পারে না। বরং তার মর্মার্থ বোঝার জন্য যেমন আরবি ভাষার জ্ঞানের প্রয়োজন, তেমনি, বরং তার চেয়েও অধিক, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ, কার্যাবলি, অবস্থাবলি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন এবং এটিই আল্লাহর কালামের বিশুদ্ধ তাফসির ও পরিশুদ্ধ ব্যাখ্যার বাহন।
সন্দেহাতীতভাবে এটি একটি প্রমাণিত সত্য কথা যে, কুরআন মাজিদের আহকাম, যথা : وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لله )এবং তোমরা হজ ও ওমরা আদায় করো(; وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ )নামায প্রতিষ্ঠা করো এবং যাকাত আদায় করো(; فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ )তোমাদের কেউ যদি রমযান মাস পায় সে যেনো সে-মাসে রোযা রাখে) প্রভৃতি আদেশগুলোতে নামায, যাকাত, হজ ও রোযার মর্মার্থ কখনো আমরা আরবি ভাষার জ্ঞান বা অভিধানের মাধ্যমে নির্দিষ্টরূপে বুঝতে পারি না। আভিধানিক অর্থের মাধ্যমে কখনো কুরআনের আহকাম বোঝা যেতে পারে না। বরং আহকামগুলোর পরিচায় জানা ও বোঝার জন্য নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওইসব বাণী ও কার্যাবলির প্রতি মুখ ফেরাতে আমরা বাধ্য, যা এই ফরয আহকামগুলোর ব্যাখ্যা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলো বলেছেন এবং করে দেখিয়েছেন। আর এটাও সত্য নয় যে, আমরা পারস্পরিক ক্রিয়া ও কার্যকলাপের মাধ্যমে ওই ফরয কার্যগুলোর স্বরূপ জানতে পারি।
কেননা, সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখতে আমাদের এ-কথা মানতেই হবে যে, আমাদের পারস্পরিক কার্যকলাপ ও আচার-আচরণের উৎসও শেষ অবধি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী ও কার্য পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায়। সুতরাং আল্লাহর রাসুলের সেসব বাণী ও কার্যকলাপকে ধর্মের অংশ বলা অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়। আর এই স্বীকৃতি ও সম্মতি ব্যতীত لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا (سورة الأحزاب)
'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।' [সুরা আহযাব: আয়াত ২১]
আয়াতটির কোনো অর্থ হয় না। কারণ এই উত্তম আদর্শ কুরআন মাজিদ বা তার আয়াত নয়; বরং সেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীসমূহ, কার্যাবলি ও অবস্থাসমূহই উত্তম আদর্শ। (যার অনুকরণে নিজের ধর্মীয় জীবন গড়ে তুলতে হবে।) আর যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী, কার্য ও অবস্থাবলি ধর্মের অংশ বলে সাব্যস্ত হলো, তখন সেগুলোর সংরক্ষণের এমন উপকরণ ও ব্যবস্থা হওয়া আবশ্যক ছিলো, যাতে তা খাতিমুন্নাবিয়িয়নের উম্মতের জন্য পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত সুরক্ষিত নিয়মে পৌঁছতে পারে। এসব খাঁটি মণি-মুক্তার সঙ্গে যখনই কোনো ভেজাল মিশ্রিত হয়, তখনই তার সংরক্ষকগণ এবং শাস্ত্রবিশারদগণ তৎক্ষণাৎ দুধ ও পানিকে পৃথক করে খাঁটি থেকে মেকিকে বেছে নিতে পারেন। এই সংরক্ষণ-পদ্ধতির নামই রেওয়ায়েতে হাদিস এবং হাদিসের দোষ-ত্রুটি যাচাই করা। এই শাস্ত্রকেই বলা হয় হাদিসশাস্ত্র। এটাই সেই পবিত্র ও মহান খেদমত, যা কেবল নিজেদেরই নয়, বরং অপরদের থেকেও প্রশংসা অর্জন করেছে এবং এই খেদমতকে ইসলামের বিশেষ নিদর্শন বলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেসব বাণী ও কার্যাবলির রেওয়ায়েতের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাঁটি ও মেকি যাচাই করার জন্য রাসুলের নবুওতের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত যে-খেদমত হয়ে আসছে, তার গুরুত্ব এ-কথা থেকেই প্রকাশ পেতে পারে যে, হাদিস রেওয়ায়েত করার শাস্ত্রটি প্রায় চৌদ্দ প্রকার বিষয় ও শাখাবিষয়ের মধ্যে বিভক্ত। সুতরাং, এটা একান্ত আবশ্যক যে, আমরা কোনো একটি রেওয়ায়েত বা রেওয়ায়েতের একটি বাক্যকে যা তার শাব্দিক অর্থ ও বাহ্যিক বর্ণনায় আকিদা-সম্পর্কিত জরুরি বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে—সহিহ, মাকবুল, মাশহুর এবং মুতাওয়াতির হাদিসকে অস্বীকার করার ওপর দলিল ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠা না করি এবং সেটিকে হাদিস অবিশ্বাস বা অস্বীকার করার কারণ বানিয়ে কুরআন মাজিদকে এমন এক অভিনব-অপরিচিত গ্রন্থ না বানিয়ে দিই, যার ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো নবীর বিশ্লেষণমূলক বাণীও নেই এবং ব্যাখ্যাস্বরূপ কার্যাবলিও নেই; বরং তা যেনো কোনো অনাবাদ ভূমি বা পাহাড়ের ওপর নাযিল হয়েছে, যা কেবল নিজের ভাষার জ্ঞান ও অভিধানের মাধ্যমেই বুঝা যেতে পারে।
অবশ্য এ-সত্যকেও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, রাসুলুল্লাহ সা.-এর যাবতীয় বাণী বা হাদিস অবিকল তাঁর শব্দে শব্দে রেওয়ায়েত করা হয় নি; বরং কোনো কোনো রেওয়ায়েতে হাদিসের মর্মার্থ রাবি নিজের শব্দে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ এমন হয় নি যে, রাসুলুল্লাহ সা. যে-শব্দগুলো পবিত্র মুখে উচ্চারণ করেছেন, রাবি তার প্রতিটি শব্দ অনুরূপভাবে রেওয়ায়েত করেছেন। বরং রাসুল সা.-এর উচ্চারিত শব্দগুলোর মর্মার্থ স্মরণে রেখে রাবি তাকে নিজের শব্দে ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার প্রতি লক্ষ রাখার পর এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়কেও এইভাবে অনুধাবন করা যায় যে, সহিহ বুখারির হাদিসগুলো সন্দেহাতীতভাবে সর্বজনের স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং এটাও স্বীকার করে নেয়া যায় যে, এ-কিতাবটি আলোচনা ও সমালোচনার কষ্টিপাথরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উম্মতের মধ্যে প্রসিদ্ধি এবং স্বীকৃতির এমন স্তরে পৌঁছেছে যে তা আল্লাহর কিতাব কুরআনের পর সর্বাপেক্ষা অধিক বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত হয়েছে। তারপরও এটা সম্ভব যে, তার কোনো রেওয়ায়েতে রাসুল সা.-এর বাণীর মর্মার্থ রাবির নিজের বর্ণনার শব্দচয়নে ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়েছে। সেই রেওয়ায়েতটি সনদ ও ইবারতের পরিপ্রেক্ষিতে যদিও নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য, কিন্তু সেই বাক্যটির বর্ণনাকে দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত মনে করা হবে এবং মূল রেওয়ায়েতটিকে প্রত্যাখ্যান করার পরিবর্তে কেবল সেই বাক্যটির দুর্বলতা ও ত্রুটিকে প্রকাশ করে দেয়া হবে। যেমন এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত সহিহ বুখারির মেরাজের হাদিসটিতে রয়েছে।
মুহাদ্দিসিনে কেরাম সবাই এ-কথার ওপর একমত যে, সহিহ মুসলিম শরিফে রাসুল সা.-এর মেরাজ সম্পর্কে যে-রেওয়ায়েতটি হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে তার মোকাবিলায় সহিহ বুখারির আবদুল্লাহ বিন আবি নামিরা থেকে বর্ণিত হাদিসটিতে দুর্বলতা ও ত্রুটি রয়েছে। তার তারতিবের মধ্যে ভুল বিদ্যমান। পক্ষান্তরে সহিহ মুসলিমের রেওয়ায়েতটি ওইসব দুর্বলতা ও দোষ থেকে মুক্ত। অথচ এই দুটি রেওয়ায়েতই রেওয়ায়েত ও দেরায়েত হিসেবে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য।
কাজেই কোনো সন্দেহ ও ইতস্ততা করা ব্যতীত এ-বিষয়টি স্বীকার করে নেয়া উচিত যে, হযরত ইবরাহিম আ.-সম্পর্কিত উপরিউক্ত দীর্ঘ রেওয়ায়েত দুটি মর্মার্থ বর্ণনা-করা জাতীয় রেওয়ায়েতগুলোর অন্তর্গত। এবং এই দাবি কখনো করা যেতে পারে না যে, রেওয়ায়েত দুটির শব্দ ও বাক্যাবলির বর্ণিত পূর্ণরূপ রাসুল সা.-এর পবিত্র যবান থেকে নিঃসৃত শব্দ ও বাক্যাবলিরই হুবহু রূপ; বরং এগুলো তাঁর কথার মর্মার্থকে বর্ণনা করছে মাত্র। অতএব, রেওয়ায়েত দুটির মধ্যে হয়তো বর্ণিত ঘটনাবলি বিশুদ্ধ ও সঠিক হওয়া সত্ত্বেও আলোচ্য শব্দগুলো সনদের মধ্যস্থিত কোনো রাবির নিজের বর্ণনায় শব্দচয়ন ও বিন্যাসের ফল এবং সে-কারণে এই দোষ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষত, এর জন্য এই সংকেতও বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত ইবরাহিম আ., হযরত সারা রা. এবং মিসরের রাজার ওই ঘটনাটির উল্লেখ তাওরাতেও রয়েছে এবং সেখানে এ-জাতীয় অসাবধানতামূলক বহুসংখ্যক বাক্য বিদ্যমান। সুতরাং এটা সম্ভবপর যে, এই ইসরাইলি রেওয়ায়েত সহিহ রেওয়ায়েতের মধ্যে মিশে গেছে। কাজেই বর্ণনাকারী হয়তো উপরিউক্ত আলোচ্য শব্দগুলো দ্বারাই বিষয়টি বর্ণনা করে দিয়েছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00