📄 আয়াতগুলোর তাফসিরে মীমাংসাকারী উক্তি
এ-কথার ওপর সবারই ঐকমত্য রয়েছে যে হযরত ইবরাহিম আ. কখনো গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা করেন নি এবং তাঁর গোটা জীবন শিরকরে অপবিত্র স্পর্শ থেকে পবিত্র। তারপরও সুরা আন'আমের উপরিউক্ত আয়াতগুলোর তাফসিরে উলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মত রয়েছে। এই আয়াতগুলোর সূচনায় যা-কিছু লেখা হয়েছে, তা সেই মতগুলোর মধ্যে অন্যতম মত অনুযায়ী লেখা হয়েছে। তার সারমর্ম এই যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর কথাগুলো ছিলো কওমের নক্ষত্রপূজার খণ্ডন সম্পর্কে এবং তাদেরকে নিরুত্তর করে দেয়ার জন্য। কেননা, দুটি দল যখন কোনো বিষয়ে মতভেদ করে থাকে, তখন সত্যকে প্রমাণিত করার জন্য বিতর্কসুলভ দলিল-প্রমাণের মধ্যে এক প্রকার দলিল এমনও আছে যেখানে নিজেদের দাবি প্রমাণে কেবল থিওরিসমূহই পেশ করা হয় না: বরং চাক্ষুষ দর্শনের এমন একটি পথ বেছে নেয়া হয় যাতে বিরুদ্ধ পক্ষ সেই দাবির মোকাবিলায় সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে যায়। তাদের সামনে প্রথম পক্ষের প্রমাণ খণ্ডনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। এখন যদি বিরুদ্ধ পক্ষের মধ্যে হঠকারিতা না থাকে; বরং সত্যপথ অবলম্বনের স্পৃহা তাদের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, অর্থাৎ তাদের অন্তরে সত্যকে গ্রহণ করে নেয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তারা তা কবুল করে নেয়। অন্যথায় বিনা-কারণেই তারা ঝগড়ায় লিপ্ত হতে প্রস্তুত হয়ে যায়। এইভাবে তখন হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য ফুটে ওঠে এবং প্রকৃত বিষয় ছেঁকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। হযরত ইবরাহিম আ. অতি উচ্চ মর্যাদাবান একজন নবী। তাঁর মিশন তর্কশাস্ত্রের নিয়ম-নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো না; বরং প্রকৃত সত্যকে প্রাকৃতিক প্রমাণসমূহের সরলতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে দেয়াই ছিলো তাঁর বৈশিষ্ট্য। সুতরাং তিনি এ-পথই অবলম্বন করলেন এবং তাঁর সম্প্রদায়ের সামনে পরিষ্কার করে দিলেন যে, গ্রহ-নক্ষত্র, চাই তা সূর্য হোক বা চন্দ্র হোক, রব ও মাবুদ হওয়ার যোগ্য নয়; বরং রব ও মাবুদ হওয়া তাঁরই জন্য শোভনীয় হয় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক এবং জমিন ও আসমানের অর্থাৎ নিম্নজগৎ ও ঊর্ধ্বজগতের সমুদয় সৃষ্টির স্রষ্টা ও মালিক। তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এই উজ্জ্বল প্রমাণের কোনো জবাব ছিলো না। তাই তারা বিরক্ত হয়ে সত্য বিষয়কে কবুল করার পরিবর্তে বিতণ্ডা ও লড়াই করতে প্রস্তুত হয়ে গেলো। কিন্তু তাদের অন্তর এ-কথা মানতে বাধ্য হলো যে হযরত ইবরাহিম আ. যা-কিছু বলেছেন তা সত্য। তাদের কাছে এর কোনো সঠিক জবাব নেই। হযরত ইবরাহিম আ.-এর উদ্দেশ্য ছিলো এটাই এবং তাঁর কর্তব্যপালনের সীমাও ছিলো এ-পর্যন্ত ই। কেননা, হৃদয় চিরে সত্যকে তার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া তাঁর সাধ্যের বাইরে ছিলো।
এই তাফসির অনুযায়ী কুরআন মাজিদের এই আয়াতগুলোর কোনো ব্যাখ্যারই প্রয়োজন হয় না এবং কোনো উহ্য বাক্যও মেনে নিতে হয় না। তা ছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রের চাক্ষুষ দর্শন সম্পর্কে আয়াতগুলোর পূর্বাপর কথা সহজেই এই তাফসিরের সমর্থন করছে। যেমন, এই বিষয়-সম্পর্কিত পূর্বের দুটি আয়াত-
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلالٍ مُبِينٍ ( وَكَذَلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُونَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ (سورة الأنعام
'স্মরণ করো, (সেই সময়ের কথা, যখন) ইবরাহিম তার পিতা আযারকে বলেছিলো, "আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।" আর এইভাবে আমি ইবরাহিমকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর পরিচালনা- "ব্যবস্থা” দেখাই, (চাক্ষুষ দর্শন করিয়ে দিয়েছি) যাতে সে নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [সুরা আন'আম: আয়াত ৭৪-৭৫] এই আয়াত দুটি থেকে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাচ্ছে:
১। গ্রহ ও নক্ষত্র দর্শনের ব্যাপারটি হযরত ইবরাহিম আ.-এর সঙ্গে এমন সময় ঘটেছিলো যখন তিনি সত্যপ্রচার সম্পর্কে তাঁর পিতা ও কওমের সঙ্গে লিপ্ত ছিলেন। কেননা, এখানে প্রথম আয়াতের পর দ্বিতীয় আয়াতকে 'আর এইভাবে' দিয়ে শুরু করার দ্বারা এটাই বোঝা যায়। আর তৃতীয় আয়াতের শুরুতে 'অতঃপর যখন' কথায় অতঃপর শব্দটি প্রকাশ করে যে এটি দ্বিতীয় আয়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং এভাবে এই তিনটি আয়াতই একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
২। আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ.-কে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে উজ্জ্বল প্রমাণ দান করেছিলেন, যেনো তিনি পিতা আযার ও তাঁর সম্প্রদায়কে নিরুত্তর করে দিতে পারে এবং সত্যের পথ দেখান। একইভাবে তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের পূজার বিরুদ্ধেও হযরত ইবরাহিম আ.-কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব ও পরিচালন-ব্যবস্থা চাক্ষুষ দেখিয়ে দিয়েছেন, যেনো তিনি সমুদয় সৃষ্টির তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত হয়ে যান এবং দিব্যস্তরের জ্ঞান লাভ করেন। এরপর তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের পূজার বিরুদ্ধেও উৎকৃষ্ট প্রমাণ পেশ করতে পারবেন এবং এই বিষয়েও কওমকে সত্যপথ দেখিয়ে তাদের এই ভুলপন্থা সম্পর্কে তাদেরকে নিরুত্তর করে দিতে পারবেন। এই তো ছিলো 'দেখিয়ে দেয়া'র আয়াতটির পূর্ববর্তী অবস্থা। এখন আমরা পরবর্তী অবস্থার প্রতি মনোনিবেশ করতে পারি।
অবশেষে যখন হযরত ইবরাহিম আ. সূর্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং সেটাও পরে দৃষ্টিপথ থেকে হারিয়ে যেতে শুরু করলো, তখন এই আয়াতেরই একটি বাক্যে তাঁর বক্তব্য দেখা যায়—
قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ (سورة الأنعام)
'সে (ইবরাহিম আ.) বললো, "হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক করো তার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্রব নেই।" আর এরই সঙ্গে এ-আয়াতটিও উল্লিখিত রয়েছে—
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ (সূরা আল-আন'আম)
"আমি (বাতিল উপাস্যগুলো থেকে বিমুখ হয়ে) একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন (সেগুলোর মালিক) এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।" [সূরা আন'আম : আয়াত ৭৯] এরপর এরই সঙ্গে সংলগ্ন আয়াতটিতে রয়েছে-
وَحَاجَهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُونِّي فِي اللَّهِ 'তার (ইবরাহিমের) সম্প্রদায় তার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলো। সে বললো, "তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হবে?" আর সর্বশেষ আয়াতে বলা হয়েছে-
وَتِلْكَ حُجَّتُنَا آتَيْنَاهَا إِبْرَاهِيمَ عَلَى قَوْمِهِ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَنْ نَشَاءُ إِنَّ رَبَّكَ حَكِيمٌ عَلِيمٌ (سورة الأنعام) 'আর ইহা আমার যুক্তি-প্রমাণ যা ইবরাহিমকে দিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের মোকাবিলায়; যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় আমি উন্নীত করি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক প্রজ্ঞাময়; সর্বজ্ঞ।' [সূরা আন'আম : আয়াত ৮৩]
এই আয়াতগুলো থেকে যেসব ফল বের হয় তা নিম্নরূপ:
১। গ্রহ-নক্ষত্র দর্শনের বিষয়টি অবশ্যই সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলো। তাই তৃতীয় দফায় ইবরাহিম আ. নিজেকে সম্বোধন করার পরিবর্তে তৎক্ষণাৎ তাঁর কওমকে সম্বোধন করতে শুরু করে দিলেন।
২। আর তাঁর সম্প্রদায়ও সবকিছু শুনে প্রমাণের জবাব প্রমাণ দিয়ে দেয়ার পরিবর্তে ঝগড়া-বিবাদ করতে শুরু করে দিলো।
৩। সম্প্রদায়ের সঙ্গে হযরত ইবরাহিম আ.-এর এই কথোপকথন অর্থাৎ প্রমাণ প্রদানকে আল্লাহপাক নিজের পক্ষ থেকে প্রমাণ প্রদান বলে সাব্যস্ত করেছিলেন। ইবরাহিম আ.-এর রিসালাতের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে এবং বহু উঁচু স্তরের। সুতরাং কওম তাঁর পথ প্রদর্শনের একান্ত মুখাপেক্ষী। আর এসব বিষয় ছাড়া এ-কথাও প্রণিধানযোগ্য যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহিম আ. সম্পর্কে এই বলেছেন-
وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِنْ قَبْلُ وَكُنَّا بِه عَالِمِينَ (سورة الأنبياء)
'আমি তো এর পূর্বে ইবরাহিমকে সৎপথের জ্ঞান দান করেছিলাম এবং আমি তার সম্পর্কে ছিলাম সম্যক অবগত।' [সুরা আম্বিয়া: আয়াত ৫১)
সুতরাং এ-ব্যাপারটি হযরত ইবরাহিম আ.-এর বাল্যকালের ঘটনাও হতে পারে না এবং তাঁর নিজের ঈমান ও আকিদার ব্যাপারও হতে পারে না। এখানকার বিস্তারিত বিবরণ থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, আমার বর্ণিত তাফসিরই আয়াতগুলোর বিশুদ্ধ তাফসির। আর নিঃসন্দেহে এটি হযরত ইবরাহিম আ.-এর পক্ষ থেকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ ছিলো। এ-বিষয়ে যে, সম্প্রদায়ের লোকদের গ্রহ-নক্ষত্রের পূজা করা, তাদের জন্য মন্দির নির্মাণ করা, উক্ত গ্রহ-নক্ষত্রের নাম অনুসারে নিজেদের নিম্নজগতের দেব-দেবীদের নাম রাখা ইত্যাদি।
মোটকথা, ওগুলোকে রব, মাবুদ ও খোদা মনে করা নিশ্চিতরূপে বাতিল ও পথভ্রষ্টতা। কেননা, এসব গ্রহ-নক্ষত্র সবাই এক বিশেষ শৃঙ্খলে জড়িত এবং তারা দিবস ও রজনীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রকার পরিবর্তন গ্রহণ করে। এই পূর্ণ শৃঙ্খলার মালিক এবং স্রষ্টা শুধু সেই মহান শক্তিমান সত্তা, যাঁর কুদরত এ-সমুদয় বস্তুকে বশীভূত করে রেখেছে এবং তিনি 'আল্লাহ'। আল্লাহর কুদরকের বশীভূত থাকার ফলে-
لَا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ (سورة يس)
'সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রতেক্যে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে। [সুরা ইয়াসিন: আয়াত ৪০]
টিকাঃ
১০. অর্থাৎ স্রষ্টা, মালিক, প্রতিপালক ও সংরক্ষক হিসেবে আল্লাহর অসীম ক্ষমতা এবং সুষ্ঠু ও সুবিন্যস্ত পরিচালন-ব্যবস্থা।
১৪. এখানে 'আল্লাহ' শব্দটি উহ্য রয়েছে।
* এখানে জুলুমের অর্থ শিরক। যেমন লুকমান তাঁর পুত্রকে সম্বোধন করে বলেছেন, إنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمُ عَظِيمٌ )নিশ্চয় শিরক করা বড় জুলুম।- সুরা লুকমান(