📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 বংশপরিচয়

📄 বংশপরিচয়


তাওরাতে হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশপরিচয় নিম্নরূপ: ইবরাহিম খলিলুল্লাহ বিন তারিহ বিন নাহুর বিন সারুজ বিন বিন রা'উ বিন ফালিখ বিন আবির বিন শালিহ বিন আরফাকশায বিন সাম বিন নুহ আ.। এই বিবরণটি তাওরাত ও ইতিহাসের অনুরূপ। কিন্তু কুরআন মাজিদে তাঁর পিতার নাম আযার বলা হয়েছে।
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لِأَبِيهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلِهَةً إِنِّي أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (سورة الأنعام) 'স্মরণ করো, (সেই সময়ের কথা, যখন) ইবরাহিম তার পিতা আযারকে বলেছিলো, "আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখছি।" [সুরা আন'আম : আয়াত ৭৪]

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ

📄 আযর শব্দের বিশ্লেষণ


যেহেতু ইতিহাস ও তাওরাত হযরত ইবরাহিম আ.-এর পিতার নাম তারিহ বলছে, আর কুরআন মাজিদ বলছে আযার, তাই মুফাস্সির আলেমগণ এ-বিষয়টির তথ্য বিশ্লেষণে দুই প্রকারের মত অবলম্বন করেছেন:
১। এমন একটি অবস্থা বের করা হোক, যাতে উভয় নামের মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটে এবং অনৈক্য দূর হয়ে যায়।
২। তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তমূলক কথা বলে দেয়া হোক যে, এই দুটি নামের মধ্যে কোনটি সঠিক নাম এবং কোনটি ভুল; অথবা দুটি নামই সঠিক, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন লোকের নাম।
প্রথম মতের আলেমগণের সিদ্ধান্ত এই, দুটি নামই এক ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট; 'তারিহ' ব্যক্তিবাচক নাম আর 'আযার' গুণবাচক নাম। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, প্রতিমা-প্রেমিককে আযার বলা হয়। তারিহের মধ্যে যেহেতু প্রতিমা-নির্মাণ ও প্রতিমা-পূজা উভয় বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান ছিলো, এ-কারণে সে আযার উপাধিতে প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আবার তাঁদের কেউ কেউ ধারণা করেন, আযার শব্দের অর্থ أعوج অর্থাৎ স্বল্পবুদ্ধি বা নির্বোধ ও অতিশয় দুর্বল বৃদ্ধ।' তারিখের মধ্যে এই বিষয়গুলো বিদ্যমান ছিলো। তাই তাকে এই বিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে। কুরআন মাজিদ তার এই গুণবাচক প্রসিদ্ধ নামটিকে বর্ণনা করেছে। আল্লামা আবুল কাসেম আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আস- সুহাইলি (মৃত্যু: ৫৮১ হিজরি) তাঁর الروض الأنف في شرح السيرة النبوية لابن هشام গ্রন্থে এ-মতটিই গ্রহণ করেছেন।
আর দ্বিতীয় মতের আলেমগণের বিশ্লেষণ হলো, আযার একটি প্রতিমার নাম। তারিহ সেই প্রতিমার পূজারী ও মোহন্ত ছিলো। যেমন মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত আছে যে কুরআন মাজিদের উপরিউক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হলো- أتتَّخِذُ آزَرَ إِلهَا آزَرَ أَي أَتَتَّخِذُ أَصْنَامًا آلهة (سورة الأنعام) 'তুমি কি আযারকে উপাস্য বলে মান্য করো।' অর্থাৎ প্রতিমাগুলোকে খোদা বলে মানো?
হাসান বিন মুহাম্মদ আস-সাগানি একই মত পোষণ করেছেন। কেবল ব্যাকরণের দিক থেকে তিনি উহ্য বাক্য সম্পর্কে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছেন। মোটকথা, তাঁদের উভয়ের কাছে آزر শব্দটি ابیه শব্দের بدل বা Noun of apposition নয়; বরং এটি মূর্তির নাম। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী কুরআন মাজিদে ইবরাহিম আ.-এর পিতার নাম উল্লেখ নেই। এটাও একটা প্রসিদ্ধ বক্তব্য যে, হযরত ইবরাহিম আ.-এর পিতার নাম ছিলো তারিহ (বা তারিখ) এবং তাঁর চাচার নাম ছিলো আযার। যেহেতু আযারই তাঁকে নিজের সন্তানের মতো প্রতিপালন করেছিলো, এইজন্য কুরআন মাজিদ আযাকে তাঁর পিতা বলে সম্বোধন করেছে। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, عم الرجل صنو أبيه 'কারো চাচা তার পিতার মতোই।'
আল্লামা আবদুল ওয়াহাব বুখারি বলেন, এসব অভিমতের মধ্যে মুজাহিদ রহ.-এর অভিমতটিই যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য। কারণ মিসরবাসীদের একটি প্রাচীন দেবতার নাম পাওয়া যায় আযওয়ারিস (ازوریس)। এর অর্থ 'শক্তিমান ও সাহায্যকারী খোদা'। মূর্তিপূজক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে শুরু থেকেই এই প্রথা প্রচলিত ছিলো যে তারা প্রাচীন দেবতাগুলোর নামেই নতুন দেবতাগুলোর নামকরণ করতো। এ-কারণে এই মূর্তিটির নামও প্রাচীন মিসরীয় দেবতার নামানুসারে 'আযার' রাখা হয়েছে। তবে হযরত ইবরাহিম আ.-এর পিতার মান তারিহই ছিলো।
আমাদের মতে এসব বক্তব্য কেবল অযথা জটিলতা সৃষ্টি করছে। কেননা, কুরআনুর কারিম যখন পরিষ্কারভাবে আযারকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর পিতাই বলেছে, তখন বংশতত্ত্ববিশেষজ্ঞদের এবং বাইবেলের ধারণাপ্রসূত অনুমানে প্রভাবিত হয়ে কুরআন মাজিদে নিশ্চিত বিবৃতিকে রূপক অর্থে নেয়া অথবা তার চেয়ে আরো আগে বেড়ে গিয়ে কুরআনে খামাখা ব্যাকরণশাস্ত্রের উহ্য শব্দ মেনে নেয়ার জন্য কোন্ শরিয়তসম্মত প্রকৃত প্রয়োজন বাধ্য করছে?
যদি মেনে নেয়া হয় যে, প্রতিমার প্রেমিককে আযার বলা হয় অথবা তা কোনো মূর্তির নাম, তারপরও কোনো উহ্য শব্দ না ধরে এবং বিরূপ ব্যাখ্যা না দিয়ে এটা কেনো হতে পারে না যে উল্লিখিত দুটি কারণেই আযারের নাম আযার রাখা হয়েছে। কারণ মূর্তিপূজক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে প্রাচীনকাল থেকেই এই প্রথা চালু হয়ে আসছে যে তারা কখনো কখনো 'দেবতার দাস' অর্থ প্রকাশ করে নিজেদের সন্তানের নাম রাখতো। আবার কোনো কোনো সময় দেবতার নামেই সন্তানদের নাম রেখে দিতো।
আসল কথা হলো, কালদি ভাষায় শ্রেষ্ঠ পূজারীকে ১। 'আদার' বলা হয়; আরবি ভাষায় একেই آزر 'আযার' বলা হয়েছে। তারিহ (বা তারিখ) যেহেতু প্রতিমা-নির্মাতা ও শ্রেষ্ঠ মূর্তিপূজক ছিলো, তাই 'আযার' নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এটি ব্যক্তিগত নাম ছিলো না; বরং গুণবাচক উপাধি ছিলো। উপাধি যখন নামের স্থান দখল করে ফেলেছে, কাজেই কুরআন মাজিদও তাকে এই নামেই সম্বোধন করেছে।
তা ছাড়া সেই মহাপবিত্র মানব হযরত ইবরাহিম আ.-এর চারিত্রিক মর্যাদা এত উন্নত যে, মূর্তিপূজার নিন্দা প্রসঙ্গে যখন আযারের সঙ্গে তার বিতর্ক হয়ে গেলো এবং আযার বিরক্ত হয়ে বললো- أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا (سورة مریم)
"হে ইবরাহিম, তুমি কি আমার দেব-দেবী থেকে বিমুখ? যদি তুমি নিবৃত্ত না হও, তবে আমি প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণনাশ করবোই। (প্রস্তর নিক্ষেপ করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবো।) তুমি চিরদিনের জন্য আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যাও।" [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৪৬]
এমন কঠোর ও মনোযন্ত্রণাদায়ক কথোপকথনের সময়ও হযরত ইবরাহিম আ. পিতৃ-সম্পর্কের মর্যাদা শুধু এতটুকু বলেছিলেন- سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا (سورة مريم)
"তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার প্রতিপালকের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো, নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। [সুরা মারইয়াম: আয়াত ৪৭]
এমন মহান ব্যক্তিত্ব থেকে এটা কেমন করে আশা করা যায় যে, তিনি নিজের পিতা আযারকে নির্বোধ দুর্বল বৃদ্ধ এবং এ-জাতীয় তুচ্ছতাব্যাঞ্জক শব্দ দিয়ে সম্বোধন করবেন।
অতএব, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ইতিহাসের 'তারিখ' আযারই বটে এবং এটা তার ব্যক্তিগত নাম, গুণবাচক নাম নয়। তারিখ হয়তো ভুল না অথবা আযার শব্দের অনুবাদ, যা তাওরাতের অন্যান্য নামের মতো শেষ পর্যন্ত আর অনুবাদ থাকে নি; বরং আসল নামে পরিণত হয়েছে।
মারাতাশি সপ্তদশ শতাব্দীর একজন খ্রিস্টান শিক্ষাবিদ। তিনি কুরআন মাজিদের অনুবাদ করেছেন এবং কুআনুল কারিমের প্রতি খুবই সূক্ষ্ম ও পক্ষপাতমূলক আক্রমণ করেছেন। তিনি এ-ক্ষেত্রে তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী একটি অনর্থক ও দুর্বল প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। তার সারমর্ম এই- ইফযবিউসের গির্জার ইতিহাসের একটি বাক্যে এই শব্দটি বর্ণিত হয়েছে। যাকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল সিগা ও শব্দরূপের সঙ্গে কুরআন মাজিদে যোগ করেছেন।
কিন্তু বিচিত্র তামাশার কথা হলো, মারাতাশি নিজের এই দাবি প্রমাণে ইতিহাসের সেই বাক্যটুকুও উল্লেখ করেন নি, যা থেকে এই শব্দটি গৃহীত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সেই মূল শুদ্ধ শব্দটিরও সন্ধান দেন নি যা থেকে এই ভুল শব্দটি বানিয়ে নেয়া হয়েছে। তা ছাড়া তিনি এটাও বলেন নি যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওই শব্দটি বর্ণনা করার কী প্রয়োজন পড়েছিলো। সুতরাং মারাতাশির ওই উক্তিটি সম্পূর্ণ প্রমাণহীন অনর্থক কথা কেবল পক্ষপাতিত্ব ও মূর্খতার ভিত্তিতে বলা হয়েছে। বস্তুত সত্য তা-ই, যা আমি এইমাত্র উপরে বর্ণনা করেছি।

টিকাঃ
১. দেখুন: তাজুল উরুস মিন জাওয়াহিরি কামুস, মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুর রাজ্জাক আয-যুবাইদি। তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২।
২. এখানে -এর অর্থ অভিভাবদন নয়, বিদায় গ্রহণ। কাশশাফ, জালালাইন, কুরতুবি ইত্যাদি।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশধারা

📄 হযরত নূহ আ. পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশধারা


তাওরাত ও ইতিহাস হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত নুহ আলাইহিস সালাম পর্যন্ত যেসব ধাপ বিবৃত করেছে তা নিচে দেয়া হলো। এই নসবনামা বা বংশপরম্পরার শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতার বিষয়টি আনুমানিক ও ধারণাপ্রসূত মতের অধিক কিছু নয়। কেননা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশ সম্পর্কে এ-কথা তো সুনিশ্চিত যে তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এর বংশধর, তারপরও আদনান থেকে ওপরের ধাপগুলো স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সিদ্ধান্ত এই — كذب النسابون 'বংশতত্ত্ব বিশেষজ্ঞগণ নামগুলোর নির্দিষ্টতার ব্যাপারে ভুল বর্ণনা করেছেন।' সুতরাং হযরত ইবরাহিম আ. থেকে হযরত নুহ আ. পর্যন্ত বংশধারা ভুল ও মিথ্যা বর্ণনা থেকে কীভাবে বিশুদ্ধ থাকতে পারে?
নাম - পিতার নাম - পুত্রের জন্মকালে পিতার বয়স
সাম - নুহ আ. - ৫০০ বছর
আরফাকশায - সাম - ১০০ বছর
শালিহ - আরফাকশায - ৩৫ বছর
আবির - শালিহ - ৩০ বছর
ফালিখ - আবির - ৩৪ বছর
রা'উ - ফালিখ - ৩০ বছর
সারুজ - রা'উ - ৩২ বছর
নাহুর - সারুজ - ৩০ বছর
তারিহ - নাহুর - ২৯ বছর
ইবরাহিম আ. - আযার (তারিহ বা তারিখ) - ৭০ বছর
এই গণনা অনুসারে হযরত ইবরাহি আ.-এর জন্মকাল থেকে হযরত নুহ আ. পর্যন্ত আটশো নব্বই বছর হয়। হযরত নুহ আ.-এর পূর্ণ বয়স বা আয়ুষ্কাল ৯৫০ বছর বলা হয়। তখন এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, হযরত নুহ আ.-এর আয়ুষ্কাল ৬০ বছর বাকি থাকতে তাঁর জীবদ্দশাতেই হযরত ইবরাহিম আ.-এর জন্ম হয় এবং তাঁরা উভয়ে এই ৬০ বছর সমসাময়িক জীবনযাপন করেন। সুতরাং নিঃসন্দেহে এটা ভিত্তিহীন কথা এবং নিশ্চিতভাবে ভুল ও অর্থহীন। কাজেই এ-কথা মানতে হবে যে, তাওরাতের এই গণনা ও হিসাব নিরেট বানোয়াট কল্পকাহিনির চেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারী নয়। আর বাস্তবিক ব্যাপারও এটাই যে, প্রাচীনকালে ইহুদিদের কাছে ইতিহাসের অধ্যায়সমূহ এ-জাতীয় কল্পকাহিনি ও রেওয়ায়েতের ওপরই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। এগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা, সময়ের বৈপরীত্য এবং মতানৈক্যের প্রতি বিন্দুমাত্র লক্ষ রাখা হয় নি।

টিকাঃ
৩. حليل الرحمن - بن تارح وهو آزر بن ناحور بن ساروغ بن راعو بن فالح بن عيبر بن : ه . الروض الأنف في شرح السيرة النبوية لابن هشام شالخ بن ارفخشد بن سام بن نوح
৪. ইবরাহিম আ.-এর আরো দুটি বংশপরম্পরা বর্ণিত আছে : ২. هو إبراهيم عليه السلام بن تارخ وهو عازر بن ناخور بن ساروغ بن ارغو بن فالح بن غابر بن شالخ بن قينان بن ارفخشد بن سام بن نوح عليه الصلاة والسلام
৩. هو إبراهيم عليه السلام بن تارح بن ناحور بن سروج بن رعو بن فالح بن عابر بن شالح بن أفكشاذ بن سام بن نوح عليه السلام অর্থাৎ নামের বানান ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। যেমন: তারিহ (تارح) ও তারিখ (تارخ); সারুজ (سروج) ও সারুগ (ساروغ); ফালি (فالغ) , ফালা’ (فالع) ও ফালিজ (فالج); আবির (عابر), গাবির (غابر) ও ইবার (عير); শালিহ ও শালিখ; আরফাকশায (أفكشاذ) ও আরফাখশায (ارفخشد) । দ্বিতীয় সূত্রে শালিখের পর কীনানের নাম বলা হয়েছে।

📘 কাসাসুল কুরআন > 📄 ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের অর্থহীন বক্তব্য

📄 ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের অর্থহীন বক্তব্য


ইউরোপের প্রাচ্যবিদদের একটি দল ইসলামের শত্রুতায় বিশেষ পাণ্ডিত্য রাখেন। বিদ্বেষ ও শত্রুতার প্রজ্জ্বলিত আগুনে তাঁরা বাস্তবতা ও সত্য ঘটনাবলিকে অস্বীকার করতে প্রয়াস পান। এ-জাতীয় ক্ষেত্রের মধ্যে- যেখানে কুরআন মাজিদের বিরুদ্ধে কোনো দলিল-প্রমাণ ছাড়াই তাঁদের সমালোচনার তরবারি চলতে থাকে — হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্বও একটি ক্ষেত্র। রচিত দায়িরাতুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়া (دائرة المعارف الإسلامية / Encyclopedia of Islam) উইনসিঙ্কের (Arent Jan Wensinck) বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছে যে, সর্বপ্রথম স্পিঙ্গার (Sprenger) এই দাবি করেছেন, কুরআন মাজিদে একটি দীর্ঘ সময়সীমা পর্যন্ত হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্ব পবিত্র কাবাগৃহের পুনর্নির্মাতা এবং দীনে হানিফের পথপ্রদর্শকরূপে আলোচিত হয় নি।
অবশ্য দীর্ঘকাল পরে তাঁর ব্যক্তিত্বকে ওইসব গুণে গুণান্বিত বলে প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাতে তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশেষ গুরুত্ব দৃষ্টিগোচর হয়। যেহেতু এই দাবি তাঁর সংক্ষিপ্ত বিবৃতির প্রেক্ষিতে তখনো অসম্পূর্ণ ছিলো, তাই দীর্ঘকাল পর স্প্রিঙ্গারের এই বক্তব্যকে স্লোগ এবং হিক্রোনিয়াহ বেশ বিস্তারিতরূপে বর্ণনা করেছেন এবং নিজেদের কল্পনাপ্রসূত দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে তাকে বিশেষ রঙে রঞ্জিত করেছেন। তিনি বলেছেন:
"পবিত্র কুরআনে যতগুলো মক্কি (মক্কায় নাযিল-হওয়া) আয়াত এবং সুরা রয়েছে, তার কোনো এক জায়গাও হযরত ইসমাইল আ.-এর সঙ্গে হযরত ইবরাহিম আ.-এর সম্পর্ক দেখা যায় না এবং তাঁকে 'সর্বপ্রথম মুসলমান'ও মুসলমানও বলা হয় না। বরং তিনি কেবল একজন নবী ও পয়গম্বর হিসেবে গোচরীভূত হন। তাঁর আলোচনাযুক্ত একটি আয়াতও এমন পাওয়া যাবে না, যা তাঁকে কা'বাগৃহের প্রতিষ্ঠাতা, হযরত ইসমাইল আ.-এর পিতা, আরবের নবী ও পথপ্রদর্শক, মিল্লাতে হানিফির আহ্বানকারী বলে প্রকাশ করেছে। সুরা আয-যারিয়াত, সুরা আল-হিজর, সুরা আস-সাফফাত, সুরা আল-আন'আম, সুরা হুদ, সুরা মারইয়াম, সুরা আল-আম্বিয়া, যার সবগুলোই মক্কি সুরা, আমাদের দাবির পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করছে। এ থেকে এই স্পষ্ট ফল প্রকাশিত হয় যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে আরব ভূখণ্ডে কোনো নবী আসেন নি এবং ইনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি নবুওতের দাবি করেছেন।
অবশ্য যখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মদিনার জীবন শুরু হয় তখন মদিনায় নাযিল-হওয়া সুরাগুলোতে হযরত ইবরাহিম আ. সম্পর্কে আলোচনার সময় তাঁর এ-সকল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বসহ সেগুলোর প্রতি আলোকপাত করা হয়।
কেনো এমন হলো? কেনো এই ভিন্নতা বিদ্যমান? এর কারণ হলো এই, মক্কার জীবনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কার জীবনে যাবতীয় বিষয়ে ইহুদিদের ওপর নির্ভর করতেন, তাদের নীতি-পন্থাই পছন্দ করতেন, তাই তখন পর্যন্ত তিনি হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্বকে সে-দৃষ্টিতেই দেখতেন, যে-দৃষ্টিতে ইহুদিরা তাঁকে দেখতো।
কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় পৌঁছে ইহুদিদেরকে তাঁর ইসলামি মিশনের দাওয়াত জানালেন, তখন তারা ইসলামের দাওয়াত কবুল করতে অস্বীকৃতি জানালো, এমনকি তাঁর শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন চিন্তা করলেন এবং গভীরভাবে ভাবলেন। অবশেষে তাঁর তীক্ষ্ণ ধীশক্তি ও বিচক্ষণতা তাঁকে পথের সন্ধান দিলো এবং তিনি আরবদের জন্য ইহুদিদের ইহুদি ধর্ম থেকে ভিন্ন এমন এক ধর্মের প্রতিষ্ঠা করলেন যাকে ইবরাহিমি ইহুদি ধর্ম বলা উচিত। সুতরাং, এর পূর্ণতা সাধনের জন্য কুরআন মাজিদের মাদানি সুরাগুলোতে হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে তিনি মিল্লাতে হানিফির আহ্বানকারী, আরবদের নবী হযরত ইসমাইলের পিতা এবং কাবাগৃহের প্রতিষ্ঠাতারূপে গোচরীভূত হচ্ছেন।"
এটাই সেই দাবি ও তার প্রমাণ যা স্প্রিঙ্গার, স্নোগ, উইনসিল্ক-এর মতো ইসলামের শত্রু ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের পক্ষ থেকে নির্ভেজাল মিথ্যাচার। এই মিথ্যা রচনা কেবল এ-জন্য করা হয়েছে, যাতে এ-জাতীয় দুর্বল ভিত্তির ওপর খ্রিস্টান ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইসলাম ধর্মের হীনতার প্রসাদ নির্মাণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া এ-জন্যও, যাতে হযরত ইবরাহিম আ. সম্পর্কে এ-কথা প্রমাণ করা যায় যে আরবদের সঙ্গে তাঁর বংশগত সম্পর্কও নেই, এমনকি ধর্মীয় সম্পর্কও নেই। কিন্তু যখন একজন ইতিহাসবিদ এবং একজন সমালোচক ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের এই দাবি এবং দাবির পক্ষে প্রমাণসমূহকে কেবল ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তখন এটা পরিষ্কাররূপে প্রতিভাত হয় যে, এই যা-কিছু বলা হলো, প্রকৃত সত্য ও বাস্তব ঘটনাবলি থেকে ইচ্ছাকৃত চোখ বন্ধ করে কেবল শত্রুতা এবং হিংসা ও বিদ্বেষবশত বিনা প্রমাণেই বলা হলো। ফলে তাদের দাবির পক্ষে সবশ্রেষ্ঠ প্রমাণ হিসেবে এটাই পেশ করা হয়েছে যে, মক্কায় নাযিল-হওয়া সুরাসমূহে হযরত ইবরাহিম আ.-সম্পর্কিত ওইসব গুণাবলি গোচরীভূত হয় না, যা মদিনায় নাযিল হওয়া সুরাগুলোতে পাওয়া যায়।
কিন্তু আফসোসের সঙ্গে বলতে হয়, এটি আপাদমস্তক মিথ্যা; বরং এটি জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইচ্ছাপূর্বক ও সংকল্পবদ্ধ বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ, মক্কি সুরাগুলো থেকে কেবল ওইসব আয়াতেরই উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, যাতে হযরত ইবরাহিম আ.-কে কেবল একজন নবীরূপেই উপস্থাপিত করা হয়েছে। কিন্তু যে-মক্কি সুরাকে হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্বকে সবদিক থেকে উজ্জ্বল করে তোলার জন্য তাঁর নামে শিরোনাম দিয়ে নাযিল করা হয়েছে, অর্থাৎ সুরা ইবরাহিম, সেই সুরা থেকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। যেসব মানুষ কুরআন মাজিদ থেকে সরাসরি কোনো অর্থ উদ্ধার করতে পারে না এবং উপকৃত হতে পারে না, যাতে তাদের সামনে মূর্খতার পর্দা পড়েই থাকে এবং ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের অন্ধ অনুকরণে তারা তাঁদের ভুল দাবিকে সঠিক বলে মনে করে।
সুরা ইবরাহিম মক্কি সুরা; এর আয়াতগুলো হিজরতের পূর্বেই নাযিল হয়েছে। সুরা ইবরাহিম নিম্নলিখিত সত্যগুলো ঘোষণা করছে।
এক. হযরত ইবরাহিম আ. আরবে অর্থাৎ হিজাযে অবস্থান করেন এবং আল্লাহর রাসুল হিসেবে নিজেকে ও নিজের বংশধরকে প্রতিমাপূজা থেকে বেঁচে থাকার এবং সেই স্থানটিকে গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার কেন্দ্র করে দেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার দরবারে প্রার্থনা করেন। وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِي أَنْ تَعْبُدَ الْأَصْنَامَ (سورة إبراهيم)
'স্মরণ করো, ইবরাহিম বলেছিলো, “হে আমার প্রতিপালক, এই নগরীকে (মক্কা মুকাররমাকে) নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে প্রতিমাপূজা থেকে দূরে রেখো।" [সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৩৫। رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّي وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رحيم "হে আমার প্রতিপালক, এ-সকল প্রতিমা' তো বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে-ই আমার দলভুক্ত; কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে তুমি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" [সুরা ইবরাহিম : আয়াত ৩৬।
দুই. হযরত ইবরাহিম আ. স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, হিজায অঞ্চলটি (যা গোটা আরব দেশের হৃৎপিণ্ডস্বরূপ) তাঁরই বংশধরদের মাধ্যমে আবাদ হয়েছে এবং তারাই এতে বসতি স্থাপন করেছে এবং তারাই প্রস্তরময় প্রান্তরে বাইতুল হারাম অর্থাৎ কা'বাগৃহ নির্মাণ করেছে। যেমন কুরআন মাজিদে উল্লেখ করা হয়েছে-
رَبَّنَا إِنِّي أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ () رَبَّنَا إِنَّكَ تَعْلَمُ مَا تُخْفِي وَمَا تُعْلِنُ وَمَا يَخْفَى عَلَى اللَّهِ مِنْ شَيْءٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاء (سورة إبراهيم)
"হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার বংশধরদের কতিপয়কে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র গৃহের কাছে, হে আমার প্রতিপালক, এইজন্য যে, তারা যেনো সালাত কায়েম করে। অতএব তুমি কিছু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দিয়ে তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করো, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। হে আমার প্রতিপালক, তুমি তো জানো যা আমরা গোপন করি ও যা আমরা প্রকাশ করি; আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।" [সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৭-৩৮]
তিন. হযরত ইবরাহিম আ. হযরত ইসমাইল ও হযরত ইসহাক আ.-এর পিতা। এই ইসমাইল আ.-ই আরববাসীদের আদি পিতা। আর হযরত ইবরাহিম আ. মিল্লাহে হানিফির প্রতীক নামায কায়েম করার জন্য দোয়া করছেন-
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذي وهب لي على الكبر إسماعيل وَإِسْحَاقَ إِنَّ رَبِّي لَسَمِيعُ الدُّعَاءِ () رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاء () رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ (سورة إبراهيم)
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই, যিনি আমাকে আমার বার্ধ্যকে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছেন। আমার প্রতিপালক অবশ্যই প্রার্থনা শুনে থাকেন। "হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সালাত কায়েমকারী করো এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের প্রতিপালক, আমার প্রার্থনা কবুল করো। হে আমার প্রতিপালক, যেই দিন হিসাব অনুষ্ঠিত হবে সেই দিন আমাকে আমার পিতা মাতাকে এবং মুমিনগণকে ক্ষমা করো।” [সূরা ইবরাহিম: আয়াত ৩৪-৪১]
এই আয়াতগুলো পাঠ করার পর এক মুহূর্তের জন্যও কি কোনো ব্যক্তির এমন দুঃসাহস হতে পারে যে সে ওইসব অনর্থক ও প্রমাণহীন দাবিগুলোকে সত্য বলে মনে করে, যেগুলোকে ইউরোপের বিদ্বেষ-আক্রান্ত প্রাচ্যবিদ্‌গণ নিজেদের মূর্খতা অথবা ইচ্ছাকৃত মিথ্যা বিকৃতির সঙ্গে ইসলামী সমালোচনার শিরোনাম বানিয়েছে? এ আয়াতগুলো কি মক্কী নয় এবং এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে কি সেসব কথাই প্রমাণিত হয় না যা মাদানি আয়াতসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে?
চার. অতএব সূরা ইবরাহিম ছাড়াও সূরা আন'আম ও সূরা আন-নাহলও মক্কি সূরা। এ-দৃষ্টিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইবরাহিম আ. শিরকের মোকাবিলায় হানিফি ধর্মের প্রতি আহ্বানকারী ও দাওয়াতও প্রদানকারী। আহ্বান ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিত্ব বিশিষ্ট ও বিখ্যাত।
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ‘আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই’। [সূরা আন'আম: আয়াত ৭৯]
قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمًا دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (سورة الأنعام) “বলো, “আমার প্রতিপালক তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। তাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ, তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। [সূরা আন'আম : আয়াত ১৬১]
إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِلّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ ( ) شَاكِرًا لِّأَنْعُمِهِ [সূরা নাহল]
'ইবরাহিম ছিলো এক উম্মত, আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না; সে ছিলো আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য। কৃতজ্ঞ; আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেন এবং তাকে পরিচালিত করেছেন সরল পথে। [সুরা আন-নাহল: আয়াত ১২০-১২১)
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (سورة النحل) 'এখন আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করো; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না।' [সুরা আন-নাহল: আয়াত ১২৩]
তবে কি এসব দ্ব্যর্থহীন স্পষ্ট আয়াতের পরেও ওইসব প্রমাণের কোনো অর্থ থাকতে পারে যা স্লোগ ও তাঁর মতালম্বীরা এ-বিষয়ে বর্ণনা করেছেন? মক্কি সুরাই হোক, আর মাদানি সুরাই হোক—উভয় ক্ষেত্রেই হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্ব একই রকম প্রতীয়মান হচ্ছে। উভয় অবস্থাতেই তিনি হানিফি দীনের দাওয়াত প্রদানকারী। হযরত ইসমাইল আ.-ও সমগ্র আরব জাতির আদি পিতা, পবিত্র কা'বাগৃহের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাতা এবং আরবদের পথপ্রদর্শক। সুতরাং ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের এই উক্তি—হযরত ইবরাহিম আ.-এর ব্যক্তিত্ব কুরআন মাজিদের মক্কি ও মাদানি আয়াতসমূহে ভিন্ন ভিন্ন পরিলক্ষিত হয়—সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং স্পষ্ট অপবাদ। তা ছাড়া এ-বক্তব্যও সত্যের বিপরীত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরবে সর্বপ্রথম নবুওত দাবি করেন এবং তাঁর পূর্বে আরো কোনো নবীও অতীত হন নি। কেননা, হযরত ইবরাহিম আ., হযরত ইসমাইল আ., হযরত হুদ ও সালেহ আ. এ- ভূখণ্ডেরই পথপ্রদর্শক ও নবী ছিলেন।
জ্ঞানের ওই দাবিদারকে পক্ষপাতদুষ্টতা এমন মূর্খ করে দিয়েছে যে, কুরআন ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি প্রশ্ন উত্থাপন এ-কথাও চিন্তা করে না—এ-জাতীয় দাবির মাধ্যমে আমরা কেবল কুরআনের নয়, তাওরাতেরও মিথ্যা-প্রতিপাদন করছি। কারণ তাওরাতে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত আছে যে, হযরত ইসমাইল আ. হযরত ইবরাহিম আ.-এর পুত্র। আর ইসমাইল আ. আরব জাতির আদি পিতা এবং ইবরাহিম আ.-এর সন্তানদের মাধ্যমেই আরবভূমি আবাদ হয়েছে এবং এই পিতাপুত্র আরবভূমির দু-জন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।
তা ছাড়া এই অপবাদও নিশ্চিত ভিত্তিহীন ও নিরর্থক যে, মক্কার জীবনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদি ও তাদের ধর্মের অনুসরণ করেছেন এবং মদিনায় পৌঁছে যখন ইহুদিদের অবিশ্বাস এবং তাদের বিরোধিতামূলক উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করলেন, তখন ইহুদি থেকে স্বতন্ত্র নতুন এক ইহুদি ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তাকে মিল্লাতে ইবরাহিম বা ইবরাহিমি ধর্মে আখ্যায়িত করেন। প্রাচ্যবিদদের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ মক্কার জীবনে তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে ইহুদিদের কোনো সম্পর্কই ছিলো না। তাই বিরোধিতা, ঐকমত্য বা অনুকরণের প্রশ্নই ওঠে না। অবশ্য মদিনায় এসে তিনি মুশরিকদের চেয়ে ইহুদিদের প্রতি অধিক মনোযোগ প্রদান করেছিলেন।
তা এ-জন্য করেছিলেন যে, ইহুদিরা ইসলামের আকিদার অনুরূপ হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের অনুসারী ছিলো, যদিও তাতে বিকৃতি এবং পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছিলো, কিন্তু তারা মুশরিকদের বিপরীতে তাওহিদ ও একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলো। আর তাদের পরিবর্তিত কিতাবে পরিবর্তনের পরেও অনেক বাক্য এমন থেকে গিয়েছিলো যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হওয়া এবং ও তাঁর নবুওয়তের সাক্ষ্য ও প্রমাণ ছিলো। এসব বাণী থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া অনেক বিধি-বিধান এমনও ছিলো যা বিশুদ্ধ অর্থেই ওহির পর্যায়ভুক্ত এবং হযরত মুসা আ.-এর ধর্মের ভিত্তি ও বুনিয়াদ ছিলো। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারণা করেছিলেন যে এরা মুশরিকদের তুলনায় তাড়াতাড়িই ইবরাহিমি ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ফেলবে।
কিন্তু রাসুল যখন তাদের অস্বীকার, শত্রুতা ও বিদ্বেষের অভিজ্ঞতা লাভ করলেন, তখন তাদের সঙ্গে রাসুলের আচার-ব্যবহার সে-রকমই হয়ে গেলো, যে-রকম ছিলো মুশরিকদের সঙ্গে। অমুসলিম সবার ধর্মই এক অর্থাৎ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতা-এই প্রতিপাদ্য অনুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের সবাইকে একই পর্যায়ে রাখলেন।
প্রিঙ্গার, স্লোগ এবং তাঁদের সমমতাবলম্বীরা এতটুকু পরিষ্কার কথা বুঝতেও অক্ষম অথবা ইচ্ছা করেই বুঝতে চান না যে, যেহেতু হযরত ইবরাহিম আ. ইসরাইল (ইয়াকুব) আ.-এর দাদা ছিলেন এবং ইহুদিরা তাদের ধর্মের সম্পর্ককে ইসরাইল আ.-এর প্রতি আরোপ করে এবং বনি ইসরাইল অর্থাৎ ইসরাইল আ.-এর বংশধর হওয়ার কারণে গর্ববোধ করে, সুতরাং তাদের এই উক্তি-হযরত ইবরাহিম আ.-ও ইহুদি ছিলেন-কেমন হাস্যকর উক্তি! পৌত্রের ধর্ম সম্পর্কে কখনো কি এ-ধরনের কথা বলা যেতে পারে যে, দীর্ঘকাল পূর্বে অতীত দাদার ধর্ম পৌত্রের ধর্মের অনুগামী ছিলো?
এই সত্য প্রকাশ করার জন্যই কুরআন মাজিদ ঘোষণা করেছে- مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (سورة آل عمران)
'ইবরাহিম ইহুদি ছিলো না, খ্রিস্টানও ছিলো না; সে ছিলো একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্তও ছিলো না।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৬৭]
কিন্তু সেই অন্ধরা এ-আয়াতের এই অর্থ গ্রহণ করেছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় তো ইহুদিদের ধর্মের ওপর ছিলেন। কিন্তু মদিনায় গিয়ে যখন দেখলেন ইহুদিরা তাঁকে নবী মানতে অস্বীকার করছে, তখন ইহুদিদের ধর্মের মুকাবিলায় নিজের স্বভাবসুলভ মেধার সাহায্যে ইবরাহিমের ইহুদি ধর্ম উদ্ভাবন করে নিয়েছেন। سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانَ عَظِيمٌ )আল্লাহ পবিত্র, মহান। এ তো এক গুরুতর অপবাদ![
স্লোগ ও তাঁর সমমতাবলম্বীরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে আরবে কোনো নবী আসেন নি-এই দাবির প্রমাণে নিচের আয়াতটিও পেশ করেছেন- وَمَا كُنْتَ بِجانب الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَكِنْ رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (سورة القصص)
'মুসাকে যখন আমি আহ্বান করেছিলাম তখন তুমি তুর পাহাড়ের পাশে উপস্থিত ছিলে না। বস্তুত তা' তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দয়াস্বরূপ, যাতে তুমি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারো, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোনো সতর্ককারী আসে নি, যেনো তারা উপদেশ গ্রহণ করে।' [সুরা কাসাস: আয়াত ৪৬]
তাঁরা বলেন, ইবরাহিম ও ইসমাইল আ. আরবের নবী হলে কুরআন মাজিদ আরবের উম্মতদের সম্পর্কে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এভাবে সম্বোধন করতো না।
কিন্তু এটিও একটি জঘন্য ধোঁকা। কুরআন মাজিদের সম্বোধনরীতি, বর্ণনা-শৈলী এবং বাতিলপন্থীদের বাতিলপন্থার বিরুদ্ধে দলিলসমূহের বিন্যাস সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে এই ভুলের সৃষ্টি হয়েছে। অথবা, পূর্বে উল্লিখিত প্রশ্ন ও অভিযোগের মতো নিছক শত্রুতা, বিদ্বেষ ও বিরোধিতার কারণে এই ধোঁকার আশ্রয় নেয়া হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সত্য এই যে, আরবের একটি অতি বড় অংশ মূর্তিপূজায় লিপ্ত ছিলো এবং এ-ধারাবাহিকতায় তারা আকিদা ও ধর্মের নাম দিয়ে কতগুলো বিধান তৈরি করে রেখেছিলো। যেমন: দেবতাদের উদ্দেশে মানত এবং কুরবানির জন্য সায়েবা, বাহিরা ও অসিলা ইত্যাদি উদ্ভাবন। তা ছাড়া তারা বিভিন্ন মূর্তির পূজার জন্য বিভিন্ন নিয়মনীতি স্থির করেছিলো। এ-কারণে যখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে তাওহিদ ও ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং শিরক ও মূর্তিপূজা করতে বারণ করলেন, তখন তারা বলতে শুরু করলো, 'আমাদের ধর্ম খারাপ এবং আমাদের কোনো ইলহামি ধর্ম নেই— তোমার এ-ধরনের কথা বলা যে ভুল। কারণ আমাদের স্বতন্ত্র ধর্ম রয়েছে এবং তা আমাদের পূর্বপুরুষদের সনাতন ধর্ম।' আল্লাহপাক তাদের বক্তব্যকে কুরআনে উদ্ধৃত করেছেন এভাবে—
قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا وَاللَّهُ أَمَرَنَا بِهَا (سورة الأعراف) 'তারা বলে, "আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে তা করতে (এই ধর্মের ওপর থাকতে) দেখেছি এবং আল্লাহও আমাদেরকে এর (এই ধর্মের) নির্দেশ দিয়েছেন।" [সুরা আ'রাফ: আয়াত ২৮।
তখন কুরআন মাজিদ তাদের বাতিল আকিদার হাকিকতকে তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়ার জন্য এই পন্থা অবলম্বন করলো যে কোনো ধর্মের আল্লাহর ধর্ম হওয়ার দুই ধরনের দলিলই হতে পারে: ১. উপলব্ধি ও জ্ঞানের মাধ্যমে এটা স্পষ্টরূপে প্রকাশ পায় যে তা আল্লাহর ধর্ম এবং তাঁর প্রিয় ধর্ম; ২. অথবা উদ্ধৃত রেওয়ায়েতসমূহ তার সপক্ষে অকাট্য ও বিশ্বস্ত এবং অনস্বীকার্য প্রমাণ পেশ করে যে তা আল্লাহর প্রেরিত শরিয়ত। যদি কোনো দাবির পেছনে এ-দুই প্রকারের কোনো প্রকার দলিলই না থাকে, তবে সেই দাবিটি বাতিল এবং এমন দাবি উত্থাপনকারী মিথ্যাবাদী।
সুতরাং, কুরআন মাজিদ মুশরিকদের এই দাবি খণ্ডন করার জন্য কুরআনের আয়াতসমূহকে তিনভাগে ভাগ করে দিয়েছে। এক ভাগে তাদের এই দাবিগুলোকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং দাবিগুলো যে অযৌক্তিক তা প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মুশরিকদের এমন উক্তি আল্লাহ আমাদেরকে এই ধর্মেরই (শিরকের) আদেশ করেছেন'-সম্পূর্ণ ভুল এবং আপাদমস্তক বাতিল। কেননা,
'আল্লাহ অশ্লীল আচরণের (অনর্থক ও বেহুদা কাজের) নির্দেশ দেন না। (হে মুশরিকরা,) তোমরা কি আল্লাহ সম্পর্কে এমনকিছু বলছো (তাঁর ওপর এমন কথা আরোপ করছো) যা তোমরা জানো না?' [সুরা আ'রাফ: আয়াত ২৮]
আর দ্বিতীয় ভাগের আয়াতগুলো তাদের বাতিল দাবির সপক্ষে অনুভূতিগ্রাহ্য এবং যৌক্তিক প্রমাণ তলব করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তারা যুক্তির মাধ্যমে এ-বিষয়টি প্রমাণ করুক যে তারা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যা-কিছু ভুল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যার ওপর তাদের কল্পিত ধর্মের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত, তা কীভাবে সঠিক হয়েছে এবং কীভাবে তা জ্ঞানীদের কাছে মেনে নেয়ার উপযোগী হয়েছে। কুরআন বলছে-
'(হে মুহাম্মদ,) এখন তাদেরকে (মক্কার কাফেরদেরকে) জিজ্ঞেস করো, তোমার প্রতিপালকের জন্যই কি রয়েছে কন্যাসন্তান এবং তাদের জন্য পুত্রসন্তান? অথবা আমি কি ফেরেশতাদেরকে নারীরূপে সৃষ্টি করছিলাম আর তারা প্রত্যক্ষ করছিলো? (তারা কি তখন উপস্থিত ছিলো?) জেনে রাখো, তারা তো মনগড়া কথা বলে যে আল্লাহ সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তারা নিশ্চয় মিথ্যাবাদী। তিনি পুত্র সন্তানের পরিবর্তে কন্যা সন্তান পছন্দ করতেন? (হে মুশরিকরা) কী হয়েছে তোমাদের, তোমরা কেমন বিচার করো? (কেমন অবাস্তব হুকুম আরোপ করছো?) তবে কি তোমরা (কখনো) উপদেশ গ্রহণ করবে না।' [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১৪৯-১৫৫]
আর তৃতীয় ভাগের আয়াতগুলোকে তাদের বাতিল আকিদা সম্পর্কে কিতাবি দলিল তলব করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। কুরআন মাজিদ তাদের জিজ্ঞেস করছে, তোমরা যা-কিছু বলছো এবং তাকে আল্লাহর দীন বলে সাব্যস্ত করছো, তবে কি তোমাদের কাছে তার সপক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো দলিল বা প্রমাণ নাযিল হয়েছে? অথবা তাঁর কাছ থেকে কি এসব আকিদার সত্যায়নের জন্য কোনো কিতাব প্রেরণ করা হয়েছে? যদি এমন হয়ে থাকে তবে তা উপস্থিত করো। এ-ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে-
أَمْ لَكُمْ سُلْطَانٌ مُبِينٌ () فَأْتُوا بِكِتَابِكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (سورة الصافات) 'তোমাদের কি সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণ আছে? তাহলে (আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত) তোমাদের কিতাব উপস্থিত করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।' [সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১৫৬-১৫৭]
এখন যদি নিজেদের দাবি সত্যায়নের জন্য তাদের কাছে কোনো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যৌক্তিক প্রমাণও না থাকে এবং উদ্ধৃতিযোগ্য সনদের ভিত্তিতে কোনো দলিল বা কিতাবও না থাকে, তাহলে তাদের দাবি- তাদের কাছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ব থেকেই আল্লাহর দীন বিদ্যমান এবং সুশৃঙ্খল শরিয়তও রয়েছে-সম্পূর্ণ বাতিল ও মিথ্যা দাবি।
এমনিভাবে মুশরিকদের কাছে এ-কথা প্রকাশ করার জন্য যে তোমাদের কাছে তোমাদের বাতিল দাবিগুলোর পক্ষে কোনো যৌক্তিক প্রমাণও নেই এবং কোনো কিতাবি দলিলও নেই এবং তাদেরকে নিরুত্তর করে দেয়ার জন্য সুরা আহকাফের মধ্যে প্রমাণ পেশের এই পন্থাই অবলম্বন করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ائْتُونِي بِكِتَابِ مِنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةِ مِنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ 'বলো, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তাদের কথা ভেবে দেখেছো কি? আমাকে দেখাও তারা (ভূমি থেকে) পৃথিবীতে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আকাশমণ্ডলীতে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি? পূর্ববর্তী কোনো কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোনো জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার কাছে (তোমাদের দাবির সমর্থনে) উপস্থিত করো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।' [সুরা আহকাফ: আয়াত ৪।
এটাই সেই তত্ত্ব যাকে ভিন্ন এক ভঙ্গিতে কুরআন মাজিদের ওইসব আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে এ-কথা প্রকাশ পায় যে, আরবের মুশরিকদের কাছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে আর কোনো নবী আসেন নি। এসব আয়াতের অর্থ কখনো এমন হতে পারে না যে, আরবভূমি হেজায সবসময়ের জন্য আল্লাহর নবী ও রাসুলগণের আগমন থেকে বঞ্চিত ছিলো এবং সে-রাজ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আওয়াজই সর্বপ্রথম আওয়াজ। কুরআন মাজিদ এমন সত্যবিরোধী কথা কেমন করে বলতে পারে যখন সুরা ইবরাহিম, সুরা আনআম, সুরা আন-নাহলের আয়াতসমূহে হযরত ইবরাহিম ও হযরত ইসমাইল আ.-এর আরবি নবী হওয়ার পরিষ্কার ও স্পষ্ট সাক্ষ্য বিদ্যমান রয়েছে, যা একটু আগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিঃসন্দেহে কুরআন মাজিদ এ-জাতীয় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও বৈপরীত্যপূর্ণ উক্তি থেকে নিশ্চিতরূপে পবিত্র যে তা এক জায়গায় একটি কথাকে অস্বীকার করবে এবং অন্য এক জায়গায় সেই একই কথাকে স্বীকার করবে। কেননা, তা দৃশ্য ও অদৃশ্য এবং গায়েব ও হাজির সম্পর্কে জ্ঞানবান আল্লাহ তাআলার কালাম; ভুলভ্রান্তিযুক্ত মানুষের কথা নয়। কারণ আল্লাহপাক বলেন-
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
'তবে কি তারা কুরআন সম্পর্কে অনুধাবন করে না? (গভীর চিন্তা-ভাবনা করে দেখে না?) যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো কাছ থেকে আসতো (অন্যকারো কালাম হতো) তবে তারা তাতে অনেক অসঙ্গতি পেতো।' [সুরা নিসা: আয়াত ৮২]
সুতরাং কুরআন মাজিদের বিরুদ্ধে স্প্রিঙ্গার, স্লোগ এবং উইনসিঙ্ক-এর এসব উদ্ভট দাবি এবং তাদের উপস্থাপিত প্রমাণসমূহ ঐতিহাসিক তথ্য ও সত্য ঘটনাবলির আলোকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল এবং মিথ্যা। তাদের কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছে যে এঁরা এবং এই প্রজাতির অন্য সমালোচকগণ কুরআন মাজিদ সম্পর্কে সততা ও সুবিচারের সঙ্গে সমালোচনা করেন না। অথচ তাঁদের বোধশক্তি ও বোধগম্যতায় কোনো ত্রুটি নেই; বরং এর বিপরীতে তাঁরা জেনে-শুনে অসৎ ও অসাধুতাপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করে কুরআন মাজিদের বিরুদ্ধে বিষ উদ্‌দ্গীরণ করছেন, ভুল দোষারোপ করছেন, স্পষ্ট ও প্রকাশ্য বিষয়গুলোতে নিজেদের অভিপ্রায় অনুসারে জটিলতা সৃষ্টি করে অজ্ঞ দুনিয়াকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এ-জাতীয় দোষারোপে তাঁদের কেবল একটিমাত্র উদ্দেশ্য থাকতে, যাকে কুরআন এই শ্রেণির বিরোধীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে-
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاءٌ (سورة النساء) 'তারা (কুরআন ও ইসলাম অবিশ্বাসকারী লোক) এটাই কামনা করে যে (কতই না ভালো হতো) তারা যেমন কুফরি করেছে তোমরাও তেমন কুফরি করো, যাতে তোমরা তাদের সমান হয়ে যাও।' [সুরা নিসা: আয়াত ৮৯]
সুতরাং এসব অবিশ্বাসকারী কাফেরদের মোকাবিলায় মুসলমানদের সবসময় একটিমাত্র জবাব রয়েছে—
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ (سورة آل عمران) 'হে আমাদের প্রতিপালক, সরলপথ প্রদর্শনের পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য লঙ্ঘনপ্রবণ করো না (বক্রতার দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়ো না) এবং তোমার কাছ থেকে আমাদেরকে করুণা দাও, নিশ্চয় তুমি মহাদাতা।' [সুরা আলে ইমরান: আয়াত ৮)
যাইহোক, কুরআন মাজিদের উপরিউক্ত আলোচ্য আয়াতটির অর্থ খুব পরিষ্কার ও স্পষ্ট এবং তার মধ্যে ও সুরা আনআম, সুরা নাহল ও সুরা ইবরাহিমের অনুরূপ সুরাগুলোতে হযরত ইবরাহিম আ.-এর আরবের নবী হওয়ার মধ্যে নিশ্চিতভাবে কোনো বিরোধ ও বৈপরীত্য নেই। এখানে বর্ণিত বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ ছাড়াও সাধারণ মুফাস্সিরগণ এ-জাতীয় আয়াতগুলোর অর্থ এমন বর্ণনা করেছেন যে, এই সম্বোধন কেবল ওইসব লোকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিলো। তাদের অতীত পূর্বপুরুষ এবং আরবের অতীতকালের ইতিহাসের সঙ্গে এই সম্বোধনের কোনো সম্পর্ক নেই।

টিকাঃ
১. 'এখানে ১ সর্বনাম দ্বারা প্রতিমাগুলোকে বুঝাচ্ছে।
* অর্থাৎ ওহি, যা আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে প্রেরণ করে তাঁকে এমন সব বিষয়ে সংবাদ প্রদান করেছেন যা তিনি জানতেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00