📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


হুদায়বিয়ায় যে সন্ধিপত্র লেখা হয়েছিল, মুসলমানরা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও বিশ্বস্তার সহিত তা যথাযথ পালন করে আসছিল। ইত্যবসরেই হিজরি ৮ম সালে কুরাইশরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধি পত্র নবায়নের জন্য কতিপয় শর্ত যুক্ত করে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন। পরিশেষে একথা লিখে দিলেন, এ শর্তাবলী মনযুর করা না হলে হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করা হবে। কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গ করাকেই পছন্দ করল। (যুরকানী : ২/২৬৭)

অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। ৮ম হিজরির ১০ই রমযান সোমবার আসরের পর দশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বিরাট এক বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। কুদাইদ পৌঁছার পর মাগরিবের সময় হয়ে গেলে সকলে সেখানেই ইফতার সেরে নেন। মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছার পর হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদকে সৈন্যের একটি অংশ দিয়ে মক্কার উঁচু দিক দিয়ে প্রবেশের জন্য প্রেরণ করে তাদের বলে দিলেন, কেউ তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করলে তোমরাও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। (সীরাতে মুগলতাঈ)

মক্কার অন্য দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করেন। এক সাধারণ ঘোষণায় তিনি বলে দিলেন, যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ। অবশ্য এমন ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলাকে ক্ষমা করেন নি, যাদের অস্তিত্বই ছিল সকল ফেতনা-ফাসাদের উৎস, কিন্তু এরা সকলেও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় পৌঁছে মুসলমান হয়ে যায়। ২০শে রমযান জুমার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ তওয়াফ করেন। তখনো বায়তুল্লাহর আশেপাশে ৩৬০টি মূর্তি রাখা ছিল। হুযুরের হাতে ছিল একটি লাঠি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো মূর্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় সে লাঠি দ্বারা ইশারা করতেই মূর্তিটি মুখ থুবড়ে পড়ে যেত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিম্নের আয়াতটি পড়ছিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْবিطل كَانَ زَهُوقًا
"সত্য এসেছে, বাতিল ধ্বংস হয়েছে, নিশ্চয় বাতিল ধ্বংসশীল।"

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণ

📄 কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণ


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ সেরে কাবার চাবিরক্ষক উসমান বিন তালহা শাইবার কাছ থেকে বাইতুল্লাহর চাবি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর সেখান থেকে বের হয়ে মাকামে ইবরাহীমে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে তিনি মসজিদেই অবস্থান করছিলেন। আজ তিনি কুরাইশদের সম্পর্কে কী নির্দেশ জারি করেন লোকজন গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে তারই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সকল সন্দেহও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব শান্তির দূত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সম্বোধন করে বললেন, তোমরা আজ সর্ব বিষয়ে নিরাপদ। অতঃপর কাবার চাবিও তাদের নিকট দিয়ে দিলেন। (তালখীসুস সীরাত)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আবু সুফিয়ান রাযি.-এর ইসলাম গ্রহণ

📄 আবু সুফিয়ান রাযি.-এর ইসলাম গ্রহণ


আবু সুফিয়ান তখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে কুরাইশ পক্ষের প্রধান ছিলেন। সকল যুদ্ধেই তাদের সেনাপ্রধান তিনি হতেন। তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বে মুসলিম সৈন্যের সংবাদ নেওয়ার জন্য মক্কা থেকে বের হয়েছিলেন। সাহাবারা তাকে গ্রেফতার করে ফেলেন। গ্রেফতার করে যখন তাকে রহমতে আলম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত করা হল, তখন সেখান থেকে তার ক্ষমার ঘোষণা হয়ে যায়। যার প্রতিক্রিয়া হল এই, তিনি তৎক্ষণাৎ ইসলাম কবুল করে মুসলমানদের দলভূক্ত হয়ে যান। তাই আমরা এখন তাকে "হযরত আবু সুফিয়ান রাযি." বলি।

মক্কা বিজয়ের দিন এক ব্যক্তি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে হুজুরের দরবারে উপস্থিত হল। শান্তির বাহক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন- 'শান্ত হও, আমি কোনো বাদশা নই। আমি একজন সাধারণ মায়ের সন্তান।'

মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পনের দিন মক্কায় অবস্থান করেন। তখন মদিনার আনসারগণ এ চিন্তায় অস্থির ছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝি ওখানে থেকে যাবেন, আর আমরা হয়ে যাবো তার থেকে দূরে। কিন্তু তিনি তাদের মনের এ ধারণা জানতে পেরে বললেন, তোমাদের ধারণা সঠিক নয় (বরং আমার জীবন-মরণ এখন তোমাদের সাথে)। অতঃপর হযরত আত্তাব ইবনে উসাইদ রাযি. কে মক্কার আমির নিযুক্ত করে নিজে মদিনায় ফিরে আসেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হুনাইনের যুদ্ধ

📄 হুনাইনের যুদ্ধ


মক্কা বিজয়ের পর সাধারণভাবে আরবরা ইসলাম কবুল করে। কেননা তাদের অধিকাংশ ছিল সে সব লোক যারা ইসলামের সত্যতার ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও কুরাইশদের প্রতিপত্তির ভয়ে প্রকাশ্যে মুসলমান হওয়া থেকে বিরত ছিল এবং মক্কা বিজয়ের অপেক্ষায় ছিল। মক্কা বিজয়ের পর তারা সকলে দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। অবশিষ্ট আরবদের আর ইসলামের মোকাবেলা করার মতো দুঃসাহস বাকি থাকল না। অবশ্য হাওয়াযিন ও সাকিফ গোত্রদ্বয় নিজস্ব আত্মমর্যাদাবোধের কারণে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হল। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছলে তিনি ১২ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী যুদ্ধের জন্য সমবেত করলেন। যাদের মধ্যে দশ হাজার ছিলেন আনসার ও মুহাজির যারা মক্কা বিজয়ের সময় সঙ্গে ছিলেন। আর দু হাজার সেসব নও মুসলিম যারা মক্কা বিজয়ের সময় মুসলমান হয়েছিলেন।

এটা ছিল ইসলামি বাহিনীর তখনকার সময় পর্যন্ত সর্ববৃহৎ সংখ্যা। অষ্টম হিজরির ৬ শাওয়াল আল্লাহর এ বাহিনী যুদ্ধের জন্য রওনা হয়। তারা যখন হুনাইন উপত্যকার কাছে পৌঁছলেন তখন পাহাড়ের ঘাটিতে লুকিয়ে থাকা শত্রু সেনারা অতর্কিতভাবে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তখনো যেহেতু মুসলিম বাহিনী নিজেদের সৈন্যদের কাতার বিন্যাসও করে নি তাই ইসলামি সৈন্যের অগ্রভাগ প্রথমে কিছুটা পিছু হটতে লাগল। এ পিছু হটার বাহ্যিক কারণ যদিও মুসলিম বাহিনীর কাতার বিন্যাসের অপ্রস্তুতিকে দায়ি করা হয়, কিন্তু তার প্রকৃতকারণ ওটাই যেদিকে পবিত্র কুরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মুসলমানরা তখন তাদের চিরাচরিত অভ্যাসের বিপরীত নিজস্ব সংখ্যাধিক্য ও সাজ-সরঞ্জাম দেখে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। কোনো কোনো সাহাবা এমনকি হযরত সিদ্দিকে আকবার রাযি.-এর মুখ দিয়েও একথা বের হয়েছিল, "আজ আমরা কোনো মতেই পরাজিত হতে পারি না।”

তাই মহান রাব্বুল আলামিন তাদেরকে সতর্ক করার জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন। যেন মুসলমানরা বুঝতে সক্ষম হয়, আমাদের যুদ্ধের হার-জিতটা বাহুবল আর তীর-তলোয়ারের খেলা নয়। বরং তা তো একমাত্র আল্লাহ পাকেরই হাতে। নার্গিসের কি শক্তি আছে বলো, মাতাল করে মোরে আড়ালে তার যে আছে বিরাজ, স্মরি তারই জোরে। বদরের যুদ্ধে নিরস্ত্র অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর মহান বিজয় আর হুনাইনে (ব্যাপক সমরাস্ত্র ও সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও প্রথমে) পরাজয় বরণের রহস্য এটিই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দুটি বর্ম পরিহিত অবস্থায় দুলদুল নামক একটি সাদা খচ্চরের ওপর আরোহী ছিলেন। মুসলিম সেনাদেরকে পিছু হটতে দেখে হুযুরের নির্দেশে হযরত আব্বাস রাযি. এক বীরত্বপূর্ণ আওয়াজ দিতে বলেন। যা শুনে সকলের স্খলিত পা পুনরায় জমে গেল এবং উভয় পক্ষে ঘোরতর লড়াই শুরু হয়ে গেল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px