📄 মুতার যুদ্ধ ও মক্কা বিজয়
অষ্টম হিজরি সনে ইসলামের ইতিহাসে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুতার যুদ্ধ এবং ইসলামের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা মক্কা বিজয়। এছাড়াও এই হিজরি সনেই হুনায়িন যুদ্ধ ও তায়েফ অভিযান সম্পন্ন হয়েছিল।
📄 মুতার যুদ্ধ
সিরিয়ার বালকা শহরের উপকন্ঠে বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে আনুমানিক একশ মাইল দূরত্বে অবস্থিত একটি শহরের নাম মুতা। এখানে মুসলমান ও রোমানদের মাঝে সর্বপ্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কারণ ছিল, রোমসম্রাটের নিযুক্ত বসরার গভর্ণর আমর বিন শুরাহবিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দূত হারেস ইবনে উমায়র রাযি. কে হত্যা করেছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অষ্টম হিজরি মাঝামাঝি সময় হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তিন হাজার মুসলিম সেনা মুতার দিকে পাঠিয়ে দেন। মুসলিম সৈন্যদলের মুতার কাছে পৌঁছার সংবাদ রোমানরা জানতে পেরে দেড় লাখ সেনাবাহিনীর বিরাট দল নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বেড়িয়ে পড়ে। কয়েকদিন যুদ্ধ চলার পর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দেড় লাখ কাফেরদের অন্তরে তিন হাজার মুসলিম সৈন্যের এমন ভয় প্রবেশ করিয়ে দিলেন, অবশেষে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আত্মরক্ষার কোনো পথই তাদের খোলা রইল না। (তালখীসুস সীরাত)
📄 মক্কা বিজয়
হুদায়বিয়ায় যে সন্ধিপত্র লেখা হয়েছিল, মুসলমানরা তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও বিশ্বস্তার সহিত তা যথাযথ পালন করে আসছিল। ইত্যবসরেই হিজরি ৮ম সালে কুরাইশরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বসল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্ধি পত্র নবায়নের জন্য কতিপয় শর্ত যুক্ত করে কুরাইশদের কাছে একজন দূত প্রেরণ করেন। পরিশেষে একথা লিখে দিলেন, এ শর্তাবলী মনযুর করা না হলে হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করা হবে। কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গ করাকেই পছন্দ করল। (যুরকানী : ২/২৬৭)
অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। ৮ম হিজরির ১০ই রমযান সোমবার আসরের পর দশ হাজার সাহাবায়ে কেরামের বিরাট এক বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করেন। কুদাইদ পৌঁছার পর মাগরিবের সময় হয়ে গেলে সকলে সেখানেই ইফতার সেরে নেন। মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছার পর হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদকে সৈন্যের একটি অংশ দিয়ে মক্কার উঁচু দিক দিয়ে প্রবেশের জন্য প্রেরণ করে তাদের বলে দিলেন, কেউ তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করলে তোমরাও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। (সীরাতে মুগলতাঈ)
মক্কার অন্য দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করেন। এক সাধারণ ঘোষণায় তিনি বলে দিলেন, যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ। অবশ্য এমন ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলাকে ক্ষমা করেন নি, যাদের অস্তিত্বই ছিল সকল ফেতনা-ফাসাদের উৎস, কিন্তু এরা সকলেও বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে এদের অধিকাংশই মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় পৌঁছে মুসলমান হয়ে যায়। ২০শে রমযান জুমার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়তুল্লাহ তওয়াফ করেন। তখনো বায়তুল্লাহর আশেপাশে ৩৬০টি মূর্তি রাখা ছিল। হুযুরের হাতে ছিল একটি লাঠি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো মূর্তির নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় সে লাঠি দ্বারা ইশারা করতেই মূর্তিটি মুখ থুবড়ে পড়ে যেত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন নিম্নের আয়াতটি পড়ছিলেন:
جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْবিطل كَانَ زَهُوقًا
"সত্য এসেছে, বাতিল ধ্বংস হয়েছে, নিশ্চয় বাতিল ধ্বংসশীল।"
📄 কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের আচরণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফ সেরে কাবার চাবিরক্ষক উসমান বিন তালহা শাইবার কাছ থেকে বাইতুল্লাহর চাবি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। অতঃপর সেখান থেকে বের হয়ে মাকামে ইবরাহীমে নামায আদায় করলেন। নামায শেষে তিনি মসজিদেই অবস্থান করছিলেন। আজ তিনি কুরাইশদের সম্পর্কে কী নির্দেশ জারি করেন লোকজন গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে তারই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সকল সন্দেহও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব শান্তির দূত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদের সম্বোধন করে বললেন, তোমরা আজ সর্ব বিষয়ে নিরাপদ। অতঃপর কাবার চাবিও তাদের নিকট দিয়ে দিলেন। (তালখীসুস সীরাত)