📄 ইসলামে জিহাদের বিধান ও অনুমোদন
এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দীর্ঘ ৫৩ বছর জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পাঠকবৃন্দের সম্মুখে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে কিছুটা বিস্তারিতভাবে এটিও জানা গেছে, পৃথিবীতে ইসলামের প্রচার প্রসার কীভাবে হয়েছিল এবং প্রতিটি স্তরের ও প্রতিটি গোত্রের যে হাজারো মানুষ হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামের গণ্ডির মধ্যে এসে এমনই আসক্ত হয়েছিল, ইসলাম ও ইসলামের পয়গাম্বরকে নিজের অর্থ সম্পত্তি বাপ-দাদা, স্ত্রী-পুত্র এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয় মনে করত। তাদের ইসলাম গ্রহণের কী কারণ ছিল? প্রশাসনের চাপ ও বাধ্যবাধকতা অথবা অর্থের লোভ ও মর্যাদার আশা না কোনো প্রভাবশালী সংগঠন যার তলোয়ার তাদেরকে বাধ্য করেছিল? না অন্য কিছু? কিন্তু যখন এ উম্মী নবীর পবিত্র অবস্থাদির উপর দৃষ্টিপাত করা হবে তখন নিঃসন্দেহে এ সবের উত্তর হবে নেতিবাচক।
স্পষ্টতই যে এতিমের পিতৃছায়া দুনিয়াতে আসার আগেই তার মাথার ওপর থেকে উঠে গিয়েছিল এবং যার শৈশবে ছয় বছর বয়সের সময় মায়ের স্নেহকোলের অবসান হয়েছিল, যার ঘরে মাসের পর মাস আগুন পর্যন্ত জ্বালানোর সুযোগ হয়নি, যার পরিবারের লোকেরা পেট ভরে রুটি খায় নি, যার জীবিত আত্মীয়-স্বজনও এক সত্যবাণী উচ্চারণ করার কারণে শুধু তার থেকে পৃথক নয় বরং ঘোর শত্রু হয়ে গিয়েছিল, তিনি কি কারো ওপর কর্তৃত্ব চালাতে পারতেন কিংবা অর্থের লোভে, তলোয়ারের জোরে কাউকে নিজের সমমনা বানাতে পারতেন? এ ছাড়া যারা বলে থাকে ইসলাম তলোয়ারের জোরে প্রসার লাভ করেছে তারা কি এর কোনো জবাব দিতে পারে, ঐ সব তলোয়ার চালনাকারীদের উপর কারা তলোয়ার চালিয়েছে? যারা শুধু মুসলমান হয় নি বরং ইসলামকে সতেজ রাখার জন্য তলোয়ার ধারণ করে স্বীয় জীবন উৎসর্গ করার ঝুঁকি নিতে পর্যন্ত সদা প্রস্তুত ছিল?
📄 সারিয়ায়ে হামযা ও সারিয়ায়ে উবায়দা রাযি.
হিজরতের সাত মাস পর পবিত্র রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হামযা রাযি. কে ৩০ সদস্যের মুহাজির দলের আমীর মনোনীত করে একটি সাদা ঝান্ডাসহ কুরাইশদের এক কাফেলা অভিমুখে পাঠালেন। কিন্তু তারা যখন সমুদ্র উপকূলে পৌঁছে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হলেন তখন মাজদী বিন আমর জাহমী তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে যুদ্ধ বন্ধ করে দিলেন।
অতঃপর প্রথম হিজরির শাওয়াল মাসে হযরত উবাইদা ইবনুল হারিসকে ৩০ সদস্যের আমীর বানিয়ে "বাতনে রাবেগ" এর দিকে আবু সুফিয়ানের মোকাবেলা করার জন্যে পাঠানো হয়। এ জিহাদেই সর্বপ্রথম সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযি. কাফিরদের ওপর তীর নিক্ষেপ করেন। আর এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম তীর যা মুসলমানদের পক্ষ হতে কাফেরদের উপর নিক্ষেপ করা হয়।
📄 কোরআনের নির্দেশনা ও আত্মরক্ষামূলক জিহাদ
ইতিহাসগ্রন্থ সামনেই রয়েছে। এতে কোনো প্রকার মতপার্থক্য ব্যতীত বর্ণিত রয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের তিপ্পান্ন বছর এভাবে কেটেছে, প্রাথমিক নিঃসম্বলতা ও অসহায়ত্বের পর যখন ইসলাম এক ধরণের বাহ্যিক শক্তি লাভও করেছে এবং বড় বড় বীর সাহসী ও ধনী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তখনও ইসলাম কোনো কাফিরের উপর হাত উঠায় নি বরং জালিমদের জুলুমের জবাব পর্যন্ত দেয় নি। অথচ মক্কার কাফিরদের পক্ষ থেকে শুধু মাত্র মহানবী-এর পবিত্র সত্তায় নয় বরং তার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, আত্মীয়-স্বজন ও অনুসারীদের উপর এমন নির্যাতন চালিয়েছিল যা বর্ণনার অতীত। কুরাইশ কাফিররা, যারা সব ধরণের শক্তি ও প্রভাব রাখত তারা তাঁকে কষ্ট দিতে বরং হত্যা করতে কোনো সম্ভাব্য উপায় হাতছাড়া করে নি। যেমন তিন বছর যাবত তাঁর আত্মীয়-স্বজনসহ অবরুদ্ধ থাকা, তাঁর সাথে সকল কুরাইশদের একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন করা, তাঁকে হত্যার চক্রান্ত, সাহাবায়ে কেরামকে সব রকমের কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি যা সবই আপনারা অবগত রয়েছেন।
নির্যাতনের যত ধরণ ছিল সবই মুসলমানদের উপর চলেছিল, কিন্তু কুরআন তার অনুসারীদের ধৈর্য, সংযম ও সহনশীল হওয়ার পরামর্শ ছাড়া যুদ্ধ করার অনুমতি দেয় নি। এ সময় যে জিহাদের নির্দেশ ছিল তা হলো কাফিরদের উপদেশমূলক কথা বলে নিজ প্রতিপালকের দিকে দাওয়াত দাও। যদি মুখোমুখি কথাবার্তার সুযোগ আসে তবে সুন্দরভাবে নম্র ভদ্র কথা বলে তাদের প্রতিহত কর এবং কুরআনের স্পষ্ট দলিল প্রমাণের মাধ্যমে মৌন জিহাদ কর যেন তারা সত্যকে বুঝতে পারে। ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلُهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ এর মর্মার্থ এটাই।
📄 ইসলামে জিহাদের বাস্তবতা
জিহাদ ফরয হওয়ার উদ্দেশ্য এ নয়, মানুষের ঘাড়ে তলোয়ার রেখে বলা হবে, মুসলমান হয়ে যাও বা অন্য কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে তাদেরকে ইসলামে প্রবেশ করানো হবে বরং জিহাদের সাথে জিযিয়ার (যা কাফিরদের নিরাপত্তার জন্য তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়) হুকুম এবং কাফিরদেরকে যিম্মী সাব্যস্ত করে তাদের জান-মালের হেফাযত পুরোপুরি মুসলমানদেরই মতো করা সম্পর্কে ইসলামি বিধান স্বয়ং এ প্রমাণ বহন করে, জিহাদ ফরয হওয়ার পরও ইসলাম কোনো কাফিরকে ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারে কস্মিনকালেও বাধ্যতা আরোপ করে নি। তাই একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য হল-স্থির চিত্তে এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করা, ইসলামে কোনো উদ্দেশ্যে ও কী কী উপকারিতার কারণে জিহাদ ফরয করা হয়েছে। তখন তাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, যেমনিভাবে সে ধর্ম পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না যা মানুষকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে জোর করে স্বীয় অনুসারী বানায়, তেমনিভাবে সে ধর্মও পূর্ণাঙ্গ নয় যাতে রাজনীতি নেই এবং সে রাজনীতিও পূর্ণাঙ্গ নয় যার সাথে তরবারী থাকে না। রাজনীতিবিহীন ধর্ম পূর্ণাঙ্গ নয় আবার তলোয়ার বা শাসনবিহীন রাজনীতি পরিপূর্ণ নয়। সে চিকিৎসক নিজের পেশায় দক্ষ নয় যে শুধু পট্টি বাঁধতে ও ব্যান্ডেজ লাগাতে জানে, কিন্তু পঁচে যাওয়া ও নষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অস্ত্রোপচার করতে জানে না।