📄 পৃথিবীতে ইসলাম প্রচার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর প্রথম যখন ওহি নাযিল হয়, তখন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদিষ্ট ছিলেন না। বরং তাতে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিধি-বিধানই ছিল। অতঃপর কিছু দিন অহি আগমন বন্ধ থাকারপর যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে পুনরায় তাঁর প্রতি ওহি অবতীর্ণ হতে আরম্ভ করল, তখন তাঁকে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেয়া হল। কিন্ত তখন বিশ্বময় ছিল ধর্মহীনতা ও পথ ভ্রষ্টতার জয় জয়কার। বিশেষ করে বাপ দাদার অন্ধঅনুকরণ আরবের লোকদেরকে সত্যের বাণী কানে নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না কোনোক্রমেই। এ কারণে আল্লাহ পাকের হেকমতের দাবি এটাই ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ দেওয়া যাবে না। অন্যথায় শুরুতে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও বিশ্বাসভাজন লোকদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। এ প্রক্রিয়ায় দাওয়াতের কাজ শুরু করলে সর্বপ্রথম তাঁর নিজের স্ত্রী খাদিজা, হযরত আবু বকর রাযি. চাচাতো ভাই আলি এবং পালকপুত্র যায়েদ রাযি. ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
হযরত আবু বকর রাযি. নবুয়তের পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বন্ধু ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সততা ও আখলাক চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে নিজের নবুয়ত প্রাপ্তির খবর জানালেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বীকার করে নেন এবং কালিমা শাহাদাৎ পাঠ করে মুসলমান হয়ে যান। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. তাঁর সমাজে সর্বজনস্বীকৃত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। যে কোনো ব্যাপারে মানুষ তাঁর উপর আস্থা রাখত। ইসলাম গ্রহণের পর তিনিও সে সকল লোককে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, যাদের মধ্যে কিছুটা সততা ও কল্যাণ আছে বলে মনে করতেন। হযরত উসমান, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, যুবায়ের ইবনে আওয়াম ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রাযি. তাঁর দাওয়াত কবুল করেন এবং তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে নিয়ে যান। তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, উবাইদা ইবনে হারিস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব, সাঈদ ইবনে যায়েদ আদাবী, আবু সালামা মাখযুমী, খালেদ ইবনে সাঈদ ইবনে আস, উসমান ইবনে মাযউন ও তাঁর দু ভাই, কুদামা ও উবাইদুল্লাহ ও আরকাম ইবনে আরকাম রাযি. ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা সকলেই ছিলেন কুরাইশ গোত্রীয়। কুরাইশদের বাইরে সুহাইব রুমী, আম্মার ইবনে ইয়াসির, আবু যর গিফারী ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ইসলাম গ্রহণ করেন। এ দাওয়াতী কার্যক্রম গোপনে গোপনে চলছিল। ইবাদত এবং ইসলামি অনুষ্ঠানাদিও লুকিয়ে লুকিয়ে আদায় করা হত। এমনকি ছেলে পিতা থেকে পিতা ছেলে থেকে লুকিয়ে নামায আদায় করত। মুসলমানের সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য বড় একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। এখানে তারা সকলে একত্র হতেন এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তালিম দিতেন। এ পদ্ধতিতে তিন বছর পর্যন্ত দাওয়াতের কাজ চলে। এ তিন বছরে কুরাইশদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইসলাম কবুল করেন। পরে আস্তে আস্তে অন্যরাও ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। অবশেষে মক্কাবাসীদের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসাধারণের মাঝে এর আলোচনা শুরু হতে থাকে। এরপর প্রকাশ্যে ইসলামের কাজ করার সময় এসে যায়।
📄 প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত
৩ বছর পর যখন বিপুল সংখ্যক পুরুষ ও নারী ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং মানুষের মধ্যে ইসলাম নিয়ে আলোচনা হতে লাগল, তখন আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে মানুষের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছানোর হুকুম করলেন। হুকুম পেয়ে রাসুলুল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করতে শুরু করলেন। মক্কার সাফা পর্বতে উঠে কুরাইশ গোত্র সমূহকে নাম ধরে আহবান করতে লাগলেন। সকলে সমবেত হলে তিনি প্রথমে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি যদি তোমাদেরকে এই সংবাদ দিই, গোনায়ম গোত্রের শত্রুবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ছুটে আসছে এবং এক্ষুণি তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাহলে তোমরা আমার এই কথা বিশ্বাস করবে? একথা শুনে সকলেই সমস্বরে বলে উঠল, অবশ্যই আপনার এই খবরকে আমরা সম্পূর্ণ সত্য ও বাস্তব মনে করব। কারণ এ পর্যন্ত কখনো আমরা আপনাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি। এবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি তোমাদের খবর দিচ্ছি, তোমরা যদি মিথ্যা ধ্যান-ধারণা আর বাতিল আকিদা-বিশ্বাস ত্যাগ না কর, তাহলে আল্লাহ তাআলার কঠিন শাস্তি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। অতঃপর তিনি বললেন, আমি যতদূর জানি, দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত কেউ আমার এই উপহার অপেক্ষা উত্তম উপহার নিয়ে আসেনি, যা আমি তোমাদের সামনে পেশ করেছি। তোমাদের জন্য আমি দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ বহন করে এনেছি। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে এর প্রতি আহবান করতে আদেশ করেছেন। আল্লাহর কসম! আমি যদি দুনিয়ার অপরাপর মানুষের সাথে মিথ্যা বলতাম, তবুও তোমাদের সামনে মিথ্যা বলতাম না। দুনিয়ার সকল মানুষকে ধোঁকা দিলেও তোমাদেরকে ধোঁকা দিতাম না। কসম সেই পবিত্র সত্ত্বার, যিনি এক, যার কোনো শরিক নেই, আমি তোমাদের প্রতি বিশেষভাবে এবং সারা বিশ্ববাসীর প্রতি সাধারণভাবে আল্লাহর রাসূল ও সংবাদ বাহক হয়ে আগমন করেছি।
📄 সমগ্র আরবের বিরোধিতা ও শত্রুতার মুখে নবীজির দৃঢ়তা
এই দীনি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ এভাবেই চলছিল। আরববাসীরা যখন জানতে পারল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে ওহির মাধ্যমে তাদের মূর্তির স্বরূপ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এবং মূর্তি-পূজারীদের মূর্খতার মুখোশ উন্মোচন করে দেওয়া হয়েছে, তখনই তারা তাঁর বিরোধিতার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। তাদের একটি দল চাচা আবু তালিবের নিকট এসে বলল, তিনি যেন মুহাম্মদ-কে এ ধরণের কথা-বার্তা থেকে বিরত রাখেন। নতুবা তিনি যেন তাঁর প্রতি স্বীয় সমর্থন উঠিয়ে নেন। আবু তালিব এক সুন্দর পন্থায় তাদের প্রস্তাবের উত্তর দিয়ে বিদায় দিলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বের ন্যায় সত্যধর্মের প্রচার ও প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন এবং মূর্তিপূজা থেকে মানুষকে বাধা দিতে থাকলেন। আরবরা এটা মেনে নিতে পারল না। তাই তারা পুনরায় আবু তালিবের নিকট এসে কঠোরভাবে এই দাবি উত্থাপন করল, হয়তো আপনি স্বীয় ভাতিজাকে তাঁর কাজ থেকে বিরত রাখুন নতুবা আমরা সকলে আপনার বিরুদ্ধে, একপক্ষ নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকব।
📄 সম্মিলিত আরবের মোকাবেলায় মহানবীর জবাব
কাফেরদের কথা শুনে আবু তালিব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাই এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে আলোচনায় বসলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন— হে আমার সম্মানিত চাচা, আল্লাহর শপথ! যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয় এবং তাঁর বিনিময়ে তারা এটা চায়, আমি আল্লাহর বাণী তাঁরই সৃষ্টিজীবকে পৌঁছানো থেকে বিরত থাকি, তাহলেও আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত নই। আমার এ দাওয়াতের ফলে হয়তো আল্লাহর সত্যধর্মের প্রচার-প্রসার ঘটাবে; আর না হয় আমি এ কাজ করতে করতে আমার জীবন বিসর্জন দিয়ে দিব।