📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাহারাদারগণ
(১) হযরত সাদ ইবনে মুআয রাযি.। তিনি বদর যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাহারা দিয়েছিলেন। (২) যাকওয়ান ইবনে আবদে কায়েস রাযি. (৩) মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা আনসারী রাযি.। এ দুজন ওহুদ যুদ্ধে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাহারা দিয়েছিলেন (৪) যুবায়র রাযি. খন্দকের যুদ্ধে (৫) আসাদ ইবনে বশীর রাযি. (৬) সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রাযি. (৭) আবু আইয়ুব আনসারী রাযি. এবং (৮) বেলাল রাযি. ওয়াদিউল কুরায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাহারা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এ আয়াত নাযিল হলে এ পাহারাদারীর ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়: وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ (আল্লাহই আপনাকে লোকদের থেকে রক্ষা করবেন।)
📄 কাবা নির্মাণ এবং আলআমিন স্বীকৃতি দান
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ, তখন কুরাইশরা কাবাগৃহ পুনঃর্নিমাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আল্লাহর ঘর নির্মাণ করাকে তারা প্রত্যেকেই নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করত। কুরাইশ গোত্রসমূহ বায়তুল্লাহ নির্মাণে কে কতটুকু অংশ নিতে পারে, তাঁর উপর নিজেদের ভাগ্যের ফায়সালা করে রেখেছিল। এক সময় বিবাদ এড়ানোর জন্য এই নির্মাণকার্য গোত্রগুলোর মাঝে বন্টন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এ কর্ম-বন্টন পদ্ধতিতে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছাড়া কাবা নির্মাণের বাদ-বাকি কাজ সম্পন্ন হল। কিন্তু নির্মাণের এ পর্যায়ে এসে হাজারে আসওয়াদ উঠিয়ে এর নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করার ব্যাপারে গোত্রগুলোর মাঝে চরম মতানৈক্য দেখা দিল। প্রত্যেক গোত্র এমনকি প্রত্যেক ব্যক্তির প্রাণের দাবি হাজরে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপনের সুযোগ তাকে দিতে হবে। এ নিয়ে বিবাদ এতদূর গড়ালো, প্রত্যেকেই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ ও অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে লাগল। এবার সমাজের কয়েকজন বিচক্ষণ ও চিন্তাশীল ব্যক্তি পরামর্শের মাধ্যমে কোনো মীমাংসায় পৌঁছা যায় কি না তা ভাবতে লাগলেন। কাবাগৃহেই তাঁরা বৈঠকে মিলিত হলেন।
পরামর্শে সিদ্ধান্ত হল, আগামী কাল ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম বায়তুল্লায় প্রবেশ করবেন তিনি এ ব্যাপারে মীমাংসা করবেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে কুদরতী ফায়সালা মনে করে সকলেই মেনে নেবেন। আল্লাহর কি মহিমা! পরদিন সকালে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা ঘরে প্রবেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে সকলেই এক বাক্যে বলে উঠল, এই তো আল-আমিন এসে গেছেন। আমরা তাঁর মীমাংসা মেনে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নবীজি এগিয়ে আসলেন এবং অত্যন্ত বিজ্ঞোচিত মীমাংসা দিলেন, যা এক বাক্যে সকলেই মেনে নিলেন। তিনি প্রথমে একটি চাদর বিছালেন। চাদরে পাথরটি রেখে প্রত্যেক গোত্রের একজন করে প্রতিনিধিকে তাঁর এক এক কোণ ধরতে বললেন। এভাবে পাথরটি ভিত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল। এবার নবীজি নিজ হাতে তুলে পাথরটি যথাস্থানে স্থাপন করে দিলেন। এ ঘটনাটি উদ্ধৃত করে ইবনে হিশাম লিখেছেন— নবুয়ত প্রাপ্তির আগে সমগ্র কুরাইশ এক বাক্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল-আমীন বা বিশ্বস্ত বলে সম্বোধন করত।
📄 নবুয়ত লাভ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স যখন ৪০ বছর একদিন পূর্ণ হল, ঠিক সে দিন প্রকাশ্যে নিয়মতান্ত্রিক ভাবে তাঁকে নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। কেন না বাতেনীভাবে তো হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমস্ত আম্বিয়াদের পূর্বে নবুয়ত প্রদান করা হয়েছে। যে তারিখে নবীজি জন্মলাভ করেন ঠিক সে তারিখে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। অর্থাৎ ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার। এ ছাড়া ভিন্নমতও পাওয়া যায়।
📄 পৃথিবীতে ইসলাম প্রচার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর প্রথম যখন ওহি নাযিল হয়, তখন তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদিষ্ট ছিলেন না। বরং তাতে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিধি-বিধানই ছিল। অতঃপর কিছু দিন অহি আগমন বন্ধ থাকারপর যখন দ্বিতীয় পর্যায়ে পুনরায় তাঁর প্রতি ওহি অবতীর্ণ হতে আরম্ভ করল, তখন তাঁকে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেয়া হল। কিন্ত তখন বিশ্বময় ছিল ধর্মহীনতা ও পথ ভ্রষ্টতার জয় জয়কার। বিশেষ করে বাপ দাদার অন্ধঅনুকরণ আরবের লোকদেরকে সত্যের বাণী কানে নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না কোনোক্রমেই। এ কারণে আল্লাহ পাকের হেকমতের দাবি এটাই ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ দেওয়া যাবে না। অন্যথায় শুরুতে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। ফলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও বিশ্বাসভাজন লোকদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। এ প্রক্রিয়ায় দাওয়াতের কাজ শুরু করলে সর্বপ্রথম তাঁর নিজের স্ত্রী খাদিজা, হযরত আবু বকর রাযি. চাচাতো ভাই আলি এবং পালকপুত্র যায়েদ রাযি. ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
হযরত আবু বকর রাযি. নবুয়তের পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বন্ধু ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সততা ও আখলাক চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁকে নিজের নবুয়ত প্রাপ্তির খবর জানালেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বীকার করে নেন এবং কালিমা শাহাদাৎ পাঠ করে মুসলমান হয়ে যান। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযি. তাঁর সমাজে সর্বজনস্বীকৃত সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। যে কোনো ব্যাপারে মানুষ তাঁর উপর আস্থা রাখত। ইসলাম গ্রহণের পর তিনিও সে সকল লোককে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, যাদের মধ্যে কিছুটা সততা ও কল্যাণ আছে বলে মনে করতেন। হযরত উসমান, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, যুবায়ের ইবনে আওয়াম ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রাযি. তাঁর দাওয়াত কবুল করেন এবং তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে নিয়ে যান। তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, উবাইদা ইবনে হারিস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব, সাঈদ ইবনে যায়েদ আদাবী, আবু সালামা মাখযুমী, খালেদ ইবনে সাঈদ ইবনে আস, উসমান ইবনে মাযউন ও তাঁর দু ভাই, কুদামা ও উবাইদুল্লাহ ও আরকাম ইবনে আরকাম রাযি. ইসলাম গ্রহণ করেন। এরা সকলেই ছিলেন কুরাইশ গোত্রীয়। কুরাইশদের বাইরে সুহাইব রুমী, আম্মার ইবনে ইয়াসির, আবু যর গিফারী ও আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. ইসলাম গ্রহণ করেন। এ দাওয়াতী কার্যক্রম গোপনে গোপনে চলছিল। ইবাদত এবং ইসলামি অনুষ্ঠানাদিও লুকিয়ে লুকিয়ে আদায় করা হত। এমনকি ছেলে পিতা থেকে পিতা ছেলে থেকে লুকিয়ে নামায আদায় করত। মুসলমানের সংখ্যা ত্রিশ ছাড়িয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য বড় একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেন। এখানে তারা সকলে একত্র হতেন এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের তালিম দিতেন। এ পদ্ধতিতে তিন বছর পর্যন্ত দাওয়াতের কাজ চলে। এ তিন বছরে কুরাইশদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক ইসলাম কবুল করেন। পরে আস্তে আস্তে অন্যরাও ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। অবশেষে মক্কাবাসীদের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং জনসাধারণের মাঝে এর আলোচনা শুরু হতে থাকে। এরপর প্রকাশ্যে ইসলামের কাজ করার সময় এসে যায়।