📄 হযরত খাদিজা রাযি.-এর সঙ্গে নবীজির বিবাহ
হযরত খাদিজা রাযি. একজন বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যক্তিত্ব ও বিস্ময়কর চরিত্র দেখে তাঁর প্রতি খাদিজা রাযি.-এর অন্তরে পরম ভক্তি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে গেল। ফলে খাদিজা রাযি. নিজেই ইচ্ছা করলেন, নবীজি রাজি হলে তাঁর সঙ্গে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স যখন পঁচিশ বছর তখন খাদিজার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের সময় খাদিজা রাযি.-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। কোনো কোনো বর্ণনা মতে পঁয়তাল্লিশ বছর। এই বিবাহের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স সম্পর্কে আরও বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বিবাহে আবু তালিব ও বনু হাশিম এবং মুযার গোত্রের সমস্ত নেতৃবর্গ সমবেত হন। আবু তালেব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন। খুতবায় আবু তালেব নবীজি সম্পর্কে যেসব শব্দ ব্যবহার করেন তা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যার অর্থ নিম্নরূপ:
"ইনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। ধন-সম্পদে গরিব হলেও উন্নত চরিত্র ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে যার সঙ্গেই তুলনা করা হবে, তাঁর থেকেই তিনি উন্নত বলে প্রমাণিত হবেন। কারণ, সম্পদ বিলীয়মান ছায়া মাত্র; যা আজ আছে তো কাল নেই। আপনাদের সর্বজন পরিচিত মুহাম্মদ, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বিবাহ করতে যাচ্ছেন। তাঁর নগদ বাকি সব মহর পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আল্লাহর শপথ! এরপর ইনি বিপুল সম্মানের অধিকারী হবেন।"
নবীজি সম্পর্কে আবু তালেবের এই মন্তব্য সে সময়কার, যখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ বছর। বাহ্যত তখনও তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হননি। তা ছাড়া মজার বিষয় হল, আবু তালেব তখন সেই প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাসের অনুসারী যা বিলুপ্ত করার জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব, যার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবন কুরবান। কিন্তু বাস্তবতা এই, সত্য কখনো গোপন করা যায় না। খাদিজার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ সম্পন্ন হবার পর খাদিজা রাযি. ২৪ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেবা করার সুযোগ পান। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে কিছুকাল, আর পরে কিছুকাল।
📄 নবীজির সন্তান
খাদিজার গর্ভে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ২ জন পুত্রসন্তান ও ৪ জন কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র ২ জন হলেন কাসেম ও তাহের রাযি.। তাহের সম্পর্কে বলা হয়, তাঁর নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তাঁর আসল নাম আব্দুল্লাহ ছিল এবং তাইয়িব ও তাহির— এ দুটি তাঁর উপনাম ছিল।
কন্যা চারজন হলেন— ফাতেমা, যায়নব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম। মেয়েদের মধ্যে যায়নব ছিলেন সবার বড়। উল্লিখিত সব কজনই ছিলেন খাদিজা রাযি.-এর গর্ভের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয় পুত্র যার নাম ইবরাহীম, তিনি ছিলেন ক্রীতদাসী মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৩ পুত্র শৈশবেই মারা যান। তবে কাসেম সম্পর্কে বর্ণনা আছে, তিনি এতটুকু বড় হয়েছিলেন, সাওয়ারীতে আরোহণ করতে পারতেন। কাসেমের নামেই নবীজি আবুল কাসেম উপনামে প্রসিদ্ধ।
📄 চার কন্যা
উম্মতের সর্বসম্মত মত অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৪ কন্যার মধ্যে ফাতেমা ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ফাতেমা জান্নাতী নারীদের নেত্রী হবে। পনের বছর পাঁচ মাস পনের দিন বয়সে হযরত আলি রাযি.-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহে মহর ছিল ৪৮০ দিরহাম। যা প্রায় ১৫০ তোলা রূপার সমান। রমণীকূল শিরোমনি ফাতেমার বিবাহের উপঢৌকন ছিল একটি চাদর, একটি বালিশ, যাতে খেজুর গাছের ছাল ভরা ছিল, একটি চামড়ার গদি, একটি দড়ির চৌকি, চামড়ার তৈরি একটি পানির পাত্র, দুটি মাটির কলস, দুটি মশক এবং একটি আটার পাত্র।
চাক্কীতে আটা পেষণসহ ঘরের যাবতীয় কাজ ফাতেমা রাযি. নিজ হাতেই করতেন। এ হলো উভয় জগতের সরদার নবীজির সবচেয়ে আদরের কন্যার বিবাহ এবং তাঁর উপঢৌকন আর মহর। এই হলো তাঁর দারিদ্রপীড়িত জীবনের বাস্তব চিত্র। এরপরও কি সেসব মহিলার চোখে এতটুকু লজ্জাও আসে না, যারা বিবাহ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় নিজেদের দীন-ধর্ম সব কিছুই খোয়াচ্ছেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুত্র সন্তানদের কেউই জীবিত না থাকার পেছনে আল্লাহ পাকের বিশেষ হেকমত নিহিত আছে। কেবল কন্যা সন্তানদের দ্বারা দুনিয়াতে তাঁর বংশধারা টিকে আছে। আবার মেয়েদের মধ্যেও হযরত ফাতেমা রাযি.-এর সন্তানরাই বেঁচে ছিলেন। অন্যান্য মেয়েদের কারো সন্তানই হয়নি। আবার কারো সন্তান জন্মাবার পর শৈশবেই মারা যায়।
হযরত যায়নব রাযি.-এর বিবাহ হয় আবুল আস ইবনে রবী রাযি.-এর সঙ্গে। তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে অল্প বয়সেই মারা যায়। একটি কন্যা সন্তানও জন্মলাভ করে। তাঁর নাম ছিল উমামা। হযরত ফাতেমা রাযি.-এর ইনতেকালের পর হযরত আলি রাযি. যায়নব রাযি.-এর কন্যা উমামাকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর গর্ভে হযরত আলি রাযি.-এর কোনো সন্তান জন্মলাভ করেনি।
রুকাইয়া রাযি.-কে বিবাহ করেন হযরত উসমান রাযি.। হাবশা হিজরতের সময় তিনি স্বামী উসমান রাযি.-এর সঙ্গে ছিলেন। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় নিঃসন্তান অবস্থায়ই তিনি ইনতেকাল করেন। এরপর তৃতীয় হিজরীতে তাঁর অপর এক বোন উম্মে কুলসুমকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসমান রাযি.-এর সঙ্গে বিবাহ দেন। আর এ কারণেই হযরত উসমান রাযি. যুননূরাইন উপাধিতে ভূষিত হন। নবম হিজরিতে তিনিও ইহজগত ত্যাগ করেন। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমার যদি আরো কোনো মেয়ে থাকত তাহলে তাকেও উসমানের সঙ্গে বিবাহ দিতাম।
📄 নারী সমাজের জন্য স্মরণীয় বিষয়
সীরাতের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে আছে, একদা হযরত রুকাইয়া রাযি. হযরত উসমান রাযি.-এর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নালিশ করতে আসেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, "স্ত্রী স্বামীর নামে অভিযোগ করবে, এটা আমি পছন্দ করি না। ওঠ, ঘরে যাও।" এ-ই হলো মেয়েদের জন্য শিক্ষা, যা তাদের দুনিয়া ও আখিরাত দু-ই ঠিক করে দিতে পারে।