📄 দ্বিতীয়বার সিরিয়া সফর
সে সময় মক্কায় খাদিজা নামের এক বিত্তবান মহিলা বাস করতেন। অগাধ সম্পদের সাথে সাথে তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা এবং অভিজ্ঞতার অধিকারিণীও ছিলেন। বিচক্ষণ ও বিশ্বস্ত গরীব লোকদের দেখে তিনি ব্যবসার পণ্য দিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করতেন এবং লাভের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তাদেরকে প্রদান করতেন। নবীজি তখনও নবুয়ত প্রাপ্ত হননি ঠিক, কিন্তু সমগ্র মক্কাবাসীর কাছে তার সততা ও বিশ্বস্ততার যথেষ্ট সুনাম ছিল। প্রত্যেকের কাছেই তিনি আস্থাভাজন ছিলেন। সকলের কাছে তিনি আল-আমীন তথা বিশ্বস্ত উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই সুনাম সুখ্যাতি খাদিজার কাছেও গোপন ছিল না। তাই তিনি তার ব্যবসার কাজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে সোপর্দ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিয়ানতদারী দ্বারা উপকৃত হওয়ার মনস্থ করলেন।
তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রস্তাব পাঠালেন, আপনি যদি আমার ব্যবসার পণ্য নিয়ে সিরিয়া যেতে রাজি হন তাহলে আপনার খেদমতের জন্য সঙ্গে আমার একটি গোলাম দেব এবং অন্যদের তুলনায় আপনাকে লাভের অংশ বেশী দেব। যেহেতু নবীজি অত্যন্ত সাহসী ও উদার মনের অধিকারী ছিলেন, তাই প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদূর সিরিয়া সফরের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং খাদিজার গোলাম মাইসারাকে সঙ্গে নিয়ে ১৬ই জিলহজ সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সিরিয়া গিয়ে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অধিক লাভে পণ্য বিক্রি করে সেখান থেকে অন্য মাল ক্রয় করে ফিরে আসেন। মক্কা এসে সিরিয়া থেকে আনা পণ্যগুলো খাদিজার হাতে সোপর্দ করেন। সেই পণ্য বিক্রি করে খাদিজা প্রায় দ্বিগুণ লাভ করেন।
সিরিয়ার পথে একস্থানে নবীজি অবস্থান করছিলেন। সেখানে নাসতুরা নামক এক ইহুদি পণ্ডিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে বর্ণিত আখেরী নবীর লক্ষণসমূহ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনে ফেলেন। ইহুদি পণ্ডিত মাইসারাকে আগে থেকেই জানতেন। তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গের এই লোকটি কে? মাইসারা বলল, ইনি মক্কার কুরাইশ গোত্রের এক ভদ্র যুবক। ইহুদী পণ্ডিত বললেন, ভবিষ্যতে ইনি নবী হবেন।
📄 হযরত খাদিজা রাযি.-এর সঙ্গে নবীজির বিবাহ
হযরত খাদিজা রাযি. একজন বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যক্তিত্ব ও বিস্ময়কর চরিত্র দেখে তাঁর প্রতি খাদিজা রাযি.-এর অন্তরে পরম ভক্তি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে গেল। ফলে খাদিজা রাযি. নিজেই ইচ্ছা করলেন, নবীজি রাজি হলে তাঁর সঙ্গে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স যখন পঁচিশ বছর তখন খাদিজার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহের সময় খাদিজা রাযি.-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। কোনো কোনো বর্ণনা মতে পঁয়তাল্লিশ বছর। এই বিবাহের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স সম্পর্কে আরও বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ বিবাহে আবু তালিব ও বনু হাশিম এবং মুযার গোত্রের সমস্ত নেতৃবর্গ সমবেত হন। আবু তালেব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন। খুতবায় আবু তালেব নবীজি সম্পর্কে যেসব শব্দ ব্যবহার করেন তা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। যার অর্থ নিম্নরূপ:
"ইনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ। ধন-সম্পদে গরিব হলেও উন্নত চরিত্র ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে যার সঙ্গেই তুলনা করা হবে, তাঁর থেকেই তিনি উন্নত বলে প্রমাণিত হবেন। কারণ, সম্পদ বিলীয়মান ছায়া মাত্র; যা আজ আছে তো কাল নেই। আপনাদের সর্বজন পরিচিত মুহাম্মদ, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বিবাহ করতে যাচ্ছেন। তাঁর নগদ বাকি সব মহর পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আল্লাহর শপথ! এরপর ইনি বিপুল সম্মানের অধিকারী হবেন।"
নবীজি সম্পর্কে আবু তালেবের এই মন্তব্য সে সময়কার, যখন তাঁর বয়স মাত্র পঁচিশ বছর। বাহ্যত তখনও তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হননি। তা ছাড়া মজার বিষয় হল, আবু তালেব তখন সেই প্রাচীন ধর্ম বিশ্বাসের অনুসারী যা বিলুপ্ত করার জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আবির্ভাব, যার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবন কুরবান। কিন্তু বাস্তবতা এই, সত্য কখনো গোপন করা যায় না। খাদিজার সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ সম্পন্ন হবার পর খাদিজা রাযি. ২৪ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেবা করার সুযোগ পান। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে কিছুকাল, আর পরে কিছুকাল।
📄 নবীজির সন্তান
খাদিজার গর্ভে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ২ জন পুত্রসন্তান ও ৪ জন কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র ২ জন হলেন কাসেম ও তাহের রাযি.। তাহের সম্পর্কে বলা হয়, তাঁর নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তাঁর আসল নাম আব্দুল্লাহ ছিল এবং তাইয়িব ও তাহির— এ দুটি তাঁর উপনাম ছিল।
কন্যা চারজন হলেন— ফাতেমা, যায়নব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম। মেয়েদের মধ্যে যায়নব ছিলেন সবার বড়। উল্লিখিত সব কজনই ছিলেন খাদিজা রাযি.-এর গর্ভের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তৃতীয় পুত্র যার নাম ইবরাহীম, তিনি ছিলেন ক্রীতদাসী মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভের। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৩ পুত্র শৈশবেই মারা যান। তবে কাসেম সম্পর্কে বর্ণনা আছে, তিনি এতটুকু বড় হয়েছিলেন, সাওয়ারীতে আরোহণ করতে পারতেন। কাসেমের নামেই নবীজি আবুল কাসেম উপনামে প্রসিদ্ধ।
📄 চার কন্যা
উম্মতের সর্বসম্মত মত অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ৪ কন্যার মধ্যে ফাতেমা ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ফাতেমা জান্নাতী নারীদের নেত্রী হবে। পনের বছর পাঁচ মাস পনের দিন বয়সে হযরত আলি রাযি.-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিবাহে মহর ছিল ৪৮০ দিরহাম। যা প্রায় ১৫০ তোলা রূপার সমান। রমণীকূল শিরোমনি ফাতেমার বিবাহের উপঢৌকন ছিল একটি চাদর, একটি বালিশ, যাতে খেজুর গাছের ছাল ভরা ছিল, একটি চামড়ার গদি, একটি দড়ির চৌকি, চামড়ার তৈরি একটি পানির পাত্র, দুটি মাটির কলস, দুটি মশক এবং একটি আটার পাত্র।
চাক্কীতে আটা পেষণসহ ঘরের যাবতীয় কাজ ফাতেমা রাযি. নিজ হাতেই করতেন। এ হলো উভয় জগতের সরদার নবীজির সবচেয়ে আদরের কন্যার বিবাহ এবং তাঁর উপঢৌকন আর মহর। এই হলো তাঁর দারিদ্রপীড়িত জীবনের বাস্তব চিত্র। এরপরও কি সেসব মহিলার চোখে এতটুকু লজ্জাও আসে না, যারা বিবাহ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতায় নিজেদের দীন-ধর্ম সব কিছুই খোয়াচ্ছেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুত্র সন্তানদের কেউই জীবিত না থাকার পেছনে আল্লাহ পাকের বিশেষ হেকমত নিহিত আছে। কেবল কন্যা সন্তানদের দ্বারা দুনিয়াতে তাঁর বংশধারা টিকে আছে। আবার মেয়েদের মধ্যেও হযরত ফাতেমা রাযি.-এর সন্তানরাই বেঁচে ছিলেন। অন্যান্য মেয়েদের কারো সন্তানই হয়নি। আবার কারো সন্তান জন্মাবার পর শৈশবেই মারা যায়।
হযরত যায়নব রাযি.-এর বিবাহ হয় আবুল আস ইবনে রবী রাযি.-এর সঙ্গে। তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে অল্প বয়সেই মারা যায়। একটি কন্যা সন্তানও জন্মলাভ করে। তাঁর নাম ছিল উমামা। হযরত ফাতেমা রাযি.-এর ইনতেকালের পর হযরত আলি রাযি. যায়নব রাযি.-এর কন্যা উমামাকে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর গর্ভে হযরত আলি রাযি.-এর কোনো সন্তান জন্মলাভ করেনি।
রুকাইয়া রাযি.-কে বিবাহ করেন হযরত উসমান রাযি.। হাবশা হিজরতের সময় তিনি স্বামী উসমান রাযি.-এর সঙ্গে ছিলেন। দ্বিতীয় হিজরিতে বদর যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় নিঃসন্তান অবস্থায়ই তিনি ইনতেকাল করেন। এরপর তৃতীয় হিজরীতে তাঁর অপর এক বোন উম্মে কুলসুমকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসমান রাযি.-এর সঙ্গে বিবাহ দেন। আর এ কারণেই হযরত উসমান রাযি. যুননূরাইন উপাধিতে ভূষিত হন। নবম হিজরিতে তিনিও ইহজগত ত্যাগ করেন। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমার যদি আরো কোনো মেয়ে থাকত তাহলে তাকেও উসমানের সঙ্গে বিবাহ দিতাম।