📄 প্রথম কথা
হালিমা সাদিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি যখন দুধ ছাড়ালাম, তখন তাঁর পবিত্র মুখ থেকে নিম্নোক্ত কথাগুলো উচ্চারিত হয়: اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا، وَসُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا এ বাক্যগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রথম কথা।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক বৃদ্ধি অন্য সব শিশুর তুলনায় ভালো ছিল। দুবছর বয়সেই বেশ হৃষ্টপুষ্ট মনে হতে লাগল। এবার নিয়মানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। কিন্তু তাঁর বরকতের কারণে তাঁকে রেখে যেতে মন চাচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে সে বছর মক্কায় মহামারী দেখা দিয়েছিল। এ অজুহাতে আমরা পুনরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাথে করে নিয়ে এলাম। তিনি আমাদের কাছেই থাকতে লাগলেন। এবার তিনি ঘর থেকে বাইরে যান, পাড়ার ছেলেদের খেলা দেখেন কিন্তু নিজে কখনো খেলতেন না। সব সময় একা থাকতেন। একদিন আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মা ভাইয়াকে সারাদিন একবারও দেখি না, থাকেন কোথায়? আমি বললাম, ও মাঠে বকরি চরাতে যায়। এবার তিনি বললেন, তাহলে আমাকেও তার সাথে পাঠিয়ে দিন। এরপর থেকে নবীজি দুধভাই আব্দুল্লাহর সাথে প্রতিদিন বকরি চরাতে মাঠে যেতেন।
একদিনের ঘটনা। দু ভাই বকরি চরাচ্ছিলেন। হঠাৎ আব্দুল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে ঘরে এসে পিতাকে বলল, আমার কুরাইশী ভাইকে সাদা পোশাকধারী দুজন লোক ধরে মাটিতে শুইয়ে পেট চিরে ফেলেছে। এ অবস্থায়ই তাকে আমি ফেলে এসেছি। হালিমা বলেন, এ খবর শুনে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। মাঠে দৌঁড়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নবীজি বসে আছেন। কিন্তু ভয়ে তার চেহারা বিবর্ণ। আমি বললাম, ব্যাপার কী! জবাবে তিনি বললেন, সাদা পোশাক পরা দুজন লোক এসে আমাকে ধরে মাটিতে শুইয়ে আমার পেট চিরে পেটের ভেতর থেকে খুঁজে কী যেন বের করলেন। হালিমা বলেন, তাকে ঘরে নিয়ে এলাম। আমরা এক জ্যোতিষীর কাছে তাকে নিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেই জ্যোতিষী আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, কোথায় আছ আরবের মানুষ! জলদি এসো। যে বিপদ তোমাদের আসার কথা ছিল, তা এসে গেছে। শীঘ্রই তা দমন কর। এই শিশুটিকে খুন কর। এর সঙ্গে আমাকেও মেরে ফেল। একে বাঁচতে দিলে মনে রেখ এই শিশু তোমাদের দ্বীন-ধর্ম নিশ্চিহ্ন করে তোমাদের এমন এক ধর্মের প্রতি আহবান করবে যার কথা তোমরা কখনো শোননি।
জ্যোতিষীর এ কথা শুনে হালিমা শিহরিত হয়ে উঠলেন। ক্রোধের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার হাত থেকে ছিনিয়ে এনে বললেন, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে। আগে তোমার মাথার চিকিৎসা করানো উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে হালিমা ঘরে ফিরে এলেন। এই দ্বিতীয় ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে আসার ব্যাপারে হালিমাকে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, হালিমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছিলেন না। মক্কা গিয়ে হালিমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। হযরত আমেনা জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি এত আগ্রহ করে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন কেন? হালিমা সব ঘটনা খুলে বললেন। শুনে আমিনা বললেন, নিশ্চয় আমার এই পুত্রের ব্যতিক্রমধর্মী বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে! অতঃপর হালীমাকে তিনি গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়কার বিস্ময়কর ঘটনাসমূহ শুনালেন।
টিকাঃ
১. শৈশবকালেই এ শিশুর সাম্য-চেতনা লক্ষ্যণীয়, যখন আমার ভাই কাজ করবে, তখন আমি কেন করব না।
২. ইসলামের পূর্বে কিছু মানুষ জিন ও শয়তান দ্বারা আসমানি খবর এবং গোপন কথাবার্তা জেনে নিয়ে গায়েবি খবরের দাবিদার ছিল, তাদেরকে কাহেন বা গণক বলা হয়।
📄 মায়ের ইনতেকাল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়স যখন চার কিংবা ছয় বছর, তখন মদিনা থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে মা আমিনা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। ছয় বছরের শিশু। মাথার উপর থেকে পিতার স্নেহছায়া তো জন্মের আগেই বিদায় নিয়েছে। এবার জননীর মমতার কোলেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু যে রহমতের কোলে লালিত হবেন এ এতিম, তিনি তো এ সকল উপায় উপকরণের মুখাপেক্ষী নন।
📄 দাদার ইনতেকাল
পিতামাতা হারিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাদা আব্দুল মুত্তালিবের আশ্রয়ে লালিত-পালিত হচ্ছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা দেখাতে চেয়েছিলেন, এই শিশু একমাত্র রহমতের কোলেই পালিত হবেন। জাগতিক উপায় উপকরণের মূল নিয়ামক যাঁর হাতে তিনি নিজেই এই শিশুর জিম্মাদার। যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স ৮ বছর ২ মাস ১০ দিনে উপনীত হল, সেদিন দাদা আব্দুল মুত্তালিবও চিরবিদায় গ্রহণ করেন।
📄 সিরিয়া সফর
দাদার ইন্তেকালের পর আপন চাচা আবু তালিব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। চাচার কাছে নবীজি বড় হতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স যখন বার বছর দু'মাস দশ দিন তখন চাচা আবু তালিব ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া সফর করার মনস্থ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাথে নিয়ে তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে তায়মা নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করলেন।