📄 পিতার ইনতেকাল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় দাদা আবদুল মুত্তালিবের আদেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিতা আবদুল্লাহ খেজুর আনতে মদিনা যান। ঘটনাক্রমে সেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন। এভাবে দুনিয়াতে আগমনের পূর্বেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হন।
📄 দুধপান ও শৈশবকাল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজের মায়ের দুধ পান করেন। কয়েক দিন পর আবু লাহাবের দাসী সুআইবার দুধ পান করেন। অতঃপর আল্লাহ প্রদত্ত এ মহান দৌলত হালিমা সাদিয়ার ভাগ্যে জোটে। আরবের অভিজাত পরিবারসমূহের নিয়ম ছিল, দুধপানের জন্য নবজাত শিশুদের তারা আশপাশের পল্লী এলাকায় পাঠিয়ে দিত। এতে পল্লী অঞ্চলের আবহাওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্যও ভালো হত এবং তারা বিশুদ্ধ আরবি ভাষাও শিখতে পারত। এ কারণেই গ্রামের মহিলারা অনেক সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু সংগ্রহের জন্য শহরে আসত।
হযরত হালিমা সাদিয়া রাযি. এর নিজের বর্ণনা- দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে আমি বনু সাদ গোত্রের মহিলাদের সঙ্গে তায়েফ থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সে বছর দেশে দুর্ভিক্ষ ছিল। আমার স্তনে এতটুকু দুধ ছিল না, যা আমার নিজের বাচ্চার প্রয়োজন মেটাতে পারে। রাতভর শিশুটি ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করত। আর আমি তাকে কোলে নিয়ে বসে বসে রাত কাটাতাম। আমাদের একটি উট ছিল বটে; কিন্তু তারও দুধ ছিল না। উটের ওপর চড়ে আমি মক্কায় রওনা হলাম। সেটি এত দুর্বল ছিল, অন্যদের সাথে সমানতালে সে চলতে পারছিল না। এতে আমার সফরসঙ্গীরাও বিরক্তিবোধ করছিল। অবশেষে অনেক কষ্টে সফর শেষ করে আমরা মক্কায় এসে পৌঁছি।
মক্কা পৌঁছে আমরা সকলে দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধান করতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে যখন মহিলারা শুনতে পেল, শিশুটি এতিম, তখন কেউই তাকে গ্রহণ করছিল না। এতিম হওয়ার কারণে তার পক্ষ থেকে বেশি পুরস্কার পাওয়ার আশা ছিল না। এদিকে হালিমার ভাগ্যের তারকা চমকাতে শুরু করল। দুধের স্বল্পতা তাঁর জন্য রহমতের রূপ ধারণ করল। কারণ, দুধ কম দেখে কেউ তাকে শিশু দিতে সম্মত হল না। হালিমা বলেন, অনেক খোঁজাখুজির পর কোনো শিশু না পেয়ে আমি আমার স্বামীকে বললাম, খালি হাতে ফিরে যেতে আমার ভালো লাগছে না। তার চেয়ে বরং এই এতিম শিশুটিই নিয়ে চলুন। আমার এ প্রস্তাবে স্বামী সম্মত হলেন। এতিম রত্নটিই কোলে করে আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। যার উসিলায় কেবল হালিমা আর আমিনার গৃহই নয় বরং সমগ্র বিশ্বজগত আলোকিত হয়েছিল।
আল্লাহর মেহেরবানিতে হালিমার ভাগ্য খুলে গেল। উভয় জগতের সরদার তাঁর কোলে এল। শিশুসন্তান মুহাম্মদকে নিয়ে তাঁবুতে এসে হালিমা তাঁকে দুধপান করাতে বসলেন। আর অমনি একের পর এক বরকত শুরু হয়ে গেল। হালিমার স্তনের বোটায় মুখ দেওয়ার সাথে সাথে এত অধিক পরিমাণ দুধ নেমে আসে, প্রিয়নবী নিজে এবং তাঁর দুধভাই উভয়ে মিলে অতি তৃপ্তির সাথে দুধপান করে আরামের সাথে ঘুমিয়ে পড়লেন। অপর দিকে উটের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল তার স্তন দুধে পরিপূর্ণ। হালিমা বলেন, আমার স্বামী উটের দুধ দোহন করে আনলেন। আমরা সকলে তৃপ্তি সহকারে পান করলাম এবং আরামের সাথে রাত কাটালাম। দীর্ঘদিন পর এ রাতেই প্রথম আমরা পরম শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম। এখন আমার স্বামীও বলতে লাগলেন, হালিমা, তুমি তো বড় বরকতময় ভাগ্যবান শিশু এনেছ! আমি বললাম, আমিও আশা করি শিশুটি অস্বাভাবিক মুবারক।
অতঃপর আমরা মক্কা থেকে রওনা হলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোলে নিয়ে আমি সেই দুর্বল উটনীর পিঠে সওয়ার হলাম। কিন্তু আল্লাহর কি অপার মহিমা! সেই দুর্বল উটনী এবার এত দ্রুত চলতে শুরু করল, অন্য কোনো বাহনই তার নাগাল পেল না। আমার সঙ্গী মহিলারা বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগল, এ কি তোমার সেই উটনী, যাতে চড়ে তুমি এসেছিলে? মোটকথা, দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আমরা ঘরে এসে পৌঁছলাম। এলাকায় তখন চরম দুর্ভিক্ষ চলছিল। দুধের পশুগুলো সব ছিল দুগ্ধশূন্য। কিন্তু আমি ঘরে প্রবেশ করা মাত্র আমার বকরিরগুলোর স্তন দুধে ভরপুর হয়ে গেল। অবস্থা এমন হল, আমার বকরিগুলো প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে দুধ দিচ্ছে, আর অন্য কেউ তাদের পশু থেকে এক ফোটা দুধও পাচ্ছে না। আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাখালদের বলে দিল, আমাদের বকরিগুলোও তোমরা সেই চারণভূমিতে নিয়ে যেও, হালিমার বকরিগুলো যেখানে ঘাস খায়। কিন্তু তাতে হবে কি? এখানে যে চারণভূমি আর ঘাসপাতার কোনো কৃতিত্ব নেই। যে রত্নের বরকতে এসব ঘটছে হালিমা ছাড়া অন্যেরা তা পাবে কোথায়? তাই একই স্থানে ঘাস খাওয়ানোর পরও অন্যদের বকরিগুলো আগের মতো দুগ্ধশূন্যই রয়ে গেল। হালিমা বলেন, এভাবে একের পর এক আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকত প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। এমন করে দু বছর কেটে গেলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিলাম।
📄 প্রথম কথা
হালিমা সাদিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি যখন দুধ ছাড়ালাম, তখন তাঁর পবিত্র মুখ থেকে নিম্নোক্ত কথাগুলো উচ্চারিত হয়: اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا، وَসُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا এ বাক্যগুলোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে উচ্চারিত প্রথম কথা।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক বৃদ্ধি অন্য সব শিশুর তুলনায় ভালো ছিল। দুবছর বয়সেই বেশ হৃষ্টপুষ্ট মনে হতে লাগল। এবার নিয়মানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। কিন্তু তাঁর বরকতের কারণে তাঁকে রেখে যেতে মন চাচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে সে বছর মক্কায় মহামারী দেখা দিয়েছিল। এ অজুহাতে আমরা পুনরায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাথে করে নিয়ে এলাম। তিনি আমাদের কাছেই থাকতে লাগলেন। এবার তিনি ঘর থেকে বাইরে যান, পাড়ার ছেলেদের খেলা দেখেন কিন্তু নিজে কখনো খেলতেন না। সব সময় একা থাকতেন। একদিন আমাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মা ভাইয়াকে সারাদিন একবারও দেখি না, থাকেন কোথায়? আমি বললাম, ও মাঠে বকরি চরাতে যায়। এবার তিনি বললেন, তাহলে আমাকেও তার সাথে পাঠিয়ে দিন। এরপর থেকে নবীজি দুধভাই আব্দুল্লাহর সাথে প্রতিদিন বকরি চরাতে মাঠে যেতেন।
একদিনের ঘটনা। দু ভাই বকরি চরাচ্ছিলেন। হঠাৎ আব্দুল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে ঘরে এসে পিতাকে বলল, আমার কুরাইশী ভাইকে সাদা পোশাকধারী দুজন লোক ধরে মাটিতে শুইয়ে পেট চিরে ফেলেছে। এ অবস্থায়ই তাকে আমি ফেলে এসেছি। হালিমা বলেন, এ খবর শুনে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। মাঠে দৌঁড়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নবীজি বসে আছেন। কিন্তু ভয়ে তার চেহারা বিবর্ণ। আমি বললাম, ব্যাপার কী! জবাবে তিনি বললেন, সাদা পোশাক পরা দুজন লোক এসে আমাকে ধরে মাটিতে শুইয়ে আমার পেট চিরে পেটের ভেতর থেকে খুঁজে কী যেন বের করলেন। হালিমা বলেন, তাকে ঘরে নিয়ে এলাম। আমরা এক জ্যোতিষীর কাছে তাকে নিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেই জ্যোতিষী আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, কোথায় আছ আরবের মানুষ! জলদি এসো। যে বিপদ তোমাদের আসার কথা ছিল, তা এসে গেছে। শীঘ্রই তা দমন কর। এই শিশুটিকে খুন কর। এর সঙ্গে আমাকেও মেরে ফেল। একে বাঁচতে দিলে মনে রেখ এই শিশু তোমাদের দ্বীন-ধর্ম নিশ্চিহ্ন করে তোমাদের এমন এক ধর্মের প্রতি আহবান করবে যার কথা তোমরা কখনো শোননি।
জ্যোতিষীর এ কথা শুনে হালিমা শিহরিত হয়ে উঠলেন। ক্রোধের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার হাত থেকে ছিনিয়ে এনে বললেন, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে। আগে তোমার মাথার চিকিৎসা করানো উচিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে হালিমা ঘরে ফিরে এলেন। এই দ্বিতীয় ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে আসার ব্যাপারে হালিমাকে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, হালিমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছিলেন না। মক্কা গিয়ে হালিমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। হযরত আমেনা জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি এত আগ্রহ করে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন কেন? হালিমা সব ঘটনা খুলে বললেন। শুনে আমিনা বললেন, নিশ্চয় আমার এই পুত্রের ব্যতিক্রমধর্মী বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে! অতঃপর হালীমাকে তিনি গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়কার বিস্ময়কর ঘটনাসমূহ শুনালেন।
টিকাঃ
১. শৈশবকালেই এ শিশুর সাম্য-চেতনা লক্ষ্যণীয়, যখন আমার ভাই কাজ করবে, তখন আমি কেন করব না।
২. ইসলামের পূর্বে কিছু মানুষ জিন ও শয়তান দ্বারা আসমানি খবর এবং গোপন কথাবার্তা জেনে নিয়ে গায়েবি খবরের দাবিদার ছিল, তাদেরকে কাহেন বা গণক বলা হয়।
📄 মায়ের ইনতেকাল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বয়স যখন চার কিংবা ছয় বছর, তখন মদিনা থেকে ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে মা আমিনা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। ছয় বছরের শিশু। মাথার উপর থেকে পিতার স্নেহছায়া তো জন্মের আগেই বিদায় নিয়েছে। এবার জননীর মমতার কোলেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু যে রহমতের কোলে লালিত হবেন এ এতিম, তিনি তো এ সকল উপায় উপকরণের মুখাপেক্ষী নন।