📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 জন্মের পূর্বে বরকত প্রকাশ

📄 জন্মের পূর্বে বরকত প্রকাশ


সূর্য উদিত হওয়ার পূর্বক্ষণে সুবহে সাদিকের দিগন্ত বিস্তৃত আলোকরশ্মি অতঃপর রক্তিম আভা যেমন বিশ্বজগতকে সূর্যোদয়ের সুসংবাদ প্রদান করে, তেমনি নবুয়তের সূর্য উদয়ের সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন পৃথিবীর দিক দিগন্তে এমন বহু ঘটনা ঘটতে লাগল, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনী বার্তা প্রচার করছিল। মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের পরিভাষায় এগুলোকে ইরহাসাত (অপেক্ষমান নিদর্শন) বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মায়ের বর্ণনা, নবীজী তাঁর গর্ভে আসার পর একদিন স্বপ্নে তাকে সুসংবাদ দেওয়া হল, তোমার গর্ভের সন্তানটি এই উম্মতের কর্ণধার। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার জন্য তুমি এই দুআ করবে, আমি একে এক আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করছি। আর তার নাম মুহাম্মদ রাখবে। তিনি আরো বলেন, মুহাম্মদ আমার গর্ভে থাকা অবস্থায় আমি একটি নূর দেখতে পেলাম। যার আলোকে বসরা ও সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 শুভ জন্ম

📄 শুভ জন্ম


অধিকাংশ আলেমগণই একমত, যে বছর আসহাবে ফীল বাইতুল্লাহ শরীফ আক্রমণ করে এবং আল্লাহ তাআলা ক্ষুদ্র এক ঝাঁক পাখি দ্বারা তাদের ধ্বংস করেন, (যে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কুরআন মাজিদেও রয়েছে) ঠিক সে বছরের রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। বস্তুত আসহাবে ফীলের ঘটনাটিও ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুনিয়ায় আগমনের বরকত সমূহের ভূমিকা মাত্র। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ঘরে জন্মলাভ করেন, পরবর্তীতে সে ঘরটি হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ভাই মুহাম্মদ ইবনে ইউসুফের হাতে এসেছিল।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে আসহাবে ফীলের ঘটনাটি ঘটেছিল ৫৭১ সনের ২০শে এপ্রিল। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম-এর জন্মের ৫৭১ বছর পরে হয়েছিল। সর্বসম্মত মতানুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুণ্যময় জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের সোমবারে হয়। কিন্তু তারিখ নির্ধারণের ব্যাপারে ৪টি বর্ণনা প্রসিদ্ধ- দ্বিতীয়, অষ্টম, দশম, দ্বাদশ। হাফেয মুগলতাঈ রহ. ২ তারিখ গ্রহণ করে দ্বিতীয় বর্ণনাকে দুর্বল গণ্য করেছেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ বর্ণনা হল ১২ তারিখ। এমনকি হাফেয ইবনুল হাজার আসকালানীর উপর অধিকাংশের মত বর্ণনা করেন। এটাকেই কামেল ইবনে আসীরে গ্রহণ করা হয়েছে এবং মিসরের বাদশা মাহমুদ পাশা হিসাব করে ৯ তারিখ গ্রহণ করেন। এটা অধিকাংশ আলেমের মতের বিরোধী সনদবিহীন বর্ণনা। চন্দ্রোদয়ের স্থান বিভিন্ন হওয়ার ফলে গণনার মধ্যে নির্ভর করা যায় না বলে অধিকাংশের মতের বিরুদ্ধাচরণ করা যায় না।

প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে আসাকির পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এভাবে লিখেছেন, হযরত আদম আ. ও নূহ আ. এর মাঝে ব্যবধান ছিল ১২০০ বছর, নূহ আ. থেকে ইবরাহীম আ. পর্যন্ত ১১৪২ বছর, ইবরাহীম আ. থেকে মূসা আ. পর্যন্ত ৫৬৫ বছর, মূসা আ. দাউদ আ. পর্যন্ত ৫৬৯ বছর, দাউদ আ. থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত ১৩৫৬ বছর এবং ঈসা আ. থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত ব্যবধান ছিল ৬০০ বছর। এ হিসেবে হযরত আদম আ. থেকে আমাদের প্রিয়নবী পর্যন্ত ৫০৩২ বছর। আর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী আদম আ. হায়াত পেয়েছিলেন ৯৬০ বছর। তাই আদম আ. পৃথিবীতে আগমনের প্রায় ৬ হাজার বছর পরে অর্থাৎ সপ্তম সহস্রাব্দে সাইয়িদুল মুরসালীন খাতামুল আম্বিয়া মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুনিয়ায় আবির্ভাব ঘটে।

মোটকথা যে বছর বাইতুল্লাহর ওপর আসহাবে ফীলের আক্রমণ হয়, সে বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য দিন। এ দিনে জগত সৃষ্টির উদ্দেশ্য, রাত-দিনের বিবর্তনের মূল লক্ষ্য, আদম ও বনি আদমের গৌরব, নূহ আ. এর নৌকার হেফাজতের রহস্য, ইবরাহীম আ. এর দুআ এবং মূসা ও ঈসা আ. এর ভবিষ্যদ্বাণীর জীবন্ত প্রতীক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পৃথিবীতে শুভাগমন করেন। এদিকে পৃথিবীর দিকে দিকে নবুয়তের সূর্যকিরণ আত্মপ্রকাশ করতে লাগল, ওদিকে পারস্যের রাজপ্রাসাদে ভূমিকম্প হতে শুরু করল। যার ফলে প্রাসাদের চৌদ্দটি গম্বুজ ভেঙ্গে পড়ল। হঠাৎ শুকিয়ে গেল পারস্যের খরস্রোতা শ্বেতসাগর। নিস্তেজ হয়ে গেল এক হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত পারসিকদের সেই অগ্নিকুণ্ড, যা প্রজ্বলনের পর এক মুহূর্তের জন্যও হাজার বছরে একবারও নির্বাপিত হয়নি। এক রেওয়ায়েতে এরূপও আছে, তাঁর জন্মের ৭ মাস পর তাঁর পিতার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু যাদুল মাআদ-এ ইবনে কাইয়ুম রহ. এ অভিমত দুর্বল বলে অভিহিত করেছেন। বিভিন্ন সহি হাদীসে আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের সময় তাঁর মায়ের পেট থেকে এমন একটি আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল, যার আলোতে পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভূমিষ্ঠ হন, তখন তিনি নিজের উভয় হাতের উপর ভর দেওয়া অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর এক মুষ্টি মাটি নিয়ে আকাশপানে দৃষ্টিপাত করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 পিতার ইনতেকাল

📄 পিতার ইনতেকাল


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় দাদা আবদুল মুত্তালিবের আদেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিতা আবদুল্লাহ খেজুর আনতে মদিনা যান। ঘটনাক্রমে সেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন। এভাবে দুনিয়াতে আগমনের পূর্বেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 দুধপান ও শৈশবকাল

📄 দুধপান ও শৈশবকাল


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজের মায়ের দুধ পান করেন। কয়েক দিন পর আবু লাহাবের দাসী সুআইবার দুধ পান করেন। অতঃপর আল্লাহ প্রদত্ত এ মহান দৌলত হালিমা সাদিয়ার ভাগ্যে জোটে। আরবের অভিজাত পরিবারসমূহের নিয়ম ছিল, দুধপানের জন্য নবজাত শিশুদের তারা আশপাশের পল্লী এলাকায় পাঠিয়ে দিত। এতে পল্লী অঞ্চলের আবহাওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্যও ভালো হত এবং তারা বিশুদ্ধ আরবি ভাষাও শিখতে পারত। এ কারণেই গ্রামের মহিলারা অনেক সময় দুগ্ধপোষ্য শিশু সংগ্রহের জন্য শহরে আসত।

হযরত হালিমা সাদিয়া রাযি. এর নিজের বর্ণনা- দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে আমি বনু সাদ গোত্রের মহিলাদের সঙ্গে তায়েফ থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সে বছর দেশে দুর্ভিক্ষ ছিল। আমার স্তনে এতটুকু দুধ ছিল না, যা আমার নিজের বাচ্চার প্রয়োজন মেটাতে পারে। রাতভর শিশুটি ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করত। আর আমি তাকে কোলে নিয়ে বসে বসে রাত কাটাতাম। আমাদের একটি উট ছিল বটে; কিন্তু তারও দুধ ছিল না। উটের ওপর চড়ে আমি মক্কায় রওনা হলাম। সেটি এত দুর্বল ছিল, অন্যদের সাথে সমানতালে সে চলতে পারছিল না। এতে আমার সফরসঙ্গীরাও বিরক্তিবোধ করছিল। অবশেষে অনেক কষ্টে সফর শেষ করে আমরা মক্কায় এসে পৌঁছি।

মক্কা পৌঁছে আমরা সকলে দুগ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধান করতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখে যখন মহিলারা শুনতে পেল, শিশুটি এতিম, তখন কেউই তাকে গ্রহণ করছিল না। এতিম হওয়ার কারণে তার পক্ষ থেকে বেশি পুরস্কার পাওয়ার আশা ছিল না। এদিকে হালিমার ভাগ্যের তারকা চমকাতে শুরু করল। দুধের স্বল্পতা তাঁর জন্য রহমতের রূপ ধারণ করল। কারণ, দুধ কম দেখে কেউ তাকে শিশু দিতে সম্মত হল না। হালিমা বলেন, অনেক খোঁজাখুজির পর কোনো শিশু না পেয়ে আমি আমার স্বামীকে বললাম, খালি হাতে ফিরে যেতে আমার ভালো লাগছে না। তার চেয়ে বরং এই এতিম শিশুটিই নিয়ে চলুন। আমার এ প্রস্তাবে স্বামী সম্মত হলেন। এতিম রত্নটিই কোলে করে আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। যার উসিলায় কেবল হালিমা আর আমিনার গৃহই নয় বরং সমগ্র বিশ্বজগত আলোকিত হয়েছিল।

আল্লাহর মেহেরবানিতে হালিমার ভাগ্য খুলে গেল। উভয় জগতের সরদার তাঁর কোলে এল। শিশুসন্তান মুহাম্মদকে নিয়ে তাঁবুতে এসে হালিমা তাঁকে দুধপান করাতে বসলেন। আর অমনি একের পর এক বরকত শুরু হয়ে গেল। হালিমার স্তনের বোটায় মুখ দেওয়ার সাথে সাথে এত অধিক পরিমাণ দুধ নেমে আসে, প্রিয়নবী নিজে এবং তাঁর দুধভাই উভয়ে মিলে অতি তৃপ্তির সাথে দুধপান করে আরামের সাথে ঘুমিয়ে পড়লেন। অপর দিকে উটের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল তার স্তন দুধে পরিপূর্ণ। হালিমা বলেন, আমার স্বামী উটের দুধ দোহন করে আনলেন। আমরা সকলে তৃপ্তি সহকারে পান করলাম এবং আরামের সাথে রাত কাটালাম। দীর্ঘদিন পর এ রাতেই প্রথম আমরা পরম শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম। এখন আমার স্বামীও বলতে লাগলেন, হালিমা, তুমি তো বড় বরকতময় ভাগ্যবান শিশু এনেছ! আমি বললাম, আমিও আশা করি শিশুটি অস্বাভাবিক মুবারক।

অতঃপর আমরা মক্কা থেকে রওনা হলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কোলে নিয়ে আমি সেই দুর্বল উটনীর পিঠে সওয়ার হলাম। কিন্তু আল্লাহর কি অপার মহিমা! সেই দুর্বল উটনী এবার এত দ্রুত চলতে শুরু করল, অন্য কোনো বাহনই তার নাগাল পেল না। আমার সঙ্গী মহিলারা বিস্ময়ের সাথে বলতে লাগল, এ কি তোমার সেই উটনী, যাতে চড়ে তুমি এসেছিলে? মোটকথা, দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আমরা ঘরে এসে পৌঁছলাম। এলাকায় তখন চরম দুর্ভিক্ষ চলছিল। দুধের পশুগুলো সব ছিল দুগ্ধশূন্য। কিন্তু আমি ঘরে প্রবেশ করা মাত্র আমার বকরিরগুলোর স্তন দুধে ভরপুর হয়ে গেল। অবস্থা এমন হল, আমার বকরিগুলো প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে দুধ দিচ্ছে, আর অন্য কেউ তাদের পশু থেকে এক ফোটা দুধও পাচ্ছে না। আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাখালদের বলে দিল, আমাদের বকরিগুলোও তোমরা সেই চারণভূমিতে নিয়ে যেও, হালিমার বকরিগুলো যেখানে ঘাস খায়। কিন্তু তাতে হবে কি? এখানে যে চারণভূমি আর ঘাসপাতার কোনো কৃতিত্ব নেই। যে রত্নের বরকতে এসব ঘটছে হালিমা ছাড়া অন্যেরা তা পাবে কোথায়? তাই একই স্থানে ঘাস খাওয়ানোর পরও অন্যদের বকরিগুলো আগের মতো দুগ্ধশূন্যই রয়ে গেল। হালিমা বলেন, এভাবে একের পর এক আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকত প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। এমন করে দু বছর কেটে গেলে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিলাম।

ফন্ট সাইজ
15px
17px