📄 মাহাত্ম্য ও চারিত্রিক গুণাবলী
আল্লাহ পাক বলেন:
মাল মাসীহুবনু মারিয়ামা ইল্লা রসূলুন ক্বদ খলাত মিন ক্বাবলিহির রুসুলু অয়া উম্মুহু সিদ্দিকাহ।
"মারিয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মা সত্যনিষ্ঠ ছিল।" (সূরা মায়িদা: ৭৫)
মাসীহ অর্থ অত্যধিক ভ্রমণকারী। ঈসা আ.-এর প্রতি ইহুদিদের কঠোর শত্রুতা, মিথ্যা আরোপ এবং তাঁর ওপর ও তাঁর মায়ের ওপর অপবাদ দেওয়ার কারণে সৃষ্ট ফিৎনা ফাসাদ থেকে দীনকে রক্ষার জন্যে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সফরে কাটান। এ কারণে তাঁকে মাসীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেউ কেউ বলেন, তার পায়ের তলা সমতল থাকার কারণে হযরত ঈসা আ.-কে মাসীহ বলা হয়।
অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন: "এরপর আমি তাদের অনুগামী করেছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারিয়াম তনয় ঈসাকে আর তাঁকে দিয়েছিলাম ইনজীল।" (সূরা হাদীদ: ২৭)
আল্লাহর বাণী: "এবং মারিয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাঁকে শক্তিশালী করেছি।" (সূরা বাকারা: ৮৭)
এ সম্পর্কে কুরআনে প্রচুর আয়াত বিদ্যমান। ইতঃপূর্বে বুখারী ও মুসলিমে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এমন কোনো শিশু সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান পেটের পার্শ্বদেশে খোঁচা না দেয়। জন্মের সময় শয়তানের খোঁচার কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারিয়াম ও তাঁর পুত্র ঈসা আ.-এর ব্যতিক্রম। শয়তান তাঁকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল। কিন্তু তা না পেরে ঘরের পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়।
ইমাম বুখারী রহ. ইবরাহীম ইবনে মুনযিরের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ একচক্ষু বিশিষ্ট নন। শুনে রেখো, দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তাঁর চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের' মতো ভাসাভাসা। আমি এক রাতে স্বপ্নে আমাকে কাবার কাছে দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং-এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার চাইতেও বেশি সুন্দর ছিলেন তিনি। তাঁর মাথার সোজা চুলগুলো তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত ঝুলছিল। তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি দুজন লোকের কাঁধে হাত রেখে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওনি কে? তারা জবাব দিল, ওনি হলেন মাসীহ ইবনে মারিয়াম। তারপর তাঁর পেছনে আর একজন লোক দেখলাম। তাঁর মাথার চুল ছিল বেশি কোঁকড়ান, ডান চোখ কানা। আকৃতিতে সে আমার দেখা লোকদের মধ্যে ইবনে কাতানের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু কাঁধে ভর করে কাবার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই লোকটি কে? তারা বলল, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।
ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি হযরত উমর রাযি.-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিশয়োক্তি করো না। যেমনি ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. সম্পর্কে নাসারারা করেছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।'
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন জন শিশু ব্যতীত আর কেউ দোলনায় কথা বলেন নি। (১) হযরত ঈসা (২) জুরাইজ নামে বনি ইসরাঈল এক ব্যক্তি। একবার সে নামাযরত থাকা অবস্থায় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকল। সে ভাবল, আমি কি ডাকে সাড়া দিব, না নামাযে নিমগ্ন থাকব। জবাব না পেয়ে তাঁর মা বলল, ইয়া আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর চেহারা না দেখা পর্যন্ত তুমি একে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তাঁর ইবাদতখানায় থাকতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা আসল। সে অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তাতে রাজী হলেন না। এরপর মহিলাটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাঁকে দিয়ে মনোবাসনা পূরণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, এটি কার সন্তান? স্ত্রীলোকটি বলল, জুরাইজের। লোকেরা তাঁর কাছে আসল এবং তাঁর ইবাদতখানাটি ভেঙে দিল। আর তাঁকে নিচে নামিয়ে আনল ও গালিগালাজ করল। তখন জুরাইজ ওযু করে নামায আদায় করলেন। এরপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল, অমুক রাখাল আমার পিতা। তখন বনি ইসরাঈলের লোকেরা জুরাইজকে বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। জুরাইজ বললেন না, তবে কাদা মাটি দিয়ে তৈরি কর দিতে পার। (৩) বনি ইসরাঈলের একজন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। মহিলাটি দুআ করল, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে তার মতো বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো করো না। এরপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের দুধ পান করতে লাগল। আবু হোরাইরা রাযি. বলেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি নিজের আঙ্গুল চুষে দেখাচ্ছেন। এরপর সেই মহিলাটির পাশ দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। মহিলাটি বলল, ইয়া আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মতো করো না। শিশুটি তৎক্ষণাৎ মায়ের স্তন ছেড়ে দিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো কর। মা জিজ্ঞেস করল, তা কেন? শিশুটি জবাব দিল, সেই আরোহী লোকটি ছিল বড় জালিম আর এ দাসীটিকে লোকে বলছে, তুমি চুরি করেছ, যেনা করেছ। অথচ সে এসবের কিছুই করেনি।
ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার বেশি নিকটতম। আর নবীগণ যেন পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই অর্থাৎ বাপ এক, মা ভিন্ন ভিন্ন। আমার ও ঈসার মাঝখানে কোনো নবী নেই। তবে ইমাম আহমদ রহ.-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা পুনরায় দুনিয়ায় অবতরণ করবেন। যখন তাঁকে দেখবে, তখন তোমরা চিনতে পারবে। কেন না, তিনি হবেন মাঝারি গড়নের। গায়ের রং লালচে সাদা। মাথার চুল সোজা। মনে হবে যেন মাথার চুল থেকে পানি টপকে পড়ছে। যদিও তিনি পানি স্পর্শ করেননি। তিনি এসে ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর রহিত করবেন। একমাত্র ইসলাম ছাড়া সে যুগের সকল ধর্ম ও মতবাদ খতম করবেন। আল্লাহ তাঁর হাতে মিথ্যুক মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন।
সমস্ত পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তায় ভরে যাবে। এমনকি উট ও সিংহ, বাঘ ও গরু এবং নেকড়ে ও বকরী একই সাথে একই মাঠে বিচরণ করবে। কিশোর বালকগণ সাপের সাথে খেলা করবে। কিন্তু কেউ কারও ক্ষতি করবে না। যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা ততদিন তিনি পৃথিবীতে থাকবেন। তারপর তিনি স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়বে। হিশাম ইবনে উরওয়া আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ. পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ.-এর পুনরায় দুনিয়ায় আগমন কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ। দামিশকের শুভ্র মিনারের ওপর তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন অবতরণ করবেন, তখন ফজরের নামাযের ইকামত হতে থাকবে। তাঁকে দেখে মুসলমানদের ইমাম বলবেন, হে রুহুল্লাহ! সম্মুখে আসুন ও নামাযের ইমামতি করুন! ঈসা আ. বলবেন, "না, আপনারা একে অন্যের ওপর নেতা! এ সম্মান আল্লাহ এ উম্মতকেই দান করেছেন।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. ইমাম সাহেবকে বলবেন, আপনিই ইমামতি করুন। কেন না আপনার জন্যে ইকামত দেওয়া হয়েছে।
এরপর উক্ত ইমামের পেছনে তিনি নামায আদায় করবেন। নামায শেষে তিনি বাহনে আরোহণ করে দাজ্জালের সন্ধানে বের হবেন এবং মুসলমানরা তাঁর সাথে থাকবেন। দাজ্জালকে লুদ তোরণের নিকট পেয়ে সেখানেই তিনি নিজ হাতে তাঁকে হত্যা করবেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, দামিশকের পূর্ব পার্শ্বে এ মিনার যখন শুভ্র পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয় তখনই দৃঢ় আশা করা হয়েছিল, এখানেই তিনি অবতরণ করবেন। এ স্থানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর নাসারাদের অর্থ দ্বারাই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঈসা আ. এখানে অবতরণ করে শূকর নিধন করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে চুরমার করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন তিনি গ্রাহ্য করবেন না।
ঈসা আ. রাওহা থেকে হজ কিংবা উমরা অথবা উভয়টির নিয়ত করে বের হবেন এবং তা সম্পন্ন করবেন। চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর তিনি ইনতিকাল করবেন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রথম দুই খলীফার নিকট দাফন করা হবে। এ সম্পর্কে ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ঈসা আ.-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণিত মারফু হাদীসে উল্লেখ করেছেন, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা শরীফের মধ্যে রাসূলুল্লাহ, আবূ বকর ও উমরের সাথে দাফন করা হবে। কিন্তু এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ নয়। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আছে, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাফন করা হবে। এ হাদীসের অন্যতম রাবী মওদূদ মাদানী বলেন, রাসূলুল্লাহ এর হুজরায় একটি কবর পরিমাণ স্থান খালি আছে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমার মতে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে নবুয়তের বিরতিকাল ছয় শ' বছর। কাতাদার মতে, পাঁচ শ ষাট বছর। কারও মতে পাঁচ শ' চল্লিশ বছর। যাই হোক, চার শ' ত্রিশ বছরের কিছু বেশি কিন্তু প্রসিদ্ধ মত ছয় শ' বছর। তবে কেউ কেউ বলেছেন, চান্দ্র বছরের হিসেবে ছয় শ' বিশ বছর এবং সৌর বছর হিসেবে ছয় শ' বছর।
ইবনে হিব্বান তাঁর সহি গ্রন্থে ঈসা আ.-এর উম্মতগণ কত দিন সঠিক দীনের ওপর ও নবীর আদর্শের ওপর টিকেছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ দাউদ নবীকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মৃত্যু দেন। কিন্তু এতে তাঁর অনুসারীরা বিপথগামীও হয়নি, দীনও পরিবর্তন করেনি। আর ঈসা আ. অনুসারীরা তাঁর বিদায়ের পরে ২শ বছর তাঁর নীতি ও আদর্শের ওপর টিকে ছিল। ইবনে হিব্বান এ হাদীসকে সহি বললেও মূলত এর সনদ গরিব পর্যায়ের। ইবনে জারীর রহ. মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পূর্বে তিনি হাওয়ারীগণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন মানুষকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে থাকে। তিনি তাঁদের প্রত্যেককে সিরিয়া ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জনগোষ্ঠীর এক এক এলাকা দাওয়াতী কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
বর্ণনাকারীগণ বলেছেন, যে এলাকায় যে হাওয়ারীকে নিয়োগ করা হয়েছিল, তিনি সেই এলাকার অধিবাসীদের সাথে তাঁদের নিজ ভাষায় কথা বলতেন। অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, হযরত ঈসা আ.-এর নিকট থেকে চার জন লোক ইনজীল উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা হলেন লুক, মথি, মার্কস (মার্ক) ও ইউহান্না (যোহন)। কিন্তু এ ইনজীল চতুষ্টয়ের মধ্যে একটির সাথে আর একটির যথেষ্ট গরমিল বিদ্যমান। একটির মধ্যে বেশি তো আর একটিতে কম। উক্ত চার জনের মধ্যে মথি ও ইউহান্না হযরত ঈসা আ. এর যুগের এবং তারা তাঁকে দেখেছিলেন। মার্কস ও লুক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ঈসা আ.-এর শিষ্যদের শিষ্য। তবে তাঁরা মাসীহর ওপর যথার্থ ঈমান আনেন ও তাঁকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন।
দামিশকের এক ব্যক্তি ঈসা আ. ওপর ঈমান আনেন, তাঁর নাম যায়ন। তবে তিনি পোল নামক জনৈক ইহুদির ভয়ে দামিশকের পূর্ব গেটে গীর্জার নিকটে একটি গুহায় আত্মগোপন করে থাকেন। উক্ত ইহুদি অত্যাচারী ও ঈসা আ.-এর ওপর ঈমান আনার কারণে সে তাঁর মাথার চুল মুড়িয়ে দেয়। শহরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরায় এবং পাথর মেরে তাঁকে হত্যা করে। একদিন সে শুনতে পেল ঈসা আ. দামিশক অভিমুখে রওনা হয়েছেন। তখন সে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খচ্চরে আরোহণ করে সেদিকে বেরিয়ে পড়ল। কাওকাব নামক স্থানে পৌঁছে সে ঈসা আ.-কে দেখতে পেল। ঈসা আ.-এর শিষ্যদের দিকে অগ্রসর হতেই এক ফেরেশতা এসে পাখা দিয়ে আঘাত করে তাঁর চোখ কানা করে দিলেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁর অন্তরে ঈসা আ.-এর প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। তখন সে ঈসা আ.-এর নিকট গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ঈমান আনে ঈসা আ. তাঁর ঈমান গ্রহণ করলেন। এরপর সে ঈসা আ.-কে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে অনুরোধ করল, যাতে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। ঈসা আ. বললেন, তুমি যায়ন-এর কাছে ফিরে যাও। দামিশকের পূর্ব প্রান্তে লম্বা বাজারের পার্শ্বে তাঁকে পাবে। সে তোমার জন্যে দুআ করবে। ঈসা আ.-এর কথামতো সে সেখানে এসে যায়নকে পেল। যায়ন তার জন্যে দুআ করলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। পোল আন্তরিকভাবে ঈসা আ. এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তিনি তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নামে দামিশকে একটি গীর্জা তৈরি করা হয়। পোলের গীর্জা নামে খ্যাত এ গীর্জাটি সাহাবাদের যুগে দামিশক বিজয়কালেও বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে এটা ধ্বংস হয়ে যায়।
আল্লাহ পাক বলেন:
মাল মাসীহুবনু মারিয়ামা ইল্লা রসূলুন ক্বদ খলাত মিন ক্বাবলিহির রুসুলু অয়া উম্মুহু সিদ্দিকাহ।
"মারিয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মা সত্যনিষ্ঠ ছিল।" (সূরা মায়িদা: ৭৫)
মাসীহ অর্থ অত্যধিক ভ্রমণকারী। ঈসা আ.-এর প্রতি ইহুদিদের কঠোর শত্রুতা, মিথ্যা আরোপ এবং তাঁর ওপর ও তাঁর মায়ের ওপর অপবাদ দেওয়ার কারণে সৃষ্ট ফিৎনা ফাসাদ থেকে দীনকে রক্ষার জন্যে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সফরে কাটান। এ কারণে তাঁকে মাসীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেউ কেউ বলেন, তার পায়ের তলা সমতল থাকার কারণে হযরত ঈসা আ.-কে মাসীহ বলা হয়।
অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন: "এরপর আমি তাদের অনুগামী করেছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারিয়াম তনয় ঈসাকে আর তাঁকে দিয়েছিলাম ইনজীল।" (সূরা হাদীদ: ২৭)
আল্লাহর বাণী: "এবং মারিয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাঁকে শক্তিশালী করেছি।" (সূরা বাকারা: ৮৭)
এ সম্পর্কে কুরআনে প্রচুর আয়াত বিদ্যমান। ইতঃপূর্বে বুখারী ও মুসলিমে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এমন কোনো শিশু সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান পেটের পার্শ্বদেশে খোঁচা না দেয়। জন্মের সময় শয়তানের খোঁচার কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারিয়াম ও তাঁর পুত্র ঈসা আ.-এর ব্যতিক্রম। শয়তান তাঁকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল। কিন্তু তা না পেরে ঘরের পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়।
ইমাম বুখারী রহ. ইবরাহীম ইবনে মুনযিরের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ একচক্ষু বিশিষ্ট নন। শুনে রেখো, দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তাঁর চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের' মতো ভাসাভাসা। আমি এক রাতে স্বপ্নে আমাকে কাবার কাছে দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং-এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার চাইতেও বেশি সুন্দর ছিলেন তিনি। তাঁর মাথার সোজা চুলগুলো তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত ঝুলছিল। তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি দুজন লোকের কাঁধে হাত রেখে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওনি কে? তারা জবাব দিল, ওনি হলেন মাসীহ ইবনে মারিয়াম। তারপর তাঁর পেছনে আর একজন লোক দেখলাম। তাঁর মাথার চুল ছিল বেশি কোঁকড়ান, ডান চোখ কানা। আকৃতিতে সে আমার দেখা লোকদের মধ্যে ইবনে কাতানের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু কাঁধে ভর করে কাবার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই লোকটি কে? তারা বলল, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।
ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি হযরত উমর রাযি.-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিশয়োক্তি করো না। যেমনি ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. সম্পর্কে নাসারারা করেছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।'
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন জন শিশু ব্যতীত আর কেউ দোলনায় কথা বলেন নি। (১) হযরত ঈসা (২) জুরাইজ নামে বনি ইসরাঈল এক ব্যক্তি। একবার সে নামাযরত থাকা অবস্থায় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকল। সে ভাবল, আমি কি ডাকে সাড়া দিব, না নামাযে নিমগ্ন থাকব। জবাব না পেয়ে তাঁর মা বলল, ইয়া আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর চেহারা না দেখা পর্যন্ত তুমি একে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তাঁর ইবাদতখানায় থাকতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা আসল। সে অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তাতে রাজী হলেন না। এরপর মহিলাটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাঁকে দিয়ে মনোবাসনা পূরণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, এটি কার সন্তান? স্ত্রীলোকটি বলল, জুরাইজের। লোকেরা তাঁর কাছে আসল এবং তাঁর ইবাদতখানাটি ভেঙে দিল। আর তাঁকে নিচে নামিয়ে আনল ও গালিগালাজ করল। তখন জুরাইজ ওযু করে নামায আদায় করলেন। এরপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল, অমুক রাখাল আমার পিতা। তখন বনি ইসরাঈলের লোকেরা জুরাইজকে বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। জুরাইজ বললেন না, তবে কাদা মাটি দিয়ে তৈরি কর দিতে পার। (৩) বনি ইসরাঈলের একজন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। মহিলাটি দুআ করল, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে তার মতো বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো করো না। এরপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের দুধ পান করতে লাগল। আবু হোরাইরা রাযি. বলেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি নিজের আঙ্গুল চুষে দেখাচ্ছেন। এরপর সেই মহিলাটির পাশ দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। মহিলাটি বলল, ইয়া আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মতো করো না। শিশুটি তৎক্ষণাৎ মায়ের স্তন ছেড়ে দিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো কর। মা জিজ্ঞেস করল, তা কেন? শিশুটি জবাব দিল, সেই আরোহী লোকটি ছিল বড় জালিম আর এ দাসীটিকে লোকে বলছে, তুমি চুরি করেছ, যেনা করেছ। অথচ সে এসবের কিছুই করেনি।
ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার বেশি নিকটতম। আর নবীগণ যেন পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই অর্থাৎ বাপ এক, মা ভিন্ন ভিন্ন। আমার ও ঈসার মাঝখানে কোনো নবী নেই। তবে ইমাম আহমদ রহ.-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা পুনরায় দুনিয়ায় অবতরণ করবেন। যখন তাঁকে দেখবে, তখন তোমরা চিনতে পারবে। কেন না, তিনি হবেন মাঝারি গড়নের। গায়ের রং লালচে সাদা। মাথার চুল সোজা। মনে হবে যেন মাথার চুল থেকে পানি টপকে পড়ছে। যদিও তিনি পানি স্পর্শ করেননি। তিনি এসে ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর রহিত করবেন। একমাত্র ইসলাম ছাড়া সে যুগের সকল ধর্ম ও মতবাদ খতম করবেন। আল্লাহ তাঁর হাতে মিথ্যুক মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন।
সমস্ত পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তায় ভরে যাবে। এমনকি উট ও সিংহ, বাঘ ও গরু এবং নেকড়ে ও বকরী একই সাথে একই মাঠে বিচরণ করবে। কিশোর বালকগণ সাপের সাথে খেলা করবে। কিন্তু কেউ কারও ক্ষতি করবে না। যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা ততদিন তিনি পৃথিবীতে থাকবেন। তারপর তিনি স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়বে। হিশাম ইবনে উরওয়া আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ. পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ.-এর পুনরায় দুনিয়ায় আগমন কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ। দামিশকের শুভ্র মিনারের ওপর তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন অবতরণ করবেন, তখন ফজরের নামাযের ইকামত হতে থাকবে। তাঁকে দেখে মুসলমানদের ইমাম বলবেন, হে রুহুল্লাহ! সম্মুখে আসুন ও নামাযের ইমামতি করুন! ঈসা আ. বলবেন, "না, আপনারা একে অন্যের ওপর নেতা! এ সম্মান আল্লাহ এ উম্মতকেই দান করেছেন।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. ইমাম সাহেবকে বলবেন, আপনিই ইমামতি করুন। কেন না আপনার জন্যে ইকামত দেওয়া হয়েছে।
এরপর উক্ত ইমামের পেছনে তিনি নামায আদায় করবেন। নামায শেষে তিনি বাহনে আরোহণ করে দাজ্জালের সন্ধানে বের হবেন এবং মুসলমানরা তাঁর সাথে থাকবেন। দাজ্জালকে লুদ তোরণের নিকট পেয়ে সেখানেই তিনি নিজ হাতে তাঁকে হত্যা করবেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, দামিশকের পূর্ব পার্শ্বে এ মিনার যখন শুভ্র পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয় তখনই দৃঢ় আশা করা হয়েছিল, এখানেই তিনি অবতরণ করবেন। এ স্থানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর নাসারাদের অর্থ দ্বারাই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঈসা আ. এখানে অবতরণ করে শূকর নিধন করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে চুরমার করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন তিনি গ্রাহ্য করবেন না।
ঈসা আ. রাওহা থেকে হজ কিংবা উমরা অথবা উভয়টির নিয়ত করে বের হবেন এবং তা সম্পন্ন করবেন। চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর তিনি ইনতিকাল করবেন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রথম দুই খলীফার নিকট দাফন করা হবে। এ সম্পর্কে ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ঈসা আ.-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণিত মারফু হাদীসে উল্লেখ করেছেন, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা শরীফের মধ্যে রাসূলুল্লাহ, আবূ বকর ও উমরের সাথে দাফন করা হবে। কিন্তু এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ নয়। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আছে, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাফন করা হবে। এ হাদীসের অন্যতম রাবী মওদূদ মাদানী বলেন, রাসূলুল্লাহ এর হুজরায় একটি কবর পরিমাণ স্থান খালি আছে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমার মতে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে নবুয়তের বিরতিকাল ছয় শ' বছর। কাতাদার মতে, পাঁচ শ ষাট বছর। কারও মতে পাঁচ শ' চল্লিশ বছর। যাই হোক, চার শ' ত্রিশ বছরের কিছু বেশি কিন্তু প্রসিদ্ধ মত ছয় শ' বছর। তবে কেউ কেউ বলেছেন, চান্দ্র বছরের হিসেবে ছয় শ' বিশ বছর এবং সৌর বছর হিসেবে ছয় শ' বছর।
ইবনে হিব্বান তাঁর সহি গ্রন্থে ঈসা আ.-এর উম্মতগণ কত দিন সঠিক দীনের ওপর ও নবীর আদর্শের ওপর টিকেছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ দাউদ নবীকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মৃত্যু দেন। কিন্তু এতে তাঁর অনুসারীরা বিপথগামীও হয়নি, দীনও পরিবর্তন করেনি। আর ঈসা আ. অনুসারীরা তাঁর বিদায়ের পরে ২শ বছর তাঁর নীতি ও আদর্শের ওপর টিকে ছিল। ইবনে হিব্বান এ হাদীসকে সহি বললেও মূলত এর সনদ গরিব পর্যায়ের। ইবনে জারীর রহ. মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পূর্বে তিনি হাওয়ারীগণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন মানুষকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে থাকে। তিনি তাঁদের প্রত্যেককে সিরিয়া ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জনগোষ্ঠীর এক এক এলাকা দাওয়াতী কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
বর্ণনাকারীগণ বলেছেন, যে এলাকায় যে হাওয়ারীকে নিয়োগ করা হয়েছিল, তিনি সেই এলাকার অধিবাসীদের সাথে তাঁদের নিজ ভাষায় কথা বলতেন। অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, হযরত ঈসা আ.-এর নিকট থেকে চার জন লোক ইনজীল উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা হলেন লুক, মথি, মার্কস (মার্ক) ও ইউহান্না (যোহন)। কিন্তু এ ইনজীল চতুষ্টয়ের মধ্যে একটির সাথে আর একটির যথেষ্ট গরমিল বিদ্যমান। একটির মধ্যে বেশি তো আর একটিতে কম। উক্ত চার জনের মধ্যে মথি ও ইউহান্না হযরত ঈসা আ. এর যুগের এবং তারা তাঁকে দেখেছিলেন। মার্কস ও লুক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ঈসা আ.-এর শিষ্যদের শিষ্য। তবে তাঁরা মাসীহর ওপর যথার্থ ঈমান আনেন ও তাঁকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন।
দামিশকের এক ব্যক্তি ঈসা আ. ওপর ঈমান আনেন, তাঁর নাম যায়ন। তবে তিনি পোল নামক জনৈক ইহুদির ভয়ে দামিশকের পূর্ব গেটে গীর্জার নিকটে একটি গুহায় আত্মগোপন করে থাকেন। উক্ত ইহুদি অত্যাচারী ও ঈসা আ.-এর ওপর ঈমান আনার কারণে সে তাঁর মাথার চুল মুড়িয়ে দেয়। শহরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরায় এবং পাথর মেরে তাঁকে হত্যা করে। একদিন সে শুনতে পেল ঈসা আ. দামিশক অভিমুখে রওনা হয়েছেন। তখন সে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খচ্চরে আরোহণ করে সেদিকে বেরিয়ে পড়ল। কাওকাব নামক স্থানে পৌঁছে সে ঈসা আ.-কে দেখতে পেল। ঈসা আ.-এর শিষ্যদের দিকে অগ্রসর হতেই এক ফেরেশতা এসে পাখা দিয়ে আঘাত করে তাঁর চোখ কানা করে দিলেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁর অন্তরে ঈসা আ.-এর প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। তখন সে ঈসা আ.-এর নিকট গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ঈমান আনে ঈসা আ. তাঁর ঈমান গ্রহণ করলেন। এরপর সে ঈসা আ.-কে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে অনুরোধ করল, যাতে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। ঈসা আ. বললেন, তুমি যায়ন-এর কাছে ফিরে যাও। দামিশকের পূর্ব প্রান্তে লম্বা বাজারের পার্শ্বে তাঁকে পাবে। সে তোমার জন্যে দুআ করবে। ঈসা আ.-এর কথামতো সে সেখানে এসে যায়নকে পেল। যায়ন তার জন্যে দুআ করলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। পোল আন্তরিকভাবে ঈসা আ. এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তিনি তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নামে দামিশকে একটি গীর্জা তৈরি করা হয়। পোলের গীর্জা নামে খ্যাত এ গীর্জাটি সাহাবাদের যুগে দামিশক বিজয়কালেও বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে এটা ধ্বংস হয়ে যায়।
📄 বেথেলহাম ও কুমামার ভিত্তি স্থাপন
হযরত ঈসা মাসীহ আ. যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে স্থানে সম্রাট কনষ্টান্টাইন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম রাখা হয় বায়তু লাহাম (বেথেলহাম)। অপর দিকে সম্রাটের মা হায়লানা কথিত ক্রুশবিদ্ধ ঈসার কবরের ওপর আর একটি প্রাসাদ তৈরি করেন, যার নাম রাখা হয় কুমামা। ইহুদিদের প্রচারণায় পড়ে তাঁরাও বিশ্বাস করত, নবী ঈসা মাসীহ আ.কেই ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এ মত পোষণকারী পূর্বের পরের সকলেই কাফের। এরা বিভিন্ন রকম মনগড়া বিধি-বিধান ও আইন-কানুন তৈরি করে। এসব বিধানের মধ্যে ছিল পুরাতন নিয়ম তথা তাওরাতের বিরোধিতা করা। তাঁরা তাওরাতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তুকে হালাল করে নেয়, যেমন শূকর খাওয়া। তাঁরা পূর্বমুখী হয়ে উপাসনা করা। অথচ ঈসা মাসীহ বায়ুতল মুকাদ্দাসের শুভ্র পাথরের দিকে মুখ করা ছাড়া ইবাদত করতেন না। শুধু তিনিই নন বরং মূসা আ.-এর পরবর্তী সকল নবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেছেন। এমনকি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে নামায আদায় করেছেন। পরে তিনি আল্লাহর হুকুমে ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন। তাঁরা গির্জাগুলোতে মূর্তি স্থাপন করে। অথচ ইতোপূর্বে গির্জায় কখনো কোনো মূর্তি রাখা হত না। তাঁরা এমন সব আকিদা তৈরি করে, যা শিশু, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বিশ্বাস করত। এ আকিদার নাম ছিল 'আমান'। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল সম্পূর্ণ কুফরি আকিদা ও বিশ্বাসভঙ্গের নামান্তর।
হযরত ঈসা মাসীহ আ. যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে স্থানে সম্রাট কনষ্টান্টাইন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম রাখা হয় বায়তু লাহাম (বেথেলহাম)। অপর দিকে সম্রাটের মা হায়লানা কথিত ক্রুশবিদ্ধ ঈসার কবরের ওপর আর একটি প্রাসাদ তৈরি করেন, যার নাম রাখা হয় কুমামা। ইহুদিদের প্রচারণায় পড়ে তাঁরাও বিশ্বাস করত, নবী ঈসা মাসীহ আ.কেই ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এ মত পোষণকারী পূর্বের পরের সকলেই কাফের। এরা বিভিন্ন রকম মনগড়া বিধি-বিধান ও আইন-কানুন তৈরি করে। এসব বিধানের মধ্যে ছিল পুরাতন নিয়ম তথা তাওরাতের বিরোধিতা করা। তাঁরা তাওরাতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তুকে হালাল করে নেয়, যেমন শূকর খাওয়া। তাঁরা পূর্বমুখী হয়ে উপাসনা করা। অথচ ঈসা মাসীহ বায়ুতল মুকাদ্দাসের শুভ্র পাথরের দিকে মুখ করা ছাড়া ইবাদত করতেন না। শুধু তিনিই নন বরং মূসা আ.-এর পরবর্তী সকল নবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেছেন। এমনকি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে নামায আদায় করেছেন। পরে তিনি আল্লাহর হুকুমে ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন। তাঁরা গির্জাগুলোতে মূর্তি স্থাপন করে। অথচ ইতোপূর্বে গির্জায় কখনো কোনো মূর্তি রাখা হত না। তাঁরা এমন সব আকিদা তৈরি করে, যা শিশু, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বিশ্বাস করত। এ আকিদার নাম ছিল 'আমান'। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল সম্পূর্ণ কুফরি আকিদা ও বিশ্বাসভঙ্গের নামান্তর।
📄 হযরত মসীহ আ.-এর অবতীর্ণ হওয়ার প্রকৃত স্থান
লেবানন ইহুদী রাজ্য তাবরিয়া হ্রদ। আফিক ভূমধ্য সাগর তেল আবীব ইসরাঈল লুদ বায়তুল মোকাদ্দাস ফিলিস্তিনের যে অংশ আরবদের দখলে জর্দান নদী লুত সাগর জর্দান সিরিয়া দামেস্ক
লেবানন ইহুদী রাজ্য তাবরিয়া হ্রদ। আফিক ভূমধ্য সাগর তেল আবীব ইসরাঈল লুদ বায়তুল মোকাদ্দাস ফিলিস্তিনের যে অংশ আরবদের দখলে জর্দান নদী লুত সাগর জর্দান সিরিয়া দামেস্ক
📄 হযরত ঈসা আ.-এর আমলে ফিলিস্তিন
সাইদা প্রদেশ • দামেস্ক সূর রোমী সিরিয়া গালীল অঞ্চল নাসেরা কায়সারিয়া নাহরুন কায়সারিয়ারে ফিলিপ এতদ্ব্যতীত সাইদা হীরোদ দি গ্রেট এর পুত্র ফিলিপস এর রাষ্ট্র ভূমধ্য সাগর ডীকা পুলস (রোমান সিরিয়া প্রদেসের অধীন) (রোমান সিরিয়া প্রদেসের অধীন) জর্দান নদী শ্রীত্রাশ ইডিপাসের রাষ্ট্র ইয়াফা সিত সামেরিয়া অঞ্চল রোমীয় সিরিয়ার একটা অংশ আস্কালান। গাজা পুনতস পীলাতিস শাসিং ইয়ারীহ জেরুশালেম বেতেলহাম ইয়াহদীয়া হিবরুন আদুমীয়া লুত সাগর দে তী উত্তর র অ
সাইদা প্রদেশ • দামেস্ক সূর রোমী সিরিয়া গালীল অঞ্চল নাসেরা কায়সারিয়া নাহরুন কায়সারিয়ারে ফিলিপ এতদ্ব্যতীত সাইদা হীরোদ দি গ্রেট এর পুত্র ফিলিপস এর রাষ্ট্র ভূমধ্য সাগর ডীকা পুলস (রোমান সিরিয়া প্রদেসের অধীন) (রোমান সিরিয়া প্রদেসের অধীন) জর্দান নদী শ্রীত্রাশ ইডিপাসের রাষ্ট্র ইয়াফা সিত সামেরিয়া অঞ্চল রোমীয় সিরিয়ার একটা অংশ আস্কালান। গাজা পুনতস পীলাতিস শাসিং ইয়ারীহ জেরুশালেম বেতেলহাম ইয়াহদীয়া হিবরুন আদুমীয়া লুত সাগর দে তী উত্তর র অ