📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া

📄 হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া


আল্লাহ তাআলা কর্তৃক ঈসা আ.-কে রক্ষা এবং ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে শূলে চড়ানোর মিথ্যা দাবি প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

অয়ামাকারু অয়ামাকারুল্লাহু অয়াল্লাহু খইরুল মাকিরীন (৫৪) ইয ক্বালািল্লাহু ইয়া ঈসা ইন্নী মুতাঅয়াফ্ফিকা অয়া রফিুকা ইলাইয়্যা অয়া মুতহহিরুকা মিনাল্লাযীনা কাফারু অয়াজা-ইলুল্লাযীনাত্তাবাউকা ফাওক্বাল্লাযীনা কাফারু ইলা ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ। ছুম্মা ইলাইয়্যা মারজিউকুম ফাআহকুমু বাইনাকুম ফীমা কুনতুম ফীহি তাখতালিফুন।

"তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও কৌশল করেছিলেন, আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরী করেছে, তাদের মধ্য হতে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি। এরপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দিব। (আলে-ইমরান: ৫৪-৫৫)

আল্লাহ আরো বলেন:

ফাবিমা নাক্বদিহিম মীছাক্বাহুম অয়াকুফরিহিম বিআয়াতিল্লাহি অয়াক্বাতলিহিমুল আম্বিয়াআ বিগইরি হাক্বক্বিন অয়াক্বাওলিহিম ক্বুলুবুনা গুলফুন বাল তবাআল্লাহু আলাইহা বিকুফরিহিম ফালা ইউমিনূনা ইল্লা ক্বালীলা (১৫৫) অবিকুফরিহিম অয়াক্বাওলিহিম আলা মারিয়ামা বুহতানান আযীমা (১৫৬) অয়াক্বাওলিহিম ইন্না ক্বাতালনাল মাসীহা ঈসাবনা মারিয়ামা রসূলুল্লাহি অয়ামা ক্বাতালূহু অয়ামা সালাবূহু অয়ালাকিন শুববিহা লাহুম অয়া ইন্নাল্লাযীনাখ তালাফূ ফীহি লাফী শাক্কিম মিনহু মা লাহুম বিহি মিন ইলমিন ইল্লাত্তিবাআয যন্নি অয়ামা ক্বাতালূহু ইয়াক্বীনা (১৫৭) বার রফাউল্লাহু ইলাইহি অয়াকানাল্লাহু আযীযান হাকীমা (১৫৮) অয়া ইম মিন আহলিল কিতাবি ইল্লা লাইউমিনান্না বিহি ক্বাবলা মাওতিহি অয়া ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ ইয়াকুনু আলাইহিম শাহিদী

এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্যে, আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখান করার জন্যে নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার জন্যে এবং আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, তাদের এ উক্তির জন্যে বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাতে মোহর মেরে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যক লোকই বিশ্বাস করে। এবং লা'নতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্যে ও মারিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্যে। আর আমরা আল্লাহর রাসূল মারিয়াম-তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি— তাদের এ উক্তির জন্যে। অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তাঁর সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। (সূরা নিসা: ১৫৫-১৫৯)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক হযরত ঈসা আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করার পরে আসমানে তুলে নেন। এটাই সন্দেহাতীত বিশুদ্ধ মত। ইহুদিরা সে যুগের জনৈক কাফির বাদশার সাথে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে যে নির্যাতন করতে চেয়েছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে মুক্ত করেন। হাসান বসরী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, সে বাদশার নাম ছিল দাউদ ইবনে নুরা। সে হযরত ঈসা আ.-কে হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দেয়। হুকুম পেয়ে ইহুদিরা শুক্রবার দিবাগত শনিবার রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে হযরত ঈসা আ.-কে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কক্ষে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহ তাআলা কক্ষে বিদ্যমান ঈসা আ.-এর অনুসারীদের মধ্য হতে একজনের চেহারাকে তাঁর চেহারার সদৃশ করে দেন এবং ঈসা আ.-কে বাতায়নপথে আকাশে তুলে নেন।

কক্ষে যারা ছিল তারা ঈসা আ.-কে তুলে নেওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। ইতঃমধ্যে বাদশার রক্ষীরা কক্ষে প্রবেশ করে ঈসা আ.-এর চেহারা বিশিষ্ট ওই যুবককে দেখতে পায়। তারা তাকেই ঈসা আ. মনে করে ধরে এনে শূলে চড়ায় এবং মাথায় কাঁটার টুপি পরায়। তাঁকে অধিক লাঞ্ছিত করার জন্যে তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ নাসারা, যারা ঈসা আ.-এর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি, তারা ইহুদিদের ঈসা আ.-কে ক্রুশ বিদ্ধ করার দাবি মেনে নেয়। ফলে তারাও সত্য থেকে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিভ্রান্তির অতল তলে নিক্ষিপ্ত হয়। সেই জন্যে আল্লাহ বলেন, "কিতাবীদের প্রত্যেকেই তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি বিশ্বাস করবে।" অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে তখনকার সকল কিতাবীরাই তাঁর প্রতি বিশ্বাস আনবে। কেন না তিনি পুনর্বার পৃথিবীতে আসবেন এবং শূকর বধ করবেন, ক্রুশ ধ্বংস করবেন, জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন কবুল করবেন না।

ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নিতে ইচ্ছা করলেন, তখন ঘটনা ছিল, বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে ঈসা আ.-এর বারজন হাওয়ারী অবস্থান করছিলেন। তিনি মসজিদের একটি ঝরনায় গোসল করে ওই কক্ষে শিষ্যদের নিকট যান। তাঁর মাথার চুল থেকে তখনও পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছে, যে তার প্রতি ঈমান আনার পর ১২ বার আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এরপরে তিনি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে যাকে আমার গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করা হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে, পরিণামে আমার সাথে সে মর্যাদা লাভ করবে? উপস্থিত শিষ্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এক যুবক দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বললেন, বস। এরপর তিনি দ্বিতীয় বার একই আহবান জানান। এবারও ওই যুবকটি দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বসতে বললেন। তৃতীয়বার তিনি আবারও একই আহবান রাখেন আর ওই যুবক দাঁড়িয়ে বললেন, এ জন্যে আমি প্রস্তুত। ঈসা আ. বললেন তাই হবে, তুমিই এর অধিকারী।

এরপর যুবকটির গঠনাকৃতিকে ঈসা আ. এর গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া এবং মসজিদের একটি বাতায়ন পথে ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ইহুদিদের একটি অনুসন্ধানকারী দল ঈসা আ.-কে ধরার জন্যে এসে উক্ত যুবককে ঈসা আ. মনে করে ধরে নিয়ে আসে ও তাকে হত্যা করে এবং ক্রুশবিদ্ধ করে। জনৈক শিষ্য ঈসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার পর বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনী ইসরাঈল তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা: (১) আল-ইয়াকুবিয়্যা: এ দল বিশ্বাস করে যে, এতদিন আল্লাহ স্বয়ং আমাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলেন, এখন তিনি আসমানে উঠে গিয়েছেন। (২) আল-নাসুতরিয়‍্যা এ দলের বিশ্বাস হল, আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে এতদিন ছিলেন, এখন তাঁকে আল্লাহ নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (৩) আল-মুসলিমুন : এ দলের মতে ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ছিল ততদিন তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। এখন তাঁকে আল্লাহর নিজের সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছেন। উক্ত তিন দলের মধ্যে কাফির দুই দল একত্র হয়ে মুসলিম দলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। ফলে মুসলিম দল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলার পর আল্লাহ মুহাম্মাদকে রসূলরূপে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এ দিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনে বলা হয়েছে “পরে আমি মুমিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়। ফলে তারা বিজয়ী হল।"

এ হাদীসটি সবচেয়ে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. আল্লাহর নিকট তাঁর মৃত্যুকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে দুআ করতেন, যাতে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারেন। দাওয়াতী কাজ সম্প্রসারণ করতে পারেন এবং অধিক পরিমাণ লোক যাতে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে পারে। ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে জানিয়ে দেন, অচিরেই তুমি দুনিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছ তখন তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। এ সময় তিনি হাওয়ারীগণকে দাওয়াত করেন। তাঁদের জন্যে খাদ্য প্রস্তুত করেন। তাঁদেরকে জানিয়ে দেন, রাত্রে তোমরা আমার নিকট আসবে, তোমাদের কাছে আমার প্রয়োজন আছে। হাওয়ারীগণ রাত্রে আসলে ঈসা আ. তাদেরকে নিজ হাতে খানা পরিবেশন করে খাওয়ান। আহার শেষে নিজেই তাঁদের হাত ধুয়ে দেন ও নিজের কাপড় দ্বারা তাঁদের হাত মুছে দেন। এ সব দেখে হাওয়ারীগণ আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং বিব্রত বোধ করলেন।

ঈসা আ. বললেন, দেখ, আমি যা কিছু করব কেউ যদি তার প্রতিবাদ করে তবে সে আমার শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তার কেউ নই। তখন তারা তা মেনে নিলেন। আর ঈসা আ. বললেন, আমি আজ রাত্রে তোমাদের সাথে যে আচরণ করলাম, তোমাদের সেবা করলাম, খাদ্য পরিবেশন করলাম, হাত ধুয়ে দিলাম, এ যেন তোমাদের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকে। তোমরা জানো, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না বরং নিজেকে অপরের চাইতে ছোট জ্ঞান করবে। তোমরা তো প্রত্যক্ষ করলে, কিভাবে আমি তোমাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। তোমরাও ঠিক এভাবে করবে, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করবে এবং মনে প্রাণে দুআ করবে যেন তিনি আমার মৃত্যুকে পিছিয়ে দেন।

ঈসা আ.-এর কথা শোনার পর হাওয়ারীগণ যখন দুআ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে দু'আ করতে বসলেন, তখন গভীর নিদ্রা তাঁদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ফলে তাঁরা দুআ করতে সমর্থ হলেন না। ঈসা আ. তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাবার চেষ্টা করেন এবং বলেন: কী আশ্চর্য! তোমরা কি মাত্র একটা রাত আমার জন্যে ধৈর্যধারণ করতে এবং আমাকে সাহায্য করতে পারবে না? তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি পারছি না, আমাদের এ কী হল? আমরা তো প্রতি দিন রাত্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জেগে থাকি, কথাবার্তা বলি; কিন্তু আজ রাত্রে তার কিছুই করতে পারছি না। যখনই দুআ করতে যাই তখনই ঘুম এসে মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন হযরত ঈসা আ. বললেন, রাখাল মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছে আর বকরীগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জাতীয় আরও বিভিন্ন কথা তিনি বলতে থাকেন এবং নিজের বিয়োগ ব্যথার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর ঈসা আ. বললেন আমি তোমাদেরকে একটি সত্য কথা বলছি— তোমাদের মধ্যে একজন আজ মোরগ ডাক দেওয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তোমাদের মধ্যে একজন সামান্য কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে শত্রুদের কাছে আমার সন্ধান বলে দেবে এবং আমার বিনিময়ে প্রাপ্তঅর্থ ভক্ষণ করবে। এরপর তারা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। এদিকে ইহুদিরা ঈসা আ.-কে সন্ধান করে ফিরছে। তারা শামউন নামক এক হওয়ারীকে ধরে বলল, এই ব্যক্তি ঈসার শিষ্য। কিন্তু সে অস্বীকার করে বলল, আমি ঈসার শিষ্য নই। এ কথা বললে, তারা শামউনকে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে তাকে অন্য ইহুদিরা পাকড়াও করলে সে পূর্বের মতো উত্তর দিয়ে আত্মরক্ষা করল।

এমন সময় ঈসা আ. হঠাৎ মোরগের ডাক শুনতে পান। মোরগের ডাক শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। প্রভাত হওয়ার পর জনৈক হাওয়ারী ইহুদিদের নিকট গিয়ে বলল, আমি যদি তোমাদেরকে ঈসা মাসীহর সন্ধান দিই, তা হলে তোমরা আমাকে কী পুরস্কার দিবে? ইহুদিরা তাকে ত্রিশটি দিরহাম দিল, বিনিময়ে সে তাদের নিকট তাঁর সন্ধান বলে দিল। কিন্তু এর পূর্বেই তাকে ঈসার অনুরূপ চেহারা দান করা হয় এবং তাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয়। ফলে তাকেই তারা পাকড়াও করে রশি দ্বারা শক্ত করে বাঁধল এবং একথা বলতে বলতে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গেল, তুমিই তো মৃতকে জীবিত করতে, জীন-ভূত তাড়াতে, পাগল মানুষকে সুস্থ করে দিতে। এখন এই রশির বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত কর দেখি! তারা তার ওপর থুথু নিক্ষেপ করল, দেহে কাঁটা ফুটাল এবং যেই ক্রুশে বিদ্ধ করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে তাকে নিয়ে আসল।

ইতঃমধ্যে ঈসা আ.-কে আল্লাহ নিজ সান্নিধ্যে তুলে নিলেন এবং ইহুদিরা ওই চেহারা পরিবর্তিত ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করল। ক্রুশের ওপর লাশ সাত দিন পর্যন্ত ঝুলে ছিল। এরপর ঈসা আ.-এর মা এবং অন্য এক মহিলা যে পাগল ছিল এবং যাকে ঈসা আ, সুস্থ করেছিলেন উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্রুশবিদ্ধ লোকটির কাছে আসলেন। তখন হযরত ঈসা আ.-তাঁদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কাঁদছেন কেন? তাঁরা বললেন, আমরা তো তোমার জন্যে কাঁদছি। ঈসা আ. বললেন, আমাকে আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং উত্তম অবস্থায় রেখেছেন আর এই যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে, তার ব্যাপারে ইহুদিরা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।

এরপর তিনি হাওয়ারীদের প্রতি নির্দেশ দিলেন যেন, অমুক স্থানে তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নির্দেশ মতে এগারজন হাওয়ারী সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। সেই এক হাওয়ারী অনুপস্থিত থাকে, যে ঈসাকে দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করেছিল এবং ইহুদিদেরকে তাঁর সন্ধান বলে দিয়েছিল; তার সম্পর্কে ঈসা আ. শিষ্যদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে তারা জানালো, সে তার কর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঈসা আ. বললেন, যদি সে তওবা করত তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করতেন। এরপর তিনি ইয়াহইয়া নামক সেই যুবকের কথা জিজ্ঞেস করলেন, যে তাদেরকে অনুসরণ করত। তিনি বললেন, সে তোমাদের সাথেই আছে। এরপর ঈসা আ. বললেন, তোমরা এখান থেকে চলে যাও। কেন না অচিরেই তোমরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলবে। সুতরাং তাদেরকে সতর্ক করবে এবং দীনের দাওয়াত দিবে।

ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া ইবনে হাবীবের সূত্রে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, মারিয়াম আ. ধারণা করেছিলেন, সে তাঁরই পুত্র। তাই তিনি ঘটনার সাত দিন পর বাদশার লোকদের নিকট গিয়ে লাশটি নামিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। তারা তাঁর আবেদনে সাড়া দেয় এবং সেখানেই লাশটি দাফন করা হয়। তারপর মারিয়াম আ. হযরত ইয়াহইয়া আ. মাকে বললেন: চল! আমরা মাসীহর কবর যিয়ারত করে আসি। উভয়ে রওনা হলেন। কবরের কাছাকাছি পৌঁছলে মারিয়াম আ. ইয়াহইয়া আ. এর মাকে বললেন, পর্দা কর! ইয়াহইয়ার মা বললেন, কার থেকে পর্দা করব? বললেন: কেন কবরের কাছে ওই যে লোকটিকে দেখা যায়, তার থেকে! ইয়াহইয়া আ. এর মা বললেন, কী বলছ? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! মারিয়াম আ. তখন ভাবছেন, ওনি জিবরাঈল ফিরিশতা হবেন। বস্তুত জিবরাঈল আ.-কে তিনি বহু পূর্বে দেখেছিলেন।

মোটকথা, ইয়াহইয়া আ. এর মাকে সেখানে রেখে মারিয়াম আ. কবরের কাছে গেলেন। কবরের নিকট গেলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! কোথায় যাচ্ছ? মারিয়াম আ. বললেন, মাসীহর কবর যিয়ারত করতে এবং তাঁকে সালাম জানাতে। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! এ তো মাসীহ নয়। তাঁকে তো আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন, কাফিরদের হাত থেকে তাঁকে পবিত্র করেছেন। তবে কবরবাসীকে মাসীহর আকৃতি বদলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। এর নিদর্শন হচ্ছে, ওই লোকটির পরিবারের লোকজন একে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছে না এবং তার কি হয়েছে তাও তারা জানে না; এর জন্যে তারা কেবল কান্নাকাটি করে ফিরছে। তুমি অমুক দিন অমুক বাগানের নিকট আসলে মাসীহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে। এ কথা বলে জিবরাঈল আ. সেখান থেকে প্রস্থান করেন। মারিয়াম আ. তার বোনের নিকট ফিরে এসে জিবরাঈল আ. এর ব্যাপারে জানালেন এবং বাগানের বিষয়টিও বললেন। নির্দিষ্ট দিনে মারিয়াম আ. সেই বাগানের নিকট গেলে সেখানে মাসীহকে দেখতে পান। ঈসা আ. মাকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসেন, মা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর মাথায় চুম্বন দেন। তিনি পূর্বের মত তাঁর জন্যে দুআ করেন। তারপর বলেন, মা! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে হত্যা করতে পারেনি, আল্লাহ আমাকে তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দিয়েছেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হবে। ধৈর্য ধরুন ও বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করুন। ঈসা আ. ঊর্ধ্বলোকে চলে গেলেন। এরপর মারিয়াম আ. সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ঈসার আর সাক্ষাৎ হয়নি। রাবী বলেন, ঈসা আ.-এর ঊর্ধ্ব্বারোহণের পরে তাঁর মা পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিপ্পান্ন বছর বয়সকালে তিনি ইনতিকাল করেন।

আল্লাহ তাআলা কর্তৃক ঈসা আ.-কে রক্ষা এবং ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে শূলে চড়ানোর মিথ্যা দাবি প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

অয়ামাকারু অয়ামাকারুল্লাহু অয়াল্লাহু খইরুল মাকিরীন (৫৪) ইয ক্বালািল্লাহু ইয়া ঈসা ইন্নী মুতাঅয়াফ্ফিকা অয়া রফিুকা ইলাইয়্যা অয়া মুতহহিরুকা মিনাল্লাযীনা কাফারু অয়াজা-ইলুল্লাযীনাত্তাবাউকা ফাওক্বাল্লাযীনা কাফারু ইলা ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ। ছুম্মা ইলাইয়্যা মারজিউকুম ফাআহকুমু বাইনাকুম ফীমা কুনতুম ফীহি তাখতালিফুন।

"তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও কৌশল করেছিলেন, আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরী করেছে, তাদের মধ্য হতে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি। এরপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দিব। (আলে-ইমরান: ৫৪-৫৫)

আল্লাহ আরো বলেন:

ফাবিমা নাক্বদিহিম মীছাক্বাহুম অয়াকুফরিহিম বিআয়াতিল্লাহি অয়াক্বাতলিহিমুল আম্বিয়াআ বিগইরি হাক্বক্বিন অয়াক্বাওলিহিম ক্বুলুবুনা গুলফুন বাল তবাআল্লাহু আলাইহা বিকুফরিহিম ফালা ইউমিনূনা ইল্লা ক্বালীলা (১৫৫) অবিকুফরিহিম অয়াক্বাওলিহিম আলা মারিয়ামা বুহতানান আযীমা (১৫৬) অয়াক্বাওলিহিম ইন্না ক্বাতালনাল মাসীহা ঈসাবনা মারিয়ামা রসূলুল্লাহি অয়ামা ক্বাতালূহু অয়ামা সালাবূহু অয়ালাকিন শুববিহা লাহুম অয়া ইন্নাল্লাযীনাখ তালাফূ ফীহি লাফী শাক্কিম মিনহু মা লাহুম বিহি মিন ইলমিন ইল্লাত্তিবাআয যন্নি অয়ামা ক্বাতালূহু ইয়াক্বীনা (১৫৭) বার রফাউল্লাহু ইলাইহি অয়াকানাল্লাহু আযীযান হাকীমা (১৫৮) অয়া ইম মিন আহলিল কিতাবি ইল্লা লাইউমিনান্না বিহি ক্বাবলা মাওতিহি অয়া ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ ইয়াকুনু আলাইহিম শাহিদী

এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্যে, আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখান করার জন্যে নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার জন্যে এবং আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, তাদের এ উক্তির জন্যে বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাতে মোহর মেরে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যক লোকই বিশ্বাস করে। এবং লা'নতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্যে ও মারিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্যে। আর আমরা আল্লাহর রাসূল মারিয়াম-তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি— তাদের এ উক্তির জন্যে। অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তাঁর সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। (সূরা নিসা: ১৫৫-১৫৯)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক হযরত ঈসা আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করার পরে আসমানে তুলে নেন। এটাই সন্দেহাতীত বিশুদ্ধ মত। ইহুদিরা সে যুগের জনৈক কাফির বাদশার সাথে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে যে নির্যাতন করতে চেয়েছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে মুক্ত করেন। হাসান বসরী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, সে বাদশার নাম ছিল দাউদ ইবনে নুরা। সে হযরত ঈসা আ.-কে হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দেয়। হুকুম পেয়ে ইহুদিরা শুক্রবার দিবাগত শনিবার রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে হযরত ঈসা আ.-কে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কক্ষে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহ তাআলা কক্ষে বিদ্যমান ঈসা আ.-এর অনুসারীদের মধ্য হতে একজনের চেহারাকে তাঁর চেহারার সদৃশ করে দেন এবং ঈসা আ.-কে বাতায়নপথে আকাশে তুলে নেন।

কক্ষে যারা ছিল তারা ঈসা আ.-কে তুলে নেওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। ইতঃমধ্যে বাদশার রক্ষীরা কক্ষে প্রবেশ করে ঈসা আ.-এর চেহারা বিশিষ্ট ওই যুবককে দেখতে পায়। তারা তাকেই ঈসা আ. মনে করে ধরে এনে শূলে চড়ায় এবং মাথায় কাঁটার টুপি পরায়। তাঁকে অধিক লাঞ্ছিত করার জন্যে তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ নাসারা, যারা ঈসা আ.-এর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি, তারা ইহুদিদের ঈসা আ.-কে ক্রুশ বিদ্ধ করার দাবি মেনে নেয়। ফলে তারাও সত্য থেকে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিভ্রান্তির অতল তলে নিক্ষিপ্ত হয়। সেই জন্যে আল্লাহ বলেন, "কিতাবীদের প্রত্যেকেই তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি বিশ্বাস করবে।" অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে তখনকার সকল কিতাবীরাই তাঁর প্রতি বিশ্বাস আনবে। কেন না তিনি পুনর্বার পৃথিবীতে আসবেন এবং শূকর বধ করবেন, ক্রুশ ধ্বংস করবেন, জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন কবুল করবেন না।

ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নিতে ইচ্ছা করলেন, তখন ঘটনা ছিল, বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে ঈসা আ.-এর বারজন হাওয়ারী অবস্থান করছিলেন। তিনি মসজিদের একটি ঝরনায় গোসল করে ওই কক্ষে শিষ্যদের নিকট যান। তাঁর মাথার চুল থেকে তখনও পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছে, যে তার প্রতি ঈমান আনার পর ১২ বার আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এরপরে তিনি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে যাকে আমার গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করা হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে, পরিণামে আমার সাথে সে মর্যাদা লাভ করবে? উপস্থিত শিষ্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এক যুবক দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বললেন, বস। এরপর তিনি দ্বিতীয় বার একই আহবান জানান। এবারও ওই যুবকটি দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বসতে বললেন। তৃতীয়বার তিনি আবারও একই আহবান রাখেন আর ওই যুবক দাঁড়িয়ে বললেন, এ জন্যে আমি প্রস্তুত। ঈসা আ. বললেন তাই হবে, তুমিই এর অধিকারী।

এরপর যুবকটির গঠনাকৃতিকে ঈসা আ. এর গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া এবং মসজিদের একটি বাতায়ন পথে ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ইহুদিদের একটি অনুসন্ধানকারী দল ঈসা আ.-কে ধরার জন্যে এসে উক্ত যুবককে ঈসা আ. মনে করে ধরে নিয়ে আসে ও তাকে হত্যা করে এবং ক্রুশবিদ্ধ করে। জনৈক শিষ্য ঈসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার পর বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনী ইসরাঈল তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা: (১) আল-ইয়াকুবিয়্যা: এ দল বিশ্বাস করে যে, এতদিন আল্লাহ স্বয়ং আমাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলেন, এখন তিনি আসমানে উঠে গিয়েছেন। (২) আল-নাসুতরিয়‍্যা এ দলের বিশ্বাস হল, আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে এতদিন ছিলেন, এখন তাঁকে আল্লাহ নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (৩) আল-মুসলিমুন : এ দলের মতে ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ছিল ততদিন তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। এখন তাঁকে আল্লাহর নিজের সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছেন। উক্ত তিন দলের মধ্যে কাফির দুই দল একত্র হয়ে মুসলিম দলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। ফলে মুসলিম দল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলার পর আল্লাহ মুহাম্মাদকে রসূলরূপে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এ দিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনে বলা হয়েছে “পরে আমি মুমিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়। ফলে তারা বিজয়ী হল।"

এ হাদীসটি সবচেয়ে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. আল্লাহর নিকট তাঁর মৃত্যুকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে দুআ করতেন, যাতে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারেন। দাওয়াতী কাজ সম্প্রসারণ করতে পারেন এবং অধিক পরিমাণ লোক যাতে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে পারে। ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে জানিয়ে দেন, অচিরেই তুমি দুনিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছ তখন তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। এ সময় তিনি হাওয়ারীগণকে দাওয়াত করেন। তাঁদের জন্যে খাদ্য প্রস্তুত করেন। তাঁদেরকে জানিয়ে দেন, রাত্রে তোমরা আমার নিকট আসবে, তোমাদের কাছে আমার প্রয়োজন আছে। হাওয়ারীগণ রাত্রে আসলে ঈসা আ. তাদেরকে নিজ হাতে খানা পরিবেশন করে খাওয়ান। আহার শেষে নিজেই তাঁদের হাত ধুয়ে দেন ও নিজের কাপড় দ্বারা তাঁদের হাত মুছে দেন। এ সব দেখে হাওয়ারীগণ আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং বিব্রত বোধ করলেন।

ঈসা আ. বললেন, দেখ, আমি যা কিছু করব কেউ যদি তার প্রতিবাদ করে তবে সে আমার শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তার কেউ নই। তখন তারা তা মেনে নিলেন। আর ঈসা আ. বললেন, আমি আজ রাত্রে তোমাদের সাথে যে আচরণ করলাম, তোমাদের সেবা করলাম, খাদ্য পরিবেশন করলাম, হাত ধুয়ে দিলাম, এ যেন তোমাদের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকে। তোমরা জানো, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না বরং নিজেকে অপরের চাইতে ছোট জ্ঞান করবে। তোমরা তো প্রত্যক্ষ করলে, কিভাবে আমি তোমাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। তোমরাও ঠিক এভাবে করবে, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করবে এবং মনে প্রাণে দুআ করবে যেন তিনি আমার মৃত্যুকে পিছিয়ে দেন।

ঈসা আ.-এর কথা শোনার পর হাওয়ারীগণ যখন দুআ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে দু'আ করতে বসলেন, তখন গভীর নিদ্রা তাঁদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ফলে তাঁরা দুআ করতে সমর্থ হলেন না। ঈসা আ. তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাবার চেষ্টা করেন এবং বলেন: কী আশ্চর্য! তোমরা কি মাত্র একটা রাত আমার জন্যে ধৈর্যধারণ করতে এবং আমাকে সাহায্য করতে পারবে না? তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি পারছি না, আমাদের এ কী হল? আমরা তো প্রতি দিন রাত্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জেগে থাকি, কথাবার্তা বলি; কিন্তু আজ রাত্রে তার কিছুই করতে পারছি না। যখনই দুআ করতে যাই তখনই ঘুম এসে মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন হযরত ঈসা আ. বললেন, রাখাল মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছে আর বকরীগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জাতীয় আরও বিভিন্ন কথা তিনি বলতে থাকেন এবং নিজের বিয়োগ ব্যথার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর ঈসা আ. বললেন আমি তোমাদেরকে একটি সত্য কথা বলছি— তোমাদের মধ্যে একজন আজ মোরগ ডাক দেওয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তোমাদের মধ্যে একজন সামান্য কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে শত্রুদের কাছে আমার সন্ধান বলে দেবে এবং আমার বিনিময়ে প্রাপ্তঅর্থ ভক্ষণ করবে। এরপর তারা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। এদিকে ইহুদিরা ঈসা আ.-কে সন্ধান করে ফিরছে। তারা শামউন নামক এক হওয়ারীকে ধরে বলল, এই ব্যক্তি ঈসার শিষ্য। কিন্তু সে অস্বীকার করে বলল, আমি ঈসার শিষ্য নই। এ কথা বললে, তারা শামউনকে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে তাকে অন্য ইহুদিরা পাকড়াও করলে সে পূর্বের মতো উত্তর দিয়ে আত্মরক্ষা করল।

এমন সময় ঈসা আ. হঠাৎ মোরগের ডাক শুনতে পান। মোরগের ডাক শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। প্রভাত হওয়ার পর জনৈক হাওয়ারী ইহুদিদের নিকট গিয়ে বলল, আমি যদি তোমাদেরকে ঈসা মাসীহর সন্ধান দিই, তা হলে তোমরা আমাকে কী পুরস্কার দিবে? ইহুদিরা তাকে ত্রিশটি দিরহাম দিল, বিনিময়ে সে তাদের নিকট তাঁর সন্ধান বলে দিল। কিন্তু এর পূর্বেই তাকে ঈসার অনুরূপ চেহারা দান করা হয় এবং তাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয়। ফলে তাকেই তারা পাকড়াও করে রশি দ্বারা শক্ত করে বাঁধল এবং একথা বলতে বলতে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গেল, তুমিই তো মৃতকে জীবিত করতে, জীন-ভূত তাড়াতে, পাগল মানুষকে সুস্থ করে দিতে। এখন এই রশির বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত কর দেখি! তারা তার ওপর থুথু নিক্ষেপ করল, দেহে কাঁটা ফুটাল এবং যেই ক্রুশে বিদ্ধ করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে তাকে নিয়ে আসল।

ইতঃমধ্যে ঈসা আ.-কে আল্লাহ নিজ সান্নিধ্যে তুলে নিলেন এবং ইহুদিরা ওই চেহারা পরিবর্তিত ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করল। ক্রুশের ওপর লাশ সাত দিন পর্যন্ত ঝুলে ছিল। এরপর ঈসা আ.-এর মা এবং অন্য এক মহিলা যে পাগল ছিল এবং যাকে ঈসা আ, সুস্থ করেছিলেন উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্রুশবিদ্ধ লোকটির কাছে আসলেন। তখন হযরত ঈসা আ.-তাঁদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কাঁদছেন কেন? তাঁরা বললেন, আমরা তো তোমার জন্যে কাঁদছি। ঈসা আ. বললেন, আমাকে আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং উত্তম অবস্থায় রেখেছেন আর এই যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে, তার ব্যাপারে ইহুদিরা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।

এরপর তিনি হাওয়ারীদের প্রতি নির্দেশ দিলেন যেন, অমুক স্থানে তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নির্দেশ মতে এগারজন হাওয়ারী সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। সেই এক হাওয়ারী অনুপস্থিত থাকে, যে ঈসাকে দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করেছিল এবং ইহুদিদেরকে তাঁর সন্ধান বলে দিয়েছিল; তার সম্পর্কে ঈসা আ. শিষ্যদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে তারা জানালো, সে তার কর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঈসা আ. বললেন, যদি সে তওবা করত তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করতেন। এরপর তিনি ইয়াহইয়া নামক সেই যুবকের কথা জিজ্ঞেস করলেন, যে তাদেরকে অনুসরণ করত। তিনি বললেন, সে তোমাদের সাথেই আছে। এরপর ঈসা আ. বললেন, তোমরা এখান থেকে চলে যাও। কেন না অচিরেই তোমরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলবে। সুতরাং তাদেরকে সতর্ক করবে এবং দীনের দাওয়াত দিবে।

ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া ইবনে হাবীবের সূত্রে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, মারিয়াম আ. ধারণা করেছিলেন, সে তাঁরই পুত্র। তাই তিনি ঘটনার সাত দিন পর বাদশার লোকদের নিকট গিয়ে লাশটি নামিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। তারা তাঁর আবেদনে সাড়া দেয় এবং সেখানেই লাশটি দাফন করা হয়। তারপর মারিয়াম আ. হযরত ইয়াহইয়া আ. মাকে বললেন: চল! আমরা মাসীহর কবর যিয়ারত করে আসি। উভয়ে রওনা হলেন। কবরের কাছাকাছি পৌঁছলে মারিয়াম আ. ইয়াহইয়া আ. এর মাকে বললেন, পর্দা কর! ইয়াহইয়ার মা বললেন, কার থেকে পর্দা করব? বললেন: কেন কবরের কাছে ওই যে লোকটিকে দেখা যায়, তার থেকে! ইয়াহইয়া আ. এর মা বললেন, কী বলছ? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! মারিয়াম আ. তখন ভাবছেন, ওনি জিবরাঈল ফিরিশতা হবেন। বস্তুত জিবরাঈল আ.-কে তিনি বহু পূর্বে দেখেছিলেন।

মোটকথা, ইয়াহইয়া আ. এর মাকে সেখানে রেখে মারিয়াম আ. কবরের কাছে গেলেন। কবরের নিকট গেলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! কোথায় যাচ্ছ? মারিয়াম আ. বললেন, মাসীহর কবর যিয়ারত করতে এবং তাঁকে সালাম জানাতে। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! এ তো মাসীহ নয়। তাঁকে তো আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন, কাফিরদের হাত থেকে তাঁকে পবিত্র করেছেন। তবে কবরবাসীকে মাসীহর আকৃতি বদলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। এর নিদর্শন হচ্ছে, ওই লোকটির পরিবারের লোকজন একে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছে না এবং তার কি হয়েছে তাও তারা জানে না; এর জন্যে তারা কেবল কান্নাকাটি করে ফিরছে। তুমি অমুক দিন অমুক বাগানের নিকট আসলে মাসীহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে। এ কথা বলে জিবরাঈল আ. সেখান থেকে প্রস্থান করেন। মারিয়াম আ. তার বোনের নিকট ফিরে এসে জিবরাঈল আ. এর ব্যাপারে জানালেন এবং বাগানের বিষয়টিও বললেন। নির্দিষ্ট দিনে মারিয়াম আ. সেই বাগানের নিকট গেলে সেখানে মাসীহকে দেখতে পান। ঈসা আ. মাকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসেন, মা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর মাথায় চুম্বন দেন। তিনি পূর্বের মত তাঁর জন্যে দুআ করেন। তারপর বলেন, মা! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে হত্যা করতে পারেনি, আল্লাহ আমাকে তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দিয়েছেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হবে। ধৈর্য ধরুন ও বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করুন। ঈসা আ. ঊর্ধ্বলোকে চলে গেলেন। এরপর মারিয়াম আ. সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ঈসার আর সাক্ষাৎ হয়নি। রাবী বলেন, ঈসা আ.-এর ঊর্ধ্ব্বারোহণের পরে তাঁর মা পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিপ্পান্ন বছর বয়সকালে তিনি ইনতিকাল করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ঈসা আ.-এর আয়ু

📄 হযরত ঈসা আ.-এর আয়ু


হাসান বসরী রহ. বলেছেন, যেদিন হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে নেওয়া হয় সেদিন পর্যন্ত তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। কেউ কেউ বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলি রাযি. থেকে বর্ণিত: হযরত ঈসা আ.-কে রমযান মাসের ২২ তারিখের রাত্রে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হযরত আলি রাযি.-ও শত্রুদের বর্শার আঘাত পাওয়ার ৫ দিন পর রমযানের ২২ তারিখ রাত্রে ইনতেকাল করেন।

যাহহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর নিকটবর্তী হয়। তিনি এর ওপর বসেন। মা মারিয়াম আ. সেখানে উপস্থিত হন। পুত্রকে বিদায় জানান ও কান্নাকাটি করেন। তারপরে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। মারিয়াম আ. তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকেন। ঊর্ধ্বে উঠার সময় হযরত ঈসা আ. তাঁর মাকে নিজের চাদরখানা দিয়ে যান এবং বলেন, এটি হবে কিয়ামতের দিনে আমার ও আপনার মধ্যে পরিচয়ের উপায়। শিষ্য শামউনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের পাগড়িটি নিক্ষেপ করেন। হযরত ঈসা আ. যখন ওপরের দিকে উঠতে থাকেন, তখন মারিয়াম আ. হাতের আঙ্গুল উঠিয়ে ইঙ্গিতে তাঁকে বিদায় জানাতে থাকেন। যতক্ষণ না তিনি চোখের আড়ালে চলে যান। হযরত মরিয়াম ঈসা আ.-কে অত্যধিক স্নেহ করতেন। কেন না পিতা না থাকার কারণে ঈসা আ. পিতামাতা উভয়ের ভালোবাসা মাকেই দিতেন। সফরে হোক কিংবা বাড়িতে হোক হযরত মারিয়াম আ. ঈসা আ.-কে সর্বদা কাছে রাখতেন। মুহূর্তের জন্যেও দূরে যেতে দিতেন না।

হাসান বসরী রহ. বলেছেন, যেদিন হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে নেওয়া হয় সেদিন পর্যন্ত তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। কেউ কেউ বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলি রাযি. থেকে বর্ণিত: হযরত ঈসা আ.-কে রমযান মাসের ২২ তারিখের রাত্রে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হযরত আলি রাযি.-ও শত্রুদের বর্শার আঘাত পাওয়ার ৫ দিন পর রমযানের ২২ তারিখ রাত্রে ইনতেকাল করেন।

যাহহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর নিকটবর্তী হয়। তিনি এর ওপর বসেন। মা মারিয়াম আ. সেখানে উপস্থিত হন। পুত্রকে বিদায় জানান ও কান্নাকাটি করেন। তারপরে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। মারিয়াম আ. তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকেন। ঊর্ধ্বে উঠার সময় হযরত ঈসা আ. তাঁর মাকে নিজের চাদরখানা দিয়ে যান এবং বলেন, এটি হবে কিয়ামতের দিনে আমার ও আপনার মধ্যে পরিচয়ের উপায়। শিষ্য শামউনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের পাগড়িটি নিক্ষেপ করেন। হযরত ঈসা আ. যখন ওপরের দিকে উঠতে থাকেন, তখন মারিয়াম আ. হাতের আঙ্গুল উঠিয়ে ইঙ্গিতে তাঁকে বিদায় জানাতে থাকেন। যতক্ষণ না তিনি চোখের আড়ালে চলে যান। হযরত মরিয়াম ঈসা আ.-কে অত্যধিক স্নেহ করতেন। কেন না পিতা না থাকার কারণে ঈসা আ. পিতামাতা উভয়ের ভালোবাসা মাকেই দিতেন। সফরে হোক কিংবা বাড়িতে হোক হযরত মারিয়াম আ. ঈসা আ.-কে সর্বদা কাছে রাখতেন। মুহূর্তের জন্যেও দূরে যেতে দিতেন না।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 মাহাত্ম্য ও চারিত্রিক গুণাবলী

📄 মাহাত্ম্য ও চারিত্রিক গুণাবলী


আল্লাহ পাক বলেন:

মাল মাসীহুবনু মারিয়ামা ইল্লা রসূলুন ক্বদ খলাত মিন ক্বাবলিহির রুসুলু অয়া উম্মুহু সিদ্দিকাহ।

"মারিয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মা সত্যনিষ্ঠ ছিল।" (সূরা মায়িদা: ৭৫)

মাসীহ অর্থ অত্যধিক ভ্রমণকারী। ঈসা আ.-এর প্রতি ইহুদিদের কঠোর শত্রুতা, মিথ্যা আরোপ এবং তাঁর ওপর ও তাঁর মায়ের ওপর অপবাদ দেওয়ার কারণে সৃষ্ট ফিৎনা ফাসাদ থেকে দীনকে রক্ষার জন্যে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সফরে কাটান। এ কারণে তাঁকে মাসীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেউ কেউ বলেন, তার পায়ের তলা সমতল থাকার কারণে হযরত ঈসা আ.-কে মাসীহ বলা হয়।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন: "এরপর আমি তাদের অনুগামী করেছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারিয়াম তনয় ঈসাকে আর তাঁকে দিয়েছিলাম ইনজীল।" (সূরা হাদীদ: ২৭)

আল্লাহর বাণী: "এবং মারিয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাঁকে শক্তিশালী করেছি।" (সূরা বাকারা: ৮৭)

এ সম্পর্কে কুরআনে প্রচুর আয়াত বিদ্যমান। ইতঃপূর্বে বুখারী ও মুসলিমে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এমন কোনো শিশু সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান পেটের পার্শ্বদেশে খোঁচা না দেয়। জন্মের সময় শয়তানের খোঁচার কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারিয়াম ও তাঁর পুত্র ঈসা আ.-এর ব্যতিক্রম। শয়তান তাঁকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল। কিন্তু তা না পেরে ঘরের পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়।

ইমাম বুখারী রহ. ইবরাহীম ইবনে মুনযিরের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ একচক্ষু বিশিষ্ট নন। শুনে রেখো, দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তাঁর চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের' মতো ভাসাভাসা। আমি এক রাতে স্বপ্নে আমাকে কাবার কাছে দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং-এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার চাইতেও বেশি সুন্দর ছিলেন তিনি। তাঁর মাথার সোজা চুলগুলো তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত ঝুলছিল। তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি দুজন লোকের কাঁধে হাত রেখে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওনি কে? তারা জবাব দিল, ওনি হলেন মাসীহ ইবনে মারিয়াম। তারপর তাঁর পেছনে আর একজন লোক দেখলাম। তাঁর মাথার চুল ছিল বেশি কোঁকড়ান, ডান চোখ কানা। আকৃতিতে সে আমার দেখা লোকদের মধ্যে ইবনে কাতানের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু কাঁধে ভর করে কাবার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই লোকটি কে? তারা বলল, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।

ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি হযরত উমর রাযি.-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিশয়োক্তি করো না। যেমনি ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. সম্পর্কে নাসারারা করেছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।'

এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন জন শিশু ব্যতীত আর কেউ দোলনায় কথা বলেন নি। (১) হযরত ঈসা (২) জুরাইজ নামে বনি ইসরাঈল এক ব্যক্তি। একবার সে নামাযরত থাকা অবস্থায় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকল। সে ভাবল, আমি কি ডাকে সাড়া দিব, না নামাযে নিমগ্ন থাকব। জবাব না পেয়ে তাঁর মা বলল, ইয়া আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর চেহারা না দেখা পর্যন্ত তুমি একে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তাঁর ইবাদতখানায় থাকতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা আসল। সে অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তাতে রাজী হলেন না। এরপর মহিলাটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাঁকে দিয়ে মনোবাসনা পূরণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, এটি কার সন্তান? স্ত্রীলোকটি বলল, জুরাইজের। লোকেরা তাঁর কাছে আসল এবং তাঁর ইবাদতখানাটি ভেঙে দিল। আর তাঁকে নিচে নামিয়ে আনল ও গালিগালাজ করল। তখন জুরাইজ ওযু করে নামায আদায় করলেন। এরপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল, অমুক রাখাল আমার পিতা। তখন বনি ইসরাঈলের লোকেরা জুরাইজকে বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। জুরাইজ বললেন না, তবে কাদা মাটি দিয়ে তৈরি কর দিতে পার। (৩) বনি ইসরাঈলের একজন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। মহিলাটি দুআ করল, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে তার মতো বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো করো না। এরপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের দুধ পান করতে লাগল। আবু হোরাইরা রাযি. বলেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি নিজের আঙ্গুল চুষে দেখাচ্ছেন। এরপর সেই মহিলাটির পাশ দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। মহিলাটি বলল, ইয়া আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মতো করো না। শিশুটি তৎক্ষণাৎ মায়ের স্তন ছেড়ে দিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো কর। মা জিজ্ঞেস করল, তা কেন? শিশুটি জবাব দিল, সেই আরোহী লোকটি ছিল বড় জালিম আর এ দাসীটিকে লোকে বলছে, তুমি চুরি করেছ, যেনা করেছ। অথচ সে এসবের কিছুই করেনি।

ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার বেশি নিকটতম। আর নবীগণ যেন পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই অর্থাৎ বাপ এক, মা ভিন্ন ভিন্ন। আমার ও ঈসার মাঝখানে কোনো নবী নেই। তবে ইমাম আহমদ রহ.-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা পুনরায় দুনিয়ায় অবতরণ করবেন। যখন তাঁকে দেখবে, তখন তোমরা চিনতে পারবে। কেন না, তিনি হবেন মাঝারি গড়নের। গায়ের রং লালচে সাদা। মাথার চুল সোজা। মনে হবে যেন মাথার চুল থেকে পানি টপকে পড়ছে। যদিও তিনি পানি স্পর্শ করেননি। তিনি এসে ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর রহিত করবেন। একমাত্র ইসলাম ছাড়া সে যুগের সকল ধর্ম ও মতবাদ খতম করবেন। আল্লাহ তাঁর হাতে মিথ্যুক মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন।

সমস্ত পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তায় ভরে যাবে। এমনকি উট ও সিংহ, বাঘ ও গরু এবং নেকড়ে ও বকরী একই সাথে একই মাঠে বিচরণ করবে। কিশোর বালকগণ সাপের সাথে খেলা করবে। কিন্তু কেউ কারও ক্ষতি করবে না। যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা ততদিন তিনি পৃথিবীতে থাকবেন। তারপর তিনি স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়বে। হিশাম ইবনে উরওয়া আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ. পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ.-এর পুনরায় দুনিয়ায় আগমন কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ। দামিশকের শুভ্র মিনারের ওপর তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন অবতরণ করবেন, তখন ফজরের নামাযের ইকামত হতে থাকবে। তাঁকে দেখে মুসলমানদের ইমাম বলবেন, হে রুহুল্লাহ! সম্মুখে আসুন ও নামাযের ইমামতি করুন! ঈসা আ. বলবেন, "না, আপনারা একে অন্যের ওপর নেতা! এ সম্মান আল্লাহ এ উম্মতকেই দান করেছেন।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. ইমাম সাহেবকে বলবেন, আপনিই ইমামতি করুন। কেন না আপনার জন্যে ইকামত দেওয়া হয়েছে।

এরপর উক্ত ইমামের পেছনে তিনি নামায আদায় করবেন। নামায শেষে তিনি বাহনে আরোহণ করে দাজ্জালের সন্ধানে বের হবেন এবং মুসলমানরা তাঁর সাথে থাকবেন। দাজ্জালকে লুদ তোরণের নিকট পেয়ে সেখানেই তিনি নিজ হাতে তাঁকে হত্যা করবেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, দামিশকের পূর্ব পার্শ্বে এ মিনার যখন শুভ্র পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয় তখনই দৃঢ় আশা করা হয়েছিল, এখানেই তিনি অবতরণ করবেন। এ স্থানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর নাসারাদের অর্থ দ্বারাই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঈসা আ. এখানে অবতরণ করে শূকর নিধন করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে চুরমার করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন তিনি গ্রাহ্য করবেন না।

ঈসা আ. রাওহা থেকে হজ কিংবা উমরা অথবা উভয়টির নিয়ত করে বের হবেন এবং তা সম্পন্ন করবেন। চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর তিনি ইনতিকাল করবেন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রথম দুই খলীফার নিকট দাফন করা হবে। এ সম্পর্কে ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ঈসা আ.-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণিত মারফু হাদীসে উল্লেখ করেছেন, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা শরীফের মধ্যে রাসূলুল্লাহ, আবূ বকর ও উমরের সাথে দাফন করা হবে। কিন্তু এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ নয়। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আছে, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাফন করা হবে। এ হাদীসের অন্যতম রাবী মওদূদ মাদানী বলেন, রাসূলুল্লাহ এর হুজরায় একটি কবর পরিমাণ স্থান খালি আছে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমার মতে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে নবুয়তের বিরতিকাল ছয় শ' বছর। কাতাদার মতে, পাঁচ শ ষাট বছর। কারও মতে পাঁচ শ' চল্লিশ বছর। যাই হোক, চার শ' ত্রিশ বছরের কিছু বেশি কিন্তু প্রসিদ্ধ মত ছয় শ' বছর। তবে কেউ কেউ বলেছেন, চান্দ্র বছরের হিসেবে ছয় শ' বিশ বছর এবং সৌর বছর হিসেবে ছয় শ' বছর।

ইবনে হিব্বান তাঁর সহি গ্রন্থে ঈসা আ.-এর উম্মতগণ কত দিন সঠিক দীনের ওপর ও নবীর আদর্শের ওপর টিকেছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ দাউদ নবীকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মৃত্যু দেন। কিন্তু এতে তাঁর অনুসারীরা বিপথগামীও হয়নি, দীনও পরিবর্তন করেনি। আর ঈসা আ. অনুসারীরা তাঁর বিদায়ের পরে ২শ বছর তাঁর নীতি ও আদর্শের ওপর টিকে ছিল। ইবনে হিব্বান এ হাদীসকে সহি বললেও মূলত এর সনদ গরিব পর্যায়ের। ইবনে জারীর রহ. মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পূর্বে তিনি হাওয়ারীগণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন মানুষকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে থাকে। তিনি তাঁদের প্রত্যেককে সিরিয়া ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জনগোষ্ঠীর এক এক এলাকা দাওয়াতী কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।

বর্ণনাকারীগণ বলেছেন, যে এলাকায় যে হাওয়ারীকে নিয়োগ করা হয়েছিল, তিনি সেই এলাকার অধিবাসীদের সাথে তাঁদের নিজ ভাষায় কথা বলতেন। অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, হযরত ঈসা আ.-এর নিকট থেকে চার জন লোক ইনজীল উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা হলেন লুক, মথি, মার্কস (মার্ক) ও ইউহান্না (যোহন)। কিন্তু এ ইনজীল চতুষ্টয়ের মধ্যে একটির সাথে আর একটির যথেষ্ট গরমিল বিদ্যমান। একটির মধ্যে বেশি তো আর একটিতে কম। উক্ত চার জনের মধ্যে মথি ও ইউহান্না হযরত ঈসা আ. এর যুগের এবং তারা তাঁকে দেখেছিলেন। মার্কস ও লুক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ঈসা আ.-এর শিষ্যদের শিষ্য। তবে তাঁরা মাসীহর ওপর যথার্থ ঈমান আনেন ও তাঁকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন।

দামিশকের এক ব্যক্তি ঈসা আ. ওপর ঈমান আনেন, তাঁর নাম যায়ন। তবে তিনি পোল নামক জনৈক ইহুদির ভয়ে দামিশকের পূর্ব গেটে গীর্জার নিকটে একটি গুহায় আত্মগোপন করে থাকেন। উক্ত ইহুদি অত্যাচারী ও ঈসা আ.-এর ওপর ঈমান আনার কারণে সে তাঁর মাথার চুল মুড়িয়ে দেয়। শহরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরায় এবং পাথর মেরে তাঁকে হত্যা করে। একদিন সে শুনতে পেল ঈসা আ. দামিশক অভিমুখে রওনা হয়েছেন। তখন সে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খচ্চরে আরোহণ করে সেদিকে বেরিয়ে পড়ল। কাওকাব নামক স্থানে পৌঁছে সে ঈসা আ.-কে দেখতে পেল। ঈসা আ.-এর শিষ্যদের দিকে অগ্রসর হতেই এক ফেরেশতা এসে পাখা দিয়ে আঘাত করে তাঁর চোখ কানা করে দিলেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁর অন্তরে ঈসা আ.-এর প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। তখন সে ঈসা আ.-এর নিকট গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ঈমান আনে ঈসা আ. তাঁর ঈমান গ্রহণ করলেন। এরপর সে ঈসা আ.-কে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে অনুরোধ করল, যাতে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। ঈসা আ. বললেন, তুমি যায়ন-এর কাছে ফিরে যাও। দামিশকের পূর্ব প্রান্তে লম্বা বাজারের পার্শ্বে তাঁকে পাবে। সে তোমার জন্যে দুআ করবে। ঈসা আ.-এর কথামতো সে সেখানে এসে যায়নকে পেল। যায়ন তার জন্যে দুআ করলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। পোল আন্তরিকভাবে ঈসা আ. এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তিনি তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নামে দামিশকে একটি গীর্জা তৈরি করা হয়। পোলের গীর্জা নামে খ্যাত এ গীর্জাটি সাহাবাদের যুগে দামিশক বিজয়কালেও বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে এটা ধ্বংস হয়ে যায়।

আল্লাহ পাক বলেন:

মাল মাসীহুবনু মারিয়ামা ইল্লা রসূলুন ক্বদ খলাত মিন ক্বাবলিহির রুসুলু অয়া উম্মুহু সিদ্দিকাহ।

"মারিয়াম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মা সত্যনিষ্ঠ ছিল।" (সূরা মায়িদা: ৭৫)

মাসীহ অর্থ অত্যধিক ভ্রমণকারী। ঈসা আ.-এর প্রতি ইহুদিদের কঠোর শত্রুতা, মিথ্যা আরোপ এবং তাঁর ওপর ও তাঁর মায়ের ওপর অপবাদ দেওয়ার কারণে সৃষ্ট ফিৎনা ফাসাদ থেকে দীনকে রক্ষার জন্যে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় সফরে কাটান। এ কারণে তাঁকে মাসীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়। কেউ কেউ বলেন, তার পায়ের তলা সমতল থাকার কারণে হযরত ঈসা আ.-কে মাসীহ বলা হয়।

অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন: "এরপর আমি তাদের অনুগামী করেছিলাম আমার রাসূলগণকে এবং অনুগামী করেছিলাম মারিয়াম তনয় ঈসাকে আর তাঁকে দিয়েছিলাম ইনজীল।" (সূরা হাদীদ: ২৭)

আল্লাহর বাণী: "এবং মারিয়াম-তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র আত্মা দ্বারা তাঁকে শক্তিশালী করেছি।" (সূরা বাকারা: ৮৭)

এ সম্পর্কে কুরআনে প্রচুর আয়াত বিদ্যমান। ইতঃপূর্বে বুখারী ও মুসলিমে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, এমন কোনো শিশু সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান পেটের পার্শ্বদেশে খোঁচা না দেয়। জন্মের সময় শয়তানের খোঁচার কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারিয়াম ও তাঁর পুত্র ঈসা আ.-এর ব্যতিক্রম। শয়তান তাঁকে খোঁচা মারতে গিয়েছিল। কিন্তু তা না পেরে ঘরের পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়।

ইমাম বুখারী রহ. ইবরাহীম ইবনে মুনযিরের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকজনের সামনে মাসীহ দাজ্জালের কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, আল্লাহ একচক্ষু বিশিষ্ট নন। শুনে রেখো, দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তাঁর চোখ যেন ফুলে যাওয়া আঙ্গুরের' মতো ভাসাভাসা। আমি এক রাতে স্বপ্নে আমাকে কাবার কাছে দেখলাম। হঠাৎ সেখানে বাদামী রং-এর এক ব্যক্তিকে দেখলাম। তোমরা যেমন সুন্দর বাদামী রঙের লোক দেখে থাক তার চাইতেও বেশি সুন্দর ছিলেন তিনি। তাঁর মাথার সোজা চুলগুলো তাঁর দু'কাঁধ পর্যন্ত ঝুলছিল। তাঁর মাথা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি দুজন লোকের কাঁধে হাত রেখে কা'বা শরীফ তাওয়াফ করছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওনি কে? তারা জবাব দিল, ওনি হলেন মাসীহ ইবনে মারিয়াম। তারপর তাঁর পেছনে আর একজন লোক দেখলাম। তাঁর মাথার চুল ছিল বেশি কোঁকড়ান, ডান চোখ কানা। আকৃতিতে সে আমার দেখা লোকদের মধ্যে ইবনে কাতানের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সে একজন লোকের দু কাঁধে ভর করে কাবার চারদিকে ঘুরছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই লোকটি কে? তারা বলল, এ হল মাসীহ দাজ্জাল।

ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি হযরত উমর রাযি.-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিশয়োক্তি করো না। যেমনি ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. সম্পর্কে নাসারারা করেছিল। আমি তো আল্লাহর বান্দা মাত্র। সুতরাং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।'

এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন জন শিশু ব্যতীত আর কেউ দোলনায় কথা বলেন নি। (১) হযরত ঈসা (২) জুরাইজ নামে বনি ইসরাঈল এক ব্যক্তি। একবার সে নামাযরত থাকা অবস্থায় তাঁর মা এসে তাঁকে ডাকল। সে ভাবল, আমি কি ডাকে সাড়া দিব, না নামাযে নিমগ্ন থাকব। জবাব না পেয়ে তাঁর মা বলল, ইয়া আল্লাহ! ব্যভিচারিণীর চেহারা না দেখা পর্যন্ত তুমি একে মৃত্যু দিও না। জুরাইজ তাঁর ইবাদতখানায় থাকতেন। একবার তাঁর কাছে এক মহিলা আসল। সে অসৎ উদ্দেশ্যে তাঁর সাথে কথা বলল। কিন্তু জুরাইজ তাতে রাজী হলেন না। এরপর মহিলাটি একজন রাখালের নিকট গেল এবং তাঁকে দিয়ে মনোবাসনা পূরণ করল। পরে সে একটি পুত্র সন্তান প্রসব করল। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, এটি কার সন্তান? স্ত্রীলোকটি বলল, জুরাইজের। লোকেরা তাঁর কাছে আসল এবং তাঁর ইবাদতখানাটি ভেঙে দিল। আর তাঁকে নিচে নামিয়ে আনল ও গালিগালাজ করল। তখন জুরাইজ ওযু করে নামায আদায় করলেন। এরপর নবজাত শিশুটির নিকট এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে শিশু! তোমার পিতা কে? সে জবাব দিল, অমুক রাখাল আমার পিতা। তখন বনি ইসরাঈলের লোকেরা জুরাইজকে বলল, আমরা আপনার ইবাদতখানাটি সোনা দিয়ে তৈরি করে দিচ্ছি। জুরাইজ বললেন না, তবে কাদা মাটি দিয়ে তৈরি কর দিতে পার। (৩) বনি ইসরাঈলের একজন মহিলা তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিল। তার কাছ দিয়ে একজন সুদর্শন পুরুষ আরোহী চলে গেল। মহিলাটি দুআ করল, ইয়া আল্লাহ! আমার ছেলেটিকে তার মতো বানাও। শিশুটি তখনই তার মায়ের স্তন ছেড়ে দিল এবং আরোহীর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো করো না। এরপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের দুধ পান করতে লাগল। আবু হোরাইরা রাযি. বলেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পাচ্ছি, তিনি নিজের আঙ্গুল চুষে দেখাচ্ছেন। এরপর সেই মহিলাটির পাশ দিয়ে একটি দাসী চলে গেল। মহিলাটি বলল, ইয়া আল্লাহ! আমার শিশুটিকে এর মতো করো না। শিশুটি তৎক্ষণাৎ মায়ের স্তন ছেড়ে দিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ! আমাকে তার মতো কর। মা জিজ্ঞেস করল, তা কেন? শিশুটি জবাব দিল, সেই আরোহী লোকটি ছিল বড় জালিম আর এ দাসীটিকে লোকে বলছে, তুমি চুরি করেছ, যেনা করেছ। অথচ সে এসবের কিছুই করেনি।

ইমাম বুখারী রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি মারিয়ামের পুত্র ঈসার বেশি নিকটতম। আর নবীগণ যেন পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই অর্থাৎ বাপ এক, মা ভিন্ন ভিন্ন। আমার ও ঈসার মাঝখানে কোনো নবী নেই। তবে ইমাম আহমদ রহ.-এর বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কিয়ামতের পূর্বে ঈসা পুনরায় দুনিয়ায় অবতরণ করবেন। যখন তাঁকে দেখবে, তখন তোমরা চিনতে পারবে। কেন না, তিনি হবেন মাঝারি গড়নের। গায়ের রং লালচে সাদা। মাথার চুল সোজা। মনে হবে যেন মাথার চুল থেকে পানি টপকে পড়ছে। যদিও তিনি পানি স্পর্শ করেননি। তিনি এসে ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন। জিযিয়া কর রহিত করবেন। একমাত্র ইসলাম ছাড়া সে যুগের সকল ধর্ম ও মতবাদ খতম করবেন। আল্লাহ তাঁর হাতে মিথ্যুক মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন।

সমস্ত পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তায় ভরে যাবে। এমনকি উট ও সিংহ, বাঘ ও গরু এবং নেকড়ে ও বকরী একই সাথে একই মাঠে বিচরণ করবে। কিশোর বালকগণ সাপের সাথে খেলা করবে। কিন্তু কেউ কারও ক্ষতি করবে না। যতদিন আল্লাহর ইচ্ছা ততদিন তিনি পৃথিবীতে থাকবেন। তারপর তিনি স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করবেন এবং মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়বে। হিশাম ইবনে উরওয়া আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ. পৃথিবীতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ঈসা আ.-এর পুনরায় দুনিয়ায় আগমন কিয়ামতের অন্যতম লক্ষণ। দামিশকের শুভ্র মিনারের ওপর তিনি অবতরণ করবেন। তিনি যখন অবতরণ করবেন, তখন ফজরের নামাযের ইকামত হতে থাকবে। তাঁকে দেখে মুসলমানদের ইমাম বলবেন, হে রুহুল্লাহ! সম্মুখে আসুন ও নামাযের ইমামতি করুন! ঈসা আ. বলবেন, "না, আপনারা একে অন্যের ওপর নেতা! এ সম্মান আল্লাহ এ উম্মতকেই দান করেছেন।" অন্য বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. ইমাম সাহেবকে বলবেন, আপনিই ইমামতি করুন। কেন না আপনার জন্যে ইকামত দেওয়া হয়েছে।

এরপর উক্ত ইমামের পেছনে তিনি নামায আদায় করবেন। নামায শেষে তিনি বাহনে আরোহণ করে দাজ্জালের সন্ধানে বের হবেন এবং মুসলমানরা তাঁর সাথে থাকবেন। দাজ্জালকে লুদ তোরণের নিকট পেয়ে সেখানেই তিনি নিজ হাতে তাঁকে হত্যা করবেন। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, দামিশকের পূর্ব পার্শ্বে এ মিনার যখন শুভ্র পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয় তখনই দৃঢ় আশা করা হয়েছিল, এখানেই তিনি অবতরণ করবেন। এ স্থানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর নাসারাদের অর্থ দ্বারাই এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঈসা আ. এখানে অবতরণ করে শূকর নিধন করবেন। ক্রুশ ভেঙ্গে চুরমার করবেন এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন তিনি গ্রাহ্য করবেন না।

ঈসা আ. রাওহা থেকে হজ কিংবা উমরা অথবা উভয়টির নিয়ত করে বের হবেন এবং তা সম্পন্ন করবেন। চল্লিশ বছর জীবিত থাকার পর তিনি ইনতিকাল করবেন। তাঁকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর প্রথম দুই খলীফার নিকট দাফন করা হবে। এ সম্পর্কে ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে ঈসা আ.-এর বর্ণনা প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণিত মারফু হাদীসে উল্লেখ করেছেন, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুজরা শরীফের মধ্যে রাসূলুল্লাহ, আবূ বকর ও উমরের সাথে দাফন করা হবে। কিন্তু এ হাদীসের সনদ বিশুদ্ধ নয়। ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী, আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাযি. থেকে বর্ণনা করেন যে, তাওরাত কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আছে, হযরত ঈসা আ.-কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দাফন করা হবে। এ হাদীসের অন্যতম রাবী মওদূদ মাদানী বলেন, রাসূলুল্লাহ এর হুজরায় একটি কবর পরিমাণ স্থান খালি আছে। ইমাম তিরমিযী রহ. এ হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম বুখারী রহ. বলেন, আমার মতে এ হাদীসটি বিশুদ্ধ নয়। ইমাম বুখারী সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে নবুয়তের বিরতিকাল ছয় শ' বছর। কাতাদার মতে, পাঁচ শ ষাট বছর। কারও মতে পাঁচ শ' চল্লিশ বছর। যাই হোক, চার শ' ত্রিশ বছরের কিছু বেশি কিন্তু প্রসিদ্ধ মত ছয় শ' বছর। তবে কেউ কেউ বলেছেন, চান্দ্র বছরের হিসেবে ছয় শ' বিশ বছর এবং সৌর বছর হিসেবে ছয় শ' বছর।

ইবনে হিব্বান তাঁর সহি গ্রন্থে ঈসা আ.-এর উম্মতগণ কত দিন সঠিক দীনের ওপর ও নবীর আদর্শের ওপর টিকেছিল সে সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ দাউদ নবীকে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মৃত্যু দেন। কিন্তু এতে তাঁর অনুসারীরা বিপথগামীও হয়নি, দীনও পরিবর্তন করেনি। আর ঈসা আ. অনুসারীরা তাঁর বিদায়ের পরে ২শ বছর তাঁর নীতি ও আদর্শের ওপর টিকে ছিল। ইবনে হিব্বান এ হাদীসকে সহি বললেও মূলত এর সনদ গরিব পর্যায়ের। ইবনে জারীর রহ. মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে লিখেছেন, ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়ার পূর্বে তিনি হাওয়ারীগণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন মানুষকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকতে থাকে। তিনি তাঁদের প্রত্যেককে সিরিয়া ও প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জনগোষ্ঠীর এক এক এলাকা দাওয়াতী কাজের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।

বর্ণনাকারীগণ বলেছেন, যে এলাকায় যে হাওয়ারীকে নিয়োগ করা হয়েছিল, তিনি সেই এলাকার অধিবাসীদের সাথে তাঁদের নিজ ভাষায় কথা বলতেন। অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, হযরত ঈসা আ.-এর নিকট থেকে চার জন লোক ইনজীল উদ্ধৃত করেছেন। তাঁরা হলেন লুক, মথি, মার্কস (মার্ক) ও ইউহান্না (যোহন)। কিন্তু এ ইনজীল চতুষ্টয়ের মধ্যে একটির সাথে আর একটির যথেষ্ট গরমিল বিদ্যমান। একটির মধ্যে বেশি তো আর একটিতে কম। উক্ত চার জনের মধ্যে মথি ও ইউহান্না হযরত ঈসা আ. এর যুগের এবং তারা তাঁকে দেখেছিলেন। মার্কস ও লুক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না বরং তাঁরা ছিলেন ঈসা আ.-এর শিষ্যদের শিষ্য। তবে তাঁরা মাসীহর ওপর যথার্থ ঈমান আনেন ও তাঁকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন।

দামিশকের এক ব্যক্তি ঈসা আ. ওপর ঈমান আনেন, তাঁর নাম যায়ন। তবে তিনি পোল নামক জনৈক ইহুদির ভয়ে দামিশকের পূর্ব গেটে গীর্জার নিকটে একটি গুহায় আত্মগোপন করে থাকেন। উক্ত ইহুদি অত্যাচারী ও ঈসা আ.-এর ওপর ঈমান আনার কারণে সে তাঁর মাথার চুল মুড়িয়ে দেয়। শহরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরায় এবং পাথর মেরে তাঁকে হত্যা করে। একদিন সে শুনতে পেল ঈসা আ. দামিশক অভিমুখে রওনা হয়েছেন। তখন সে তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খচ্চরে আরোহণ করে সেদিকে বেরিয়ে পড়ল। কাওকাব নামক স্থানে পৌঁছে সে ঈসা আ.-কে দেখতে পেল। ঈসা আ.-এর শিষ্যদের দিকে অগ্রসর হতেই এক ফেরেশতা এসে পাখা দিয়ে আঘাত করে তাঁর চোখ কানা করে দিলেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তাঁর অন্তরে ঈসা আ.-এর প্রতি বিশ্বাস জন্মায়। তখন সে ঈসা আ.-এর নিকট গিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে ঈমান আনে ঈসা আ. তাঁর ঈমান গ্রহণ করলেন। এরপর সে ঈসা আ.-কে তাঁর চক্ষুদ্বয়ের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে অনুরোধ করল, যাতে আল্লাহ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। ঈসা আ. বললেন, তুমি যায়ন-এর কাছে ফিরে যাও। দামিশকের পূর্ব প্রান্তে লম্বা বাজারের পার্শ্বে তাঁকে পাবে। সে তোমার জন্যে দুআ করবে। ঈসা আ.-এর কথামতো সে সেখানে এসে যায়নকে পেল। যায়ন তার জন্যে দুআ করলে সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। পোল আন্তরিকভাবে ঈসা আ. এর প্রতি ঈমান এনেছিলেন, তিনি তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করতেন। তাঁর নামে দামিশকে একটি গীর্জা তৈরি করা হয়। পোলের গীর্জা নামে খ্যাত এ গীর্জাটি সাহাবাদের যুগে দামিশক বিজয়কালেও বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে এটা ধ্বংস হয়ে যায়।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বেথেলহাম ও কুমামার ভিত্তি স্থাপন

📄 বেথেলহাম ও কুমামার ভিত্তি স্থাপন


হযরত ঈসা মাসীহ আ. যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে স্থানে সম্রাট কনষ্টান্টাইন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম রাখা হয় বায়তু লাহাম (বেথেলহাম)। অপর দিকে সম্রাটের মা হায়লানা কথিত ক্রুশবিদ্ধ ঈসার কবরের ওপর আর একটি প্রাসাদ তৈরি করেন, যার নাম রাখা হয় কুমামা। ইহুদিদের প্রচারণায় পড়ে তাঁরাও বিশ্বাস করত, নবী ঈসা মাসীহ আ.কেই ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এ মত পোষণকারী পূর্বের পরের সকলেই কাফের। এরা বিভিন্ন রকম মনগড়া বিধি-বিধান ও আইন-কানুন তৈরি করে। এসব বিধানের মধ্যে ছিল পুরাতন নিয়ম তথা তাওরাতের বিরোধিতা করা। তাঁরা তাওরাতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তুকে হালাল করে নেয়, যেমন শূকর খাওয়া। তাঁরা পূর্বমুখী হয়ে উপাসনা করা। অথচ ঈসা মাসীহ বায়ুতল মুকাদ্দাসের শুভ্র পাথরের দিকে মুখ করা ছাড়া ইবাদত করতেন না। শুধু তিনিই নন বরং মূসা আ.-এর পরবর্তী সকল নবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেছেন। এমনকি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে নামায আদায় করেছেন। পরে তিনি আল্লাহর হুকুমে ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন। তাঁরা গির্জাগুলোতে মূর্তি স্থাপন করে। অথচ ইতোপূর্বে গির্জায় কখনো কোনো মূর্তি রাখা হত না। তাঁরা এমন সব আকিদা তৈরি করে, যা শিশু, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বিশ্বাস করত। এ আকিদার নাম ছিল 'আমান'। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল সম্পূর্ণ কুফরি আকিদা ও বিশ্বাসভঙ্গের নামান্তর।

হযরত ঈসা মাসীহ আ. যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে স্থানে সম্রাট কনষ্টান্টাইন একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন, যার নাম রাখা হয় বায়তু লাহাম (বেথেলহাম)। অপর দিকে সম্রাটের মা হায়লানা কথিত ক্রুশবিদ্ধ ঈসার কবরের ওপর আর একটি প্রাসাদ তৈরি করেন, যার নাম রাখা হয় কুমামা। ইহুদিদের প্রচারণায় পড়ে তাঁরাও বিশ্বাস করত, নবী ঈসা মাসীহ আ.কেই ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এ মত পোষণকারী পূর্বের পরের সকলেই কাফের। এরা বিভিন্ন রকম মনগড়া বিধি-বিধান ও আইন-কানুন তৈরি করে। এসব বিধানের মধ্যে ছিল পুরাতন নিয়ম তথা তাওরাতের বিরোধিতা করা। তাঁরা তাওরাতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম বস্তুকে হালাল করে নেয়, যেমন শূকর খাওয়া। তাঁরা পূর্বমুখী হয়ে উপাসনা করা। অথচ ঈসা মাসীহ বায়ুতল মুকাদ্দাসের শুভ্র পাথরের দিকে মুখ করা ছাড়া ইবাদত করতেন না। শুধু তিনিই নন বরং মূসা আ.-এর পরবর্তী সকল নবী বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামায আদায় করেছেন। এমনকি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হিজরতের পরে ষোল কিংবা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলা করে নামায আদায় করেছেন। পরে তিনি আল্লাহর হুকুমে ইবরাহীম খলীল আ. কর্তৃক নির্মিত কাবা ঘরের দিকে ফিরে নামায পড়েন। তাঁরা গির্জাগুলোতে মূর্তি স্থাপন করে। অথচ ইতোপূর্বে গির্জায় কখনো কোনো মূর্তি রাখা হত না। তাঁরা এমন সব আকিদা তৈরি করে, যা শিশু, মহিলা ও পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই বিশ্বাস করত। এ আকিদার নাম ছিল 'আমান'। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল সম্পূর্ণ কুফরি আকিদা ও বিশ্বাসভঙ্গের নামান্তর।

ফন্ট সাইজ
15px
17px