📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আসমানি খাদ্য

📄 আসমানি খাদ্য


আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ইয ক্বালা আল-হাওয়ারিইউনা ইয়া ঈসা ইবনা মারিয়ামা হাল ইয়াস্তাতিউ রব্বুকা আই ইয়ুনানযিলা আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই ক্বালা ইত্তাকুল্লাহ ইন কুনতুম মুমিনীন (১১২) ক্বালু নুরীদু আন নাকুলা মিনহা অয় তাতমাইননা ক্বুলুবুনা অয়া নালামা আন ক্বদ সাদাক্বতানা অয়া নাকুনা আলাইহা মিনাশ শাহিদীন (১১৩) ক্বালা ঈসা ইবনু মারিয়ামা আল্লাহুম্মা রব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই তাকুনু লানা ঈদান লিআওয়ালিনা অয়া আখিরিনা অয়া আয়াতাম মিনকা অয়ারযুক্বনা অয়া আনতা খইরুর রজি ক্বীন (১১৪) ক্বালািল্লাহু ইন্নী মুনানযিলুহা আলাইকুম ফামাই ইয়াকফুর বাদু মিনকুম ফাইন্নী আআয্যিবুহু আযাবাল লা আআয্যিবুহু আহাদাম মিনাল আলামীন

"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলেছিল, হে মারিয়াম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) প্রেরণ করতে সক্ষম? সে বলেছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। তারা বলেছিল, আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাব এবং আমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলেছ এবং আমরা এর সাক্ষী থাকতে চাই। মারিয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; এটা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্যে হবে আনন্দ-উৎসব স্বরূপ ও তোমার নিকট হতে নিদর্শন। এবং আমাদেরকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বললেন, আমিই তোমাদের নিকট এটা প্রেরণ করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরী করলে তাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকেও দিব না।" (সূরা মায়িদা: ১১২-১১৫)

তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় খাঞ্চা অবতরণ প্রসঙ্গে সেই সব হাদীসে উল্লেখ আছে যা হযরত ইবনে আব্বাস, সালমান ফারসী, ইবনে ইয়াসির প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ:

হযরত ঈসা আ. হাওয়ারীগণকে ত্রিশ দিন রোযা পালনের নির্দেশ দেন। তারা ত্রিশ দিন সওম পালন শেষে হযরত ঈসা আ.-এর নিকট আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবদার জানায়। উদ্দেশ্য ছিল তারা আল্লাহর প্রেরিত এ খাদ্য আহার করবে। তাদের রোযা ও দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন এ ব্যাপারে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করবে, সওমের মেয়াদ শেষে রোযা ভঙ্গের দিনে ঈদ উৎসব পালন করবে, তাদের পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষ এবং ধনী ও দরিদ্র সকলের জন্যে তা আনন্দের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।

ঈসা আ. এ ব্যাপারে তাদেরকে অনেক উপদেশ দিলেন। তাঁর আশঙ্কা হল, এরা আল্লাহর এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে এবং এর শর্তাদি পূরণ করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু তারা তাদের আবদার পূরণ না হওয়া পর্যন্ত উপদেশ শুনতে প্রস্তুত হল না। অবশেষে তাদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করতে প্রস্তুত হন। তিনি নামাযে দণ্ডায়মান হলেন। পশম ও চুলের তৈরি কম্বল পরিধান করলেন এবং অবনত মস্তকে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলেন। তিনি আল্লাহর নিকট কাকুতি-মিনতি করে দুআ করলেন, যেন তাদের প্রার্থীত জিনিস তিনি দিয়ে দেন। সুতরাং আল্লাহ আসমান থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন।

মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, দুটি মেঘের মাঝখান থেকে খাঞ্চাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। খাঞ্চাটি যতই পৃথিবীর নিকটবর্তী হচ্ছিল, ততই হযরত ঈসা আ. বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দুআ করছিলেন, "হে আল্লাহ! একে তুমি রহমত বরকত ও শান্তি হিসেবে দান কর। শাস্তি হিসেবে দিও না।" খাঞ্চাটি ক্রমান্বয়ে নেমে এসে একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সম্মুখে মাটির ওপর থামল। খাঞ্চাটি ছিল রুমাল দিয়ে ঢাকা। ঈসা আ. 'বিসমিল্লাহি খায়রুর রাজিক্বীন' বলে রুমালখানা উঠালেন। দেখলেন তাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি আছে। কেউ বলেছেন, এর সাথে সিরকা ছিল। কেউ বলেছেন, ডালিম এবং ফল ফলাদিও ছিল। উক্ত খাদ্য দ্রব্যগুলো ছিল অত্যন্ত সুগন্ধিময়। আল্লাহ বলেছিলেন, 'হও' আর তাতেই তা হয়ে গিয়েছিল।

তারপর ঈসা আ. তাদেরকে খাওয়ার জন্যে আহবান করেন। তারা বলল, আপনি প্রথমে খাওয়া আরম্ভ করুন তারপরে আমরা খাব। হযরত ঈসা আ. বললেন, এ খাঞ্চার জন্যে তোমরাই প্রথমে আবেদন করেছিলে; কিন্তু প্রথমে খেতে তারা কিছুতেই রাজি হল না। হযরত ঈসা আ. তখন ফকীর, মিসকীন, অভাবগ্রস্ত রোগাক্রান্ত ও পঙ্গুদেরকে খাওয়ার আদেশ দেন। এ জাতীয় লোকদের সংখ্যা ছিল তেরশ'। সকলেই তা থেকে খেল। ফলে দুঃখ-দুর্দশা ও রোগ-শোক যার যে সমস্যা ছিল, এ খাদ্যের বরকতে তা থেকে সে নিরাময় লাভ করল। যারা খেতে অস্বীকার করেছিল তা দেখে তারা খুবই লজ্জিত হল ও অনুশোচনা করতে লাগল। কথিত আছে, এ খাঞ্চা প্রতিদিন একবার করে আসত। লোক এ থেকে তৃপ্তি সহকারে আহার করত। খাদ্য একটুও হ্রাস পেতো না। প্রথম দল যেভাবে আহার করত, শেষের দলও ঐ একইভাবে আহার করত। কথিত আছে, প্রতিদিন সাত হাজার লোক ঐ খাদ্য আহার করত।

কিছুদিন অতিবাহিত হলে একদিন পর পর খাঞ্চা অবতরণ করত। যেমন সালেহ আ.-এর উটনীর দুধ একদিন পর পর লোকেরা পান করত। এরপর আল্লাহ হযরত ঈসা আ.-কে আদেশ দেন, এখন থেকে খাঞ্চার খাবার শুধু দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকেরাই আহার করবে। ধনী লোকেরা তা থেকে আহার করতে পারবে না। এ নির্দেশ অনেককেই পীড়া দেয়। মুনাফিকরা এ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করল। ফলে আসমানী খাঞ্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল এবং সমালোচনাকারীরা শূকরে পরিণত হল।

আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত বকর ইবনে আবদিল্লাহ মুযানী থেকে বর্ণনা করেন: একবার হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা আ.-কে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জনৈক ব্যক্তি তাদেরকে বলল, তিনি সমুদ্রের দিকে গিয়েছেন। তারা সন্ধান করতে করতে সমুদ্রের দিকে গেল। সমুদ্রের তীরে গিয়ে দেখেন, তিনি পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন। সমুদ্রের তরঙ্গ একবার তাঁকে উপরে উঠাচ্ছে এবার নিচে নামাচ্ছে। একটি চাদরের অর্ধেক গায়ের উপর দিয়ে রেখেছেন আর বাকী অর্ধেক তাঁর পরিধানে আছে। পানির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁদের নিকটে আসেন। তাঁদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিটি বললেন, “হে আল্লাহর নবী! আমি কি আপনার নিকট আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এস, যখন তিনি এক পা পানিতে রেখে অন্য পা তুলেছেন, অমনি চিৎকার করে উঠেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো ডুবে গেলাম। হযরত ঈসা আ. বললেন, ওহে দুর্বল ঈমানদার! তোমার হাত আমার দিকে বাড়াও। কোনো আদম সন্তানের যদি একটা যব পরিমাণও ঈমান থাকে তা হলে সে পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারে।

আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী থেকে অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়ায থেকে বর্ণনা করেন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে ঈসা! আপনি কিসের সাহায্যে পানির উপর দিয়ে হাঁটেন? তিনি বললেন, ঈমান ও ইয়াকীনের বলে। উপস্থিত লোকেরা বলল, আপনি যেমন ইয়াকীন রাখেন, আমরাও তেমনি ইয়াকীন রাখি। হযরত ঈসা আ. বললেন, তাই যদি হয় তা হলে তোমরাও পানির উপর দিয়ে হেঁটে চল। তখন তারা নবী ঈসার সাথে পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু ঢেউ আসা মাত্রই তারা সকলেই ডুবে গেল। নবী বললেন, তোমাদের কী হল? তারা বলল, আমরা ঢেউ দেখে ভীত হয়ে গিয়েছিলাম। নবী বললেন, কত ভালো হত, যদি ঢেউ এর মালিককে তোমরা ভয় করতে! এরপর তিনি তাদেরকে বের করে আনলেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি মাটিতে হাত মেরে এক মুষ্টি মাটি নিলেন। পরে হাত খুললে দেখা গেল এক হাতে স্বর্ণ এবং অন্য হাতে মাটির ঢেলা কিংবা কঙ্কর। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু'হাতের কোন্টর বস্তু তোমাদের কাছে প্রিয়তর? তারা বলল, স্বর্ণ। নবী বললেন, আমার নিকট স্বর্ণ ও মাটি উভয়ই সমান। হযরত ঈসা আ. পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, গাছের পাতা আহার করতেন। তাঁর বসবাসের কোনো ঘরবাড়ী ছিল না। পরিবার ছিল না, অর্থ সম্পদ ছিল না এবং আগামী দিনের জন্যে কিছু সঞ্চয় করেও তিনি রাখতেন না। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তাঁর মায়ের সূতা কাটার চরকার আয় থেকে আহার করতেন।

ফুযায়ল ইবনে ইয়ায, ইউনুস ইবনে উবায়দ সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. বলতেন: যতক্ষণ আমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে বিমুখ হতে না পারব, ততক্ষণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারব না। হযরত ঈসা আ. বলতেন, আমি সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছি। তাতে আমি দেখেছি, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায় যাকে সৃষ্টি করা হয় নি, সে-ই আমার কাছে বেশি ঈর্ষণীয়।

ইসহাক ইবনে বিশর হযরত হাসান রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন হযরত ঈসা আ. হবেন সংসার-বিমুখদের নেতা। তিনি আরও বলেছেন : কিয়ামতের দিন পাপ থেকে পলায়নকারী লোকদের হাশর হবে ঈসা আ.-এর সাথে। রাবী আরও বলেন: একদিন হযরত ঈসা আ. একটি পাথরের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। তিনি গভীর নিন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এমন সময় ওই স্থান দিয়ে ইবলিস যাচ্ছিল। সে বলল, "ওহে ঈসা! তুমি বলে থাক না, দুনিয়ার কোনো বস্তুর প্রতি তোমার আগ্রহ নেই? কিন্তু এই পাথরটি তো দুনিয়ার বস্তু।" তখন হযরত ঈসা আ. পাথরটি ধরে তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, দুনিয়ার সাথে এটিও তুই নিয়ে যা।

মুতামির ইবনে সুলাইমান বলেন, একবার হযরত ঈসা আ. তাঁর শিষ্যদের সাথে নিয়ে বের হন। তাঁর পরিধানে ছিল পশমের জুব্বা ও চাদর। তাঁর পায়ে কোনো জুতা ছিল না। তিনি ছিলেন ক্রন্দনরত। তাঁর মাথার চুল ছিল এলোমেলো। ক্ষুধার তীব্রতায় চেহারা ছিল ফ্যাকাশে। পিপাসায় ঠোঁট দু'টি শুষ্ক। এ অবস্থায় তিনি বনি ইসরাঈলের লোকদেরকে সালাম দিয়ে বললেন: আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি দুনিয়াকে তার সঠিক অবস্থানে রেখেছি। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এবং এর জন্যে আমার গৌরবেরও কিছু নেই। তোমরা কি জান, আমার ঘর কোথায়? তারা বলল, হে রুহুল্লাহ! কোথায় আপনার ঘর? তিনি বললেন: আমার ঘর হল মসজিদ, পানি দিয়েই আমার অঙ্গসজ্জা। ক্ষুধাই আমার ব্যঞ্জন। রাতের চাঁদ আমার বাতি, শীতকালে আমার সালাত পূর্বাচল, শাক-সব্জিই আমার জীবিকা, মোটা পশমই আমার পরিধেয়। আল্লাহর ভয়ই আমার পরিচিতি, পঙ্গু ও নিঃস্বরা আমার সঙ্গী-সাথী। আমি যখন সকালে উঠি তখন আমার হাত শূন্য, যখন সন্ধ্যা হয় তখনও আমার হাতে কিছু থাকে না। এতে আমি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত এবং নিরুদ্বিগ্ন। সুতরাং আমার চাইতে ধনী ও সচ্ছল আর কে আছে?

আবু মুসআব মালিক থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বনি ইসরাঈলদেরকে বলতেন: খালি পানি পান কর, তাজা সবজি খাও এবং যবের রুটি আহার কর। গমের রুটি খেয়ো না যেন। কেন না তোমরা এর শোকর আদায় করতে পারবে না। ইবনে ওহাব হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলতেন: তোমরা দুনিয়া অতিক্রম করে যাও। একে আবাদ করো না। তিনি বলতেন: দুনিয়ার মহব্বত সকল গুনাহের মূল এবং কুদৃষ্টি অন্তরের মধ্যে কামভাব উৎপন্ন করে। অবশ্য অন্য বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কামনা-বাসনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখে ফেলে। হযরত ঈসা আ. বলতেন, হে দুর্বল চিন্তা আদম-সন্তান! যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, দুনিয়ায় মেহমান হিসেবে জীবন যাপন কর। মসজিদকে নিজের ঘর বানাও। চক্ষুদ্বয়কে কাঁদতে শিখাও, দেহকে ধৈর্যধারণ করতে ও অন্তরকে চিন্তা করতে অভ্যস্ত কর। আগামী দিনের খাদ্যের জন্যে দুশ্চিন্তা করো না এটা পাপ। তিনি বলতেন, 'সমুদ্রের তরঙ্গের উপরে ঘর বানান যেমন সম্ভব নয় তেমনি দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকাও সম্ভব নয়।'

সুফিয়ান ছাওরী বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: মুমিনের অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ও আখিরাতের মহব্বত একত্রে থাকতে পারে না, যেভাবে একত্রে থাকতে পারে না একই পাত্রে আগুন ও পানি। ইবরাহীম হারবী হযরত আবু আবদুল্লাহ সূফি রহ. এর সূত্রে বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: দুনিয়া অন্বেষণকারী লোক সমুদ্রের পানি পানকারীর সাথে তুলনীয়। সমুদ্রের পানি যত বেশি পান করবে তত বেশি পিপাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তা তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিবে। আর শয়তান দুনিয়া অন্বেষণ ও কামনাকে আকর্ষণীয় করে এবং প্রবৃত্তির লালসার সময় শক্তি যোগায়।

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. বলেছেন যে ব্যক্তি ইলম শিখে অন্যকে শেখায় এবং সে মতে আমল করে, ঊর্ধ্বজগতে তাকে বিরাট সম্মানে ভূষিত করা হয়। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: যে ইলম তোমাকে কাজের ময়দানে নিয়ে যায় না, কেবল মজলিস মাহফিলে নিয়ে যায়, তাতে কোনো কল্যাণ নেই। আরও বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বনি ইসরাঈলের মাঝে গিয়ে এক ভাষণে বলেন: হে হাওয়ারীগণ! অযোগ্য লোকদের নিকট হিকমতের কথা বলো না। এরূপ করলে হিকমত ও প্রজ্ঞাকে হেয় করা হবে। কিন্তু যোগ্য লোকদের নিকট তা বলতে কৃপণতা কর না। তা হলে তাদের উপর অবিচার করা হবে। স্মরণ রেখো! যে কোনো বিষয়ের তিনটি অবস্থা হতে পারে। যথা— (১) যার উত্তম হওয়া স্পষ্ট; এগুলোর অনুসরণ কর। (২) যার মন্দ হওয়া স্পষ্ট; এর থেকে দূরে থাক; (৩) যার ভাল বা মন্দ হওয়া সন্দেহযুক্ত; তার ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দাও।

আবদুর রাযযাক হযরত ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলেছেন: শূকরের কাছে মুক্তা ছড়িয়ো না। কেন না মুক্তা দিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। জ্ঞানপূর্ণ কথা ওই ব্যক্তিকে বলো না, যে তা শুনতে চায় না। কেন না জ্ঞানপূর্ণ কথা মুক্তার চাইতেও মূল্যবান আর যে তা চায় না, সে শূকরের চেয়েও অধম। ইকরামা আরও বর্ণনা করেন, ঈসা আ. হওয়ারীদেরকে বলেছেন: তোমরা হচ্ছ পৃথিবীতে লবণ তুল্য। যদি নষ্ট হয়ে যাও তবে তোমাদের জন্য কোনো ঔষধ নেই। তোমাদের মধ্যে মূর্খতার দুটি অভ্যাস আছে, (১) বিনা কারণে হাসা এবং (২) রাত্রি জাগরণ না করে সকালে উঠা। ইকরামা থেকে আরও বর্ণিত আছে, ঈসা আ.-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হল, কোন ব্যক্তির ফেতনা সবচাইতে মারাত্মক? তিনি বললেন: আলেমের পদস্খলন। কেন না আলেমের পদস্খলনে আরও বহু লোক বিপথগামী হয়ে যায়। রাবী আরও বলেন, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: হে জ্ঞান পাপীরা! দুনিয়াকে তোমরা মাথার উপরে রেখেছ আর আখেরাতকে রেখেছ পায়ের নিচে। তোমাদের কথাবার্তা যেন সর্বরোগের নিরাময় হয়। কিন্তু তোমাদের কার্যকলাপ হচ্ছে মহাব্যাধি। তোমাদের উপমা হচ্ছে সেই মাকাল গাছ যা দেখলে মানুষ আকৃষ্ট হয় কিন্তু তার ফল খেলে মারা যায়।

ওহাব থেকে বর্ণিত, ঈসা আ. বলেছেন: হে নিকৃষ্ট জ্ঞান পাপীরা! তোমরা জান্নাতের দরজায় বসে আছ, কিন্তু তাতে প্রবেশ করছো না আর নিঃস্বদেরকে তাতে প্রবেশ করার জন্যে আহবানও করছ না। আল্লাহর নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট মানুষ সেই জ্ঞানী ব্যক্তি, যে তার জ্ঞানের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জন করে। মাকহুল বর্ণনা করেন, একবার হযরত ঈসা আ.-এর সাথে ইয়াহইয়া আ.-এর সাক্ষাৎ হয়। তখন হযরত ঈসা আ. হাসিমুখে তাঁর সাথে মুসাফা করেন। ইয়াহইয়া আ. বললেন, কি খালাত ভাই! হাসছেন যে! মনে হচ্ছে আপনি নিরাপদ হয়ে গেছেন? ঈসা আ. বললেন, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন, নৈরাশ্যে ভুগছ না কি? তখন আল্লাহ উভয়ের নিকট ওহী প্রেরণ করে জানালেন, 'তোমাদের দুজনের মধ্যে সেই আমার নিকট প্রিয়তর, যে তার সঙ্গীর সাথে অধিকতর হাসিমুখে মিলিত হয়।'

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা একটি কবরের পাশে থামলেন। ওই কবরবাসী সঙ্কীর্ণাবস্থায় ছিল। তখন সঙ্গীরা কবরের সঙ্কীর্ণতা নিয়ে আলাপ করতে লাগলেন। তাদের কথা শুনে ঈসা আ. বললেন: তোমরা মায়ের পেটে এর চেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থানে ছিলে। তারপরে আল্লাহ যখন চাইলেন, প্রশস্ত জায়গায় নিয়ে আসলেন। আবু ওমর বলেন, ঈসা আ. যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা করতেন, তখন তাঁর চামড়া ভেদ করে রক্ত ঝরে পড়ত। হযরত ঈসা আ. থেকে এ জাতীয় অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। হাফেজ ইবনে আসাকির তাঁর গ্রন্থে বহু উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু উল্লেখ করলাম।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ইয ক্বালা আল-হাওয়ারিইউনা ইয়া ঈসা ইবনা মারিয়ামা হাল ইয়াস্তাতিউ রব্বুকা আই ইয়ুনানযিলা আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই ক্বালা ইত্তাকুল্লাহ ইন কুনতুম মুমিনীন (১১২) ক্বালু নুরীদু আন নাকুলা মিনহা অয় তাতমাইননা ক্বুলুবুনা অয়া নালামা আন ক্বদ সাদাক্বতানা অয়া নাকুনা আলাইহা মিনাশ শাহিদীন (১১৩) ক্বালা ঈসা ইবনু মারিয়ামা আল্লাহুম্মা রব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই তাকুনু লানা ঈদান লিআওয়ালিনা অয়া আখিরিনা অয়া আয়াতাম মিনকা অয়ারযুক্বনা অয়া আনতা খইরুর রজি ক্বীন (১১৪) ক্বালািল্লাহু ইন্নী মুনানযিলুহা আলাইকুম ফামাই ইয়াকফুর বাদু মিনকুম ফাইন্নী আআয্যিবুহু আযাবাল লা আআয্যিবুহু আহাদাম মিনাল আলামীন

"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলেছিল, হে মারিয়াম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) প্রেরণ করতে সক্ষম? সে বলেছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। তারা বলেছিল, আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাব এবং আমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলেছ এবং আমরা এর সাক্ষী থাকতে চাই। মারিয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; এটা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্যে হবে আনন্দ-উৎসব স্বরূপ ও তোমার নিকট হতে নিদর্শন। এবং আমাদেরকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বললেন, আমিই তোমাদের নিকট এটা প্রেরণ করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরী করলে তাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকেও দিব না।" (সূরা মায়িদা: ১১২-১১৫)

তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় খাঞ্চা অবতরণ প্রসঙ্গে সেই সব হাদীসে উল্লেখ আছে যা হযরত ইবনে আব্বাস, সালমান ফারসী, ইবনে ইয়াসির প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ:

হযরত ঈসা আ. হাওয়ারীগণকে ত্রিশ দিন রোযা পালনের নির্দেশ দেন। তারা ত্রিশ দিন সওম পালন শেষে হযরত ঈসা আ.-এর নিকট আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবদার জানায়। উদ্দেশ্য ছিল তারা আল্লাহর প্রেরিত এ খাদ্য আহার করবে। তাদের রোযা ও দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন এ ব্যাপারে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করবে, সওমের মেয়াদ শেষে রোযা ভঙ্গের দিনে ঈদ উৎসব পালন করবে, তাদের পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষ এবং ধনী ও দরিদ্র সকলের জন্যে তা আনন্দের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।

ঈসা আ. এ ব্যাপারে তাদেরকে অনেক উপদেশ দিলেন। তাঁর আশঙ্কা হল, এরা আল্লাহর এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে এবং এর শর্তাদি পূরণ করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু তারা তাদের আবদার পূরণ না হওয়া পর্যন্ত উপদেশ শুনতে প্রস্তুত হল না। অবশেষে তাদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করতে প্রস্তুত হন। তিনি নামাযে দণ্ডায়মান হলেন। পশম ও চুলের তৈরি কম্বল পরিধান করলেন এবং অবনত মস্তকে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলেন। তিনি আল্লাহর নিকট কাকুতি-মিনতি করে দুআ করলেন, যেন তাদের প্রার্থীত জিনিস তিনি দিয়ে দেন। সুতরাং আল্লাহ আসমান থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন।

মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, দুটি মেঘের মাঝখান থেকে খাঞ্চাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। খাঞ্চাটি যতই পৃথিবীর নিকটবর্তী হচ্ছিল, ততই হযরত ঈসা আ. বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দুআ করছিলেন, "হে আল্লাহ! একে তুমি রহমত বরকত ও শান্তি হিসেবে দান কর। শাস্তি হিসেবে দিও না।" খাঞ্চাটি ক্রমান্বয়ে নেমে এসে একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সম্মুখে মাটির ওপর থামল। খাঞ্চাটি ছিল রুমাল দিয়ে ঢাকা। ঈসা আ. 'বিসমিল্লাহি খায়রুর রাজিক্বীন' বলে রুমালখানা উঠালেন। দেখলেন তাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি আছে। কেউ বলেছেন, এর সাথে সিরকা ছিল। কেউ বলেছেন, ডালিম এবং ফল ফলাদিও ছিল। উক্ত খাদ্য দ্রব্যগুলো ছিল অত্যন্ত সুগন্ধিময়। আল্লাহ বলেছিলেন, 'হও' আর তাতেই তা হয়ে গিয়েছিল।

তারপর ঈসা আ. তাদেরকে খাওয়ার জন্যে আহবান করেন। তারা বলল, আপনি প্রথমে খাওয়া আরম্ভ করুন তারপরে আমরা খাব। হযরত ঈসা আ. বললেন, এ খাঞ্চার জন্যে তোমরাই প্রথমে আবেদন করেছিলে; কিন্তু প্রথমে খেতে তারা কিছুতেই রাজি হল না। হযরত ঈসা আ. তখন ফকীর, মিসকীন, অভাবগ্রস্ত রোগাক্রান্ত ও পঙ্গুদেরকে খাওয়ার আদেশ দেন। এ জাতীয় লোকদের সংখ্যা ছিল তেরশ'। সকলেই তা থেকে খেল। ফলে দুঃখ-দুর্দশা ও রোগ-শোক যার যে সমস্যা ছিল, এ খাদ্যের বরকতে তা থেকে সে নিরাময় লাভ করল। যারা খেতে অস্বীকার করেছিল তা দেখে তারা খুবই লজ্জিত হল ও অনুশোচনা করতে লাগল। কথিত আছে, এ খাঞ্চা প্রতিদিন একবার করে আসত। লোক এ থেকে তৃপ্তি সহকারে আহার করত। খাদ্য একটুও হ্রাস পেতো না। প্রথম দল যেভাবে আহার করত, শেষের দলও ঐ একইভাবে আহার করত। কথিত আছে, প্রতিদিন সাত হাজার লোক ঐ খাদ্য আহার করত।

কিছুদিন অতিবাহিত হলে একদিন পর পর খাঞ্চা অবতরণ করত। যেমন সালেহ আ.-এর উটনীর দুধ একদিন পর পর লোকেরা পান করত। এরপর আল্লাহ হযরত ঈসা আ.-কে আদেশ দেন, এখন থেকে খাঞ্চার খাবার শুধু দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকেরাই আহার করবে। ধনী লোকেরা তা থেকে আহার করতে পারবে না। এ নির্দেশ অনেককেই পীড়া দেয়। মুনাফিকরা এ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করল। ফলে আসমানী খাঞ্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল এবং সমালোচনাকারীরা শূকরে পরিণত হল।

আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত বকর ইবনে আবদিল্লাহ মুযানী থেকে বর্ণনা করেন: একবার হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা আ.-কে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জনৈক ব্যক্তি তাদেরকে বলল, তিনি সমুদ্রের দিকে গিয়েছেন। তারা সন্ধান করতে করতে সমুদ্রের দিকে গেল। সমুদ্রের তীরে গিয়ে দেখেন, তিনি পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন। সমুদ্রের তরঙ্গ একবার তাঁকে উপরে উঠাচ্ছে এবার নিচে নামাচ্ছে। একটি চাদরের অর্ধেক গায়ের উপর দিয়ে রেখেছেন আর বাকী অর্ধেক তাঁর পরিধানে আছে। পানির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁদের নিকটে আসেন। তাঁদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিটি বললেন, “হে আল্লাহর নবী! আমি কি আপনার নিকট আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এস, যখন তিনি এক পা পানিতে রেখে অন্য পা তুলেছেন, অমনি চিৎকার করে উঠেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো ডুবে গেলাম। হযরত ঈসা আ. বললেন, ওহে দুর্বল ঈমানদার! তোমার হাত আমার দিকে বাড়াও। কোনো আদম সন্তানের যদি একটা যব পরিমাণও ঈমান থাকে তা হলে সে পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারে।

আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী থেকে অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়ায থেকে বর্ণনা করেন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে ঈসা! আপনি কিসের সাহায্যে পানির উপর দিয়ে হাঁটেন? তিনি বললেন, ঈমান ও ইয়াকীনের বলে। উপস্থিত লোকেরা বলল, আপনি যেমন ইয়াকীন রাখেন, আমরাও তেমনি ইয়াকীন রাখি। হযরত ঈসা আ. বললেন, তাই যদি হয় তা হলে তোমরাও পানির উপর দিয়ে হেঁটে চল। তখন তারা নবী ঈসার সাথে পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু ঢেউ আসা মাত্রই তারা সকলেই ডুবে গেল। নবী বললেন, তোমাদের কী হল? তারা বলল, আমরা ঢেউ দেখে ভীত হয়ে গিয়েছিলাম। নবী বললেন, কত ভালো হত, যদি ঢেউ এর মালিককে তোমরা ভয় করতে! এরপর তিনি তাদেরকে বের করে আনলেন।

কিছুক্ষণ পর তিনি মাটিতে হাত মেরে এক মুষ্টি মাটি নিলেন। পরে হাত খুললে দেখা গেল এক হাতে স্বর্ণ এবং অন্য হাতে মাটির ঢেলা কিংবা কঙ্কর। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু'হাতের কোন্টর বস্তু তোমাদের কাছে প্রিয়তর? তারা বলল, স্বর্ণ। নবী বললেন, আমার নিকট স্বর্ণ ও মাটি উভয়ই সমান। হযরত ঈসা আ. পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, গাছের পাতা আহার করতেন। তাঁর বসবাসের কোনো ঘরবাড়ী ছিল না। পরিবার ছিল না, অর্থ সম্পদ ছিল না এবং আগামী দিনের জন্যে কিছু সঞ্চয় করেও তিনি রাখতেন না। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তাঁর মায়ের সূতা কাটার চরকার আয় থেকে আহার করতেন।

ফুযায়ল ইবনে ইয়ায, ইউনুস ইবনে উবায়দ সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. বলতেন: যতক্ষণ আমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে বিমুখ হতে না পারব, ততক্ষণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারব না। হযরত ঈসা আ. বলতেন, আমি সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছি। তাতে আমি দেখেছি, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায় যাকে সৃষ্টি করা হয় নি, সে-ই আমার কাছে বেশি ঈর্ষণীয়।

ইসহাক ইবনে বিশর হযরত হাসান রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন হযরত ঈসা আ. হবেন সংসার-বিমুখদের নেতা। তিনি আরও বলেছেন : কিয়ামতের দিন পাপ থেকে পলায়নকারী লোকদের হাশর হবে ঈসা আ.-এর সাথে। রাবী আরও বলেন: একদিন হযরত ঈসা আ. একটি পাথরের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। তিনি গভীর নিন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এমন সময় ওই স্থান দিয়ে ইবলিস যাচ্ছিল। সে বলল, "ওহে ঈসা! তুমি বলে থাক না, দুনিয়ার কোনো বস্তুর প্রতি তোমার আগ্রহ নেই? কিন্তু এই পাথরটি তো দুনিয়ার বস্তু।" তখন হযরত ঈসা আ. পাথরটি ধরে তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, দুনিয়ার সাথে এটিও তুই নিয়ে যা।

মুতামির ইবনে সুলাইমান বলেন, একবার হযরত ঈসা আ. তাঁর শিষ্যদের সাথে নিয়ে বের হন। তাঁর পরিধানে ছিল পশমের জুব্বা ও চাদর। তাঁর পায়ে কোনো জুতা ছিল না। তিনি ছিলেন ক্রন্দনরত। তাঁর মাথার চুল ছিল এলোমেলো। ক্ষুধার তীব্রতায় চেহারা ছিল ফ্যাকাশে। পিপাসায় ঠোঁট দু'টি শুষ্ক। এ অবস্থায় তিনি বনি ইসরাঈলের লোকদেরকে সালাম দিয়ে বললেন: আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি দুনিয়াকে তার সঠিক অবস্থানে রেখেছি। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এবং এর জন্যে আমার গৌরবেরও কিছু নেই। তোমরা কি জান, আমার ঘর কোথায়? তারা বলল, হে রুহুল্লাহ! কোথায় আপনার ঘর? তিনি বললেন: আমার ঘর হল মসজিদ, পানি দিয়েই আমার অঙ্গসজ্জা। ক্ষুধাই আমার ব্যঞ্জন। রাতের চাঁদ আমার বাতি, শীতকালে আমার সালাত পূর্বাচল, শাক-সব্জিই আমার জীবিকা, মোটা পশমই আমার পরিধেয়। আল্লাহর ভয়ই আমার পরিচিতি, পঙ্গু ও নিঃস্বরা আমার সঙ্গী-সাথী। আমি যখন সকালে উঠি তখন আমার হাত শূন্য, যখন সন্ধ্যা হয় তখনও আমার হাতে কিছু থাকে না। এতে আমি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত এবং নিরুদ্বিগ্ন। সুতরাং আমার চাইতে ধনী ও সচ্ছল আর কে আছে?

আবু মুসআব মালিক থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বনি ইসরাঈলদেরকে বলতেন: খালি পানি পান কর, তাজা সবজি খাও এবং যবের রুটি আহার কর। গমের রুটি খেয়ো না যেন। কেন না তোমরা এর শোকর আদায় করতে পারবে না। ইবনে ওহাব হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলতেন: তোমরা দুনিয়া অতিক্রম করে যাও। একে আবাদ করো না। তিনি বলতেন: দুনিয়ার মহব্বত সকল গুনাহের মূল এবং কুদৃষ্টি অন্তরের মধ্যে কামভাব উৎপন্ন করে। অবশ্য অন্য বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কামনা-বাসনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখে ফেলে। হযরত ঈসা আ. বলতেন, হে দুর্বল চিন্তা আদম-সন্তান! যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, দুনিয়ায় মেহমান হিসেবে জীবন যাপন কর। মসজিদকে নিজের ঘর বানাও। চক্ষুদ্বয়কে কাঁদতে শিখাও, দেহকে ধৈর্যধারণ করতে ও অন্তরকে চিন্তা করতে অভ্যস্ত কর। আগামী দিনের খাদ্যের জন্যে দুশ্চিন্তা করো না এটা পাপ। তিনি বলতেন, 'সমুদ্রের তরঙ্গের উপরে ঘর বানান যেমন সম্ভব নয় তেমনি দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকাও সম্ভব নয়।'

সুফিয়ান ছাওরী বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: মুমিনের অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ও আখিরাতের মহব্বত একত্রে থাকতে পারে না, যেভাবে একত্রে থাকতে পারে না একই পাত্রে আগুন ও পানি। ইবরাহীম হারবী হযরত আবু আবদুল্লাহ সূফি রহ. এর সূত্রে বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: দুনিয়া অন্বেষণকারী লোক সমুদ্রের পানি পানকারীর সাথে তুলনীয়। সমুদ্রের পানি যত বেশি পান করবে তত বেশি পিপাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তা তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিবে। আর শয়তান দুনিয়া অন্বেষণ ও কামনাকে আকর্ষণীয় করে এবং প্রবৃত্তির লালসার সময় শক্তি যোগায়।

বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. বলেছেন যে ব্যক্তি ইলম শিখে অন্যকে শেখায় এবং সে মতে আমল করে, ঊর্ধ্বজগতে তাকে বিরাট সম্মানে ভূষিত করা হয়। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: যে ইলম তোমাকে কাজের ময়দানে নিয়ে যায় না, কেবল মজলিস মাহফিলে নিয়ে যায়, তাতে কোনো কল্যাণ নেই। আরও বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বনি ইসরাঈলের মাঝে গিয়ে এক ভাষণে বলেন: হে হাওয়ারীগণ! অযোগ্য লোকদের নিকট হিকমতের কথা বলো না। এরূপ করলে হিকমত ও প্রজ্ঞাকে হেয় করা হবে। কিন্তু যোগ্য লোকদের নিকট তা বলতে কৃপণতা কর না। তা হলে তাদের উপর অবিচার করা হবে। স্মরণ রেখো! যে কোনো বিষয়ের তিনটি অবস্থা হতে পারে। যথা— (১) যার উত্তম হওয়া স্পষ্ট; এগুলোর অনুসরণ কর। (২) যার মন্দ হওয়া স্পষ্ট; এর থেকে দূরে থাক; (৩) যার ভাল বা মন্দ হওয়া সন্দেহযুক্ত; তার ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দাও।

আবদুর রাযযাক হযরত ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলেছেন: শূকরের কাছে মুক্তা ছড়িয়ো না। কেন না মুক্তা দিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। জ্ঞানপূর্ণ কথা ওই ব্যক্তিকে বলো না, যে তা শুনতে চায় না। কেন না জ্ঞানপূর্ণ কথা মুক্তার চাইতেও মূল্যবান আর যে তা চায় না, সে শূকরের চেয়েও অধম। ইকরামা আরও বর্ণনা করেন, ঈসা আ. হওয়ারীদেরকে বলেছেন: তোমরা হচ্ছ পৃথিবীতে লবণ তুল্য। যদি নষ্ট হয়ে যাও তবে তোমাদের জন্য কোনো ঔষধ নেই। তোমাদের মধ্যে মূর্খতার দুটি অভ্যাস আছে, (১) বিনা কারণে হাসা এবং (২) রাত্রি জাগরণ না করে সকালে উঠা। ইকরামা থেকে আরও বর্ণিত আছে, ঈসা আ.-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হল, কোন ব্যক্তির ফেতনা সবচাইতে মারাত্মক? তিনি বললেন: আলেমের পদস্খলন। কেন না আলেমের পদস্খলনে আরও বহু লোক বিপথগামী হয়ে যায়। রাবী আরও বলেন, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: হে জ্ঞান পাপীরা! দুনিয়াকে তোমরা মাথার উপরে রেখেছ আর আখেরাতকে রেখেছ পায়ের নিচে। তোমাদের কথাবার্তা যেন সর্বরোগের নিরাময় হয়। কিন্তু তোমাদের কার্যকলাপ হচ্ছে মহাব্যাধি। তোমাদের উপমা হচ্ছে সেই মাকাল গাছ যা দেখলে মানুষ আকৃষ্ট হয় কিন্তু তার ফল খেলে মারা যায়।

ওহাব থেকে বর্ণিত, ঈসা আ. বলেছেন: হে নিকৃষ্ট জ্ঞান পাপীরা! তোমরা জান্নাতের দরজায় বসে আছ, কিন্তু তাতে প্রবেশ করছো না আর নিঃস্বদেরকে তাতে প্রবেশ করার জন্যে আহবানও করছ না। আল্লাহর নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট মানুষ সেই জ্ঞানী ব্যক্তি, যে তার জ্ঞানের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জন করে। মাকহুল বর্ণনা করেন, একবার হযরত ঈসা আ.-এর সাথে ইয়াহইয়া আ.-এর সাক্ষাৎ হয়। তখন হযরত ঈসা আ. হাসিমুখে তাঁর সাথে মুসাফা করেন। ইয়াহইয়া আ. বললেন, কি খালাত ভাই! হাসছেন যে! মনে হচ্ছে আপনি নিরাপদ হয়ে গেছেন? ঈসা আ. বললেন, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন, নৈরাশ্যে ভুগছ না কি? তখন আল্লাহ উভয়ের নিকট ওহী প্রেরণ করে জানালেন, 'তোমাদের দুজনের মধ্যে সেই আমার নিকট প্রিয়তর, যে তার সঙ্গীর সাথে অধিকতর হাসিমুখে মিলিত হয়।'

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা একটি কবরের পাশে থামলেন। ওই কবরবাসী সঙ্কীর্ণাবস্থায় ছিল। তখন সঙ্গীরা কবরের সঙ্কীর্ণতা নিয়ে আলাপ করতে লাগলেন। তাদের কথা শুনে ঈসা আ. বললেন: তোমরা মায়ের পেটে এর চেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থানে ছিলে। তারপরে আল্লাহ যখন চাইলেন, প্রশস্ত জায়গায় নিয়ে আসলেন। আবু ওমর বলেন, ঈসা আ. যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা করতেন, তখন তাঁর চামড়া ভেদ করে রক্ত ঝরে পড়ত। হযরত ঈসা আ. থেকে এ জাতীয় অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। হাফেজ ইবনে আসাকির তাঁর গ্রন্থে বহু উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু উল্লেখ করলাম।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ঈসা আ.-এর হাওয়ারীগণের নাম

📄 ঈসা আ.-এর হাওয়ারীগণের নাম


কথিত আছে, হযরত ঈসা আ.-এর সান্নিধ্যে বারজন হাওয়ারী ছিলেন। (১) পিতর, (২) ইয়াকুব ইবনে যাবদা (সিবদিয়), (৩) ইয়াহনাস (যুহান্না) ইনি ইয়াকুবের ভাই ছিলেন (৪) ইনদারাউস (আন্দ্রিয়), (৫) ফিলিপ, (৬) আবরো ছালমা (বর্তলময়), (৭) মথি, (৮) টমাস (থমা), (৯) ইয়াকুব ইবনে হালকুবা (আলকেয়), (১০) তাদাউস (থদ্দেয়), (১১) ফাতাতিয়া শিমন ও (১২) (ইহুদা ইস্কারিযোৎ) ইউদাস কারয়া ইউতা। এই শেষোক্ত ব্যক্তি ইহুদিদেরকে ঈসা আ.-এর সন্ধান দিয়েছিল। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, হাওয়ারীদের মধ্যে সারজিস নামক আর এক ব্যক্তি ছিল, যার কথা নাসারারা গোপন রাখে। এ ব্যক্তিকেই মাসীহর রূপ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নাসারাদের কিছু অংশের মতে যাকে মাসীহর রূপ দেওয়া হয় ও ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়, তার নাম জভাস ইবনে কারয়া ইউতা।

কথিত আছে, হযরত ঈসা আ.-এর সান্নিধ্যে বারজন হাওয়ারী ছিলেন। (১) পিতর, (২) ইয়াকুব ইবনে যাবদা (সিবদিয়), (৩) ইয়াহনাস (যুহান্না) ইনি ইয়াকুবের ভাই ছিলেন (৪) ইনদারাউস (আন্দ্রিয়), (৫) ফিলিপ, (৬) আবরো ছালমা (বর্তলময়), (৭) মথি, (৮) টমাস (থমা), (৯) ইয়াকুব ইবনে হালকুবা (আলকেয়), (১০) তাদাউস (থদ্দেয়), (১১) ফাতাতিয়া শিমন ও (১২) (ইহুদা ইস্কারিযোৎ) ইউদাস কারয়া ইউতা। এই শেষোক্ত ব্যক্তি ইহুদিদেরকে ঈসা আ.-এর সন্ধান দিয়েছিল। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, হাওয়ারীদের মধ্যে সারজিস নামক আর এক ব্যক্তি ছিল, যার কথা নাসারারা গোপন রাখে। এ ব্যক্তিকেই মাসীহর রূপ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নাসারাদের কিছু অংশের মতে যাকে মাসীহর রূপ দেওয়া হয় ও ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়, তার নাম জভাস ইবনে কারয়া ইউতা।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া

📄 হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া


আল্লাহ তাআলা কর্তৃক ঈসা আ.-কে রক্ষা এবং ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে শূলে চড়ানোর মিথ্যা দাবি প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

অয়ামাকারু অয়ামাকারুল্লাহু অয়াল্লাহু খইরুল মাকিরীন (৫৪) ইয ক্বালািল্লাহু ইয়া ঈসা ইন্নী মুতাঅয়াফ্ফিকা অয়া রফিুকা ইলাইয়্যা অয়া মুতহহিরুকা মিনাল্লাযীনা কাফারু অয়াজা-ইলুল্লাযীনাত্তাবাউকা ফাওক্বাল্লাযীনা কাফারু ইলা ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ। ছুম্মা ইলাইয়্যা মারজিউকুম ফাআহকুমু বাইনাকুম ফীমা কুনতুম ফীহি তাখতালিফুন।

"তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও কৌশল করেছিলেন, আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরী করেছে, তাদের মধ্য হতে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি। এরপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দিব। (আলে-ইমরান: ৫৪-৫৫)

আল্লাহ আরো বলেন:

ফাবিমা নাক্বদিহিম মীছাক্বাহুম অয়াকুফরিহিম বিআয়াতিল্লাহি অয়াক্বাতলিহিমুল আম্বিয়াআ বিগইরি হাক্বক্বিন অয়াক্বাওলিহিম ক্বুলুবুনা গুলফুন বাল তবাআল্লাহু আলাইহা বিকুফরিহিম ফালা ইউমিনূনা ইল্লা ক্বালীলা (১৫৫) অবিকুফরিহিম অয়াক্বাওলিহিম আলা মারিয়ামা বুহতানান আযীমা (১৫৬) অয়াক্বাওলিহিম ইন্না ক্বাতালনাল মাসীহা ঈসাবনা মারিয়ামা রসূলুল্লাহি অয়ামা ক্বাতালূহু অয়ামা সালাবূহু অয়ালাকিন শুববিহা লাহুম অয়া ইন্নাল্লাযীনাখ তালাফূ ফীহি লাফী শাক্কিম মিনহু মা লাহুম বিহি মিন ইলমিন ইল্লাত্তিবাআয যন্নি অয়ামা ক্বাতালূহু ইয়াক্বীনা (১৫৭) বার রফাউল্লাহু ইলাইহি অয়াকানাল্লাহু আযীযান হাকীমা (১৫৮) অয়া ইম মিন আহলিল কিতাবি ইল্লা লাইউমিনান্না বিহি ক্বাবলা মাওতিহি অয়া ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ ইয়াকুনু আলাইহিম শাহিদী

এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্যে, আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখান করার জন্যে নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার জন্যে এবং আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, তাদের এ উক্তির জন্যে বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাতে মোহর মেরে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যক লোকই বিশ্বাস করে। এবং লা'নতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্যে ও মারিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্যে। আর আমরা আল্লাহর রাসূল মারিয়াম-তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি— তাদের এ উক্তির জন্যে। অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তাঁর সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। (সূরা নিসা: ১৫৫-১৫৯)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক হযরত ঈসা আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করার পরে আসমানে তুলে নেন। এটাই সন্দেহাতীত বিশুদ্ধ মত। ইহুদিরা সে যুগের জনৈক কাফির বাদশার সাথে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে যে নির্যাতন করতে চেয়েছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে মুক্ত করেন। হাসান বসরী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, সে বাদশার নাম ছিল দাউদ ইবনে নুরা। সে হযরত ঈসা আ.-কে হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দেয়। হুকুম পেয়ে ইহুদিরা শুক্রবার দিবাগত শনিবার রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে হযরত ঈসা আ.-কে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কক্ষে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহ তাআলা কক্ষে বিদ্যমান ঈসা আ.-এর অনুসারীদের মধ্য হতে একজনের চেহারাকে তাঁর চেহারার সদৃশ করে দেন এবং ঈসা আ.-কে বাতায়নপথে আকাশে তুলে নেন।

কক্ষে যারা ছিল তারা ঈসা আ.-কে তুলে নেওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। ইতঃমধ্যে বাদশার রক্ষীরা কক্ষে প্রবেশ করে ঈসা আ.-এর চেহারা বিশিষ্ট ওই যুবককে দেখতে পায়। তারা তাকেই ঈসা আ. মনে করে ধরে এনে শূলে চড়ায় এবং মাথায় কাঁটার টুপি পরায়। তাঁকে অধিক লাঞ্ছিত করার জন্যে তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ নাসারা, যারা ঈসা আ.-এর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি, তারা ইহুদিদের ঈসা আ.-কে ক্রুশ বিদ্ধ করার দাবি মেনে নেয়। ফলে তারাও সত্য থেকে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিভ্রান্তির অতল তলে নিক্ষিপ্ত হয়। সেই জন্যে আল্লাহ বলেন, "কিতাবীদের প্রত্যেকেই তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি বিশ্বাস করবে।" অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে তখনকার সকল কিতাবীরাই তাঁর প্রতি বিশ্বাস আনবে। কেন না তিনি পুনর্বার পৃথিবীতে আসবেন এবং শূকর বধ করবেন, ক্রুশ ধ্বংস করবেন, জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন কবুল করবেন না।

ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নিতে ইচ্ছা করলেন, তখন ঘটনা ছিল, বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে ঈসা আ.-এর বারজন হাওয়ারী অবস্থান করছিলেন। তিনি মসজিদের একটি ঝরনায় গোসল করে ওই কক্ষে শিষ্যদের নিকট যান। তাঁর মাথার চুল থেকে তখনও পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছে, যে তার প্রতি ঈমান আনার পর ১২ বার আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এরপরে তিনি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে যাকে আমার গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করা হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে, পরিণামে আমার সাথে সে মর্যাদা লাভ করবে? উপস্থিত শিষ্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এক যুবক দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বললেন, বস। এরপর তিনি দ্বিতীয় বার একই আহবান জানান। এবারও ওই যুবকটি দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বসতে বললেন। তৃতীয়বার তিনি আবারও একই আহবান রাখেন আর ওই যুবক দাঁড়িয়ে বললেন, এ জন্যে আমি প্রস্তুত। ঈসা আ. বললেন তাই হবে, তুমিই এর অধিকারী।

এরপর যুবকটির গঠনাকৃতিকে ঈসা আ. এর গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া এবং মসজিদের একটি বাতায়ন পথে ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ইহুদিদের একটি অনুসন্ধানকারী দল ঈসা আ.-কে ধরার জন্যে এসে উক্ত যুবককে ঈসা আ. মনে করে ধরে নিয়ে আসে ও তাকে হত্যা করে এবং ক্রুশবিদ্ধ করে। জনৈক শিষ্য ঈসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার পর বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনী ইসরাঈল তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা: (১) আল-ইয়াকুবিয়্যা: এ দল বিশ্বাস করে যে, এতদিন আল্লাহ স্বয়ং আমাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলেন, এখন তিনি আসমানে উঠে গিয়েছেন। (২) আল-নাসুতরিয়‍্যা এ দলের বিশ্বাস হল, আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে এতদিন ছিলেন, এখন তাঁকে আল্লাহ নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (৩) আল-মুসলিমুন : এ দলের মতে ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ছিল ততদিন তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। এখন তাঁকে আল্লাহর নিজের সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছেন। উক্ত তিন দলের মধ্যে কাফির দুই দল একত্র হয়ে মুসলিম দলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। ফলে মুসলিম দল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলার পর আল্লাহ মুহাম্মাদকে রসূলরূপে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এ দিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনে বলা হয়েছে “পরে আমি মুমিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়। ফলে তারা বিজয়ী হল।"

এ হাদীসটি সবচেয়ে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. আল্লাহর নিকট তাঁর মৃত্যুকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে দুআ করতেন, যাতে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারেন। দাওয়াতী কাজ সম্প্রসারণ করতে পারেন এবং অধিক পরিমাণ লোক যাতে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে পারে। ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে জানিয়ে দেন, অচিরেই তুমি দুনিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছ তখন তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। এ সময় তিনি হাওয়ারীগণকে দাওয়াত করেন। তাঁদের জন্যে খাদ্য প্রস্তুত করেন। তাঁদেরকে জানিয়ে দেন, রাত্রে তোমরা আমার নিকট আসবে, তোমাদের কাছে আমার প্রয়োজন আছে। হাওয়ারীগণ রাত্রে আসলে ঈসা আ. তাদেরকে নিজ হাতে খানা পরিবেশন করে খাওয়ান। আহার শেষে নিজেই তাঁদের হাত ধুয়ে দেন ও নিজের কাপড় দ্বারা তাঁদের হাত মুছে দেন। এ সব দেখে হাওয়ারীগণ আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং বিব্রত বোধ করলেন।

ঈসা আ. বললেন, দেখ, আমি যা কিছু করব কেউ যদি তার প্রতিবাদ করে তবে সে আমার শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তার কেউ নই। তখন তারা তা মেনে নিলেন। আর ঈসা আ. বললেন, আমি আজ রাত্রে তোমাদের সাথে যে আচরণ করলাম, তোমাদের সেবা করলাম, খাদ্য পরিবেশন করলাম, হাত ধুয়ে দিলাম, এ যেন তোমাদের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকে। তোমরা জানো, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না বরং নিজেকে অপরের চাইতে ছোট জ্ঞান করবে। তোমরা তো প্রত্যক্ষ করলে, কিভাবে আমি তোমাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। তোমরাও ঠিক এভাবে করবে, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করবে এবং মনে প্রাণে দুআ করবে যেন তিনি আমার মৃত্যুকে পিছিয়ে দেন।

ঈসা আ.-এর কথা শোনার পর হাওয়ারীগণ যখন দুআ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে দু'আ করতে বসলেন, তখন গভীর নিদ্রা তাঁদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ফলে তাঁরা দুআ করতে সমর্থ হলেন না। ঈসা আ. তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাবার চেষ্টা করেন এবং বলেন: কী আশ্চর্য! তোমরা কি মাত্র একটা রাত আমার জন্যে ধৈর্যধারণ করতে এবং আমাকে সাহায্য করতে পারবে না? তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি পারছি না, আমাদের এ কী হল? আমরা তো প্রতি দিন রাত্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জেগে থাকি, কথাবার্তা বলি; কিন্তু আজ রাত্রে তার কিছুই করতে পারছি না। যখনই দুআ করতে যাই তখনই ঘুম এসে মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন হযরত ঈসা আ. বললেন, রাখাল মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছে আর বকরীগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জাতীয় আরও বিভিন্ন কথা তিনি বলতে থাকেন এবং নিজের বিয়োগ ব্যথার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর ঈসা আ. বললেন আমি তোমাদেরকে একটি সত্য কথা বলছি— তোমাদের মধ্যে একজন আজ মোরগ ডাক দেওয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তোমাদের মধ্যে একজন সামান্য কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে শত্রুদের কাছে আমার সন্ধান বলে দেবে এবং আমার বিনিময়ে প্রাপ্তঅর্থ ভক্ষণ করবে। এরপর তারা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। এদিকে ইহুদিরা ঈসা আ.-কে সন্ধান করে ফিরছে। তারা শামউন নামক এক হওয়ারীকে ধরে বলল, এই ব্যক্তি ঈসার শিষ্য। কিন্তু সে অস্বীকার করে বলল, আমি ঈসার শিষ্য নই। এ কথা বললে, তারা শামউনকে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে তাকে অন্য ইহুদিরা পাকড়াও করলে সে পূর্বের মতো উত্তর দিয়ে আত্মরক্ষা করল।

এমন সময় ঈসা আ. হঠাৎ মোরগের ডাক শুনতে পান। মোরগের ডাক শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। প্রভাত হওয়ার পর জনৈক হাওয়ারী ইহুদিদের নিকট গিয়ে বলল, আমি যদি তোমাদেরকে ঈসা মাসীহর সন্ধান দিই, তা হলে তোমরা আমাকে কী পুরস্কার দিবে? ইহুদিরা তাকে ত্রিশটি দিরহাম দিল, বিনিময়ে সে তাদের নিকট তাঁর সন্ধান বলে দিল। কিন্তু এর পূর্বেই তাকে ঈসার অনুরূপ চেহারা দান করা হয় এবং তাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয়। ফলে তাকেই তারা পাকড়াও করে রশি দ্বারা শক্ত করে বাঁধল এবং একথা বলতে বলতে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গেল, তুমিই তো মৃতকে জীবিত করতে, জীন-ভূত তাড়াতে, পাগল মানুষকে সুস্থ করে দিতে। এখন এই রশির বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত কর দেখি! তারা তার ওপর থুথু নিক্ষেপ করল, দেহে কাঁটা ফুটাল এবং যেই ক্রুশে বিদ্ধ করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে তাকে নিয়ে আসল।

ইতঃমধ্যে ঈসা আ.-কে আল্লাহ নিজ সান্নিধ্যে তুলে নিলেন এবং ইহুদিরা ওই চেহারা পরিবর্তিত ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করল। ক্রুশের ওপর লাশ সাত দিন পর্যন্ত ঝুলে ছিল। এরপর ঈসা আ.-এর মা এবং অন্য এক মহিলা যে পাগল ছিল এবং যাকে ঈসা আ, সুস্থ করেছিলেন উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্রুশবিদ্ধ লোকটির কাছে আসলেন। তখন হযরত ঈসা আ.-তাঁদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কাঁদছেন কেন? তাঁরা বললেন, আমরা তো তোমার জন্যে কাঁদছি। ঈসা আ. বললেন, আমাকে আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং উত্তম অবস্থায় রেখেছেন আর এই যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে, তার ব্যাপারে ইহুদিরা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।

এরপর তিনি হাওয়ারীদের প্রতি নির্দেশ দিলেন যেন, অমুক স্থানে তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নির্দেশ মতে এগারজন হাওয়ারী সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। সেই এক হাওয়ারী অনুপস্থিত থাকে, যে ঈসাকে দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করেছিল এবং ইহুদিদেরকে তাঁর সন্ধান বলে দিয়েছিল; তার সম্পর্কে ঈসা আ. শিষ্যদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে তারা জানালো, সে তার কর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঈসা আ. বললেন, যদি সে তওবা করত তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করতেন। এরপর তিনি ইয়াহইয়া নামক সেই যুবকের কথা জিজ্ঞেস করলেন, যে তাদেরকে অনুসরণ করত। তিনি বললেন, সে তোমাদের সাথেই আছে। এরপর ঈসা আ. বললেন, তোমরা এখান থেকে চলে যাও। কেন না অচিরেই তোমরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলবে। সুতরাং তাদেরকে সতর্ক করবে এবং দীনের দাওয়াত দিবে।

ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া ইবনে হাবীবের সূত্রে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, মারিয়াম আ. ধারণা করেছিলেন, সে তাঁরই পুত্র। তাই তিনি ঘটনার সাত দিন পর বাদশার লোকদের নিকট গিয়ে লাশটি নামিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। তারা তাঁর আবেদনে সাড়া দেয় এবং সেখানেই লাশটি দাফন করা হয়। তারপর মারিয়াম আ. হযরত ইয়াহইয়া আ. মাকে বললেন: চল! আমরা মাসীহর কবর যিয়ারত করে আসি। উভয়ে রওনা হলেন। কবরের কাছাকাছি পৌঁছলে মারিয়াম আ. ইয়াহইয়া আ. এর মাকে বললেন, পর্দা কর! ইয়াহইয়ার মা বললেন, কার থেকে পর্দা করব? বললেন: কেন কবরের কাছে ওই যে লোকটিকে দেখা যায়, তার থেকে! ইয়াহইয়া আ. এর মা বললেন, কী বলছ? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! মারিয়াম আ. তখন ভাবছেন, ওনি জিবরাঈল ফিরিশতা হবেন। বস্তুত জিবরাঈল আ.-কে তিনি বহু পূর্বে দেখেছিলেন।

মোটকথা, ইয়াহইয়া আ. এর মাকে সেখানে রেখে মারিয়াম আ. কবরের কাছে গেলেন। কবরের নিকট গেলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! কোথায় যাচ্ছ? মারিয়াম আ. বললেন, মাসীহর কবর যিয়ারত করতে এবং তাঁকে সালাম জানাতে। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! এ তো মাসীহ নয়। তাঁকে তো আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন, কাফিরদের হাত থেকে তাঁকে পবিত্র করেছেন। তবে কবরবাসীকে মাসীহর আকৃতি বদলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। এর নিদর্শন হচ্ছে, ওই লোকটির পরিবারের লোকজন একে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছে না এবং তার কি হয়েছে তাও তারা জানে না; এর জন্যে তারা কেবল কান্নাকাটি করে ফিরছে। তুমি অমুক দিন অমুক বাগানের নিকট আসলে মাসীহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে। এ কথা বলে জিবরাঈল আ. সেখান থেকে প্রস্থান করেন। মারিয়াম আ. তার বোনের নিকট ফিরে এসে জিবরাঈল আ. এর ব্যাপারে জানালেন এবং বাগানের বিষয়টিও বললেন। নির্দিষ্ট দিনে মারিয়াম আ. সেই বাগানের নিকট গেলে সেখানে মাসীহকে দেখতে পান। ঈসা আ. মাকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসেন, মা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর মাথায় চুম্বন দেন। তিনি পূর্বের মত তাঁর জন্যে দুআ করেন। তারপর বলেন, মা! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে হত্যা করতে পারেনি, আল্লাহ আমাকে তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দিয়েছেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হবে। ধৈর্য ধরুন ও বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করুন। ঈসা আ. ঊর্ধ্বলোকে চলে গেলেন। এরপর মারিয়াম আ. সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ঈসার আর সাক্ষাৎ হয়নি। রাবী বলেন, ঈসা আ.-এর ঊর্ধ্ব্বারোহণের পরে তাঁর মা পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিপ্পান্ন বছর বয়সকালে তিনি ইনতিকাল করেন।

আল্লাহ তাআলা কর্তৃক ঈসা আ.-কে রক্ষা এবং ইহুদি ও নাসারারা তাঁকে শূলে চড়ানোর মিথ্যা দাবি প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন:

অয়ামাকারু অয়ামাকারুল্লাহু অয়াল্লাহু খইরুল মাকিরীন (৫৪) ইয ক্বালািল্লাহু ইয়া ঈসা ইন্নী মুতাঅয়াফ্ফিকা অয়া রফিুকা ইলাইয়্যা অয়া মুতহহিরুকা মিনাল্লাযীনা কাফারু অয়াজা-ইলুল্লাযীনাত্তাবাউকা ফাওক্বাল্লাযীনা কাফারু ইলা ইয়াওমিল ক্বিয়ামাহ। ছুম্মা ইলাইয়্যা মারজিউকুম ফাআহকুমু বাইনাকুম ফীমা কুনতুম ফীহি তাখতালিফুন।

"তারা চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও কৌশল করেছিলেন, আল্লাহ কৌশলীদের শ্রেষ্ঠ। স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলে নিচ্ছি এবং যারা কুফরী করেছে, তাদের মধ্য হতে তোমাকে পবিত্র করছি। আর তোমার অনুসারীদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি। এরপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটছে আমি তা মীমাংসা করে দিব। (আলে-ইমরান: ৫৪-৫৫)

আল্লাহ আরো বলেন:

ফাবিমা নাক্বদিহিম মীছাক্বাহুম অয়াকুফরিহিম বিআয়াতিল্লাহি অয়াক্বাতলিহিমুল আম্বিয়াআ বিগইরি হাক্বক্বিন অয়াক্বাওলিহিম ক্বুলুবুনা গুলফুন বাল তবাআল্লাহু আলাইহা বিকুফরিহিম ফালা ইউমিনূনা ইল্লা ক্বালীলা (১৫৫) অবিকুফরিহিম অয়াক্বাওলিহিম আলা মারিয়ামা বুহতানান আযীমা (১৫৬) অয়াক্বাওলিহিম ইন্না ক্বাতালনাল মাসীহা ঈসাবনা মারিয়ামা রসূলুল্লাহি অয়ামা ক্বাতালূহু অয়ামা সালাবূহু অয়ালাকিন শুববিহা লাহুম অয়া ইন্নাল্লাযীনাখ তালাফূ ফীহি লাফী শাক্কিম মিনহু মা লাহুম বিহি মিন ইলমিন ইল্লাত্তিবাআয যন্নি অয়ামা ক্বাতালূহু ইয়াক্বীনা (১৫৭) বার রফাউল্লাহু ইলাইহি অয়াকানাল্লাহু আযীযান হাকীমা (১৫৮) অয়া ইম মিন আহলিল কিতাবি ইল্লা লাইউমিনান্না বিহি ক্বাবলা মাওতিহি অয়া ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ ইয়াকুনু আলাইহিম শাহিদী

এবং তারা লানতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্যে, আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখান করার জন্যে নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার জন্যে এবং আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত, তাদের এ উক্তির জন্যে বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাতে মোহর মেরে দিয়েছেন। সুতরাং তাদের অল্প সংখ্যক লোকই বিশ্বাস করে। এবং লা'নতগ্রস্ত হয়েছিল তাদের কুফরীর জন্যে ও মারিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অপবাদের জন্যে। আর আমরা আল্লাহর রাসূল মারিয়াম-তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি— তাদের এ উক্তির জন্যে। অথচ তারা তাঁকে হত্যা করেনি, ক্রুশবিদ্ধও করেনি, কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তাঁর সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই তার সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করেনি এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তাকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। (সূরা নিসা: ১৫৫-১৫৯)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা প্রমাণিত হয়। আল্লাহ পাক হযরত ঈসা আ.-কে নিদ্রাচ্ছন্ন করার পরে আসমানে তুলে নেন। এটাই সন্দেহাতীত বিশুদ্ধ মত। ইহুদিরা সে যুগের জনৈক কাফির বাদশার সাথে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে যে নির্যাতন করতে চেয়েছিল, আল্লাহ তা থেকে তাঁকে মুক্ত করেন। হাসান বসরী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, সে বাদশার নাম ছিল দাউদ ইবনে নুরা। সে হযরত ঈসা আ.-কে হত্যা ও ক্রুশবিদ্ধ করার হুকুম দেয়। হুকুম পেয়ে ইহুদিরা শুক্রবার দিবাগত শনিবার রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে হযরত ঈসা আ.-কে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে যখন হত্যার উদ্দেশ্যে তারা কক্ষে প্রবেশ করে, তখন আল্লাহ তাআলা কক্ষে বিদ্যমান ঈসা আ.-এর অনুসারীদের মধ্য হতে একজনের চেহারাকে তাঁর চেহারার সদৃশ করে দেন এবং ঈসা আ.-কে বাতায়নপথে আকাশে তুলে নেন।

কক্ষে যারা ছিল তারা ঈসা আ.-কে তুলে নেওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। ইতঃমধ্যে বাদশার রক্ষীরা কক্ষে প্রবেশ করে ঈসা আ.-এর চেহারা বিশিষ্ট ওই যুবককে দেখতে পায়। তারা তাকেই ঈসা আ. মনে করে ধরে এনে শূলে চড়ায় এবং মাথায় কাঁটার টুপি পরায়। তাঁকে অধিক লাঞ্ছিত করার জন্যে তারা এ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণ নাসারা, যারা ঈসা আ.-এর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি, তারা ইহুদিদের ঈসা আ.-কে ক্রুশ বিদ্ধ করার দাবি মেনে নেয়। ফলে তারাও সত্য থেকে স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বিভ্রান্তির অতল তলে নিক্ষিপ্ত হয়। সেই জন্যে আল্লাহ বলেন, "কিতাবীদের প্রত্যেকেই তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁর প্রতি বিশ্বাস করবে।" অর্থাৎ কিয়ামতের পূর্বে তখনকার সকল কিতাবীরাই তাঁর প্রতি বিশ্বাস আনবে। কেন না তিনি পুনর্বার পৃথিবীতে আসবেন এবং শূকর বধ করবেন, ক্রুশ ধ্বংস করবেন, জিযিয়া কর রহিত করবেন এবং ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন কবুল করবেন না।

ইবনে আবি হাতিম ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নিতে ইচ্ছা করলেন, তখন ঘটনা ছিল, বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি কক্ষে ঈসা আ.-এর বারজন হাওয়ারী অবস্থান করছিলেন। তিনি মসজিদের একটি ঝরনায় গোসল করে ওই কক্ষে শিষ্যদের নিকট যান। তাঁর মাথার চুল থেকে তখনও পানি ঝরে পড়ছিল। তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছে, যে তার প্রতি ঈমান আনার পর ১২ বার আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। এরপরে তিনি তাদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কে রাজী আছে যাকে আমার গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করা হবে এবং আমার স্থলে তাকে হত্যা করা হবে, পরিণামে আমার সাথে সে মর্যাদা লাভ করবে? উপস্থিত শিষ্যদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এক যুবক দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বললেন, বস। এরপর তিনি দ্বিতীয় বার একই আহবান জানান। এবারও ওই যুবকটি দণ্ডায়মান হলেন। ঈসা আ. তাঁকে বসতে বললেন। তৃতীয়বার তিনি আবারও একই আহবান রাখেন আর ওই যুবক দাঁড়িয়ে বললেন, এ জন্যে আমি প্রস্তুত। ঈসা আ. বললেন তাই হবে, তুমিই এর অধিকারী।

এরপর যুবকটির গঠনাকৃতিকে ঈসা আ. এর গঠনাকৃতি দ্বারা পরিবর্তন করে দেওয়া এবং মসজিদের একটি বাতায়ন পথে ঈসা আ.-কে আসমানে তুলে নেওয়া হয়। এরপর ইহুদিদের একটি অনুসন্ধানকারী দল ঈসা আ.-কে ধরার জন্যে এসে উক্ত যুবককে ঈসা আ. মনে করে ধরে নিয়ে আসে ও তাকে হত্যা করে এবং ক্রুশবিদ্ধ করে। জনৈক শিষ্য ঈসা আ.-এর প্রতি ঈমান আনার পর বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বনী ইসরাঈল তিন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা: (১) আল-ইয়াকুবিয়্যা: এ দল বিশ্বাস করে যে, এতদিন আল্লাহ স্বয়ং আমাদের মাঝে বিদ্যমান ছিলেন, এখন তিনি আসমানে উঠে গিয়েছেন। (২) আল-নাসুতরিয়‍্যা এ দলের বিশ্বাস হল, আল্লাহর পুত্র আমাদের মধ্যে এতদিন ছিলেন, এখন তাঁকে আল্লাহ নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (৩) আল-মুসলিমুন : এ দলের মতে ঈসা আ. আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা ছিল ততদিন তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন। এখন তাঁকে আল্লাহর নিজের সান্নিধ্যে উঠিয়ে নিয়েছেন। উক্ত তিন দলের মধ্যে কাফির দুই দল একত্র হয়ে মুসলিম দলের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। ফলে মুসলিম দল নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চলার পর আল্লাহ মুহাম্মাদকে রসূলরূপে প্রেরণ করেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এ দিকে ইঙ্গিত করেই কুরআনে বলা হয়েছে “পরে আমি মুমিনদেরকে শক্তিশালী করলাম তাদের শত্রুদের মুকাবিলায়। ফলে তারা বিজয়ী হল।"

এ হাদীসটি সবচেয়ে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক। তাঁর বর্ণনায় এসেছে, ঈসা আ. আল্লাহর নিকট তাঁর মৃত্যুকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্যে দুআ করতেন, যাতে তিনি রিসালাতের দায়িত্ব পূর্ণ করতে পারেন। দাওয়াতী কাজ সম্প্রসারণ করতে পারেন এবং অধিক পরিমাণ লোক যাতে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে পারে। ইবনে জারীর বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ঈসা আ.-কে জানিয়ে দেন, অচিরেই তুমি দুনিয়া থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছ তখন তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হন। এ সময় তিনি হাওয়ারীগণকে দাওয়াত করেন। তাঁদের জন্যে খাদ্য প্রস্তুত করেন। তাঁদেরকে জানিয়ে দেন, রাত্রে তোমরা আমার নিকট আসবে, তোমাদের কাছে আমার প্রয়োজন আছে। হাওয়ারীগণ রাত্রে আসলে ঈসা আ. তাদেরকে নিজ হাতে খানা পরিবেশন করে খাওয়ান। আহার শেষে নিজেই তাঁদের হাত ধুয়ে দেন ও নিজের কাপড় দ্বারা তাঁদের হাত মুছে দেন। এ সব দেখে হাওয়ারীগণ আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং বিব্রত বোধ করলেন।

ঈসা আ. বললেন, দেখ, আমি যা কিছু করব কেউ যদি তার প্রতিবাদ করে তবে সে আমার শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমিও তার কেউ নই। তখন তারা তা মেনে নিলেন। আর ঈসা আ. বললেন, আমি আজ রাত্রে তোমাদের সাথে যে আচরণ করলাম, তোমাদের সেবা করলাম, খাদ্য পরিবেশন করলাম, হাত ধুয়ে দিলাম, এ যেন তোমাদের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকে। তোমরা জানো, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। সুতরাং তোমরা একে অপরের ওপর নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করবে না বরং নিজেকে অপরের চাইতে ছোট জ্ঞান করবে। তোমরা তো প্রত্যক্ষ করলে, কিভাবে আমি তোমাদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলাম। তোমরাও ঠিক এভাবে করবে, আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করবে এবং মনে প্রাণে দুআ করবে যেন তিনি আমার মৃত্যুকে পিছিয়ে দেন।

ঈসা আ.-এর কথা শোনার পর হাওয়ারীগণ যখন দুআ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং নিবিষ্ট চিত্তে দু'আ করতে বসলেন, তখন গভীর নিদ্রা তাঁদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। ফলে তাঁরা দুআ করতে সমর্থ হলেন না। ঈসা আ. তাদেরকে ঘুম থেকে জাগাবার চেষ্টা করেন এবং বলেন: কী আশ্চর্য! তোমরা কি মাত্র একটা রাত আমার জন্যে ধৈর্যধারণ করতে এবং আমাকে সাহায্য করতে পারবে না? তাঁরা বললেন, আল্লাহর কসম, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি পারছি না, আমাদের এ কী হল? আমরা তো প্রতি দিন রাত্রে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত জেগে থাকি, কথাবার্তা বলি; কিন্তু আজ রাত্রে তার কিছুই করতে পারছি না। যখনই দুআ করতে যাই তখনই ঘুম এসে মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন হযরত ঈসা আ. বললেন, রাখাল মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছে আর বকরীগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জাতীয় আরও বিভিন্ন কথা তিনি বলতে থাকেন এবং নিজের বিয়োগ ব্যথার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর ঈসা আ. বললেন আমি তোমাদেরকে একটি সত্য কথা বলছি— তোমাদের মধ্যে একজন আজ মোরগ ডাক দেওয়ার পূর্বে আমার সাথে তিনবার বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তোমাদের মধ্যে একজন সামান্য কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে শত্রুদের কাছে আমার সন্ধান বলে দেবে এবং আমার বিনিময়ে প্রাপ্তঅর্থ ভক্ষণ করবে। এরপর তারা সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল ও বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। এদিকে ইহুদিরা ঈসা আ.-কে সন্ধান করে ফিরছে। তারা শামউন নামক এক হওয়ারীকে ধরে বলল, এই ব্যক্তি ঈসার শিষ্য। কিন্তু সে অস্বীকার করে বলল, আমি ঈসার শিষ্য নই। এ কথা বললে, তারা শামউনকে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ পরে তাকে অন্য ইহুদিরা পাকড়াও করলে সে পূর্বের মতো উত্তর দিয়ে আত্মরক্ষা করল।

এমন সময় ঈসা আ. হঠাৎ মোরগের ডাক শুনতে পান। মোরগের ডাক শুনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং কাঁদতে থাকেন। প্রভাত হওয়ার পর জনৈক হাওয়ারী ইহুদিদের নিকট গিয়ে বলল, আমি যদি তোমাদেরকে ঈসা মাসীহর সন্ধান দিই, তা হলে তোমরা আমাকে কী পুরস্কার দিবে? ইহুদিরা তাকে ত্রিশটি দিরহাম দিল, বিনিময়ে সে তাদের নিকট তাঁর সন্ধান বলে দিল। কিন্তু এর পূর্বেই তাকে ঈসার অনুরূপ চেহারা দান করা হয় এবং তাদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলা হয়। ফলে তাকেই তারা পাকড়াও করে রশি দ্বারা শক্ত করে বাঁধল এবং একথা বলতে বলতে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে গেল, তুমিই তো মৃতকে জীবিত করতে, জীন-ভূত তাড়াতে, পাগল মানুষকে সুস্থ করে দিতে। এখন এই রশির বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত কর দেখি! তারা তার ওপর থুথু নিক্ষেপ করল, দেহে কাঁটা ফুটাল এবং যেই ক্রুশে বিদ্ধ করার জন্যে স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে তাকে নিয়ে আসল।

ইতঃমধ্যে ঈসা আ.-কে আল্লাহ নিজ সান্নিধ্যে তুলে নিলেন এবং ইহুদিরা ওই চেহারা পরিবর্তিত ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করল। ক্রুশের ওপর লাশ সাত দিন পর্যন্ত ঝুলে ছিল। এরপর ঈসা আ.-এর মা এবং অন্য এক মহিলা যে পাগল ছিল এবং যাকে ঈসা আ, সুস্থ করেছিলেন উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ক্রুশবিদ্ধ লোকটির কাছে আসলেন। তখন হযরত ঈসা আ.-তাঁদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কাঁদছেন কেন? তাঁরা বললেন, আমরা তো তোমার জন্যে কাঁদছি। ঈসা আ. বললেন, আমাকে আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং উত্তম অবস্থায় রেখেছেন আর এই যাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে, তার ব্যাপারে ইহুদিরা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে।

এরপর তিনি হাওয়ারীদের প্রতি নির্দেশ দিলেন যেন, অমুক স্থানে তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। নির্দেশ মতে এগারজন হাওয়ারী সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাতে মিলিত হন। সেই এক হাওয়ারী অনুপস্থিত থাকে, যে ঈসাকে দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করেছিল এবং ইহুদিদেরকে তাঁর সন্ধান বলে দিয়েছিল; তার সম্পর্কে ঈসা আ. শিষ্যদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে তারা জানালো, সে তার কর্মের ওপর অনুতপ্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঈসা আ. বললেন, যদি সে তওবা করত তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করতেন। এরপর তিনি ইয়াহইয়া নামক সেই যুবকের কথা জিজ্ঞেস করলেন, যে তাদেরকে অনুসরণ করত। তিনি বললেন, সে তোমাদের সাথেই আছে। এরপর ঈসা আ. বললেন, তোমরা এখান থেকে চলে যাও। কেন না অচিরেই তোমরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায় কথা বলবে। সুতরাং তাদেরকে সতর্ক করবে এবং দীনের দাওয়াত দিবে।

ইবনে আসাকির ইয়াহইয়া ইবনে হাবীবের সূত্রে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, মারিয়াম আ. ধারণা করেছিলেন, সে তাঁরই পুত্র। তাই তিনি ঘটনার সাত দিন পর বাদশার লোকদের নিকট গিয়ে লাশটি নামিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান। তারা তাঁর আবেদনে সাড়া দেয় এবং সেখানেই লাশটি দাফন করা হয়। তারপর মারিয়াম আ. হযরত ইয়াহইয়া আ. মাকে বললেন: চল! আমরা মাসীহর কবর যিয়ারত করে আসি। উভয়ে রওনা হলেন। কবরের কাছাকাছি পৌঁছলে মারিয়াম আ. ইয়াহইয়া আ. এর মাকে বললেন, পর্দা কর! ইয়াহইয়ার মা বললেন, কার থেকে পর্দা করব? বললেন: কেন কবরের কাছে ওই যে লোকটিকে দেখা যায়, তার থেকে! ইয়াহইয়া আ. এর মা বললেন, কী বলছ? আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! মারিয়াম আ. তখন ভাবছেন, ওনি জিবরাঈল ফিরিশতা হবেন। বস্তুত জিবরাঈল আ.-কে তিনি বহু পূর্বে দেখেছিলেন।

মোটকথা, ইয়াহইয়া আ. এর মাকে সেখানে রেখে মারিয়াম আ. কবরের কাছে গেলেন। কবরের নিকট গেলে তিনি তাঁকে চিনতে পারেন। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! কোথায় যাচ্ছ? মারিয়াম আ. বললেন, মাসীহর কবর যিয়ারত করতে এবং তাঁকে সালাম জানাতে। জিবরাঈল আ. বললেন, মারিয়াম! এ তো মাসীহ নয়। তাঁকে তো আল্লাহ তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন, কাফিরদের হাত থেকে তাঁকে পবিত্র করেছেন। তবে কবরবাসীকে মাসীহর আকৃতি বদলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকেই ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছে। এর নিদর্শন হচ্ছে, ওই লোকটির পরিবারের লোকজন একে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কোথাও তার সন্ধান পাচ্ছে না এবং তার কি হয়েছে তাও তারা জানে না; এর জন্যে তারা কেবল কান্নাকাটি করে ফিরছে। তুমি অমুক দিন অমুক বাগানের নিকট আসলে মাসীহর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে। এ কথা বলে জিবরাঈল আ. সেখান থেকে প্রস্থান করেন। মারিয়াম আ. তার বোনের নিকট ফিরে এসে জিবরাঈল আ. এর ব্যাপারে জানালেন এবং বাগানের বিষয়টিও বললেন। নির্দিষ্ট দিনে মারিয়াম আ. সেই বাগানের নিকট গেলে সেখানে মাসীহকে দেখতে পান। ঈসা আ. মাকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসেন, মা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর মাথায় চুম্বন দেন। তিনি পূর্বের মত তাঁর জন্যে দুআ করেন। তারপর বলেন, মা! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে হত্যা করতে পারেনি, আল্লাহ আমাকে তাঁর সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দিয়েছেন। অচিরেই আপনার মৃত্যু হবে। ধৈর্য ধরুন ও বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করুন। ঈসা আ. ঊর্ধ্বলোকে চলে গেলেন। এরপর মারিয়াম আ. সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ঈসার আর সাক্ষাৎ হয়নি। রাবী বলেন, ঈসা আ.-এর ঊর্ধ্ব্বারোহণের পরে তাঁর মা পাঁচ বছর জীবিত ছিলেন এবং তিপ্পান্ন বছর বয়সকালে তিনি ইনতিকাল করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ঈসা আ.-এর আয়ু

📄 হযরত ঈসা আ.-এর আয়ু


হাসান বসরী রহ. বলেছেন, যেদিন হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে নেওয়া হয় সেদিন পর্যন্ত তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। কেউ কেউ বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলি রাযি. থেকে বর্ণিত: হযরত ঈসা আ.-কে রমযান মাসের ২২ তারিখের রাত্রে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হযরত আলি রাযি.-ও শত্রুদের বর্শার আঘাত পাওয়ার ৫ দিন পর রমযানের ২২ তারিখ রাত্রে ইনতেকাল করেন।

যাহহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর নিকটবর্তী হয়। তিনি এর ওপর বসেন। মা মারিয়াম আ. সেখানে উপস্থিত হন। পুত্রকে বিদায় জানান ও কান্নাকাটি করেন। তারপরে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। মারিয়াম আ. তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকেন। ঊর্ধ্বে উঠার সময় হযরত ঈসা আ. তাঁর মাকে নিজের চাদরখানা দিয়ে যান এবং বলেন, এটি হবে কিয়ামতের দিনে আমার ও আপনার মধ্যে পরিচয়ের উপায়। শিষ্য শামউনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের পাগড়িটি নিক্ষেপ করেন। হযরত ঈসা আ. যখন ওপরের দিকে উঠতে থাকেন, তখন মারিয়াম আ. হাতের আঙ্গুল উঠিয়ে ইঙ্গিতে তাঁকে বিদায় জানাতে থাকেন। যতক্ষণ না তিনি চোখের আড়ালে চলে যান। হযরত মরিয়াম ঈসা আ.-কে অত্যধিক স্নেহ করতেন। কেন না পিতা না থাকার কারণে ঈসা আ. পিতামাতা উভয়ের ভালোবাসা মাকেই দিতেন। সফরে হোক কিংবা বাড়িতে হোক হযরত মারিয়াম আ. ঈসা আ.-কে সর্বদা কাছে রাখতেন। মুহূর্তের জন্যেও দূরে যেতে দিতেন না।

হাসান বসরী রহ. বলেছেন, যেদিন হযরত ঈসা আ.-কে আসমানে নেওয়া হয় সেদিন পর্যন্ত তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। কেউ কেউ বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৩ বছর।

আমিরুল মুমিনীন হযরত আলি রাযি. থেকে বর্ণিত: হযরত ঈসা আ.-কে রমযান মাসের ২২ তারিখের রাত্রে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হযরত আলি রাযি.-ও শত্রুদের বর্শার আঘাত পাওয়ার ৫ দিন পর রমযানের ২২ তারিখ রাত্রে ইনতেকাল করেন।

যাহহাক রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ.-কে যখন আসমানে তুলে নেওয়া হয় তখন এক খণ্ড মেঘ তাঁর নিকটবর্তী হয়। তিনি এর ওপর বসেন। মা মারিয়াম আ. সেখানে উপস্থিত হন। পুত্রকে বিদায় জানান ও কান্নাকাটি করেন। তারপরে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। মারিয়াম আ. তাকিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকেন। ঊর্ধ্বে উঠার সময় হযরত ঈসা আ. তাঁর মাকে নিজের চাদরখানা দিয়ে যান এবং বলেন, এটি হবে কিয়ামতের দিনে আমার ও আপনার মধ্যে পরিচয়ের উপায়। শিষ্য শামউনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের পাগড়িটি নিক্ষেপ করেন। হযরত ঈসা আ. যখন ওপরের দিকে উঠতে থাকেন, তখন মারিয়াম আ. হাতের আঙ্গুল উঠিয়ে ইঙ্গিতে তাঁকে বিদায় জানাতে থাকেন। যতক্ষণ না তিনি চোখের আড়ালে চলে যান। হযরত মরিয়াম ঈসা আ.-কে অত্যধিক স্নেহ করতেন। কেন না পিতা না থাকার কারণে ঈসা আ. পিতামাতা উভয়ের ভালোবাসা মাকেই দিতেন। সফরে হোক কিংবা বাড়িতে হোক হযরত মারিয়াম আ. ঈসা আ.-কে সর্বদা কাছে রাখতেন। মুহূর্তের জন্যেও দূরে যেতে দিতেন না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px