📄 প্রসিদ্ধ আসমানি চার কিতাব
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
📄 তূবা বৃক্ষের বর্ণনা
নবী ঈসা আ. একবার আল্লাহর নিকট নিবেদন করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তৃবা কী? আল্লাহ জানালেন, তৃবা একটি বৃক্ষের নাম। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করেছি। এটা প্রত্যেকটা জান্নাতের জন্যই। এর শিকড় রিওয়ানে এবং তার পানির উৎস তাসনীম। এর শিশির কপূরের মতো, এর স্বাদ আদার এবং ঘ্রাণ মিশকের মতো। যে ব্যক্তি এর থেকে একবার পান করবে সে কখনও পিপাসাবোধ করবে না।
ঈসা আ. বললেন, আমাকে একবার সে পানি পান করার সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন, সেই নবী পান করার পূর্বে অন্য নবীদের জন্যে এটা পান করা নিষিদ্ধ এবং সেই নবীর উম্মতরা পান করার পূর্বে অন্য নবীদের উম্মতদের জন্যে এর স্বাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে আনব। ঈসা আ. বললেন, প্রভু! কেন আমাকে উঠিয়ে নিবেন? আল্লাহ বললেন, আমি প্রথমে তোমাকে উঠিয়ে আনব। তারপর শেষ যামানায় আবার পৃথিবীতে পাঠাব। এতে তুমি সেই নবীর উম্মতের বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে পারবে এবং অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। কোনো এক নামাযের সময় তোমাকে পৃথিবীতে নামাব। কিন্তু তুমি তাদের নামাযে ইমামতি করবে না। কেন না তারা হচ্ছে রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। তাদের যিনি নবী, তারপর আর কোনো নবী নেই।
ইবনে আসাকির আবদুল্লাহ ইবনে আওসাজা থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ ওহির মাধ্যমে ঈসা ইবনে মারিয়াম আ.-কে বলেন, তোমার চিন্তা-ভাবনায় আমাকে নিত্য সাথী করে রাখ এবং তোমার আখেরাতের জন্যে আমাকে সম্বলরূপে রাখ। নফল ইবাদতের দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন কর, তা হলে আমি তোমাকে প্রিয় জানব। আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তোমার বন্ধু বানিয়ো না। এরূপ করলে তুমি লাঞ্ছিত হবে। বিপদে ধৈর্যধারণ কর এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাক। তোমার মধ্যে আমার সন্তুষ্টিকে জাগ্রত রাখ। কেন না তোমার সন্তুষ্টি আমার আনুগত্যে নিহিত, অবাধ্যতায় নয়। আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর, আমাকে সর্বদা স্মরণ রাখ। তোমার অন্তরে যেন আমার ভালোবাসা বিরাজ করে। অবসর সময়ে সদা সচেতন থাক। সূক্ষ্ম প্রজ্ঞাকে সুদৃঢ় কর। আমার প্রতি আগ্রহ ও ভীতি পোষণ কর।
আবু দাউদ তাঁর কিতাবে তাকদীর অধ্যায়ে লিখেছেন, তাউস থেকে বর্ণিত আছে: একবার ঈসা ইবনে মারিয়ামের সাথে ইবলিসের সাক্ষাৎ হয়। ঈসা আ. ইবলীসকে বললেন, তুমি তো জান, তোমার তাকদীরে যা লেখা হয়েছে তার ব্যতিক্রম কিছুতেই হবে না। ইবলীস বলল, তা হলে আপনি এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠুন এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে দেখুন জীবিত থাকেন কি-না। ঈসা আ. বললেন, তুমি জান না, আল্লাহ বলেছেন— বান্দা আমাকে পরীক্ষা করতে পারে না— আমি যা চাই তাই করে থাকি? যুহরী বলেছেন, মানুষ কোনো বিষয়ে আল্লাহকে পরীক্ষা করতে পারে না বরং আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আবু দাউদ বলেন, একবার শয়তান হযরত ঈসা আ. এর নিকটে এসে বলল: আপনি তো নিজেকে সত্যবাদী বলে মনে করেন, তা হলে আপনি ঊর্ধ্বে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়ুন দেখি। ঈসা আ. বললেন, তোমার অমঙ্গল হোক আল্লাহ কি এ কথা বলেন নি, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর। পবিত্র আত্মা অর্থাৎ জিবরাইল আ. ফেরেশতা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম। হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখি সদৃশ আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁৎকার দিতে। ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত; জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতি ক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমার থেকে বনি ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে, তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তারা বলেছিল, এ তো স্পষ্ট যাদু।
আমি গরিব ও মিসকিন লোকদেরকে তোমার একান্ত ভক্ত ও সাথী বানিয়েছি, যাদের উপরে তুমি সন্তুষ্ট। এমন সব শিষ্য ও সাহায্যকারী তোমাকে দিয়েছি, যারা তোমাকে জান্নাতের পথ প্রদর্শনকারী রূপে পেয়ে সন্তুষ্ট। জেনে রেখো, উক্ত গুণ দুটি বান্দার জন্যে প্রধান গুণ। যারা এ গুণ দুটি নিয়ে আমার কাছে আসবে, তারা আমার নিকট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মনোনীত বান্দা হিসেবে গণ্য হবে।
বনি ইসরাঈলরা তোমাকে বলবে, আমরা রোজা রেখেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি, নামায পড়েছি কিন্তু তা গৃহিত হয়নি, দান-সদকা করেছি কিন্তু তা মঞ্জুর হয়নি, উটের কান্নার মতো করুণ সুরে কেঁদেছি কিন্তু আমাদের কান্নার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়নি। এ সব অভিযোগের জবাব তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, এমনটা কেন হল? কোন জিনিসটি আমাকে এসব কবুল করা থেকে বাঁধা দিয়েছে? আসমান ও যমীনের সমস্ত ধনভাণ্ডার কি আমার হাতে নেই? আমি আমার ধনভাণ্ডার থেকে যেরূপ ইচ্ছা খরচ করে থাকি। কৃপণতা আমাকে স্পর্শ করে না। আমি কি প্রার্থনা শ্রবণের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম এবং দান করার ব্যাপারে সবচেয়ে উদার সত্তা নই? না আমার দান-অনুগ্রহ সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে? দুনিয়ার কেউ কারও প্রতি অনুগ্রহশীল হলে সে তো আমারই দয়ার কারণে তা করে থাকে।
হে ঈসা ইবনে মারিয়াম! ওই সম্প্রদায়ের লোকদের অন্তরে আমি যে সব সদগুণ প্রদান করেছিলাম, তারা যদি সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাত, তা হলে আখিরাতের জীবনের উপরে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিত না এবং বুঝতে পারত যে, কোথা থেকে তাদেরকে দান করা হয়েছে আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, মনের কামনা বাসনাই তাদের বড় দুশমন। তাদের রোযা আমি কিভাবে কবুল করি যখন হারাম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে? তাদের নামায আমি কিভাবে কবুল করি, যখন তাদের অন্তর ওই সব লোকদের প্রতি আকৃষ্ট যারা আমার বিরোধিতা করে এবং আমার নিষিদ্ধ বস্তুকে হালাল জানে? কি করে তাদের দান-সদকা আমি মঞ্জুর করি, যখন তারা মানুষের উপর জুলুম করে অবৈধ পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়।
হে ইসা! আমি ওই সব লোকদেরকে যথাযথ প্রতিদান দিব। হে ঈসা! তাদের কান্নায় আমি দয়া দেখাব কিভাবে, যখন তাদের হাত নবীদের রক্তে রঞ্জিত? এ কারণে তাদের প্রতি আমার ক্রোধ অতি মাত্রায় বেশি। হে ঈসা! যে দিন আমি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সে দিনই আমি চূড়ান্ত করে রেখেছি, যে ব্যক্তি আমার দাসত্ব কবুল করবে এবং তোমার ও তোমার মা সম্পর্কে আমার বাণীকে সঠিক বলে মেনে নিবে, তাকে আমি তোমার ঘরের প্রতিবেশী বানাব, সফরের সাথী করব এবং অলৌকিক ঘটনা প্রকাশে তোমার শরীক করব। যে দিন আমি আসমান যমিন সৃষ্টি করেছি, সেদিন আরো চূড়ান্ত করে রেখেছি, যেসব লোক তোমাকে ও তোমার মাকে আল্লাহর সাথে শরীফ করে প্রভু বানাবে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের সর্বনিম্নে স্থান দেব।
যেদিন আমি আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে রেখেছি, আমি আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদের হাতে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করব। তার উপরেই নবুয়ত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি টানব। তার জন্ম হবে মক্কায়, হিজরতস্থল (মদীনা) তাইয়্যিবা। শাম দেশ তার অধীন হবে। সে কর্কশভাষী ও কঠোরহৃদয় হবে না, বাজারে চিৎকার করে ফিরবে না, অশ্লীল-অশ্রাব্য কথাবার্তা বলবে না। প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্যে আমি তাকে তাওফিক দিব। সৎচরিত্রের যাবতীয় গুণাবলী তাকে প্রদান করব। তার অন্তর থাকবে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। জ্ঞান হবে প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার স্বভাব, ন্যায়বিচার তার চরিত্র, সত্য তার শরিয়ত, ইসলাম তার আদর্শ, নাম হবে তার আহমদ।
আমি তার সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সঠিক পথ দেখাব, অজ্ঞতা থেকে ফিরিয়ে জ্ঞানের দিকে আনব, নিঃস্ব অবস্থা থেকে স্বচ্ছলতার দিকে আনব, বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে উন্নতির সোপানে উঠাব। তার দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করব। তার সাহায্যে বধির ব্যক্তিকে শ্রবণশক্তি দান করব, আচ্ছাদিত হৃদয়সমূহকে উন্মুক্ত করে দিব, বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে সংযত করব। তার উম্মতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা দান করব। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে তাদের অভ্যুদয় ঘটবে। তারা মানুষকে ভালো কাজে আহবান জানাবে ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে। আমার নামে তারা নিষ্ঠাবান থাকবে। রাসূলের আনীত আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে।
তারা তাদের মসজিদে, সভা-সমিতিতে বাড়ি ঘরে ও চলতে ফিরতে সর্বাবস্থায় আমার তাসবীহ পাঠ করবে, পবিত্রতা ঘোষণা করবে ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়বে। তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় রুকু-সিজদার মাধ্যমে আমার জন্যে নামায আদায় করবে। আমার পথে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দুশমনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আল্লাহর পথে রক্ত দান হচ্ছে তাদের নিকট পুণ্যকর্ম। সুসংবাদের আশায় তাদের অন্তর ভরপুর, তাদের নেককাজসমূহ প্রদর্শনীযুক্ত। রাতের বেলায় তারা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল তাপস আর দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে সাক্ষাৎ সিংহ— এ সবই আমার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তাকে দিই। আমি মহা অনুগ্রহশীল।
বনি ইসরাঈলের মুনাফিক ও কাফির শ্রেণীর লোকেরা তাঁর সাথে উপহাস করে জিজ্ঞেস করত— বলুন তো, অমুক গতকাল কী খাবার খেয়েছে এবং বাড়িতে সে কি রেখে এসেছে? হযরত ঈসা আ. তাদের সঠিক জবাব দিয়ে দিতেন। এতে মুমিনদের ঈমান এবং কাফির ও মুনাফিকদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়ে যেত, এতদসত্ত্বেও ও হযরত ঈসা আ. এর মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর তিনি সালাত ও তাসবীহ আদায় করতেন। তাঁর কোনো স্থায়ী আবাসস্থল বা ঠিকানা ছিল না।
সর্বপ্রথম তিনি যে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন, সে ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ: একবার তিনি কোনো এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই কবরের নিকটে এক মহিলা বসে কাঁদছিল। ঈসা আ. মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? মহিলা বলল, আমার একটি মাত্র কন্যা ছিল। সে ছাড়া আমার আর কোনো সন্তান নেই। আমার সে কন্যাটি মারা গেছে। আমি আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি, হয় তিনি আমার কন্যাকে জীবিত করে দিবেন, না হয় আমিও তার মতো মারা যাব; এ জায়গা ত্যাগ করব না। আপনি এর দিকে একটু লক্ষ্য করুন। ঈসা আ. বললেন, আমি যদি লক্ষ্য করি তবে কি তুমি এখান থেকে ফিরে যাবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ তাই করব। তারপর হযরত ঈসা আ. দু রাকআত নামায আদায় করে কবরের পাশে এসে বসলেন এবং বললেন: ওহে অমুক! তুমি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও এবং বের হয়ে এস। তখন কবরটি সামান্য কেঁপে উঠল।
ঈসা আ. দ্বিতীয়বার আহবান করলেন। এবার কবরটি ফেটে গেল। তৃতীয়বার আহবান করলে কবরবাসিনী বেরিয়ে আসল এবং মাথার চুল থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। ঈসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বের হতে তোমার দেরি হল কেন? মেয়েটি বলল, প্রথম আওয়াজ শোনার পর আল্লাহ আমার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি আমার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি জোড়া লাগান। দ্বিতীয় আওয়াজের পর রূহ আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে। তৃতীয় আওয়াজ যখন হল তখন আমার ধারণা হল, এটা কিয়ামতের আওয়াজ। আমি ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল ও চোখের ভ্রু সব সাদা হয়ে গেছে। তারপর মেয়েটি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা! আপনি আমাকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ দুবার গ্রহণ করালেন কেন? মা! ধৈর্য ধরুন, পুণ্যের আশা করুন। দুনিয়ার ওপর থাকার কোনো আগ্রহ আমার নেই। হে রুহুল্লাহ! হে কালিমাতুল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি আখিরাতের জীবন ফিরিয়ে দেন এবং মৃত্যুর কষ্ট কমিয়ে দেন। ঈসা আ. আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। ফলে মেয়েটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল এবং তাকে কবরস্থ করা হল। এ সংবাদ ইহুদিদের নিকট পৌঁছলে তারা ঈসা আ.-এর প্রতি পূর্বের চেয়ে অধিক বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠল।
সুদ্দী হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। বনি ইসরাঈলের এক বাদশার মৃত্যু হয়। কবরস্থ করার জন্যে তাকে খাটের ওপর রাখা হয়। এ সময় হযরত ঈসা আ. সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন। ফলে বাদশা জীবিত হয়ে যায়। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে এ আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।
নবী ঈসা আ. একবার আল্লাহর নিকট নিবেদন করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তৃবা কী? আল্লাহ জানালেন, তৃবা একটি বৃক্ষের নাম। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করেছি। এটা প্রত্যেকটা জান্নাতের জন্যই। এর শিকড় রিওয়ানে এবং তার পানির উৎস তাসনীম। এর শিশির কপূরের মতো, এর স্বাদ আদার এবং ঘ্রাণ মিশকের মতো। যে ব্যক্তি এর থেকে একবার পান করবে সে কখনও পিপাসাবোধ করবে না।
ঈসা আ. বললেন, আমাকে একবার সে পানি পান করার সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন, সেই নবী পান করার পূর্বে অন্য নবীদের জন্যে এটা পান করা নিষিদ্ধ এবং সেই নবীর উম্মতরা পান করার পূর্বে অন্য নবীদের উম্মতদের জন্যে এর স্বাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে আনব। ঈসা আ. বললেন, প্রভু! কেন আমাকে উঠিয়ে নিবেন? আল্লাহ বললেন, আমি প্রথমে তোমাকে উঠিয়ে আনব। তারপর শেষ যামানায় আবার পৃথিবীতে পাঠাব। এতে তুমি সেই নবীর উম্মতের বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে পারবে এবং অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। কোনো এক নামাযের সময় তোমাকে পৃথিবীতে নামাব। কিন্তু তুমি তাদের নামাযে ইমামতি করবে না। কেন না তারা হচ্ছে রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। তাদের যিনি নবী, তারপর আর কোনো নবী নেই।
ইবনে আসাকির আবদুল্লাহ ইবনে আওসাজা থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ ওহির মাধ্যমে ঈসা ইবনে মারিয়াম আ.-কে বলেন, তোমার চিন্তা-ভাবনায় আমাকে নিত্য সাথী করে রাখ এবং তোমার আখেরাতের জন্যে আমাকে সম্বলরূপে রাখ। নফল ইবাদতের দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন কর, তা হলে আমি তোমাকে প্রিয় জানব। আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তোমার বন্ধু বানিয়ো না। এরূপ করলে তুমি লাঞ্ছিত হবে। বিপদে ধৈর্যধারণ কর এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাক। তোমার মধ্যে আমার সন্তুষ্টিকে জাগ্রত রাখ। কেন না তোমার সন্তুষ্টি আমার আনুগত্যে নিহিত, অবাধ্যতায় নয়। আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর, আমাকে সর্বদা স্মরণ রাখ। তোমার অন্তরে যেন আমার ভালোবাসা বিরাজ করে। অবসর সময়ে সদা সচেতন থাক। সূক্ষ্ম প্রজ্ঞাকে সুদৃঢ় কর। আমার প্রতি আগ্রহ ও ভীতি পোষণ কর।
আবু দাউদ তাঁর কিতাবে তাকদীর অধ্যায়ে লিখেছেন, তাউস থেকে বর্ণিত আছে: একবার ঈসা ইবনে মারিয়ামের সাথে ইবলিসের সাক্ষাৎ হয়। ঈসা আ. ইবলীসকে বললেন, তুমি তো জান, তোমার তাকদীরে যা লেখা হয়েছে তার ব্যতিক্রম কিছুতেই হবে না। ইবলীস বলল, তা হলে আপনি এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠুন এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে দেখুন জীবিত থাকেন কি-না। ঈসা আ. বললেন, তুমি জান না, আল্লাহ বলেছেন— বান্দা আমাকে পরীক্ষা করতে পারে না— আমি যা চাই তাই করে থাকি? যুহরী বলেছেন, মানুষ কোনো বিষয়ে আল্লাহকে পরীক্ষা করতে পারে না বরং আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আবু দাউদ বলেন, একবার শয়তান হযরত ঈসা আ. এর নিকটে এসে বলল: আপনি তো নিজেকে সত্যবাদী বলে মনে করেন, তা হলে আপনি ঊর্ধ্বে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়ুন দেখি। ঈসা আ. বললেন, তোমার অমঙ্গল হোক আল্লাহ কি এ কথা বলেন নি, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর। পবিত্র আত্মা অর্থাৎ জিবরাইল আ. ফেরেশতা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম। হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখি সদৃশ আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁৎকার দিতে। ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত; জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতি ক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমার থেকে বনি ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে, তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তারা বলেছিল, এ তো স্পষ্ট যাদু।
আমি গরিব ও মিসকিন লোকদেরকে তোমার একান্ত ভক্ত ও সাথী বানিয়েছি, যাদের উপরে তুমি সন্তুষ্ট। এমন সব শিষ্য ও সাহায্যকারী তোমাকে দিয়েছি, যারা তোমাকে জান্নাতের পথ প্রদর্শনকারী রূপে পেয়ে সন্তুষ্ট। জেনে রেখো, উক্ত গুণ দুটি বান্দার জন্যে প্রধান গুণ। যারা এ গুণ দুটি নিয়ে আমার কাছে আসবে, তারা আমার নিকট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মনোনীত বান্দা হিসেবে গণ্য হবে।
বনি ইসরাঈলরা তোমাকে বলবে, আমরা রোজা রেখেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি, নামায পড়েছি কিন্তু তা গৃহিত হয়নি, দান-সদকা করেছি কিন্তু তা মঞ্জুর হয়নি, উটের কান্নার মতো করুণ সুরে কেঁদেছি কিন্তু আমাদের কান্নার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়নি। এ সব অভিযোগের জবাব তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, এমনটা কেন হল? কোন জিনিসটি আমাকে এসব কবুল করা থেকে বাঁধা দিয়েছে? আসমান ও যমীনের সমস্ত ধনভাণ্ডার কি আমার হাতে নেই? আমি আমার ধনভাণ্ডার থেকে যেরূপ ইচ্ছা খরচ করে থাকি। কৃপণতা আমাকে স্পর্শ করে না। আমি কি প্রার্থনা শ্রবণের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম এবং দান করার ব্যাপারে সবচেয়ে উদার সত্তা নই? না আমার দান-অনুগ্রহ সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে? দুনিয়ার কেউ কারও প্রতি অনুগ্রহশীল হলে সে তো আমারই দয়ার কারণে তা করে থাকে।
হে ঈসা ইবনে মারিয়াম! ওই সম্প্রদায়ের লোকদের অন্তরে আমি যে সব সদগুণ প্রদান করেছিলাম, তারা যদি সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাত, তা হলে আখিরাতের জীবনের উপরে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিত না এবং বুঝতে পারত যে, কোথা থেকে তাদেরকে দান করা হয়েছে আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, মনের কামনা বাসনাই তাদের বড় দুশমন। তাদের রোযা আমি কিভাবে কবুল করি যখন হারাম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে? তাদের নামায আমি কিভাবে কবুল করি, যখন তাদের অন্তর ওই সব লোকদের প্রতি আকৃষ্ট যারা আমার বিরোধিতা করে এবং আমার নিষিদ্ধ বস্তুকে হালাল জানে? কি করে তাদের দান-সদকা আমি মঞ্জুর করি, যখন তারা মানুষের উপর জুলুম করে অবৈধ পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়।
হে ইসা! আমি ওই সব লোকদেরকে যথাযথ প্রতিদান দিব। হে ঈসা! তাদের কান্নায় আমি দয়া দেখাব কিভাবে, যখন তাদের হাত নবীদের রক্তে রঞ্জিত? এ কারণে তাদের প্রতি আমার ক্রোধ অতি মাত্রায় বেশি। হে ঈসা! যে দিন আমি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সে দিনই আমি চূড়ান্ত করে রেখেছি, যে ব্যক্তি আমার দাসত্ব কবুল করবে এবং তোমার ও তোমার মা সম্পর্কে আমার বাণীকে সঠিক বলে মেনে নিবে, তাকে আমি তোমার ঘরের প্রতিবেশী বানাব, সফরের সাথী করব এবং অলৌকিক ঘটনা প্রকাশে তোমার শরীক করব। যে দিন আমি আসমান যমিন সৃষ্টি করেছি, সেদিন আরো চূড়ান্ত করে রেখেছি, যেসব লোক তোমাকে ও তোমার মাকে আল্লাহর সাথে শরীফ করে প্রভু বানাবে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের সর্বনিম্নে স্থান দেব।
যেদিন আমি আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে রেখেছি, আমি আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদের হাতে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করব। তার উপরেই নবুয়ত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি টানব। তার জন্ম হবে মক্কায়, হিজরতস্থল (মদীনা) তাইয়্যিবা। শাম দেশ তার অধীন হবে। সে কর্কশভাষী ও কঠোরহৃদয় হবে না, বাজারে চিৎকার করে ফিরবে না, অশ্লীল-অশ্রাব্য কথাবার্তা বলবে না। প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্যে আমি তাকে তাওফিক দিব। সৎচরিত্রের যাবতীয় গুণাবলী তাকে প্রদান করব। তার অন্তর থাকবে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। জ্ঞান হবে প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার স্বভাব, ন্যায়বিচার তার চরিত্র, সত্য তার শরিয়ত, ইসলাম তার আদর্শ, নাম হবে তার আহমদ।
আমি তার সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সঠিক পথ দেখাব, অজ্ঞতা থেকে ফিরিয়ে জ্ঞানের দিকে আনব, নিঃস্ব অবস্থা থেকে স্বচ্ছলতার দিকে আনব, বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে উন্নতির সোপানে উঠাব। তার দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করব। তার সাহায্যে বধির ব্যক্তিকে শ্রবণশক্তি দান করব, আচ্ছাদিত হৃদয়সমূহকে উন্মুক্ত করে দিব, বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে সংযত করব। তার উম্মতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা দান করব। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে তাদের অভ্যুদয় ঘটবে। তারা মানুষকে ভালো কাজে আহবান জানাবে ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে। আমার নামে তারা নিষ্ঠাবান থাকবে। রাসূলের আনীত আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে।
তারা তাদের মসজিদে, সভা-সমিতিতে বাড়ি ঘরে ও চলতে ফিরতে সর্বাবস্থায় আমার তাসবীহ পাঠ করবে, পবিত্রতা ঘোষণা করবে ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়বে। তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় রুকু-সিজদার মাধ্যমে আমার জন্যে নামায আদায় করবে। আমার পথে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দুশমনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আল্লাহর পথে রক্ত দান হচ্ছে তাদের নিকট পুণ্যকর্ম। সুসংবাদের আশায় তাদের অন্তর ভরপুর, তাদের নেককাজসমূহ প্রদর্শনীযুক্ত। রাতের বেলায় তারা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল তাপস আর দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে সাক্ষাৎ সিংহ— এ সবই আমার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তাকে দিই। আমি মহা অনুগ্রহশীল।
বনি ইসরাঈলের মুনাফিক ও কাফির শ্রেণীর লোকেরা তাঁর সাথে উপহাস করে জিজ্ঞেস করত— বলুন তো, অমুক গতকাল কী খাবার খেয়েছে এবং বাড়িতে সে কি রেখে এসেছে? হযরত ঈসা আ. তাদের সঠিক জবাব দিয়ে দিতেন। এতে মুমিনদের ঈমান এবং কাফির ও মুনাফিকদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়ে যেত, এতদসত্ত্বেও ও হযরত ঈসা আ. এর মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর তিনি সালাত ও তাসবীহ আদায় করতেন। তাঁর কোনো স্থায়ী আবাসস্থল বা ঠিকানা ছিল না।
সর্বপ্রথম তিনি যে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন, সে ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ: একবার তিনি কোনো এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই কবরের নিকটে এক মহিলা বসে কাঁদছিল। ঈসা আ. মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? মহিলা বলল, আমার একটি মাত্র কন্যা ছিল। সে ছাড়া আমার আর কোনো সন্তান নেই। আমার সে কন্যাটি মারা গেছে। আমি আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি, হয় তিনি আমার কন্যাকে জীবিত করে দিবেন, না হয় আমিও তার মতো মারা যাব; এ জায়গা ত্যাগ করব না। আপনি এর দিকে একটু লক্ষ্য করুন। ঈসা আ. বললেন, আমি যদি লক্ষ্য করি তবে কি তুমি এখান থেকে ফিরে যাবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ তাই করব। তারপর হযরত ঈসা আ. দু রাকআত নামায আদায় করে কবরের পাশে এসে বসলেন এবং বললেন: ওহে অমুক! তুমি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও এবং বের হয়ে এস। তখন কবরটি সামান্য কেঁপে উঠল।
ঈসা আ. দ্বিতীয়বার আহবান করলেন। এবার কবরটি ফেটে গেল। তৃতীয়বার আহবান করলে কবরবাসিনী বেরিয়ে আসল এবং মাথার চুল থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। ঈসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বের হতে তোমার দেরি হল কেন? মেয়েটি বলল, প্রথম আওয়াজ শোনার পর আল্লাহ আমার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি আমার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি জোড়া লাগান। দ্বিতীয় আওয়াজের পর রূহ আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে। তৃতীয় আওয়াজ যখন হল তখন আমার ধারণা হল, এটা কিয়ামতের আওয়াজ। আমি ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল ও চোখের ভ্রু সব সাদা হয়ে গেছে। তারপর মেয়েটি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা! আপনি আমাকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ দুবার গ্রহণ করালেন কেন? মা! ধৈর্য ধরুন, পুণ্যের আশা করুন। দুনিয়ার ওপর থাকার কোনো আগ্রহ আমার নেই। হে রুহুল্লাহ! হে কালিমাতুল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি আখিরাতের জীবন ফিরিয়ে দেন এবং মৃত্যুর কষ্ট কমিয়ে দেন। ঈসা আ. আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। ফলে মেয়েটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল এবং তাকে কবরস্থ করা হল। এ সংবাদ ইহুদিদের নিকট পৌঁছলে তারা ঈসা আ.-এর প্রতি পূর্বের চেয়ে অধিক বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠল।
সুদ্দী হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। বনি ইসরাঈলের এক বাদশার মৃত্যু হয়। কবরস্থ করার জন্যে তাকে খাটের ওপর রাখা হয়। এ সময় হযরত ঈসা আ. সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন। ফলে বাদশা জীবিত হয়ে যায়। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে এ আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।
📄 আসমানি খাদ্য
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ইয ক্বালা আল-হাওয়ারিইউনা ইয়া ঈসা ইবনা মারিয়ামা হাল ইয়াস্তাতিউ রব্বুকা আই ইয়ুনানযিলা আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই ক্বালা ইত্তাকুল্লাহ ইন কুনতুম মুমিনীন (১১২) ক্বালু নুরীদু আন নাকুলা মিনহা অয় তাতমাইননা ক্বুলুবুনা অয়া নালামা আন ক্বদ সাদাক্বতানা অয়া নাকুনা আলাইহা মিনাশ শাহিদীন (১১৩) ক্বালা ঈসা ইবনু মারিয়ামা আল্লাহুম্মা রব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই তাকুনু লানা ঈদান লিআওয়ালিনা অয়া আখিরিনা অয়া আয়াতাম মিনকা অয়ারযুক্বনা অয়া আনতা খইরুর রজি ক্বীন (১১৪) ক্বালািল্লাহু ইন্নী মুনানযিলুহা আলাইকুম ফামাই ইয়াকফুর বাদু মিনকুম ফাইন্নী আআয্যিবুহু আযাবাল লা আআয্যিবুহু আহাদাম মিনাল আলামীন
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলেছিল, হে মারিয়াম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) প্রেরণ করতে সক্ষম? সে বলেছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। তারা বলেছিল, আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাব এবং আমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলেছ এবং আমরা এর সাক্ষী থাকতে চাই। মারিয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; এটা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্যে হবে আনন্দ-উৎসব স্বরূপ ও তোমার নিকট হতে নিদর্শন। এবং আমাদেরকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বললেন, আমিই তোমাদের নিকট এটা প্রেরণ করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরী করলে তাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকেও দিব না।" (সূরা মায়িদা: ১১২-১১৫)
তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় খাঞ্চা অবতরণ প্রসঙ্গে সেই সব হাদীসে উল্লেখ আছে যা হযরত ইবনে আব্বাস, সালমান ফারসী, ইবনে ইয়াসির প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ:
হযরত ঈসা আ. হাওয়ারীগণকে ত্রিশ দিন রোযা পালনের নির্দেশ দেন। তারা ত্রিশ দিন সওম পালন শেষে হযরত ঈসা আ.-এর নিকট আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবদার জানায়। উদ্দেশ্য ছিল তারা আল্লাহর প্রেরিত এ খাদ্য আহার করবে। তাদের রোযা ও দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন এ ব্যাপারে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করবে, সওমের মেয়াদ শেষে রোযা ভঙ্গের দিনে ঈদ উৎসব পালন করবে, তাদের পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষ এবং ধনী ও দরিদ্র সকলের জন্যে তা আনন্দের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।
ঈসা আ. এ ব্যাপারে তাদেরকে অনেক উপদেশ দিলেন। তাঁর আশঙ্কা হল, এরা আল্লাহর এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে এবং এর শর্তাদি পূরণ করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু তারা তাদের আবদার পূরণ না হওয়া পর্যন্ত উপদেশ শুনতে প্রস্তুত হল না। অবশেষে তাদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করতে প্রস্তুত হন। তিনি নামাযে দণ্ডায়মান হলেন। পশম ও চুলের তৈরি কম্বল পরিধান করলেন এবং অবনত মস্তকে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলেন। তিনি আল্লাহর নিকট কাকুতি-মিনতি করে দুআ করলেন, যেন তাদের প্রার্থীত জিনিস তিনি দিয়ে দেন। সুতরাং আল্লাহ আসমান থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন।
মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, দুটি মেঘের মাঝখান থেকে খাঞ্চাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। খাঞ্চাটি যতই পৃথিবীর নিকটবর্তী হচ্ছিল, ততই হযরত ঈসা আ. বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দুআ করছিলেন, "হে আল্লাহ! একে তুমি রহমত বরকত ও শান্তি হিসেবে দান কর। শাস্তি হিসেবে দিও না।" খাঞ্চাটি ক্রমান্বয়ে নেমে এসে একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সম্মুখে মাটির ওপর থামল। খাঞ্চাটি ছিল রুমাল দিয়ে ঢাকা। ঈসা আ. 'বিসমিল্লাহি খায়রুর রাজিক্বীন' বলে রুমালখানা উঠালেন। দেখলেন তাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি আছে। কেউ বলেছেন, এর সাথে সিরকা ছিল। কেউ বলেছেন, ডালিম এবং ফল ফলাদিও ছিল। উক্ত খাদ্য দ্রব্যগুলো ছিল অত্যন্ত সুগন্ধিময়। আল্লাহ বলেছিলেন, 'হও' আর তাতেই তা হয়ে গিয়েছিল।
তারপর ঈসা আ. তাদেরকে খাওয়ার জন্যে আহবান করেন। তারা বলল, আপনি প্রথমে খাওয়া আরম্ভ করুন তারপরে আমরা খাব। হযরত ঈসা আ. বললেন, এ খাঞ্চার জন্যে তোমরাই প্রথমে আবেদন করেছিলে; কিন্তু প্রথমে খেতে তারা কিছুতেই রাজি হল না। হযরত ঈসা আ. তখন ফকীর, মিসকীন, অভাবগ্রস্ত রোগাক্রান্ত ও পঙ্গুদেরকে খাওয়ার আদেশ দেন। এ জাতীয় লোকদের সংখ্যা ছিল তেরশ'। সকলেই তা থেকে খেল। ফলে দুঃখ-দুর্দশা ও রোগ-শোক যার যে সমস্যা ছিল, এ খাদ্যের বরকতে তা থেকে সে নিরাময় লাভ করল। যারা খেতে অস্বীকার করেছিল তা দেখে তারা খুবই লজ্জিত হল ও অনুশোচনা করতে লাগল। কথিত আছে, এ খাঞ্চা প্রতিদিন একবার করে আসত। লোক এ থেকে তৃপ্তি সহকারে আহার করত। খাদ্য একটুও হ্রাস পেতো না। প্রথম দল যেভাবে আহার করত, শেষের দলও ঐ একইভাবে আহার করত। কথিত আছে, প্রতিদিন সাত হাজার লোক ঐ খাদ্য আহার করত।
কিছুদিন অতিবাহিত হলে একদিন পর পর খাঞ্চা অবতরণ করত। যেমন সালেহ আ.-এর উটনীর দুধ একদিন পর পর লোকেরা পান করত। এরপর আল্লাহ হযরত ঈসা আ.-কে আদেশ দেন, এখন থেকে খাঞ্চার খাবার শুধু দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকেরাই আহার করবে। ধনী লোকেরা তা থেকে আহার করতে পারবে না। এ নির্দেশ অনেককেই পীড়া দেয়। মুনাফিকরা এ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করল। ফলে আসমানী খাঞ্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল এবং সমালোচনাকারীরা শূকরে পরিণত হল।
আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত বকর ইবনে আবদিল্লাহ মুযানী থেকে বর্ণনা করেন: একবার হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা আ.-কে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জনৈক ব্যক্তি তাদেরকে বলল, তিনি সমুদ্রের দিকে গিয়েছেন। তারা সন্ধান করতে করতে সমুদ্রের দিকে গেল। সমুদ্রের তীরে গিয়ে দেখেন, তিনি পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন। সমুদ্রের তরঙ্গ একবার তাঁকে উপরে উঠাচ্ছে এবার নিচে নামাচ্ছে। একটি চাদরের অর্ধেক গায়ের উপর দিয়ে রেখেছেন আর বাকী অর্ধেক তাঁর পরিধানে আছে। পানির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁদের নিকটে আসেন। তাঁদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিটি বললেন, “হে আল্লাহর নবী! আমি কি আপনার নিকট আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এস, যখন তিনি এক পা পানিতে রেখে অন্য পা তুলেছেন, অমনি চিৎকার করে উঠেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো ডুবে গেলাম। হযরত ঈসা আ. বললেন, ওহে দুর্বল ঈমানদার! তোমার হাত আমার দিকে বাড়াও। কোনো আদম সন্তানের যদি একটা যব পরিমাণও ঈমান থাকে তা হলে সে পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারে।
আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী থেকে অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়ায থেকে বর্ণনা করেন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে ঈসা! আপনি কিসের সাহায্যে পানির উপর দিয়ে হাঁটেন? তিনি বললেন, ঈমান ও ইয়াকীনের বলে। উপস্থিত লোকেরা বলল, আপনি যেমন ইয়াকীন রাখেন, আমরাও তেমনি ইয়াকীন রাখি। হযরত ঈসা আ. বললেন, তাই যদি হয় তা হলে তোমরাও পানির উপর দিয়ে হেঁটে চল। তখন তারা নবী ঈসার সাথে পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু ঢেউ আসা মাত্রই তারা সকলেই ডুবে গেল। নবী বললেন, তোমাদের কী হল? তারা বলল, আমরা ঢেউ দেখে ভীত হয়ে গিয়েছিলাম। নবী বললেন, কত ভালো হত, যদি ঢেউ এর মালিককে তোমরা ভয় করতে! এরপর তিনি তাদেরকে বের করে আনলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি মাটিতে হাত মেরে এক মুষ্টি মাটি নিলেন। পরে হাত খুললে দেখা গেল এক হাতে স্বর্ণ এবং অন্য হাতে মাটির ঢেলা কিংবা কঙ্কর। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু'হাতের কোন্টর বস্তু তোমাদের কাছে প্রিয়তর? তারা বলল, স্বর্ণ। নবী বললেন, আমার নিকট স্বর্ণ ও মাটি উভয়ই সমান। হযরত ঈসা আ. পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, গাছের পাতা আহার করতেন। তাঁর বসবাসের কোনো ঘরবাড়ী ছিল না। পরিবার ছিল না, অর্থ সম্পদ ছিল না এবং আগামী দিনের জন্যে কিছু সঞ্চয় করেও তিনি রাখতেন না। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তাঁর মায়ের সূতা কাটার চরকার আয় থেকে আহার করতেন।
ফুযায়ল ইবনে ইয়ায, ইউনুস ইবনে উবায়দ সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. বলতেন: যতক্ষণ আমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে বিমুখ হতে না পারব, ততক্ষণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারব না। হযরত ঈসা আ. বলতেন, আমি সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছি। তাতে আমি দেখেছি, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায় যাকে সৃষ্টি করা হয় নি, সে-ই আমার কাছে বেশি ঈর্ষণীয়।
ইসহাক ইবনে বিশর হযরত হাসান রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন হযরত ঈসা আ. হবেন সংসার-বিমুখদের নেতা। তিনি আরও বলেছেন : কিয়ামতের দিন পাপ থেকে পলায়নকারী লোকদের হাশর হবে ঈসা আ.-এর সাথে। রাবী আরও বলেন: একদিন হযরত ঈসা আ. একটি পাথরের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। তিনি গভীর নিন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এমন সময় ওই স্থান দিয়ে ইবলিস যাচ্ছিল। সে বলল, "ওহে ঈসা! তুমি বলে থাক না, দুনিয়ার কোনো বস্তুর প্রতি তোমার আগ্রহ নেই? কিন্তু এই পাথরটি তো দুনিয়ার বস্তু।" তখন হযরত ঈসা আ. পাথরটি ধরে তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, দুনিয়ার সাথে এটিও তুই নিয়ে যা।
মুতামির ইবনে সুলাইমান বলেন, একবার হযরত ঈসা আ. তাঁর শিষ্যদের সাথে নিয়ে বের হন। তাঁর পরিধানে ছিল পশমের জুব্বা ও চাদর। তাঁর পায়ে কোনো জুতা ছিল না। তিনি ছিলেন ক্রন্দনরত। তাঁর মাথার চুল ছিল এলোমেলো। ক্ষুধার তীব্রতায় চেহারা ছিল ফ্যাকাশে। পিপাসায় ঠোঁট দু'টি শুষ্ক। এ অবস্থায় তিনি বনি ইসরাঈলের লোকদেরকে সালাম দিয়ে বললেন: আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি দুনিয়াকে তার সঠিক অবস্থানে রেখেছি। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এবং এর জন্যে আমার গৌরবেরও কিছু নেই। তোমরা কি জান, আমার ঘর কোথায়? তারা বলল, হে রুহুল্লাহ! কোথায় আপনার ঘর? তিনি বললেন: আমার ঘর হল মসজিদ, পানি দিয়েই আমার অঙ্গসজ্জা। ক্ষুধাই আমার ব্যঞ্জন। রাতের চাঁদ আমার বাতি, শীতকালে আমার সালাত পূর্বাচল, শাক-সব্জিই আমার জীবিকা, মোটা পশমই আমার পরিধেয়। আল্লাহর ভয়ই আমার পরিচিতি, পঙ্গু ও নিঃস্বরা আমার সঙ্গী-সাথী। আমি যখন সকালে উঠি তখন আমার হাত শূন্য, যখন সন্ধ্যা হয় তখনও আমার হাতে কিছু থাকে না। এতে আমি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত এবং নিরুদ্বিগ্ন। সুতরাং আমার চাইতে ধনী ও সচ্ছল আর কে আছে?
আবু মুসআব মালিক থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বনি ইসরাঈলদেরকে বলতেন: খালি পানি পান কর, তাজা সবজি খাও এবং যবের রুটি আহার কর। গমের রুটি খেয়ো না যেন। কেন না তোমরা এর শোকর আদায় করতে পারবে না। ইবনে ওহাব হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলতেন: তোমরা দুনিয়া অতিক্রম করে যাও। একে আবাদ করো না। তিনি বলতেন: দুনিয়ার মহব্বত সকল গুনাহের মূল এবং কুদৃষ্টি অন্তরের মধ্যে কামভাব উৎপন্ন করে। অবশ্য অন্য বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কামনা-বাসনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখে ফেলে। হযরত ঈসা আ. বলতেন, হে দুর্বল চিন্তা আদম-সন্তান! যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, দুনিয়ায় মেহমান হিসেবে জীবন যাপন কর। মসজিদকে নিজের ঘর বানাও। চক্ষুদ্বয়কে কাঁদতে শিখাও, দেহকে ধৈর্যধারণ করতে ও অন্তরকে চিন্তা করতে অভ্যস্ত কর। আগামী দিনের খাদ্যের জন্যে দুশ্চিন্তা করো না এটা পাপ। তিনি বলতেন, 'সমুদ্রের তরঙ্গের উপরে ঘর বানান যেমন সম্ভব নয় তেমনি দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকাও সম্ভব নয়।'
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: মুমিনের অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ও আখিরাতের মহব্বত একত্রে থাকতে পারে না, যেভাবে একত্রে থাকতে পারে না একই পাত্রে আগুন ও পানি। ইবরাহীম হারবী হযরত আবু আবদুল্লাহ সূফি রহ. এর সূত্রে বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: দুনিয়া অন্বেষণকারী লোক সমুদ্রের পানি পানকারীর সাথে তুলনীয়। সমুদ্রের পানি যত বেশি পান করবে তত বেশি পিপাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তা তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিবে। আর শয়তান দুনিয়া অন্বেষণ ও কামনাকে আকর্ষণীয় করে এবং প্রবৃত্তির লালসার সময় শক্তি যোগায়।
বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. বলেছেন যে ব্যক্তি ইলম শিখে অন্যকে শেখায় এবং সে মতে আমল করে, ঊর্ধ্বজগতে তাকে বিরাট সম্মানে ভূষিত করা হয়। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: যে ইলম তোমাকে কাজের ময়দানে নিয়ে যায় না, কেবল মজলিস মাহফিলে নিয়ে যায়, তাতে কোনো কল্যাণ নেই। আরও বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বনি ইসরাঈলের মাঝে গিয়ে এক ভাষণে বলেন: হে হাওয়ারীগণ! অযোগ্য লোকদের নিকট হিকমতের কথা বলো না। এরূপ করলে হিকমত ও প্রজ্ঞাকে হেয় করা হবে। কিন্তু যোগ্য লোকদের নিকট তা বলতে কৃপণতা কর না। তা হলে তাদের উপর অবিচার করা হবে। স্মরণ রেখো! যে কোনো বিষয়ের তিনটি অবস্থা হতে পারে। যথা— (১) যার উত্তম হওয়া স্পষ্ট; এগুলোর অনুসরণ কর। (২) যার মন্দ হওয়া স্পষ্ট; এর থেকে দূরে থাক; (৩) যার ভাল বা মন্দ হওয়া সন্দেহযুক্ত; তার ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দাও।
আবদুর রাযযাক হযরত ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলেছেন: শূকরের কাছে মুক্তা ছড়িয়ো না। কেন না মুক্তা দিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। জ্ঞানপূর্ণ কথা ওই ব্যক্তিকে বলো না, যে তা শুনতে চায় না। কেন না জ্ঞানপূর্ণ কথা মুক্তার চাইতেও মূল্যবান আর যে তা চায় না, সে শূকরের চেয়েও অধম। ইকরামা আরও বর্ণনা করেন, ঈসা আ. হওয়ারীদেরকে বলেছেন: তোমরা হচ্ছ পৃথিবীতে লবণ তুল্য। যদি নষ্ট হয়ে যাও তবে তোমাদের জন্য কোনো ঔষধ নেই। তোমাদের মধ্যে মূর্খতার দুটি অভ্যাস আছে, (১) বিনা কারণে হাসা এবং (২) রাত্রি জাগরণ না করে সকালে উঠা। ইকরামা থেকে আরও বর্ণিত আছে, ঈসা আ.-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হল, কোন ব্যক্তির ফেতনা সবচাইতে মারাত্মক? তিনি বললেন: আলেমের পদস্খলন। কেন না আলেমের পদস্খলনে আরও বহু লোক বিপথগামী হয়ে যায়। রাবী আরও বলেন, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: হে জ্ঞান পাপীরা! দুনিয়াকে তোমরা মাথার উপরে রেখেছ আর আখেরাতকে রেখেছ পায়ের নিচে। তোমাদের কথাবার্তা যেন সর্বরোগের নিরাময় হয়। কিন্তু তোমাদের কার্যকলাপ হচ্ছে মহাব্যাধি। তোমাদের উপমা হচ্ছে সেই মাকাল গাছ যা দেখলে মানুষ আকৃষ্ট হয় কিন্তু তার ফল খেলে মারা যায়।
ওহাব থেকে বর্ণিত, ঈসা আ. বলেছেন: হে নিকৃষ্ট জ্ঞান পাপীরা! তোমরা জান্নাতের দরজায় বসে আছ, কিন্তু তাতে প্রবেশ করছো না আর নিঃস্বদেরকে তাতে প্রবেশ করার জন্যে আহবানও করছ না। আল্লাহর নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট মানুষ সেই জ্ঞানী ব্যক্তি, যে তার জ্ঞানের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জন করে। মাকহুল বর্ণনা করেন, একবার হযরত ঈসা আ.-এর সাথে ইয়াহইয়া আ.-এর সাক্ষাৎ হয়। তখন হযরত ঈসা আ. হাসিমুখে তাঁর সাথে মুসাফা করেন। ইয়াহইয়া আ. বললেন, কি খালাত ভাই! হাসছেন যে! মনে হচ্ছে আপনি নিরাপদ হয়ে গেছেন? ঈসা আ. বললেন, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন, নৈরাশ্যে ভুগছ না কি? তখন আল্লাহ উভয়ের নিকট ওহী প্রেরণ করে জানালেন, 'তোমাদের দুজনের মধ্যে সেই আমার নিকট প্রিয়তর, যে তার সঙ্গীর সাথে অধিকতর হাসিমুখে মিলিত হয়।'
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা একটি কবরের পাশে থামলেন। ওই কবরবাসী সঙ্কীর্ণাবস্থায় ছিল। তখন সঙ্গীরা কবরের সঙ্কীর্ণতা নিয়ে আলাপ করতে লাগলেন। তাদের কথা শুনে ঈসা আ. বললেন: তোমরা মায়ের পেটে এর চেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থানে ছিলে। তারপরে আল্লাহ যখন চাইলেন, প্রশস্ত জায়গায় নিয়ে আসলেন। আবু ওমর বলেন, ঈসা আ. যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা করতেন, তখন তাঁর চামড়া ভেদ করে রক্ত ঝরে পড়ত। হযরত ঈসা আ. থেকে এ জাতীয় অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। হাফেজ ইবনে আসাকির তাঁর গ্রন্থে বহু উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু উল্লেখ করলাম।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন: ইয ক্বালা আল-হাওয়ারিইউনা ইয়া ঈসা ইবনা মারিয়ামা হাল ইয়াস্তাতিউ রব্বুকা আই ইয়ুনানযিলা আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই ক্বালা ইত্তাকুল্লাহ ইন কুনতুম মুমিনীন (১১২) ক্বালু নুরীদু আন নাকুলা মিনহা অয় তাতমাইননা ক্বুলুবুনা অয়া নালামা আন ক্বদ সাদাক্বতানা অয়া নাকুনা আলাইহা মিনাশ শাহিদীন (১১৩) ক্বালা ঈসা ইবনু মারিয়ামা আল্লাহুম্মা রব্বানা আনযিল আলাইনা মায়িদাতাম মিনাস সামাই তাকুনু লানা ঈদান লিআওয়ালিনা অয়া আখিরিনা অয়া আয়াতাম মিনকা অয়ারযুক্বনা অয়া আনতা খইরুর রজি ক্বীন (১১৪) ক্বালািল্লাহু ইন্নী মুনানযিলুহা আলাইকুম ফামাই ইয়াকফুর বাদু মিনকুম ফাইন্নী আআয্যিবুহু আযাবাল লা আআয্যিবুহু আহাদাম মিনাল আলামীন
"স্মরণ কর, হাওয়ারীগণ বলেছিল, হে মারিয়াম-তনয় ঈসা! তোমার প্রতিপালক কি আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্য পরিপূর্ণ খাঞ্চা (মায়িদা) প্রেরণ করতে সক্ষম? সে বলেছিল, আল্লাহকে ভয় কর, যদি তোমরা মুমিন হও। তারা বলেছিল, আমরা চাই যে, তা থেকে কিছু খাব এবং আমাদের অন্তর প্রশান্তি লাভ করবে। আর আমরা জানতে চাই যে, তুমি আমাদেরকে সত্য বলেছ এবং আমরা এর সাক্ষী থাকতে চাই। মারিয়াম-তনয় ঈসা বলল, হে আল্লাহ, আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্যে আসমান হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ কর; এটা আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্যে হবে আনন্দ-উৎসব স্বরূপ ও তোমার নিকট হতে নিদর্শন। এবং আমাদেরকে জীবিকা দান কর; তুমিই তো শ্রেষ্ঠ জীবিকাদাতা। আল্লাহ বললেন, আমিই তোমাদের নিকট এটা প্রেরণ করব; কিন্তু এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ কুফরী করলে তাকে এমন শাস্তি দিব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকেও দিব না।" (সূরা মায়িদা: ১১২-১১৫)
তাফসীর গ্রন্থে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় খাঞ্চা অবতরণ প্রসঙ্গে সেই সব হাদীসে উল্লেখ আছে যা হযরত ইবনে আব্বাস, সালমান ফারসী, ইবনে ইয়াসির প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার সারসংক্ষেপ:
হযরত ঈসা আ. হাওয়ারীগণকে ত্রিশ দিন রোযা পালনের নির্দেশ দেন। তারা ত্রিশ দিন সওম পালন শেষে হযরত ঈসা আ.-এর নিকট আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা অবতীর্ণ করার আবদার জানায়। উদ্দেশ্য ছিল তারা আল্লাহর প্রেরিত এ খাদ্য আহার করবে। তাদের রোযা ও দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন এ ব্যাপারে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করবে, সওমের মেয়াদ শেষে রোযা ভঙ্গের দিনে ঈদ উৎসব পালন করবে, তাদের পূর্বপুরুষ ও উত্তরপুরুষ এবং ধনী ও দরিদ্র সকলের জন্যে তা আনন্দের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে।
ঈসা আ. এ ব্যাপারে তাদেরকে অনেক উপদেশ দিলেন। তাঁর আশঙ্কা হল, এরা আল্লাহর এ নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে এবং এর শর্তাদি পূরণ করতে সক্ষম হবে না। কিন্তু তারা তাদের আবদার পূরণ না হওয়া পর্যন্ত উপদেশ শুনতে প্রস্তুত হল না। অবশেষে তাদের পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করতে প্রস্তুত হন। তিনি নামাযে দণ্ডায়মান হলেন। পশম ও চুলের তৈরি কম্বল পরিধান করলেন এবং অবনত মস্তকে কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলেন। তিনি আল্লাহর নিকট কাকুতি-মিনতি করে দুআ করলেন, যেন তাদের প্রার্থীত জিনিস তিনি দিয়ে দেন। সুতরাং আল্লাহ আসমান থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করেন।
মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, দুটি মেঘের মাঝখান থেকে খাঞ্চাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে আসছে। খাঞ্চাটি যতই পৃথিবীর নিকটবর্তী হচ্ছিল, ততই হযরত ঈসা আ. বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দুআ করছিলেন, "হে আল্লাহ! একে তুমি রহমত বরকত ও শান্তি হিসেবে দান কর। শাস্তি হিসেবে দিও না।" খাঞ্চাটি ক্রমান্বয়ে নেমে এসে একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং হযরত ঈসা আ.-এর সম্মুখে মাটির ওপর থামল। খাঞ্চাটি ছিল রুমাল দিয়ে ঢাকা। ঈসা আ. 'বিসমিল্লাহি খায়রুর রাজিক্বীন' বলে রুমালখানা উঠালেন। দেখলেন তাতে সাতটি মাছ ও সাতটি রুটি আছে। কেউ বলেছেন, এর সাথে সিরকা ছিল। কেউ বলেছেন, ডালিম এবং ফল ফলাদিও ছিল। উক্ত খাদ্য দ্রব্যগুলো ছিল অত্যন্ত সুগন্ধিময়। আল্লাহ বলেছিলেন, 'হও' আর তাতেই তা হয়ে গিয়েছিল।
তারপর ঈসা আ. তাদেরকে খাওয়ার জন্যে আহবান করেন। তারা বলল, আপনি প্রথমে খাওয়া আরম্ভ করুন তারপরে আমরা খাব। হযরত ঈসা আ. বললেন, এ খাঞ্চার জন্যে তোমরাই প্রথমে আবেদন করেছিলে; কিন্তু প্রথমে খেতে তারা কিছুতেই রাজি হল না। হযরত ঈসা আ. তখন ফকীর, মিসকীন, অভাবগ্রস্ত রোগাক্রান্ত ও পঙ্গুদেরকে খাওয়ার আদেশ দেন। এ জাতীয় লোকদের সংখ্যা ছিল তেরশ'। সকলেই তা থেকে খেল। ফলে দুঃখ-দুর্দশা ও রোগ-শোক যার যে সমস্যা ছিল, এ খাদ্যের বরকতে তা থেকে সে নিরাময় লাভ করল। যারা খেতে অস্বীকার করেছিল তা দেখে তারা খুবই লজ্জিত হল ও অনুশোচনা করতে লাগল। কথিত আছে, এ খাঞ্চা প্রতিদিন একবার করে আসত। লোক এ থেকে তৃপ্তি সহকারে আহার করত। খাদ্য একটুও হ্রাস পেতো না। প্রথম দল যেভাবে আহার করত, শেষের দলও ঐ একইভাবে আহার করত। কথিত আছে, প্রতিদিন সাত হাজার লোক ঐ খাদ্য আহার করত।
কিছুদিন অতিবাহিত হলে একদিন পর পর খাঞ্চা অবতরণ করত। যেমন সালেহ আ.-এর উটনীর দুধ একদিন পর পর লোকেরা পান করত। এরপর আল্লাহ হযরত ঈসা আ.-কে আদেশ দেন, এখন থেকে খাঞ্চার খাবার শুধু দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত লোকেরাই আহার করবে। ধনী লোকেরা তা থেকে আহার করতে পারবে না। এ নির্দেশ অনেককেই পীড়া দেয়। মুনাফিকরা এ নিয়ে বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করল। ফলে আসমানী খাঞ্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেল এবং সমালোচনাকারীরা শূকরে পরিণত হল।
আবু বকর ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত বকর ইবনে আবদিল্লাহ মুযানী থেকে বর্ণনা করেন: একবার হাওয়ারীগণ হযরত ঈসা আ.-কে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জনৈক ব্যক্তি তাদেরকে বলল, তিনি সমুদ্রের দিকে গিয়েছেন। তারা সন্ধান করতে করতে সমুদ্রের দিকে গেল। সমুদ্রের তীরে গিয়ে দেখেন, তিনি পানির উপর দিয়ে হাঁটছেন। সমুদ্রের তরঙ্গ একবার তাঁকে উপরে উঠাচ্ছে এবার নিচে নামাচ্ছে। একটি চাদরের অর্ধেক গায়ের উপর দিয়ে রেখেছেন আর বাকী অর্ধেক তাঁর পরিধানে আছে। পানির উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তাঁদের নিকটে আসেন। তাঁদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিটি বললেন, “হে আল্লাহর নবী! আমি কি আপনার নিকট আসব? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এস, যখন তিনি এক পা পানিতে রেখে অন্য পা তুলেছেন, অমনি চিৎকার করে উঠেন, হে আল্লাহর নবী! আমি তো ডুবে গেলাম। হযরত ঈসা আ. বললেন, ওহে দুর্বল ঈমানদার! তোমার হাত আমার দিকে বাড়াও। কোনো আদম সন্তানের যদি একটা যব পরিমাণও ঈমান থাকে তা হলে সে পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারে।
আবু সাঈদ ইবনুল আরাবী থেকে অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত আছে। ইবনে আবিদ দুনিয়া হযরত ফুযায়েল ইবনে ইয়ায থেকে বর্ণনা করেন জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে ঈসা! আপনি কিসের সাহায্যে পানির উপর দিয়ে হাঁটেন? তিনি বললেন, ঈমান ও ইয়াকীনের বলে। উপস্থিত লোকেরা বলল, আপনি যেমন ইয়াকীন রাখেন, আমরাও তেমনি ইয়াকীন রাখি। হযরত ঈসা আ. বললেন, তাই যদি হয় তা হলে তোমরাও পানির উপর দিয়ে হেঁটে চল। তখন তারা নবী ঈসার সাথে পানির উপর দিয়ে হাঁটা শুরু করল। কিন্তু ঢেউ আসা মাত্রই তারা সকলেই ডুবে গেল। নবী বললেন, তোমাদের কী হল? তারা বলল, আমরা ঢেউ দেখে ভীত হয়ে গিয়েছিলাম। নবী বললেন, কত ভালো হত, যদি ঢেউ এর মালিককে তোমরা ভয় করতে! এরপর তিনি তাদেরকে বের করে আনলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি মাটিতে হাত মেরে এক মুষ্টি মাটি নিলেন। পরে হাত খুললে দেখা গেল এক হাতে স্বর্ণ এবং অন্য হাতে মাটির ঢেলা কিংবা কঙ্কর। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু'হাতের কোন্টর বস্তু তোমাদের কাছে প্রিয়তর? তারা বলল, স্বর্ণ। নবী বললেন, আমার নিকট স্বর্ণ ও মাটি উভয়ই সমান। হযরত ঈসা আ. পশমী বস্ত্র পরিধান করতেন, গাছের পাতা আহার করতেন। তাঁর বসবাসের কোনো ঘরবাড়ী ছিল না। পরিবার ছিল না, অর্থ সম্পদ ছিল না এবং আগামী দিনের জন্যে কিছু সঞ্চয় করেও তিনি রাখতেন না। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তাঁর মায়ের সূতা কাটার চরকার আয় থেকে আহার করতেন।
ফুযায়ল ইবনে ইয়ায, ইউনুস ইবনে উবায়দ সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ঈসা আ. বলতেন: যতক্ষণ আমরা দুনিয়ার ভোগ-বিলাস থেকে বিমুখ হতে না পারব, ততক্ষণ প্রকৃত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারব না। হযরত ঈসা আ. বলতেন, আমি সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করেছি। তাতে আমি দেখেছি, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে তার তুলনায় যাকে সৃষ্টি করা হয় নি, সে-ই আমার কাছে বেশি ঈর্ষণীয়।
ইসহাক ইবনে বিশর হযরত হাসান রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, কিয়ামতের দিন হযরত ঈসা আ. হবেন সংসার-বিমুখদের নেতা। তিনি আরও বলেছেন : কিয়ামতের দিন পাপ থেকে পলায়নকারী লোকদের হাশর হবে ঈসা আ.-এর সাথে। রাবী আরও বলেন: একদিন হযরত ঈসা আ. একটি পাথরের উপর মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। তিনি গভীর নিন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এমন সময় ওই স্থান দিয়ে ইবলিস যাচ্ছিল। সে বলল, "ওহে ঈসা! তুমি বলে থাক না, দুনিয়ার কোনো বস্তুর প্রতি তোমার আগ্রহ নেই? কিন্তু এই পাথরটি তো দুনিয়ার বস্তু।" তখন হযরত ঈসা আ. পাথরটি ধরে তাঁর দিকে ছুঁড়ে মারলেন এবং বললেন, দুনিয়ার সাথে এটিও তুই নিয়ে যা।
মুতামির ইবনে সুলাইমান বলেন, একবার হযরত ঈসা আ. তাঁর শিষ্যদের সাথে নিয়ে বের হন। তাঁর পরিধানে ছিল পশমের জুব্বা ও চাদর। তাঁর পায়ে কোনো জুতা ছিল না। তিনি ছিলেন ক্রন্দনরত। তাঁর মাথার চুল ছিল এলোমেলো। ক্ষুধার তীব্রতায় চেহারা ছিল ফ্যাকাশে। পিপাসায় ঠোঁট দু'টি শুষ্ক। এ অবস্থায় তিনি বনি ইসরাঈলের লোকদেরকে সালাম দিয়ে বললেন: আল্লাহর মেহেরবানীতে আমি দুনিয়াকে তার সঠিক অবস্থানে রেখেছি। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এবং এর জন্যে আমার গৌরবেরও কিছু নেই। তোমরা কি জান, আমার ঘর কোথায়? তারা বলল, হে রুহুল্লাহ! কোথায় আপনার ঘর? তিনি বললেন: আমার ঘর হল মসজিদ, পানি দিয়েই আমার অঙ্গসজ্জা। ক্ষুধাই আমার ব্যঞ্জন। রাতের চাঁদ আমার বাতি, শীতকালে আমার সালাত পূর্বাচল, শাক-সব্জিই আমার জীবিকা, মোটা পশমই আমার পরিধেয়। আল্লাহর ভয়ই আমার পরিচিতি, পঙ্গু ও নিঃস্বরা আমার সঙ্গী-সাথী। আমি যখন সকালে উঠি তখন আমার হাত শূন্য, যখন সন্ধ্যা হয় তখনও আমার হাতে কিছু থাকে না। এতে আমি সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত এবং নিরুদ্বিগ্ন। সুতরাং আমার চাইতে ধনী ও সচ্ছল আর কে আছে?
আবু মুসআব মালিক থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বনি ইসরাঈলদেরকে বলতেন: খালি পানি পান কর, তাজা সবজি খাও এবং যবের রুটি আহার কর। গমের রুটি খেয়ো না যেন। কেন না তোমরা এর শোকর আদায় করতে পারবে না। ইবনে ওহাব হযরত ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলতেন: তোমরা দুনিয়া অতিক্রম করে যাও। একে আবাদ করো না। তিনি বলতেন: দুনিয়ার মহব্বত সকল গুনাহের মূল এবং কুদৃষ্টি অন্তরের মধ্যে কামভাব উৎপন্ন করে। অবশ্য অন্য বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে, কামনা-বাসনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখে ফেলে। হযরত ঈসা আ. বলতেন, হে দুর্বল চিন্তা আদম-সন্তান! যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় কর, দুনিয়ায় মেহমান হিসেবে জীবন যাপন কর। মসজিদকে নিজের ঘর বানাও। চক্ষুদ্বয়কে কাঁদতে শিখাও, দেহকে ধৈর্যধারণ করতে ও অন্তরকে চিন্তা করতে অভ্যস্ত কর। আগামী দিনের খাদ্যের জন্যে দুশ্চিন্তা করো না এটা পাপ। তিনি বলতেন, 'সমুদ্রের তরঙ্গের উপরে ঘর বানান যেমন সম্ভব নয় তেমনি দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকাও সম্ভব নয়।'
সুফিয়ান ছাওরী বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: মুমিনের অন্তরে দুনিয়ার মহব্বত ও আখিরাতের মহব্বত একত্রে থাকতে পারে না, যেভাবে একত্রে থাকতে পারে না একই পাত্রে আগুন ও পানি। ইবরাহীম হারবী হযরত আবু আবদুল্লাহ সূফি রহ. এর সূত্রে বলেন, ঈসা আ. বলেছেন: দুনিয়া অন্বেষণকারী লোক সমুদ্রের পানি পানকারীর সাথে তুলনীয়। সমুদ্রের পানি যত বেশি পান করবে তত বেশি পিপাসা বৃদ্ধি পাবে এবং তা তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিবে। আর শয়তান দুনিয়া অন্বেষণ ও কামনাকে আকর্ষণীয় করে এবং প্রবৃত্তির লালসার সময় শক্তি যোগায়।
বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. বলেছেন যে ব্যক্তি ইলম শিখে অন্যকে শেখায় এবং সে মতে আমল করে, ঊর্ধ্বজগতে তাকে বিরাট সম্মানে ভূষিত করা হয়। অন্যত্র বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: যে ইলম তোমাকে কাজের ময়দানে নিয়ে যায় না, কেবল মজলিস মাহফিলে নিয়ে যায়, তাতে কোনো কল্যাণ নেই। আরও বর্ণিত আছে, হযরত ঈসা আ. বনি ইসরাঈলের মাঝে গিয়ে এক ভাষণে বলেন: হে হাওয়ারীগণ! অযোগ্য লোকদের নিকট হিকমতের কথা বলো না। এরূপ করলে হিকমত ও প্রজ্ঞাকে হেয় করা হবে। কিন্তু যোগ্য লোকদের নিকট তা বলতে কৃপণতা কর না। তা হলে তাদের উপর অবিচার করা হবে। স্মরণ রেখো! যে কোনো বিষয়ের তিনটি অবস্থা হতে পারে। যথা— (১) যার উত্তম হওয়া স্পষ্ট; এগুলোর অনুসরণ কর। (২) যার মন্দ হওয়া স্পষ্ট; এর থেকে দূরে থাক; (৩) যার ভাল বা মন্দ হওয়া সন্দেহযুক্ত; তার ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দাও।
আবদুর রাযযাক হযরত ইকরামা থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা আ. বলেছেন: শূকরের কাছে মুক্তা ছড়িয়ো না। কেন না মুক্তা দিয়ে সে কিছুই করতে পারে না। জ্ঞানপূর্ণ কথা ওই ব্যক্তিকে বলো না, যে তা শুনতে চায় না। কেন না জ্ঞানপূর্ণ কথা মুক্তার চাইতেও মূল্যবান আর যে তা চায় না, সে শূকরের চেয়েও অধম। ইকরামা আরও বর্ণনা করেন, ঈসা আ. হওয়ারীদেরকে বলেছেন: তোমরা হচ্ছ পৃথিবীতে লবণ তুল্য। যদি নষ্ট হয়ে যাও তবে তোমাদের জন্য কোনো ঔষধ নেই। তোমাদের মধ্যে মূর্খতার দুটি অভ্যাস আছে, (১) বিনা কারণে হাসা এবং (২) রাত্রি জাগরণ না করে সকালে উঠা। ইকরামা থেকে আরও বর্ণিত আছে, ঈসা আ.-কে একবার জিজ্ঞাসা করা হল, কোন ব্যক্তির ফেতনা সবচাইতে মারাত্মক? তিনি বললেন: আলেমের পদস্খলন। কেন না আলেমের পদস্খলনে আরও বহু লোক বিপথগামী হয়ে যায়। রাবী আরও বলেন, হযরত ঈসা আ. বলেছেন: হে জ্ঞান পাপীরা! দুনিয়াকে তোমরা মাথার উপরে রেখেছ আর আখেরাতকে রেখেছ পায়ের নিচে। তোমাদের কথাবার্তা যেন সর্বরোগের নিরাময় হয়। কিন্তু তোমাদের কার্যকলাপ হচ্ছে মহাব্যাধি। তোমাদের উপমা হচ্ছে সেই মাকাল গাছ যা দেখলে মানুষ আকৃষ্ট হয় কিন্তু তার ফল খেলে মারা যায়।
ওহাব থেকে বর্ণিত, ঈসা আ. বলেছেন: হে নিকৃষ্ট জ্ঞান পাপীরা! তোমরা জান্নাতের দরজায় বসে আছ, কিন্তু তাতে প্রবেশ করছো না আর নিঃস্বদেরকে তাতে প্রবেশ করার জন্যে আহবানও করছ না। আল্লাহর নিকট সর্বাধিক নিকৃষ্ট মানুষ সেই জ্ঞানী ব্যক্তি, যে তার জ্ঞানের বিনিময়ে দুনিয়া অর্জন করে। মাকহুল বর্ণনা করেন, একবার হযরত ঈসা আ.-এর সাথে ইয়াহইয়া আ.-এর সাক্ষাৎ হয়। তখন হযরত ঈসা আ. হাসিমুখে তাঁর সাথে মুসাফা করেন। ইয়াহইয়া আ. বললেন, কি খালাত ভাই! হাসছেন যে! মনে হচ্ছে আপনি নিরাপদ হয়ে গেছেন? ঈসা আ. বললেন, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন, নৈরাশ্যে ভুগছ না কি? তখন আল্লাহ উভয়ের নিকট ওহী প্রেরণ করে জানালেন, 'তোমাদের দুজনের মধ্যে সেই আমার নিকট প্রিয়তর, যে তার সঙ্গীর সাথে অধিকতর হাসিমুখে মিলিত হয়।'
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা একটি কবরের পাশে থামলেন। ওই কবরবাসী সঙ্কীর্ণাবস্থায় ছিল। তখন সঙ্গীরা কবরের সঙ্কীর্ণতা নিয়ে আলাপ করতে লাগলেন। তাদের কথা শুনে ঈসা আ. বললেন: তোমরা মায়ের পেটে এর চেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থানে ছিলে। তারপরে আল্লাহ যখন চাইলেন, প্রশস্ত জায়গায় নিয়ে আসলেন। আবু ওমর বলেন, ঈসা আ. যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা করতেন, তখন তাঁর চামড়া ভেদ করে রক্ত ঝরে পড়ত। হযরত ঈসা আ. থেকে এ জাতীয় অনেক উক্তি বর্ণিত আছে। হাফেজ ইবনে আসাকির তাঁর গ্রন্থে বহু উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে কিছু উল্লেখ করলাম।
📄 ঈসা আ.-এর হাওয়ারীগণের নাম
কথিত আছে, হযরত ঈসা আ.-এর সান্নিধ্যে বারজন হাওয়ারী ছিলেন। (১) পিতর, (২) ইয়াকুব ইবনে যাবদা (সিবদিয়), (৩) ইয়াহনাস (যুহান্না) ইনি ইয়াকুবের ভাই ছিলেন (৪) ইনদারাউস (আন্দ্রিয়), (৫) ফিলিপ, (৬) আবরো ছালমা (বর্তলময়), (৭) মথি, (৮) টমাস (থমা), (৯) ইয়াকুব ইবনে হালকুবা (আলকেয়), (১০) তাদাউস (থদ্দেয়), (১১) ফাতাতিয়া শিমন ও (১২) (ইহুদা ইস্কারিযোৎ) ইউদাস কারয়া ইউতা। এই শেষোক্ত ব্যক্তি ইহুদিদেরকে ঈসা আ.-এর সন্ধান দিয়েছিল। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, হাওয়ারীদের মধ্যে সারজিস নামক আর এক ব্যক্তি ছিল, যার কথা নাসারারা গোপন রাখে। এ ব্যক্তিকেই মাসীহর রূপ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নাসারাদের কিছু অংশের মতে যাকে মাসীহর রূপ দেওয়া হয় ও ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়, তার নাম জভাস ইবনে কারয়া ইউতা।
কথিত আছে, হযরত ঈসা আ.-এর সান্নিধ্যে বারজন হাওয়ারী ছিলেন। (১) পিতর, (২) ইয়াকুব ইবনে যাবদা (সিবদিয়), (৩) ইয়াহনাস (যুহান্না) ইনি ইয়াকুবের ভাই ছিলেন (৪) ইনদারাউস (আন্দ্রিয়), (৫) ফিলিপ, (৬) আবরো ছালমা (বর্তলময়), (৭) মথি, (৮) টমাস (থমা), (৯) ইয়াকুব ইবনে হালকুবা (আলকেয়), (১০) তাদাউস (থদ্দেয়), (১১) ফাতাতিয়া শিমন ও (১২) (ইহুদা ইস্কারিযোৎ) ইউদাস কারয়া ইউতা। এই শেষোক্ত ব্যক্তি ইহুদিদেরকে ঈসা আ.-এর সন্ধান দিয়েছিল। ইবনে ইসহাক লিখেছেন, হাওয়ারীদের মধ্যে সারজিস নামক আর এক ব্যক্তি ছিল, যার কথা নাসারারা গোপন রাখে। এ ব্যক্তিকেই মাসীহর রূপ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নাসারাদের কিছু অংশের মতে যাকে মাসীহর রূপ দেওয়া হয় ও ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়, তার নাম জভাস ইবনে কারয়া ইউতা।