📄 আল্লাহ সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র
এ প্রসঙ্গে সূরা মারিয়ামে আল্লাহ বলেন:
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا (৮৮) لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذَا (৮৯) تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجিবَالُ هَذَا (৯০) أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا (৯১) وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذُ وَلَدًا (৯২) إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا (৯৩) لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا (৯৪) وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا
"তারা বলে, দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন! তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছ; (অর্থাৎ তোমাদের এ কথা অত্যন্ত ভয়াবহ, কুরুচিপূর্ণ ও নিরেট মিথ্যা।) এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হবে, যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভন নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন এবং কিয়ামত দিবসে তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (সূরা মারিয়াম: ৮৮-৯৫)
উক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়। কেন না তিনি সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা ও মালিক এবং সব কিছু তাঁর মুখাপেক্ষী ও অনুগত। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই তাঁর দাস, তিনি এ সবের প্রতিপালক। তিনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই, আর কোনো প্রতিপালকও নেই। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং কিরূপে তাঁর সন্তান হতে পারে? আমরা জানি, সমশ্রেণীর দুজনের মিলন ব্যতীত সন্তান হয় না। আর আল্লাহর সমকক্ষ, সদৃশ ও সমশ্রেণীর কেউ নেই। অতএব তাঁর স্ত্রীও নেই, যখন তাঁর সন্তানও হতে পারে না।
আল্লাহ আহলে কিতাব ও তাদের অনুরূপ সম্প্রদায়কে ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও অহংকার প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। খ্রিষ্টান সম্প্রদায় মাসীহ-এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের উচিত ছিল তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা এবং এ আকীদা পোষণ করা যে, তিনি আল্লাহর সতী বাঁদী কুমারী মারিয়ামের সন্তান। ফিরিশতা জিবরাঈলকে আল্লাহ মারিয়ামের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী মারয়ামের মধ্যে ফুঁক দেন। এ প্রক্রিয়ায় হযরত ঈসা আ. মারয়ামের গর্ভে আসেন। এই রূহ আল্লাহর কোনো অংশ নয় বরং আল্লাহর সৃষ্টি বা মাখলুক। আল্লাহর দিকে রূহকে সম্পর্কিত করা হয়েছে সম্মানার্থে ও গুরুত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে। বিনা পিতায় জন্ম হওয়ায় হযরত ঈসাকে বলা হয়েছে রূহুল্লাহ। তাঁকে কালেমাতুল্লাহ বা আল্লাহর কলেমাও (বাণী) বলা হয়। কেন না আল্লাহর এক কলেমার (বাণী) দ্বারাই তিনি অস্তিত্ব লাভ করেন।
এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "ইহুদিরা বলে, উযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং খ্রিষ্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা। পূর্বে যারা কুফরী করেছিল এরা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন! তারা কেমন করে সত্য বিমুখ হয়।" (সূরা তাওবা: ৩০)
মোটকথা, ইহুদি ও খ্রিষ্টান অভিশপ্ত উভয় দলই আল্লাহর ব্যাপারে অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবি করেছে এবং ধারণা করেছে, আল্লাহর পুত্র সন্তান আছে। অথচ তাদের এ দাবির বহু ঊর্ধ্বে আল্লাহর মর্যাদা। তাদের এ দাবি ছিল সম্পূর্ণ মনগড়া। এদের পূর্ববর্তী পথভ্রষ্ট মানুষও এ জাতীয় মনগড়া উক্তি করেছে। তাদের সাথে এদের অন্তরের মিল রয়েছে।
কুরআন মাজিদের উপর্যুক্ত মক্কী আয়াতগুলোতে ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুশরিক ও দার্শনিকদের সমস্ত দল-উপদলের মতামতের খণ্ডন করা হয়েছে। যারা অজ্ঞতাবশত, বিশ্বাস করে ও দাবি করে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এসব জালিমদের সীমালঙ্ঘনমূলক উক্তি থেকে আল্লাহ পবিত্র ও মহান। এ জঘন্য উক্তি উচ্চারণকারীদের মধ্যে সবচাইতে প্রসিদ্ধ দল হল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। এ কারণে কুরআন মাজিদে তাদের খণ্ডন করা হয়েছে সবচাইতে বেশী। তাদের স্ব-বিরোধী উক্তি, অজ্ঞতা ও জ্ঞানের দৈন্যের কথা বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের এ কুফরী উক্তির মধ্যে আবার বিভিন্ন দল-উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা তো কুফরী করেছেই, যদিও এক ইলাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই।
তারা উভয়েই খাদ্য গ্রহণ করত। অন্যদের মতো তাদেরও পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হত। এমতাবস্থায় তাঁরা ইলাহ হন কীরূপে? আল্লাহ তাদের এ মূর্খতাব্যঞ্জক উক্তি থেকে মুক্ত ও পবিত্র। নিশ্চয় তারা কাফির, যারা বলে আল্লাহ তিন জনের একজন। আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমাকে ও আমার মাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর? সে বলবে, তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তা বলতাম, তবে নিশ্চয়ই তুমি তা জানতে। আমার অন্তরে যা আছে, তা তো তুমি অবগত আছ কিন্তু তোমার অন্তরে কী আছে, আমি তা অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তুমি আমাকে যে আদেশ করেছ, তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলি নি; তা এই: তোমরা আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।
📄 হযরত ঈসা আ.-এর জন্মকালীন কিছু মোজেযা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত ঈসা আ. বায়তুল মুকাদ্দাসের সন্নিকটে বায়তে লাহমে জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.-এর ধারণা, হযরত ঈসা আ.-এর জন্ম হয় মিসরে এবং মারয়াম ও ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব আল-নাজ্জার একই গাধার পিঠে আরোহণ করে ভ্রমণ করেন। কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক নয়। কেন না পূর্বেই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ঈসা আ.-এর জন্মস্থান হচ্ছে বায়তে লাহাম। সুতরাং এ হাদীসের মুকাবিলায় অন্য যে কোনো বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ঈসা আ. যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত মূর্তি ভেঙে পড়ে যায়। ফলে শয়তানরা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে। এর কোনো কারণ তারা খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে বড় ইবলীস তাদেরকে জানাল যে, ঈসা আ.-এর জন্ম হয়েছে। শয়তানরা শিশু ঈসাকে তার মায়ের কোলে আর চারদিকে ফেরেশতাগণ দাঁড়িয়ে তাঁকে ঘিরে রেখেছেন দেখতে পেল। তারা আকাশে উদিত একটি বিরাট নক্ষত্রও দেখতে পেল। পারস্য সম্রাট ওই নক্ষত্র দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং জ্যোতিষীদের নিকট এর উদিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। জ্যোতিষীরা জানাল, পৃথিবীতে এক মহান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। এ সংবাদ শুনে মারিয়াম শিশুপুত্র ঈসাকে নিয়ে মিসরে চলে আসেন এবং একটানা বার বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে ঈসা আ.-এর বিভিন্ন রকম কারামাত ও মুজিযা প্রকাশ হতে থাকে। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ কতিপয় মু'জিযার কথা উল্লেখ করেছেন। যথা:
এক. মারিয়াম আ. মিসরের যে সর্দারের বাড়িতে অবস্থান করেন, একবার ওই বাড়ি থেকে একটি বস্তু হারিয়ে যায়। কে বা কারা বস্তুটি চুরি করেছে, তা অনুসন্ধান করেও তার সন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে শিশু ঈসা সেখানে অবস্থানকারী এক অন্ধ ও এক পঙ্গু ব্যক্তির নিকট গেলেন। অন্ধকে বললেন, তুমি এ পঙ্গুকে ধরে উঠাও এবং তাকে সাথে নিয়ে চুরি করা বস্তা নিয়ে এস। অন্ধ বলল, আমি তো তাকে উঠাতে সক্ষম নই। ঈসা আ. বললেন কেন, তোমরা উভয়ে যেভাবে ঘরের জানালা দিয়ে বস্তুটি নিয়ে এসেছিলে, সেভাবেই গিয়ে দিয়ে এস। এ কথা শোনার পর তারা এর সত্যতা স্বীকার করল এবং চুরি করা বস্তুটি নিয়ে আসল। এ ঘটনার পর ঈসার মর্যাদা মানুষের নিকট অত্যধিক বেড়ে যায়।
দুই. উক্ত সর্দারের পুত্র আপন সন্তানদের পবিত্রতা অর্জনের উৎসবের দিনে এক ভোজসভার আয়োজন করে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। সে যুগের নিয়মানুযায়ী এখন মদ পরিবেশনের পালা। কিন্তু মদ ঢালতে গিয়ে দেখা গেল কোনো কলসিতেই মদ নেই। হযরত ঈসা আ. এ অবস্থা দেখে প্রতিটি কলসির মুখে হাত ঘুরিয়ে আসলেন। ফলে সেগুলো সাথে সাথে উৎকৃষ্ট মদে পূর্ণ হয়ে গেল। লোকজন এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হল। এরপর তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পড়লেন।
হযরত ঈসা ইবনে মারিয়ামই প্রথম মানুষ, যিনি শিশুকালে কথা বলেছেন। আল্লাহ তাঁর রসনা খুলে দেন এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসায় এমন অনেক কথা বলেন, যা ইতিপূর্বে কোনো কান কখনও শোনে নি। এ প্রশংসায় তিনি চাঁদ, সুরুজ, পর্বত, নদী, ঝর্ণা কোনো কিছুকেই উল্লেখ করতে বাদ দেন নি। ঈসা ইবনে মারয়াম আ. শিশু অবস্থায় একবার কথা বলেন। এরপর তার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যান্য শিশুরা যখন স্বাভাবিক বয়সে কথা বলে থাকে, তিনিও সে বয়সে পুনরায় কথা বলতে শুরু করেন। আল্লাহ তখন তাঁকে যুক্তিপূর্ণ কথা ও বাগ্মিতা শিক্ষা দেন।
হযরত ঈসা আ.-এর বয়স যখন সাত বছর, তখন তাঁরা তাঁকে লেখাপড়া শিখানোর জন্যে বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু শিক্ষক তাঁকে যে বিষয়টিই শিখাতে চাইতেন, তিনি আগেই সে বিষয় সম্পর্কে বলে দিতেন। এমতাবস্থায় এক শিক্ষক তাঁকে 'আবূ জাদ' শিখালেন। শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, আবু জাদ কি? উত্তরে ঈসা বললেন, 'আ' দ্বারা 'আলাউুল্লাহ' (আল্লাহর নিয়ামতরাশি), 'বা' দ্বারা 'বাহাউল্লাহ' (আল্লাহর দীপ্তি), 'জা' দ্বারা 'বাহজাতুল্লাহ ও জামালুহু' (আল্লাহর অনুপম সৌন্দর্য)। এ উত্তর শুনে শিক্ষক বিস্মিত হয়ে গেলেন। হযরত ঈসা আ.-ই সর্ব প্রথম আবূ জাদ শব্দের ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
হযরত ঈসার বয়স যখন তের বছর, তখন আল্লাহ তাকে মিসর ত্যাগ করে ঈলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন ঈসার মায়ের মামাত ভাই ইউসুফ এসে ঈসা আ. ও মারিয়ামকে একটি গাধার পিঠে উঠিয়ে ঈলিয়া নিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। আল্লাহ এখানেই তার উপর ইনজীল অবতীর্ণ করেন, তাওরাত শিক্ষা দেন, মৃতকে জীবিত করা, রোগীকে আরোগ্য করা, বাড়িতে প্রস্তুতকৃত খাদ্য সম্পর্কে না দেখেই জানিয়ে দেওয়ার জ্ঞান দান করেন। ঈলিয়ার লোকদের মধ্যে তাঁর আগমন বার্তা পৌঁছে যায়। তাঁর দ্বারা বিস্ময়কর ঘটনাবলী প্রকাশিত হতে দেখে তারা ঘাবড়ে যায় এবং আশ্চর্যবোধ করতে থাকে। ঈসা আ. তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানান। এভাবে তাঁর নবুয়তি প্রচারকার্য জনগণের মধ্যে বিকাশ লাভ করে।
📄 প্রসিদ্ধ আসমানি চার কিতাব
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
📄 তূবা বৃক্ষের বর্ণনা
নবী ঈসা আ. একবার আল্লাহর নিকট নিবেদন করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তৃবা কী? আল্লাহ জানালেন, তৃবা একটি বৃক্ষের নাম। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করেছি। এটা প্রত্যেকটা জান্নাতের জন্যই। এর শিকড় রিওয়ানে এবং তার পানির উৎস তাসনীম। এর শিশির কপূরের মতো, এর স্বাদ আদার এবং ঘ্রাণ মিশকের মতো। যে ব্যক্তি এর থেকে একবার পান করবে সে কখনও পিপাসাবোধ করবে না।
ঈসা আ. বললেন, আমাকে একবার সে পানি পান করার সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন, সেই নবী পান করার পূর্বে অন্য নবীদের জন্যে এটা পান করা নিষিদ্ধ এবং সেই নবীর উম্মতরা পান করার পূর্বে অন্য নবীদের উম্মতদের জন্যে এর স্বাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে আনব। ঈসা আ. বললেন, প্রভু! কেন আমাকে উঠিয়ে নিবেন? আল্লাহ বললেন, আমি প্রথমে তোমাকে উঠিয়ে আনব। তারপর শেষ যামানায় আবার পৃথিবীতে পাঠাব। এতে তুমি সেই নবীর উম্মতের বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে পারবে এবং অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। কোনো এক নামাযের সময় তোমাকে পৃথিবীতে নামাব। কিন্তু তুমি তাদের নামাযে ইমামতি করবে না। কেন না তারা হচ্ছে রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। তাদের যিনি নবী, তারপর আর কোনো নবী নেই।
ইবনে আসাকির আবদুল্লাহ ইবনে আওসাজা থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ ওহির মাধ্যমে ঈসা ইবনে মারিয়াম আ.-কে বলেন, তোমার চিন্তা-ভাবনায় আমাকে নিত্য সাথী করে রাখ এবং তোমার আখেরাতের জন্যে আমাকে সম্বলরূপে রাখ। নফল ইবাদতের দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন কর, তা হলে আমি তোমাকে প্রিয় জানব। আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তোমার বন্ধু বানিয়ো না। এরূপ করলে তুমি লাঞ্ছিত হবে। বিপদে ধৈর্যধারণ কর এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাক। তোমার মধ্যে আমার সন্তুষ্টিকে জাগ্রত রাখ। কেন না তোমার সন্তুষ্টি আমার আনুগত্যে নিহিত, অবাধ্যতায় নয়। আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর, আমাকে সর্বদা স্মরণ রাখ। তোমার অন্তরে যেন আমার ভালোবাসা বিরাজ করে। অবসর সময়ে সদা সচেতন থাক। সূক্ষ্ম প্রজ্ঞাকে সুদৃঢ় কর। আমার প্রতি আগ্রহ ও ভীতি পোষণ কর।
আবু দাউদ তাঁর কিতাবে তাকদীর অধ্যায়ে লিখেছেন, তাউস থেকে বর্ণিত আছে: একবার ঈসা ইবনে মারিয়ামের সাথে ইবলিসের সাক্ষাৎ হয়। ঈসা আ. ইবলীসকে বললেন, তুমি তো জান, তোমার তাকদীরে যা লেখা হয়েছে তার ব্যতিক্রম কিছুতেই হবে না। ইবলীস বলল, তা হলে আপনি এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠুন এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে দেখুন জীবিত থাকেন কি-না। ঈসা আ. বললেন, তুমি জান না, আল্লাহ বলেছেন— বান্দা আমাকে পরীক্ষা করতে পারে না— আমি যা চাই তাই করে থাকি? যুহরী বলেছেন, মানুষ কোনো বিষয়ে আল্লাহকে পরীক্ষা করতে পারে না বরং আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আবু দাউদ বলেন, একবার শয়তান হযরত ঈসা আ. এর নিকটে এসে বলল: আপনি তো নিজেকে সত্যবাদী বলে মনে করেন, তা হলে আপনি ঊর্ধ্বে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়ুন দেখি। ঈসা আ. বললেন, তোমার অমঙ্গল হোক আল্লাহ কি এ কথা বলেন নি, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর। পবিত্র আত্মা অর্থাৎ জিবরাইল আ. ফেরেশতা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম। হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখি সদৃশ আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁৎকার দিতে। ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত; জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতি ক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমার থেকে বনি ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে, তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তারা বলেছিল, এ তো স্পষ্ট যাদু।
আমি গরিব ও মিসকিন লোকদেরকে তোমার একান্ত ভক্ত ও সাথী বানিয়েছি, যাদের উপরে তুমি সন্তুষ্ট। এমন সব শিষ্য ও সাহায্যকারী তোমাকে দিয়েছি, যারা তোমাকে জান্নাতের পথ প্রদর্শনকারী রূপে পেয়ে সন্তুষ্ট। জেনে রেখো, উক্ত গুণ দুটি বান্দার জন্যে প্রধান গুণ। যারা এ গুণ দুটি নিয়ে আমার কাছে আসবে, তারা আমার নিকট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মনোনীত বান্দা হিসেবে গণ্য হবে।
বনি ইসরাঈলরা তোমাকে বলবে, আমরা রোজা রেখেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি, নামায পড়েছি কিন্তু তা গৃহিত হয়নি, দান-সদকা করেছি কিন্তু তা মঞ্জুর হয়নি, উটের কান্নার মতো করুণ সুরে কেঁদেছি কিন্তু আমাদের কান্নার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়নি। এ সব অভিযোগের জবাব তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, এমনটা কেন হল? কোন জিনিসটি আমাকে এসব কবুল করা থেকে বাঁধা দিয়েছে? আসমান ও যমীনের সমস্ত ধনভাণ্ডার কি আমার হাতে নেই? আমি আমার ধনভাণ্ডার থেকে যেরূপ ইচ্ছা খরচ করে থাকি। কৃপণতা আমাকে স্পর্শ করে না। আমি কি প্রার্থনা শ্রবণের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম এবং দান করার ব্যাপারে সবচেয়ে উদার সত্তা নই? না আমার দান-অনুগ্রহ সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে? দুনিয়ার কেউ কারও প্রতি অনুগ্রহশীল হলে সে তো আমারই দয়ার কারণে তা করে থাকে।
হে ঈসা ইবনে মারিয়াম! ওই সম্প্রদায়ের লোকদের অন্তরে আমি যে সব সদগুণ প্রদান করেছিলাম, তারা যদি সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাত, তা হলে আখিরাতের জীবনের উপরে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিত না এবং বুঝতে পারত যে, কোথা থেকে তাদেরকে দান করা হয়েছে আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, মনের কামনা বাসনাই তাদের বড় দুশমন। তাদের রোযা আমি কিভাবে কবুল করি যখন হারাম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে? তাদের নামায আমি কিভাবে কবুল করি, যখন তাদের অন্তর ওই সব লোকদের প্রতি আকৃষ্ট যারা আমার বিরোধিতা করে এবং আমার নিষিদ্ধ বস্তুকে হালাল জানে? কি করে তাদের দান-সদকা আমি মঞ্জুর করি, যখন তারা মানুষের উপর জুলুম করে অবৈধ পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়।
হে ইসা! আমি ওই সব লোকদেরকে যথাযথ প্রতিদান দিব। হে ঈসা! তাদের কান্নায় আমি দয়া দেখাব কিভাবে, যখন তাদের হাত নবীদের রক্তে রঞ্জিত? এ কারণে তাদের প্রতি আমার ক্রোধ অতি মাত্রায় বেশি। হে ঈসা! যে দিন আমি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সে দিনই আমি চূড়ান্ত করে রেখেছি, যে ব্যক্তি আমার দাসত্ব কবুল করবে এবং তোমার ও তোমার মা সম্পর্কে আমার বাণীকে সঠিক বলে মেনে নিবে, তাকে আমি তোমার ঘরের প্রতিবেশী বানাব, সফরের সাথী করব এবং অলৌকিক ঘটনা প্রকাশে তোমার শরীক করব। যে দিন আমি আসমান যমিন সৃষ্টি করেছি, সেদিন আরো চূড়ান্ত করে রেখেছি, যেসব লোক তোমাকে ও তোমার মাকে আল্লাহর সাথে শরীফ করে প্রভু বানাবে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের সর্বনিম্নে স্থান দেব।
যেদিন আমি আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে রেখেছি, আমি আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদের হাতে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করব। তার উপরেই নবুয়ত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি টানব। তার জন্ম হবে মক্কায়, হিজরতস্থল (মদীনা) তাইয়্যিবা। শাম দেশ তার অধীন হবে। সে কর্কশভাষী ও কঠোরহৃদয় হবে না, বাজারে চিৎকার করে ফিরবে না, অশ্লীল-অশ্রাব্য কথাবার্তা বলবে না। প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্যে আমি তাকে তাওফিক দিব। সৎচরিত্রের যাবতীয় গুণাবলী তাকে প্রদান করব। তার অন্তর থাকবে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। জ্ঞান হবে প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার স্বভাব, ন্যায়বিচার তার চরিত্র, সত্য তার শরিয়ত, ইসলাম তার আদর্শ, নাম হবে তার আহমদ।
আমি তার সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সঠিক পথ দেখাব, অজ্ঞতা থেকে ফিরিয়ে জ্ঞানের দিকে আনব, নিঃস্ব অবস্থা থেকে স্বচ্ছলতার দিকে আনব, বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে উন্নতির সোপানে উঠাব। তার দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করব। তার সাহায্যে বধির ব্যক্তিকে শ্রবণশক্তি দান করব, আচ্ছাদিত হৃদয়সমূহকে উন্মুক্ত করে দিব, বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে সংযত করব। তার উম্মতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা দান করব। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে তাদের অভ্যুদয় ঘটবে। তারা মানুষকে ভালো কাজে আহবান জানাবে ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে। আমার নামে তারা নিষ্ঠাবান থাকবে। রাসূলের আনীত আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে।
তারা তাদের মসজিদে, সভা-সমিতিতে বাড়ি ঘরে ও চলতে ফিরতে সর্বাবস্থায় আমার তাসবীহ পাঠ করবে, পবিত্রতা ঘোষণা করবে ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়বে। তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় রুকু-সিজদার মাধ্যমে আমার জন্যে নামায আদায় করবে। আমার পথে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দুশমনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আল্লাহর পথে রক্ত দান হচ্ছে তাদের নিকট পুণ্যকর্ম। সুসংবাদের আশায় তাদের অন্তর ভরপুর, তাদের নেককাজসমূহ প্রদর্শনীযুক্ত। রাতের বেলায় তারা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল তাপস আর দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে সাক্ষাৎ সিংহ— এ সবই আমার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তাকে দিই। আমি মহা অনুগ্রহশীল।
বনি ইসরাঈলের মুনাফিক ও কাফির শ্রেণীর লোকেরা তাঁর সাথে উপহাস করে জিজ্ঞেস করত— বলুন তো, অমুক গতকাল কী খাবার খেয়েছে এবং বাড়িতে সে কি রেখে এসেছে? হযরত ঈসা আ. তাদের সঠিক জবাব দিয়ে দিতেন। এতে মুমিনদের ঈমান এবং কাফির ও মুনাফিকদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়ে যেত, এতদসত্ত্বেও ও হযরত ঈসা আ. এর মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর তিনি সালাত ও তাসবীহ আদায় করতেন। তাঁর কোনো স্থায়ী আবাসস্থল বা ঠিকানা ছিল না।
সর্বপ্রথম তিনি যে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন, সে ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ: একবার তিনি কোনো এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই কবরের নিকটে এক মহিলা বসে কাঁদছিল। ঈসা আ. মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? মহিলা বলল, আমার একটি মাত্র কন্যা ছিল। সে ছাড়া আমার আর কোনো সন্তান নেই। আমার সে কন্যাটি মারা গেছে। আমি আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি, হয় তিনি আমার কন্যাকে জীবিত করে দিবেন, না হয় আমিও তার মতো মারা যাব; এ জায়গা ত্যাগ করব না। আপনি এর দিকে একটু লক্ষ্য করুন। ঈসা আ. বললেন, আমি যদি লক্ষ্য করি তবে কি তুমি এখান থেকে ফিরে যাবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ তাই করব। তারপর হযরত ঈসা আ. দু রাকআত নামায আদায় করে কবরের পাশে এসে বসলেন এবং বললেন: ওহে অমুক! তুমি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও এবং বের হয়ে এস। তখন কবরটি সামান্য কেঁপে উঠল।
ঈসা আ. দ্বিতীয়বার আহবান করলেন। এবার কবরটি ফেটে গেল। তৃতীয়বার আহবান করলে কবরবাসিনী বেরিয়ে আসল এবং মাথার চুল থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। ঈসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বের হতে তোমার দেরি হল কেন? মেয়েটি বলল, প্রথম আওয়াজ শোনার পর আল্লাহ আমার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি আমার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি জোড়া লাগান। দ্বিতীয় আওয়াজের পর রূহ আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে। তৃতীয় আওয়াজ যখন হল তখন আমার ধারণা হল, এটা কিয়ামতের আওয়াজ। আমি ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল ও চোখের ভ্রু সব সাদা হয়ে গেছে। তারপর মেয়েটি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা! আপনি আমাকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ দুবার গ্রহণ করালেন কেন? মা! ধৈর্য ধরুন, পুণ্যের আশা করুন। দুনিয়ার ওপর থাকার কোনো আগ্রহ আমার নেই। হে রুহুল্লাহ! হে কালিমাতুল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি আখিরাতের জীবন ফিরিয়ে দেন এবং মৃত্যুর কষ্ট কমিয়ে দেন। ঈসা আ. আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। ফলে মেয়েটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল এবং তাকে কবরস্থ করা হল। এ সংবাদ ইহুদিদের নিকট পৌঁছলে তারা ঈসা আ.-এর প্রতি পূর্বের চেয়ে অধিক বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠল।
সুদ্দী হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। বনি ইসরাঈলের এক বাদশার মৃত্যু হয়। কবরস্থ করার জন্যে তাকে খাটের ওপর রাখা হয়। এ সময় হযরত ঈসা আ. সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন। ফলে বাদশা জীবিত হয়ে যায়। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে এ আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।
নবী ঈসা আ. একবার আল্লাহর নিকট নিবেদন করলেন, হে আমার প্রতিপালক! তৃবা কী? আল্লাহ জানালেন, তৃবা একটি বৃক্ষের নাম। আমি নিজ হাতে তা রোপণ করেছি। এটা প্রত্যেকটা জান্নাতের জন্যই। এর শিকড় রিওয়ানে এবং তার পানির উৎস তাসনীম। এর শিশির কপূরের মতো, এর স্বাদ আদার এবং ঘ্রাণ মিশকের মতো। যে ব্যক্তি এর থেকে একবার পান করবে সে কখনও পিপাসাবোধ করবে না।
ঈসা আ. বললেন, আমাকে একবার সে পানি পান করার সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন, সেই নবী পান করার পূর্বে অন্য নবীদের জন্যে এটা পান করা নিষিদ্ধ এবং সেই নবীর উম্মতরা পান করার পূর্বে অন্য নবীদের উম্মতদের জন্যে এর স্বাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ বললেন, হে ঈসা! আমি তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে আনব। ঈসা আ. বললেন, প্রভু! কেন আমাকে উঠিয়ে নিবেন? আল্লাহ বললেন, আমি প্রথমে তোমাকে উঠিয়ে আনব। তারপর শেষ যামানায় আবার পৃথিবীতে পাঠাব। এতে তুমি সেই নবীর উম্মতের বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে পারবে এবং অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করার ব্যাপারে তাদেরকে সাহায্য করতে পারবে। কোনো এক নামাযের সময় তোমাকে পৃথিবীতে নামাব। কিন্তু তুমি তাদের নামাযে ইমামতি করবে না। কেন না তারা হচ্ছে রহমতপ্রাপ্ত উম্মত। তাদের যিনি নবী, তারপর আর কোনো নবী নেই।
ইবনে আসাকির আবদুল্লাহ ইবনে আওসাজা থেকে বর্ণনা করেন। আল্লাহ ওহির মাধ্যমে ঈসা ইবনে মারিয়াম আ.-কে বলেন, তোমার চিন্তা-ভাবনায় আমাকে নিত্য সাথী করে রাখ এবং তোমার আখেরাতের জন্যে আমাকে সম্বলরূপে রাখ। নফল ইবাদতের দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন কর, তা হলে আমি তোমাকে প্রিয় জানব। আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে তোমার বন্ধু বানিয়ো না। এরূপ করলে তুমি লাঞ্ছিত হবে। বিপদে ধৈর্যধারণ কর এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাক। তোমার মধ্যে আমার সন্তুষ্টিকে জাগ্রত রাখ। কেন না তোমার সন্তুষ্টি আমার আনুগত্যে নিহিত, অবাধ্যতায় নয়। আমার নৈকট্য লাভের চেষ্টা কর, আমাকে সর্বদা স্মরণ রাখ। তোমার অন্তরে যেন আমার ভালোবাসা বিরাজ করে। অবসর সময়ে সদা সচেতন থাক। সূক্ষ্ম প্রজ্ঞাকে সুদৃঢ় কর। আমার প্রতি আগ্রহ ও ভীতি পোষণ কর।
আবু দাউদ তাঁর কিতাবে তাকদীর অধ্যায়ে লিখেছেন, তাউস থেকে বর্ণিত আছে: একবার ঈসা ইবনে মারিয়ামের সাথে ইবলিসের সাক্ষাৎ হয়। ঈসা আ. ইবলীসকে বললেন, তুমি তো জান, তোমার তাকদীরে যা লেখা হয়েছে তার ব্যতিক্রম কিছুতেই হবে না। ইবলীস বলল, তা হলে আপনি এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠুন এবং সেখান থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে দেখুন জীবিত থাকেন কি-না। ঈসা আ. বললেন, তুমি জান না, আল্লাহ বলেছেন— বান্দা আমাকে পরীক্ষা করতে পারে না— আমি যা চাই তাই করে থাকি? যুহরী বলেছেন, মানুষ কোনো বিষয়ে আল্লাহকে পরীক্ষা করতে পারে না বরং আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন।
আবু দাউদ বলেন, একবার শয়তান হযরত ঈসা আ. এর নিকটে এসে বলল: আপনি তো নিজেকে সত্যবাদী বলে মনে করেন, তা হলে আপনি ঊর্ধ্বে উঠে নিচে লাফিয়ে পড়ুন দেখি। ঈসা আ. বললেন, তোমার অমঙ্গল হোক আল্লাহ কি এ কথা বলেন নি, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর। পবিত্র আত্মা অর্থাৎ জিবরাইল আ. ফেরেশতা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করেছিলাম। হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল শিক্ষা দিয়েছিলাম; তুমি কর্দম দ্বারা আমার অনুমতিক্রমে পাখি সদৃশ আকৃতি গঠন করতে এবং তাতে ফুঁৎকার দিতে। ফলে আমার অনুমতিক্রমে তা পাখি হয়ে যেত; জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে তুমি আমার অনুমতিক্রমে নিরাময় করতে এবং আমার অনুমতি ক্রমে তুমি মৃতকে জীবিত করতে; আমি তোমার থেকে বনি ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম; তুমি যখন তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন এনেছিলে, তখন তাদের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল তারা বলেছিল, এ তো স্পষ্ট যাদু।
আমি গরিব ও মিসকিন লোকদেরকে তোমার একান্ত ভক্ত ও সাথী বানিয়েছি, যাদের উপরে তুমি সন্তুষ্ট। এমন সব শিষ্য ও সাহায্যকারী তোমাকে দিয়েছি, যারা তোমাকে জান্নাতের পথ প্রদর্শনকারী রূপে পেয়ে সন্তুষ্ট। জেনে রেখো, উক্ত গুণ দুটি বান্দার জন্যে প্রধান গুণ। যারা এ গুণ দুটি নিয়ে আমার কাছে আসবে, তারা আমার নিকট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মনোনীত বান্দা হিসেবে গণ্য হবে।
বনি ইসরাঈলরা তোমাকে বলবে, আমরা রোজা রেখেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি, নামায পড়েছি কিন্তু তা গৃহিত হয়নি, দান-সদকা করেছি কিন্তু তা মঞ্জুর হয়নি, উটের কান্নার মতো করুণ সুরে কেঁদেছি কিন্তু আমাদের কান্নার প্রতি দয়া প্রদর্শন করা হয়নি। এ সব অভিযোগের জবাব তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, এমনটা কেন হল? কোন জিনিসটি আমাকে এসব কবুল করা থেকে বাঁধা দিয়েছে? আসমান ও যমীনের সমস্ত ধনভাণ্ডার কি আমার হাতে নেই? আমি আমার ধনভাণ্ডার থেকে যেরূপ ইচ্ছা খরচ করে থাকি। কৃপণতা আমাকে স্পর্শ করে না। আমি কি প্রার্থনা শ্রবণের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম এবং দান করার ব্যাপারে সবচেয়ে উদার সত্তা নই? না আমার দান-অনুগ্রহ সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে? দুনিয়ার কেউ কারও প্রতি অনুগ্রহশীল হলে সে তো আমারই দয়ার কারণে তা করে থাকে।
হে ঈসা ইবনে মারিয়াম! ওই সম্প্রদায়ের লোকদের অন্তরে আমি যে সব সদগুণ প্রদান করেছিলাম, তারা যদি সেগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাত, তা হলে আখিরাতের জীবনের উপরে দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিত না এবং বুঝতে পারত যে, কোথা থেকে তাদেরকে দান করা হয়েছে আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, মনের কামনা বাসনাই তাদের বড় দুশমন। তাদের রোযা আমি কিভাবে কবুল করি যখন হারাম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে? তাদের নামায আমি কিভাবে কবুল করি, যখন তাদের অন্তর ওই সব লোকদের প্রতি আকৃষ্ট যারা আমার বিরোধিতা করে এবং আমার নিষিদ্ধ বস্তুকে হালাল জানে? কি করে তাদের দান-সদকা আমি মঞ্জুর করি, যখন তারা মানুষের উপর জুলুম করে অবৈধ পন্থায় তাদের ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়।
হে ইসা! আমি ওই সব লোকদেরকে যথাযথ প্রতিদান দিব। হে ঈসা! তাদের কান্নায় আমি দয়া দেখাব কিভাবে, যখন তাদের হাত নবীদের রক্তে রঞ্জিত? এ কারণে তাদের প্রতি আমার ক্রোধ অতি মাত্রায় বেশি। হে ঈসা! যে দিন আমি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছি, সে দিনই আমি চূড়ান্ত করে রেখেছি, যে ব্যক্তি আমার দাসত্ব কবুল করবে এবং তোমার ও তোমার মা সম্পর্কে আমার বাণীকে সঠিক বলে মেনে নিবে, তাকে আমি তোমার ঘরের প্রতিবেশী বানাব, সফরের সাথী করব এবং অলৌকিক ঘটনা প্রকাশে তোমার শরীক করব। যে দিন আমি আসমান যমিন সৃষ্টি করেছি, সেদিন আরো চূড়ান্ত করে রেখেছি, যেসব লোক তোমাকে ও তোমার মাকে আল্লাহর সাথে শরীফ করে প্রভু বানাবে, তাদেরকে আমি জাহান্নামের সর্বনিম্নে স্থান দেব।
যেদিন আমি আসমান ও যমিন সৃষ্টি করেছি, সে দিন এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে রেখেছি, আমি আমার প্রিয় বান্দা মুহাম্মদের হাতে এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করব। তার উপরেই নবুয়ত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি টানব। তার জন্ম হবে মক্কায়, হিজরতস্থল (মদীনা) তাইয়্যিবা। শাম দেশ তার অধীন হবে। সে কর্কশভাষী ও কঠোরহৃদয় হবে না, বাজারে চিৎকার করে ফিরবে না, অশ্লীল-অশ্রাব্য কথাবার্তা বলবে না। প্রতিটি বিষয়ে উত্তম পন্থা অবলম্বনের জন্যে আমি তাকে তাওফিক দিব। সৎচরিত্রের যাবতীয় গুণাবলী তাকে প্রদান করব। তার অন্তর থাকবে তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। জ্ঞান হবে প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা তার স্বভাব, ন্যায়বিচার তার চরিত্র, সত্য তার শরিয়ত, ইসলাম তার আদর্শ, নাম হবে তার আহমদ।
আমি তার সাহায্যে মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে সঠিক পথ দেখাব, অজ্ঞতা থেকে ফিরিয়ে জ্ঞানের দিকে আনব, নিঃস্ব অবস্থা থেকে স্বচ্ছলতার দিকে আনব, বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে উন্নতির সোপানে উঠাব। তার দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করব। তার সাহায্যে বধির ব্যক্তিকে শ্রবণশক্তি দান করব, আচ্ছাদিত হৃদয়সমূহকে উন্মুক্ত করে দিব, বিভিন্ন কামনা-বাসনাকে সংযত করব। তার উম্মতকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা দান করব। মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্যে তাদের অভ্যুদয় ঘটবে। তারা মানুষকে ভালো কাজে আহবান জানাবে ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করবে। আমার নামে তারা নিষ্ঠাবান থাকবে। রাসূলের আনীত আদর্শকে তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে।
তারা তাদের মসজিদে, সভা-সমিতিতে বাড়ি ঘরে ও চলতে ফিরতে সর্বাবস্থায় আমার তাসবীহ পাঠ করবে, পবিত্রতা ঘোষণা করবে ও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়বে। তারা দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় রুকু-সিজদার মাধ্যমে আমার জন্যে নামায আদায় করবে। আমার পথে তারা সারিবদ্ধ হয়ে দুশমনের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আল্লাহর পথে রক্ত দান হচ্ছে তাদের নিকট পুণ্যকর্ম। সুসংবাদের আশায় তাদের অন্তর ভরপুর, তাদের নেককাজসমূহ প্রদর্শনীযুক্ত। রাতের বেলায় তারা আল্লাহর ধ্যানে মশগুল তাপস আর দিনের বেলায় যুদ্ধের ময়দানে সাক্ষাৎ সিংহ— এ সবই আমার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তাকে দিই। আমি মহা অনুগ্রহশীল।
বনি ইসরাঈলের মুনাফিক ও কাফির শ্রেণীর লোকেরা তাঁর সাথে উপহাস করে জিজ্ঞেস করত— বলুন তো, অমুক গতকাল কী খাবার খেয়েছে এবং বাড়িতে সে কি রেখে এসেছে? হযরত ঈসা আ. তাদের সঠিক জবাব দিয়ে দিতেন। এতে মুমিনদের ঈমান এবং কাফির ও মুনাফিকদের সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বেড়ে যেত, এতদসত্ত্বেও ও হযরত ঈসা আ. এর মাথা গোঁজার মতো কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। খোলা আকাশের নিচে মাটির ওপর তিনি সালাত ও তাসবীহ আদায় করতেন। তাঁর কোনো স্থায়ী আবাসস্থল বা ঠিকানা ছিল না।
সর্বপ্রথম তিনি যে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন, সে ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ: একবার তিনি কোনো এক কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই কবরের নিকটে এক মহিলা বসে কাঁদছিল। ঈসা আ. মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী হয়েছে? মহিলা বলল, আমার একটি মাত্র কন্যা ছিল। সে ছাড়া আমার আর কোনো সন্তান নেই। আমার সে কন্যাটি মারা গেছে। আমি আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি, হয় তিনি আমার কন্যাকে জীবিত করে দিবেন, না হয় আমিও তার মতো মারা যাব; এ জায়গা ত্যাগ করব না। আপনি এর দিকে একটু লক্ষ্য করুন। ঈসা আ. বললেন, আমি যদি লক্ষ্য করি তবে কি তুমি এখান থেকে ফিরে যাবে? মহিলাটি বলল, হ্যাঁ তাই করব। তারপর হযরত ঈসা আ. দু রাকআত নামায আদায় করে কবরের পাশে এসে বসলেন এবং বললেন: ওহে অমুক! তুমি আল্লাহর হুকুমে উঠে দাঁড়াও এবং বের হয়ে এস। তখন কবরটি সামান্য কেঁপে উঠল।
ঈসা আ. দ্বিতীয়বার আহবান করলেন। এবার কবরটি ফেটে গেল। তৃতীয়বার আহবান করলে কবরবাসিনী বেরিয়ে আসল এবং মাথার চুল থেকে ধুলাবালি ঝেড়ে ফেলতে লাগল। ঈসা আ. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, বের হতে তোমার দেরি হল কেন? মেয়েটি বলল, প্রথম আওয়াজ শোনার পর আল্লাহ আমার নিকট একজন ফেরেশতা পাঠান। তিনি আমার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি জোড়া লাগান। দ্বিতীয় আওয়াজের পর রূহ আমার দেহের ভিতর প্রবেশ করে। তৃতীয় আওয়াজ যখন হল তখন আমার ধারণা হল, এটা কিয়ামতের আওয়াজ। আমি ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কিয়ামতের ভয়ে আমার মাথার চুল ও চোখের ভ্রু সব সাদা হয়ে গেছে। তারপর মেয়েটি তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, মা! আপনি আমাকে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ দুবার গ্রহণ করালেন কেন? মা! ধৈর্য ধরুন, পুণ্যের আশা করুন। দুনিয়ার ওপর থাকার কোনো আগ্রহ আমার নেই। হে রুহুল্লাহ! হে কালিমাতুল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট দুআ করুন, যেন আমাকে তিনি আখিরাতের জীবন ফিরিয়ে দেন এবং মৃত্যুর কষ্ট কমিয়ে দেন। ঈসা আ. আল্লাহর নিকট দুআ করলেন। ফলে মেয়েটির দ্বিতীয়বার মৃত্যু হল এবং তাকে কবরস্থ করা হল। এ সংবাদ ইহুদিদের নিকট পৌঁছলে তারা ঈসা আ.-এর প্রতি পূর্বের চেয়ে অধিক বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে উঠল।
সুদ্দী হযরত ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। বনি ইসরাঈলের এক বাদশার মৃত্যু হয়। কবরস্থ করার জন্যে তাকে খাটের ওপর রাখা হয়। এ সময় হযরত ঈসা আ. সেখানে উপস্থিত হন। তিনি আল্লাহর নিকট দুআ করেন। ফলে বাদশা জীবিত হয়ে যায়। মানুষ অবাক দৃষ্টিতে এ আশ্চর্য ও অভূতপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।