📄 হযরত ঈসা আ.-এর জন্মগ্রহণ
আল্লাহ পাক বলেন:
"বর্ণনা কর এ কিতাবে উল্লিখিত মারিয়ামের কথা, যখন সে তার পরিবারবর্গ থেকে পৃথক হয়ে নিরালায় পূর্ব দিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল। তারপর তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্যে সে পর্দা করল। তারপর আমি তার নিকট আমার রূহকে পাঠালাম। সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল। মারিয়াম বলল, আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় চাচ্ছি যদি তুমি মুত্তাকী হও। মারিয়াম বলল, কেমন করে পুত্র হবে যখন আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করে নি এবং আমি ব্যভিচারিণীও নই? সে বলল, 'এরূপই হবে'। তোমার প্রতিপালক বলেছেন, এটা আমার জন্যে সহজসাধ্য এবং আমি তাকে এ জন্যে সৃষ্টি করব, যেন সে হয় মানুষের জন্যে এক নিদর্শন ও আমার নিকট হতে এক অনুগ্রহ; এটা তো এক স্থিরকৃত ব্যাপার। তারপর সে গর্ভে তাকে ধারণ করল; তারপর তাকে নিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। প্রসব-বেদনা তাকে এক খেজুর গাছের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। সে বলল, হায়, এর পূর্বে আমি মারা যেতাম ও লোকের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতাম!
ফেরেশতা তার নিচ দিক থেকে আহবান করে তাকে বলল, "তুমি দুঃখ করো না, তোমার নিচ দিয়ে তোমার প্রতিপালক এক নহর সৃষ্টি করেছেন। তুমি তোমার দিকে খেজুর গাছের কাণ্ডে নাড়া দাও, তা তোমাকে পাকা তাজা খেজুর দান করবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চোখ জুড়াও। মানুষের মধ্যে কাউকেও যদি তুমি দেখ, তখন বলবে- আমি দয়াময়ের উদ্দেশ্যে মৌনতাবলম্বনের মানত করেছি। সুতরাং আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সাথে বাক্যালাপ করব না। তারপর সে সন্তানকে নিয়ে তার সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হল। তারা বলল, "হে মারিয়াম! তুমি তো এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছ। হে হারুনের বোন! তোমার পিতা অসৎ ব্যক্তি ছিল না এবং তোমার মা না ছিল ব্যভিচারিণী।" তারপর সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করল। তারা বলল, যে কোলের শিশু, তার সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?
সে বলল, "আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন নামায ও যাকাত আদায় করতে। আর আমাকে আমার মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন এবং তিনি আমাকে করেন নি উদ্ধত ও হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি যে দিন আমি জন্মলাভ করেছি, যেদিন আমার মৃত্যু হবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হব।" এ-ই মারিয়াম তনয় ঈসা। আমি বললাম, সত্য কথা, যে বিষয়ে তারা বিতর্ক করে। সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর কাজ নয়, তিনি পবিত্র মহিমাময়। তিনি যখন কিছু স্থির করেন, তখন বলেন, 'হও' এবং তা হয়ে যায়। আল্লাহই আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক। সুতরাং তার ইবাদত কর, এটাই সরল পথ। তারপর দলগুলি নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল। সুতরাং দুর্ভোগ কাফেরদের মহাদিবস আগমনকালে।" (সূরা মারিয়াম: ১৬-৩৭)
সূরা আম্বিয়ায় আল্লাহ পাক বলেন: "এবং স্মরণ কর সেই নারীর কথা, যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করছিল। তারপর আমি তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে করেছিলাম বিশ্ববাসীর জন্যে এক নিদর্শন।" (সূরা আম্বিয়া: ৮৯-৯১)
পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, মারিয়ামকে তার মা বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্যে উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে মারিয়ামের বোনের স্বামী বা খালার স্বামী যাকারিয়া তাঁর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যিনি ছিলেন ওই যামানার নবী। হযরত যাকারিয়া আ. মারিয়ামের জন্যে বায়তুল মুকাদ্দাসে একটি উত্তম কক্ষ বরাদ্দ করেন। সেখানে তিনি ব্যতীত অন্য কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। প্রাপ্ত বয়স্কা হলে মারিয়াম আল্লাহর ইবাদতে এত গভীরভাবে নিমগ্ন হন যে, সে যুগে তাঁর মতো এত অধিক ইবাদতকারী অন্য কেউ ছিল না। তাঁর থেকে এমন সব অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেতে থাকে, যা দেখে হযরত যাকারিয়া আ.-এর মনে ঈর্ষার উদ্রেক হয়। একবার ফেরেশতা তাঁকে সুসংবাদ দিলেন, আল্লাহ তাঁকে বিশেষ উদ্দেশ্যে মনোনীত করেছেন; অচিরেই তাঁর এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবেন, তিনি হবেন পূতঃপবিত্র সম্মানিত নবী ও বিভিন্ন মুজিযার অধিকারী। পিতা ব্যতীত সন্তান হওয়ার ব্যাপারে মারিয়াম অবাক হয়ে যান। তিনি বললেন, আমার বিবাহ হয় নি, স্বামী নেই, কিরূপে আমার সন্তান হবে? জবাবে ফেরেশতা জানালেন, আল্লাহ সব কিছু করতে সক্ষম। তিনি যখন কোনো কিছু অস্তিত্বে আনতে চান, তখন শুধু বলেন, 'হয়ে যাও'! অমনি তা হয়ে যায়। মারিয়াম এরপর আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর বিনয়ের সাথে আত্মসমর্পণ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর সম্মুখে এক বিরাট পরীক্ষা।
কেন না সাধারণ লোক এতে সমালোচনার ঝড় তুলবে। আল্লাহর শক্তি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব ও সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকার ফলে শুধু বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিচার করেই তারা নানা কথা বলতে থাকবে। বায়তুল মুকাদ্দাসে অবস্থানকালে বিভিন্ন প্রয়োজনে মারিয়াম কখনও কখনও মসজিদের বাইরে আসতেন। যেমন, মাসিক ঋতুস্রাব হলে কিংবা পানি ও খাদ্যের সন্ধানে অথবা অন্য কোনো অতি প্রয়োজনীয় কাজে তিনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসতেন। একবার এ জাতীয় এক বিশেষ প্রয়োজনে তিনি মসজিদ থেকে বের হলেন এবং দূরে এক স্থানে আশ্রয় নিলেন অর্থাৎ তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদের পূর্ব দিকে অনেক দূর পর্যন্ত একাকী চলে যান। আল্লাহ হযরত জিবরাঈল আমীনকে তথায় প্রেরণ করেন।
জিবরাঈল আ. মারিয়ামের নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন। মারিয়াম তাঁকে দেখেই বলে উঠলেন, "আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করি যদি তুমি আল্লাহ ভীরু হও।" আবুল আলিয়া বলেন: আয়াতে উল্লিখিত 'তাকিয়্যা' বলা হয় এমন ব্যক্তিকে, যে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলে; নিষিদ্ধ কাজকে যে ভয় করে।
জিবরাঈল আ. বললেন, "আমি তো শুধু তোমার পালনকর্তার প্রেরিত এক দূত।" আমি মানুষ নই- তুমি যা ভেবেছ বরং আমি ফেরেশতা। আল্লাহ তোমার নিকট আমাকে প্রেরণ করেছেন। তোমাকে আমি এক পবিত্র পুত্র দান করে যাব। মারিয়াম বললেন, কিরূপে আমার পুত্র হবে অথচ কোনো মানব আমাকে স্পর্শ করে নি এবং আমি ব্যভিচারিণীও কখনও ছিলাম না। আমার এখনও বিবাহ হয় নি এবং আমি কখনও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হই নি। এমতাবস্থায় আমার সন্তান হবে কিভাবে? তিনি বললেন, এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন, এটা আমার জন্যে সহজসাধ্য। অর্থাৎ পুত্র হওয়ার সংবাদে মারিয়াম বিস্ময় প্রকাশ করে যে প্রশ্ন করেছিলেন, তার উত্তরে ফেরেশতা বললেন, স্বামী না থাকা এবং ব্যভিচারিণী না হওয়া সত্ত্বেও তোমার পুত্র সন্তান সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর তাঁর জন্যে এ কাজ অতি সহজ। কেন না তিনি যা ইচ্ছা করেন সব কিছুই করতে পারেন।
এরপর আল্লাহ বলেন: এ অবস্থায় তাকে সৃষ্টি করে আমি বিভিন্ন পন্থায় আমার সৃষ্টি কৌশলের ক্ষমতার দৃষ্টান্ত পেশ করতে চাই। কেন না আল্লাহ আদমকে নর-নারী ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন নারী ছাড়া নর থেকে, ঈসাকে সৃষ্টি করেছেন নর ছাড়া নারী থেকে এবং অন্যান্য সবাইকে সৃষ্টি করেছেন নর ও নারী উভয় থেকে। এটা ঈসার সাহায্যে মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রকাশ কল্পে। কেন না তিনি তার শৈশবে মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের দিকে আহবান করবেন এবং আল্লাহকে স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার সমকক্ষ, শরীক ও সাদৃশ্য থেকে সৃক্ত থাকার বাণী প্রচার করবে আর এটাই শেষ কথা। এ বিষয়টি আল্লাহ চূড়ান্ত করে ফেলেছেন, যার বাস্তবায়ন অবাধারিত এবং যা অবশ্যই সংঘটিত হবে। অথবা এরপর মারিয়ামের মধ্যে হযরত জিবরাঈল আ. ঈসার রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। যেমন, সূরা তাহরীমে আল্লাহ পাক বলেছেন: "আল্লাহ মুমিনদের জন্যে আরও উপস্থিত করছেন, ইমরান তনয়া মারিয়ামের দৃষ্টান্ত, যে তার সতীত্ব রক্ষা করেছিল। ফলে আমি তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছিলাম।" (সূরা তাহরীম: ১২)
হযরত জিবরাঈল আ. কিভাবে ফুঁক দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে একাধিক মুফাস্সির লিখেছেন: হযরত জিবরাঈল হযরত মারিয়ামের জামার আস্তিনে ফুঁক দিয়েছিলেন। ওই ফুঁক জামার মধ্যে দিয়ে তার গুপ্তাঙ্গে গিয়ে প্রবেশ করে। সাথে সাথে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন, যেরূপ নারীরা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে থাকে স্বামীর সাথে সহবাসের মাধ্যমে। এভাবেই মারিয়ামের মধ্যে ফেরেশতার ফুঁক প্রবেশ করে। এতে তার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান এল। এরপর তাকে নিয়ে তিনি এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেলেন। কেন না গর্ভে সন্তান আসার পর মারিয়ামের অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই সঙ্কোচ সৃষ্টি হয়। তিনি বুঝতে পারলেন, অচিরেই লোকজন তাঁর প্রসঙ্গে নানা কথা ছড়াবে।
ওহাব ইবনে মুনাববিহ বলেন, মারয়ামের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া সম্পর্কে যে ব্যক্তি টের পায়, সে হল বনি ইসরাঈলের ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব আন-নাজ্জার নামক এক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন মারিয়ামেরই খালাতো ভাই। মারিয়ামের পূতঃপবিত্র চরিত্র, তাঁর ইবাদত-বন্দেগী ও দীনদারী সম্পর্কে তিনি ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। কিন্তু বিবাহ ব্যতীত অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তিনি ভীষণভাবে বিস্মিত হন। একদিন তিনি মারিয়ামকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, মারয়াম! বল তো বীজ ছাড়াই কি শস্য হয় কখনও? মারিয়াম বললেন, কেন হবে না? সর্বপ্রথম শস্য কিভাবে সৃষ্টি হল? তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, বৃষ্টি ও পানি ব্যতীত কি বৃক্ষ জন্মায়? মারিয়াম বললেন, জন্মায় বৈ কি? না হলে প্রথম বৃক্ষের জন্ম হল কিভাবে? তিনি বললেন: আচ্ছা! পুরুষের স্পর্শ ব্যতীত কি সন্তান জন্মগ্রহণ করে? মারিয়াম বললেন: হ্যাঁ, হয়। আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন নর-নারী ব্যতীত; এরপর তিনি বললেন, এখন তোমার ব্যাপারটা আমাকে খুলে বল, কি হয়েছে? মারিয়াম বললেন: আল্লাহ আমাকে তাঁর এক বাণীর সুসংবাদ দিয়েছেন, যার নাম হল মসীহ মারিয়াম-তনয় ঈসা; দুনিয়া ও আখিরাতের সে হবে মহা সম্মানের অধিকারী এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত। যখন সে মায়ের কোলে থাকবে এবং পূর্ণ বয়স্ক হবে, তখন সে মানুষের সঙ্গে কথা বলবে আর সে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" বর্ণিত আছে, হযরত যাকারিয়া আ.-ও মারিয়ামকে এ ধরনের প্রশ্ন করেছিলেন এবং তিনি তাঁকেও অনুরূপ উত্তর দিয়েছিলেন।
মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, মারিয়াম বলতেন: আমি যখন একাকী নির্জনে থাকতাম, তখন আমার পেটের বাচ্চা আমার সাথে কথা বলত। আর যখন আমি লোক সমাজে থাকতাম, তখন সে আমার পেটের মধ্যে তাসবীহ পাঠ করত। স্পষ্টত মারিয়াম অন্যান্য নারীদের মতো স্বাভাবিকভাবে নয় মাস গর্ভ ধারণের পর প্রসব করেছিলেন। কেন না এর ব্যতিক্রম হলে তার উল্লেখ করা হত। ইকরামা ও ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর এ গর্ভকাল ছিল আট মাস। ইবনে আব্বাসের অপর বর্ণনায় রয়েছে, তিনি গর্ভধারণ মাত্রই সন্তান প্রসব করেছিলেন। আবার কেউ কেউ তাঁর গর্ভকাল মাত্র নয় ঘণ্টা স্থায়ী ছিল বলে বলেছেন। এ মতের সমর্থনে নিম্নের আয়াত "তৎপর সে গর্ভে তাকে ধারণ করল। এরপর তৎসহ এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। প্রসব বেদনা তাকে এক খেজুর বৃক্ষ মূলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল।" (সূরা মারিয়াম : ২২-২৩) প্রনিধানযোগ্য।
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক লিখেছেন, গোটা বনি ইসরাঈলের মধ্যে এ সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, মারিয়াম অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। এতে যাকারিয়া আ. এর পরিবার দুঃখ-শোকে সর্বাধিক মুহ্যমান হয়ে পড়েন। কোনো কোনো ধর্মহীন ব্যক্তি (যিনদীক) জনৈক ইউসুফের দ্বারা এরূপ হয়েছে বলে অপবাদ রটায়। ইউসুফ বায়তুল মুকাদ্দাসে একই সময়ে ইবাদত বন্দেগী করতেন। মারিয়াম লোকালয় থেকে বহু দূরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। প্রসব বেদনা তাঁকে এক খর্জুরবৃক্ষ তলে আশ্রয় নিতে বাধ্য করল। যে স্থানে মারিয়াম আশ্রয় নিয়েছিলেন সে স্থানের নাম বায়তে লাহম (বেথেলহাম)।
মারিয়াম বললেন, হায়! আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মারা যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতাম! তাঁর এ মৃত্যু কামনা থেকে দলীল গ্রহণ করে বলা হয়ে থাকে যে, ফিতনা বা মহা বিপদকালে মৃত্যু কামনা করা বৈধ। মারিয়ামও এরূপ মহা-বিপদকালে মৃত্যু কামনা করেছিলেন। কেন না তিনি নিশ্চিত রূপেই বুঝতে পেরেছিলেন, আমার ইবাদত-বন্দেগী, পবিত্রতা, সার্বক্ষণিক মসজিদে অবস্থান ও ইতিকাফ করা, নবী পরিবারের লোক হওয়া ও দীনদারী সম্পর্কে লোকজন যতই অবগত থাকুক না কেন, যখনই আমি সন্তান কোলে নিয়ে তাদের মাঝে আসব তখনই তারা আমার বিরুদ্ধে অপবাদ দিবে। আমি যতই সত্য কথা বলি না কেন, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করবে। এসব চিন্তা করেই তিনি উপরোক্ত কামনা করেন যে, এ অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার আগেই যদি আমার মৃত্যু হয়ে যেত! কিংবা যদি আমার জন্মই না হত!
এরপর নিম্ন দিক থেকে তাকে কেউ আহবান করে বলল- "তুমি নিজের দিকে খেজুর গাছের কাণ্ডে নাড়া দাও, তা থেকে তোমার উপর সুপক্ক তাজা খেজুর পতিত হবে।" আল্লাহ পাক সেখানে তার জন্য পবিত্র পানি ও পরিপক্ক খেজুরের ব্যবস্থা করেন। অবশেষে ওই আহবানকারী তাকে সওম পালন অর্থাৎ চুপ থাকা ও মৌনতা অবলম্বন করার উপদেশ দেন। সে যুগের শরিয়তে পানাহার ও বাক্যালাপ থেকে বিরত থাকাকে সওম বলা হত।
মারিয়াম আ. এর সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন তাঁর কোলে নবজাত শিশু সন্তানকে দেখল তখন বলল: “হে মারিয়াম! তুমি তো এক বিরাট অন্যায় কাজ করে ফেলেছ।” তুমি তো এমন পরিবারের মেয়ে নও, যাদের চরিত্র এত নীচু পর্যায়ের। তোমার পরিবারের কেউই তো মন্দ কাজে জড়িত ছিল না। তোমার ভাই, পিতা ও মাতা কেউ তো এরূপ ছিলেন না। এভাবে তারা মারিয়ামের চরিত্রে কলঙ্ক লেপে দিল এবং মহা অপবাদ আরোপ করল।
ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, তারা হযরত যাকারিয়া আ. এর ওপর অসৎ কর্মের অপবাদ দেয় এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। হযরত যাকারিয়া আ. সেখান থেকে পলায়ন করলে তারাও তাঁর পিছু ধাওয়া করে। কতিপয় মুনাফিক মারিয়ামকে তাঁর খালাত ভাই ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব আল-নাজ্জারকে জড়িয়ে অপবাদ দেয়। সম্প্রদায়ের লোকদের এ সব অপবাদের মুখে মারিয়ামের অবস্থা যখন কঠিন হয়ে পড়ল, বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে গেল এবং নিজেকে অপবাদ থেকে মুক্ত করার কোনো উপায়ই রইল না, তখন তিনি মহান আল্লাহর উপর ভরসা রেখে হাত দ্বারা সন্তানের দিকে ইঙ্গিত করে তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, তোমরা ওর কাছে জিজ্ঞেস কর এবং তার সাথে কথা বলো! কেন না তোমাদের প্রশ্নের জওয়াব তার কাছে পাওয়া যাবে এবং তোমরা যা শুনতে চাচ্ছ, তা তার কাছেই আছে। তখন উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে দুষ্ট-দুর্দান্ত প্রকৃতির লোকেরা বলল : "এ তো কোলের শিশু! এর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলব?" তুমি আমাদের প্রশ্নের উত্তর অবুঝ শিশুর উপর কি করে ছেড়ে দিলে? যে মাখন ও ঘোলের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে না। তুমি আমাদের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করছ। মুখে কথা না বলে, অবুঝ শিশুর দিকে ইঙ্গিত করে আমাদের সাথে উপহাস করছ। ঠিক এমন সময় শিশু ঈসা বলে উঠলেন :
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا (৩০) وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْতُ حَيًّا (৩১) وَبَرًّا بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا (৩২) وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أُمُوتُ وَيَوْমَ أُبْعَثُ حَيًّا
“আমি তো আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, যতদিন জীবিত থাকি, ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে এবং মায়ের অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেন নি। আমার প্রতি সালাম যে দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি। যে দিন মৃত্যুবরণ করব এবং যে দিন পুনর্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।" (সূরা মারিয়াম: ৩০-৩২)
এই হল ঈসা আ. এর মুখ থেকে প্রকাশিত প্রথম কথা। এখানে সর্বপ্রথম তিনি নিজেকে "আমি আল্লাহর বান্দা” আল্লাহর দাসত্বকে স্বীকার করে নেন এবং আল্লাহ যে তাঁর প্রতিপালক এ কথার ঘোষণা দেন। ঈসা আল্লাহর পুত্র নন বরং তিনি, তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর এক দাসীর পুত্র এ কথাও ঘোষণা করেন। এরপর জাহিল লোকেরা তাঁর মায়ের উপর যে অপবাদ দিয়েছিল, সে অপবাদ থেকে তাঁর মা যে পবিত্র ছিলেন সে সম্পর্কে বলেন, "আল্লাহ আমাকে কিতাব দিয়েছেন ও নবী করেছেন।" কেন না আল্লাহ এমন ব্যক্তিকে নবুয়ত দান করেন না, যার জন্ম হয় ব্যভিচারের মাধ্যমে।
মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় হযরত ঈসা আ. এর কথা এ পর্যন্ত। তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিলেন, আল্লাহ তাঁর প্রতিপালক এবং তাদেরও প্রতিপালক; তার প্রভু এবং তাদেরও প্রভু। আর এটাই সরল পথ। এরপর দলগুলো নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করল। সুতরাং দুর্ভোগ কাফিরদের মহাদিবস আগমনকালে। সেই যুগের ও পরবর্তী যুগের লোক হযরত ঈসা আ. সম্পর্কে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ইহুদিদের এক দল বলল, ঈসা ব্যভিচার জাত সন্তান এবং এ কথার উপরই তারা অটল হয়ে থাকল। আর এক দল আরও অগ্রসর হয়ে বলল, ঈসাই আল্লাহ। অন্য দল বলল, সে আল্লাহর পুত্র। কিন্তু সৃষ্টিজ্ঞান সম্পন্ন লোকেরা বললেন তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল, আল্লাহর এক দাসীর সন্তান এবং আল্লাহর কালেমা, যা মারিয়ামের প্রতি প্রদান করেছিলেন এবং তিনি আল্লাহর প্রেরিত রূহ। শেষোক্ত এ দলটিই মুক্তিপ্রাপ্ত, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত।
📄 আল্লাহ সন্তান গ্রহণ থেকে পবিত্র
এ প্রসঙ্গে সূরা মারিয়ামে আল্লাহ বলেন:
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا (৮৮) لَقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِذَا (৮৯) تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجিবَالُ هَذَا (৯০) أَنْ دَعَوْا لِلرَّحْمَنِ وَلَدًا (৯১) وَمَا يَنْبَغِي لِلرَّحْمَنِ أَنْ يَتَّخِذُ وَلَدًا (৯২) إِنْ كُلُّ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَنِ عَبْدًا (৯৩) لَقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا (৯৪) وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا
"তারা বলে, দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন! তোমরা তো এক বীভৎস কথার অবতারণা করেছ; (অর্থাৎ তোমাদের এ কথা অত্যন্ত ভয়াবহ, কুরুচিপূর্ণ ও নিরেট মিথ্যা।) এতে যেন আকাশমণ্ডলী বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পতিত হবে, যেহেতু তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা দয়াময়ের জন্যে শোভন নয়। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের নিকট বান্দারূপে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গণনা করেছেন এবং কিয়ামত দিবসে তাদের সকলেই তাঁর নিকট আসবে একাকী অবস্থায়।" (সূরা মারিয়াম: ৮৮-৯৫)
উক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, সন্তান গ্রহণ করা আল্লাহর জন্যে মোটেই শোভনীয় নয়। কেন না তিনি সব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা ও মালিক এবং সব কিছু তাঁর মুখাপেক্ষী ও অনুগত। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই তাঁর দাস, তিনি এ সবের প্রতিপালক। তিনি ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই, আর কোনো প্রতিপালকও নেই। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। সুতরাং কিরূপে তাঁর সন্তান হতে পারে? আমরা জানি, সমশ্রেণীর দুজনের মিলন ব্যতীত সন্তান হয় না। আর আল্লাহর সমকক্ষ, সদৃশ ও সমশ্রেণীর কেউ নেই। অতএব তাঁর স্ত্রীও নেই, যখন তাঁর সন্তানও হতে পারে না।
আল্লাহ আহলে কিতাব ও তাদের অনুরূপ সম্প্রদায়কে ধর্মীয় বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও অহংকার প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। খ্রিষ্টান সম্প্রদায় মাসীহ-এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের উচিত ছিল তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা এবং এ আকীদা পোষণ করা যে, তিনি আল্লাহর সতী বাঁদী কুমারী মারিয়ামের সন্তান। ফিরিশতা জিবরাঈলকে আল্লাহ মারিয়ামের নিকট প্রেরণ করেন। তিনি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী মারয়ামের মধ্যে ফুঁক দেন। এ প্রক্রিয়ায় হযরত ঈসা আ. মারয়ামের গর্ভে আসেন। এই রূহ আল্লাহর কোনো অংশ নয় বরং আল্লাহর সৃষ্টি বা মাখলুক। আল্লাহর দিকে রূহকে সম্পর্কিত করা হয়েছে সম্মানার্থে ও গুরুত্ব প্রকাশের উদ্দেশ্যে। বিনা পিতায় জন্ম হওয়ায় হযরত ঈসাকে বলা হয়েছে রূহুল্লাহ। তাঁকে কালেমাতুল্লাহ বা আল্লাহর কলেমাও (বাণী) বলা হয়। কেন না আল্লাহর এক কলেমার (বাণী) দ্বারাই তিনি অস্তিত্ব লাভ করেন।
এখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: "ইহুদিরা বলে, উযায়ের আল্লাহর পুত্র এবং খ্রিষ্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহর পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা। পূর্বে যারা কুফরী করেছিল এরা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ ওদেরকে ধ্বংস করুন! তারা কেমন করে সত্য বিমুখ হয়।" (সূরা তাওবা: ৩০)
মোটকথা, ইহুদি ও খ্রিষ্টান অভিশপ্ত উভয় দলই আল্লাহর ব্যাপারে অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবি করেছে এবং ধারণা করেছে, আল্লাহর পুত্র সন্তান আছে। অথচ তাদের এ দাবির বহু ঊর্ধ্বে আল্লাহর মর্যাদা। তাদের এ দাবি ছিল সম্পূর্ণ মনগড়া। এদের পূর্ববর্তী পথভ্রষ্ট মানুষও এ জাতীয় মনগড়া উক্তি করেছে। তাদের সাথে এদের অন্তরের মিল রয়েছে।
কুরআন মাজিদের উপর্যুক্ত মক্কী আয়াতগুলোতে ইহুদি, খ্রিষ্টান, মুশরিক ও দার্শনিকদের সমস্ত দল-উপদলের মতামতের খণ্ডন করা হয়েছে। যারা অজ্ঞতাবশত, বিশ্বাস করে ও দাবি করে যে, আল্লাহর সন্তান আছে। এসব জালিমদের সীমালঙ্ঘনমূলক উক্তি থেকে আল্লাহ পবিত্র ও মহান। এ জঘন্য উক্তি উচ্চারণকারীদের মধ্যে সবচাইতে প্রসিদ্ধ দল হল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। এ কারণে কুরআন মাজিদে তাদের খণ্ডন করা হয়েছে সবচাইতে বেশী। তাদের স্ব-বিরোধী উক্তি, অজ্ঞতা ও জ্ঞানের দৈন্যের কথা বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের এ কুফরী উক্তির মধ্যে আবার বিভিন্ন দল-উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা তো কুফরী করেছেই, যদিও এক ইলাহ ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই।
তারা উভয়েই খাদ্য গ্রহণ করত। অন্যদের মতো তাদেরও পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন হত। এমতাবস্থায় তাঁরা ইলাহ হন কীরূপে? আল্লাহ তাদের এ মূর্খতাব্যঞ্জক উক্তি থেকে মুক্ত ও পবিত্র। নিশ্চয় তারা কাফির, যারা বলে আল্লাহ তিন জনের একজন। আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারিয়াম তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমাকে ও আমার মাকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর? সে বলবে, তুমিই মহিমান্বিত! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তা বলতাম, তবে নিশ্চয়ই তুমি তা জানতে। আমার অন্তরে যা আছে, তা তো তুমি অবগত আছ কিন্তু তোমার অন্তরে কী আছে, আমি তা অবগত নই; তুমি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তুমি আমাকে যে আদেশ করেছ, তা ব্যতীত তাদেরকে আমি কিছুই বলি নি; তা এই: তোমরা আমার ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম, ততদিন আমি ছিলাম তাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলে নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।
📄 হযরত ঈসা আ.-এর জন্মকালীন কিছু মোজেযা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, হযরত ঈসা আ. বায়তুল মুকাদ্দাসের সন্নিকটে বায়তে লাহমে জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ.-এর ধারণা, হযরত ঈসা আ.-এর জন্ম হয় মিসরে এবং মারয়াম ও ইউসুফ ইবনে ইয়াকূব আল-নাজ্জার একই গাধার পিঠে আরোহণ করে ভ্রমণ করেন। কিন্তু এ বর্ণনা সঠিক নয়। কেন না পূর্বেই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, ঈসা আ.-এর জন্মস্থান হচ্ছে বায়তে লাহাম। সুতরাং এ হাদীসের মুকাবিলায় অন্য যে কোনো বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য।
ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ঈসা আ. যখন ভূমিষ্ঠ হন তখন পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত মূর্তি ভেঙে পড়ে যায়। ফলে শয়তানরা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে। এর কোনো কারণ তারা খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে বড় ইবলীস তাদেরকে জানাল যে, ঈসা আ.-এর জন্ম হয়েছে। শয়তানরা শিশু ঈসাকে তার মায়ের কোলে আর চারদিকে ফেরেশতাগণ দাঁড়িয়ে তাঁকে ঘিরে রেখেছেন দেখতে পেল। তারা আকাশে উদিত একটি বিরাট নক্ষত্রও দেখতে পেল। পারস্য সম্রাট ওই নক্ষত্র দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং জ্যোতিষীদের নিকট এর উদিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। জ্যোতিষীরা জানাল, পৃথিবীতে এক মহান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে। এ সংবাদ শুনে মারিয়াম শিশুপুত্র ঈসাকে নিয়ে মিসরে চলে আসেন এবং একটানা বার বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে ঈসা আ.-এর বিভিন্ন রকম কারামাত ও মুজিযা প্রকাশ হতে থাকে। ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ কতিপয় মু'জিযার কথা উল্লেখ করেছেন। যথা:
এক. মারিয়াম আ. মিসরের যে সর্দারের বাড়িতে অবস্থান করেন, একবার ওই বাড়ি থেকে একটি বস্তু হারিয়ে যায়। কে বা কারা বস্তুটি চুরি করেছে, তা অনুসন্ধান করেও তার সন্ধান পাওয়া গেল না। অবশেষে শিশু ঈসা সেখানে অবস্থানকারী এক অন্ধ ও এক পঙ্গু ব্যক্তির নিকট গেলেন। অন্ধকে বললেন, তুমি এ পঙ্গুকে ধরে উঠাও এবং তাকে সাথে নিয়ে চুরি করা বস্তা নিয়ে এস। অন্ধ বলল, আমি তো তাকে উঠাতে সক্ষম নই। ঈসা আ. বললেন কেন, তোমরা উভয়ে যেভাবে ঘরের জানালা দিয়ে বস্তুটি নিয়ে এসেছিলে, সেভাবেই গিয়ে দিয়ে এস। এ কথা শোনার পর তারা এর সত্যতা স্বীকার করল এবং চুরি করা বস্তুটি নিয়ে আসল। এ ঘটনার পর ঈসার মর্যাদা মানুষের নিকট অত্যধিক বেড়ে যায়।
দুই. উক্ত সর্দারের পুত্র আপন সন্তানদের পবিত্রতা অর্জনের উৎসবের দিনে এক ভোজসভার আয়োজন করে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। সে যুগের নিয়মানুযায়ী এখন মদ পরিবেশনের পালা। কিন্তু মদ ঢালতে গিয়ে দেখা গেল কোনো কলসিতেই মদ নেই। হযরত ঈসা আ. এ অবস্থা দেখে প্রতিটি কলসির মুখে হাত ঘুরিয়ে আসলেন। ফলে সেগুলো সাথে সাথে উৎকৃষ্ট মদে পূর্ণ হয়ে গেল। লোকজন এ ঘটনা দেখে বিস্মিত হল। এরপর তারা বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পড়লেন।
হযরত ঈসা ইবনে মারিয়ামই প্রথম মানুষ, যিনি শিশুকালে কথা বলেছেন। আল্লাহ তাঁর রসনা খুলে দেন এবং তিনি আল্লাহর প্রশংসায় এমন অনেক কথা বলেন, যা ইতিপূর্বে কোনো কান কখনও শোনে নি। এ প্রশংসায় তিনি চাঁদ, সুরুজ, পর্বত, নদী, ঝর্ণা কোনো কিছুকেই উল্লেখ করতে বাদ দেন নি। ঈসা ইবনে মারয়াম আ. শিশু অবস্থায় একবার কথা বলেন। এরপর তার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যান্য শিশুরা যখন স্বাভাবিক বয়সে কথা বলে থাকে, তিনিও সে বয়সে পুনরায় কথা বলতে শুরু করেন। আল্লাহ তখন তাঁকে যুক্তিপূর্ণ কথা ও বাগ্মিতা শিক্ষা দেন।
হযরত ঈসা আ.-এর বয়স যখন সাত বছর, তখন তাঁরা তাঁকে লেখাপড়া শিখানোর জন্যে বিদ্যালয়ে পাঠান। কিন্তু শিক্ষক তাঁকে যে বিষয়টিই শিখাতে চাইতেন, তিনি আগেই সে বিষয় সম্পর্কে বলে দিতেন। এমতাবস্থায় এক শিক্ষক তাঁকে 'আবূ জাদ' শিখালেন। শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, আবু জাদ কি? উত্তরে ঈসা বললেন, 'আ' দ্বারা 'আলাউুল্লাহ' (আল্লাহর নিয়ামতরাশি), 'বা' দ্বারা 'বাহাউল্লাহ' (আল্লাহর দীপ্তি), 'জা' দ্বারা 'বাহজাতুল্লাহ ও জামালুহু' (আল্লাহর অনুপম সৌন্দর্য)। এ উত্তর শুনে শিক্ষক বিস্মিত হয়ে গেলেন। হযরত ঈসা আ.-ই সর্ব প্রথম আবূ জাদ শব্দের ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
হযরত ঈসার বয়স যখন তের বছর, তখন আল্লাহ তাকে মিসর ত্যাগ করে ঈলিয়া যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন ঈসার মায়ের মামাত ভাই ইউসুফ এসে ঈসা আ. ও মারিয়ামকে একটি গাধার পিঠে উঠিয়ে ঈলিয়া নিয়ে যান এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। আল্লাহ এখানেই তার উপর ইনজীল অবতীর্ণ করেন, তাওরাত শিক্ষা দেন, মৃতকে জীবিত করা, রোগীকে আরোগ্য করা, বাড়িতে প্রস্তুতকৃত খাদ্য সম্পর্কে না দেখেই জানিয়ে দেওয়ার জ্ঞান দান করেন। ঈলিয়ার লোকদের মধ্যে তাঁর আগমন বার্তা পৌঁছে যায়। তাঁর দ্বারা বিস্ময়কর ঘটনাবলী প্রকাশিত হতে দেখে তারা ঘাবড়ে যায় এবং আশ্চর্যবোধ করতে থাকে। ঈসা আ. তাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানান। এভাবে তাঁর নবুয়তি প্রচারকার্য জনগণের মধ্যে বিকাশ লাভ করে।
📄 প্রসিদ্ধ আসমানি চার কিতাব
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
আবু যুরআ দামেশকী রহ. বর্ণনা করেন, তাওরাত কিতাব হযরত মূসা আ.-এর উপর ৬ রমযানে অবতীর্ণ হয়। এর ৪৮২ বছর পর হযরত দাউদ আ.-এর উপর যাবুর নাযিল হয় ১২ রমযানে। এর ১০৫০ বছর পর ১৮ রমাযানে হযরত ঈসা আ.-এর উপর ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং ২৪ রমাযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কুরআন মজিদ নাযিল হয়। ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ত্রিশ বছর বয়সকালে হযরত ঈসা আ.-এর প্রতি ইনজীল অবতীর্ণ হয় এবং তেত্রিশ বছর বয়সের সময় তাঁকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।