📄 ইমরানের স্ত্রীর সন্তান প্রার্থনা
মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, মারিয়াম আ. এর মায়ের কোনো সন্তান হত না। এ অবস্থায় একদিন তিনি দেখেন, একটি পাখি তার ছানাকে আদর-সোহাগ করছে। এ দৃশ্য দেখে তাঁর অন্তরে সন্তান লাভের অদম্য আগ্রহ জাগে। তখনই তিনি মানত করলেন, তিনি যদি গর্ভবতী হন তবে তাঁর পুত্র সন্তানকে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করবেন; বায়তুল মুকাদ্দাসের খাদেম বানাবেন। মানত করার সাথে সাথেই তাঁর মাসিক স্রাব আরম্ভ হয়ে যায়। পবিত্র হওয়ার পর তাঁর স্বামী তাঁর সাথে মিলিত হন এবং মারিয়াম তাঁর গর্ভে আসেন।
আল-কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে, এরপর সে যখন তাকে প্রসব করল, তখন সে বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যাসন্তান প্রসব করেছি। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের ব্যাপারে কন্যাসন্তান পুত্র সন্তানের মতো নয়। উল্লেখ্য, সে যুগের লোকেরা বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্যে নিজেদের সন্তান মান্নত করত। মারিয়ামের মা তার নাম রাখল মারিয়াম।
📄 শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা
এরপর তার মা বললেন, "আমি একে এবং এর ভবিষ্যৎ বংশধরকে বিতাড়িত শয়তান থেকে রক্ষা করার জন্যে তোমারই আশ্রয় চাই।" মারিয়ামের মায়ের এ দুআ তাঁর মানতের মতই কবুল হয়েছিল। এ সম্পর্কে হাদিসে আছে, ইমাম আহমদ আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় শয়তান তাকে স্পর্শ করে, তাই সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কেবল মারিয়াম ও তার পুত্র এর ব্যতিক্রম। আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের এ আয়াত পড়তে পার: وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ
ইমাম আহমদ রহ. ভিন্ন সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বনি আদমের প্রতিটি নবজাত শিশুকে শয়তান আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে। কেবল মারিয়াম বিনতে ইমরান ও তাঁর পুত্র ঈসা এর ব্যতিক্রম। ভিন্ন সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কোনো মা যখন সন্তান প্রসব করে, তখন মায়ের কোলেই শয়তান তাকে ঘুষি মারে। কেবল মারিয়াম ও তার পুত্র এর ব্যতিক্রম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কি দেখেছ, শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন চিৎকার করে কাঁদে? সাহাবাগণ বললেন: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ চিৎকার তখনই সে দেয়, যখন মায়ের কোলে শয়তান তাকে ঘুষি মারে। এ হাদীসটি মুসলিমের শর্তানুযায়ী বর্ণিত।
কায়স আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোনো শিশু ভূমিষ্ঠ হলে শয়তান তাকে একবার বা দুবার চাপ দেয়। কেবল ঈসা ইবনে মারিয়াম ও মারিয়াম এ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন। "আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে তার ও তার বংশধরদের জন্যে তোমার আশ্রয় চাই।" মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ও ইমাম আহমদ আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: প্রতিটি আদম সন্তান, যখন সে ভূমিষ্ঠ হয় তখন শয়তান তার পার্শ্বদেশে খোঁচা মারে। কেবল ঈসা ইবনে মারিয়াম এর ব্যতিক্রম। শয়তান ঈসাকে খোঁচা মারতে গিয়ে পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়। এ হাদীস বুখারী ও মুসলিমের শর্তে বর্ণিত।
📄 ফেরেশতাগণের সুসংবাদ
ফেরেশতাগণ মারিয়াম আ.-কে একদিন সুসংবাদ দিলেন, আল্লাহ তাঁকে সে যুগের সমস্ত নারীদের মধ্যে মনোনীত করেছেন। কেন না তিনি তাঁর থেকে সৃষ্টি করবেন পিতা ছাড়া পুত্র-সন্তান এবং সে পুত্রটি হবেন মর্যাদাশীল নবী। মানুষের সাথে কথা বলবেন দোলনায় থাকা অবস্থায়। শিশুকালেই তিনি মানুষকে ওই একই আহবান জানাতে থাকবেন। এ থেকে বুঝা যায় যে, মারিয়াম তনয় পরিণত বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন এবং মানুষকে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করবেন। সেইসঙ্গে তাঁকে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগী ও রুকু সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। যাতে করে তিনি ওই মর্যাদার যোগ্য হয়ে উঠেন এবং তিনি এ অপার নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারেন। তিনি এ নির্দেশ পূর্ণভাবে পালন করার চেষ্টা করতেন। কথিত আছে, দীর্ঘক্ষণ নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু পা ফুলে যেত।
📄 মারিয়াম আ.-এর মর্যাদা
ফেরেশতাগণ বলেন, “হে মারিয়াম! আল্লাহ মন্দ চরিত্র থেকে তোমাকে পবিত্র রেখেছেন এবং উত্তম গুণাবলী দ্বারা বিভূষিত করেছেন। তদুপরি তোমাকে বিশ্বের নারীগণের মধ্যে মনোনীত করেছেন। অর্থাৎ সে যুগে বিশ্বে যত নারী ছিল, তাদের ঊর্ধ্বে। অথবা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বিশ্বের সমস্ত নারীর মধ্যে মারিয়ামই শ্রেষ্ঠ। কেন না তিনি যদি নবী হয়ে থাকেন, যেমনটি ইবনে হাযম প্রমুখের ধারণা। তিনি মনে করেন, ঈসা নবীর মা মারিয়াম, ইসহাক নবীর মা সারা ও মূসা নবীর মা নবী ছিলেন। কেন না এঁদের প্রত্যেকের সাথে ফেরেশতা কথা বলেছেন। তদ্রুপ মূসা নবীর মায়ের নিকটও ওহি এসেছে। এ মত অনুযায়ী মারিয়াম অন্যান্য নারীদের তুলনায় তো বটেই, এমনকি সারা এবং মূসা আ.-এর মায়ের তুলনায়ও শ্রেষ্ঠতর।
ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈ রহ. বিভিন্ন সূত্রে হযরত আলি রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম মারিয়াম বিনতে ইমরান এবং নারীদের মধ্যে সর্বোত্তম খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ। ইমাম আহমদ আনাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বিশ্বজগতে নারীদের মধ্যে কেবল চারজনই শ্রেষ্ঠ। তারা হলেন মারিয়াম বিনতে ইমরান, ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া, খাদিজা বিনতে খুওয়ায়লিদ ও ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ।
আবু ইয়ালার সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মাটির উপরে চারটি রেখা আঁকেন এবং সাহাবাগণের নিকট জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি বুঝতে পেরেছ এ রেখা কিসের? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, জান্নাতবাসী মহিলাদের মধ্যে সর্বোত্তম মহিলা খুওয়াইলিদের কন্যা খাদিজা, মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমা, ইমরানের কন্যা মারিয়াম এবং মুযাহিমের কন্যা ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া।
মোটকথা, উপর্যুক্ত হাদীস ছাড়াও এ সম্পর্কিত আরও হাদীস রয়েছে। যার দ্বারা বুঝা যায়, চার জনের মধ্যে ফাতেমা ও মারিয়ামই শ্রেষ্ঠ। তবে এ দুজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে? এ বিষয়ে হাদিসের অর্থ দু'রকম হতে পারে। এক. মারিয়াম আ. ফাতেমা রাযি. চেয়ে শ্রেষ্ঠ। দুই. মারিয়াম ও ফাতেমা উভয়ে সমমর্যাদা সম্পন্ন। এ বিষয়ে হাফেজ ইবনে আসাকির ইবনে আব্বাসের এক হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "জান্নাতবাসী মহিলাদের মধ্যে সবার শীর্ষে থাকবে মারিয়াম বিনতে ইমরান, তারপরে ফাতেমা তারপরে খাদিজা, তারপরে ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া।"
এখানে শব্দ বিন্যাস থেকে তাঁদের, মর্যাদার ক্রমবিন্যাস বুঝা যায়। ইতঃপূর্বে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেখানেও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে; যার দ্বারা মর্যাদার বিন্যাসও বুঝায় না এবং বিন্যাসের পরিপন্থীও বুঝায় না। এ হাদীসটিই আবু হাতিম রহ. ভিন্ন সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন। সেখানেও বর্ণনা থেকে মর্যাদার ক্রম বিন্যাস বুঝায় না। ইবনে মারদুই থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পুরুষদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক লোক পূর্ণতা (কামালিয়াত) লাভ করেছেন; কিন্তু মহিলাদের মধ্যে তিনজন ছাড়া আর কেউই পূর্ণতা অর্জন করেন নি। তাঁরা হচ্ছেন মারিয়াম বিনতে ইমরান, ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ও খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ। আর নারীদের মধ্যে আয়েশার মর্যাদা সেই পরিমাণ, যেই পরিমাণ মর্যাদা সমস্ত খাদ্যের মধ্যে ছারীদের।