📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ঈসা আ.-এর বিবরণ

📄 হযরত ঈসা আ.-এর বিবরণ


খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, আল্লাহর সন্তান আছে। তাদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডনে আল্লাহ তাআলা সূরা আলে-ইমরানের প্রথম দিকে ধারাবাহিকভাবে তিরাশিটি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। নাজরান থেকে খ্রিষ্টানদের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের ভ্রান্ত ধর্ম-বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করে বলে, তারা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী এবং তাদের ধারণা অনুসারে আল্লাহ হচ্ছেন তিন সত্তার এক সত্তা। তাদের মধ্যকার বিভিন্ন দল উপদলের মধ্যে এক দলের মতে সেই তিন সত্তা হল: আল্লাহ, ঈসা আ. ও মারিয়াম। এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা সূরার প্রারম্ভে উক্ত বিষয়ে আয়াত নাযিল করেন। তাতে তিনি বলেন, ঈসা আ. আল্লাহর বান্দাদের মধ্যকার একজন বান্দা। অন্যান্য সৃষ্টির মতো আল্লাহ তাঁকেও সৃষ্টি করেছেন এবং মাতৃগর্ভে আকৃতি দান করেছেন। তবে আল্লাহ তাঁকে পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন, যেমন আদমকে পিতা ও মাতা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন। তাঁর ক্ষেত্রে তিনি কেবল বলেছেন, 'কুন' (হয়ে যাও), তখনই তিনি সৃষ্ট হয়ে যান। এ সম্পর্কে সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ (৩৩) ذُرِّيَّةٌ بَعْضُهَا مِنْ بَعْضٍ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ (৩৪) إِذْ قَالَتِ امْرَأَتُ عِمْرَانَ رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (৩৫) فَلَمَّا وَضَعَتُهَا قَالَت่ رَبِّ إِنِّي وَضَعْتُهَا أُنْثَى وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا وَضَعَتْ وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَى وَإِنِّي سَمَّيْتُهَا مَرْيَمَ وَإِنِّي أُعِيدُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ (৩৬) فَتَقَبَّلَهَا رَبُّهَا بِقَبُولٍ حَسَنٍ وَأَنْبَتَهَا نَبَاتًا حَسَنًا وَكَفَلَهَا زَكَرِيَّا كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِنْدَهَا رِزْقًا قَالَ يَا مَرْيَمُ أَنَّى لَكِ هَذَا قَالَتْ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ

"নিশ্চয়ই আদম, নূহ ও ইবরাহীম ও ইমরানের বংশধরকে আল্লাহ বিশ্বজগতে মনোনীত করেছেন। এরা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। স্মরণ কর, যখন ইমরানের স্ত্রী বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! আমার গর্ভে যা আছে, তা একান্ত তোমার জন্যে আমি উৎসর্গ করলাম। সুতরাং তুমি আমার নিকট হতে তা কবুল কর, তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। এরপর যখন সে তাকে প্রসব করল তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যা প্রসব করেছি। সে যা প্রসব করেছে, আল্লাহ তা সম্যক অবগত। ছেলে তো এ মেয়ের মতো নয়, আমি তার নাম মারিয়াম রেখেছি এবং অভিশপ্ত শয়তান হতে তার ও তার বংশধরদের জন্যে তোমার আশ্রয় নিচ্ছি। এরপর তার প্রতিপালক তাকে সাগ্রহে কবুল করলেন এবং তাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করলেন এবং তিনি তাকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রেখেছিলেন। যখনই যাকারিয়া কক্ষে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যেত, তখনই তার নিকট খাদ্যসামগ্রী দেখতে পেত। সে বলত, হে মারিয়াম! এ সব তুমি কোথায় পেলে? সে বলত, এটা আল্লাহর নিকট হতে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবনোপকরণ দান করেন।" (সূরা আলে-ইমরান: ৩৩-৩৭)

আল্লাহ এখানে আদম আ.-কে এবং তাঁর সন্তানদের মধ্যে যারা তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণে অটল ও অবিচল ছিলেন, বিশেষভাবে হযরত ইবরাহীম আ.-এর বংশধর, তাঁর বংশের ইসমাঈলী শাখা ও ইসহাকের শাখা এবং ইমরান পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। এখানে ইমরান বলতে মারিয়ামের পিতা উদ্দেশ্য।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ইমরানের পরিচয়

📄 ইমরানের পরিচয়


মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ইমরানের নসবনামা উল্লেখ করেছেন। ইমরান ইবনে বাশিম ইবনে আমূন ইবনে মীশা ইবনে হিযকিয়া ইবনে আহরীক ইবনে মুছাম ইবনে আযাবিয়া ইবনে আমসিয়া ইবনে ইয়াউশ ইবনে আহরীহ ইবনে ইয়াযাম ইবনে ইয়াহফাশাত ইবনে ঈশা ইবনে আয়ান ইবনে রাহবিআম ইবনে সুলাইমান ইবনে দাউদ আ.।

অপরদিকে ইবনে আসাকিরের বর্ণনা মতে হযরত মারিয়াম আ. এর বংশধারা হল: মারিয়াম বিনতে ইমরান ইবনে মাছান ইবনুল আযির ইবনুল ইয়াওদ ইবনে আখনার ইবনে সাদৃক ইবনে 'আয়াযূয ইবনে আল-য়াফীম ইবনে আয়বৃদ ইবনে যারয়াবীল ইবনে মাওছাম ইবনে আযরিয়া ইবনে য়ূরাম ইবনে শাফাত ইবনে ঈশা ইবনে ঈবা ইবনে রাহরিআম ইবনে সুলায়মান ইবনে দাউদ আ.।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের বর্ণিত নসবনামার সাথে এ নসবনামার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তবে মারিয়াম আ. যে দাউদ আ.-এর বংশধর, এ ব্যাপারে কোনো বিরোধ নেই। মারিয়ামের পিতা ইমরান ছিলেন সে যুগে বনি ইসরাঈলের ইমাম। তাঁর মা হান্না বিনতে ফাকূদ ইবনে কাবীল ছিলেন ইবাদতগুজার মহিলা। আর হযরত যাকারিয়া আ. ছিলেন সে যুগের নবী। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি ছিলেন মারিয়ামের বোন আশইয়ার স্বামী। কিন্তু কারও কারও মতে মারিয়ামের খালার নাম ছিল আশইয়া' এবং যাকারিয়া ছিলেন এ আশইয়ার স্বামী।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ইমরানের স্ত্রীর সন্তান প্রার্থনা

📄 ইমরানের স্ত্রীর সন্তান প্রার্থনা


মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, মারিয়াম আ. এর মায়ের কোনো সন্তান হত না। এ অবস্থায় একদিন তিনি দেখেন, একটি পাখি তার ছানাকে আদর-সোহাগ করছে। এ দৃশ্য দেখে তাঁর অন্তরে সন্তান লাভের অদম্য আগ্রহ জাগে। তখনই তিনি মানত করলেন, তিনি যদি গর্ভবতী হন তবে তাঁর পুত্র সন্তানকে আল্লাহর জন্যে উৎসর্গ করবেন; বায়তুল মুকাদ্দাসের খাদেম বানাবেন। মানত করার সাথে সাথেই তাঁর মাসিক স্রাব আরম্ভ হয়ে যায়। পবিত্র হওয়ার পর তাঁর স্বামী তাঁর সাথে মিলিত হন এবং মারিয়াম তাঁর গর্ভে আসেন।

আল-কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে, এরপর সে যখন তাকে প্রসব করল, তখন সে বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমি কন্যাসন্তান প্রসব করেছি। আর বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের ব্যাপারে কন্যাসন্তান পুত্র সন্তানের মতো নয়। উল্লেখ্য, সে যুগের লোকেরা বায়তুল মুকাদ্দাসের খেদমতের জন্যে নিজেদের সন্তান মান্নত করত। মারিয়ামের মা তার নাম রাখল মারিয়াম।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা

📄 শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা


এরপর তার মা বললেন, "আমি একে এবং এর ভবিষ্যৎ বংশধরকে বিতাড়িত শয়তান থেকে রক্ষা করার জন্যে তোমারই আশ্রয় চাই।" মারিয়ামের মায়ের এ দুআ তাঁর মানতের মতই কবুল হয়েছিল। এ সম্পর্কে হাদিসে আছে, ইমাম আহমদ আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে কোনো সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় শয়তান তাকে স্পর্শ করে, তাই সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কেবল মারিয়াম ও তার পুত্র এর ব্যতিক্রম। আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে কুরআনের এ আয়াত পড়তে পার: وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ

ইমাম আহমদ রহ. ভিন্ন সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: বনি আদমের প্রতিটি নবজাত শিশুকে শয়তান আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে। কেবল মারিয়াম বিনতে ইমরান ও তাঁর পুত্র ঈসা এর ব্যতিক্রম। ভিন্ন সূত্রে আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কোনো মা যখন সন্তান প্রসব করে, তখন মায়ের কোলেই শয়তান তাকে ঘুষি মারে। কেবল মারিয়াম ও তার পুত্র এর ব্যতিক্রম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কি দেখেছ, শিশু যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন চিৎকার করে কাঁদে? সাহাবাগণ বললেন: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ চিৎকার তখনই সে দেয়, যখন মায়ের কোলে শয়তান তাকে ঘুষি মারে। এ হাদীসটি মুসলিমের শর্তানুযায়ী বর্ণিত।

কায়স আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোনো শিশু ভূমিষ্ঠ হলে শয়তান তাকে একবার বা দুবার চাপ দেয়। কেবল ঈসা ইবনে মারিয়াম ও মারিয়াম এ থেকে রক্ষা পেয়েছে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত পাঠ করলেন। "আমি অভিশপ্ত শয়তান থেকে তার ও তার বংশধরদের জন্যে তোমার আশ্রয় চাই।" মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক ও ইমাম আহমদ আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: প্রতিটি আদম সন্তান, যখন সে ভূমিষ্ঠ হয় তখন শয়তান তার পার্শ্বদেশে খোঁচা মারে। কেবল ঈসা ইবনে মারিয়াম এর ব্যতিক্রম। শয়তান ঈসাকে খোঁচা মারতে গিয়ে পর্দায় খোঁচা মেরে চলে যায়। এ হাদীস বুখারী ও মুসলিমের শর্তে বর্ণিত।

ফন্ট সাইজ
15px
17px