📄 পরিচয় ও বিবরণ
ইয়াজুজ-মাজুজ যে হযরত আদম আ.-এর বংশধর, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। প্রমাণ হল সহি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হযরত আবু সাঈদ রাযি.-এর হাদিস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাআলা আদেশ দেবেন, হে আদম! উঠ, তোমার বংশধরদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের দিকে পাঠিয়ে দাও। হযরত আদম আ. বলবেন, হে প্রতিপালক! জাহান্নামীদের সংখ্যা কত? আল্লাহ তাআলা বলবেন, প্রতি হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী আর একজন মাত্র জান্নাতী। তখন শিশুগণ বৃদ্ধে পরিণত হবে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটবে এবং তুমি তাদেরকে মাতালের মতো দেখতে পাবে, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সে একজন কে হবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের থেকে হবে একজন আর ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে হবে এক হাজার জন।
অপর বর্ণনায় এসেছে, সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের মধ্যে দুটো দল রয়েছে। সে দুদল যেখানে যাবে সেখানে সংখ্যাধিক্য হবে। এটি প্রমাণ করে, ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা অত্যধিক এবং তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।
দ্বিতীয় কথা হল, তারা হযরত নূহ আ.-এর বংশধর। কারণ, জগতবাসীর উদ্দেশ্যে হযরত নূহ আ.-এর দুআ: 'হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না।' আল্লাহ তাআলা এ দোয়া কবুল করেছেন বলে জানিয়েছেন। আবার আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তাদেরকে আমি এবং নৌকা আরোহনকারীদেরকে রক্ষা করেছি।' তিনি অন্যত্র বলেছেন, 'তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশপরম্পরায়।'
মুসনাদ ও সুনান-এ আছে, হযরত নূহ আ.-এর তিন পুত্র ছিলেন— সাম, হাম ও ইয়াফিছ। এদের মধ্যে সাম হচ্ছেন আরবদের পূর্বপুরুষ, হাম সুদানীদের পূর্বপুরুষ এবং ইয়াফিছ তুর্কীদের পূর্বপুরুষ। সুতরাং ইয়াজুজ-মাজুজ তুর্কীদেরই গোত্র। এরা মোঙ্গল সম্প্রদায়ভুক্ত। দুর্ধর্ষতা ও ধ্বংস সাধনে এরা মোঙ্গলীয়দের অন্যান্য শাখার তুলনায় অগ্রগামী। সাধারণ মানুষের তুলনায় সাধারণ মোঙ্গলীয়দের যে অবস্থা, সাধারণ মোঙ্গলদের তুলনায় ইয়াজুজ-মাজুজের অবস্থা তদ্রুপ। কথিত আছে, তুর্কীদের এরূপ নামকরণের কারণ হল বাদশা যুলকারনাইন যখন তাঁর ঐতিহাসিক প্রাচীর তৈরি করেন, তখন ইয়াজুজ-মাজুজকে ওই প্রাচীরের পিছনে থাকতে বাধ্য করেন। ওদের একটি গোত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রাচীরের এদিকে রয়ে গিয়েছিল। এদের দুর্ধর্ষতা পূর্বোক্তদের সমপর্যায়ের ছিল না। ওদেরকে প্রাচীরের এ পাশে রেখে দেওয়া হয়েছিল। তাই তাদের নাম হয়েছে তুর্ক বা পরিত্যক্ত।
কেউ কেউ বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টি হযরত আদম আ.-এর স্বপ্নদোষকালীন বীর্য থেকে। ওই বীর্য মাটির সাথে মিলিত হয় এবং তা থেকে তারা সৃষ্টি হয়েছিল। তারা হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত সন্তান নয়। শায়খ আবু যাকারিয়া নববী সহি মুসলিমের ভাষ্যগ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থে এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং এ বক্তব্য যথার্থভাবেই দুর্বল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। কারণ, এর পক্ষে কোনো দলিল প্রমাণ নেই। বরং কুরআনের আয়াত দ্বারা আমরা প্রমাণ করেছি, এ যুগের সকল মানুষই নূহ আ.-এর বংশধর। উপর্যুক্ত বক্তব্য তার বিপরীত।
যারা মনে করেন, ইয়াজুজ-মাজুজের অবয়ব বিভিন্ন প্রকৃতির এবং শারীরিক দৈর্ঘ্যে তাদের মধ্যে পরস্পরের ব্যবধান বিস্তর। কতক হল সুদীর্ঘ খেজুর গাছের মতো আর কতক একেবারে খাটো। তাদের কতক এমন, এক কান বিছিয়ে অপর কান দিয়ে নিজেকে ঢেকে নেয়। এ সব উক্তির কোনো প্রমাণ নেই; এগুলো নেহায়েত কাল্পনিক উক্তি। সঠিক মত হল, তারা হযরত আদম আ.-এর বংশধর এবং তাদের আকৃতি-প্রকৃতিও সাধারণ মানুষের মতোই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ.-এর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। তারপর মানুষ ক্রমান্বয়ে খাটো হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।' এ বিষয়ে এটিই চূড়ান্ত কথা। কেউ কেউ যে বলেন, ওদের একজনের ঔরসে ১০০০ সন্তান জন্মগ্রহণ না করা পর্যন্ত তার মৃত্যু হয় না। এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে তবেই আমরা মানব। অন্যথায় আমরা এটি প্রত্যাখ্যানও করব না। কারণ, বিবেক-বুদ্ধি এবং রেওয়ায়েতের আলোকে এমনটি হওয়াও সম্ভব। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। অবশ্য এ ব্যাপারে একটি হাদীসও রয়েছে। তবে তা প্রমাণ সাপেক্ষ।
আল্লামা তাবারানী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর বংশধর। তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হলে মানবজাতির জীবনোপকরণগুলো ধ্বংস করে দিত। এক হাজার কিংবা ততোধিক সন্তানের জন্ম না দেওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো পুরুষের মৃত্যু হয় না। ওদের পশ্চাতে রয়েছে তিনটি দল— তাবীল, তারীগ ও মানসাক। এটি একটি চূড়ান্ত গরীব পর্যায়ের হাদীস। এর সনদ দুর্বল এবং এতে অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী রয়েছে।
ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে এ মর্মে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওদের নিকট গিয়েছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর পথে আসার দাওয়াত দিয়েছিলেন। তারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি এবং তাঁর অনুসরণ করেনি। তিনি ওখানকার ওই উম্মতত্রয়কেও দাওয়াত দিয়েছিলেন। এরা তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছিল। মূলত এটি একটা জাল হাদিস।
যদি কেউ প্রশ্ন করেন, সহি বুখারী ও সহি মুসলিমের হাদীস কী করে প্রমাণ করে কিয়ামতের দিনে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় ঈমানদারদের বদলে জাহান্নামে যাবে, অথচ ইয়াজুজ-মাজুজের নিকট তো কোনো রাসূল প্রেরিত হননি? অপরদিকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না?' তা হলে এ প্রশ্নের উত্তর হবে, তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সাব্যস্ত না করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে না। তারা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্ববর্তী সময়ের লোক হয়ে থাকে এবং তাদের প্রতি অন্যান্য রাসূল এসে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ তো সাব্যস্ত হয়েই গিয়েছে। আর যদি তাদের প্রতি কোনো রাসূল প্রেরিত না হয়ে থাকেন, তবে তাদের বিধান হবে দুই রাসূলের অন্তবর্তী যুগের লোকদের মতো এবং যাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছেনি তাদের মতো। এ বিষয়ে একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ পর্যায়ের লোকদের কিয়ামতের ময়দানে পরীক্ষা করা হবে। তখন যে ব্যক্তি সত্যের ডাকে সাড়া দিবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে ব্যক্তি তা প্রত্যাখ্যান করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
তাদেরকে পরীক্ষা করায় তাদের মুক্তি অনিবার্য সাব্যস্ত হয় না এবং এটি তাদের জাহান্নামী হওয়া বিষয়ক সংবাদের পরিপন্থীও নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা তো রাসূলকে আপন ইচ্ছা মোতাবেক অদৃশ্য বিষয়াদি অবহিত করেন। আল্লাহ তাঁকে অবহিত করেছেন, ওরা পাপাচারী লোক এবং তাদের প্রকৃতিই সত্য গ্রহণে ও সত্যের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তারা সত্যের আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিবে না। এতে প্রমাণিত হয়, দুনিয়াতে তাদের নিকট সত্যের দাওয়াত পৌঁছলে তারা অধিকতর দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'এবং হায়, যদি তুমি দেখতে যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ কর। আমরা সৎকর্ম করব, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।' আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: 'ওরা সেদিন আমার নিকট আসবে সেদিন কত স্পষ্ট শুনবে ও দেখবে।'
ইয়াজুজ-মাজুজ যে হযরত আদম আ.-এর বংশধর, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। প্রমাণ হল সহি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হযরত আবু সাঈদ রাযি.-এর হাদিস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: কিয়ামত দিবসে আল্লাহ তাআলা আদেশ দেবেন, হে আদম! উঠ, তোমার বংশধরদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদেরকে জাহান্নামের দিকে পাঠিয়ে দাও। হযরত আদম আ. বলবেন, হে প্রতিপালক! জাহান্নামীদের সংখ্যা কত? আল্লাহ তাআলা বলবেন, প্রতি হাজারে ৯৯৯ জন জাহান্নামী আর একজন মাত্র জান্নাতী। তখন শিশুগণ বৃদ্ধে পরিণত হবে। গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটবে এবং তুমি তাদেরকে মাতালের মতো দেখতে পাবে, যদিও তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি কঠিন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সে একজন কে হবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের থেকে হবে একজন আর ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে হবে এক হাজার জন।
অপর বর্ণনায় এসেছে, সুসংবাদ গ্রহণ কর, তোমাদের মধ্যে দুটো দল রয়েছে। সে দুদল যেখানে যাবে সেখানে সংখ্যাধিক্য হবে। এটি প্রমাণ করে, ইয়াজুজ-মাজুজের সংখ্যা অত্যধিক এবং তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকগুণ বেশি।
দ্বিতীয় কথা হল, তারা হযরত নূহ আ.-এর বংশধর। কারণ, জগতবাসীর উদ্দেশ্যে হযরত নূহ আ.-এর দুআ: 'হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য হতে কোনো গৃহবাসীকে অব্যাহতি দেবেন না।' আল্লাহ তাআলা এ দোয়া কবুল করেছেন বলে জানিয়েছেন। আবার আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'তাদেরকে আমি এবং নৌকা আরোহনকারীদেরকে রক্ষা করেছি।' তিনি অন্যত্র বলেছেন, 'তার বংশধরদেরকেই আমি বিদ্যমান রেখেছি বংশপরম্পরায়।'
মুসনাদ ও সুনান-এ আছে, হযরত নূহ আ.-এর তিন পুত্র ছিলেন— সাম, হাম ও ইয়াফিছ। এদের মধ্যে সাম হচ্ছেন আরবদের পূর্বপুরুষ, হাম সুদানীদের পূর্বপুরুষ এবং ইয়াফিছ তুর্কীদের পূর্বপুরুষ। সুতরাং ইয়াজুজ-মাজুজ তুর্কীদেরই গোত্র। এরা মোঙ্গল সম্প্রদায়ভুক্ত। দুর্ধর্ষতা ও ধ্বংস সাধনে এরা মোঙ্গলীয়দের অন্যান্য শাখার তুলনায় অগ্রগামী। সাধারণ মানুষের তুলনায় সাধারণ মোঙ্গলীয়দের যে অবস্থা, সাধারণ মোঙ্গলদের তুলনায় ইয়াজুজ-মাজুজের অবস্থা তদ্রুপ। কথিত আছে, তুর্কীদের এরূপ নামকরণের কারণ হল বাদশা যুলকারনাইন যখন তাঁর ঐতিহাসিক প্রাচীর তৈরি করেন, তখন ইয়াজুজ-মাজুজকে ওই প্রাচীরের পিছনে থাকতে বাধ্য করেন। ওদের একটি গোত্র বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রাচীরের এদিকে রয়ে গিয়েছিল। এদের দুর্ধর্ষতা পূর্বোক্তদের সমপর্যায়ের ছিল না। ওদেরকে প্রাচীরের এ পাশে রেখে দেওয়া হয়েছিল। তাই তাদের নাম হয়েছে তুর্ক বা পরিত্যক্ত।
কেউ কেউ বলেন, ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টি হযরত আদম আ.-এর স্বপ্নদোষকালীন বীর্য থেকে। ওই বীর্য মাটির সাথে মিলিত হয় এবং তা থেকে তারা সৃষ্টি হয়েছিল। তারা হযরত হাওয়া আ.-এর গর্ভজাত সন্তান নয়। শায়খ আবু যাকারিয়া নববী সহি মুসলিমের ভাষ্যগ্রন্থ ও অন্যান্য গ্রন্থে এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন এবং এ বক্তব্য যথার্থভাবেই দুর্বল বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। কারণ, এর পক্ষে কোনো দলিল প্রমাণ নেই। বরং কুরআনের আয়াত দ্বারা আমরা প্রমাণ করেছি, এ যুগের সকল মানুষই নূহ আ.-এর বংশধর। উপর্যুক্ত বক্তব্য তার বিপরীত।
যারা মনে করেন, ইয়াজুজ-মাজুজের অবয়ব বিভিন্ন প্রকৃতির এবং শারীরিক দৈর্ঘ্যে তাদের মধ্যে পরস্পরের ব্যবধান বিস্তর। কতক হল সুদীর্ঘ খেজুর গাছের মতো আর কতক একেবারে খাটো। তাদের কতক এমন, এক কান বিছিয়ে অপর কান দিয়ে নিজেকে ঢেকে নেয়। এ সব উক্তির কোনো প্রমাণ নেই; এগুলো নেহায়েত কাল্পনিক উক্তি। সঠিক মত হল, তারা হযরত আদম আ.-এর বংশধর এবং তাদের আকৃতি-প্রকৃতিও সাধারণ মানুষের মতোই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আদম আ.-কে সৃষ্টি করেছেন। হযরত আদম আ.-এর দৈর্ঘ্য ছিল ষাট হাত। তারপর মানুষ ক্রমান্বয়ে খাটো হতে হতে বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।' এ বিষয়ে এটিই চূড়ান্ত কথা। কেউ কেউ যে বলেন, ওদের একজনের ঔরসে ১০০০ সন্তান জন্মগ্রহণ না করা পর্যন্ত তার মৃত্যু হয় না। এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ প্রমাণিত হলে তবেই আমরা মানব। অন্যথায় আমরা এটি প্রত্যাখ্যানও করব না। কারণ, বিবেক-বুদ্ধি এবং রেওয়ায়েতের আলোকে এমনটি হওয়াও সম্ভব। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। অবশ্য এ ব্যাপারে একটি হাদীসও রয়েছে। তবে তা প্রমাণ সাপেক্ষ।
আল্লামা তাবারানী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ইয়াজুজ-মাজুজ হযরত আদম আ.-এর বংশধর। তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হলে মানবজাতির জীবনোপকরণগুলো ধ্বংস করে দিত। এক হাজার কিংবা ততোধিক সন্তানের জন্ম না দেওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো পুরুষের মৃত্যু হয় না। ওদের পশ্চাতে রয়েছে তিনটি দল— তাবীল, তারীগ ও মানসাক। এটি একটি চূড়ান্ত গরীব পর্যায়ের হাদীস। এর সনদ দুর্বল এবং এতে অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী রয়েছে।
ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে এ মর্মে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, মেরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওদের নিকট গিয়েছিলেন এবং তাদেরকে আল্লাহর পথে আসার দাওয়াত দিয়েছিলেন। তারা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি এবং তাঁর অনুসরণ করেনি। তিনি ওখানকার ওই উম্মতত্রয়কেও দাওয়াত দিয়েছিলেন। এরা তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছিল। মূলত এটি একটা জাল হাদিস।
যদি কেউ প্রশ্ন করেন, সহি বুখারী ও সহি মুসলিমের হাদীস কী করে প্রমাণ করে কিয়ামতের দিনে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় ঈমানদারদের বদলে জাহান্নামে যাবে, অথচ ইয়াজুজ-মাজুজের নিকট তো কোনো রাসূল প্রেরিত হননি? অপরদিকে আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'আমি রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না?' তা হলে এ প্রশ্নের উত্তর হবে, তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সাব্যস্ত না করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে না। তারা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্ববর্তী সময়ের লোক হয়ে থাকে এবং তাদের প্রতি অন্যান্য রাসূল এসে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ তো সাব্যস্ত হয়েই গিয়েছে। আর যদি তাদের প্রতি কোনো রাসূল প্রেরিত না হয়ে থাকেন, তবে তাদের বিধান হবে দুই রাসূলের অন্তবর্তী যুগের লোকদের মতো এবং যাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছেনি তাদের মতো। এ বিষয়ে একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত হাদিস রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ পর্যায়ের লোকদের কিয়ামতের ময়দানে পরীক্ষা করা হবে। তখন যে ব্যক্তি সত্যের ডাকে সাড়া দিবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে ব্যক্তি তা প্রত্যাখ্যান করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
তাদেরকে পরীক্ষা করায় তাদের মুক্তি অনিবার্য সাব্যস্ত হয় না এবং এটি তাদের জাহান্নামী হওয়া বিষয়ক সংবাদের পরিপন্থীও নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা তো রাসূলকে আপন ইচ্ছা মোতাবেক অদৃশ্য বিষয়াদি অবহিত করেন। আল্লাহ তাঁকে অবহিত করেছেন, ওরা পাপাচারী লোক এবং তাদের প্রকৃতিই সত্য গ্রহণে ও সত্যের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত তারা সত্যের আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিবে না। এতে প্রমাণিত হয়, দুনিয়াতে তাদের নিকট সত্যের দাওয়াত পৌঁছলে তারা অধিকতর দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 'এবং হায়, যদি তুমি দেখতে যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে নতশির হয়ে বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ কর। আমরা সৎকর্ম করব, আমরা তো দৃঢ় বিশ্বাসী।' আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: 'ওরা সেদিন আমার নিকট আসবে সেদিন কত স্পষ্ট শুনবে ও দেখবে।'
📄 প্রাচীরটির অবস্থান
ইমাম বুখারী রহ. বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, আমি ওই প্রাচীরটি দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেমন দেখেছ? সে বলল, জমকালো চাদরের মতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তাই দেখেছি।
তবে হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি বলেছিল: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে আমার নিকট সেটির বর্ণনা দাও। সে বলল, সেটি ডোরাদার চাদরের মতো, যার একটি ডোরা কালো এবং অপরটি লাল ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তাই দেখছি। কথিত আছে, খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ যুলকারনাইনের প্রাচীর দেখার জন্য একদল প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিলেন। পথে অবস্থিত রাজ্যসমূহের রাজাদের নিকট তিনি চিঠি লিখে দিয়েছিলেন, যেন তাঁরা ওই প্রতিনিধি দলকে নিজ নিজ রাজ্য অতিক্রম করে প্রাচীর পর্যন্ত পৌছুবার ব্যাপারে সাহায্য করেন। যাতে তারা প্রাচীর সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারেন এবং যুলকারনাইন এটি কিভাবে নির্মাণ করেছেন, তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে। ওই প্রতিনিধি দলটি ফিরে এসে উক্ত প্রাচীর সম্পর্কে বর্ণনা দেয়, তাতে একটি বিরাট দরজা রয়েছে। দরজায় রয়েছে বহু তালা। এটি সুউচ্চ, মজবুত ও সুদৃঢ়। প্রাচীরটি নির্মাণের পর যে লোহার ইট ও যন্ত্রপাতি অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো একটি সুদৃঢ় মহলের মধ্যে রক্ষিত আছে। তারা আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজাদের পক্ষ থেকে নিয়োজিত প্রহরীগণ সার্বক্ষণিক ওই প্রাচীরটি প্রহরায় নিয়োজিত রয়েছে। এটির অবস্থান ছিল পৃথিবীর উত্তর-পূর্ব কোণের উত্তর-পূর্ব অংশে। কথিত আছে, তাদের শহর বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ও প্রশস্ত ছিল। কৃষিকাজ ও জলে-স্থলে শিকার করে তারা জীবিকা নির্বাহ করত। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ওদের সংখ্যা কেউ জানে না।
যদি কেউ প্রশ্ন করে, আল্লাহ তাআলার বাণী: 'এরপর তারা সেটি অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদ করতেও পারল না' এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীসটির মাঝে সমন্বয় সাধন করা যাবে কিভাবে? যেমন— উম্মুল মুমিনীন যায়নাব বিনতে জাহাশ রাযি. বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তাঁর মুখমণ্ডল তখন রক্তিম বর্ণ। তিনি বলছিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আরবদের ধ্বংস নিকটবর্তী। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু ছিদ্র হয়ে গেছে। (এরপর তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দ্বারা বৃত্ত বানিয়ে দেখান)। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন পাপাচার বৃদ্ধি পাবে।
উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তর হতে পারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "প্রাচীর খুলে গিয়েছে" বাক্যাংশের দ্বারা ফিতনা ও অকল্যাণের দরজাগুলো খুলে গিয়েছে বুঝিয়েছেন। এটি একটি রূপক বাক্য ও বাগধারা স্বরূপ। অথবা বলা হবে, 'প্রাচীর খুলে গিয়েছে' বাক্যাংশের দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবে প্রাচীর খুলে গিয়েছে বুঝিয়েছেন এবং আয়াতে "তারা এটি অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদ করতেও পারল না" দ্বারা তখনকার সময়ের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। হতে পারে পরবর্তীকালে আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং আল্লাহ কর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে তারা অল্প অল্প করে ক্রমান্বয়ে ওই নির্ধারিত সময়ে প্রাচীর ক্ষয় করে ফেলবে। অবশেষে এক সময়ে নির্ধারিত মেয়াদও পূর্ণ হবে এবং আল্লাহর নির্ধারিত উদ্দেশ্যও সফল হবে। তারপর তারা বেরিয়ে পড়বে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: 'এবং তারা প্রতি উচ্চ ভূমি হতে ছুটে আসবে।'
অবশ্য অন্য এক হাদিসের কারণে আরও সমস্যা সৃষ্টি হয়। হাদীসটি ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন ওই প্রাচীরটি খুঁড়ে চলছে। খুঁড়তে খুঁড়তে তারা যখন এতটুকু পৌঁছে, যাতে সূর্যের আলো দেখতে পাওয়ার উপক্রম হয়, তখন তাদের উট ও বকরির নাকে জন্ম নেয় এমন কীট। তখন নেতা বলে, আজ তোমরা ফিরে যাও; আগামী কাল অনায়াসে খোঁড়া শেষ করে দিব। পরের দিন তারা এসে দেখতে পায়, পূর্বে যতটুকু ছিল, প্রাচীরটি এখন তার চাইতে অধিকতর মজবুত হয়ে রয়েছে। এভাবে যখন তাদের অবরুদ্ধ রাখার মেয়াদ শেষ হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লোকালয়ে প্রেরণের ইচ্ছা করবেন, তখন তারা খুঁড়তে খুঁড়তে সূর্যের আলো দেখার পর্যায়ে চলে এলে তাদের নেতা বলবে, এখন ফিরে যাও, আগামীকাল ইনশাআল্লাহ খোঁড়া শেষ করতে পারবে। পরদিন তারা এসে প্রাচীরটিকে পূর্ববর্তী দিবসের রেখে যাওয়া অবস্থায় দেখতে পাবে। তখন তারা খননকার্য শেষ করে লোকালয়ে বেরিয়ে আসবে। তারা পৃথিবীর সব পানি পান করে ফেলবে। লোকজন নিজ নিজ দুর্গে আশ্রয় নিবে। এরপর ইয়াজুজ-মাজুজ আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। রক্তের চিহ্নসহ তীর ফিরে আসবে। তারা বলবে, আমরা পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে পদানত করেছি এবং আকাশের অধিবাসীদের ওপর বিজয় লাভ করেছি। তারপর আল্লাহ তাআলা তাদের ঘাড়ে কীট সৃষ্টি করে দিবেন। এ কীটের দ্বারা তিনি তাদেরকে ধ্বংস করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: 'যে মহান সত্তার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ! ওদের গোশত ও রক্ত খেয়ে পৃথিবীর জীবজন্তুগুলো মোটা তাজা হয়ে উঠবে এবং শোকর আদায় করবে।'
অন্য এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, ওরা প্রতিদিন জিহবা দিয়ে ওই প্রাচীরটি চাটতে থাকে। চাটতে চাটতে প্রাচীরটি এমন পাতলা হয়ে যায়, অপর দিকে সূর্যের কিরণ দেখা যাওয়ার উপক্রম হয়। এটি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি না হয়ে কাব আহবাবের উক্তি হয়— যেমনটি কেউ কেউ বলেছেন, তবে আমরা ওই অসঙ্গতির হাত থেকে মুক্তি পাই। আর এটি যদি প্রকৃতই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হয়ে থাকে, তবে বলা হবে, তাদের ওই কর্মতৎপরতা চলবে আখেরী যামানায় তাদের বেরিয়ে আসার নিকটবর্তী সময়ে। অথবা বলা যাবে, 'তারা ওটা ভেদ করতেও পারল না' অর্থ— এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত ছিদ্র করে সারতে পারেনি। সুতরাং এটি তাদের জিহবা দিয়ে চাটা। অথচ ছিদ্র না করা এর পরিপন্থী নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ইমাম বুখারী রহ. বলেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলল, আমি ওই প্রাচীরটি দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কেমন দেখেছ? সে বলল, জমকালো চাদরের মতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তাই দেখেছি।
তবে হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি বলেছিল: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর দেখেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা হলে আমার নিকট সেটির বর্ণনা দাও। সে বলল, সেটি ডোরাদার চাদরের মতো, যার একটি ডোরা কালো এবং অপরটি লাল ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমিও তাই দেখছি। কথিত আছে, খলিফা ওয়াসিক বিল্লাহ যুলকারনাইনের প্রাচীর দেখার জন্য একদল প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিলেন। পথে অবস্থিত রাজ্যসমূহের রাজাদের নিকট তিনি চিঠি লিখে দিয়েছিলেন, যেন তাঁরা ওই প্রতিনিধি দলকে নিজ নিজ রাজ্য অতিক্রম করে প্রাচীর পর্যন্ত পৌছুবার ব্যাপারে সাহায্য করেন। যাতে তারা প্রাচীর সম্পর্কে অবগতি লাভ করতে পারেন এবং যুলকারনাইন এটি কিভাবে নির্মাণ করেছেন, তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে। ওই প্রতিনিধি দলটি ফিরে এসে উক্ত প্রাচীর সম্পর্কে বর্ণনা দেয়, তাতে একটি বিরাট দরজা রয়েছে। দরজায় রয়েছে বহু তালা। এটি সুউচ্চ, মজবুত ও সুদৃঢ়। প্রাচীরটি নির্মাণের পর যে লোহার ইট ও যন্ত্রপাতি অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো একটি সুদৃঢ় মহলের মধ্যে রক্ষিত আছে। তারা আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজাদের পক্ষ থেকে নিয়োজিত প্রহরীগণ সার্বক্ষণিক ওই প্রাচীরটি প্রহরায় নিয়োজিত রয়েছে। এটির অবস্থান ছিল পৃথিবীর উত্তর-পূর্ব কোণের উত্তর-পূর্ব অংশে। কথিত আছে, তাদের শহর বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ও প্রশস্ত ছিল। কৃষিকাজ ও জলে-স্থলে শিকার করে তারা জীবিকা নির্বাহ করত। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ওদের সংখ্যা কেউ জানে না।
যদি কেউ প্রশ্ন করে, আল্লাহ তাআলার বাণী: 'এরপর তারা সেটি অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদ করতেও পারল না' এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীসটির মাঝে সমন্বয় সাধন করা যাবে কিভাবে? যেমন— উম্মুল মুমিনীন যায়নাব বিনতে জাহাশ রাযি. বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তাঁর মুখমণ্ডল তখন রক্তিম বর্ণ। তিনি বলছিলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ! আরবদের ধ্বংস নিকটবর্তী। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর এতটুকু ছিদ্র হয়ে গেছে। (এরপর তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দ্বারা বৃত্ত বানিয়ে দেখান)। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন পাপাচার বৃদ্ধি পাবে।
উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তর হতে পারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম "প্রাচীর খুলে গিয়েছে" বাক্যাংশের দ্বারা ফিতনা ও অকল্যাণের দরজাগুলো খুলে গিয়েছে বুঝিয়েছেন। এটি একটি রূপক বাক্য ও বাগধারা স্বরূপ। অথবা বলা হবে, 'প্রাচীর খুলে গিয়েছে' বাক্যাংশের দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাস্তবে প্রাচীর খুলে গিয়েছে বুঝিয়েছেন এবং আয়াতে "তারা এটি অতিক্রম করতে পারল না এবং ভেদ করতেও পারল না" দ্বারা তখনকার সময়ের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। হতে পারে পরবর্তীকালে আল্লাহর অনুমতিক্রমে এবং আল্লাহ কর্তৃক ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে তারা অল্প অল্প করে ক্রমান্বয়ে ওই নির্ধারিত সময়ে প্রাচীর ক্ষয় করে ফেলবে। অবশেষে এক সময়ে নির্ধারিত মেয়াদও পূর্ণ হবে এবং আল্লাহর নির্ধারিত উদ্দেশ্যও সফল হবে। তারপর তারা বেরিয়ে পড়বে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: 'এবং তারা প্রতি উচ্চ ভূমি হতে ছুটে আসবে।'
অবশ্য অন্য এক হাদিসের কারণে আরও সমস্যা সৃষ্টি হয়। হাদীসটি ইমাম আহমদ রহ. তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে উদ্ধৃত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন ওই প্রাচীরটি খুঁড়ে চলছে। খুঁড়তে খুঁড়তে তারা যখন এতটুকু পৌঁছে, যাতে সূর্যের আলো দেখতে পাওয়ার উপক্রম হয়, তখন তাদের উট ও বকরির নাকে জন্ম নেয় এমন কীট। তখন নেতা বলে, আজ তোমরা ফিরে যাও; আগামী কাল অনায়াসে খোঁড়া শেষ করে দিব। পরের দিন তারা এসে দেখতে পায়, পূর্বে যতটুকু ছিল, প্রাচীরটি এখন তার চাইতে অধিকতর মজবুত হয়ে রয়েছে। এভাবে যখন তাদের অবরুদ্ধ রাখার মেয়াদ শেষ হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাদেরকে লোকালয়ে প্রেরণের ইচ্ছা করবেন, তখন তারা খুঁড়তে খুঁড়তে সূর্যের আলো দেখার পর্যায়ে চলে এলে তাদের নেতা বলবে, এখন ফিরে যাও, আগামীকাল ইনশাআল্লাহ খোঁড়া শেষ করতে পারবে। পরদিন তারা এসে প্রাচীরটিকে পূর্ববর্তী দিবসের রেখে যাওয়া অবস্থায় দেখতে পাবে। তখন তারা খননকার্য শেষ করে লোকালয়ে বেরিয়ে আসবে। তারা পৃথিবীর সব পানি পান করে ফেলবে। লোকজন নিজ নিজ দুর্গে আশ্রয় নিবে। এরপর ইয়াজুজ-মাজুজ আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। রক্তের চিহ্নসহ তীর ফিরে আসবে। তারা বলবে, আমরা পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে পদানত করেছি এবং আকাশের অধিবাসীদের ওপর বিজয় লাভ করেছি। তারপর আল্লাহ তাআলা তাদের ঘাড়ে কীট সৃষ্টি করে দিবেন। এ কীটের দ্বারা তিনি তাদেরকে ধ্বংস করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: 'যে মহান সত্তার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ তাঁর শপথ! ওদের গোশত ও রক্ত খেয়ে পৃথিবীর জীবজন্তুগুলো মোটা তাজা হয়ে উঠবে এবং শোকর আদায় করবে।'
অন্য এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, ওরা প্রতিদিন জিহবা দিয়ে ওই প্রাচীরটি চাটতে থাকে। চাটতে চাটতে প্রাচীরটি এমন পাতলা হয়ে যায়, অপর দিকে সূর্যের কিরণ দেখা যাওয়ার উপক্রম হয়। এটি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি না হয়ে কাব আহবাবের উক্তি হয়— যেমনটি কেউ কেউ বলেছেন, তবে আমরা ওই অসঙ্গতির হাত থেকে মুক্তি পাই। আর এটি যদি প্রকৃতই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী হয়ে থাকে, তবে বলা হবে, তাদের ওই কর্মতৎপরতা চলবে আখেরী যামানায় তাদের বেরিয়ে আসার নিকটবর্তী সময়ে। অথবা বলা যাবে, 'তারা ওটা ভেদ করতেও পারল না' অর্থ— এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত ছিদ্র করে সারতে পারেনি। সুতরাং এটি তাদের জিহবা দিয়ে চাটা। অথচ ছিদ্র না করা এর পরিপন্থী নয়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।