📄 আবেহায়াতের সন্ধানে
ইবনে আসাকির ওকী রহ. এর সূত্রে যাইনুল আবিদীন থেকে এক দীর্ঘ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনার সারমর্ম হল, যুলকারনাইনের সাথে একজন ফেরেশতা থাকতেন। তাঁর নাম ছিল রানাকীল। একদিন যুলকারনাইন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: পৃথিবীতে এমন কোনো ঝর্ণা আছে, যার নাম আইনুল হায়াত বা সঞ্জীবনী ঝর্ণা? ফেরেশতা ঝর্ণাটির অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন। যুলকারনাইন তার সন্ধানে যাত্রা শুরু করলেন। হযরত খিযির আ.-কে তিনি অগ্রবর্তী দলে রাখলেন। যেতে যেতে এক অন্ধকার উপত্যকায় গিয়ে ওই ঝর্ণাটির সন্ধান পেলেন। খিযির আ. ঝর্ণার কাছে গিয়ে সেখান থেকে পানি পান করলেন। কিন্তু যুলকারনাইন ঝর্ণার কাছে যেতে পারলেন না। তিনি সেখানে অবস্থিত একটি প্রাসাদে এক ফেরেশতার সাথে মিলিত হলেন। ফেরেশতা যুলকারনাইনকে একটি পাথর দান করলেন। পরে তিনি সেনাবাহিনীর নিকট ফিরে এলে আলেমগণ পাথরটি সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি পাথরটিকে ওজন করার জন্য এক পাল্লায় রাখলেন এবং অপর পাল্লায় অনুরূপ এক হাজার পাথর রাখলেন। কিন্তু ওই পাথরটির পাল্লা ভারি হল। তখন হযরত খিযির আ.-ও পাথরটির রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি তার বিপরীত পাল্লায় একটি পাথর উঠিয়ে তার উপর এক মুষ্টি মাটি ছেড়ে দিলেন। এবার পাল্লাটি ভারি হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, এটা ঠিক বনি আদমের উপমা। যারা কবরের মাটি ছাড়া কোনো কিছুতেই তৃপ্ত হয় না।
অনন্তর তিনি পশ্চিম থেকে প্রত্যাবর্তন করে পূর্ব দিকে যাওয়ার পথ ধরলেন। কথিত আছে, পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব প্রান্তে ফিরে আসতে তাঁর বারো বছর অতিবাহিত হয়। চলতে চলতে যখন সূর্যোদয়স্থলে পৌঁছেন, তখন এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে, যাদের কোনো ঘর-বাড়ি ছিল না এবং সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। অবশ্য অনেক আলেম বলেছেন, তারা মাটিতে কবরের মতো এক প্রকার সুড়ঙ্গে গিয়ে প্রচণ্ড তাপের সময় আশ্রয় নিত। প্রকৃত ঘটনা এটাই। তাঁর বৃত্তান্ত আল্লাহ সম্যক অবগত। উবায়দ ইবনে উমায়ের ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ প্রমুখ আলেমগণ বলেছেন, যুলকারনাইন পদব্রজে হজ পালন করেন। হযরত ইবরাহীম আ. যুলকারনাইনের আগমনের সংবাদ পেয়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ে একত্রে মিলিত হলে ইবরাহীম আ. তাঁর জন্যে দুআ করেন এবং কতিপয় উপদেশ দেন। কথিত আছে, হযরত ইবরাহীম আ. একটি ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যান এবং যুলকারনাইনকে তাতে আরোহণ করতে বলেন। কিন্তু যুলকারনাইন অস্বীকার করে বলেন, যে শহরে আল্লাহর খলীল বিদ্যমান আছেন সেই শহরে আমি বাহনে আরোহণ করে প্রবেশ করব না। তখন আল্লাহ মেঘমালাকে তাঁর অনুগত করে দেন।
আবার তিনি পথ চলতে চলতে দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তীস্থলে পৌঁছুলে সেখানে এমন এক সম্প্রদায়কে পেলেন, যারা তার কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। এ সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয়, এরা হল তুর্কী জাতি; ইয়াজুজ ও মাজুজের জ্ঞাতি ভাই। এ সম্প্রদায়ের লোকজন যুলকারনাইনের নিকট অভিযোগ করে, ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রদ্বয় তাদের ওপর অত্যাচার চালায়, লুটতরাজ ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের দ্বারা শহরকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তারা যুলকারনাইনকে কর দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। যেন তিনি তাদের ও ইয়াজুজ-মাজুজের মাঝে একটি প্রাচীর তৈরি করে দেন। যাতে করে তারা আর এদিকে উঠে আসতে না পারে। যুলকারনাইন তাদের থেকে কর নিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁকে আল্লাহ যে সম্পদ ও ক্ষমতা দিয়েছেন তাতেই সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে তিনি তাদেরকে শ্রমিক ও উপকরণ সরবরাহ করতে বলেন এবং উক্ত দুই পর্বতের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এ দু পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান ছাড়া ইয়াজুজ-মাজুজের আসার অন্য কোনো পথ ছিল না। তাদের একদিকে ছিল গভীর সমুদ্র, অন্যদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা। এরপর তিনি লোহা ও গলিত তামা, মতান্তরে সীসা দ্বারা উক্ত বাঁধ নির্মাণ করেন। কিন্তু প্রথমোক্ত মতোই সঠিক। সে মতে এ বাঁধ নির্মাণে তিনি ইটের পরিবর্তে লোহা এবং সুরকির পরিবর্তে তামা ব্যবহার করেন। এরপর তারা সিঁড়ি কিংবা অন্য কিছুর সাহায্যে বাঁধ পার হয়ে আসতে পারল না এবং কুঠার বা শাবল দ্বারা ছিদ্রও করতে পারল না। সহজের মুকাবিলায় সহজ ও কঠিনের মুকাবিলায় কঠিন নীতি অবলম্বন করা হল। তিনি বললেন, এ বাঁধ নির্মাণের ক্ষমতা আল্লাহই দান করেছেন। এটা তাঁরই অনুগ্রহ ও দয়া। কেন না এর দ্বারা উক্ত সীমালঙ্ঘনকারী জাতির অত্যাচার থেকে তাদের প্রতিবেশী লোকদেরকে রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু শেষ যামানায় মানব জাতির ওপর তাদের বের হয়ে আসার নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন তিনি এটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবেন; মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। কেন না তাদের বের হয়ে আসার জন্যে এ রকম হওয়া আবশ্যক। আর আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।
📄 ওফাত লাভ
আবু দাউদ রহ. হযরত সুফিয়ান ছাওরী রহ. এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সর্বপ্রথম যিনি মুসাফাহা প্রবর্তন করেন তিনি হলেন, যুলকারনাইন। কাব আহবাব হযরত মুআবিয়া রাযি. কে বলেছেন: যুলকারনাইনের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি তাঁর মাকে অসিয়ত করেন, আমার মৃত্যু হয়ে গেলে আপনি ভোজের ব্যবস্থা করবেন এবং নগরীতে সমস্ত মহিলাদেরকে ডাকবেন। তারা আসলে তাদের সম্মুখে খানা রেখে সন্তানহারা মহিলাদের ব্যতীত অন্যদেরকে আহার করতে বলবেন। যে সব মহিলা সন্তান হারিয়েছে, তারা যেন উক্ত খাদ্য ভক্ষণ না করে। অসিয়ত অনুযায়ী মা সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করে উক্তরূপে আহার গ্রহণের আহবান জানালেন। কিন্তু একজন মহিলাও খাবার স্পর্শ করল না। যুলকারনাইনের মা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার তোমরা সকলেই কি সন্তানহারা? তারা বলল, আল্লাহর কসম! আমরা প্রত্যেকেই সন্তান হারিয়েছি। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তখন তিনি মনে সান্ত্বনা লাভ করলেন।
ইসহাক ইবনে বিশর আবদুল্লাহ ইবনে যিনাদের মাধ্যমে জনৈক আহলে কিতাব থেকে বর্ণনা করেন, যুলকারনাইনের অসিয়ত ও তাঁর মায়ের উপদেশ একটি সুদীর্ঘ মূল্যবান উপদেশ। তাতে বহু জ্ঞানপূর্ণ ও কল্যাণকর কথা আছে। যুলকারনাইন যখন ইনতেকাল করেন, তখন তার বয়স হয়েছিল তিন হাজার বছর। এ বর্ণনাটি 'গরীব' পর্যায়ের। ইবনে আসাকির রহ. অন্য এক সূত্রে বলেছেন, যুলকারনাইন ছত্রিশ বছর জীবিত ছিলেন। কারো মতে তিনি বত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন। হযরত দাউদ আ.-এর সাতশ চল্লিশ বছর পর এবং আদম আ.-এর পাঁচ হাজার একশ একাশি বছর পর তিনি দুনিয়ায় আগমন করেন এবং ষোল বছর রাজত্ব করেন। ইবনে আসাকিরের এ বক্তব্য দ্বিতীয় ইসকান্দারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, প্রথম ইসকান্দারের ক্ষেত্রে নয়। তিনি দুই ইসকান্দারের মধ্যে প্রথম জন ও দ্বিতীয় জনের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। প্রকৃতপক্ষে ইসকান্দার দুজন। হাফেজ আবুল কাসিম সুহায়লী এর জোর প্রতিবাদ এবং কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাথে সাথে উভয় ইসকান্দারের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে পার্থক্য নির্ণয় করে দেখিয়েছেন। সুহায়লী বলেছেন, সম্ভবত প্রাচীন যুগের কতিপয় রাজা-বাদশা প্রথম ইসকান্দারের সাথে তুলনা করে দ্বিতীয় ইসকান্দরকেও যুলকারনাইন নামে আখ্যায়িত করেছেন।
📄 যুলকারনাইনের ঘটনা সংক্রান্ত মানচিত্র
সোগদ বাখতর (বলখ)। আরিয়া পার্থিয়া (খোরাসান) পারস্য। পারস্য উপসাগর। আরাকোসিয়া (কান্দাহার ও সীস্তান)। গদরুশিয়া (মাকরান ও কিরমান)। খোরস ও তার উত্তরাধিকারীদের সাম্রাজ্য খৃষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষভাগ। এ চিহ্নটি এ সাম্রাজ্যের সীমারেখা নির্দেশ করে। কাসপিয়ান সাগর। সীথিয়া আর্মেনিয়া মিডিয়া (আল জিবাল)। আশুর (আসিরিয়া) বেবিলন কান্দান। সীথিয়া লীডিয়া কাবাজক ফিলিস্তিন সিরিয়া লিবিয়া উত্তর মিশর হিত সাগর। জুলকারনাইন কিস্সা সংক্রান্ত মানচিত্র (সূরা আল-কাহফ ৬২নং টীকা)