📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 কোরআন মাজিদে হযরত যুলকারনাইন আ.

📄 কোরআন মাজিদে হযরত যুলকারনাইন আ.


আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَيَسْأَلُونَكَ عَنْ ذِي الْقَرْنَيْنِ قُلْ سَأَتْلُو عَلَيْكُمْ مِنْهُ ذِكْرًا (৮৩) إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا (৮৪) فَأَتْبَعَ سَبَبًا (৮৫) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَغْرِبَ الشَّمْسِ وَجَدَهَا تَغْرُبُ فِي عَيْنٍ حَمِئَةٍ وَوَجَدَ عِنْدَهَا قَوْمًا قُلْنَا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِمَّا أَنْ تُعَذِّبَ وَإِمَّا أَنْ تَتَّخِذَ فِيهِمْ حُسْنًا (৮৬) قَالَ أَمَّا مَنْ ظَلَمَ فَسَوْفَ نُعَذِّبُهُ ثُمَّ يُرَدُّ إِلَى رَبِّهِ فَيُعَذِّبُهُ عَذَابًا نُكْرًا (৮৭) وَأَمَّا مَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَلَهُ جَزَاءُ الْحُسْنَى وَسَنَقُولُ لَهُ مِنْ أَمْرِنَا يُسْرًا (৮৮) ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا (৮৯) حَتَّى إِذَا بَلَغَ مَطْلِعَ الشَّমْسِ وَجَدَهَا تَطْلُعُ عَلَى قَوْمٍ لَمْ نَجْعَلْ لَهُمْ مِنْ دُونِهَا سِتْرًا (৯০) كَذَلِكَ وَقَدْ أَحَطْنَا بِمَا لَدَيْهِ خُبْرًا (৯১) ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا (৯২) حَتَّى إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِنْ دُونِهِمَا قَوْمًا لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا (৯৩) قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَى أَنْ تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا (৯৪) قَالَ مَا مَكَّنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا (৯৫) آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ حَتَّى إِذَا سَاوَى بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انْفُخُوا حَتَّى إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا (৯৬) فَمَا اسْتَطَاعُوا أَنْ يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا (৯৭) قَالَ هَذَا رَحْمَةٌ مِنْ رَبِِّي فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ وَكَانَ وَعْدُ رَبِِّي حَقًّا (৯৮)

"ওরা তোমাকে যুল-কারনাইন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। বল, আমি তোমাদের নিকট তার বিষয় বর্ণনা করব। আমি তাকে পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের উপায়-উপকরণ দান করেছিলাম। এরপর সে এক পথ অবলম্বন করল। চলতে চলতে সে যখন সূর্যের অস্তাচলে গিয়ে পৌঁছুল। তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্তগমন করতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল। আমি বললাম, 'হে যুলকারনাইন! তুমি এদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা এদের ব্যাপারে সদয়ভাব গ্রহণ করতে পার।' সে বলল: 'যে কেউ সীমালঙ্ঘন করবে, আমি তাকে শাস্তি দিব। এরপর সে তার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে এবং তিনি তাকে কঠিন শাস্তি দিবেন। তবে যে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তার জন্যে প্রতিদান স্বরূপ আছে কল্যাণ এবং তার প্রতি ব্যবহারে আমি নম্র কথা বলব।

আবার সে এক পথ ধরল। চলতে চলতে সে সূর্যের উদয়াচলে গিয়ে পৌঁছুল। তখন সে দেখল, তা এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদয় হচ্ছে, যাদের জন্যে সূর্যতাপ হতে কোনো অন্তরাল আমি সৃষ্টি করি নি। প্রকৃত ঘটনা এটাই, তার বৃত্তান্ত আমি সম্যক অবগত আছি। আবার সে এক পথ ধরল। চলতে চলতে সে যখন দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থলে গিয়ে পৌঁছুল, তখন সেখানে সে এক সম্প্রদায়কে পেল, যারা তার কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। তারা বলল, 'হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে; আমরা কি তোমাকে কর দিব এই শর্তে, তুমি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর গড়ে দিবে?' সে বলল, 'আমার প্রতিপালক আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন, তাই উৎকৃষ্ট। সুতরাং তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যস্থলে এক মজবুত প্রাচীর গড়ে দিব। তোমরা আমার নিকট লৌহ পিণ্ডসমূহ আন!' এরপর মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে যখন লৌহস্তূপ দুই পর্বতের সমান হল, তখন সে বলল তোমরা গলিত তামা আন! আমি তা ঢেলে দিই এর ওপর। এরপর তারা তা অতিক্রম করতে পারল না কিংবা ভেদ করতেও পারল না। সে বলল, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হবে, তখন এটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবেন আর আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য।" (কাহফ : ৮৩-৯৮)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তিনি নবী ছিলেন কি না?

📄 তিনি নবী ছিলেন কি না?


আল্লাহ পাক যুলকারনাইনের আলোচনায় তাকে ন্যায়-পরায়ণ বলে প্রশংসা করেছেন। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তিনি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সমস্ত ভূ-খণ্ডের উপর তিনি বিজয় লাভ করেছিলেন। সকল দেশের অধিবাসীরা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করেছিল। তাদের মধ্যে তিনি পূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বস্তুত তিনি ছিলেন আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত এক সফল ও বিজয়ী বীর; ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী বাদশা। তাঁর সম্পর্কে এটাই বিশুদ্ধ কথা। অবশ্য কারো কারো মতে তিনি নবী, কারো কারো মতে রাসূল। তাঁর সম্পর্কে একটি বিরল মত হচ্ছে, তিনি ছিলেন ফেরেশতা। এ শেষোক্ত মতটি আমীরুল মুমিনীন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. থেকে শ্রুত হয়ে বর্ণিত হয়েছে। তিনি একদিন শুনতে পেলেন, এক ব্যক্তি অপর একজনকে বলছে— হে যুলকারনাইন! তখন তিনি বললেন, থাম! যে কোনো একজন নবীর নামে নাম রাখাই যথেষ্ট; ফেরেশতার নামে কারও নাম রাখার কী প্রয়োজন? সুহায়লী এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।

মুজাহিদের সূত্রে আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, যুলকারনাইন নবী ছিলেন। হাফিজ ইবনে আসাকির আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি জানি না, তুব্বা বাদশা অভিশপ্ত ছিল কি-না? আমি এও জানি না, শরয়ি শাস্তি দ্বারা দণ্ডপ্রাপ্তের গুনাহ মাফ হবে কি-না? আমি জানি না, যুলকারনাইন নবী ছিলেন কি-না! এ হাদিস উপর্যুক্ত সনদে গরীব।

ইসহাক ইবনে বিশর ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, যুলকারনাইন ছিলেন একজন ধার্মিক বাদশা। আল্লাহ তাঁর কাজ-কর্মে সন্তুষ্ট ছিলেন। নিজ কিতাবে তিনি তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত। হযরত খিযির আ. ছিলেন তাঁর উযির। তিনি আরও বলেছেন, খিযির আ. থাকতেন তাঁর সেনাবাহিনীর অগ্রভাগে। বর্তমানকালে বাদশার নিকট উযিরের যে স্থান, যুলকারনাইনের নিকট হযরত খিযিরের ছিল ঠিক সেরূপ উপদেষ্টার মর্যাদা। কোনো কোনো ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, যুলকারনাইন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আ.-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে তিনি ও ইসমাঈল আ. একত্রে কাবা তাওয়াফ করেন। কেউ কেউ বলেছেন, যুলকারনাইন পদব্রজে হজ পালন করেছেন। ইবরাহীম আ. তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন, তাঁকে দুআ করেন ও তাঁর উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আল্লাহ মেঘপুঞ্জকে যুলকারনাইনের অনুগত করে দিয়েছিলেন। যেখানে তিনি যেতে চাইতেন, মেঘমালা তাকে সেখানে বহন করে নিয়ে যেত।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাঁর আসল নাম কী?

📄 তাঁর আসল নাম কী?


যুলকারনাইনের আসল নাম কি ছিল, এ ব্যাপারে একাধিক মত পাওয়া যায়। যুবায়র হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর নাম আবদুল্লাহ ইবনে যাহহাক ইবনে মাআদ। কারো কারো বর্ণনা মতে মুসআব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে কিনান ইবনে মানসূর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আযদ ইবনে আওন ইবনে নাবাত ইবনে মালিক ইবনে যায়দ ইবনে কাহলান ইবনে সাবা ইবনে কাহতান। এক হাদীসে আছে, যুলকারনাইন হিমইয়ার গোত্রভুক্ত ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন রোম দেশীয়। প্রখর জ্ঞানের অধিকারী হওয়ায় যুলকারনাইনকে ইবনুল ফায়সালুফ বা মহাবিজ্ঞানী বলা হত। হিমইয়ার গোত্রের জনৈক কবি তাদের পূর্ব-পুরুষ যুলকারনাইনের প্রশংসায় গৌরবগাঁথা লিখেন।

সুহায়লী লিখেছেন, কেউ কেউ তাঁর নাম বলেছেন মারযুবান ইবনে মারযুবা। ইবনে হিশাম অন্য স্থানে লিখেছেন যুলকারনাইনের নাম আসসাব ইবনে যী-মারাইদ। তুব্বা বংশের ওনিই প্রথম বাদশা। বীরুস-সাবার ঘটনায় তিনি ইবরাহীমের পক্ষে ফয়সালা দিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন, যুলকারনাইনের নাম আফরীদূন ইবনে আসফিয়ান, যিনি যাহহাককে হত্যা করেছিলেন। আরবের বাগ্মী পুরুষ কুস তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন: হে আয়াদ ইবনে সাব যুলকারনাইনের বংশধর। তোমাদের পূর্বপুরুষ যুলকারনাইন যিনি পূর্ব ও পশ্চিমের বাদশা, জিন ও ইনসানের উপর ক্ষমতা প্রয়োগকারী এবং দু হাজার বছর যার বয়স। এ সত্ত্বেও তা যেন ছিল এক মুহূর্তের মতো।

ইমাম দারাকুনী ও ইবনে মাকুলা বলেছেন, যুলকারনাইনের নাম হুরমুস। তাঁকে বলা হত হারবীস ইবনে কায়তুন ইবনে রামী ইবনে লান্তী ইবনে কাশলূখীন ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফিছ ইবনে নূহ আ.। ইসহাক ইবনে বিশর হযরত কাতাদা রহ. থেকে বর্ণনা করেন, বাদশা ইস্কান্দার (আলেকজাণ্ডার)-ই হলেন যুলকারনাইন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রথম কায়সার (রোম সম্রাট)। তিনি সাম ইবনে নূহ আ.-এর বংশধর। আর দ্বিতীয় যুলকারনাইন হচ্ছেন ইস্কান্দার ইবনে ফিলিপস ইবনে মুসরীম ইবনে হুরমুস ইবনে মায়তুন ইবনে রুমী ইবনে লানতী ইবনে ইউনান ইবনে ইয়াফিছ ইবনে য়ূনাহ ইবনে শারখুন ইবনে রূমাহ ইবনে শারফত ইবনে তাওফীল ইবনে রূমী ইবনে আসফার ইবনে ইয়াকিয ইবনে ঈস ইবনে ইসহাক ইবনে ইবরাহীম খলীল আ.। হাফেজ ইবনে আসাকির তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে এই নসবখানা উল্লেখ করেছেন।

যুলকারনাইন মাকদূন ইউনানী মিসর আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর প্রতিষ্ঠাতা। যিনি তার শাসনামলে রোমের ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথম যুলকারনাইন থেকে এ দ্বিতীয় যুলকারনাইন দীর্ঘকাল পরে হযরত ঈসা আ.-এর তিনশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। দার্শনিক এরিস্টটল ছিলেন তাঁর উযির। তিনি দারার পুত্র দারাকে হত্যা করেন এবং পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করেন। আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করলাম এজন্যে, অনেকেই উভয় ইসকান্দারকে অভিন্ন ব্যক্তি মনে করেন। ফলে তাঁরা বিশ্বাস করেন কুরআনে যে যুলকারনাইনের কথা বলা হয়েছে, তাঁরই উযির ছিলেন এরিষ্টটল। এ বিশ্বাসের ফলে বিরাট ভুল ও জটিলতার সৃষ্টি হয়। কেন না প্রথম যুলকারনাইন ছিলেন মুমিন, সৎ, আল্লাহভক্ত ও ন্যায়পরায়ন বাদশা; হযরত খিযির আ. তাঁর উযির। অনেকের মতে তিনি ছিলেন নবী। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় যুলকারনাইন ছিল মুশরিক। তার উযির ছিল একজন দার্শনিক। তা ছাড়া এ দুজনের মধ্যে দুহাজার বছরের চেয়েও অধিক সময়ের ব্যবধান রয়েছে। সুতরাং কোথায় এর অবস্থান আর কোথায় তাঁর অবস্থান! উভয়ের মধ্যে আদৌ কোনোই সামঞ্জস্য নেই। অজ্ঞ ও নির্বোধ লোকরাই দুজনকে এক বলে ভাবতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন: "ওরা তোমাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে!" এর কারণ হচ্ছে, কতিপয় কুরায়েশের কাফের ইহুদিদের কাছে গিয়ে বলে তোমরা আমাদেরকে এমন কিছু বলে দাও, যে বিষয়ে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্ঞান পরীক্ষা করতে পারি। ইহুদিরা এদেরকে শিখিয়ে দিল, তোমরা তাঁকে এমন এক ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস কর, যে সমগ্র ভূখণ্ড বিচরণ করেছে। আর কতিপয় যুবকের পরিচয় জিজ্ঞেস কর, যারা তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, যাদের পরিণতি সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। কুরায়েশরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ প্রশ্ন করলে আল্লাহ তাআলা আসহাবে কাহাফ ও যুলকারনাইনের ঘটনা সম্বলিত আয়াতসমূহ নাযিল করেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 আবেহায়াতের সন্ধানে

📄 আবেহায়াতের সন্ধানে


ইবনে আসাকির ওকী রহ. এর সূত্রে যাইনুল আবিদীন থেকে এক দীর্ঘ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ঘটনার সারমর্ম হল, যুলকারনাইনের সাথে একজন ফেরেশতা থাকতেন। তাঁর নাম ছিল রানাকীল। একদিন যুলকারনাইন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: পৃথিবীতে এমন কোনো ঝর্ণা আছে, যার নাম আইনুল হায়াত বা সঞ্জীবনী ঝর্ণা? ফেরেশতা ঝর্ণাটির অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন। যুলকারনাইন তার সন্ধানে যাত্রা শুরু করলেন। হযরত খিযির আ.-কে তিনি অগ্রবর্তী দলে রাখলেন। যেতে যেতে এক অন্ধকার উপত্যকায় গিয়ে ওই ঝর্ণাটির সন্ধান পেলেন। খিযির আ. ঝর্ণার কাছে গিয়ে সেখান থেকে পানি পান করলেন। কিন্তু যুলকারনাইন ঝর্ণার কাছে যেতে পারলেন না। তিনি সেখানে অবস্থিত একটি প্রাসাদে এক ফেরেশতার সাথে মিলিত হলেন। ফেরেশতা যুলকারনাইনকে একটি পাথর দান করলেন। পরে তিনি সেনাবাহিনীর নিকট ফিরে এলে আলেমগণ পাথরটি সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি পাথরটিকে ওজন করার জন্য এক পাল্লায় রাখলেন এবং অপর পাল্লায় অনুরূপ এক হাজার পাথর রাখলেন। কিন্তু ওই পাথরটির পাল্লা ভারি হল। তখন হযরত খিযির আ.-ও পাথরটির রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তখন তিনি তার বিপরীত পাল্লায় একটি পাথর উঠিয়ে তার উপর এক মুষ্টি মাটি ছেড়ে দিলেন। এবার পাল্লাটি ভারি হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, এটা ঠিক বনি আদমের উপমা। যারা কবরের মাটি ছাড়া কোনো কিছুতেই তৃপ্ত হয় না।

অনন্তর তিনি পশ্চিম থেকে প্রত্যাবর্তন করে পূর্ব দিকে যাওয়ার পথ ধরলেন। কথিত আছে, পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব প্রান্তে ফিরে আসতে তাঁর বারো বছর অতিবাহিত হয়। চলতে চলতে যখন সূর্যোদয়স্থলে পৌঁছেন, তখন এমন এক সম্প্রদায়ের উপর উদিত হচ্ছে, যাদের কোনো ঘর-বাড়ি ছিল না এবং সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার কোনো উপায় ছিল না। অবশ্য অনেক আলেম বলেছেন, তারা মাটিতে কবরের মতো এক প্রকার সুড়ঙ্গে গিয়ে প্রচণ্ড তাপের সময় আশ্রয় নিত। প্রকৃত ঘটনা এটাই। তাঁর বৃত্তান্ত আল্লাহ সম্যক অবগত। উবায়দ ইবনে উমায়ের ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ প্রমুখ আলেমগণ বলেছেন, যুলকারনাইন পদব্রজে হজ পালন করেন। হযরত ইবরাহীম আ. যুলকারনাইনের আগমনের সংবাদ পেয়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। উভয়ে একত্রে মিলিত হলে ইবরাহীম আ. তাঁর জন্যে দুআ করেন এবং কতিপয় উপদেশ দেন। কথিত আছে, হযরত ইবরাহীম আ. একটি ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যান এবং যুলকারনাইনকে তাতে আরোহণ করতে বলেন। কিন্তু যুলকারনাইন অস্বীকার করে বলেন, যে শহরে আল্লাহর খলীল বিদ্যমান আছেন সেই শহরে আমি বাহনে আরোহণ করে প্রবেশ করব না। তখন আল্লাহ মেঘমালাকে তাঁর অনুগত করে দেন।

আবার তিনি পথ চলতে চলতে দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যবর্তীস্থলে পৌঁছুলে সেখানে এমন এক সম্প্রদায়কে পেলেন, যারা তার কথা একেবারেই বুঝতে পারছিল না। এ সম্প্রদায় সম্পর্কে বলা হয়, এরা হল তুর্কী জাতি; ইয়াজুজ ও মাজুজের জ্ঞাতি ভাই। এ সম্প্রদায়ের লোকজন যুলকারনাইনের নিকট অভিযোগ করে, ইয়াজুজ ও মাজুজ গোত্রদ্বয় তাদের ওপর অত্যাচার চালায়, লুটতরাজ ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের দ্বারা শহরকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তারা যুলকারনাইনকে কর দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। যেন তিনি তাদের ও ইয়াজুজ-মাজুজের মাঝে একটি প্রাচীর তৈরি করে দেন। যাতে করে তারা আর এদিকে উঠে আসতে না পারে। যুলকারনাইন তাদের থেকে কর নিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁকে আল্লাহ যে সম্পদ ও ক্ষমতা দিয়েছেন তাতেই সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে তিনি তাদেরকে শ্রমিক ও উপকরণ সরবরাহ করতে বলেন এবং উক্ত দুই পর্বতের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান ভরাট করে বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এ দু পর্বতের মধ্যবর্তী স্থান ছাড়া ইয়াজুজ-মাজুজের আসার অন্য কোনো পথ ছিল না। তাদের একদিকে ছিল গভীর সমুদ্র, অন্যদিকে সুউচ্চ পর্বতমালা। এরপর তিনি লোহা ও গলিত তামা, মতান্তরে সীসা দ্বারা উক্ত বাঁধ নির্মাণ করেন। কিন্তু প্রথমোক্ত মতোই সঠিক। সে মতে এ বাঁধ নির্মাণে তিনি ইটের পরিবর্তে লোহা এবং সুরকির পরিবর্তে তামা ব্যবহার করেন। এরপর তারা সিঁড়ি কিংবা অন্য কিছুর সাহায্যে বাঁধ পার হয়ে আসতে পারল না এবং কুঠার বা শাবল দ্বারা ছিদ্রও করতে পারল না। সহজের মুকাবিলায় সহজ ও কঠিনের মুকাবিলায় কঠিন নীতি অবলম্বন করা হল। তিনি বললেন, এ বাঁধ নির্মাণের ক্ষমতা আল্লাহই দান করেছেন। এটা তাঁরই অনুগ্রহ ও দয়া। কেন না এর দ্বারা উক্ত সীমালঙ্ঘনকারী জাতির অত্যাচার থেকে তাদের প্রতিবেশী লোকদেরকে রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু শেষ যামানায় মানব জাতির ওপর তাদের বের হয়ে আসার নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হবে, তখন তিনি এটাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবেন; মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। কেন না তাদের বের হয়ে আসার জন্যে এ রকম হওয়া আবশ্যক। আর আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।

ফন্ট সাইজ
15px
17px