📄 হাদিস পাকে হযরত লোকমান আ.
সুফিয়ান ছাওরী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বলেন, লোকমান ছিলেন জনৈক আবিসিনীয় দাস। পেশায় নাজ্জার বা সূত্রধর। কাতাদা রহ. ইবনে যুবায়ের রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: আমি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, লোকমান সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত আপনাদের অভিমত কি নাজ্জার বা সুত্রধর? তিনি বললেন, লোকমান ছিলেন খর্বাকৃতি এবং নূবী গোত্রস্থিত চ্যাপ্টা নাক বিশিষ্ট লোক। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান ছিলেন মিসরীয় কৃষ্ণকায় লোক। তার ওষ্ঠাধর ছিল মোটা ও পুরু। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হিকমত ও প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন, নবুয়ত দান করেন নি।
উমর ইবনে কায়েস বলেন, লোকমান ছিলেন একজন কৃষ্ণকায় ক্রীতদাস। ঠোঁট দুটো পুরু, পা দুটো চ্যাপ্টা। তিনি যখন লোকজনকে উপদেশ দিচ্ছিলেন এমন সময় একজন লোক এসে বলল, আপনি না আমার সাথে অমুক অমুক স্থানে বকরি চরিয়েছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, তা হলে এখন যা দেখছি, এ পর্যায়ে আপনি উন্নীত হলেন কেমন করে? তিনি উত্তর দিলেন, সত্য বলা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মৌনতা অবলম্বনের মাধ্যমে। এ বর্ণনাটি ইবনে জারীরের।
ইবনে আবী হাতিম আবদুর রহমান ইবনে আবী ইয়াযিদ ইবনে জাবির থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, লোকমান হাকীমের হেকমত ও প্রজ্ঞার বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। তাঁর পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে দেখে বলল, আপনি কি অমুকের ক্রীতদাস ছিলেন না? আপনি কি পূর্বে বকরী চরাতেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, লোকটি বলেন, কিসে আপনাকে আমার দেখা এ পর্যায়ে উন্নীত করল? তিনি বললেন, তাকদিরের লিখন, আমানতদারী, সত্যবাদিতা ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন।
আফরার আযাতকৃত দাস ওমর থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি লোকমান হাকীমের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আপনি তো বনি নুহাস গোত্রের ক্রীতদাস লোকমান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, আপনি সেই কৃষ্ণকায় বকরি চরানো ব্যক্তিই তো? তিনি বললেন, আমার কালোবর্ণ বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার কোন বিষয়টি আপনাকে বিস্মিত করছে? সে বলল, এই যে লোকজন আপনার কাছে জড়ো হচ্ছে, আপনার দরজা ওদেরকে আচ্ছাদিত করছে এবং আপনার বক্তব্যে তারা প্রীতও হচ্ছে—এসব। লোকমান বললেন, ভাতিজা! আমি তোমাকে যা বলব, তুমি যদি তা কর, তবে তুমিও আমার মতো হতে পারবে। সে বলল, তা কী? লোকমান বললেন, আমি আমার দৃষ্টি অবনত রাখি। আমি আমার জিহবা সংযত রাখি। আমি আমার পানাহার ও যৌনাচারের ব্যাপারে আমি সংযম অবলম্বন করি। আমি আমার দায়িত্ব পালন করি। অঙ্গীকার পূরণ করি। মেহামানদের সম্মান করি। প্রতিবেশীদের হক আদায় করি। অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন করি। এ কর্মগুলোই আমাকে এ পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা তুমি দেখতে পাচ্ছ।
ইবনে আবী হাতিম হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান হাকীমের আলোচনায় একদিন তিনি বললেন, তাঁর না ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবার-পরিজন, না ধন-সম্পদ, না কোনো বংশ-মর্যাদা, না কোনো বৈশিষ্ট্য। তবে তিনি ছিলেন সুঠামদেহী নীরবতা অবলম্বনকারী, চিন্তাশীল, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী। দিনের বেলা তিনি কখনও ঘুমাতেন না, তাঁকে কেউ থুথু ফেলতে দেখেনি, দেখেনি কাশি দিতে, পেশাব-পায়খানা করতে, গোসল করতে কিংবা বাজে কাজকর্ম করতে এবং কেউ তাঁকে হাসতেও দেখেনি। খুব গভীর কোনো জ্ঞানের কথা না হলে বা কেউ জিজ্ঞাসা না করলে তিনি কখনও তাঁর বক্তব্য পুনঃউচ্চারণ করতেন না। তিনি বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর একাধিক সন্তানও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এদের মৃত্যুতে তিনি কাঁদেন নি। তিনি রাজা-বাদশা ও আমীর-উমরাদের নিকট যেতেন তাঁদের অবস্থা দেখার জন্যে, চিন্তা-ভাবনা করার জন্যে এবং ওদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্যে। ফলে তিনি এ মর্যাদার অধিকারী হন।
কেউ কেউ বলেন, তাঁকে নবুয়ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। তিনি নবুয়তের গুরুদায়িত্ব পালনে শঙ্কিত হন আর হিকমত তথা প্রজ্ঞাকেই বেছে নেন। কারণ, এটি ছিল তাঁর নিকট সহজতর। এ মন্তব্যের যথার্থতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন। ইবনে আবী হাতিম ও ইবনে জারীর ইকরামার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, লোকমান নবী ছিলেন। তবে বর্ণনাটি দুর্বল বলে গণ্য করা হয়। অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে লোকমান ছিলেন প্রজ্ঞাময় ও বিচক্ষণ একজন ওলি। তিনি নবী ছিলেন না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে হযরত লোকমানের কথা উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করেছেন। সেইসঙ্গে তাঁর প্রাণপ্রিয় ও স্নেহধন্য পুত্রকে যেসব উপদেশ দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাও উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রথমে আপন পুত্রকে শিরিক করতে নিষেধ করলেন এবং সতর্ক করে দেন। এরপর তিনি সন্তানের ওপর পিতামাতার অধিকারের কথা, তারা মুশরিক হলেও তাদের প্রতি সদাচরণের কথা এবং তাদের দীন কবুল করার ব্যাপারে তাদের আনুগত্য না করার কথা উল্লেখ করেছেন।
এরপর হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে মানুষের প্রতি জুলুম করতে বারণ করেন। জুলুম যদিও সর্ষে দানা পরিমাণও হয়। কেন না আল্লাহ তাআলা জুলুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। জুলুমকে হিসাব নিকাশকালে হাজির করবেন এবং আমলের পাল্লায় রাখবেন। এর দ্বারা জানিয়ে দেওয়া হল, জুলুম দৃষ্টিতে তিল পরিমাণ ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হলেও এবং তা দরজা জানালাহীন, এমনকি ছিদ্র বিহীন কঠিন পাথরের মধ্যে রাখা হলেও অথবা বিশাল ও বিস্তৃত এ অসীম আসমানের গহীন অন্ধকার স্থান থেকে কোনো বস্তুতে পতিত হলেও আল্লাহ তাআলা সেটি সম্পর্কে অবগত থাকেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী সম্যক অবহিত। আল্লাহ তাআলার ইলম অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাই সাধারণত যা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, সেই অণু পরিমাণ বিষয়ও তাঁর অগোচরে থাকে না।
ইমাম আহমদ রহ. আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমাদের কেউ যদি দরজা ও ছিদ্রহীন পাথরের মধ্যেও কোনো আমল কর, তাও মানুষের সম্মুখে প্রকাশিত হয়ে পড়বে, আমলটি যে পর্যায়েরই হোক না কেন।"
এরপর হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে বললেন: হে বৎস! নামায কায়েম কর। অর্থাৎ সকল নিয়মনীতি সহকারে ফরয, ওয়াজিব, ওয়াক্ত, রুকু সিজদা, ধীর-স্থির ও বিনয় সব কিছুর প্রতি লক্ষ রেখে এবং এ সম্পর্কিত শরিয়তের নিষিদ্ধ বিষয়াদি পরিহার করে পূর্ণাঙ্গ রূপে নামায আদায় কর। এরপর তিনি বললেন, সৎকর্মের নির্দেশ দিবে এবং অসৎকর্মে নিষেধ করবে নিজের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী। হাতে তথা বলপ্রয়োগে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে বলপ্রয়োগে বাধা দেবে। নতুবা মুখে, তাতেও সমর্থ না হলে অন্তরে। এরপর পুত্রকে নির্দেশ দিলেন ধৈর্য ধারণের। কেন না সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে গেলে সাধারণত বাধা ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। তবে এর পরিণাম উৎকৃষ্ট। এটি সর্বজনবিদিত, সবুরে মেওয়া ফলে। তাই তিনি বলেন: এ তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ, অপরিহার্যও বটে।
তিনি বললেন, অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না। মানুষের প্রতি অহংকারী হয়ো না। লোকজনের সাথে কথা বলার সময় তাদের প্রতি গর্বভরে ও অবজ্ঞা বশে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না। যেমনি ঘাড়ের রোগে আক্রান্ত উটের মাথা ঝুঁকে পড়ে। এরপর তিনি তাঁর পুত্রকে মানুষের সম্মুখে দম্ভ, অহংকার ও ঔদ্ধত্য সহকারে পথ চলতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তুমি তোমার দ্রুতগতি সম্পন্ন পথ চলার সকল শহর, নগর অতিক্রম করে যেতে পারবে না, তোমার পদাঘাতে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর তোমার বিশালত্ব অহংকার ও উচ্চতায় তুমি পাহাড়ের সমান উঁচুও হতে পারবে না। সুতরাং নিজের প্রতি তাকাও এবং বুঝে নাও, তুমি তোমার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যেতে পারবে না।
হাদিস শরিফে আছে, এক ব্যক্তি দুটো কাপড় পরে গর্বভরে পথ চলছিল। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ভূমিতে প্রোথিত করে দিলেন। কেয়ামত পর্যন্ত সে নিচের দিকে প্রোথিত হতে থাকবে। অপর হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: গোড়ালীর নিচ পর্যন্ত লুঙ্গি ঝুলিয়ে দেওয়া থেকে তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ। কেন না তা অহংকারের পরিচায়ক। আল্লাহ তা পছন্দ করেন না। এরপর লোকমান তাঁর পুত্রকে মধ্যম গতিতে পথ চলতে নির্দেশ দিলেন। কারণ, পথ চলাতো লাগবেই। তিনি এ বিষয়ে পুত্রকে মন্দ দিক সম্পর্কে নিষেধ করলেন এবং কল্যাণকর দিকটি অবলম্বনের নির্দেশ দিলেন। বললেন, পথ চলতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে; খুব মন্থরগতি কিংবা খুব দ্রুতগতিতে নয় বরং মধ্যম গতিতে চলবে।
এরপর লোকমান তাঁর পুত্রকে বললেন: তুমি যখন কথা বলবে, তখন প্রয়োজনাতিরিক্ত উচ্চ স্বরে কথা বলবে না। কেন না সর্বোচ্চ এবং সর্বনিকৃষ্ট কণ্ঠস্বর হল গাধার স্বর। সহি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাত্রি বেলায় গাধার ডাক শুনলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আউযুবিল্লাহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন না গাধা শয়তানকে দেখতে পায়। এ জন্যেই বিনা প্রয়োজনে কণ্ঠস্বর উচ্চ করতে নিষেধ করেছেন। বিশেষত হাঁচি দেওয়ার সময়। হাঁচির সময় শব্দ নিচু রাখা এবং মুখ ঢেকে রাখা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতেন বলে হাদিসে প্রমাণ রয়েছে। অবশ্য আযানের সময় উচ্চ স্বরে আযান দেওয়া, যুদ্ধের সময় উচ্চ স্বরে আহবান জানানো এবং বিপদ-আপদ ও মৃত্যুর আশঙ্কায় উচ্চস্বরে কাউকে ডাকা শরিয়তসম্মত।
হযরত লোকমান আ.-এর এসব প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য, কল্যাণকর ও অকল্যাণরোধক উপদেশাবলী আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে উল্লেখ করেছেন। হযরত লোকমান আ.-এর বিবরণ ও উপদেশাবলী সম্পর্কে আরও বহু বর্ণনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য সম্বলিত 'হেকমতে লোকমান' নামে একটি পুস্তক পাওয়া যায়। ইমাম আহমদ হযরত ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানালেন, লোকমান হাকীম বলতেন, আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু আমানতরূপে দিলে তিনি তা হেফাজতও করেন।
ইবনে আবী হাতিম কাসিম ইবনে মুখায়মারা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, "হে বৎস! হিম্মত ও প্রজ্ঞা দরিদ্রদেরকে রাজার আসনে বসিয়েছে।"
আওন ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! তুমি কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে ইসলামের রীতি অনুযায়ী সালাম করবে। তারপর মজলিসের এক পাশে বসে পড়বে। তাঁদের কথা বলার পূর্বে তুমি কোনো কথা বলো না। তারা আল্লাহর যিকির ও আল্লাহ সম্পর্কে আলোচনায় নিয়োজিত হলে তুমি তাঁদের সাথে আলোচনায় অংশ নিবে। তারা যদি অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করে, তবে তুমি তাঁদেরকে ত্যাগ করে অন্যদের কাছে চলে যাবে।
হাফস ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত। হযরত লোকমান আ. এক থলে সরিষা পাশে নিয়ে তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে বসেছিলেন। একটি করে উপদেশ দিচ্ছিলেন আর একটি সরিষা থলে থেকে বের করছিলেন। এভাবে তাঁর সব সরিষা শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, হে বৎস! আমি তোমাকে এমন উপদেশ দিলাম, কোনো পর্বতকে এ উপদেশ শুনালে ফেটে চৌচির হয়ে যেত। তাঁর পুত্রের অবস্থাও তাই হয়েছিল।
মালেক ইবনে দীনার থেকে বর্ণিত, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! তুমি ব্যবসা রূপে আল্লাহর ইবাদতকে বেছে নাও, তা হলে পুঁজি ছাড়াই লাভ পাবে। ইয়াযিদ মুহাম্মদ ইবনে ওয়াছি থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে লক্ষ্য করে প্রায়ই বলতেন, হে বৎস! আল্লাহকে ভয় কর। তোমার অন্তর কলুষিত থাকা অবস্থায় মানুষের শ্রদ্ধা অর্জনের জন্যে তুমি আল্লাহকে ভয় করার ভান কর না!
ইয়াযিদ বলেন, লোকমান ছিলেন একজন হাবশী ক্রীতদাস। পেশায় ছুতার। তাঁর মালিক তাঁকে একটি বকরি জবাই করতে বলেছিল। সে মতে তিনি একটি বকরি জবাই করেন। বকরির উৎকৃষ্টতম দুটো টুকরো আনতে মালিক তাঁকে নির্দেশ দেন। তিনি বকরিটির জিহবা ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে আসেন। মালিক তাকে জিজ্ঞেস করল, এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো অঙ্গ কি এ বকরিতে নেই? তিনি বললেন, না। মালিক কিছু সময় চুপ করে থাকার পর আবার তাঁকে বললেন, আমার জন্যে অপর একটি বকরি জবাই কর। তিনি তাঁর জন্যে অপর একটি বকরি জবাই করলেন। মালিক বললেন, এটির নিকৃষ্টতম টুকরো দুটো ফেলে দাও! তিনি বকরিটির জিহবা ও হৃৎপিণ্ড ফেলে দিলেন। মালিক বললেন, আমি তোমাকে উৎকৃষ্ট দুটো টুকরো আনতে বললাম, তুমি নিয়ে এলে জিহবা আর হৃৎপিণ্ড। আবার নিকৃষ্টতম দুটো টুকরা ফেলে দিতে বললাম, তুমি জিহবা আর হৃৎপিণ্ড ফেলে দিলে! এর রহস্য কি? লোকমান বললেন, জিহবা ও হৃৎপিণ্ড যতক্ষণ পবিত্র থাকে ততক্ষণ এ দু'টো অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কিছু থাকে না। আর এ দুটো যখন কলুষিত হয়, তখন এ দুটো অপেক্ষা ঘৃণিত অন্য কিছু থাকে না।
দাউদ ইবনে রশীদ আবু উছমান রহ. এর সূত্রে বলেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, মূর্খদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে আগ্রহী হয়ো না। তা হলে সে মনে করবে, তার কর্মে তুমি সন্তুষ্ট। বিজ্ঞ ব্যক্তিদের অসন্তুষ্টিকে তুচ্ছ ভেব না। তা হলে সে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে।
দাউদ ইবনে উসায়দ আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদের সূত্রে বলেন, লোকমান বলেছেন: জেনে রাখ! প্রজ্ঞাবানদের মুখে আল্লাহ পাকের হাত থাকে। তিনি যা তৈরি করে দেন, তা ব্যতীত তারা কথা বলেন না।
আবদুর রাযযাক বলেন, তিনি ইবনে জুরায়েজকে বলতে শুনেছেন, আমি রাতে মাথা ঢেকে রাখতাম। ওমর রাযি. আমাকে বললেন, তুমি রাতে মাথা ঢেকে রাখ কেন? তুমি কি জান না, লোকমান আ. বলেছেন, দিনের বেলা মাথা ঢেকে রাখা অপমানজনক এবং রাত্রে তা ওযর বা অপারগতার নিদর্শন। তা হলে তুমি রাতে মাথা ঢাক কেন? তখন আমি তাঁকে বললাম, লোকমান আ.-এর তো কোনো ঋণ ছিল না। সুফিয়ান বলেন, লোকমান তার পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! নীরবতা অবলম্বন করে আমি কখনো লজ্জিত হই নি। কথা বলা যদি রূপা হয়, তবে নীরব থাকা হচ্ছে সোনা।
আবদুস সামাদ কাতাদা সূত্রে বলেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! মন্দ থেকে দূরে থাক। তা হলে মন্দ তোমার থেকে দূরে থাকবে। কেন না মন্দের জন্যেই মন্দের সৃষ্টি। আবু মুআবিয়া উরওয়ার সূত্রে বলেন: হযরত লোকমানের প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যে আছে, হে বৎস। অতিরিক্ত মাখামাখি পরিহার করবে। কেন না, অতিরিক্ত মাখামাখি ঘনিষ্ঠজন থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং প্রজ্ঞাকে বিলুপ্ত করে দেয়। হে বৎস! অতি ক্রোধ বর্জন করবে। কেন না, তা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির অন্তঃকরণকে ধ্বংস করে দেয়।
ইমাম আহমদ উবায়দ ইবনে উমায়েরের সূত্রে বলেন, লোকমান আ. তার পুত্রকে নসিহত করেন, হে বৎস! দেখে-শুনে মজলিস বেছে নেবে। যদি এমন মজলিস দেখ, যেখানে আল্লাহর যিকির হয়, তবে তুমি তাঁদের সাথে সেখানে বসবে। কেন না, তুমি নিজে জ্ঞানী হলে তোমার জ্ঞান তোমার উপকার করবে; তুমি মূর্খ হলে মজলিসের লোকেরা তোমাকে জ্ঞান দান করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের ওপর রহমত নাযিল করলে তাঁদের সাথে তুমিও রহমতের অংশ পাবে। হে বৎস! যে মজলিসে আল্লাহর যিকির হয় না, সে মজলিসে বসবে না। কেন না, তুমি নিজে জ্ঞানী হলে তখন তোমার জ্ঞান তোমার কোনো উপকার করবে না। আর তুমি যদি মূর্খ হও তারা তোমার মূর্খতা আরও বৃদ্ধি করে দিবে। উপরন্তু আল্লাহ তাঁদের ওপর কোনো গযব নাযিল করলে তাঁদের সাথে তুমিও গযবে পতিত হবে। হে বৎস! ঈমানদারের রক্তপাতকারী শক্তিমান ব্যক্তিকে ঈর্ষা করো না। কেন না, তার জন্যে আল্লাহর নিকট এমন ঘাতক রয়েছে, যার মৃত্যু নেই।
আবু মুয়াবিয়া উরওয়া রহ. সূত্রে বলেন, 'আলহিকমাহ' গ্রন্থে রয়েছে, হে বৎস! তুমি ভালো কথা বলবে এবং হাসিমুখে থাকবে। তা হলে দানশীল ব্যক্তিদের তুলনায় তুমি মানুষের নিকট অধিকতর প্রিয় হবে। তিনি আরও বলেন, 'আলহিকমাহ' গ্রন্থে বা তাওরাতে আছে, নম্রতা হল প্রজ্ঞার মস্তক স্বরূপ। তুমি যেমন দয়া করবে, তেমন দয়া পাবে। তিনি আরও বলেছেন, হিকমত গ্রন্থে আছে, যেমন বপন করবে তেমন ফসল তুলবে। তোমার বন্ধুকে এবং তোমার পিতার বন্ধুকে ভালোবাসবে।
আবদুর রাযযাক আবু কিলাবা সূত্রে বলেন, লোকমান আ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কোন ব্যক্তি অধিক ধৈর্যশীল? তিনি বললেন: যে ধৈর্যের যার পরে কষ্ট দেওয়া হয় না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন: যে অন্যের জ্ঞান দ্বারা নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করে। বলা হল, কোন লোক উত্তম? তিনি বললেন, ধনী ব্যক্তি। বলা হল, প্রাচুর্যের অধিকারী, সম্পদে প্রাচুর্য? তিনি বললেন: না, বরং আমি সে ব্যক্তিকে বুঝিয়েছি, যার কাছে কোনো কল্যাণ চাওয়া হলে তা পাওয়া যায়। তা না হলে অন্তত সে অন্যের দ্বারস্থ হয় না। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন, লোকমান আ.-কে বলা হল, নিকৃষ্টতম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি এ কথার পরোয়া করে না, লোকে তাঁকে মন্দ কার্যে লিপ্ত দেখবে।
আবু সামাদ মালিক ইবনে দীনার সূত্রে বলেন, প্রজ্ঞাপূর্ণ কথার মধ্যে আমি এটা পেয়েছি, মানুষের খেয়াল-খুশি ও কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে সমাজের উপরতলার যে সকল লোক আলাপ-আলোচনা করে আল্লাহ তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেন। আমি তাতে আরো পেয়েছি, তুমি যা জানো তা আমল না করে, যা জানো না তা জানার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। এটি তো সে ব্যক্তির মতো, যে কাঠ সংগ্রহ করে বোঝা বাঁধে। তারপর তা মাথায় তুলে নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। তারপর গিয়ে আরো কাঠ সংগ্রহ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ আবু সাঈদ রহ. সূত্রে বলেন, হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন হে বৎস। পরহেযগার ব্যক্তিরাই যেন তোমার খাদ্য খায় এবং তোমার কাজকর্মে বিজ্ঞজনদের পরামর্শ নিও। এ বিষয়ে ইমাম আহমদ রহ. যা বর্ণনা করেছেন, এগুলো হচ্ছে তার সারসংক্ষেপ। আল্লাহই ভালো জানেন।
ইবনে আবি হাতিম কাতাদা রহ. এর সূত্রে বলেন, আল্লাহ তাআলা লোকমান হাকীমকে নবুয়ত ও হেকমতের যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দিয়েছিলেন। তিনি নবুয়তের পরিবর্তে হেকমত গ্রহণ করেন। তারপর জিবরাঈল আ. তাঁর নিকট এলেন। তিনি তখন নিদ্রামগ্ন। জিবরাঈল আ. তাঁর নিকট হেকমতের বারি বর্ষণ করেন। এরপর থেকে তিনি হেকমতপূর্ণ কথা বলতে শুরু করেন। সাদ বলেন, আমি কাতাদা রহ.-কে বলতে শুনেছি, লোকমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি নবুয়ত না নিয়ে হেকমত নিলেন কেন? আপনাকে তো এ দুটোতেও আপনার প্রতিপালক ইখতিয়ার দিয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমাকে যদি বাধ্যতামূলকভাবে নবুয়ত দেওয়া হত, তা হলে আশা করি, আমি ওই দায়িত্ব পালনে সাফল্য লাভ করতাম। কিন্তু আমাকে যখন যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দেওয়া হল, তখন আমি নবুয়তের গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে যাব বলে আশঙ্কা করলাম। তাই হেকমতই আমার নিকট প্রিয়তর মনে হল। এ বর্ণনাটি সংশয়মুক্ত নয়। সায়্যিদ ইবনে কাথিরের বর্ণনা সম্পর্কে হাদিসবেত্তাগণের বিরূপ সমালোচনা রয়েছে। উপরন্তু সাঈদ ইবনে আবি আরূবা কাতাদা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন: হেকমত অর্থ, প্রজ্ঞা ও ইসলাম। তিনি নবী ছিলেন না, তাঁর প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়নি। পূর্ববর্তী কালের ওলামায়ে কেরামও স্পষ্টভাবে তা বলেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
📄 হেকমতপূর্ণ বাণী
আরবদেশে তৎকালে লোকমানের হেকমতের যথেষ্ট চর্চা ছিল। তারা অধিকাংশ মজলিসে লোকমানের জ্ঞানগর্ভ উক্তিসমূহ উদ্ধৃত করে থাকত। তাবেয়িন, সাহাবায়ে কেরাম, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতেও এ সম্বন্ধীয় কতিপয় জ্ঞানবাণী নকল করা হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হল:
১. হেকমত ও বুদ্ধিমত্তা দরিদ্রকে রাজা করে দেয়।
২. কোনো মজলিসে প্রবেশ করলে প্রথমে সালাম করবে। এরপর একপার্শ্বে বসে পড়বে। মজলিসের লোকদের কথা না শুনা পর্যন্ত নিজের কথা আরম্ভ করবে না। 'যদি তারা আল্লাহ তাআলার যিকিরে মশগুল থাকে, তবে তুমিও তাতে অংশগ্রহণ করবে। আর যদি তারা বেহুদা কাজে মশগুল থাকে, তবে সেখান থেকে পৃথক হয়ে অন্য কোনো ভালো মজলিসে চলে যাবে।
৩. আল্লাহ তাআলা যদি কাউকেও আমানতদার বানান, তবে তার ওপর সেই আমানতের হেফাযত করা ফরয।
৪. হে বৎস! আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। রিয়াকারীর সাথে (লোকদেখানোভাবে) আল্লাহ তাআলার ভয় প্রকাশ করো না— যাতে লোকে তোমার সম্মান করবে, অথচ তোমার অন্তর প্রকৃতপক্ষে গুনাহগার।
৫. হে বৎস! মূর্খের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাতে সে মনে করবে, তুমি তার মূর্খতাসুলভ আচরণ পছন্দ কর। জ্ঞানী ব্যক্তির গোসসা ও অসন্তোষের প্রতি বেপরোয়া ভাব প্রকাশ করো না, পাছে না তুমি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়।
৬. জ্ঞানী লোকদের মুখে খোদাপ্রদত্ত শক্তি থাকে। কোনো বিষয় আল্লাহ তাআলা যেরূপ করতে ইচ্ছা করেন, তাঁরা তদ্রুপই বলে থাকেন।
৭. হে বৎস! নীরবতা অবলম্বনে কখনো অনুতপ্ত এবং লজ্জিত হতে হয় না। কথা বলা যদি রৌপ্য হয় তবে নীরবতা অবলম্বন স্বর্ণ স্বরূপ।
৮. হে বৎস! সর্বদা মন্দ কাজ হতে দূরে থাক! তা হলে মন্দ কাজও তোমার থেকে দূরে থাকবে। কেন না মন্দ হতে মন্দ উৎপন্ন হয়ে থাকে।
৯. হে বৎস! ক্রোধ ও গোসসা হতে আত্মরক্ষা কর। কেন না অতিরিক্ত গোসসা জ্ঞানী লোকের অন্তরকে মুর্দা করে ফেলে।
১০. হে বৎস! মধুরভাষী হও। সদা হাস্যময় চেহারা ধারণ কর। তবে তুমি মানুষের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তির চেয়েও অধিক প্রিয় হয়ে যাবে, যে ব্যক্তি তাঁদেরকে সর্বক্ষণ দান-দক্ষিণা প্রদান করে থাকে।
১১. নম্রস্বভাব বুদ্ধিমত্তার মূল।
১২. যা বপন করবে তাই কাটবে।
১৩. নিজের ও নিজের পিতার বন্ধুকে ভালোবাসবে।
১৪. কেউ লোকমানকে জিজ্ঞাসা করল, সর্বপেক্ষা অধিক ছবরকারী কোন ব্যক্তি? তিনি উত্তর করলেন, যার ছবর করার পিছনে কষ্টপ্রদান করা উদ্দেশ্য না হয়। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম কে? তিনি উত্তর করলেন, যে ব্যক্তি অন্যান্য আলেমদের ইলম দ্বারা নিজের ইলম বাড়াতে থাকে। সে পুনরায় প্রশ্ন করল, সর্বপেক্ষা উত্তম মানুষ কে? তিনি বললেন "অভাবমুক্ত লোক"। প্রশ্নকারী পুনরায় বলল, 'অভাবমুক্ত' বলতে কি ধনবান লোক উদ্দেশ্য? উত্তরে তিনি বললেন: না, বরং অভাবমুক্ত সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে মঙ্গল ও সৎগুণ তালাশ করলে তা বিদ্যমান দেখতে পায়। অন্যথায় সে নিজেকে অপর হতে অমুখাপেক্ষী রাখে।
১৫. কেউ জিজ্ঞাসা করল, নিকৃষ্টতম মানুষ কে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি এ পরোয়া করে না, লোকে তাঁকে মন্দকার্য করতে দেখলে মন্দ বলবে।
১৬. হে বৎস! তোমার দস্তরখানে যদি সর্বদা নেককার লোকদের সমাবেশ থাকে তো উত্তম। আর পরামর্শ শুধু ওলামায়ে হক থেকেই গ্রহণ কর!
📄 হযরত লোকমানের নসিহত
১. মানুষ যদি নিষ্পাপ নবী ও পয়গম্বরও না হয়, কিন্তু জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার সম্মানে সম্মানিত হয়, তবুও আল্লাহ তাআলার নিকট তার মর্যাদা অতি মহান হয়ে থাকে। এ কারণেই হযরত লোকমান এত সম্মান লাভ করেছেন, আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে তাঁর প্রশংসা ও সৎগুণাবলীর বর্ণনা করেছেন এবং উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য তাঁর এমন কতকগুলি নসিহত ও নসিহত ও অসিয়ত বর্ণনা করেছেন, যা তিনি তাঁর পুত্রকে করেছেন। এমনকি কুরআন শরিফের একটি সূরা তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে।
২. আল্লাহর সঙ্গে শরীক সাব্যস্ত করা সমস্ত নেককাজকে বিলীন করে দিয়ে মানুষকে খালি হাতে আল্লাহ পাকের সম্মুখে নিয়ে যায়। সুতরাং সর্বদা তা হতে দূরে থাকা অবশ্য কর্তব্য। প্রকাশ্য শিরকের মতো গুপ্ত শিরকও মানুষের আমলসমূহ এমনভাবে ভক্ষণ করে, যেমনি আগুন লাকড়িকে ভক্ষণ করে। আর গুপ্ত শিরকসমূহের মধ্যে রিয়াকারী অর্থাৎ লোকদেখানো কার্য এবং খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৩. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার এবং তাঁদের শ্রদ্ধা করা ইসলামে এত গুরুত্বপূর্ণ, কুরআন মাজিদ তাঁদেরকে ব্যবহারিক অর্থে রব আখ্যা দিয়েছে। এমনকি তাঁদের খেদমত এবং তাঁদের সম্মুখে মস্তক অবনত রাখাকে পিতা-মাতার ইসলাম এবং কুফর উভয় অবস্থাতে জরুরি সাব্যস্ত করেছে। আর এ গুরুত্বের প্রতি লক্ষ করেই স্থানে স্থানে আল্লাহ তাআলা নিজের একত্ব ঘোষণার সাথে সাথে পিতা-মাতার হকসমূহের কথাও উল্লেখ করেছেন এবং পিতা-মাতার হকসমূহকে সমস্ত হকের ওপর অগ্রগণ্য রেখেছেন। যেমন সূরা বনি ইসরাঈলে বলা হয়েছে:
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا (২৩) وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا (২৪) رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا فِي نُفُوسِكُمْ إِنْ تَكُونُوا صَالِحِينَ فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا
"আর তোমার রব আদেশ করেছেন, তাঁকে ব্যতীত আর কারো ইবাদত করবে না। পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো, যদি তোমাদের সম্মুখে তাঁদের কোনো একজন কিংবা উভয়ে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের প্রতি উঃ শব্দটিও প্রয়োগ করো না এবং তাঁদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলো না। আদবের সাথে তাঁদের সাথে কথা বলো, তাঁদের সম্মুখে বিনয় ও নম্রতার সাথে নিজের কাঁধ অবনত করে দাও বিনীতভাবে এবং দোয়া কর— হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে (স্নেহ ও দয়ার সাথে) প্রতিপালন করেছেন। তোমাদের রব খুব অবহিত আছেন, যা কিছু তোমাদের মনের মধ্যে রয়েছে। যদি তোমরা নেককার হও, তবে তিনি (তাঁর প্রতি) রুজুকারীদেরকে ক্ষমা করে দেন।"
এ ছাড়া পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার সম্বন্ধে অসংখ্য হাদিস বিদ্যমান রয়েছে হাদিসের কিতাবসমূহে। যেমন: নাসায়ির এক হাদীসে আছে : "বেহেশত মায়ের পদতলে"।
📄 আসহাবে কাহাফ
وَكَذٰلِكَ اَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوْٓا اَنَّ وَعْدَ اللّٰهِ حَقٌّ وَّاَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيْهَا اِذْ يَتَنَازَعُوْنَ بَيْنَهُمْ اَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوْا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا رَبُّهُمْ اَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوْا عَلٰٓى اَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَّسْجِدًا (২১) سَيَقُوْلُوْنَ ثَلٰثَةٌ رَّابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُوْلُوْنَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُوْلُوْنَ سَبْعَةٌ وَّثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ قُلْ رَّبِّيْ اَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ مَّا يَعْلَمُهُمْ اِلَّا قَلِيْلٌ فَلَا تُمَارِ فِيْهِمْ اِلَّا مِرَآءً ظَاهِرًا وَّلَا تَسْتَفْتِ فِيْهِمْ مِّنْهُمْ اَحَدًا (২২) وَلَا تَقُوْلَنَّ لِشَيْءٍ اِنِّيْ فَاعِلٌ ذٰلِكَ غَدًا (২৩) اِلَّآ اَنْ يَّشَآءَ اللّٰهُ وَاذْكُرْ رَّبَّكَ اِذَا نَسِيْتَ وَقُلْ عَسٰٓى اَنْ يَّهْدِيَنِ رَبِّيْ لِاَقْرَبَ مِنْ هٰذَا رَشَدًا (২৪) وَلَبِثُوْا فِيْ كَهْفِهِمْ ثَلٰثَ مِائَةٍ سِنِيْنَ وَازْدَادُوْا تِسْعًا (২৫) قُلِ اللّٰهُ اَعْلَمُ بِمَا لَبِثُوْا لَهٗ غَيْبُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ اَبْصِرْ بِهٖ وَاَسْمِعْ مَا لَهُمْ مِّنْ دُوْنِهٖ مِنْ وَّلِيٍّ وَّلَا يُشْرِكُ فِيْ حُكْمِهٖ اَحَدًا
তুমি কি মনে কর, গুহা ও রাকীম (পর্বত বা ফলক)-এর অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলেছিল: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি নিজ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন। এরপর আমি তাঁদেরকে গুহায় কয়েক বছর ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। পরে আমি ওদেরকে জাগ্রত করলাম জানার জন্যে, দু দলের মধ্যে কোনটি ওদের অবস্থান কাল সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে? আমি তোমার নিকট ওদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। ওরা ছিল কয়েকজন যুবক। ওরা ওদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি ওদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম আমি ওদের চিত্ত দৃঢ় করে দিলাম। ওরা যখন উঠে দাঁড়াল, তখন বলল, আমাদের প্রতিপালক আকাশরাজি ও পৃথিবীর প্রতিপালক। আমরা কখনই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনো ইলাহকে আহ্বান করব না। যদি করে বসি, তবে তা হবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। আমাদেরই এ স্বজাতিরা তাঁর পরিবর্তে অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে। তারা এ সকল ইলাহ সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক জালেম আর কে?
তোমরা যখন বিচ্ছিন্ন হলে ওদের থেকে এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের উপাসনা করে তাঁদের থেকে তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন। তুমি দেখতে পেতে— ওরা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত, সূর্য উদয়কাল ওদের গুহার দক্ষিণ পার্শ্বে হেলে যায় এবং অস্তকালে ওদেরকে অতিক্রম করে বামপার্শ্ব দিয়ে। এ সমস্ত আল্লাহর নিদর্শন আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে সৎপথ প্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনই তার কোনো পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না। তুমি মনে করতে ওরা জাগ্রত, কিন্তু ওরা ছিল নিদ্রিত। আমি তাঁদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডান দিকে ও বামে এবং ওদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটো গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। তাকিয়ে ওদেরকে দেখলে তুমি পিছনে ফিরে পলায়ন করতে ও ওদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে। এবং এভাবেই আমি ওদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে ওরা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওদের একজন বলল, তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? কেউ কেউ বলল, একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ। কেউ কেউ বলল, তোমরা কতদিন অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন।
এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এ মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর! সে যেন দেখে কোন খাদ্য উত্তম এবং তা হতে যেন কিছু তোমাদের জন্যে নিয়ে আসে। সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে এবং কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকেই কিছু জানতে না দেয়। ওরা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে, তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে ওদের ধর্মে ফিরিয়ে নিবে এবং সে ক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না। এবং এভাবে আমি মানুষকে তাঁদের বিষয় জানিয়ে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয়, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতের কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা তাঁদের কর্তব্য বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করছিল, তখন অনেকে বলল, ওদের ওপর সৌধ নির্মাণ কর। ওদের প্রতিপালক ওদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাঁদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল— আমরা তো নিশ্চয়ই ওদের পার্শ্বে মসজিদ নির্মাণ করব। কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল তিনজন, ওদের চতুর্থটি ছিল ওদের কুকুর। কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল পাঁচজন, ওদের ষষ্ঠটি ছিল ওদের কুকুর। অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে: ওরা ছিল সাত জন, ওদের অষ্টমটি ছিল ওদের কুকুর। বল, আমার প্রতিপালকই ওদের সংখ্যা ভালো জানেন; ওদের সংখ্যা অল্প কজনই জানে। সাধারণ আলোচনা ব্যতীত আপনি ওদের বিষয়ে বিতর্ক করবে না এবং ওদের কাউকে ওদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। কখনই তুমি কোনো বিষয়ে বলবে না, 'আমি এটি আগামীকাল করব। আল্লাহ ইচ্ছা করলে' কথাটি না বলে। যদি ভুলে যাও, তবে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ করবে এবং বলবে, সম্ভবত আমার প্রতিপালক আমাকে ওটি অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথনির্দেশ করবেন। ওরা ওদের গুহায় ছিল তিন শ' বছর আরো নয় বছর। তুমি বল, তারা কতকাল ছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন, আকাশরাজি ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই। তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টা ও শ্রোতা! তিনি ব্যতীত ওদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে তাঁর কর্তৃত্বে শরিক করেন না। (সূরা কাহাফ: ৯-২৬)
আসহাবে কাহাফ ও যুলকারনাইন সম্পর্কে আয়াত নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকসহ অন্যান্য সীরাত রচয়িতাগণ তাঁদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কুরায়েশরা মদিনার ইহুদিদের নিকট একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ইহুদিরা যেন তাঁদেরকে কিছু প্রশ্ন শিখিয়ে দেয়। এরপর কুরাইশরা সেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করবে এবং এর দ্বারা তারা তাঁকে পরীক্ষা করবে। ইহুদিরা বলেছিল, তোমরা তাঁকে এমন এক সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, যারা অতীতেই বিলীন হয়ে গেছে। যার ফলে তাঁদের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে জানা যায় না। আর প্রশ্ন করবে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী একজন লোক সম্পর্কে এবং রূহ সম্পর্কে। এ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন : (অয়া ইয়াস আলু নাকা আনির রূহ) তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে! অন্যত্র আছে (অয়া ইয়াসআলুনাকা আন যিল ক্বরনাইন) তারা আপনাকে যুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে! আর এখানে বললেন: "তুমি কি মনে কর, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর?" অর্থাৎ, আমি আপনাকে যেসব অভূতপূর্ব আশ্চর্যজনক বিষয়াদি, উজ্জ্বল নিদর্শনাদি ও বিস্ময়কর ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করেছি, সে সবের তুলনায় গুহা ও রাকীমের অধিবাসীদের সংবাদ ও ঘটনা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়।
'কাহফ' অর্থ, পর্বত গুহা। শুআইব যুবাঈ বলেন, গুহাটির নাম হায়যুম। রাকীম শব্দ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাকীম দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, তা আমার জানা নেই। কেউ কেউ বলেন: রাকীম অর্থ লিখিত ফলক, যাতে সেখানে আশ্রয় গ্রহণকারীদের নাম এবং তাঁদের ঘটনাবলী লিখিত রয়েছে। পরবর্তী যুগের লোকজন এটি লিখে রেখেছিল। ইবনে জারীর ও অন্যান্যগণ এ অভিমত করেন। কেউ কেউ বলেন: রাকীম হল সেই পর্বতের নাম, যে পর্বতের গুহায় তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস রাযি. ও শুআইব যুবাঈ বলেন, ওই পর্বতের নাম বিনাজলুস। কারো কারো মতে রাকীম হচ্ছে ওই গুহার পাশে অবস্থিত একটি উপত্যকার নাম। অপর কারো কারো মতে এটি সে এলাকার একটি জনপদের নাম।
শুআইব যুবাঈ বলেন, তাঁদের কুকুরের নাম হামরান। কোনো কোনো তাফসিরকারক বলেছেন, তাঁরা ছিলেন হযরত ঈসা আ.-এর পরবর্তী যুগের লোক এবং তারা খৃস্টান ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে ইহুদিদের গুরুত্ব আরোপ এবং তাঁদের সম্পর্কে সংবাদ সংগ্রহের আগ্রহ দ্বারা প্রমাণিত হয়, তারা হযরত ঈসা আ.-এর পূর্ববর্তী যুগের লোক। আয়াতের বাচনভঙ্গি থেকে প্রতীয়মান হয়, তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকজন ছিল মুশরিক। তারা মূর্তিপূজা করত। বহু তাফসিরকারক ও ইতিহাসবিদ অভিমত প্রকাশ করেছেন, তারা বাদশা দাকরানূমের সময়ের অভিজাত বংশীয় লোক ছিলেন। আবার কারো কারো মতে তারা ছিলেন রাজপুত্র।
ঘটনাক্রমে তারা সম্প্রদায়ের উৎসবের দিনে একত্র হয়। তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা সেখানে যে মূর্তিদেরকে সিজদা করছে এবং প্রতিমাগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করছে, তা তারা প্রত্যক্ষ করে। তখন তারা গভীর মনোযোগের সাথে তা পর্যালোচনা করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁদের অন্তরের উদাসীনতার পর্দা ছিন্ন করে দেন এবং তাঁদের মনে সত্য ও হেদায়েতের উন্মেষ ঘটান। ফলে তারা উপলব্ধি করেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের এসব কাজকর্ম সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। যুবকরা তাঁদের ওই ধর্ম পরিত্যাগ করেন এবং এক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করেন। কেউ কেউ বলেন, যুবকদের প্রত্যেকের মনে আল্লাহ তাআলা তাওহিদ ও হেদায়েতের অনুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। তারপর তারা সকলেই লোকজনের সংসর্গ ত্যাগ করে এক নির্জন এলাকায় এসে উপস্থিত হন। বুখারীতে এ বিষয়ে একটি বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। "রূহগুলো সুবিন্যস্ত বাহিনী স্বরূপ। তাঁদের মধ্যে যেগুলো পূর্ব-পরিচিত, সেগুলো বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আর যারা পরস্পর অপরিচিত তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।" তখন তারা একে অপরের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান বর্ণনা করে। তখন জানা যায়, তারা সবাই নিজ নিজ গোত্র ছেড়ে এসেছে এবং ওদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আপন দীন রক্ষার্থে পালিয়ে এসেছে। ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও পাপাচারের বিস্তৃতিকালে এভাবে সমাজ ত্যাগ করা শরিয়তসম্মত।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তার চেয়ে অধিক জালিম আর কে? তোমরা যখন তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এবং ওরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাঁদের থেকে" অর্থাৎ দীনের প্রশ্নে তোমরা যখন তাঁদের থেকে পৃথক হয়ে গেলে এবং তারা আল্লাহ ব্যতীত যেগুলোর উপাসনা করে, সেগুলোকে ত্যাগ করল। কেন না, তারা আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করত। যেমন হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ বলেছিলেন: "তোমরা যেগুলোর পূজা কর, তাঁদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে শুধু তাঁরই সাথে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আমাকে সৎপথ দেখাবেন।" (সূরা যুখরুফ: ২৬-২৭)
এ যুবকরাও অনুরূপ বলেছিলেন। আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, দীনের প্রশ্নে তোমরা যেমন তোমাদের সম্প্রদায় থেকে পৃথক হয়ে গেছ, দৈহিকভাবেও তোমরা তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও, যাতে ওদের অনিষ্ট থেকে তোমরা নিরাপদ থাকতে পার। "তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে তাঁর দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের কাজ কর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন" অর্থাৎ তাঁর রহমতের পর্দা দ্বারা তোমাদেরকে ঢেকে দিবেন। তোমরা তার নিরাপত্তা ও আশ্রয়ে থাকবে এবং তিনি তোমাদের পরিণাম কল্যাণময় করে দিবেন। যেমন হাদিস শরীফে এসেছে: "হে আল্লাহ। সকল কর্মে আমাদেরকে কল্যাণময় পরিণতি দান করুন এবং দুনিয়ার লাঞ্ছনা ও আখেরাতের আযাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন।"
এরপর তারা যে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, গুহাটি উত্তরমুখী ছিল। তার পশ্চিম দিকে ঢালু ছিল। কিবলার দিকে ঢালু উত্তরমুখী স্থান অধিক কল্যাণকর স্থানরূপে বিবেচিত হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি দেখতে পেতে, ওরা গুহার চত্বরে অবস্থিত। সূর্য উদয়কালে ওদের গুহার ডান দিকে হেলে যায় এবং অস্তকালে ওদেরকে অতিক্রম করে বাম পার্শ্ব দিয়ে" অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে সূর্য উদিত হওয়ার সময় তাঁদের গুহার পশ্চিম দিকে আলো ছড়ায়, তারপর সূর্য যতই উপরে উঠতে থাকে, ক্রমান্বয়ে ততই ওই আলো গুহা থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এটি হল সূর্যের ডান দিক দিয়ে অতিক্রম। এরপর সূর্য মধ্য আকাশে উত্থিত হয় এবং গুহা থেকে ওই আলো বেরিয়ে যায়। তারপর যখন অস্ত যেতে শুরু করে, তখন পূর্ব পাশ দিয়ে অল্প অল্প করে আলো প্রবেশ করতে থাকে। অবশেষে সূর্য অস্ত যায়। এ ধরনের স্থানে এরূপই দেখা যায়। তাঁদের গুহায় মাঝে মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশের এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল, যাতে ওই গুহার আবহাওয়া দূষিত না হয়। "ওরা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত"। এ সব আল্লাহর নিদর্শন। তাঁদের পানাহার না করে, খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ না করে শত শত বছর এ অবস্থায় বিদ্যমান থাকাটা আল্লাহ তাআলার অন্যতম নিদর্শন এবং তাঁর মহাশক্তির প্রমাণ স্বরূপ।
"আল্লাহ যাকে সৎপথে পরিচালিত করেন, সে সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনই তার কোনো পথ প্রদর্শনকারী অভিভাবক পাবে না। তুমি মনে করতে তারা ঘুমন্ত অথচ তারা জাগ্রত।" এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন: তাঁদের চোখ খোলা ছিল। যাতে সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত বন্ধ থাকার ফলে চক্ষু নষ্ট হয়ে না যায়। "আমি ওদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাতাম ডানে, বামে"—এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, বছরে একবার করে তাঁদের পার্শ্ব পরিবর্তন করানো হত। এ পাশ থেকে ও পাশে ফেরানো হত। হতে পারে বছরে একাধিকবারও তা ঘটত। আল্লাহই সম্যক অবগত। "তাঁদের কুকুর ছিল সম্মুখের পা দুটো গুহার মুখের দিকে প্রসারিত করে।" শুআইব জুবাঈ বলেন, তাঁদের কুকুরের নাম ছিল হামরান। অন্য এক মুফাসসির বলেন: যুবকগণ যখন নিজ নিজ গোত্র থেকে একাকী বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন যে কুকুরটি তাঁদের সাথে এসেছিল সেটি শেষ পর্যন্ত, তাঁদের সাথে থেকে যায়। এটি গুহার মধ্যে প্রবেশ করে নি বরং দুহাত গুহামুখে রেখে গুহার প্রবেশ পথে বসেছিল। এটি ওই কুকুরের অনুপম শিষ্টাচার এবং যুবকদের প্রতি সম্ভ্রমবোধের নিদর্শন। কেন না, সাধারণত যে ঘরে কুকুর থাকে সে ঘরে রহমতের ফিরিশতা প্রবেশ করেন না। সাহচর্য ও আনুগত্যের স্বভাবতই একটা প্রভাব থাকে। তাই যুবকদের অনুসরণ করতে গিয়ে কুকুরটিও তাঁদের সাথে অমর হয়ে রয়। কেন না, যে যাকে ভালবাসে, সে তার সৌভাগ্যের অংশীদার হয়। একটি কুকুরের ব্যাপারে যখন এমন হল, তখন সম্মানের পাত্র কোনো পুণ্যবানের অনুসরণকারীর ক্ষেত্রে কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
বহু ধর্মীয় বক্তা ও তাফসিরকারক উক্ত কুকুর সম্পর্কে অনেক লম্বা-চওড়া কাহিনীর উল্লেখ করেছেন। কুকুরটির নাম ও রং সম্পর্কে তারা বিভিন্ন কথা বলেছেন। এগুলোর অধিকাংশই ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে সংগৃহিত এবং এর অধিকাংশ নির্জলা মিথ্যা। এতে কোনো ফায়দাও নেই। গুহাটি কোথায় অবস্থিত, এ নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁদের অনেকে বলেন, এটি আয়লা অঞ্চলে অবস্থিত। কেউ বলেন, এটির অবস্থান নিনোভা এলাকায়। কারো মতে কলকা অঞ্চলে আবার কারো মতে রোমকদের এলাকায়। শেষ অভিমতটিই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
আল্লাহ তাআলা তাঁদের ঘটনার অধিক কল্যাণকর অংশটি এমন সাবলীল প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করলেন, যেন শ্রবণকারী তা প্রত্যক্ষ করছে এবং নিজের চোখে তাঁদের গুহার অবস্থা, গুহার মধ্যে তাঁদের অবস্থান, ওদের পার্শ্ব পরিবর্তন এবং তাঁদের গুহা মুখে প্রসারিত করে উপবিষ্ট কুকুর স্বচক্ষে দেখছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন: "তুমি যদি ওদেরকে তাকিয়ে দেখতে, তবে পিছনে ফিরে পালাতে এবং ওদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে"। অর্থাৎ তারা যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে এবং যে গুরুগম্ভীর ও ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য। সম্ভবত এ সম্বোধনটি সকল মানুষের জন্যে, শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে নয়। কারণ, মানুষ সাধারণত ভীতিকর দৃশ্য দেখলে পালিয়ে যায়। এতে বুঝা যায়, শোনা আর দেখা এক কথা নয়। যেমনটি হাদীসেও এর সমর্থন রয়েছে। কারণ, আলোচ্য ঘটনায় গুহাবাসীর ভীতিকর সংবাদ শুনে কেউ পালায় নি বা ভীতও হয় নি। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, তিনি তাঁদেরকে জাগ্রত করলেন তাঁদের ৩০৯ বছর নিদ্রামগ্ন থাকার পর। জাগ্রত হওয়ার পর তাঁদের একে অন্যকে বলল: তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? কেউ কেউ বলল, একদিন অথবা এক দিনের কিছু অংশ। অপর কেউ বলল তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ, তা তোমাদের প্রতিপালকই ভালো জানেন। যা হোক, তোমাদের একজনকে তোমাদের এ মুদ্রাসহ নগরে প্রেরণ কর অর্থাৎ তাঁদের সাথে থাকা রৌপ্য মুদ্রার দিকে ইঙ্গিত করে, তা নিয়ে নগরে যেতে বলেছিল।
কথিত আছে, ওই নগরীর নাম ছিল দাফমূম। "সে গিয়ে দেখুক কোন খাদ্য উত্তম" অর্থাৎ কোনটি উৎকৃষ্ট মানের। "এরপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্যে"। অর্থাৎ যা তোমরা খেতে পারবে। এটি ছিল তাঁদের সংযম ও নির্লোভ মনোভাবের পরিচায়ক। সে যেন বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে নগরে প্রবেশ করার সময়। "কিছুতেই যেন তোমাদের সম্বন্ধে কাউকে কিছু টের পেতে না দেয়। ওরা যদি তোমাদের বিষয় জানতে পারে তবে তোমাদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে ওদের ধর্মে ফিরিয়ে নিবে। সেক্ষেত্রে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।" অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদেরকে ওদের বাতিল ধর্ম থেকে উদ্ধার করার পর তোমরা যদি পুনরায় ওদের মধ্যে ফিরে যাও, তবে আর তোমাদের সাফল্য নেই। তারা এ জাতীয় কথাবার্তা এ জন্য বলেছিল, তারা মনে করেছিল তারা একদিন, একদিনের কতকাংশ কিংবা তার চাইতে কিঞ্চিতাধিক সময় নিদ্রামগ্ন ছিল। তারা যে ৩০০ বছরের অধিককাল ধরে নিদ্রামগ্ন ছিল এবং ইতোমধ্যে যে রাষ্ট্রক্ষমতার বহুবার হাত বদল হয়েছে, নগর ও নগরবাসীর পরিবর্তন হয়েছে, তাঁদের প্রজন্মের লোকদেরও মৃত্যু হয়েছে, অন্য প্রজন্ম এসেছে এবং তারাও চলে গিয়েছে, এরপর অন্য আরেক প্রজন্মের আবির্ভাব হয়েছে; তার কিছুই তারা তখনও আঁচ করে উঠতে পারে নি। এ জন্যে তাঁদের একজন অর্থাৎ তীযূসীস যখন নিজের পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে গুহা থেকে বের হন এবং নগরে প্রবেশ করেন, তখন তা তাঁর নিকট অপরিচিত মনে হয়। নগরবাসীরাও তাঁকে দেখে অপরিচিত বোধ করে। তাঁর আকার-আকৃতি কথাবার্তা এবং তাঁর মুদ্রা সবই নগরবাসীর নিকট অপরিচিত ও আশ্চর্যজনক মনে হয়।
কথিত আছে, তারা তাঁকে তাঁদের রাজার নিকট নিয়ে যায় এবং তারা তাঁকে গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে। কেউ কেউ তাঁকে শক্তিশালী শত্রু মনে করে তার ক্ষতিকর আক্রমণেরও আশঙ্কা করেছে। কতক ঐতিহাসিকের মতে তিনি তখন তাঁদের নিকট থেকে পালিয়ে যান। আর কতক ঐতিহাসিকের মতে তিনি নগরবাসীকে তাঁর নিজের ও সাথীদের অবস্থার বিবরণ দেন। এরপর তারা তাঁর সাথে তার অবস্থান ক্ষেত্রের দিকে রওনা হয়, যাতে তিনি তাঁদেরকে নিজেদের অবস্থানস্থল দেখিয়ে দেন। নগরবাসী গুহার নিকট এসে পৌঁছার পর তীযূসীস সর্বাগ্রে তার সাথীদের নিকট প্রবেশ করেন। তিনি নিজেদের প্রকৃত অবস্থা এবং নিদ্রার মেয়াদ সম্পর্কে তাঁদেরকে অবহিত করেন। তখন তারা উপলব্ধি করে, মূলত এটি মহান আল্লাহর নির্ধারিত একটি বিষয়। কথিত আছে, এরপর তাঁরা আবার নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েন। মতান্তরে এরপর তাঁদের ইনতেকাল হয়ে যায়। ওই নগরবাসীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা ওই গুহাটি খুঁজে পায়নি। গুহাবাসীদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে অনবহিত রেখে দেন। কেউ কেউ বলেন, গুহাবাসীদের ব্যাপারে তাঁদের মনে ভীতির সৃষ্টি হওয়ার দরুণ গুহায় প্রবেশ করতে পারে নি। গুহাবাসীদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে নগরবাসীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। তাঁদের একদল বলল, "তাঁদের ওপর সৌধ নির্মাণ করে দাও!" অর্থাৎ গুহামুখ বন্ধ করে দাও! যাতে তারা সেখান থেকে বের হতে না পারে কিংবা কেউ তাঁদেরকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের নিকট যেতে না পারে। অপর দল বলল, "আমরা অবশ্যই ওদের ওপর মসজিদ নির্মাণ করব" অর্থাৎ ইবাদতখানা তৈরি করব। আর এদের মতই প্রবল ছিল। এ সকল পূণ্যবান লোকদের পাশাপাশি থাকার কারণে তা বরকতময় হয়ে থাকবে। পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে এরূপ মসজিদ নির্মাণের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি মানুষকে এভাবে তাঁদের বিষয় জানিয়ে দিলাম। যাতে তারা জ্ঞাত হয়, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য এবং কিয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই।" বহু তাফসিরকারক বলেছেন, এর অর্থ হল যাতে লোকজন জানতে পারে, পুনরুত্থান সত্য এবং কিয়ামত অনুষ্ঠানে কোনো সন্দেহ নেই। কেন না মানুষ যখন অবগত হবে, গুহাবাসীগণ তিনশ বছরেরও অধিককাল ধরে নিদ্রামগ্ন ছিল, তারপর কোনো প্রকারের বিকৃতি ছাড়া যে অবস্থায় ছিলেন ঠিক সে অবস্থায়ই জাগ্রত হয়ে উঠেছেন, তখন তারা উপলব্ধি করতে পারবে, মহান সত্তা তাঁদেরকে কোনো পরিবর্তন ছাড়া অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষমতা রাখেন। তিনি নিশ্চয়ই চূর্ণ-বিচূর্ণ অস্থি বিশিষ্ট মানবদেহকে মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত করার ক্ষমতা রাখেন। এটি এমন একটি বিষয়, যাতে ঈমানদারগণ কোনোই সন্দেহ পোষণ করে না।
অবশ্য আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যাও হতে পারে। অর্থাৎ 'যাতে তারা জানতে পারে' বলতে গুহাবাসীগণকে বুঝানো হয়েছে। কেন না তাঁদের নিজেদের সম্পর্কে তাঁদের অবগত হওয়াটা তাঁদের সম্পর্কে অন্যের অবগত হওয়া অপেক্ষা অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী। আবার হতে পারে আয়াতে 'তারা জানতে পারে' বলতে সকলকেই বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন: "কেউ বলবে, ওরা ছিল তিনজন; ওদের চতুর্থটি ছিল ওদের কুকুর এবং কেউ বলবে, ওরা ছিল পাঁচজন; ওদের ষষ্ঠটি ছিল ওদের কুকুর। অজানা বিষয়ে অনুমানের ওপর নির্ভর করে। আবার কেউ কেউ বলবে, ওরা ছিল সাতজন; ওদের অষ্টমটি ছিল ওদের কুকুর।" তাঁদের সংখ্যা সম্পর্কে মানুষের তিনটি অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম দুটো অভিমত দুর্বল সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বুঝা যায়, তৃতীয় অভিমতটিই যথার্থ। এ ছাড়া অন্য কোনো মত থাকলে তা-ও উল্লিখিত হত। এ তৃতীয় মতটি যথার্থ না হলে তাও দুর্বল বলে চিহ্নিত করা হত। তাই তৃতীয় মতটিই সঠিক। তবে এ জাতীয় বিষয়ে বিতর্কে যেহেতু কোনো উপকারিতা নেই, সেহেতু আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে করণীয় শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ যখন এ জাতীয় বিষয়ে মতভেদ করবে, তখন তিনি যেন বলেন, 'আল্লাহই ভালো জানেন।' এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা বলেন, "বল আমার প্রতিপালকই ওদের সংখ্যা ভালো জানেন। ওদের সংখ্যা অল্প কয়েকজনই জানে।" "সাধারণ আলোচনা ব্যতীত তুমি ওদের বিষয়ে বিতর্ক করবে না।" অর্থাৎ সহজ ও স্বাভাবিক আলোচনা করুন। এ জাতীয় বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হবেন না। আর তাঁদের সম্বন্ধে কোনো মানুষকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। এ কারণে শুরুতে আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংখ্যা অস্পষ্ট রেখেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, "কখনও তুমি কোনো বিষয়ে বলবে না, আমি এটি আগামীকাল করব 'আল্লাহ ইচ্ছা করলে' কথাটি না বলে।" এটি একটি উচ্চস্তরের শিষ্টাচার। এটা আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ কোনো কাজ করতে চাইলে তার জন্যে শরিয়তের বিধান, সে 'ইনশাআল্লাহ' বলবে। যাতে এতে তার সুদৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পায়। কেন না আগামীকাল কি হবে তা তো বান্দা জানে না। সে এটাও জানে না, সে যে কাজটি করার সংকল্প করেছে তা তার তাকদিরে আছে কি-না? এই 'ইনশাআল্লাহ' শব্দটি শর্ত বলে গণ্য হবে না। বরং এটি তার দৃঢ় সংকল্প বলেই গণ্য হবে।
আল্লাহ তাআলার বাণী: "যদি ভুলে যাও তবে তোমার প্রতিপালককে স্মরণ কর!" কেন না, ভুলে যাওয়াটা কোনো কোনো সময় শয়তানের প্রভাবে হয়ে থাকে। তখন আল্লাহর স্মরণ অন্তর থেকে প্রভাব বিদূরিত করে দেয়। ফলে যা ভুলে গিয়েছিল, তা স্মরণে আসে। আল্লাহর বাণী: “এবং বল সম্ভবত আমার প্রতিপালক আমাকে এটি অপেক্ষা সত্যের নিকটতর পথ নির্দেশ করবেন।" অর্থাৎ যখন কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতা এসে যায় এবং লোকজনের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়, তবে আপনি আল্লাহ অভিমুখী হন, তিনি বিষয়টিকে আপনার জন্যে সহজ ও স্বাভাবিক করে দিবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, "তারা তাঁদের গুহায় ছিল তিনশ বছর, আরও নয় বছর।" তাঁদের সুদীর্ঘ কাল গুহায় অবস্থানের কথা উল্লেখ তাৎপর্যবহ। তাই আল্লাহ তাআলা এর উল্লেখ করেছেন। এখানে অতিরিক্ত নয় বছর হল চান্দ্র মাসের হিসাবে। সৌর বছরের ৩০০ বছর পূর্ণ করতে চান্দ্র মাসের হিসেবে অতিরিক্ত নয় বছরের প্রয়োজন হয়। কেন না, প্রতি ১০০ সৌর বছর থেকে ১০০ চান্দ্র বছরের সময়কাল তিন বছর কম হয়ে থাকে।
আল্লাহর বাণী: "বল, তারা কতকাল ছিল তা আল্লাহই ভালো জানেন।" অর্থাৎ এ জাতীয় কোনো বিষয়ে যদি আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করে আর আপনার নিকট সে বিষয়ে কোনো লিখিত প্রমাণ না থাকে, তবে বিষয়টি মহান আল্লাহর প্রতি সোপর্দ করে দিন। "আকাশরাজি ও পৃথিবীর অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই।" অর্থাৎ অদৃশ্য বিষয়ে অবগত তিনিই, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাঁকে তা অবগত করান; অন্য কাউকে নয়। "তিনি কত সুন্দর দ্রষ্টাও শ্রোতা।" অর্থাৎ তিনি সবকিছুকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। কেন না, তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে এবং সেগুলোর চাহিদা ও প্রয়োজন সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত। তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, "তিনি ব্যতীত ওদের অন্য কোনো অভিভাবক নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।” অর্থাৎ রাজত্বে, ক্ষমতায় ও কর্তৃত্বে আপনার প্রতিপালক একক, অনন্য। তাঁর কোনো শরীক ও অংশীদার নেই। (সূরা কাহাফ: ৯-২৬)