📄 নাম ও বংশ পরিচিতি
লোকমান বা লোকমান হাকীম আরববাসীদের নিকট একটি বিখ্যাত নাম ও ব্যক্তিত্ব। তাঁর অবস্থাবলী, খান্দান এবং বংশ-পরিচয় সম্বন্ধে বিভিন্ন উক্তি ও মতামত পাওয়া যায়। তিনি একজন মহান ও সুবিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ উক্তিসমূহ 'সহিফায়ে লোকমান' নামে আরবদের মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ ছিল। এতটুকু কথার ওপর সকলের ঐকমত্য রয়েছে। তবে অন্যান্য বিষয়সমূহে বিপরীতমুখী উক্তি পাওয়া যায়। প্রাচীনকালের ইতিহাসে লোকমান নামে আরও এক ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় আদ এর সম্প্রদায়ের একজন নেককার বাদশা। তিনি খাঁটি আরব বংশদ্ভূত। ইবনে জারীর, ইবনে কাসীর ও সুহাইলীর মতো বিখ্যাত ইতিহাসবিদগণের মতে লোকমান হাকীম ছিলেন আফ্রিকান লোক। তিনি আরব দেশে একজন ক্রীতদাসরূপে আগমন করেছিলেন। এ সমস্ত ইতিহাসবিদগণ তাঁর বংশ-পরিচয় এবং শারীরিক গঠন ও আকৃতি এরূপ বর্ণনা করেন: هُوَ لُقْمَانُ بْنُ عُنْقَا بْنُ سَنْدُونَ أَوْ لُقْمَانُ بْنُ ثَارِ بْنِ سُنْدُو "তিনি লোকমান ইবনে ওনকা ইবনে সান্দুন বা লোকমান ইবনে ছার ইবনে সান্দুন।" তাঁরা বলেন, তিনি সুদানের 'নাওবী' গোত্রদ্ভূত ছিলেন। খর্বাকৃতি, স্থূলকায় ও কৃষ্ণ বর্ণের ছিলেন। তাঁর ওষ্ঠাধার ছিল খুব মোটা এবং হাত-পাগুলি ছিল বিশ্রী; কিন্তু খুবই নেককার, এবাদতকারী, সংসারবিরাগী, বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান লোক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হেকমত ও জ্ঞানের বিরাট এক অংশ দান করেছিলেন। কেউ কেউ আবার বলেন, তিনি হযরত দাউদ আ.-এর যমানায় 'কাযির' পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
১। হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, লোকমান ছিলেন হাবশী গোলাম এবং করাতির কাজ করতেন। আর জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি. বলেন: লোকমান খর্বাকৃতি, পুরু ওষ্ঠাধরবিশিষ্ট এবং নাওবাহ গোত্রদ্ভূত ছিলেন। (রাওযুল আনফ: ১ম খণ্ড)
২। আবু সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব বলেন: লোকমান মিছরী-সুদানী ছিলেন। তাঁর ওষ্ঠাধর অত্যন্ত পুরু ছিল। আল্লাহ তাআলা যদিও তাঁকে নবুয়ত প্রদান করেন নি; কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি ও হেকমতের বিরাট অংশ দান করেছিলেন।
৩। আবদুর রহমান ইবনে হারমালা বলেন, একবার জনৈক হাবশী হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাবের কাছে কতিপয় প্রশ্ন করলে তিনি তাকে বললেন: তুমি এ বিষয়ে দুঃখিত হয়ো না, তুমি একজন কৃষ্ণকায় হাবশী। কেন না সুদানীদের মধ্যে তিন ব্যক্তি দুনিয়ায় অপেক্ষাকৃত উত্তম ব্যক্তি হয়েছেন: (১) হযরত বেলাল রাযি. (২) হযরত ওমর রাযি.-এর গোলাম মাহজা এবং (৩) হাকিম লোকমান, যিনি সুদানী এবং নাওবী ছিলেন। তাঁর ওষ্ঠাধর বেশ পুরু এবং কুৎসিত ছিল। (তারিখে ইবনে কাসীর)
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং ইসলামী জিহাদসমূহের ঘটনা লেখক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেন, লোকমান হাকিম আরবের বিখ্যাত আদ গোত্রদ্ভূত ছিলেন। অর্থাৎ বহিরাগত আরবদের বংশধর ছিলেন। গোলাম ছিলেন না; বাদশা ছিলেন।
"ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ বলেন, শাদ্দাদ ইবনে আদের মৃত্যু হলে শাসনদণ্ড তার ভ্রাতা লোকমান ইবনে আদের হস্তগত হয়। আল্লাহ তাআলা লোকমানকে এমন বস্তু দান করেছিলেন, তৎকালের লোকদের মধ্যে কাউকেও সেই বস্তু দান করেন নি। আল্লাহ তাআলা তাকে একশ লোকের সমান জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা তাঁকে দান করেছিলেন। তিনি তাঁর সমকালের লোকদের মধ্যে সকলের চেয়ে অধিক দীর্ঘাকৃতির ছিলেন।"
"ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বেহ বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলতেন, লোকমান ইবনে আদের বংশ পরিচয় হল মুলতাত ইবনে সালাক ইবনে ওয়ায়েল ইবনে হিমইয়ার। তিনি নবী ছিলেন, কিন্তু রাসূল ছিলেন না।" (কিতাবুত্তীজনা: ৭০)
মজার ব্যাপার হল, ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর নিজেদের মতের সমর্থনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. এর উক্তিই রেওয়ায়েত করছেন। ইবনে ইসহাকও তাঁরই উক্তিকে নিজের মতের সমর্থনে পেশ করছেন। সমসাময়িক ইতিহাসবিদগণের মধ্য হতে 'আরদুল কুরআনে'র লেখক বলেছেন, লোকমান হাকীম ও লোকমান বাদশা একই ব্যক্তি। তিনি দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের নেককার বাদশাগণের মধ্যে একজন অতি বড় বিজ্ঞানী ও অত্যন্ত জ্ঞানবান ছিলেন। আরবজাতির মধ্যে 'সহিফায়ে লোকমান' নামে যে গ্রন্থটি লোকমানের সাথে সম্পর্কিত ছিল, তা এ দ্বিতীয় আদ সম্প্রদায়ের লোকমানেরই ছিল। তিনি নিজের এ দাবির স্বপক্ষে বিভিন্ন প্রমাণসমূহের মধ্যে একটি প্রমাণ এটাও পেশ করেন, অজ্ঞ যুগের কবি সালমা ইবনে রবিয়ার নিম্নোক্ত কবিতাগুলি আমার এ দাবিকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ করছে:
"যমানার বিবর্তনসমূহ আতসাম গোত্রকে এবং এরপর ইয়ামানের বাদশা যা জাদওয়ানকে, জাশের ও মাআরেবের অধিবাসীগণকে এবং লোকমানের গোত্রকে ও তাকূনের অধিবাসীগণকে ধ্বংস করে দিয়েছে।”
এরপর বলেন, এ কবিতায় লোকমানের শুধু আরব হওয়াই প্রকাশ পায় না; 'সাবা' সম্প্রদায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বলেও বুঝা যায়। আর এ সমুদয় বিষয় আদে সানীর লোকমানের উপর প্রযোজ্য হতে পারে। ১৮ হিজরি সনে প্রাপ্ত আদ সম্প্রদায়ের একটি শিলালিপিতে লিখা ছিল— "আমাদের উপর সেই বাদশা রাজত্ব করছেন, যিনি হীনম্মন্যতা হতে বহু দূরে এবং দুশ্চরিত্র লোকদেরকে শাস্তি প্রদানকারী ছিলেন এবং হৃদের শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। উত্তম মীমাংসাসমূহ একটি কিতাবে লিখিত হত।" আমরা কি এ শেষোক্ত শব্দগুলি হতে— যা কাগজ নয়, শীলার উপর লিখিত পাওয়া গেছে— এই ফল বের করতে পারি না, "সহিফায়ে লোকমান'ই লোকমানের উত্তম মীমাংসাসমূহ, যা একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল? (আরদুল কুরআন: ১/১৮১-১৮২)
📄 কোরআন মাজিদে হযরত লোকমান আ.
কুরআন মাজিদে হযরত লোকমানের আলোচনা রয়েছে। পূর্ণ একটি সূরার নামও লোকমান রাখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَلَقَدْ اٰتَيْنَا لُقْمٰنَ الْحِكْمَةَ اَنِ اشْكُرْ لِلّٰهِ وَمَنْ يَّشْكُرْ فَاِنَّمَا يَشْكُرُ لِنَفْسِهٖ وَمَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِيٌّ حَمِيْدٌ (১২) وَاِذْ قَالَ لُقْمٰنُ لِابْنِهٖ وَهُوَ يَعِظُهٗ يٰبُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللّٰهِ اِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ (১৩) وَوَصَّيْنَا الْاِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ اُمُّهٗ وَهْنًا عَلٰى وَهْنٍ وَّفِصَالُهٗ فِيْ عَامَيْنِ اَنِ اشْكُرْ لِيْ وَلِوَالِدَيْكَ اِلَيَّ الْمَصِيْرُ (১৪) وَاِنْ جَاهَدَاكَ عَلٰٓى اَنْ تُشْرِكَ بِيْ مَا لَيْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوْفًا وَّاتَّبِعْ سَبِيْلَ مَنْ اَنَابَ اِلَيَّ ثُمَّ اِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَاُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُوْنَ (১৫) يٰبُنَيَّ اِنَّهَآ اِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِيْ صَخْرَةٍ اَوْ فِي السَّمٰوٰتِ اَوْ فِي الْاَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللّٰهُ اِنَّ اللّٰهَ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ (১৬) يٰبُنَيَّ اَقِمِ الصَّلٰوةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلٰى مَآ اَصَابَكَ اِنَّ ذٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْاُمُوْرِ (১৭) وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْاَرْضِ مَرَحًا اِنَّ اللّٰهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ (১৮) وَاقْصِدْ فِيْ مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ اِنَّ اَنْكَرَ الْاَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ (১৯)
"আমি লোকমানকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো তা করে নিজেরই জন্যে এবং কেউ অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, প্রশংসার্হ। স্মরণ কর, যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বলেছিল, হে ছেলে! আল্লাহর কোনো শরিক করো না, নিশ্চয়ই শিরিক চরম জুলুম। আমি তো মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। মা সন্তানকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দু বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট। তোমার পিতামাতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মানবে না; তবে পৃথিবীতে তাদের সাথে বসবাস করবে সৎভাবে আর যে বিশুদ্ধচিত্তে আমার অভিমুখী হয়েছে, তার পথ অবলম্বন করবে।
এরপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট এবং তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব। হে ছেলে! কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং সেটি যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মাটির নিচে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত। হে ছেলে! নামায কায়েম করবে, সৎকর্মের নির্দেশ দিবে আর অসৎকর্মে নিষেধ করবে এবং আপদে-বিপদে ধৈর্যধারণ করবে। এটিই তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ। অহংকার বলে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করবে না এবং পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। তুমি পা ফেলবে সংযতভাবে এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করবে। নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।”
📄 হাদিস পাকে হযরত লোকমান আ.
সুফিয়ান ছাওরী রহ. ইবনে আব্বাস রাযি. সূত্রে বলেন, লোকমান ছিলেন জনৈক আবিসিনীয় দাস। পেশায় নাজ্জার বা সূত্রধর। কাতাদা রহ. ইবনে যুবায়ের রাযি. সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: আমি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, লোকমান সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত আপনাদের অভিমত কি নাজ্জার বা সুত্রধর? তিনি বললেন, লোকমান ছিলেন খর্বাকৃতি এবং নূবী গোত্রস্থিত চ্যাপ্টা নাক বিশিষ্ট লোক। ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান ছিলেন মিসরীয় কৃষ্ণকায় লোক। তার ওষ্ঠাধর ছিল মোটা ও পুরু। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হিকমত ও প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন, নবুয়ত দান করেন নি।
উমর ইবনে কায়েস বলেন, লোকমান ছিলেন একজন কৃষ্ণকায় ক্রীতদাস। ঠোঁট দুটো পুরু, পা দুটো চ্যাপ্টা। তিনি যখন লোকজনকে উপদেশ দিচ্ছিলেন এমন সময় একজন লোক এসে বলল, আপনি না আমার সাথে অমুক অমুক স্থানে বকরি চরিয়েছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, তা হলে এখন যা দেখছি, এ পর্যায়ে আপনি উন্নীত হলেন কেমন করে? তিনি উত্তর দিলেন, সত্য বলা এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মৌনতা অবলম্বনের মাধ্যমে। এ বর্ণনাটি ইবনে জারীরের।
ইবনে আবী হাতিম আবদুর রহমান ইবনে আবী ইয়াযিদ ইবনে জাবির থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, লোকমান হাকীমের হেকমত ও প্রজ্ঞার বদৌলতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। তাঁর পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে দেখে বলল, আপনি কি অমুকের ক্রীতদাস ছিলেন না? আপনি কি পূর্বে বকরী চরাতেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, লোকটি বলেন, কিসে আপনাকে আমার দেখা এ পর্যায়ে উন্নীত করল? তিনি বললেন, তাকদিরের লিখন, আমানতদারী, সত্যবাদিতা ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন।
আফরার আযাতকৃত দাস ওমর থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি লোকমান হাকীমের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, আপনি তো বনি নুহাস গোত্রের ক্রীতদাস লোকমান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকটি বলল, আপনি সেই কৃষ্ণকায় বকরি চরানো ব্যক্তিই তো? তিনি বললেন, আমার কালোবর্ণ বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার কোন বিষয়টি আপনাকে বিস্মিত করছে? সে বলল, এই যে লোকজন আপনার কাছে জড়ো হচ্ছে, আপনার দরজা ওদেরকে আচ্ছাদিত করছে এবং আপনার বক্তব্যে তারা প্রীতও হচ্ছে—এসব। লোকমান বললেন, ভাতিজা! আমি তোমাকে যা বলব, তুমি যদি তা কর, তবে তুমিও আমার মতো হতে পারবে। সে বলল, তা কী? লোকমান বললেন, আমি আমার দৃষ্টি অবনত রাখি। আমি আমার জিহবা সংযত রাখি। আমি আমার পানাহার ও যৌনাচারের ব্যাপারে আমি সংযম অবলম্বন করি। আমি আমার দায়িত্ব পালন করি। অঙ্গীকার পূরণ করি। মেহামানদের সম্মান করি। প্রতিবেশীদের হক আদায় করি। অপ্রয়োজনীয় বিষয় বর্জন করি। এ কর্মগুলোই আমাকে এ পর্যায়ে উন্নীত করেছে, যা তুমি দেখতে পাচ্ছ।
ইবনে আবী হাতিম হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান হাকীমের আলোচনায় একদিন তিনি বললেন, তাঁর না ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবার-পরিজন, না ধন-সম্পদ, না কোনো বংশ-মর্যাদা, না কোনো বৈশিষ্ট্য। তবে তিনি ছিলেন সুঠামদেহী নীরবতা অবলম্বনকারী, চিন্তাশীল, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণকারী। দিনের বেলা তিনি কখনও ঘুমাতেন না, তাঁকে কেউ থুথু ফেলতে দেখেনি, দেখেনি কাশি দিতে, পেশাব-পায়খানা করতে, গোসল করতে কিংবা বাজে কাজকর্ম করতে এবং কেউ তাঁকে হাসতেও দেখেনি। খুব গভীর কোনো জ্ঞানের কথা না হলে বা কেউ জিজ্ঞাসা না করলে তিনি কখনও তাঁর বক্তব্য পুনঃউচ্চারণ করতেন না। তিনি বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর একাধিক সন্তানও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এদের মৃত্যুতে তিনি কাঁদেন নি। তিনি রাজা-বাদশা ও আমীর-উমরাদের নিকট যেতেন তাঁদের অবস্থা দেখার জন্যে, চিন্তা-ভাবনা করার জন্যে এবং ওদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্যে। ফলে তিনি এ মর্যাদার অধিকারী হন।
কেউ কেউ বলেন, তাঁকে নবুয়ত গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। তিনি নবুয়তের গুরুদায়িত্ব পালনে শঙ্কিত হন আর হিকমত তথা প্রজ্ঞাকেই বেছে নেন। কারণ, এটি ছিল তাঁর নিকট সহজতর। এ মন্তব্যের যথার্থতা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন। ইবনে আবী হাতিম ও ইবনে জারীর ইকরামার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, লোকমান নবী ছিলেন। তবে বর্ণনাটি দুর্বল বলে গণ্য করা হয়। অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে লোকমান ছিলেন প্রজ্ঞাময় ও বিচক্ষণ একজন ওলি। তিনি নবী ছিলেন না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে হযরত লোকমানের কথা উল্লেখ করে তাঁর প্রশংসা করেছেন। সেইসঙ্গে তাঁর প্রাণপ্রিয় ও স্নেহধন্য পুত্রকে যেসব উপদেশ দিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাও উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রথমে আপন পুত্রকে শিরিক করতে নিষেধ করলেন এবং সতর্ক করে দেন। এরপর তিনি সন্তানের ওপর পিতামাতার অধিকারের কথা, তারা মুশরিক হলেও তাদের প্রতি সদাচরণের কথা এবং তাদের দীন কবুল করার ব্যাপারে তাদের আনুগত্য না করার কথা উল্লেখ করেছেন।
এরপর হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে মানুষের প্রতি জুলুম করতে বারণ করেন। জুলুম যদিও সর্ষে দানা পরিমাণও হয়। কেন না আল্লাহ তাআলা জুলুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। জুলুমকে হিসাব নিকাশকালে হাজির করবেন এবং আমলের পাল্লায় রাখবেন। এর দ্বারা জানিয়ে দেওয়া হল, জুলুম দৃষ্টিতে তিল পরিমাণ ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ হলেও এবং তা দরজা জানালাহীন, এমনকি ছিদ্র বিহীন কঠিন পাথরের মধ্যে রাখা হলেও অথবা বিশাল ও বিস্তৃত এ অসীম আসমানের গহীন অন্ধকার স্থান থেকে কোনো বস্তুতে পতিত হলেও আল্লাহ তাআলা সেটি সম্পর্কে অবগত থাকেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী সম্যক অবহিত। আল্লাহ তাআলার ইলম অত্যন্ত সূক্ষ্ম। তাই সাধারণত যা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, সেই অণু পরিমাণ বিষয়ও তাঁর অগোচরে থাকে না।
ইমাম আহমদ রহ. আবু সাঈদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমাদের কেউ যদি দরজা ও ছিদ্রহীন পাথরের মধ্যেও কোনো আমল কর, তাও মানুষের সম্মুখে প্রকাশিত হয়ে পড়বে, আমলটি যে পর্যায়েরই হোক না কেন।"
এরপর হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে বললেন: হে বৎস! নামায কায়েম কর। অর্থাৎ সকল নিয়মনীতি সহকারে ফরয, ওয়াজিব, ওয়াক্ত, রুকু সিজদা, ধীর-স্থির ও বিনয় সব কিছুর প্রতি লক্ষ রেখে এবং এ সম্পর্কিত শরিয়তের নিষিদ্ধ বিষয়াদি পরিহার করে পূর্ণাঙ্গ রূপে নামায আদায় কর। এরপর তিনি বললেন, সৎকর্মের নির্দেশ দিবে এবং অসৎকর্মে নিষেধ করবে নিজের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী। হাতে তথা বলপ্রয়োগে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে বলপ্রয়োগে বাধা দেবে। নতুবা মুখে, তাতেও সমর্থ না হলে অন্তরে। এরপর পুত্রকে নির্দেশ দিলেন ধৈর্য ধারণের। কেন না সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে গেলে সাধারণত বাধা ও প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। তবে এর পরিণাম উৎকৃষ্ট। এটি সর্বজনবিদিত, সবুরে মেওয়া ফলে। তাই তিনি বলেন: এ তো দৃঢ় সংকল্পের কাজ, অপরিহার্যও বটে।
তিনি বললেন, অহংকার বশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না। মানুষের প্রতি অহংকারী হয়ো না। লোকজনের সাথে কথা বলার সময় তাদের প্রতি গর্বভরে ও অবজ্ঞা বশে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না। যেমনি ঘাড়ের রোগে আক্রান্ত উটের মাথা ঝুঁকে পড়ে। এরপর তিনি তাঁর পুত্রকে মানুষের সম্মুখে দম্ভ, অহংকার ও ঔদ্ধত্য সহকারে পথ চলতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ তুমি তোমার দ্রুতগতি সম্পন্ন পথ চলার সকল শহর, নগর অতিক্রম করে যেতে পারবে না, তোমার পদাঘাতে বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর তোমার বিশালত্ব অহংকার ও উচ্চতায় তুমি পাহাড়ের সমান উঁচুও হতে পারবে না। সুতরাং নিজের প্রতি তাকাও এবং বুঝে নাও, তুমি তোমার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যেতে পারবে না।
হাদিস শরিফে আছে, এক ব্যক্তি দুটো কাপড় পরে গর্বভরে পথ চলছিল। তখন আল্লাহ তাআলা তাকে ভূমিতে প্রোথিত করে দিলেন। কেয়ামত পর্যন্ত সে নিচের দিকে প্রোথিত হতে থাকবে। অপর হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: গোড়ালীর নিচ পর্যন্ত লুঙ্গি ঝুলিয়ে দেওয়া থেকে তুমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখ। কেন না তা অহংকারের পরিচায়ক। আল্লাহ তা পছন্দ করেন না। এরপর লোকমান তাঁর পুত্রকে মধ্যম গতিতে পথ চলতে নির্দেশ দিলেন। কারণ, পথ চলাতো লাগবেই। তিনি এ বিষয়ে পুত্রকে মন্দ দিক সম্পর্কে নিষেধ করলেন এবং কল্যাণকর দিকটি অবলম্বনের নির্দেশ দিলেন। বললেন, পথ চলতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে; খুব মন্থরগতি কিংবা খুব দ্রুতগতিতে নয় বরং মধ্যম গতিতে চলবে।
এরপর লোকমান তাঁর পুত্রকে বললেন: তুমি যখন কথা বলবে, তখন প্রয়োজনাতিরিক্ত উচ্চ স্বরে কথা বলবে না। কেন না সর্বোচ্চ এবং সর্বনিকৃষ্ট কণ্ঠস্বর হল গাধার স্বর। সহি বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাত্রি বেলায় গাধার ডাক শুনলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আউযুবিল্লাহ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কেন না গাধা শয়তানকে দেখতে পায়। এ জন্যেই বিনা প্রয়োজনে কণ্ঠস্বর উচ্চ করতে নিষেধ করেছেন। বিশেষত হাঁচি দেওয়ার সময়। হাঁচির সময় শব্দ নিচু রাখা এবং মুখ ঢেকে রাখা মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতেন বলে হাদিসে প্রমাণ রয়েছে। অবশ্য আযানের সময় উচ্চ স্বরে আযান দেওয়া, যুদ্ধের সময় উচ্চ স্বরে আহবান জানানো এবং বিপদ-আপদ ও মৃত্যুর আশঙ্কায় উচ্চস্বরে কাউকে ডাকা শরিয়তসম্মত।
হযরত লোকমান আ.-এর এসব প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য, কল্যাণকর ও অকল্যাণরোধক উপদেশাবলী আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে উল্লেখ করেছেন। হযরত লোকমান আ.-এর বিবরণ ও উপদেশাবলী সম্পর্কে আরও বহু বর্ণনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য সম্বলিত 'হেকমতে লোকমান' নামে একটি পুস্তক পাওয়া যায়। ইমাম আহমদ হযরত ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানালেন, লোকমান হাকীম বলতেন, আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু আমানতরূপে দিলে তিনি তা হেফাজতও করেন।
ইবনে আবী হাতিম কাসিম ইবনে মুখায়মারা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, "হে বৎস! হিম্মত ও প্রজ্ঞা দরিদ্রদেরকে রাজার আসনে বসিয়েছে।"
আওন ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত। লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! তুমি কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে ইসলামের রীতি অনুযায়ী সালাম করবে। তারপর মজলিসের এক পাশে বসে পড়বে। তাঁদের কথা বলার পূর্বে তুমি কোনো কথা বলো না। তারা আল্লাহর যিকির ও আল্লাহ সম্পর্কে আলোচনায় নিয়োজিত হলে তুমি তাঁদের সাথে আলোচনায় অংশ নিবে। তারা যদি অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করে, তবে তুমি তাঁদেরকে ত্যাগ করে অন্যদের কাছে চলে যাবে।
হাফস ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত। হযরত লোকমান আ. এক থলে সরিষা পাশে নিয়ে তাঁর পুত্রকে উপদেশ দিতে বসেছিলেন। একটি করে উপদেশ দিচ্ছিলেন আর একটি সরিষা থলে থেকে বের করছিলেন। এভাবে তাঁর সব সরিষা শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি বললেন, হে বৎস! আমি তোমাকে এমন উপদেশ দিলাম, কোনো পর্বতকে এ উপদেশ শুনালে ফেটে চৌচির হয়ে যেত। তাঁর পুত্রের অবস্থাও তাই হয়েছিল।
মালেক ইবনে দীনার থেকে বর্ণিত, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! তুমি ব্যবসা রূপে আল্লাহর ইবাদতকে বেছে নাও, তা হলে পুঁজি ছাড়াই লাভ পাবে। ইয়াযিদ মুহাম্মদ ইবনে ওয়াছি থেকে বর্ণনা করেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে লক্ষ্য করে প্রায়ই বলতেন, হে বৎস! আল্লাহকে ভয় কর। তোমার অন্তর কলুষিত থাকা অবস্থায় মানুষের শ্রদ্ধা অর্জনের জন্যে তুমি আল্লাহকে ভয় করার ভান কর না!
ইয়াযিদ বলেন, লোকমান ছিলেন একজন হাবশী ক্রীতদাস। পেশায় ছুতার। তাঁর মালিক তাঁকে একটি বকরি জবাই করতে বলেছিল। সে মতে তিনি একটি বকরি জবাই করেন। বকরির উৎকৃষ্টতম দুটো টুকরো আনতে মালিক তাঁকে নির্দেশ দেন। তিনি বকরিটির জিহবা ও হৃৎপিণ্ড নিয়ে আসেন। মালিক তাকে জিজ্ঞেস করল, এর চাইতে উৎকৃষ্ট কোনো অঙ্গ কি এ বকরিতে নেই? তিনি বললেন, না। মালিক কিছু সময় চুপ করে থাকার পর আবার তাঁকে বললেন, আমার জন্যে অপর একটি বকরি জবাই কর। তিনি তাঁর জন্যে অপর একটি বকরি জবাই করলেন। মালিক বললেন, এটির নিকৃষ্টতম টুকরো দুটো ফেলে দাও! তিনি বকরিটির জিহবা ও হৃৎপিণ্ড ফেলে দিলেন। মালিক বললেন, আমি তোমাকে উৎকৃষ্ট দুটো টুকরো আনতে বললাম, তুমি নিয়ে এলে জিহবা আর হৃৎপিণ্ড। আবার নিকৃষ্টতম দুটো টুকরা ফেলে দিতে বললাম, তুমি জিহবা আর হৃৎপিণ্ড ফেলে দিলে! এর রহস্য কি? লোকমান বললেন, জিহবা ও হৃৎপিণ্ড যতক্ষণ পবিত্র থাকে ততক্ষণ এ দু'টো অপেক্ষা উৎকৃষ্ট কিছু থাকে না। আর এ দুটো যখন কলুষিত হয়, তখন এ দুটো অপেক্ষা ঘৃণিত অন্য কিছু থাকে না।
দাউদ ইবনে রশীদ আবু উছমান রহ. এর সূত্রে বলেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, মূর্খদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনে আগ্রহী হয়ো না। তা হলে সে মনে করবে, তার কর্মে তুমি সন্তুষ্ট। বিজ্ঞ ব্যক্তিদের অসন্তুষ্টিকে তুচ্ছ ভেব না। তা হলে সে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে।
দাউদ ইবনে উসায়দ আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদের সূত্রে বলেন, লোকমান বলেছেন: জেনে রাখ! প্রজ্ঞাবানদের মুখে আল্লাহ পাকের হাত থাকে। তিনি যা তৈরি করে দেন, তা ব্যতীত তারা কথা বলেন না।
আবদুর রাযযাক বলেন, তিনি ইবনে জুরায়েজকে বলতে শুনেছেন, আমি রাতে মাথা ঢেকে রাখতাম। ওমর রাযি. আমাকে বললেন, তুমি রাতে মাথা ঢেকে রাখ কেন? তুমি কি জান না, লোকমান আ. বলেছেন, দিনের বেলা মাথা ঢেকে রাখা অপমানজনক এবং রাত্রে তা ওযর বা অপারগতার নিদর্শন। তা হলে তুমি রাতে মাথা ঢাক কেন? তখন আমি তাঁকে বললাম, লোকমান আ.-এর তো কোনো ঋণ ছিল না। সুফিয়ান বলেন, লোকমান তার পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! নীরবতা অবলম্বন করে আমি কখনো লজ্জিত হই নি। কথা বলা যদি রূপা হয়, তবে নীরব থাকা হচ্ছে সোনা।
আবদুস সামাদ কাতাদা সূত্রে বলেন, লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন, হে বৎস! মন্দ থেকে দূরে থাক। তা হলে মন্দ তোমার থেকে দূরে থাকবে। কেন না মন্দের জন্যেই মন্দের সৃষ্টি। আবু মুআবিয়া উরওয়ার সূত্রে বলেন: হযরত লোকমানের প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্যে আছে, হে বৎস। অতিরিক্ত মাখামাখি পরিহার করবে। কেন না, অতিরিক্ত মাখামাখি ঘনিষ্ঠজন থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং প্রজ্ঞাকে বিলুপ্ত করে দেয়। হে বৎস! অতি ক্রোধ বর্জন করবে। কেন না, তা প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির অন্তঃকরণকে ধ্বংস করে দেয়।
ইমাম আহমদ উবায়দ ইবনে উমায়েরের সূত্রে বলেন, লোকমান আ. তার পুত্রকে নসিহত করেন, হে বৎস! দেখে-শুনে মজলিস বেছে নেবে। যদি এমন মজলিস দেখ, যেখানে আল্লাহর যিকির হয়, তবে তুমি তাঁদের সাথে সেখানে বসবে। কেন না, তুমি নিজে জ্ঞানী হলে তোমার জ্ঞান তোমার উপকার করবে; তুমি মূর্খ হলে মজলিসের লোকেরা তোমাকে জ্ঞান দান করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের ওপর রহমত নাযিল করলে তাঁদের সাথে তুমিও রহমতের অংশ পাবে। হে বৎস! যে মজলিসে আল্লাহর যিকির হয় না, সে মজলিসে বসবে না। কেন না, তুমি নিজে জ্ঞানী হলে তখন তোমার জ্ঞান তোমার কোনো উপকার করবে না। আর তুমি যদি মূর্খ হও তারা তোমার মূর্খতা আরও বৃদ্ধি করে দিবে। উপরন্তু আল্লাহ তাঁদের ওপর কোনো গযব নাযিল করলে তাঁদের সাথে তুমিও গযবে পতিত হবে। হে বৎস! ঈমানদারের রক্তপাতকারী শক্তিমান ব্যক্তিকে ঈর্ষা করো না। কেন না, তার জন্যে আল্লাহর নিকট এমন ঘাতক রয়েছে, যার মৃত্যু নেই।
আবু মুয়াবিয়া উরওয়া রহ. সূত্রে বলেন, 'আলহিকমাহ' গ্রন্থে রয়েছে, হে বৎস! তুমি ভালো কথা বলবে এবং হাসিমুখে থাকবে। তা হলে দানশীল ব্যক্তিদের তুলনায় তুমি মানুষের নিকট অধিকতর প্রিয় হবে। তিনি আরও বলেন, 'আলহিকমাহ' গ্রন্থে বা তাওরাতে আছে, নম্রতা হল প্রজ্ঞার মস্তক স্বরূপ। তুমি যেমন দয়া করবে, তেমন দয়া পাবে। তিনি আরও বলেছেন, হিকমত গ্রন্থে আছে, যেমন বপন করবে তেমন ফসল তুলবে। তোমার বন্ধুকে এবং তোমার পিতার বন্ধুকে ভালোবাসবে।
আবদুর রাযযাক আবু কিলাবা সূত্রে বলেন, লোকমান আ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কোন ব্যক্তি অধিক ধৈর্যশীল? তিনি বললেন: যে ধৈর্যের যার পরে কষ্ট দেওয়া হয় না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, কোন ব্যক্তি সর্বাধিক জ্ঞানী? তিনি বললেন: যে অন্যের জ্ঞান দ্বারা নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করে। বলা হল, কোন লোক উত্তম? তিনি বললেন, ধনী ব্যক্তি। বলা হল, প্রাচুর্যের অধিকারী, সম্পদে প্রাচুর্য? তিনি বললেন: না, বরং আমি সে ব্যক্তিকে বুঝিয়েছি, যার কাছে কোনো কল্যাণ চাওয়া হলে তা পাওয়া যায়। তা না হলে অন্তত সে অন্যের দ্বারস্থ হয় না। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন, লোকমান আ.-কে বলা হল, নিকৃষ্টতম ব্যক্তি কে? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি এ কথার পরোয়া করে না, লোকে তাঁকে মন্দ কার্যে লিপ্ত দেখবে।
আবু সামাদ মালিক ইবনে দীনার সূত্রে বলেন, প্রজ্ঞাপূর্ণ কথার মধ্যে আমি এটা পেয়েছি, মানুষের খেয়াল-খুশি ও কুপ্রবৃত্তি সম্পর্কে সমাজের উপরতলার যে সকল লোক আলাপ-আলোচনা করে আল্লাহ তাঁদেরকে ধ্বংস করে দেন। আমি তাতে আরো পেয়েছি, তুমি যা জানো তা আমল না করে, যা জানো না তা জানার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। এটি তো সে ব্যক্তির মতো, যে কাঠ সংগ্রহ করে বোঝা বাঁধে। তারপর তা মাথায় তুলে নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। তারপর গিয়ে আরো কাঠ সংগ্রহ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ আবু সাঈদ রহ. সূত্রে বলেন, হযরত লোকমান তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন হে বৎস। পরহেযগার ব্যক্তিরাই যেন তোমার খাদ্য খায় এবং তোমার কাজকর্মে বিজ্ঞজনদের পরামর্শ নিও। এ বিষয়ে ইমাম আহমদ রহ. যা বর্ণনা করেছেন, এগুলো হচ্ছে তার সারসংক্ষেপ। আল্লাহই ভালো জানেন।
ইবনে আবি হাতিম কাতাদা রহ. এর সূত্রে বলেন, আল্লাহ তাআলা লোকমান হাকীমকে নবুয়ত ও হেকমতের যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দিয়েছিলেন। তিনি নবুয়তের পরিবর্তে হেকমত গ্রহণ করেন। তারপর জিবরাঈল আ. তাঁর নিকট এলেন। তিনি তখন নিদ্রামগ্ন। জিবরাঈল আ. তাঁর নিকট হেকমতের বারি বর্ষণ করেন। এরপর থেকে তিনি হেকমতপূর্ণ কথা বলতে শুরু করেন। সাদ বলেন, আমি কাতাদা রহ.-কে বলতে শুনেছি, লোকমানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি নবুয়ত না নিয়ে হেকমত নিলেন কেন? আপনাকে তো এ দুটোতেও আপনার প্রতিপালক ইখতিয়ার দিয়েছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমাকে যদি বাধ্যতামূলকভাবে নবুয়ত দেওয়া হত, তা হলে আশা করি, আমি ওই দায়িত্ব পালনে সাফল্য লাভ করতাম। কিন্তু আমাকে যখন যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার ইখতিয়ার দেওয়া হল, তখন আমি নবুয়তের গুরুদায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে যাব বলে আশঙ্কা করলাম। তাই হেকমতই আমার নিকট প্রিয়তর মনে হল। এ বর্ণনাটি সংশয়মুক্ত নয়। সায়্যিদ ইবনে কাথিরের বর্ণনা সম্পর্কে হাদিসবেত্তাগণের বিরূপ সমালোচনা রয়েছে। উপরন্তু সাঈদ ইবনে আবি আরূবা কাতাদা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন: হেকমত অর্থ, প্রজ্ঞা ও ইসলাম। তিনি নবী ছিলেন না, তাঁর প্রতি ওহি অবতীর্ণ হয়নি। পূর্ববর্তী কালের ওলামায়ে কেরামও স্পষ্টভাবে তা বলেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
📄 হেকমতপূর্ণ বাণী
আরবদেশে তৎকালে লোকমানের হেকমতের যথেষ্ট চর্চা ছিল। তারা অধিকাংশ মজলিসে লোকমানের জ্ঞানগর্ভ উক্তিসমূহ উদ্ধৃত করে থাকত। তাবেয়িন, সাহাবায়ে কেরাম, এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতেও এ সম্বন্ধীয় কতিপয় জ্ঞানবাণী নকল করা হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হল:
১. হেকমত ও বুদ্ধিমত্তা দরিদ্রকে রাজা করে দেয়।
২. কোনো মজলিসে প্রবেশ করলে প্রথমে সালাম করবে। এরপর একপার্শ্বে বসে পড়বে। মজলিসের লোকদের কথা না শুনা পর্যন্ত নিজের কথা আরম্ভ করবে না। 'যদি তারা আল্লাহ তাআলার যিকিরে মশগুল থাকে, তবে তুমিও তাতে অংশগ্রহণ করবে। আর যদি তারা বেহুদা কাজে মশগুল থাকে, তবে সেখান থেকে পৃথক হয়ে অন্য কোনো ভালো মজলিসে চলে যাবে।
৩. আল্লাহ তাআলা যদি কাউকেও আমানতদার বানান, তবে তার ওপর সেই আমানতের হেফাযত করা ফরয।
৪. হে বৎস! আল্লাহ তাআলাকে ভয় কর। রিয়াকারীর সাথে (লোকদেখানোভাবে) আল্লাহ তাআলার ভয় প্রকাশ করো না— যাতে লোকে তোমার সম্মান করবে, অথচ তোমার অন্তর প্রকৃতপক্ষে গুনাহগার।
৫. হে বৎস! মূর্খের সাথে বন্ধুত্ব করো না, যাতে সে মনে করবে, তুমি তার মূর্খতাসুলভ আচরণ পছন্দ কর। জ্ঞানী ব্যক্তির গোসসা ও অসন্তোষের প্রতি বেপরোয়া ভাব প্রকাশ করো না, পাছে না তুমি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়।
৬. জ্ঞানী লোকদের মুখে খোদাপ্রদত্ত শক্তি থাকে। কোনো বিষয় আল্লাহ তাআলা যেরূপ করতে ইচ্ছা করেন, তাঁরা তদ্রুপই বলে থাকেন।
৭. হে বৎস! নীরবতা অবলম্বনে কখনো অনুতপ্ত এবং লজ্জিত হতে হয় না। কথা বলা যদি রৌপ্য হয় তবে নীরবতা অবলম্বন স্বর্ণ স্বরূপ।
৮. হে বৎস! সর্বদা মন্দ কাজ হতে দূরে থাক! তা হলে মন্দ কাজও তোমার থেকে দূরে থাকবে। কেন না মন্দ হতে মন্দ উৎপন্ন হয়ে থাকে।
৯. হে বৎস! ক্রোধ ও গোসসা হতে আত্মরক্ষা কর। কেন না অতিরিক্ত গোসসা জ্ঞানী লোকের অন্তরকে মুর্দা করে ফেলে।
১০. হে বৎস! মধুরভাষী হও। সদা হাস্যময় চেহারা ধারণ কর। তবে তুমি মানুষের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তির চেয়েও অধিক প্রিয় হয়ে যাবে, যে ব্যক্তি তাঁদেরকে সর্বক্ষণ দান-দক্ষিণা প্রদান করে থাকে।
১১. নম্রস্বভাব বুদ্ধিমত্তার মূল।
১২. যা বপন করবে তাই কাটবে।
১৩. নিজের ও নিজের পিতার বন্ধুকে ভালোবাসবে।
১৪. কেউ লোকমানকে জিজ্ঞাসা করল, সর্বপেক্ষা অধিক ছবরকারী কোন ব্যক্তি? তিনি উত্তর করলেন, যার ছবর করার পিছনে কষ্টপ্রদান করা উদ্দেশ্য না হয়। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম কে? তিনি উত্তর করলেন, যে ব্যক্তি অন্যান্য আলেমদের ইলম দ্বারা নিজের ইলম বাড়াতে থাকে। সে পুনরায় প্রশ্ন করল, সর্বপেক্ষা উত্তম মানুষ কে? তিনি বললেন "অভাবমুক্ত লোক"। প্রশ্নকারী পুনরায় বলল, 'অভাবমুক্ত' বলতে কি ধনবান লোক উদ্দেশ্য? উত্তরে তিনি বললেন: না, বরং অভাবমুক্ত সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে মঙ্গল ও সৎগুণ তালাশ করলে তা বিদ্যমান দেখতে পায়। অন্যথায় সে নিজেকে অপর হতে অমুখাপেক্ষী রাখে।
১৫. কেউ জিজ্ঞাসা করল, নিকৃষ্টতম মানুষ কে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি এ পরোয়া করে না, লোকে তাঁকে মন্দকার্য করতে দেখলে মন্দ বলবে।
১৬. হে বৎস! তোমার দস্তরখানে যদি সর্বদা নেককার লোকদের সমাবেশ থাকে তো উত্তম। আর পরামর্শ শুধু ওলামায়ে হক থেকেই গ্রহণ কর!