📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর কতল
বনি ইসরাঈলের নবীগণের মধ্যে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের যুগ চলছিল। সেকালে ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওয়ায নসিহতের সুফলে বনি ইসরাঈলদের অন্তরসমূহ ক্রমশ বশীভূত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি যেদিকে বের হতেন, দলে দলে মানুষ তাঁর কাছে পঙ্গপালের মতো লুটিয়ে পড়ত। অপরদিকে ইহুদিদের বাদশা হীরোদেস খুবই অসৎ ও যালেম ছিল। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে গেল। ভয় করতে লাগল, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হস্তচ্যুত হয়ে পাছে না এ হেদায়েতকারী ব্যক্তির হাতে চলে যায়।
ঘটনাক্রমে একদিন হীরোদেসের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ইনতেকাল হয়ে গেল। তার স্ত্রী ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। সে হীরোদেসের ভাবী হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিল। হীরোদেস তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল এবং তাকে বিবাহ করে ফেলল। কিন্তু এ বিবাহ যেহেতু ইসরাঈলী ধর্মে শরিয়তবিরোধী ছিল। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. পূর্ণ রাজদরবারের সমক্ষে তাকে তিরস্কার করলেন এবং আল্লাহ তাআলার আযাবের ভয় প্রদর্শন করলেন। হীরোদেসের প্রেয়সী এটা শুনে চিন্তায় ও ক্রোধে অধীর হয়ে পড়ল এবং ইয়াহইয়া আ.-কে কতল করে ফেলার জন্য হীরোদেসকে প্রস্তুত করে নিল। অবশ্য হীরোদেসও ভরা দরবারে এ নসিহত করার কারণে ইয়াহইয়া আ.-এর উপর তেলে-বেগুনে জ্বলছিল; কিন্তু কতল করা সম্বন্ধে ইতস্তত করছিল। বাদশা স্ত্রীর অনুরোধে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলে। তার পর তাঁর মাথা কেটে একটি থালার মধ্যে রেখে প্রেয়সীর নিকট পাঠিয়ে দিল।
অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হল, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও কোনো ইসরাঈলীরই সাহস হল না, হীরোদেসের এ অভিশপ্ত কাজের জন্য তাকে বাধা প্রদান করবে বা তাকে তিরস্কার করবে। বরং একটি দল তার এ অভিশপ্ত কাজটিকে সুনজরে দেখল। এখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর শহিদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত এবং তবলিগের সময় আসল। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত ও মুশরিকী রসম, যালেম-শৈরাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন। কিন্তু ইহুদিদের মধ্যে এ যোগ্যতা কোথায় ছিল, তাঁর সত্যের ডাকে সাড়া দিবে? ফলে অতি সামান্য কজন লোক ব্যতীত তাদের বিরাট দলই তাঁর বিরোধিতা শুরু করল। ইতঃমধ্যে নাবতী বাদশা হারেস- যিনি হিরোদেসের প্রথমা স্ত্রীর পিতা অর্থাৎ তার শ্বশুর ছিলেন, তাঁর রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং ভীষণ রক্তারক্তির পর হীরোদেসকে পরাস্ত করলেন। এ পরাজয় হিরোদেসের শক্তির অবসান ঘটাল। তথাপি ইহুদিরা বলত, হীরোদেস ও বনি ইসরাঈলদের এ অপমান ও পরাজয় হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করার প্রতিফলেই ঘটেছিল। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তারা এ ঘটনা হতে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে নি। তারা তাদের জুলুম এবং অত্যাচারমূলক কার্যাবলী হতে বিরত হয় নি।
📄 হযরত ইয়াহইয়া আ. কোথায় নিহত হন
হযরত ইয়াহইয়া আ. কোন স্থানে নিহত হয়েছিলেন, এ সম্পর্কে মতভেদ আছে। কারো মতে বায়তুল মুকাদ্দাসের ভিতরে; কারও মতে মসজিদের বাইরে অন্য কোথাও। সুফিয়ান ছাওরী রহ. বলেন: বায়তুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে যে ঐতিহাসিক পাথর আছে, সেখানে সত্তরজন নবীকে হত্যা করা হয়। ইয়াহইয়া আ. তাঁদের অন্যতম।
আবু উবায়দ হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ. থেকে বর্ণনা করেন, বুখতে নসর যখন দামিশকে অভিযানে আসে, তখন ইয়াহইয়া আ.-এর রক্ত মাটির নিচ থেকে উপরের দিকে উত্থিত হতে দেখতে পায়। সে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে লোকজন প্রকৃত ঘটনা জানায়। তখন বুখতে নসর এ রক্তের উপরে সত্তর হাজার বনি ইসরাঈলকে জবাই করে। ফলে রক্ত উঠা বন্ধ হয়ে যায়। এ বর্ণনার সূত্রে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ. পর্যন্ত সহি। এ বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াহইয়া আ. এর হত্যাস্থল দামিশক। আর বুখত নসরের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হযরত ঈসা মাসীহ আ.-এর পরে।
ইবনে আসাকির হযরত যায়েদ ইবনে ওয়াকিদ থেকে বর্ণনা করেন, তার আমলে দামিশকের মসজিদ পুনঃনির্মাণের সময় হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর মস্তক বের হয়ে পড়ে। আমি তা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। মসজিদের পূর্ব দিকের মিহরাবের নিকট কিবলার যে দেয়াল ছিল, তার নিচ থেকে ওই মস্তক বের হয়েছিল। মস্তকের চামড়া ও চুল অক্ষত ছিল। এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, মস্তকটি দেখে মনে হয় যেন এই মাত্র কর্তন করা হয়েছে। এরপর উক্ত মসজিদের সাকাসিকা' নামক প্রসিদ্ধ স্তম্ভের নিচে মস্তকটি দাফন করা হয়।
সাঈদ ইবনে আবদিল রহ. বলেছেন, উক্ত রক্ত ছিল সমস্ত নবীদের মিশ্রিত রক্ত। মাটির তলদেশ থেকে সর্বদা উথলে উঠত এবং বাইরে গড়িয়ে যেত। হযরত আরমিয়া আ. সে স্থানে দাঁড়িয়ে রক্তকে সম্বোধন করে বলেন, 'হে রক্ত! বনি ইসরাঈল তো শেষ হয়ে গেছে! আল্লাহর হুকুমে এখন থাম।' এরপর রক্ত থেমে যায়। বুখত নসর এরপর হত্যাকাণ্ড বন্ধ করে এবং তলোয়ার গুটিয়ে নেয়। তার এ অভিযানকালে দামিশকের বহু লোক পালিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে চলে যায়। বুখত নসর তাদেরকে ধাওয়া করে সেখানে গিয়েও হত্যা করে। কত লোক যে এ অভিযানে তার হাতে নিহত হয়েছিল, তার কোনো ছিল না।