📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 নাম ও বংশ পরিচয়

📄 নাম ও বংশ পরিচয়


হযরত ইয়াহইয়া আ. ছিলেন হযরত যাকারিয়া আ.-এর পুত্র এবং তাঁর পয়গম্বরি দোয়ার সুফল। তাঁর নাম আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত। এটি এমন এক নাম যা তাঁর বংশে ও খান্দানে ইতঃপূর্বে আর কারো রাখা হয় নি। যেমন কুরআন মাজিদ বলে:
يَا زَكَرِيَّا إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ اسْمُهُ يَحْيَى لَمْ نَجْعَلْ لَهُ مِنْ قَبْلُ سَمِيًّا
"হে যাকারিয়া! আমি নিঃসন্দেহে তোমাকে সুসংবাদ প্রদান করছি এক পুত্রের, তার নাম ইয়াহইয়া হবে। এর পূর্বে কারো জন্য আমি এ নাম নির্ধারিত করি নি।" (সূরা মারিয়াম: রুকু: ১)

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 জীবনের তথ্যাবলী

📄 জীবনের তথ্যাবলী


মালেক ইবনে আনাস রাযি. বলেন, ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া আ. এবং ঈসা ইবনে মারিয়াম আ. উভয়ের মাতৃগর্ভে আগমন একই যমানায় হয়েছিল। সালাবি রহ. বলেন, ঈসা আ. মাতৃগর্ভে আগমনের ছয় মাস পূর্বে হযরত ইয়াহইয়া আ. মাতৃগর্ভে আগমন করেন। (ফতহুল বারী: ৬/৩৬৪) আর লুকার ইঞ্জিলে আছে, যখন হযরত যাকারিয়া আ.-এর স্ত্রী ইয়াশা ছয় মাসের গর্ভবতী, তখন ফেরেশতা জিবরাইল আ. মারিয়াম আ.-এর নিকট এসে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং ঈসা আ.-এর জন্ম সম্বন্ধে তাঁকে সুসংবাদ প্রদান করলেন- 'তোমার আত্মীয় ইয়াশারও বৃদ্ধবয়সে পুত্র হবে। ছয় মাস পূর্বে পর্যন্ত তাকে বন্ধ্যা বলা হত।' গত ছয় মাস যাবৎ সে আর বন্ধ্যা নয় বরং গর্ভে সন্তান ধারণ করেছে। এ সমস্ত রেওয়ায়েতের সারমর্ম হল, হযরত ইয়াহইয়া আ. বয়সে হযরত ঈসা আ. হতে ছয় মাসের বড় ছিলেন।

হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জন্মলাভের জন্য যখন হযরত যাকারিয়া আ. দুআ করেছিলেন, তখন সেই দুআয় তিনি বলেছিলেন, সেই সন্তান যেন নেকস্বভাব ও সৎপ্রকৃতির পুত্র হয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করলেন। সুতরাং হযরত ইয়াহইয়া আ. সমস্ত নেককারদের সরদার এবং সংসার বিমুখতা ও খোদাভীতিতে অনুপম ছিলেন। তিনি বিবাহ করেন নি। তাঁর অন্তরে কোনো সময় কোনো পাপ কার্যের চিন্তাও উদিত হয় নি। নিজ বুযুর্গ পিতার মতো তিনিও আল্লাহ পাকের মনোনীত নবী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা শৈশবকালেই তাঁকে ইলম ও হেকমতে পরিপূর্ণ করে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সর্বপ্রধান কাজ ছিল, তিনি ঈসা আ.-এর আগমনের সুসংবাদ প্রদান করতেন। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে তিনি হেদায়েত ও সৎপথ প্রদর্শনের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেন:
فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ
“এরপর যখন যাকারিয়া আ. নামাযে রত ছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে সম্বোধন করে বললেন, হে যাকারিয়া! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে এক সন্তান ইয়াহইয়া-এর সুসংবাদ দিচ্ছেন। যিনি আল্লাহর কালেমা (ঈসা)-এর (আগমনের) সুসংবাদ প্রদান করবেন। আর তিনি আল্লাহ তাআলার ও তাঁর বান্দাগণের দৃষ্টিতে সম্মানিত এবং যাবতীয় পাপকার্য হতে পবিত্র হবেন। আর নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (আলে-ইমরান : রুকু : ৪)

জীবনচরিত গ্রন্থসমূহে এ স্থলের ‘সাইয়েদ’ শব্দের বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: ‘হালীম’ তথা ধৈর্যশীল, ‘আলেম’ তথা জ্ঞানী, ‘ফকিহ’ তথা ধর্ম বিধানসমূহের বিশারদ, ধর্মীয় ও পার্থিব নেতা, মুন্সি, পরহেজগার, আল্লাহ তায়ালার নিকট পছন্দনীয় এবং মনোনীত। অতঃপর حصور শব্দের বিভিন্ন প্রকার অর্থ বর্ণিত হয়েছে। এমন ব্যক্তি যে কখনও স্ত্রী জাতির কাছেও যায় নি। যে ব্যক্তি সৎকর্মের পারদর্শীতায় কাল অতিবাহিত করে সুরক্ষিত এবং তাঁর অন্তরে কোনো সময় পাপ কার্যের চিন্তা উদিত হয় নি। যে ব্যক্তির নফস সম্পূর্ণরূপে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে এবং নফসের প্ররোচনাকে দমন করে রেখেছে। (তাফসিরে ইবনে কাসীর : ২/৩৬১)

অবশ্য কারো কারো মতে حصور শব্দের অর্থ পুরুষত্ব শক্তি হতে বঞ্চিত। কিন্তু এ অর্থ এ স্থলে একদম বাতিল। কেননা এ অর্থটি পুরুষের জন্য প্রশংসনীয় নয় বরং ত্রুটি ও দোষ জ্ঞাপক। এ কারণেই ওলামাগণ নিজ নিজ তাফসীরসমূহে একে প্রত্যাখ্যানযোগ্য সাব্যস্ত করেছেন। অবশ্য পুরুষত্ব শক্তি বহাল থাকা সত্ত্বেও এর উপর নিয়ন্ত্রণক্ষমতা লাভের জন্য আল্লাহ তাআলার মনোনীত বান্দার সর্বদা দুটি পন্থা রয়েছে। একটি হল নিঃসঙ্গতা এবং সংসারবিরাগী হয়ে আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া এবং আল্লাহ তাআলার পথে চেষ্টা ও পরিশ্রম করা ও নফসকে দাবিয়ে রাখা, যেন তা বিগড়ে যেতে দেওয়া না হয়। ঈসা আ.-এর জীবনে এ দিকটি সুস্পষ্ট। আর ইয়াহইয়া আ.-এর মধ্যে আল্লাহ তাআলা এ গুণটি বিনা চেষ্টায় ও পরিশ্রমে অর্থাৎ সাধ্য-সাধনা ব্যতিরেকে সৃষ্টিগতভাবে দান করেছিলেন। আর দ্বিতীয় পন্থাটি হল নফসকে একভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা, যাতে কোনো সময় মুহূর্তের জন্যও অন্যায় গতিবিধিতে আসার চিন্তাও বাকি না থাকে, কিন্তু মানব বংশ বৃদ্ধির জন্য বৈবাহিক জীবন অবলম্বন করা হয়।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 নসিহত

📄 নসিহত


ইমাম আহমদ হযরত হারেস আনসারী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া আ.-কে পাঁচটি আমল করতে এবং বনি ইসরাঈলকেও আমল করার নির্দেশ দিয়ে অহি নাযিল করেন। হযরত ইয়াহইয়া আ. সেটি পৌঁছাতে একটু বিলম্ব করেছিলেন। তখন ঈসা আ. তাঁকে বলেছিলেন, আল্লাহ তোমাকে পাঁচটি বিষয়ে আমল করতে ও বনি ইসরাঈলকে আমল করার হুকুম করতে আদেশ পাঠিয়েছিলেন। বনি ইসরাঈলের নিকট এ সংবাদ তুমি পৌঁছিয়ে দেবে, না আমি গিয়ে পৌঁছিয়ে দেব? হযরত ইয়াহইয়া আ. বললেন, ভাই! তুমি যদি পৌঁছিয়ে দাও, তা হলে আমার আশঙ্কা হয়, আমাকে হয় শাস্তি দেওয়া হবে, না হয় মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেওয়া হবে। এরপর হযরত ইয়াহইয়া আ. ইসরাঈলিদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাসে সমবেত করলেন। মসজিদ লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। হযরত ইয়াহইয়া আ. সম্মুখ দিকের উঁচু স্থানে বসলেন। প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি জানালেন। এরপর বললেন, আল্লাহ পাঁচটি বিষয়ের হুকুম করেছেন। আমাকে সেগুলো আমল করতে বলেছেন এবং তোমাদেরকেও আমল করার আদেশ দিতে বলেছেন। যথা-

এক. তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।
দুই. আমি তোমাদেরকে নামাযের আদেশ দিচ্ছি। কেননা আল্লাহ বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ অব্যাহত রাখেন, যতক্ষণ বান্দা অন্য দিকে ফিরে না তাকায়। অতএব যখন তোমরা নামায আদায় করবে, তখন অন্য দিকে তাকাবে না।
তিন. রোযা পালন করার জন্যে আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা যে ব্যক্তি রোযা পালন করে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন ব্যক্তির মতো, যে একটি দলের মধ্যে অবস্থান করছে। তার নিকট মেশকের একটি কৌটা আছে। আর ওই মেশকের সুঘ্রাণ দলের প্রতিটি লোক পাচ্ছে। আর শোনো! রোযা পালনকারীর মুখে দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের চেয়ে অধিকতর সুঘ্রাণ হিসেবে বিবেচিত।
চার. দান-সদকা করার জন্যে আমি তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছি।
পাঁচ. আল্লাহর যিকির অধিক পরিমাণ করার জন্যে আমি তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছি। কেননা যে ব্যক্তি অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করে, তার দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির মতো, যাকে ধরার জন্যে শত্রুরা দ্রুত ধাওয়া করছে। এরপর সে একটি সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে আত্মরক্ষা করল। অনুরূপ বান্দা যতক্ষণ আল্লাহর যিকিরে নিমগ্ন থাকে, ততক্ষণ সে শয়তানের পাকড়াও থেকে নিরাপদে অবস্থান করে।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর কতল

📄 হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর কতল


বনি ইসরাঈলের নবীগণের মধ্যে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর দাওয়াত ও তাবলিগের যুগ চলছিল। সেকালে ইয়াহুদিয়া অঞ্চলে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ওয়ায নসিহতের সুফলে বনি ইসরাঈলদের অন্তরসমূহ ক্রমশ বশীভূত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি যেদিকে বের হতেন, দলে দলে মানুষ তাঁর কাছে পঙ্গপালের মতো লুটিয়ে পড়ত। অপরদিকে ইহুদিদের বাদশা হীরোদেস খুবই অসৎ ও যালেম ছিল। সে হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে ভীত হয়ে গেল। ভয় করতে লাগল, ইয়াহুদিয়ার রাজত্ব আমার হস্তচ্যুত হয়ে পাছে না এ হেদায়েতকারী ব্যক্তির হাতে চলে যায়।

ঘটনাক্রমে একদিন হীরোদেসের বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ইনতেকাল হয়ে গেল। তার স্ত্রী ছিল অত্যন্ত সুন্দরী। সে হীরোদেসের ভাবী হওয়া ছাড়াও তার বৈপিত্রেয় ভ্রাতুষ্পুত্রী ছিল। হীরোদেস তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল এবং তাকে বিবাহ করে ফেলল। কিন্তু এ বিবাহ যেহেতু ইসরাঈলী ধর্মে শরিয়তবিরোধী ছিল। তাই হযরত ইয়াহইয়া আ. পূর্ণ রাজদরবারের সমক্ষে তাকে তিরস্কার করলেন এবং আল্লাহ তাআলার আযাবের ভয় প্রদর্শন করলেন। হীরোদেসের প্রেয়সী এটা শুনে চিন্তায় ও ক্রোধে অধীর হয়ে পড়ল এবং ইয়াহইয়া আ.-কে কতল করে ফেলার জন্য হীরোদেসকে প্রস্তুত করে নিল। অবশ্য হীরোদেসও ভরা দরবারে এ নসিহত করার কারণে ইয়াহইয়া আ.-এর উপর তেলে-বেগুনে জ্বলছিল; কিন্তু কতল করা সম্বন্ধে ইতস্তত করছিল। বাদশা স্ত্রীর অনুরোধে হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে হত্যা করে ফেলে। তার পর তাঁর মাথা কেটে একটি থালার মধ্যে রেখে প্রেয়সীর নিকট পাঠিয়ে দিল।

অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার হল, হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও কোনো ইসরাঈলীরই সাহস হল না, হীরোদেসের এ অভিশপ্ত কাজের জন্য তাকে বাধা প্রদান করবে বা তাকে তিরস্কার করবে। বরং একটি দল তার এ অভিশপ্ত কাজটিকে সুনজরে দেখল। এখন হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর শহিদ হওয়ার পর হযরত ঈসা আ.-এর দাওয়াত এবং তবলিগের সময় আসল। তিনি প্রকাশ্যভাবে ইহুদিদের বিদআত ও মুশরিকী রসম, যালেম-শৈরাচারী স্বভাব এবং ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধ আরম্ভ করে দিলেন। কিন্তু ইহুদিদের মধ্যে এ যোগ্যতা কোথায় ছিল, তাঁর সত্যের ডাকে সাড়া দিবে? ফলে অতি সামান্য কজন লোক ব্যতীত তাদের বিরাট দলই তাঁর বিরোধিতা শুরু করল। ইতঃমধ্যে নাবতী বাদশা হারেস- যিনি হিরোদেসের প্রথমা স্ত্রীর পিতা অর্থাৎ তার শ্বশুর ছিলেন, তাঁর রাজ্য আক্রমণ করলেন এবং ভীষণ রক্তারক্তির পর হীরোদেসকে পরাস্ত করলেন। এ পরাজয় হিরোদেসের শক্তির অবসান ঘটাল। তথাপি ইহুদিরা বলত, হীরোদেস ও বনি ইসরাঈলদের এ অপমান ও পরাজয় হযরত ইয়াহইয়া আ.-কে অন্যায়ভাবে হত্যা করার প্রতিফলেই ঘটেছিল। কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তারা এ ঘটনা হতে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করে নি। তারা তাদের জুলুম এবং অত্যাচারমূলক কার্যাবলী হতে বিরত হয় নি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px