📄 বংশ পরিচয়
ইবনে আসাকির তাঁর বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থে হযরত যাকারিয়া আ.-এর বংশ তালিকা নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন: যাকারিয়া ইবনে বারিয়া বা বারিখিয়া ইবনে দান কিংবা যাকারিয়া ইবনে লাদুন ইবনে মুসলিম ইবনে সাদুক ইবনে শাদুক ইবনে হাসবান ইবনে দাউদ ইবনে সুলায়মান ইবনে মুসলিম সাদিকা ইবনে বারিয়া ইবনে বাআলতাতা ইবনে নাযুর ইবনে সালুম ইবনে বাহানশাত ইবনে আয়ানাম ইবনে রাব্বিজাম ইবনে সুলাইমান ইবনে দাউদ। হযরত যাকারিয়া আ. ছিলেন বনি ইসরাঈলের নবী ইয়াহইয়া আ.-এর পিতা। তিনি পুত্র ইয়াহইয়ার সন্ধানে দামিশকের বুছায়না শহরে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, পুত্র ইয়াহইয়া নিহত হওয়ার সময় তিনি দামিশকেই অবস্থান করছিলেন। তার নসবনামা সম্পর্কে আরও বিভিন্ন মত রয়েছে। উচ্চারণে যাকারিয়া (দীর্ঘ স্বরবিশিষ্ট), যাকারিয়া বা যাকরা বলাও হয়ে থাকে।
📄 জীবনের তথ্যাবলী
যাকারিয়া আ.-এর জীবনের অবস্থাবলী বিস্তারিতভাবে জানা নেই। যতটুকু কুরআন মাজিদ, জীবনী ও ইতিহাসগ্রন্থের নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েতসমূহ দ্বারা জানা যায় তা হল: বনি ইসরাঈলদের মধ্যে 'কাহেন' একটি সম্মানিত পদ ছিল। তাঁর দায়িত্ব ছিল তিনি ইহকালের (অর্থাৎ ছাখরায়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের) পবিত্র রুসুমসমূহ পালন করতেন। এজন্য বিভিন্ন গোত্র হতে পৃথক কাহেন নির্ধারিত হত এবং নিজ নিজ পালাক্রমে সে কার্যটি সম্পন্ন করতেন। হযরত যাকারিয়া আ. বনি ইসরাঈলদের মধ্যে সম্মানিত 'কাহিন'ও ছিলেন এবং উচ্চস্তরের পয়গম্বরও ছিলেন। যেমন কুরআন মাজিদ তাঁকে আম্বিয়ায়ে কেরামের তালিকায় গণ্য করে বলেছে: "আর যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা, ইলিয়াস এরা সকলেই নেককারদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।" (সূরা আনআম: রুকু: ১০)
আর লুকার ইঞ্জিলেও তাঁকে 'কাহেন' বলা হয়েছে। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবে যে কাহেন বা জ্যোতিষী হত, তারা ভবিষ্যতের কথা ও অবস্থা বর্ণনা করত এবং যাদের কথা বিশ্বাস করা 'কুফর' বলা হয়েছে, তা বনি ইসরাঈলদের ওই 'কাহেন' হতে সম্পূর্ণ পৃথক। লুকার ইঞ্জিলে উল্লেখ রয়েছে: "ইহুদিদের বাদশা হীরোদেসের যামানায় 'আবইয়াহ' দলে যাকারিয়া নামক একজন 'কাহেন' ছিলেন। তাঁর স্ত্রী হারুন আ.-এর বংশধরগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁর নাম ছিল আলইয়াশা'। তাঁরা উভয়ে আল্লাহ তাআলার দরবারে অতিশয় সত্যপরায়ণ ছিলেন এবং আল্লাহ তাআলার সমস্ত নির্দেশাবলী এবং বিধানসমূহের উপর ত্রুটিহীনভাবে চলতেন।"
কিন্তু বারনাবার ইঞ্জিলে স্পষ্টরূপে উল্লেখ আছে, তিনি আল্লাহ তাআলার মনোনীত পয়গম্বর ছিলেন। যেমন হযরত মাসীহ ঈসা আ. ইহুদিদেরকে সম্বোধন করে বলছেন, "সেই সময়টি খুবই নিকটবর্তী, যখন তোমাদের উপর ঐ সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের দরুন আযাব এসে পড়বে, যাঁদেরকে তোমরা যাকারিয়া আ.-এর যুগ পর্যন্ত হত্যা করেছ?"
হযরত যাকারিয়া আ. হযরত দাউদ আ.-এর বংশধর এবং তাঁর স্ত্রী আলইয়াশা' বা ঈশা হযরত হারুন আ.-এর বংশধর ছিলেন। সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম তাঁরা বাদশা এবং রাজ্যাধিপতিই হন না কেন, নিজের জীবিকা নিজের হাতে উপার্জন করতেন। তাঁরা কারো কাঁধের বোঝা হতেন না। এ জন্যেই প্রত্যেক নবী যখন নিজের উম্মতকে হেদায়েত করতেন, তখন সঙ্গে সঙ্গে এটাও ঘোষণা করতেন: "আমি এ হেদায়েত কাজের বিনিময়ে তোমাদের নিকট হতে কোনো পারিশ্রমিক দাবি করছি না। আমার পারিশ্রমিক তো আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারেই রয়েছে।"
যাকারিয়া আ.-ও নিজের জীবিকা উপার্জনের জন্য করাতির কাজ করতেন। হযরত আবু হোরায়রা রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকারিয়া আ. করাতির কাজ করতেন। তাঁর বংশে অর্থাৎ সুলাইমান ইবনে দাউদ আ.-এর বংশধরদের মধ্যে ইমরান ইবনে নাশী এবং তার স্ত্রী হান্না বিনতে ফাকুদ নেককার লোক ছিলেন। তিনি দরবেশী জীবন যাপন করতেন, কিন্তু নিঃসন্তান ছিলেন। হান্নার দোয়ায় তাঁর গর্ভে একটি কন্যা-সন্তান জন্মগ্রহণ করে। যার নাম রাখলেন মারিয়াম। আর হান্না নিজের মানত অনুযায়ী মারিয়ামকে বাইতুল মুকাদ্দাসের জন্য উৎসর্গ করলেন। প্রশ্ন হল, এর প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার কার ওপর ন্যস্ত হবে? কাহেনদের মধ্যে আল্লাহ তাআলার কবুলকৃত এ মানত সম্বন্ধে মতানৈক্য হয়ে যখন সাব্যস্ত হল, এ সম্বন্ধে লটারি করা হবে। তখন লটারিতে হযরত যাকারিয়া আ.-এর নাম উঠল। সুতরাং তিনিই মারিয়ামের প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার গ্রহণ করলেন।
মারিয়াম আ. যখন বোধমতী হলেন, তখন হযরত যাকারিয়া আ. তাঁর জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের কাছে একটি হুজরা (নির্জন কামরা) নির্দিষ্ট করে দিলেন। সেখানে তিনি সারা দিন আল্লাহ পাকের ইবাদতের কাটাতেন এবং রাতে তাঁর খালার নিকটে কাটাতেন। হযরত যাকারিয়া আ. যখনই মারিয়ামের হুজরায় প্রবেশ করতেন, তখনই দেখতে পেতেন, তাঁর নিকট বেমৌসুমী ফল বিদ্যমান রয়েছে। একদিন তিনি বিস্ময় সহকারে জিজ্ঞাসা করলেন, মারিয়াম! এই বেমৌসুমী ফল তোমার নিকট কোথা থেকে আসল? মারিয়াম আ. বললেন, এটা আল্লাহ পাকের তরফ থেকে এসেছে।
হযরত যাকারিয়া আ.-এর কোনো সন্তান ছিল না। তিনি অনুভব করতেন, "আমি সন্তান হতে বঞ্চিত; কিন্তু এর চেয়ে আমার অধিক চিন্তার বিষয় হল, আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউই এমন উপযুক্ত নাই, আমার পরে বনি ইসরাঈলদের হেদায়েত ও সৎপথ প্রদর্শনের খেদমতের কাজ সম্পন্ন করবে। অতএব যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে নেকস্বভাব ও সৎপ্রকৃতির পুত্র দান করতেন, তবে আমি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হতাম, আমার পরে বনি ইসরাঈলদের হেদায়েতের কাজ সম্পন্ন করার জন্য উপযুক্ত লোক রয়েছে।"
কিন্তু তাঁর বয়স তখন একশ বছরের কাছাকাছি হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর স্ত্রী ছিল বন্ধ্যা, তাই বাহ্যিক কারণে সম্পূর্ণ নিরাশ ছিলেন। এখন আর সন্তান হওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তিনি যখন মারিয়াম আ.-এর নিকট বেমৌসুমী ফল দেখতে পেলেন, তখনই তাঁর অন্তরে প্রেরণার উদয় হল, যে পবিত্র সত্তা এরূপে বেমৌসুমে মারিয়ামকে ফল দান করছেন, তিনি কি আমাকে আমার বর্তমানের এ নৈরাশ্যপূর্ণ অবস্থায় আমার জীবনের ফলস্বরূপ একটি পুত্র-সন্তান দান করতে পারেন না? নিশ্চয়ই পারেন। এরপর তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ! আমি একাকী, উত্তরাধিকারীর মুখাপেক্ষী। এমনি তো সত্যিকারের এবং সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী আপনারই পবিত্র সত্তা। আয় খোদা! আমাকে পবিত্র-স্বভাব সন্তান দান করুন।"
আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া কবুল করে নেন। যখন যাকারিয়া আ. মসজিদে ইবাদতে মশগুল ছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলার ফেরেশতা তাঁর সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করে সুসংবাদ প্রদান করলেন, আপনার পুত্র জন্মলাভ করবে। আপনি তার নাম রাখবেন ইয়াহইয়া। হযরত যাকারিয়া আ. এটা শ্রবণে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন, এ সংবাদটি কেমন করে পূর্ণতা লাভ করবে? ফেরেশতা উত্তর করলেন: আমি এতটুকুই বলতে পারি, অবস্থা যাই হোক, আপনাদের পুত্র জন্মলাভ করবে। কেননা আল্লাহ পাকের সিদ্ধান্ত অটল।
যাকারিয়া আ. আল্লাহ পাকের দরবারে আরয করলেন, ইয়া আল্লাহ! এমন কোনো লক্ষণ আমাকে দান করুন, যাতে আমি বুঝতে পারি, আপনার সুসংবাদটি অস্তিত্ব প্রাপ্তির আকার ধারণ করেছে। আল্লাহ তাআলা বললেন, তোমার লক্ষণ হল, যখন তুমি তিন দিন পর্যন্ত কথা বলতে না পারবে এবং শুধু ইঙ্গিতে ও ইশারায়ই নিজের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করবে, তখন মনে করবে, সুসংবাদটি অস্তিত্ব লাভ করেছে। কিন্তু এই তিন দিবসে তুমি আল্লাহ তাআলার তাসবিহ ও তাহলিলে খুব মশগুল থাকবে। সুতরাং যখন সেই নির্দিষ্ট সময় এসে গেল, তখন হযরত যাকারিয়া আ. আল্লাহর পাকের স্মরণে আরও অধিক মশগুল হয়ে পড়লেন এবং উম্মতদেরকেও ইশারায় আদেশ করলেন। তারাও যেন আল্লাহ তাআলার স্মরণে আরও অধিক মশগুল থাকে।
📄 ওফাত
হযরত যাকারিয়া আ.-এর ইনতেকাল স্বাভাবিক মৃত্যুতে হয়েছিল, না কি তাঁকে শহিদ করে দেওয়া হয়েছিল এ নিয়ে বেশ মতভেদ রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, উভয়বিদ মতের সনদই ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছছে। তিনি বলেন, হযরত যাকারিয়া আ. তাঁর কওমের যুলুম থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে একটি গাছের মধ্যে ঢুকে পড়েন। সম্প্রদায়ের লোকজন ওই গাছটি করাত দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। করাত যখন তাঁর দেহ স্পর্শ করে, তখন তিনি চিৎকার করেন। আল্লাহ তখন ওহি প্রেরণ করে তাঁকে জানান, তোমার চিৎকার বন্ধ না হলে যমিন উলটিয়ে দেওয়া হবে। তিনি চিৎকার বন্ধ করে দেন এবং তাঁর দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
অপর বর্ণনায় আছে, যিনি গাছের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন, তার নাম যীশাইর বা শাইয়া আ.। আর হযরত যাকারিয়া আ. স্বাভাবিকভাবেই ইনতেকাল করেছিলেন। তাকে শহিদ করা হয় নি। (তারীখে ইবনে কাসীর: ২/৫২)
তবে প্রসিদ্ধ মতে তাঁকেও ইহুদিরা শহিদ করে ফেলেছিল। অবশ্য এ ব্যাপারটি কীরূপে এবং কোন স্থানে ঘটেছিল, সেই সম্বন্ধে শুধু বলা যায়, প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ পাকই ভালোরূপে অবগত আছেন।