📄 বংশ পরিচয়
হযরত উযায়ের আ. এর পিতা এবং বংশাধারার কোনো কোনো নাম সম্বন্ধে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতভেদ পাওয়া যায়। কিন্তু সকলে এ কথায় একমত, তিনি হযরত হারূন ইবনে ইমরান আ.-এর বংশধর। ইবনে আসাকির রহ. তাঁর পিতার নাম 'জারওয়াহ' বলেন। কেউ কেউ 'সুওয়ারেক' এবং কেউ 'সারূখা' বর্ণনা করেন। আর সহিফায়ে উম্মার মধ্যে বর্ণিত আছে, তাঁর পিতার নাম 'খালকিযাহ' ছিল।
ইসহাক ইবনে বিশর হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেন: বুখতে নসর যাদেরকে বন্দি করে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে উযায়ের আ.ও ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন একজন কিশোর। যখন তিনি চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হন তখন আল্লাহ তাকে হেকমত (নবুয়ত) দান করেন। তাওরাত কিতাবে তার চেয়ে বিজ্ঞ পণ্ডিত আর কেউ ছিল না।
ইসহাক ইবনে বিশর হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রাযি. থেকে বর্ণনা করেন: উযায়ের আ. হলেন আল্লাহর সেই বান্দা, যাঁকে তিনি একশ বছর মৃত অবস্থায় রেখে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। ইসহাক ইবনে বিশর বিভিন্ন সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন: উযায়ের আ. ছিলেন একজন জ্ঞানী ও পুণ্যবান লোক। একবার তিনি তাঁর ক্ষেত-খামার ও বাগ-বাগিচা দেখার জন্যে ঘর থেকে বের হন। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনকালে দ্বিপ্রহরের সময় একটা বিধ্বস্ত বাড়িতে বিশ্রাম নেন। তাঁর বাহন গাধার পিঠ থেকে নিচে অবতরণ করেন। তাঁর সাথে একটি ঝুড়িতে ছিল ডুমুর এবং অন্য একটি ঝুঁড়িতে ছিল আঙ্গুর। খাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পেয়ালায় আঙ্গুর নিংড়িয়ে রস বের করেন এবং শুকনো রুটি তাতে ভিজিয়ে রাখেন। রুটি উক্ত রসে ভালোরূপে ভিজে গেলে খাবেন, এই সময়ের মধ্যে বিশ্রামের উদ্দেশ্যে কিছু সময়ের জন্যে শুয়ে পড়েন এবং পা দুখানা দেয়ালের সাথে লাগিয়ে দেন। এ অবস্থায় তিনি বিধ্বস্ত ঘরগুলোর প্রতি লক্ষ করলেন, যার অধিবাসীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি অনেকগুলো পুরাতন হাড় দেখতে পেয়ে মনে মনে ভাবলেন, 'মৃত্যুর পর আল্লাহ কিরূপে এগুলোকে জীবিত করবেন?" আল্লাহ যে জীবিত করবেন, এতে তাঁর আদৌ কোনো সন্দেহ ছিল না। এ কথাটি তিনি কেবল অবাক বিস্ময়ের সাথে ভেবেছিলেন। এরপর আল্লাহ মৃত্যুর ফেরেশতাকে পাঠিয়ে তাঁর রূহ কবজ করান এবং একশ বছর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় রেখে দেন। একশ বছর পূর্ণ হলে আল্লাহ উযায়ের আ. এর কাছে ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন।
এ দীর্ঘ সময়ে বনি ইসরাঈলের মধ্যে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারা ধর্মের মধ্যে অনেক বেদআতের প্রচলন করেছিল। যা হোক, ফেরেশতা এসে উযায়ের আ. এর কলব ও চক্ষুদ্বয় জীবিত করলেন, যাতে কিভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করবেন তা স্বচক্ষে দেখেন ও অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন। এরপর ফেরেশতা উযায়ের আ. এর বিক্ষিপ্ত হাড়গুলো একত্র করে তাতে গোশত লাগালেন, চুল পশম যথাস্থানে সংযুক্ত করলেন এবং চামড়া দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত করলেন। সবশেষে তাঁর মধ্যে রূহ প্রবেশ করালেন। তাঁর দেহ এভাবে তৈরি হচ্ছে, তা তিনি প্রত্যক্ষ করছিলেন এবং অন্তর দিয়ে আল্লাহর কুদরত উপলব্ধি করছিলেন। উযায়ের আ. উঠে বসলেন।
ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এ অবস্থায় কতদিন অবস্থান করলেন? তিনি বললেন, এক দিন অথবা এক দিনেরও কিছু কম।' এরূপ বলার কারণ হল, তিনি দ্বিপ্রহরে দিনের প্রথম ভাগে শুয়েছিলেন এবং সূর্যাস্তের পূর্বে উঠেছিলেন। তাই বললেন, দিনের কিছু অংশ, পূর্ণ দিন নয়। ফেরেশতা জানালেন : না, বরং আপনি একশ বছর এভাবে অবস্থান করেছেন। আপনার খাদ্যসামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ করুন! এখানে খাদ্য বলতে তাঁর শুকনো রুটি এবং পানীয় বলতে পেয়ালার মধ্যে আঙ্গুর নিংড়ানো রস বুঝানো হয়েছে। দেখা গেল এ দুটির একটিও নষ্ট হয় নি। রুটি শুকনা আছে এবং রস অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে।
কুরআনে একেই বলা হয়েছে لَمْ يَتَسَنَّهُ অর্থাৎ তা অবিকৃত রয়েছে। রুটি ও রসের মত তাঁর আঙ্গুর এবং ডুমুরও টাটকা রয়েছে। এর কিছুই নষ্ট হয় নি। উযায়ের আ. ফেরেশতার মুখে একশ বছর অবস্থানের কথা শুনে এবং খাদ্যদ্রব্য অবিকৃত দেখে দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্যে পড়ে যান। যেন ফেরেশতার কথা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই ফেরেশতা তাঁকে বললেন, আপনি আমার কথায় সন্দেহ করছেন, তা হলে আপনার গাধাটির প্রতি লক্ষ করুন। উযায়ের আ. দেখলেন, তাঁর গাধাটি মরে পঁচে গলে প্রায় নিশ্চহ্ন হয়ে গিয়েছে। হাড়গুলো পুরাতন হয়ে যত্রতত্র বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে রয়েছে।
এরপর ফেরেশতা হাড়গুলোকে আহবান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাড়গুলো চতুর্দিক থেকে এসে একত্র হয়ে গেল। ফেরেশতা সেগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত করে দিলেন। উযায়ের আ. তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন। তারপর ফেরেশতা উক্ত কঙ্কালে রগ, শিরা-উপশিরা সংযোজন করেন। গোশত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং চামড়া ও পশম দ্বারা তা আবৃত করেন। সবশেষে তার মধ্যে রূহ প্রবেশ করান। ফলে গাধাটি মাথা ও কান খাড়া করে দাঁড়াল এবং কেয়ামত আরম্ভ হয়ে গেছে ভেবে চিৎকার করতে লাগল। এ সম্পর্কেই আল্লাহ পাক বলেন: "এবং তোমার গাধাটির প্রতি লক্ষ কর" কারণ, তোমাকে মানবজাতির জন্যে নিদর্শনস্বরূপ করব। আর অস্থিগুলোর প্রতি লক্ষ কর, কিভাবে সেগুলোকে সংযোজিত করি এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দিই।" (সূরা বাকারা: ২৫৯)
অর্থাৎ তোমার গাধার বিক্ষিপ্ত হাড়গুলোর প্রতি লক্ষ কর। কিভাবে সেগুলোকে গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে সংযোজন করা হয়। যখন গোশতবিহীন হাড়ের কঙ্কাল তৈরি হল, তখন বলা হয়, এবার লক্ষ কর, কিভাবে আমি এ কঙ্কালকে গোশত দ্বারা আচ্ছাদিত করি। যখন তার নিকট এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেল তখন তিনি বলে উঠলেন, আমি জানি, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। মৃতকে জীবিত করাসহ যে কোনো কাজ করতে তিনি সম্পূর্ণ সক্ষম।
এরপর উযায়ের আ. উক্ত গাধার পিঠে আরোহণ করে নিজ এলাকায় চলে যান। কিন্তু সেখানে কোনো লোককেই তিনি চিনতে পারছেন না। আর তাকেও দেখে কেউ চিনতে পারছে না। নিজের বাড়ি-ঘরও তিনি সঠিকভাবে চিনে উঠতে পারছিলেন না। অবশেষে ধারণার বশে নিজের মনে করে এক বাড়িতে উঠলেন। সেখানে অন্ধ ও পঙ্গু এক বৃদ্ধাকে পেলেন। তার বয়স ছিল একশ বিশ বছর। এ বৃদ্ধা ছিল উযায়ের আ. এর পরিবারের দাসী। একশ বছর পূর্বে তিনি যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে যান, তখন এই বৃদ্ধার বয়স ছিল বিশ বছর এবং উযায়ের আ.-কে সে চিনত। বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হলে সে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যায়। উযায়ের আ. জিজ্ঞেস করলেন, হে বৃদ্ধা! এটা কি উযায়রের বাড়ি?
বৃদ্ধা বলল: হ্যাঁ, এটা উযায়েরের বাড়ি। বৃদ্ধা মহিলাটি কেঁদে ফেলল এবং বলল, এতগুলো বছর কেটে গেল, কেউ তার নামটি উচ্চারণও করে না, সবাই তাকে ভুলে গিয়েছে। উযায়ের আ. নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমিই সেই উযায়ের। আল্লাহ আমাকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রেখে পুনরায় জীবিত করেছেন। বৃদ্ধা বলল, কী আশ্চর্য। আমরাও তো তাকে একশ বছর পর্যন্ত পাচ্ছি না, সবাই তার নাম ভুলে গিয়েছে, কেউ তাকে স্মরণ করে না। তিনি বললেন, আমিই সেই উযায়ের। বৃদ্ধা বলল, আপনি যদি সত্যিই উযায়ের হন, তা হলে উযায়রের দুআ আল্লাহ কবুল করতেন। কোনো রোগী বা বিপদগ্রস্তের জন্যে দুআ করলে আল্লাহ তাকে নিরাময় করতেন এবং বিপদ থেকে মুক্তি দিতেন। সুতরাং আপনি আমার জন্যে দুআ করুন, আল্লাহ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলে আপনাকে দেখব এবং আপনি উযায়ের হলে আমি চিনব। তখন উযায়ের আ. দুআ করলেন এবং বৃদ্ধার চোখে হাত বুলিয়ে দিলেন। এতে তার অন্ধত্ব দূর হয়ে গেল।
তারপর তিনি বৃদ্ধার হাত ধরে বললেন, আল্লাহর হুকুমে তুমি উঠে দাঁড়াও। সাথে সাথে তার পঙ্গুত্ব বিদূরিত হল। সে সুস্থ লোকের মতো উঠে দাঁড়াল। মনে হল সে বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেছে। তারপর উযায়ের আ. এর দিকে তাকিয়ে দেখে বলে উঠল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনিই উযায়ের। এরপর ওই বৃদ্ধা বনি ইসরাঈলের মহল্লায় চলে গেল। দেখল, তারা এক আসরে জমায়েত হয়েছে। সে আসরে উযায়ের আ. এর এক বৃদ্ধ পুত্রও উপস্থিত ছিল। বয়স একশ আঠার বছর। শুধু তাই নয়; প্রপুত্ররাও তথায় উপস্থিত ছিল। তারাও আজ প্রৌঢ়। বৃদ্ধা মহিলা এক পার্শ্বে দাঁড়িয়ে মজলিসের লোকদেরকে ডেকে বলল, উযায়ের আ. তোমাদের মাঝে আবার ফিরে এসেছেন। কিন্তু বৃদ্ধার এ কথা তারা হেসে উড়িয়ে দিল। তারা বলল, তুমি মিথ্যুক। বৃদ্ধা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল: আমি অমুক, তোমাদের বাড়ির দাসি। উযায়ের আ. এসে আমার জন্যে আল্লাহর নিকট দুআ করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং পঙ্গু পা সুস্থ করে দিয়েছেন। উযায়ের আ. বলেছেন, আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত অবস্থায় রেখে আবার জীবিত করে দিয়েছেন। এ কথা শোনার পর লোকজন উঠে উযায়ের আ. এর বাড়িতে গেল এবং তাকে ভালো করে দেখল। উ্যায়রের বৃদ্ধ পুত্র বলল, আমার পিতার দুই কাঁধের মাঝে একটি কালো তিল ছিল।
সুতরাং সে কাঁধের কাপড় উঠিয়ে তিল দেখে তাঁকে চিনতে পারল। বলল, ইনিই আমার পিতা উযায়ের। তখন বনি ইসরাঈলের লোকজন উযায়ের আ.-কে বলল, আমরা শুনেছি আপনি ব্যতীত অন্য কোনো লোকের তাওরাত কিতাব মুখস্থ ছিল না। এদিকে বুখত নসর এসে লিখিত তাওরাতের সমস্ত কপি আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। একটি অংশও অবশিষ্ট নেই। সুতরাং আপনি আমাদের জন্যে একখানা তাওরাত লিখে দিন। বুখতে নসরের আক্রমণকালে উযায়ের আ. এর পিতা সারূখা তাওরাতের একটি কপি মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই স্থানটি কোথায়, উযায়ের আ. ব্যতীত আর কেউ তা জানত না। সুতরাং তিনি উপস্থিত লোকদেরকে সাথে নিয়ে সেই স্থানে গেলেন এবং মাটি খুঁড়ে তাওরাতের কপি বের করলেন। কিন্তু এতদিনে তাওরাতের পাতাগুলো নষ্ট হয়ে সমস্ত লেখা মুছে গিয়েছে।
এরপর তিনি একটি বৃক্ষের নিচে গিয়ে বসলেন। বনি ইসরাঈলের লোকজনও তাঁর পাশে গিয়ে ঘিরে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশ থেকে দুটি নক্ষত্র এসে তাঁর পেটের মধ্যে প্রবেশ করে। এতে গোটা তাওরাত কিতাব তাঁর স্মৃতিতে ভেসে উঠল। তখন বনি ইসরাঈলের জন্যে তিনি নতুনভাবে তাওরাত লিখে দিলেন। এ সবের জন্যে অর্থাৎ নক্ষত্রদ্বয়ের অবতরণ ও কার্যক্রম, তাওরাত কিতাব নতুনভাবে লিখন ও বনি ইসরাঈলের নেতৃত্ব গ্রহণের কারণে ইহুদিরা উযায়ের আ.-কে আল্লাহর পুত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে। হযরত উযায়ের আ. হিযকিল আ. এর সাওয়াদ এলাকায় বসে তাওরাত কিতাবের পুনর্লিখন কাজ সম্পন্ন করেছিলেন।
যে নগরীতে তিনি ইনতেকাল করেছিলেন তার নাম সাইরাবায। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী: وَلِنَجْعَلَكَ آيَةً لِلنَّاسِ )তোমাকে আমি মানব জাতির জন্যে নিদর্শন বানাবার উদ্দেশ্যে এরূপ করেছি) মানবজাতি বলতে এখানে বনি ইসরাঈলকে বুঝানো হয়েছে। কেননা উযায়ের আ. তাঁর পুত্রদের মাঝে অবস্থান করছিলেন। অথচ পুত্রগণ সবাই ছিল বৃদ্ধ, আর তিনি যুবক। যখন তাঁর মৃত্যু হয় তখন বয়স ছিল চল্লিশ বছর। একশ বছর পর আল্লাহ যখন তাঁকে জীবিত করলেন তখন (প্রথম) মৃত্যুকালের যৌবন অবস্থার উপরেই জীবিত করেছিলেন। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন, বুখত নসরের ঘটনার পরে উযায়ের আ. পুনর্জীবিত হয়েছিলেন।
📄 হযরত উযায়ের আ. আল্লাহ তাআলার পুত্র হওয়ার আকীদা
জালেম বাদশা বুখতে নছর বাইতুল মুকাদ্দাসকে বিধ্বস্ত ও বরবাদ করে দিয়েছিল। সে বনি ইসরাঈলদের নর-নারী এবং শিশুদেরকে ভেড়ার পালের মতো হাঁকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাওরাতের সমস্ত কপিগুলোকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিল। বনি ইসরাঈলদের নিকট একটি কপিও বাকি রইল না। তাদের মধ্যে তাওরাতের এমন কোনো হাফেযও কেউ ছিল না, তাওরাতের প্রথম হতে শেষ' পর্যন্ত যার মুখস্থ আছে। ফলে বন্দি থাকাকালের পূর্ণ সময়টিতে তারা তাওরাত হতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। কিন্তু দীর্ঘকাল পরে যখন তারা বাবেলের বন্দিদশা হতে মুক্তি লাভ করল এবং তারা পুনরায় বাইতুল মুকাদ্দাসে (জেরুযালেমে) এসে আবাদ হয়ে বসতি স্থাপন করল, তখন তাদের চিন্তা হল, আল্লাহ তাআলার কিতাব তাওরাতকে কিভাবে লাভ করা যায়। তখন হযরত উযায়ের আ. সমস্ত বনি ইসরাঈলকে সমবেত করে তাদের সম্মুখে তাওরাত প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত মুখস্থ পাঠ করে শুনালেন এবং লিখে দিলেন।
কোনো কোনো ইসরাঈলী রেওয়ায়েতে আছে, যখন তিনি বনি ইসরাঈলদের একত্র করলেন, তখন সকলের সম্মুখে আসমান হতে দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র নেমে এসে হযরত উযায়ের আ.-এর বক্ষের ভিতর প্রবেশ করল। তখন হযরত উযায়ের আ.. বনি ইসরাঈলদেরকে তাওরাত পুনরায় প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত ক্রমানুসারে সাজিয়ে দিলেন। হযরত উযায়ের আ. যখন এ বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে অবসর লাভ করলেন, তখন বনি ইসরাঈলরা অশেষ আনন্দ প্রকাশ করল। তাদের অন্তরে হযরত উযায়ের আ.-এর মূল্য ও মর্যাদা শতগুণ বৃদ্ধি পেল।
ক্রমশ এ মহব্বতের আতিশয্য গুমরাহীর রূপ ধারণ করল। তারা হযরত উযায়ের আ.-কে তেমনি আল্লাহ তাআলার পুত্র মেনে নিল, যেমনি নাসারারা হযরত ঈসা আ.-কে আল্লাহর পুত্র বলে মানে। আর বনি ইসরাঈলদের একটি দল নিজেদের এ আকীদার পক্ষে প্রমাণ স্বরূপ বলল, মূসা আ. যখন আমাদেরকে তাওরাত এনে দিয়েছিলেন, তখন তা তক্তাসমূহে (কাষ্ঠফলকে) লিখিত ছিল। আর উযায়ের আ. তো কোনো তক্তা বা কাগজে লিখিত অবস্থায় নয় বরং অক্ষরে অক্ষরে নিজের স্মৃতিপট হতে তা আমাদের সম্মুখে নকল করে দিলেন। অতএব, উযায়ের আ. আল্লাহর পুত্র বলেই এরূপ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَأَنَّ عَظِيمٌ (বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৪৬)
📄 একটি সন্দেহের উত্তর
কুরআন মাজিদের ঘোষণা "ইহুদিরা উযায়ের আ.-কে আল্লাহ তাআলার পুত্র বলে থাকে" শোনার পর এ কালের কোনো কোনো ইহুদি বলে, আমরা তো উযায়ের আ.-কে আল্লাহ তাআলার পুত্র বলে মানি না। কাজেই কুরআনের এই দাবি ভুল। কিন্তু বর্তমান যমানার ইহুদিদের এ প্রশ্নটিও তাদের পূর্বকালের লোকদের মতো প্রতারণা এবং সত্য গোপনের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। অন্যথায় তারা এবং তারা ছাড়া প্রত্যেক এ সমস্ত লোকও যারা মুসলিম রাজ্যসমূহে ভ্রমণ করেছে এবং দুনিয়ার কওমসমূহের ধর্ম সুম্বন্ধে অনুসন্ধান করার আগ্রহও তাদের আছে- ভালোভাবেই জানে, আজও ফিলিস্তিনের আশেপাশে ইহুদিদের সেই দলটি বিদ্যমান রয়েছে যারা উযায়ের আ.-কে আল্লাহ তাআলার পুত্র বলে মানে এবং রোমান ক্যাথলিকদের মতো হযরত উযায়ের আ.-এর প্রতিমূর্তি নির্মাণ করে তার সঙ্গে যেরূপ আচরণই করে থাকে, সেরূপ আচরণ আল্লাহ তাআলার সঙ্গে হওয়া উচিত।
📄 ওফাত ও সমাধি
ইবনে কাসীর রহ. ওয়াযাহর ইবনে মুনজের সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম হতে উদ্ধৃত উযায়ের আ. সম্বন্ধে যে সুদীর্ঘ রেওয়ায়েতটি নকল করেছেন, তাতে বর্ণিত আছে : হযরত উযায়ের আ. ইহুদী কওমের মধ্যে তওরাতের শিক্ষা পুনরায় দাখিল করেছিলেন। ফলে বনি ইসরাঈলদের জন্য তাওরাতের নতুন সংস্করণ লিখে দিয়েছিলেন এবং এরপর সাইরাবায নামক একটি বসতিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। কোনো কোনো সাহাবায়ে কেরাম ও ঐতিহাসিকদের মতে, তাঁর সমাধি দামেশকে অবস্থিত।