📄 বনি ইসরাইলকে একত্র হওয়া
বনি ইসরাঈলকে একত্র হওয়া সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
অর কাল্লাযি মাররা আলা করইয়াতিন... অথবা তুমি কী সে ব্যক্তিকে দেখ নি, যে এমন এক নগরে উপনীত হয়েছিল, যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সে বলল, "মৃত্যুর পর কিরূপে আল্লাহ একে জীবিত করবেন?" তারপর আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত রাখলেন। পরে তাকে পুনর্জীবিত করলেন। আল্লাহ বললেন, "তুমি কতকাল অবস্থান করলে?" সে বলল, একদিন অথবা একদিনেরও কিছু কম অবস্থান করেছি। তিনি বললেন না, বরং তুমি একশ বছর অবস্থান করেছ। তোমার খাদ্য সামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য কর, তা অবিকৃত রয়েছে এবং তোমার গাধাটির প্রতি লক্ষ্য কর, কিভাবে সেগুলোকে সংযোজিত করি এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দেই।" যখন এ তার নিকট সুস্পষ্ট হল তখন সে বলে উঠল, আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সূরা বাকারা: ২৫৯)
হিশাম ইবনে কালবী বলেন, এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত আরমিয়া নবীর নিকট ওহি প্রেরণ করলেন, আমি বায়তুল-মুকাদ্দাসকে পুনরায় আবাদ করব। সুতরাং তুমি সেখানে যাও ও অবস্থান কর। নির্দেশ মতে আরমিয়া আ. সেখানে গেলেন এবং দেখলেন, গোটা নগরী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অবাক বিস্ময়ে তিনি ভাবলেন, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আমাকে এ নগরীতে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, তিনি একে পুনরায় আবাদ করবেন; কিন্তু তা কবে? এমন বিধ্বস্ত নগরীকে তিনি কতদিনে কিভাবে আবাদ করবেন?
এসব চিন্তা করতে করতে তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। তাঁর সাথে ছিল একটি গাধা ও কিছু খাদ্যদ্রব্য। এ ঘুমের মধ্যে তাঁর ৭০ বছর কেটে যায়। ইতঃমধ্যে বুখতে নসর ও তার মনিব সম্রাট লাহরাসা মৃত্যু হয়। লাহরাসা একশ বিশ বছর যাবত রাজত্ব করেছিল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র বাস্তাসাব তার স্থলাভিস্থিক্ত হয়। তারই রাজত্বকালে বুখত নসরের মৃত্যু হয়। বাস্তাসাব সিরিয়া (শাম) সম্পর্কে অবগত হলেন, দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে, সমগ্র ফিলিস্তিন হিংস্র শ্বাপদে ভরে গিয়েছে এবং মানুষের কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই। তিনি দাউদ আ.-এর বংশের একজনকে তাদের রাজা বানিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসসহ অন্যান্য মসজিদ পুনঃনির্মাণ করার নির্দেশ দেন। বনি ইসরাঈলরা তাদের রাজার সাথে আপন দেশ সিরিয়ায় চলে গেল এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল।
আল্লাহ তখন আরমিয়া আ. এর চোখ খুলে দিলেন। তিনি নগরীর আবাদ হওয়া দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করতে থাকলেন। এভাবে তাঁর আরও ত্রিশ বছর কেটে যায়। ফলে পূর্ণ নিদ্রাকাল একশ বছর পূর্ণ হয় এবং তারপরে তিনি জাগ্রত হন। কিন্তু তিনি ধারণা করতে থাকেন, তার নিদ্রাকাল কয়েক ঘণ্টার বেশি হয় নি। অথচ নগরীকে দেখেছিলেন ধ্বংস ও বিধ্বস্ত। আর নিদ্রা থেকে জেগে এখন দেখতে পাচ্ছেন আবাদ নগরী হিসেবে। তাই সহসা বলে উঠলেন, আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন।
এরপর বনি ইসরাঈলরা তথায় বসবাস করতে থাকে। আল্লাহ তাদের রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন। এভাবে দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়। তারপর তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দ্বন্দু কলহে লিপ্ত হয়। এ সুযোগে রোমান সম্রাট তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের দেশ দখল করে নেয়। রোমীয় খ্রিষ্টানদের শাসনাধীন থেকে বনি ইসরাঈলের শক্তি ও ঐক্য-সংহতি কিছুই অবশিষ্ট থাকল না।
ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে উক্ত ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, লাহরাসাব ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রজাবর্গ, সামন্ত রাজগণ, অধিনায়কগণ ও শহর-নগর সবই ছিল তাঁর অনুগত আজ্ঞাবহ। নগর তৈরি, নদী খনন ও সরাইখানা নির্মাণে তিনি ছিলেন অতিশয় বিজ্ঞ ও পারদর্শী। একশ বছরের ঊর্ধ্বে রাজ্য শাসনের পর দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপন পুত্র বাশতাসবের নিকট ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
বাশতাসবের আমলে সে দেশে মাজুসী ধর্মের (অগ্নিপূজার) উদ্ভব হয়। এ ধর্মের সূচনা করেন যারদাশত নামক এক ব্যক্তি। সে হযরত আরমিয়া আ. এর সঙ্গে থাকত। সে নবীর উপর কোনো কারণে রাগান্বিত হয়। নবী তাকে অভিশাপ দেন। ফলে যারদাশত কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়। এরপর সে আজার-বাইজানে গিয়ে বাশতাসবের সাথে মিলিত হয় এবং তাকে নিজের উদ্ভাবিত মাজুসী ধর্মে দীক্ষিত করে। এ ধর্ম গ্রহণ করার জন্যে বাশতাসব জনগণের উপর ভীষণভাবে চাপ সৃষ্টি করে। যারা স্বীকার করতে রাজি হয় নি, তাদেরকে সে পাইকারীভাবে হত্যা করে। বাশতাসবের পরে তার পুত্র বাহমান পারস্যের সম্রাট হয় এবং রাজ্যশাসনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে।
বুখত নসর উপর্যুক্ত তিনজন সম্রাটের অধীনে আঞ্চলিক শাসনকর্তা ছিল এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিল। উপরিউক্ত বর্ণনার সারমর্ম হল : ইবনে জারিরের মতে, উক্ত জনপদের মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তি হলেন হযরত আরমিয়া আ.। কিন্তু অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ হযরত আলি, ইবনে আব্বাস রাযি. প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন, উক্ত অতিক্রমকারী ব্যক্তি হযরত উযায়ের আ.। শেষোক্ত বর্ণনার সূত্র উপরের মতের বর্ণনার সূত্রের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী এবং প্রথম যুগের ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের অধিকাংশের নিকট বেশি প্রসিদ্ধ।