📄 হযরত দানিয়াল আ.-এর আলোচনা
ইবনে আবিদ দুনয়া আবদুল্লাহ ইবনে হুজায়ল থেকে বর্ণনা করেন, কাফের বাদশা বুখত নসর দুটি সিংহ ধরে একটা কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করে। এর পর হযরত দানিয়াল আ.-কে এনে ওই দুটি সিংহের মধ্যে ছেড়ে দেয়। কিন্তু সিংহ দুটি তাঁর ওপর কোনোরূপ আক্রমণ করে নি। তিনি দীর্ঘক্ষণ সেখানে স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করার পর মানুষের জৈবিক চাহিদা অনুযায়ী তাঁর খাদ্য পানীয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন আল্লাহ ওহির মাধ্যমে নবী আরমিয়াকে দানিয়াল আ.-এর জন্যে খাদ্য-পানীয় প্রস্তুত করতে বলেন। তিনি বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি থাকি বায়তুল মুকাদ্দাস এলাকায় আর দানিয়াল আছেন সুদূর ইরাকের বাবেল শহরে। সেখানে আমি কীভাবে খাদ্য-পানীয় পৌঁছাব? আল্লাহ বললেন, আরমিয়া! আমি তোমাকে যা আদেশ করেছি, তুমি তা-ই কর। প্রস্তুতকৃত খাদ্য সামগ্রীসহ তোমাকে সেখানে পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা শীঘ্রই আমি করছি।
আরমিয়া আ. খাদ্য তৈরি করলেন। তারপর এমন একজনকে প্রেরণ করা হল, যিনি খাদ্য-পানীয়সহ আরমিয়া আ.-কে উক্ত কূপের পাড়ে পৌঁছিয়ে দিলেন। হযরত দানিয়াল আ. ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন, কে? আরমিয়া আ. নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি আরমিয়া। দানিয়াল আ. বললেন, আপনি এখানে এসেছেন কেন? আরমিয়া আ. জানালেন, আপনার প্রভু আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। দানিয়াল আ. বললেন, তা হলে আমার প্রভু আমাকে স্মরণ করেছেন? আরমিয়া আ. বললেন, জি! তখন তিনি বললেন: 'সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যাঁকে কেউ স্মরণ করলে তিনি তাকে ভুলেন না; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যাঁকে কেউ আহবান করলে তিনি সেই আহবানে সাড়া দেন; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যাঁর প্রতি কেউ নির্ভরশীল হলে তিনি তাকে অন্যের দিকে ঠেলে দেন না; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি উত্তম কাজের উত্তম বিনিময় দান করেন; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি ধৈর্যের বিনিময়ে মুক্তি দান করেন; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের বিশ্বাস ও কর্মদ্যোম শিথিল হয়ে পড়লে দৃঢ়তা দান করেন; সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমাদের সকল উপায় শেষ হওয়ার পর একমাত্র ভরসা স্থল।'
ইউনুস ইবনে বুকায়েব রহ. হযরত আবুল আলিয়া রাযি. থেকে বর্ণনা করেন: আমরা যখন তুসতর শহর জয় করি, তখন হরমুযানের বাড়িতে খাটের ওপর একটি মৃত দেহ দেখতে পাই। তার লাশের শিয়রের কাছে পড়েছিল একটি আসমানী কিতাব। আমরা তা নিয়ে আসি এবং হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-কে দেখাই। তিনি হযরত কাব রাযি. কে ডেকে তাকে দিয়ে তার আরবি অনুবাদ করান। আবুল আলিয়া রাযি. বলেন, আরবদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম ওই কিতাবখানির অনূদিত কপি পাঠ করি, যেভাবে আমি কুরআন পাঠ করে থাকি। খুলদ ইবনে দীনার বলেন, আমি আবুল আলিয়া রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলাম, তাতে কী লেখা ছিল? তিনি বলেন, তাতে লিখিত ছিল: তোমাদের কর্মকাণ্ড, ঘটনাবলী, কথাবার্তা ও পরবর্তীকালে ঘটিতব্য সার্বিক অবস্থা। আমি বললাম, আপনারা সে লোকটিকে কী করলেন? তিনি বললেন, আমরা দিনেরবেলা তেরটি কবর খুঁড়লাম এবং রাত্রিকালে একটি কবরে তাকে দাফন করে বাকি সবকটি কবর একই রূপ করে দিলাম। এ ব্যবস্থা করলাম যাতে সাধারণ লোক তার কবরের সন্ধান না পায় এবং কবর খুঁড়ে না ফেলে।
বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ তার কাছে কী প্রত্যাশা করে? আবুল আলিয়া রাযি. বললেন, বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ হয়ে গেলে লোকজন এ খাট নিয়ে ময়দানে এসে বৃষ্টি কামনা করত এবং এর ফলে বৃষ্টিপাত হত। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ মৃত লোকটিকে চিনেন কি? আবুল আলিয়া রাযি. বললেন, তাঁর নাম হযরত দানিয়াল আ. বলে শোনা যায়। রাবী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কত বছর পূর্বে মুত্যুবরণ করেছেন? আবুল আলিয়া রাযি, বললেন, তিনশ বছর পূর্বে। রাবী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, এ সময়ের মধ্যে তার মৃতদেহের কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কি? আবুল আলিয়া রাযি. বললেন, না, তবে মাথার পিছনের দিকের কয়েকটি চুলের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। নবীদের দেহ মাটিতেও পঁচে না এবং জীবজন্তু খায় না। এ ঘটনাটি আবুল আলিয়া থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে। তবে তার মৃত্যু তারিখ যদি তিনশ বছর পূর্বে হওয়া সঠিক হয়, তা হলে তিনি নবী নন বরং কোনো পুণ্যবান হবেন।
আবু বকর ইবনে আবিদ দুনয়া তাঁর রচিত 'কিতাবু আহকামিল কুনূর' গ্রন্থে আবুল আশআছ রাযি. সূত্রে লিখেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: নবী হযরত দানিয়াল আ. আল্লাহর নিকট দুআ করেছিলেন, তাঁর দাফনকার্য যেন উম্মতে মুহাম্মাদীর হাতে সুসম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে আবু মূসা আশআরী রাযি. হাতে তুসতর নগরী বিজিত হলে তাঁর লাশ একটি সিন্দুকের মধ্যে দেখতে পান। এ সময় তাঁর দেহের শিরা ও কাঁধের মোটা রগ দুটি নড়াচড়া করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, "যে ব্যক্তি দানিয়াল আ.-এর লাশ শনাক্ত করিয়ে দেবে, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।" হারকূস নামক এক ব্যক্তি দানিয়াল আ.-এর লাশ শনাক্ত করেছিলেন। আবু মূসা রাযি. হযরত ওমর রাযি.-কে এ বিষয়ে অবহিত করেন। তখন হযরত ওমর রাযি. লোক মারফত তাঁকে জানান, হযরত দানিয়াল আ.-কে ওখানে দাফন কর এবং হারকূসকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও।
ইবনে আবিদ দুনিয়া আম্বাসা ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, আবূ মূসা আশআরি রাযি. মৃত দানিয়ালের সাথে একখানা আসমানী কিতাব, চর্বি ভর্তি একটি কলস, কিছু সংখ্যক দিরহাম ও তাঁর ব্যবহৃত আংটি পান। এরপর হযরত ওমর রাযি.-কে এ সম্পর্কে অবহিত করে আবূ মূসা রাযি. একটি পত্র লেখেন। হযরত ওমর রাযি. চিঠির মাধ্যমে আবু মূসাকে জানান, আসমানি কিতাবখানা আমাদের নিকট পাঠিয়ে দাও। চর্বির কিছু অংশ আমাদের জন্যে পাঠাও এবং অবশিষ্ট অংশ থেকে আরোগ্য লাভের জন্যে মুসলমানদেরকে তোমার পক্ষ থেকে ব্যবহার করতে দাও আর দিরহামগুলো তাদের মাঝে বণ্টন কর এবং আংটিটি তুমি ব্যবহার কর!
আবূ মূসা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তাঁর নির্দেশক্রমে চারজন বন্দি নদীর মধ্যে বাঁধ দিয়ে তার তলদেশে কবর খুঁড়ে সেখানে হযরত দানিয়াল আ.-এর লাশ দাফন করে। পরে আবূ মূসা রাযি. ওই চার বন্দিকে ডেকে এনে হত্যা করেন। ফলে আবূ মূসা আশআরী রাযি. ব্যতীত উক্ত কবরের সন্ধান জানার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকল না। ইবনে আবিদ দুনিয়া আবুয-যিনাদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমি আবূ মূসা আশআরীর পুত্র আবূ বুরদার হাতে একটি আংটি দেখেছি, যাতে দু'টি সিংহ এবং সিংহদ্বয়ের মাঝে জনৈক ব্যক্তির চিত্র অংকিত রয়েছে; আর সিংহ দু'টি ওই লোকটিকে জিহবা দ্বারা চাটছে। আবু বুরদা বললেন, এটি ওই লোকটির আংটি, যাঁকে এ শহরের লোক দানিয়াল নামে জানে। তাঁকে দাফন করার সময় আবু মূসা রাযি. তা নিজের কাছে তুলে রাখেন।
আবু বুরদা বলেন, আবূ মূসা আশআরী রাযি. উক্ত জনপদের লোকজনের নিকট আংটিতে অংকিত এ চিত্রের কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, দানিয়ালের আবির্ভাবকালে দেশের যিনি শাসনকর্তা ছিলেন, তার নিকট জ্যোতিষী ও গণকদল এসে ভবিষ্যদ্বাণী করে, অমুক রাত্রে আপনার রাজ্যে এমন একজন শিশুর জন্ম হবে, যে এ রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। রাজা বললেন, আল্লাহর কসম! ওই রাত্রে যত শিশুর জন্ম হবে, আমি তাদের সকলকে হত্যা করব। শিশু হযরত দানিয়াল আ.-কে রাজার লোকজন সিংহপালের মধ্যে নিক্ষেপ করে চলে যায়। কিন্তু সিংহ তার কোনো ক্ষতি করল না বরং দুটি সিংহ শিশুটিকে জিহবা দ্বারা চেটে সুস্থ রাখে। এরপর শিশুটির মাতা এসে সন্তানকে এ অবস্থায় দেখে সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। এভাবে আল্লাহ হযরত দানিয়াল আ.-কে রক্ষা করেন এবং নিজের ইচ্ছা কার্যকরী করেন। আবু মূসা রাযি. বলেন, ওই জনপদের লোকজন জানায়, হযরত দানিয়াল আ.-এর প্রতি আল্লাহর এ অনুগ্রহ স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্যে দানিয়াল তাঁর আংটিতে নিজেকে সিংহদ্বয়ের চাটারত অবস্থা চিত্রাঙ্কিত করে রাখেন। এ বর্ণনার সূত্রটি 'হাসান' পর্যায়ের।
📄 বনি ইসরাইলকে একত্র হওয়া
বনি ইসরাঈলকে একত্র হওয়া সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
অর কাল্লাযি মাররা আলা করইয়াতিন... অথবা তুমি কী সে ব্যক্তিকে দেখ নি, যে এমন এক নগরে উপনীত হয়েছিল, যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সে বলল, "মৃত্যুর পর কিরূপে আল্লাহ একে জীবিত করবেন?" তারপর আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত রাখলেন। পরে তাকে পুনর্জীবিত করলেন। আল্লাহ বললেন, "তুমি কতকাল অবস্থান করলে?" সে বলল, একদিন অথবা একদিনেরও কিছু কম অবস্থান করেছি। তিনি বললেন না, বরং তুমি একশ বছর অবস্থান করেছ। তোমার খাদ্য সামগ্রী ও পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য কর, তা অবিকৃত রয়েছে এবং তোমার গাধাটির প্রতি লক্ষ্য কর, কিভাবে সেগুলোকে সংযোজিত করি এবং গোশত দ্বারা ঢেকে দেই।" যখন এ তার নিকট সুস্পষ্ট হল তখন সে বলে উঠল, আমি জানি যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান। (সূরা বাকারা: ২৫৯)
হিশাম ইবনে কালবী বলেন, এরপর আল্লাহ তাআলা হযরত আরমিয়া নবীর নিকট ওহি প্রেরণ করলেন, আমি বায়তুল-মুকাদ্দাসকে পুনরায় আবাদ করব। সুতরাং তুমি সেখানে যাও ও অবস্থান কর। নির্দেশ মতে আরমিয়া আ. সেখানে গেলেন এবং দেখলেন, গোটা নগরী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অবাক বিস্ময়ে তিনি ভাবলেন, সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আমাকে এ নগরীতে অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন, তিনি একে পুনরায় আবাদ করবেন; কিন্তু তা কবে? এমন বিধ্বস্ত নগরীকে তিনি কতদিনে কিভাবে আবাদ করবেন?
এসব চিন্তা করতে করতে তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। তাঁর সাথে ছিল একটি গাধা ও কিছু খাদ্যদ্রব্য। এ ঘুমের মধ্যে তাঁর ৭০ বছর কেটে যায়। ইতঃমধ্যে বুখতে নসর ও তার মনিব সম্রাট লাহরাসা মৃত্যু হয়। লাহরাসা একশ বিশ বছর যাবত রাজত্ব করেছিল। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র বাস্তাসাব তার স্থলাভিস্থিক্ত হয়। তারই রাজত্বকালে বুখত নসরের মৃত্যু হয়। বাস্তাসাব সিরিয়া (শাম) সম্পর্কে অবগত হলেন, দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে, সমগ্র ফিলিস্তিন হিংস্র শ্বাপদে ভরে গিয়েছে এবং মানুষের কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই। তিনি দাউদ আ.-এর বংশের একজনকে তাদের রাজা বানিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসসহ অন্যান্য মসজিদ পুনঃনির্মাণ করার নির্দেশ দেন। বনি ইসরাঈলরা তাদের রাজার সাথে আপন দেশ সিরিয়ায় চলে গেল এবং বায়তুল মুকাদ্দাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল।
আল্লাহ তখন আরমিয়া আ. এর চোখ খুলে দিলেন। তিনি নগরীর আবাদ হওয়া দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করতে থাকলেন। এভাবে তাঁর আরও ত্রিশ বছর কেটে যায়। ফলে পূর্ণ নিদ্রাকাল একশ বছর পূর্ণ হয় এবং তারপরে তিনি জাগ্রত হন। কিন্তু তিনি ধারণা করতে থাকেন, তার নিদ্রাকাল কয়েক ঘণ্টার বেশি হয় নি। অথচ নগরীকে দেখেছিলেন ধ্বংস ও বিধ্বস্ত। আর নিদ্রা থেকে জেগে এখন দেখতে পাচ্ছেন আবাদ নগরী হিসেবে। তাই সহসা বলে উঠলেন, আল্লাহ সব কিছুই করতে পারেন।
এরপর বনি ইসরাঈলরা তথায় বসবাস করতে থাকে। আল্লাহ তাদের রাজত্ব ফিরিয়ে দিলেন। এভাবে দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়। তারপর তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দ্বন্দু কলহে লিপ্ত হয়। এ সুযোগে রোমান সম্রাট তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের দেশ দখল করে নেয়। রোমীয় খ্রিষ্টানদের শাসনাধীন থেকে বনি ইসরাঈলের শক্তি ও ঐক্য-সংহতি কিছুই অবশিষ্ট থাকল না।
ইবনে জারীর রহ. তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে উক্ত ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, লাহরাসাব ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। প্রজাবর্গ, সামন্ত রাজগণ, অধিনায়কগণ ও শহর-নগর সবই ছিল তাঁর অনুগত আজ্ঞাবহ। নগর তৈরি, নদী খনন ও সরাইখানা নির্মাণে তিনি ছিলেন অতিশয় বিজ্ঞ ও পারদর্শী। একশ বছরের ঊর্ধ্বে রাজ্য শাসনের পর দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপন পুত্র বাশতাসবের নিকট ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
বাশতাসবের আমলে সে দেশে মাজুসী ধর্মের (অগ্নিপূজার) উদ্ভব হয়। এ ধর্মের সূচনা করেন যারদাশত নামক এক ব্যক্তি। সে হযরত আরমিয়া আ. এর সঙ্গে থাকত। সে নবীর উপর কোনো কারণে রাগান্বিত হয়। নবী তাকে অভিশাপ দেন। ফলে যারদাশত কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়। এরপর সে আজার-বাইজানে গিয়ে বাশতাসবের সাথে মিলিত হয় এবং তাকে নিজের উদ্ভাবিত মাজুসী ধর্মে দীক্ষিত করে। এ ধর্ম গ্রহণ করার জন্যে বাশতাসব জনগণের উপর ভীষণভাবে চাপ সৃষ্টি করে। যারা স্বীকার করতে রাজি হয় নি, তাদেরকে সে পাইকারীভাবে হত্যা করে। বাশতাসবের পরে তার পুত্র বাহমান পারস্যের সম্রাট হয় এবং রাজ্যশাসনে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করে।
বুখত নসর উপর্যুক্ত তিনজন সম্রাটের অধীনে আঞ্চলিক শাসনকর্তা ছিল এবং দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিল। উপরিউক্ত বর্ণনার সারমর্ম হল : ইবনে জারিরের মতে, উক্ত জনপদের মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তি হলেন হযরত আরমিয়া আ.। কিন্তু অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ হযরত আলি, ইবনে আব্বাস রাযি. প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেছেন, উক্ত অতিক্রমকারী ব্যক্তি হযরত উযায়ের আ.। শেষোক্ত বর্ণনার সূত্র উপরের মতের বর্ণনার সূত্রের অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী এবং প্রথম যুগের ও পরবর্তী যুগের আলেমগণের অধিকাংশের নিকট বেশি প্রসিদ্ধ।