📄 বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ
আল্লাহ তাআলা জিন জাতিকে এমন একটি সৃষ্টজীব হিসেবে পয়দা করেছেন, যারা জটিল হতে জটিল এবং কঠিন হতে কঠিন কাজ সমাধা করতে পারে । হযরত সুলাইমান আ. ইচ্ছা করলেন, মসজিদ (হায়কাল)-এর চতুর্দিকে একটি বিরাট শহর স্থাপন করবেন এবং মসজিদটিকেও সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনঃনির্মাণ করবেন । তাঁর অভিলাষ ছিল, মসজিদ ও শহরটিকে অধিক মূল্যবান পাথর দ্বারা নির্মাণ করেন এবং এর জন্য দূর-দুরান্ত হতে সুন্দর ও বড় বড় পাথর আনিয়ে নেন । বলাবাহুল্য, তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমিত উপকরণসমূহ হযরত সুলাইমান আ.-এর এ বাসনা পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না । এ কার্য শুধু জিন জাতিই সম্পন্ন করতে পারত । সুতরাং তিনি জিন জাতি দ্বারাই এ কার্যটি করিয়ে নিলেন । জিনেরা দূর-দূরান্ত হতে সুন্দর ও বড় বড় পাথর সংগ্রহ করে আনত এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ কার্যের ব্যবস্থা করত ।
সাধারণত এটাই প্রসিদ্ধ, মসজিদে আকছা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ কাজ হযরত সুলাইমান আ.-এর কালে সূচনা হয়েছিল, কিন্তু এটা সঠিক নয় । কেননা বুখারী ও মুসলিম শরীফের সহি ও মারফু হাদীসে উল্লেখ আছে, একবার হযরত আবু যর গেফারী রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ । দুনিয়ার বুকে সর্বপ্রথম মসজিদ কোন্টি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান, "মসজিদে হারাম ।" আবু যর রাযি. পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, "এর পরে কোনটি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মসজিদে আকছা" । আবু যর রাযি. তৃতীয় বার জিজ্ঞাসা করলেন, এতদুভয় মসজিদের নির্মাণ কাজের মধ্যে ব্যবধান কি পরিমাণ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দুটির মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ।" অথচ হযরত সুলাইমান আ. ও মসজিদ হারামের নির্মাতা হযরত ইবরাহীম আ.-এর মধ্যে এক হাজার বছরের চেয়েও অধিক সময়ের ব্যবধান রয়েছে । সুতরাং হাদীসটির অর্থ হল, যেভাবে হযরত ইবরাহীম আ. মসজিদে হারামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আর তা মক্কা শহরটি আবাদ হওয়ার কারণ হয়েছিল, তেমনি হযরত ইয়াকুব আ. বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং তার ফলে বাইতুল মুকাদ্দাস শহরটি আবাদ হয়েছিল ।
এর দীর্ঘকাল পরে হযরত সুলাইমান আ.-এর আদেশে মসজিদ এবং শহরটি নতুনভাবে পুনঃ নির্মিত হয়েছিল । এবং জিনদেরকে বশীভূত করে কাজে লাগাবার কারণে অনুপম বিরাট ইমারত নির্মিত হয়েছিল । যা অদ্যাবধি দর্শকদের বিস্ময়ের কারণ হয়ে রয়েছে— এ প্রকাণ্ড ও গুরুভার পাথরসমূহ কোথা থেকে আনা হয়েছে ! কিরূপে আনয়ন করা হয়েছে ! আর এ প্রকাণ্ড ও গুরুভার পাথরসমূহ উত্তোলনের জন্য কেমন যন্ত্রাদি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার সাহায্যে সেগুলো এত উপরে উঠিয়ে পরস্পর সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল ! জিনজাতি হযরত সুলাইমানের জন্য বাইতুল মুক্বাদ্দাস ছাড়াও আরও বহু ইমারত নির্মাণ করেছিল । কতিপয় এমন বস্তুও নির্মাণ করেছিল, যা তৎকালের হিসাবে বিচিত্র এবং অভিনব মনে করা হত । যেমন কুরআন মাজিদে বর্ণিত আছে:
وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَغُوصُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ عَمَلًا دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ
"আর শয়তান অর্থাৎ অবাধ্য জিনদের মধ্য হতে আমি বশীভূত করে দিয়েছিলাম, যারা তার (সুলায়মান আ.-এর) জন্য সমুদ্রে ডুব দিত (মহামূল্যবান সামুদ্রিক দ্রব্যসমূহ বের করে আনত) । এতদ্ব্যতীত আরো বহু কাজ করত এবং আমি তাদের প্রতি লক্ষ রাখতাম ও সংরক্ষণ করতাম ।" (সূরা আম্বিয়া: রুকু: ৬)
📄 ওফাত লাভ
কুরআন মাজিদের সূরায়ে সাবাতে হযরত সুলাইমান আ.-এর ওফাতের যে ঘটনা বর্ণনা করেছে, তার সারমর্ম হল, হযরত সুলাইমান আ.-এর আদেশে জিনদের একটি বড় দল বিরাট ইমারতের নির্মাণ কাজে মশগুল রয়েছে । ইতঃমধ্যে হযরত সুলাইমান আ.-এর ওফাতের পয়গাম এসে পৌঁছল । কিন্তু জিনেরা তাঁর ইনতেকালের সংবাদ জানতে পারল না । তারা তাদের উপর ন্যস্ত কার্যসমূহে মশগুল থাকল ।
দীর্ঘকাল পরে উইপোকা তার লাঠিটিকে খেয়ে ফেলল । যার দরুন হযরত সুলাইমান আ.-কে লাঠির ওপর ভর করে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যাচ্ছিল, তিনি ভূপতিত হলেন । তখন জিনরা জানতে পারল, হযরত সুলাইমান আ. দীর্ঘকাল পূর্বেই ইনতেকাল করেছিলেন । আফসোস, আমরা জানতে পারি নি ! কতই না ভালো হত, যদি আমরা গায়েবি খবর জানতাম, তবে এ দীর্ঘকাল পর্যন্ত এ পরিশ্রম ও মেহনতের মধ্যে পতিত থাকতাম না, যাতে আমরা হযরত সুলায়মান আ.-এর ভয়ে লিপ্ত ছিলাম । কুরআন মাজিদে ঘটনাটি এরূপে বর্ণিত আছে:
فَلَمَّا قَضَيْنَا عَلَيْهِ الْمَوْتَ مَا دَلَّهُمْ عَلَى مَوْتِهِ إِلَّا دَابَّةُ الْأَرْضِ تَأْكُلُ مِنْسَأَتَهُ فَلَمَّا خَرَّ تَبَيَّنَتِ الْجِنُّ أَنْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ الْغَيْبَ مَا لَبِثُوا فِي الْعَذَابِ الْمُهِينِ
"যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যুর ফয়সালা করে দিলাম, তখন (কর্মরত) জিনদেরকে কেউই তাঁর মৃত্যুর কোনো সংবাদ প্রদান করে নি উইপোকা ছাড়া, যারা সুলাইমানের লাঠিটি খাচ্ছিল । যখন সুলাইমান (লাঠিটির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে) পড়ে গেলেন, তখন জিনদের নিকট প্রকাশ হয়ে পড়ল, কি ভালো হত যদি তারা গায়েবি ইলম জানত । তবে এই কঠিন মুসিবতে পতিত থাকত না ।" (সূরা সাবা: রুকু: ২)
কথিত আছে, জিনদের নিকট যখন এই রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়ল, তখন ইমারত নির্মাণের কার্য সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল । সুতরাং জিনদের আফসোস হলো । যদি তারা গায়েবি ইলমে জ্ঞানী হত, তবে এর বহু পূর্বে তারা মুক্ত হয়ে যেত ।
এ স্থলে কুরআন মাজিদের উদ্দেশ্য যেমনি হযরত সুলাইমান আ.-এর ওফাতের ঘটনা বর্ণনা করা, তদ্রুপ বনি ইসরাঈলদেরকে তাদের বোকামি সম্বন্ধে অবহিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য । কেননা তাদের আকিদা অনুযায়ী যদি জিনেরা গায়েবি জ্ঞানসম্পন্ন হত, তবে তারা দীর্ঘকাল পর্যন্ত হযরত সুলাইমান আ.-এর ভয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের বা মতান্তরে অন্য কোনো শহরের নির্মাণ কার্যের কঠিন পরিশ্রমে লিপ্ত থাকত না । ফলে যেভাবে তারা হযরত সুলাইমান আ.-এর মৃত্যু সংবাদ জানতে পেরেছে, তার পর স্বয়ং শয়তানরা অর্থাৎ জিনরাও একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, আমরা যে গায়েবি ইলম জানি বলে দাবি করতাম, তা সম্পূর্ণ ভুল সাব্যস্ত হল ।
হযরত সুলাইমান আ.-এর ওফাত সম্বন্ধে কুরআন মাজিদ এ পরিমাণই বর্ণনা করেছে । এর চেয়ে অধিক বিস্তারিত কিছুই বর্ণনা করে নি । তাবলিগের উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ করে এরপর কোনো প্রয়োজনও ছিল না । সুতরাং সে সমস্ত বিস্তারিত বিবরণের অনুসন্ধানে লিপ্ত হওয়া আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই, হযরত সুলায়মান আ. কতকাল লাঠির উপর ভর করে দণ্ডায়মান ছিলেন? কি অবস্থায় দণ্ডায়মান ছিলেন? জিন ও ইনসান উভয় জাতিই কি তাঁর মৃত্যু-সংবাদ জানতে পারে নি? অথবা শুধু জিনরাই জানতে পারে নি, যারা বাইতুল মুকাদ্দাস হতে বহু দূরে কোনো শহরের নির্মাণ কার্যে মশগুল ছিল ইত্যাদি ।
ইসরাঈলী রেওয়ায়েতসমূহ থেকে গৃহীত একটি রেওয়ায়েতে আছে— যখন মালাকুল মউত আযরাইল আ. এসে হযরত সুলাইমান আ.-কে এ পয়গাম শুনালেন— আপনার মৃত্যুর মাত্র আর কয়েক ঘণ্টা বাকি আছে । তখন তিনি একথা বিবেচনা করে, পাছে জিনরা আমার এ ইমারত নির্মাণের কার্য অসম্পূর্ণ ছেড়ে না দেয় । তাতে দরজা রাখলেন না । নিজে তার ভিতর আবদ্ধ অবস্থায় লাঠির উপর ভর করে দণ্ডায়মান হয়ে ইবাদতে মশগুল হয়ে গেলেন । এ অবস্থায়ই মালাকুল মউত নিজের কাজ সমাধা করে ফেললেন । প্রায় এক বছর পর্যন্ত হযরত সুলাইমান আ. এ অবস্থায়ই দণ্ডায়মান রইলেন । এদিকে জিনেরা নির্মাণ কাজে মশগুল রইল । যখন তারা নির্মাণ কার্য সমাধা করে ফেলল, তখন হযরত সুলাইমান আ.-এর লাঠিতে উইপোকার জন্ম হল এবং সেগুলো লাঠিটি খেয়ে নিষ্ক্রিয় করে ফেলল । ফলে তা হযরত সুলাইমান আ.-এর ভার বহন করতে অক্ষম হয়ে গেল । হযরত সুলাইমান আ. মাটিতে পড়ে গেলেন । তখন জিনরা বুঝতে পারল, বহুকাল পূর্বেই হযরত সুলাইমান আ.-এর ইনতেকাল হয়ে গেছে এবং নিজেদের অজ্ঞতার জন্য আফসোস করতে লাগল ।
এ রেওয়ায়েত এবং এ জাতীয় আরো বহু ইসরাঈলী রেওয়ায়েত তত্ত্বজ্ঞানীরা পরিস্কার করে দিয়েছেন, এ সমূদয়ের স্বরূপ কি? তাওরাতে হযরত সুলাইমান আ.-এর ইনতেকালের ঘটনা এরূপ বর্ণিত আছে: “জেরুযালেমে হযরত সুলাইমান আ.-এর রাজত্বকাল চল্লিশ বছর ছিল । এবং হযরত সুলাইমান আ. তাঁর পূর্বপুরুষদের শহর 'ছাইহুনে' সমাহিত হয়েছেন । এরপর তাঁর পুত্র 'রাজআম' তাঁর স্থলে বাদশা হন ।”
কাযি বাইযাবি রহ. বলেছেন, হযরত সুলাইমান আ.-এর ১৩ বছর বয়সে তাঁর পিতা হযরত দাউদ আ. ইনতেকাল করেন । এবং তখনই তিনি রাজ্যের সিংহাসন অলঙ্কৃত করেন আর তিপ্পান্ন বৎসর বয়সে তিনি ইনতেকাল করেন । ইমাম বাইযাবি সম্ভবত এ কথাটি তাওরাত হতেই নকল করেছেন ।
ইবনে জারীর ইবনে আবী হাতিম ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর বরাতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: হযরত সুলাইমান যখনই নামায আদায় করতেন, তখনই সম্মুখে একটি চারা গাছ দেখতে পেতেন । তিনি গাছের কাছে তার নাম জিজ্ঞেস করতেন । গাছ নিজের নাম বলে দিত । তার পরে জিজ্ঞেস করতেন, কি কাজের জন্যে তোমার সৃষ্টি? যদি রোপণ করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকলে তা রোপণ করা হত । যদি ওষুধ হিসেবে হত, তা হলে ওষুধ উৎপাদনে লাগানো হত । এক দিন তিনি নামাযে রত ছিলেন । সহসা সম্মুখে একটি বৃক্ষ-চারা দেখেন । জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম? সে বলল, আল-খারূব । তিনি বললেন, কি উদ্দেশ্যে তোমার সৃষ্টি? সে বলল, বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে । তখন সুলাইমান আ. দুআ করলেন, 'আল্লাহ! জিনদের কাছে আমার মৃত্যুর অবস্থাটা গোপন রাখুন, যাতে মানুষ জানতে পারে— জিনরা আসলে গায়েব জানে না ।' এরপর সুলাইমান আ. ওই বৃক্ষ-চারা দ্বারা একটি লাঠি তৈরি করেন এবং এক বছর যাবত তাতে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকেন । ও দিকে জিনেরা পূর্ণ উদ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে ।
অবশেষে উইপোকা লাঠিটি খেয়ে শেষ করে ফেলে । এ ঘটনা থেকে মানুষ সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারল, জিনরা গায়েবের খবর জানে না । জানলে এক বছর পর্যন্ত এ লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি তারা কিছুতেই ভোগ করত না ।
সুদ্দী রহ. হযরত সুলাইমান আ.-এর ইতিহাস বর্ণনা প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদসহ কতিপয় সাহাবা থেকে বর্ণনা করেছেন, সুলাইমান আ. অন্যান্য কাজ-কর্ম থেকে অব্যাহতি দিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে কখনও কখনও একটানা এক বছর, দু বছর, এক মাস, দু মাস কিংবা এর চেয়ে বেশী কিংবা এর চেয়ে কম সময় অবস্থান করতেন । তাঁর খাদ্য ও পানীয় মসজিদেই সরবরাহ করা হত । যেবার তিনি মসজিদে প্রবেশ করার পর ইনতিকাল করেন, সেবার এক নতুন ঘটনা দেখতে পান । প্রত্যেক সকালবেলা তিনি দেখতেন, বায়তুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে একটি বৃক্ষ উদগত হচ্ছে । কাছে এসে নাম জিজ্ঞেস করলে বৃক্ষটি তার নাম বলে দিত । যদি তা রোপণ করার উদ্দেশ্যে হত, তা হলে রোপণ করতেন । যদি ঔষধরূপে ব্যবহারের জন্যে হত, তা হলে বলে দিত আমি ঔষধ-বৃক্ষ । যদি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জন্মাত, তবে বৃক্ষ তাও বলে দিত এবং তাকে সে কাজেই ব্যবহার করা হত । অবশেষে এক দিন এমন এক বৃক্ষের জন্ম হল, যার নাম জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আমার নাম খারূবা । সুলায়মান আ. জানতে চাইলেন, তোমার সৃষ্টি কী উদ্দেশ্যে? বৃক্ষটি বলল, এ মসজিদ ধ্বংস করার জন্যে । সুলায়মান আ. বললেন, আমি জীবিত থাকতে আল্লাহ এ মসজিদ ধ্বংস করবেন না বরং তুমি এমন একটি বৃক্ষ, যার উপর ভর দেওয়া অবস্থায় আমার মৃত্যু হবে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসও ধ্বংস হবে । এরপর তিনি বৃক্ষ-চারাটি সেখান থেকে তুলে মসজিদের আঙিনার বাগানে রোপণ করেন । এরপর তিনি মসজিদের মিহরাবের প্রবেশ করে লাঠির উপর হেলান দিয়ে সালাতে দণ্ডায়মান হন । এ অবস্থায় তাঁর ইনতেকাল হয়ে যায়; কিন্তু কর্মরত জিনরা তা টের পেলো না । তারা নবীর নির্দেশ মতে মসজিদের কাজ অব্যাহত রাখে । তাদের অন্তরে সর্বদা এ ভয় ছিল, কাজে ফাঁকি দিলে তিনি মিহরাব থেকে বেরিয়ে এসে শাস্তি দেবেন । অবশ্য, কখনও কখনও জিনগুলো মেহরাবের পাশের এসে একত্র হত । মিহরাবের সম্মুখে ও পশ্চাতে জানালা লাগানো ছিল ।
কোনো জিন পলায়নের ইচ্ছে করলে বলত, আমি কি এক দিকে প্ররেশ করে অন্যদিকে বের হয়ে যাওয়ার মতো চালাক নই? সুলাইমান আ. মিহরাবের মধ্যে থাকা অবস্থায় কোনো জিন তাঁর দিকে তাকালেই সঙ্গে সঙ্গে সে পুড়ে যেত । একবার কর্মরত জিনদের একজন মিহরাবে প্রবেশ করে সুলাইমান আ.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গেল । কিন্তু তাঁর কোনো আওয়াজ শুনতে পেল না । পুনরায় সে ওই পথে প্রত্যাবর্তন করল, তখনও কোনো সাড়া-শব্দ পেল না । আবার সে ঘরে ঢুকল কিন্তু পুড়ল না, তখন সে সুলাইমান আ.-এর প্রতি তাকিয়ে দেখল, তাঁর মৃতদেহ পড়ে রয়েছে ।
এবার জিনটি বেরিয়ে এসে লোকজনকে জানালো, সুলাইমানের মৃত্যু হয়েছে । লোকজন দরজা খুলে মিহরাবে প্রবেশ করে দেখল ঘটনা সত্য । তারা তাঁর দেহকে বাইরে বের করে আনল । তারা দেখতে পেল, তাঁর লাঠিটি কীটে খেয়ে ফেলেছে । কুরআন মাজিদে মুনসা শব্দ এসেছে । এটা হাবশি ভাষার শব্দ, অর্থ লাঠি । তিনি কবে, কত দিন আগে মারা গেছেন, জানার কোনো উপায় ছিল না । তাই মৃত্যুকাল বের করার উদ্দেশ্যে তারা একটি কীটকে একটি লাঠির গায়ে ছেড়ে দেয় । কীটটি একদিন এক রাত পর্যন্ত লাঠিটি খেতে থাকে । এবার তারা হিসেব বের করল, এই হারে একটা লাঠি খেতে এক বছর লাগে । তাতে তারা বুঝতে পারে, তিনি এক বছর পূর্বেই ইনতেকাল করেছেন । মোটকথা, হযরত সুলাইমান আ.-এর মৃত্যুর পর পূর্ণ একটি বছর পর্যন্ত জিনরা হাড়ভাঙা খাটুনী খাটে । মানুষ তখন পূর্বের ধারণা পরিবর্তন করে নতুনভাবে বিশ্বাস করতে থাকে, জিনরা গায়েব জানে— এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা । তারা যদি সত্যিই গায়েব জানত, তা হলে সুলাইমান আ.-এর মৃত্যু সম্পর্কে অবশ্যই অবগত হত এবং পূর্ণ এক বছর পর্যন্ত শাস্তি মূলক কাজে কিছুতেই আবদ্ধ থাকত না । জিনরা গায়েব জানার যে দাবি করত, এক্ষনি তা মানুষের কাছে ফাঁস হয়ে গেল । এরপর জিনরা ওই পোকাটির কাছে গিয়ে বলল, তুমি যদি খাদ্য দ্রব্য আহার করতে তবে আমরা তোমাকে উৎকৃষ্ট খাদ্য সরবরাহ করতাম । যদি তুমি পানীয় পান করতে তবে উন্নতমানের শরাব পান করাতাম । কিন্তু এগুলো যেহেতু তোমার আহার্য নয়, তাই আমরা তোমাকে পানি ও কাদা দিচ্ছি । বর্ণনাকারী বলেন, এরপর থেকে উই পোকাটি যেখানেই অবস্থান করত জিনরা সেখানে পানি ও মাটি পৌঁছিয়ে দিত । এ কারণেই কাঠের ভিতরে যে মাটি দেখা যায়— তা বস্তুত সেই উই পোকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে জিনরাই পৌঁছিয়ে দিয়ে থাকে ।
আবু দাউদ রহ. তাঁর গ্রন্থে আমাশের সূত্রে খায়ছামা থেকে বর্ণনা করেন: হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ মালাকুল মওতকে বলেছিলেন, আপনি যখন আমার রূহ কবয করবেন, তার পূর্বে আমাকে জানিয়ে দেবেন । ফিরিশতা বললেন, এ বিষয়ে আপনার থেকে আমার অধিক কিছু জানা নেই । বস্তুত আমার নিকট একটি লিখিত পত্র দেওয়া হয় । যার মৃত্যু হবে, ওই পত্রে তার নাম লেখা থাকে । বর্ণনাকারী বলেন, সুলাইমান আ. মালাকুল মওতকে বলেছিলেন, আপনি যখন আমার রূহ কবয করার আদেশ পাবেন, তখন পূর্বাহ্নে আমাকে জানিয়ে দেবেন । একবার মালাকুল মওত এসে সুলাইমান আ.-কে জানালেন, আপনার রূহ কবয করার জন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি । আর স্বল্প সময় বাকি আছে । তিনি তৎক্ষণাৎ শয়তান জিনদের ডেকে অবিলম্বে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করার আদেশ দেন । নির্দেশ মতে তারা একটি কাঁচের প্রাসাদ তৈরি করল । এতে কোনো দরজা জানালা ছিল না । সুলাইমান আ. ওই কাঁচের ঘরে লাঠির উপর হেলান দিয়ে সালাতে মগ্ন হন । ইত্যবসরে মালাকুল মওত তথায় প্রবেশ করে সুলাইমান আ. এর রূহ কবয করে নেন । অবশ্য তাঁর মৃত দেহ লাঠির উপর হেলান দেওয়া অবস্থায়ই থেকে যায় । সুলাইমান আ. মালাকুল মওতকে ফাঁকি দিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে এই কৌশল অবলম্বন করেন নি । জিনরা তাঁর সম্মুখেই নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল ।
সুলাইমান আ.-এর প্রতি তারা বারবার তাকিয়ে দেখত এবং মনে করত, তিনি তো জীবিতই আছেন । পরে আল্লাহ তাঁর লাঠির কাছে একটি উইপোকা পাঠান । উইপোকাটি লাঠির গায়ে লেগে খেতে শুরু করে । যখন লাঠির অভ্যন্তর ভাগ খেয়ে শূন্য করে ফেলে, তখন তা দুর্বল হয়ে যায় । হযরত সুলাইমান আ.-এর ভার সহ্য করতে না পেরে লাঠিটি ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর মৃতদেহ মাটিতে পড়ে যায় । জিনরা এ অবস্থা দেখে কাজ ছেড়ে চলে যায় ।
ইসহাক ইবনে বিশর মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের সূত্রে যুহরী প্রমুখ থেকে বর্ণনা করেন, হযরত সুলাইমান আ. বায়ান্ন বছর জীবিত ছিলেন এবং চল্লিশ বছর রাজত্ব করেন । কিন্তু ইসহাক আবু রওক হযরত ইকরামার সূত্রে ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁর রাজত্ব বিশ বছর স্থায়ী ছিল । ইবনে জারীর লিখেছেন, সুলাইমান আ.-এর বয়স হয়েছিল মোটামুটি পঞ্চাশ বছরের কিছু বেশি ।