📄 বিলকিসের বিবাহ
তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে, ইসলাম গ্রহণের পর হযরত সুলাইমান আ. সাবার রানি বিলকিসকে বিবাহ করেন এবং তাঁকে নিজ রাজ্যে প্রত্যাগমনের অনুমতি প্রদান করেন । এরপর হযরত সুলাইমান আ. সময় সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন । কিন্তু কুরআন মাজিদে ও সহি হাদিসে তাদের বিবাহ হওয়া বা না হওয়া সম্বন্ধে কোনোই উল্লেখ নেই ।
📄 বনি ইসরাইলদের মিথ্যাপবাদ
ইহুদিরা তাদের আসমানি কিতাবে বহু রদবদল করেছে । যেমন হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ব্যাপারে তো তারা এত দুঃসাহসিকতা অবলম্বন করেছে, তাঁদের নবুয়ত পর্যন্ত অস্বীকার করেছে, তাঁদের প্রতি নানা প্রকার দোষারোপ করেছে এবং অনর্থক মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে । হযরত সুলাইমান আ.-এর প্রতি তারা একটি দোষারোপ করেছিল, তিনি জাদুবিদ্যা জানতেন এবং তারই বলে তিনি "সম্রাট সুলায়মান" ছিলেন এবং জিন, ইনসান, যাবতীয় জন্তু ও পক্ষীসমূহকে বশীভূত করে নিয়েছিলেন ।
কুরআন মাজিদ বনি ইসরাঈলদের আরোপিত সে সমস্ত অপবাদকে প্রমাণ দ্বারা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সাব্যস্ত করেছে এবং হযরত সুলাইমান আ.-এর পয়গম্বরী শান ও মর্যাদাকে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল করে দিয়েছে । কুরআন পাক বলেছে, হযরত সুলাইমান আ. জাদুর অপবিত্রতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত ছিলেন । প্রকৃতপক্ষে হযরত সুলাইমান আ.-এর যমানায় বনি ইসরাঈলদেরকে গোমরাহ করার জন্য (মানব ও দানব জাতীয়) শয়তানেরা জাদু শিখিয়েছিল । এবং উক্ত জাদুসমূহকে বইয়ের মধ্যে সংকলিত করা হয়েছে ।
ইহুদিরা সেটা শিখতে ও মানুষদের শিখাতে শুরু করল । তখন বনি ইসরাঈলদের মধ্য হতে বিশিষ্ট হকপন্থীরা তাদেরকে বুঝিয়ে বলল, "এটা (যাদুবিদ্যা) নেহায়েত পথভ্রষ্টতা ও কুফর ।" তোমরা এটা হতে বিরত থাকো ! তখন শয়তানের প্ররোচনায় তারা বলতে লাগল, এটা হযরত সুলাইমান আ.-এর শিখানো বিদ্যা । সুলাইমান এরই দ্বারা এত বড় রাজ্যের রাজত্বের অধিপতি হয়েছিলেন । এই বলে তারা নিজেদের ভ্রান্ত পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রইল । কিন্তু তারা এ উক্তিতে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যাবাদী এবং হযরত সুলাইমান আ.-এর উপর মিথ্যাপবাদ আরোপ করছে ।
সুদ্দী রহ. বলেন, হযরত সুলাইমান আ.-এর জীবিতকালেই বনি ইসরাঈলদের মধ্যে এই গোমরাহী আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । তাদের মধ্যে এ কথাও প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিল, "জিনজাতি গায়েবি ইলম জানে ।" হযরত সুলাইমান আ. এ সংবাদ জানতে পেরে শয়তানদের সংকলিত সেই দফতরগুলোকে সংগ্রহ করে নিজের সিংহাসনের নিচে পুঁতে রেখেছিলেন । যেন কোনো জিন বা মানুষের সেখান পর্যন্ত পৌঁছানোর দুঃসাহস না হয় । আর সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারি করে দিলেন, "যে ব্যক্তি জাদু প্রয়োগ করবে বা জিন জাতি সম্বন্ধে গায়েবি ইলম জানার আকিদা পোষণ করবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে ।" কিন্তু হযরত সুলাইমান আ.-এর ইনতেকালের পর শয়তানরা সেই প্রোথিত জাদুভাণ্ডারকে বের করে নিল এবং বনি ইসরাঈলদের মধ্যে এ আকিদা ছড়িয়ে দিল, জাদুবিদ্যাটি হযরত সুলাইমান আ.-এর বিদ্যা । তিনি এ জাদুবিদ্যার বলেই জিন ইনসান, যাবতীয় জীবজন্তু, পক্ষীকুল এবং বায়ুর উপর রাজত্ব করতেন । এরূপে শয়তানেরা বনি ইসরাঈলদের মধ্যে পুনরায় জাদু-বিদ্যার প্রচলন করে দিল ।
📄 হযরত সুলাইমান আ.-এর স্ত্রী
হযরত সুলাইমান আ.-এর এক হাজার স্ত্রী ছিলেন । তাঁদের মধ্যে সাতশ ছিলেন স্বাধীন এবং তিনশ বাঁদি । কেউ কেউ এর বিপরীতে তিনশ স্বাধীন ও সাতশ বাঁদির কথা বলেছেন । হযরত সুলাইমান আ. ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও সক্ষম পুরুষ । ইমাম বুখারী রহ. হযরত আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: একবার হযরত সুলাইমান ইবনে দাউদ আ. বলেছিলেন, আজ রাত্রে আমি সত্তরজন স্ত্রীর কাছে যাব । প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভে একজন করে পুত্র সন্তান জন্ম হবে এবং তারা সকলেই অশ্ব চালনায় পারদর্শী হবে । আল্লাহর রাস্তায় তারা জিহাদ করবে । সুলাইমানের কাছে অবস্থানকারী একজন তখন বলেছিল, 'ইনশাআল্লাহ' (আল্লাহ যদি চান); কিন্তু সুলাইমান আ. ইনশাআল্লাহ বলেন নি । ফলে সে রাতে কোনো স্ত্রীই সন্তান ধারণ করেন নি । মাত্র একজন স্ত্রী পরে একটি অসম্পূর্ণ সন্তান প্রসব করেন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তিনি যদি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তবে সকল স্ত্রী থেকেই পুত্র সন্তান জন্ম হত এবং তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করত ।
শুআইব ও ইবনে আবি যিনাদ ৭০ স্থলে ৯০ জন স্ত্রীর কথা বর্ণনা করেছেন এবং এটাই বিশুদ্ধতম । অপর এক বর্ণনায় আছে, সুলাইমান আ. ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি যদি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তাহলে তার নেক নিয়তে এভাবে নিষ্ফল হয়ে যেত না । বরং তাঁর ইচ্ছাই পূরণ হতো । আবু হোরায়রা রাযি. সূত্রে অপর এক বর্ণনায় হযরত সুলাইমান আ.-এর চারশ স্ত্রী ও সাতশ বাঁদির উল্লেখসহ উক্ত ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে ।
অবশ্য হযরত সুলাইমান আ.-এর ছিল বিশাল সাম্রাজ্য, অসংখ্য সৈন্য-সামন্ত, বিভিন্ন প্রজাতির সেনাবাহিনী এবং রাজ্য পরিচালনার অন্যান্য সামগ্রী যা আল্লাহ তাঁর পূর্বেও কাউকে দেন নি এবং পরেও কাউকে দেন নি । হযরত সুলাইমান আ.-কে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনে যে সব অনুগ্রহ দান করেছেন তার উল্লেখ শেষে পরকালীন জীবনেও অনুগ্রহ, সম্মান ও নৈকট্য দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, "নিশ্চয়ই তার জন্যে আমার কাছে রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম ।"
📄 বাইতুল মুকাদ্দাস নির্মাণ
আল্লাহ তাআলা জিন জাতিকে এমন একটি সৃষ্টজীব হিসেবে পয়দা করেছেন, যারা জটিল হতে জটিল এবং কঠিন হতে কঠিন কাজ সমাধা করতে পারে । হযরত সুলাইমান আ. ইচ্ছা করলেন, মসজিদ (হায়কাল)-এর চতুর্দিকে একটি বিরাট শহর স্থাপন করবেন এবং মসজিদটিকেও সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনঃনির্মাণ করবেন । তাঁর অভিলাষ ছিল, মসজিদ ও শহরটিকে অধিক মূল্যবান পাথর দ্বারা নির্মাণ করেন এবং এর জন্য দূর-দুরান্ত হতে সুন্দর ও বড় বড় পাথর আনিয়ে নেন । বলাবাহুল্য, তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমিত উপকরণসমূহ হযরত সুলাইমান আ.-এর এ বাসনা পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না । এ কার্য শুধু জিন জাতিই সম্পন্ন করতে পারত । সুতরাং তিনি জিন জাতি দ্বারাই এ কার্যটি করিয়ে নিলেন । জিনেরা দূর-দূরান্ত হতে সুন্দর ও বড় বড় পাথর সংগ্রহ করে আনত এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ কার্যের ব্যবস্থা করত ।
সাধারণত এটাই প্রসিদ্ধ, মসজিদে আকছা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের নির্মাণ কাজ হযরত সুলাইমান আ.-এর কালে সূচনা হয়েছিল, কিন্তু এটা সঠিক নয় । কেননা বুখারী ও মুসলিম শরীফের সহি ও মারফু হাদীসে উল্লেখ আছে, একবার হযরত আবু যর গেফারী রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ । দুনিয়ার বুকে সর্বপ্রথম মসজিদ কোন্টি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান, "মসজিদে হারাম ।" আবু যর রাযি. পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, "এর পরে কোনটি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মসজিদে আকছা" । আবু যর রাযি. তৃতীয় বার জিজ্ঞাসা করলেন, এতদুভয় মসজিদের নির্মাণ কাজের মধ্যে ব্যবধান কি পরিমাণ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ দুটির মধ্যে চল্লিশ বছরের ব্যবধান ।" অথচ হযরত সুলাইমান আ. ও মসজিদ হারামের নির্মাতা হযরত ইবরাহীম আ.-এর মধ্যে এক হাজার বছরের চেয়েও অধিক সময়ের ব্যবধান রয়েছে । সুতরাং হাদীসটির অর্থ হল, যেভাবে হযরত ইবরাহীম আ. মসজিদে হারামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আর তা মক্কা শহরটি আবাদ হওয়ার কারণ হয়েছিল, তেমনি হযরত ইয়াকুব আ. বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং তার ফলে বাইতুল মুকাদ্দাস শহরটি আবাদ হয়েছিল ।
এর দীর্ঘকাল পরে হযরত সুলাইমান আ.-এর আদেশে মসজিদ এবং শহরটি নতুনভাবে পুনঃ নির্মিত হয়েছিল । এবং জিনদেরকে বশীভূত করে কাজে লাগাবার কারণে অনুপম বিরাট ইমারত নির্মিত হয়েছিল । যা অদ্যাবধি দর্শকদের বিস্ময়ের কারণ হয়ে রয়েছে— এ প্রকাণ্ড ও গুরুভার পাথরসমূহ কোথা থেকে আনা হয়েছে ! কিরূপে আনয়ন করা হয়েছে ! আর এ প্রকাণ্ড ও গুরুভার পাথরসমূহ উত্তোলনের জন্য কেমন যন্ত্রাদি ব্যবহার করা হয়েছিল, যার সাহায্যে সেগুলো এত উপরে উঠিয়ে পরস্পর সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল ! জিনজাতি হযরত সুলাইমানের জন্য বাইতুল মুক্বাদ্দাস ছাড়াও আরও বহু ইমারত নির্মাণ করেছিল । কতিপয় এমন বস্তুও নির্মাণ করেছিল, যা তৎকালের হিসাবে বিচিত্র এবং অভিনব মনে করা হত । যেমন কুরআন মাজিদে বর্ণিত আছে:
وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَنْ يَغُوصُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ عَمَلًا دُونَ ذَلِكَ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ
"আর শয়তান অর্থাৎ অবাধ্য জিনদের মধ্য হতে আমি বশীভূত করে দিয়েছিলাম, যারা তার (সুলায়মান আ.-এর) জন্য সমুদ্রে ডুব দিত (মহামূল্যবান সামুদ্রিক দ্রব্যসমূহ বের করে আনত) । এতদ্ব্যতীত আরো বহু কাজ করত এবং আমি তাদের প্রতি লক্ষ রাখতাম ও সংরক্ষণ করতাম ।" (সূরা আম্বিয়া: রুকু: ৬)