📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সাবার রানীর ইসলাম গ্রহণ

📄 সাবার রানীর ইসলাম গ্রহণ


সাবার রানি বিলকিস হযরত সুলাইমান আ.-এর মর্যাদা এবং বুযুর্গি দেখে ইসলাম গ্রহণ করলেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: ‘ওয়া আসলামতু মাআ সুলায়মানা লিল্লাহি রব্বিল আলামিন’। অর্থাৎ এখন আমি সুলাইমানের সাথী হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ঈমান আনলাম।

প্রথমে রানি সুলাইমান আ.-এর বিপুল শক্তির কথা শুনে তাঁর প্রতি অনুগত হয়েছিলেন কিন্তু প্রকৃত তাওহীদের মর্ম বুঝতে পারেন নি। হযরত সুলাইমান আ. তাঁর সিংহাসনের রূপ পরিবর্তন করে এবং কাঁচের প্রাসাদের মাধ্যমে তাকে এই শিক্ষা দিলেন যে, যেভাবে তিনি কাঁচের ওপরের জলকে আসল মনে করেছিলেন তেমনি সূর্যের ছায়াকে বা প্রকাশস্থলকে তারা আসল মাবুদ মনে করে পূজা করছে। রানির মস্তিষ্কে এই সত্য উদিত হওয়া মাত্র তিনি লজ্জিত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করলেন এবং এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাওরাতে সাবার রানী

📄 তাওরাতে সাবার রানী


তাওরাতেও হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার রানির সাক্ষাতের কথা উল্লেখ রয়েছে: “আর যখন আল্লাহ তাআলার নাম প্রচার সম্বন্ধে হযরত সুলাইমান আ.-এর খ্যাতি সাবার রানির নিকট পর্যন্ত পৌঁছল, তখন তিনি জটিল প্রশ্নসমূহের দ্বারা হযরত সুলাইমান আ.-কে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর সমীপে আগমন করলেন, বিরাট শোভাযাত্রা ও উষ্ট্রের পাল সহকারে, যাতে সুগন্ধি দ্রব্যাদি বোঝাই করা ছিল এবং বহু স্বর্ণ ও মহামূল্যবান হীরা-জহরত সঙ্গে নিয়ে জেরুযালেম পৌঁছলেন । তিনি সুলাইমান আ.-এর দরবারে এসে তাঁর কল্পিত সমস্ত বিষয় তাঁর সাথে আলাপ করলেন । হযরত সুলাইমান আ. তাঁর সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিলেন । সুলাইমান আ.-এর নিকট কোনো বিষয়ই অজ্ঞাত ছিল না, তিনি রানির প্রশ্নসমূহের জবাব দিতে পারবেন না ।

সাবার রানি হযরত সুলাইমান আ.-এর সমস্ত জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অবস্থা এবং সেই শীষমহলটি— যা হযরত সুলাইমান আ. রানির জন্য নির্মাণ করেছিলেন এবং দস্তরখানের নেয়ামতসমূহকে এবং তাঁর সভাসদবৃন্দের আসনসমূহকে এবং তাঁর সাকিদেরকে, আর সেই সিঁড়িটিকে— যার দ্বারা তিনি খোদাওয়ান্দ তাআলার দরবারে গমন করতেন— দেখলেন, তখন তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন । তিনি সুলাইমান আ.-কে বললেন— “এটা যথার্থ সংবাদই ছিল, যা আপনার বুযুর্গী ও বুদ্ধিমত্তা সম্বন্ধে আমি রাজ্যে বসে প্রাপ্ত হয়েছিলাম । আপনার যে সংবাদ লোকমুখে শ্রবণ করেছিলাম, তা প্রকৃত ব্যাপারে অর্ধেকও ছিল না । কেননা আপনার বুদ্ধিমত্তা, আড়ম্বর ও জাঁকজমক যা দেখতে পাচ্ছি, তা আমার শ্রুত সংবাদের চেয়ে বহু গুণের অধিক । আপনার লোকেরা সকলেই নেককার, আর আপনার খাস সভাসদবৃন্দ— যারা সর্বদা আপনার দরবারে হাযির থাকে, তাঁরাও নেককার, খোদাওয়ান্দ আপনার কথা শ্রবণ করেন । আপনার খোদা মোবারক । যিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট এবং আপনাকে ইসরাঈলের সিংহাসনে বসিয়েছেন । কেননা খোদাওয়ান্দ ইসরাঈলীদেরকে সর্বদা ভালোবাসেন ।”

তাওরাতের বর্ণনায় যদিও রানির মুসলমান হওয়ার কথা উল্লেখ নেই; কিন্তু শেষের বাক্যগুলি প্রকাশ করছে, সে ইসরাঈলী খোদার উপর ঈমান এনেছিল । সে কারণেই তাঁর উল্লেখ এত শ্রদ্ধার সাথে করছে । কিন্তু কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনার মধ্যে একটা পার্থক্য সুস্পষ্ট, কুরআন মাজিদের বর্ণনায় বুঝা যায়, হযরত সুলাইমান আ. এমন মর্যাদা এবং বুযুর্গীর সাথে সাবার রানির সঙ্গে আচরণ করেছেন, যা একজন উচ্চ শ্রেণীর পয়গম্বরের মতো ছিল । আর কুরআন মাজিদের বর্ণনার প্রতি কথায় কথায় পয়গম্বরী শান অনুযায়ী তাবলিগ ও দাওয়াতে ইসলাম দেখতে পাওয়া যায় । কিন্তু তাওরাতের বর্ণনায় হযরত সুলাইমানের বুদ্ধিমত্তা এবং রাজকীয় ক্ষমতা ব্যতীত আর কিছুই প্রকাশ পায় না ।

এটা বনি ইসরাঈলদের সেই ভুল আকিদারই ফল, যা তারা হযরত সুলাইমান আ. সম্বন্ধে মিথ্যা আবিষ্কার করে নিয়েছে— তিনি পয়গম্বর নন, শুধু বাদশা । আর কুরআন মাজিদ যেহেতু আকিদা ও আমলসমূহের সংশোধনের সাথে সাথে প্রাচীনকালের উম্মতদের এবং তাদের নবী ও রাসূলদের সম্বন্ধীয় ঘটনাবলীতে বনি ইসরাঈলদের বিকৃতকরণ, পরিবর্তন সাধন এবং তাদের ভুল ও অনর্থক মনগড়া আবিষ্কারসমূহের সংশোধনেরও দাবিদার, তাই কুরআন মাজিদ এ স্থলেও আলোচ্য ঘটনা সম্বন্ধে প্রকৃত ও সঠিক তথ্য বর্ণনা এবং সেই ভুলসমূহকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যা উম্মতদের বিকৃতকরণের দরুন পূর্বের আসমানি কিতাবসমূহে পাওয়া যায় ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বিলকিসের বিবাহ

📄 বিলকিসের বিবাহ


তাফসিরের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে, ইসলাম গ্রহণের পর হযরত সুলাইমান আ. সাবার রানি বিলকিসকে বিবাহ করেন এবং তাঁকে নিজ রাজ্যে প্রত্যাগমনের অনুমতি প্রদান করেন । এরপর হযরত সুলাইমান আ. সময় সময় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন । কিন্তু কুরআন মাজিদে ও সহি হাদিসে তাদের বিবাহ হওয়া বা না হওয়া সম্বন্ধে কোনোই উল্লেখ নেই ।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 বনি ইসরাইলদের মিথ্যাপবাদ

📄 বনি ইসরাইলদের মিথ্যাপবাদ


ইহুদিরা তাদের আসমানি কিতাবে বহু রদবদল করেছে । যেমন হযরত দাউদ ও হযরত সুলাইমান আ.-এর ব্যাপারে তো তারা এত দুঃসাহসিকতা অবলম্বন করেছে, তাঁদের নবুয়ত পর্যন্ত অস্বীকার করেছে, তাঁদের প্রতি নানা প্রকার দোষারোপ করেছে এবং অনর্থক মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে । হযরত সুলাইমান আ.-এর প্রতি তারা একটি দোষারোপ করেছিল, তিনি জাদুবিদ্যা জানতেন এবং তারই বলে তিনি "সম্রাট সুলায়মান" ছিলেন এবং জিন, ইনসান, যাবতীয় জন্তু ও পক্ষীসমূহকে বশীভূত করে নিয়েছিলেন ।

কুরআন মাজিদ বনি ইসরাঈলদের আরোপিত সে সমস্ত অপবাদকে প্রমাণ দ্বারা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সাব্যস্ত করেছে এবং হযরত সুলাইমান আ.-এর পয়গম্বরী শান ও মর্যাদাকে সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল করে দিয়েছে । কুরআন পাক বলেছে, হযরত সুলাইমান আ. জাদুর অপবিত্রতা থেকে পবিত্র ও মুক্ত ছিলেন । প্রকৃতপক্ষে হযরত সুলাইমান আ.-এর যমানায় বনি ইসরাঈলদেরকে গোমরাহ করার জন্য (মানব ও দানব জাতীয়) শয়তানেরা জাদু শিখিয়েছিল । এবং উক্ত জাদুসমূহকে বইয়ের মধ্যে সংকলিত করা হয়েছে ।

ইহুদিরা সেটা শিখতে ও মানুষদের শিখাতে শুরু করল । তখন বনি ইসরাঈলদের মধ্য হতে বিশিষ্ট হকপন্থীরা তাদেরকে বুঝিয়ে বলল, "এটা (যাদুবিদ্যা) নেহায়েত পথভ্রষ্টতা ও কুফর ।" তোমরা এটা হতে বিরত থাকো ! তখন শয়তানের প্ররোচনায় তারা বলতে লাগল, এটা হযরত সুলাইমান আ.-এর শিখানো বিদ্যা । সুলাইমান এরই দ্বারা এত বড় রাজ্যের রাজত্বের অধিপতি হয়েছিলেন । এই বলে তারা নিজেদের ভ্রান্ত পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রইল । কিন্তু তারা এ উক্তিতে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যাবাদী এবং হযরত সুলাইমান আ.-এর উপর মিথ্যাপবাদ আরোপ করছে ।

সুদ্দী রহ. বলেন, হযরত সুলাইমান আ.-এর জীবিতকালেই বনি ইসরাঈলদের মধ্যে এই গোমরাহী আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । তাদের মধ্যে এ কথাও প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিল, "জিনজাতি গায়েবি ইলম জানে ।" হযরত সুলাইমান আ. এ সংবাদ জানতে পেরে শয়তানদের সংকলিত সেই দফতরগুলোকে সংগ্রহ করে নিজের সিংহাসনের নিচে পুঁতে রেখেছিলেন । যেন কোনো জিন বা মানুষের সেখান পর্যন্ত পৌঁছানোর দুঃসাহস না হয় । আর সঙ্গে সঙ্গে আদেশ জারি করে দিলেন, "যে ব্যক্তি জাদু প্রয়োগ করবে বা জিন জাতি সম্বন্ধে গায়েবি ইলম জানার আকিদা পোষণ করবে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে ।" কিন্তু হযরত সুলাইমান আ.-এর ইনতেকালের পর শয়তানরা সেই প্রোথিত জাদুভাণ্ডারকে বের করে নিল এবং বনি ইসরাঈলদের মধ্যে এ আকিদা ছড়িয়ে দিল, জাদুবিদ্যাটি হযরত সুলাইমান আ.-এর বিদ্যা । তিনি এ জাদুবিদ্যার বলেই জিন ইনসান, যাবতীয় জীবজন্তু, পক্ষীকুল এবং বায়ুর উপর রাজত্ব করতেন । এরূপে শয়তানেরা বনি ইসরাঈলদের মধ্যে পুনরায় জাদু-বিদ্যার প্রচলন করে দিল ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px