📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 ‘সাবা’র পরিচয়

📄 ‘সাবা’র পরিচয়


‘সাবা’ শব্দের বিস্তারিত বিশ্লেষণ 'সাইলে আরেম' এর আলোচনা প্রসঙ্গে পরে আসবে। এখানে শুধু এতটুকু জেনে নেওয়া যথেষ্ট, কাহতানি বংশের একটি বিখ্যাত শাখার নাম 'সাবা'। 'সাবা' নামক এই লোক স্ব গোত্রের আদিপুরুষ ছিল। সাবা রাজত্বের মূল কেন্দ্রস্থল ছিল আরবের দক্ষিণাংশে ইয়ামানের পূর্বাঞ্চল। এর রাজধানী ছিল মাআরেব। একে তারা সাবা শহর বলত। সাবায়ি শাসকগণ সাবার রাজা নামে খ্যাত। সাবার রাজাদের সর্বশেষ রাজত্বের যুগ খৃস্টপূর্ব ৫৫০ সন বলা হয়।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সাবার রানীর নাম

📄 সাবার রানীর নাম


কুরআন মাজিদ হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার রানির ঘটনায় উল্লেখ করে নি, রানির নাম কী ছিল। কেননা কুরআনের উদ্দেশ্যের জন্য এটা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ইহুদিদের ইসরাঈলী কাহিনিসমূহে উক্ত রানির নাম 'বিলকিস' বলে উল্লেখ রয়েছে। আর আবিসিনিয়াবাসীরা দাবি করে তারা সাবার রানি বিলকিসের বংশধর এবং তারা রানির নাম 'মাকিদা' বর্ণনা করেছে। তত্ত্ববিদগণ বলেন, খাস ইয়ামান অঞ্চলের শিলালিপি ও অন্যান্য চিহ্নসমূহ দ্বারা কোনো নারীশাসক থাকা প্রমাণিত হয় না। তবে ইরাক সংলগ্ন উত্তর আরবে নারীশাসকের নাম পাওয়া যায়। সাবার রানি এ অঞ্চল থেকেই সম্ভবত এসেছিলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 সাবার রানীর ইসলাম গ্রহণ

📄 সাবার রানীর ইসলাম গ্রহণ


সাবার রানি বিলকিস হযরত সুলাইমান আ.-এর মর্যাদা এবং বুযুর্গি দেখে ইসলাম গ্রহণ করলেন। যেমন ইরশাদ হচ্ছে: ‘ওয়া আসলামতু মাআ সুলায়মানা লিল্লাহি রব্বিল আলামিন’। অর্থাৎ এখন আমি সুলাইমানের সাথী হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ঈমান আনলাম।

প্রথমে রানি সুলাইমান আ.-এর বিপুল শক্তির কথা শুনে তাঁর প্রতি অনুগত হয়েছিলেন কিন্তু প্রকৃত তাওহীদের মর্ম বুঝতে পারেন নি। হযরত সুলাইমান আ. তাঁর সিংহাসনের রূপ পরিবর্তন করে এবং কাঁচের প্রাসাদের মাধ্যমে তাকে এই শিক্ষা দিলেন যে, যেভাবে তিনি কাঁচের ওপরের জলকে আসল মনে করেছিলেন তেমনি সূর্যের ছায়াকে বা প্রকাশস্থলকে তারা আসল মাবুদ মনে করে পূজা করছে। রানির মস্তিষ্কে এই সত্য উদিত হওয়া মাত্র তিনি লজ্জিত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করলেন এবং এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন।

📘 কাসাসুল আম্বিয়া 📄 তাওরাতে সাবার রানী

📄 তাওরাতে সাবার রানী


তাওরাতেও হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার রানির সাক্ষাতের কথা উল্লেখ রয়েছে: “আর যখন আল্লাহ তাআলার নাম প্রচার সম্বন্ধে হযরত সুলাইমান আ.-এর খ্যাতি সাবার রানির নিকট পর্যন্ত পৌঁছল, তখন তিনি জটিল প্রশ্নসমূহের দ্বারা হযরত সুলাইমান আ.-কে পরীক্ষা করার জন্য তাঁর সমীপে আগমন করলেন, বিরাট শোভাযাত্রা ও উষ্ট্রের পাল সহকারে, যাতে সুগন্ধি দ্রব্যাদি বোঝাই করা ছিল এবং বহু স্বর্ণ ও মহামূল্যবান হীরা-জহরত সঙ্গে নিয়ে জেরুযালেম পৌঁছলেন । তিনি সুলাইমান আ.-এর দরবারে এসে তাঁর কল্পিত সমস্ত বিষয় তাঁর সাথে আলাপ করলেন । হযরত সুলাইমান আ. তাঁর সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিলেন । সুলাইমান আ.-এর নিকট কোনো বিষয়ই অজ্ঞাত ছিল না, তিনি রানির প্রশ্নসমূহের জবাব দিতে পারবেন না ।

সাবার রানি হযরত সুলাইমান আ.-এর সমস্ত জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অবস্থা এবং সেই শীষমহলটি— যা হযরত সুলাইমান আ. রানির জন্য নির্মাণ করেছিলেন এবং দস্তরখানের নেয়ামতসমূহকে এবং তাঁর সভাসদবৃন্দের আসনসমূহকে এবং তাঁর সাকিদেরকে, আর সেই সিঁড়িটিকে— যার দ্বারা তিনি খোদাওয়ান্দ তাআলার দরবারে গমন করতেন— দেখলেন, তখন তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন । তিনি সুলাইমান আ.-কে বললেন— “এটা যথার্থ সংবাদই ছিল, যা আপনার বুযুর্গী ও বুদ্ধিমত্তা সম্বন্ধে আমি রাজ্যে বসে প্রাপ্ত হয়েছিলাম । আপনার যে সংবাদ লোকমুখে শ্রবণ করেছিলাম, তা প্রকৃত ব্যাপারে অর্ধেকও ছিল না । কেননা আপনার বুদ্ধিমত্তা, আড়ম্বর ও জাঁকজমক যা দেখতে পাচ্ছি, তা আমার শ্রুত সংবাদের চেয়ে বহু গুণের অধিক । আপনার লোকেরা সকলেই নেককার, আর আপনার খাস সভাসদবৃন্দ— যারা সর্বদা আপনার দরবারে হাযির থাকে, তাঁরাও নেককার, খোদাওয়ান্দ আপনার কথা শ্রবণ করেন । আপনার খোদা মোবারক । যিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট এবং আপনাকে ইসরাঈলের সিংহাসনে বসিয়েছেন । কেননা খোদাওয়ান্দ ইসরাঈলীদেরকে সর্বদা ভালোবাসেন ।”

তাওরাতের বর্ণনায় যদিও রানির মুসলমান হওয়ার কথা উল্লেখ নেই; কিন্তু শেষের বাক্যগুলি প্রকাশ করছে, সে ইসরাঈলী খোদার উপর ঈমান এনেছিল । সে কারণেই তাঁর উল্লেখ এত শ্রদ্ধার সাথে করছে । কিন্তু কুরআন ও তাওরাতের বর্ণনার মধ্যে একটা পার্থক্য সুস্পষ্ট, কুরআন মাজিদের বর্ণনায় বুঝা যায়, হযরত সুলাইমান আ. এমন মর্যাদা এবং বুযুর্গীর সাথে সাবার রানির সঙ্গে আচরণ করেছেন, যা একজন উচ্চ শ্রেণীর পয়গম্বরের মতো ছিল । আর কুরআন মাজিদের বর্ণনার প্রতি কথায় কথায় পয়গম্বরী শান অনুযায়ী তাবলিগ ও দাওয়াতে ইসলাম দেখতে পাওয়া যায় । কিন্তু তাওরাতের বর্ণনায় হযরত সুলাইমানের বুদ্ধিমত্তা এবং রাজকীয় ক্ষমতা ব্যতীত আর কিছুই প্রকাশ পায় না ।

এটা বনি ইসরাঈলদের সেই ভুল আকিদারই ফল, যা তারা হযরত সুলাইমান আ. সম্বন্ধে মিথ্যা আবিষ্কার করে নিয়েছে— তিনি পয়গম্বর নন, শুধু বাদশা । আর কুরআন মাজিদ যেহেতু আকিদা ও আমলসমূহের সংশোধনের সাথে সাথে প্রাচীনকালের উম্মতদের এবং তাদের নবী ও রাসূলদের সম্বন্ধীয় ঘটনাবলীতে বনি ইসরাঈলদের বিকৃতকরণ, পরিবর্তন সাধন এবং তাদের ভুল ও অনর্থক মনগড়া আবিষ্কারসমূহের সংশোধনেরও দাবিদার, তাই কুরআন মাজিদ এ স্থলেও আলোচ্য ঘটনা সম্বন্ধে প্রকৃত ও সঠিক তথ্য বর্ণনা এবং সেই ভুলসমূহকে প্রকাশ করে দিয়েছে, যা উম্মতদের বিকৃতকরণের দরুন পূর্বের আসমানি কিতাবসমূহে পাওয়া যায় ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px