📄 সেনাবাহিনী ও পিপীলিকার ময়দান
আল্লাহ তাআলা হযরত সুলাইমান আ.-কে সব প্রাণীর ভাষা বুঝার জ্ঞান দান করেছিলেন। এ প্রসঙ্গেই কুরআন মাজিদে 'ওয়াদিয়ে নামলাহ' অর্থাৎ 'পিপীলিকাদের বসতি' বলে বর্ণিত আছে। একবার হযরত সুলাইমান আ. জিন, মানুষ ও সর্ববিধ জীব-জন্তুদের বিরাট এক সেনাবাহিনী নিয়ে একটা স্থান দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন। সেনাবাহিনী চলতে চলতে এমন এক ময়দানে পৌঁছল, যেখানে অসংখ্য পিপীলিকা ছিল। পিপীলিকাদের রাজা সেনাবাহিনীর এ বিরাট দলটিকে দেখে নিজের অনুবর্তী পিপীলিকাদের বলল: “তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ গর্তসমূহে ঢুকে পড়। সুলাইমান ও তাঁর সেনাবাহিনী জানে না, তোমরা এত অধিক সংখ্যায় এই ময়দানে বিচরণ করছ। এমন যেন না হয়, অজ্ঞাতসারে তাদের অশ্বারোহী ও পদাতিকদের পদতলে তোমাদের কিছু সংখ্যক পিপীলিকা দলিত মথিত হয়ে যায়।"
হযরত সুলাইমান আ. পিপীলিকা-রাজার এ কথাগুলি শ্রবণ করে হাসলেন এবং তার জ্ঞানীসুলভ আদেশের প্রশংসা করতে লাগলেন। এতে স্পষ্ট বুঝা যায়, পিঁপড়াটি তার দলবলকে বুদ্ধিমত্তার সাথে যে সঠিক নির্দেশ দিয়েছিলেন হযরত সুলাইমান আ.-তা বুঝেছিলেন এবং আনন্দে মুচকি হেসেছিলেন। তিনি আরয করলেন: ‘হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।’
📄 সাবার রানি বিলকিস
কুরআন মাজিদে সূরা নামলের মধ্যে হযরত সুলাইমান আ. ও 'মুলকে সাবার' (সাবা দেশের) রানি সম্বন্ধে একটি ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। হযরত সুলাইমান আ.-এর দরবারে মানুষ ছাড়াও বহু জীব-জন্তু এবং জিন খেদমতের জন্য সর্বদা উপস্থিত থাকত। একবার হুদহুদ পাখির অনুপস্থিতি দেখে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন। পরে হুদহুদ এসে সুনিশ্চিত সংবাদ দিল যে, ইয়ামান অঞ্চলে মুলকে সাবায় এক রানি রাজত্ব করে, যার বিশাল সিংহাসন রয়েছে কিন্তু তারা মূর্তিপূজক।
হযরত সুলাইমান আ. হুদহুদের মাধ্যমে একটি পত্র পাঠিয়ে রানিকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। পত্রে লেখা ছিল: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আমার অবাধ্য হওয়া এবং আমার ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা উচিত হবে না। তুমি মুসলমান হয়ে আমার নিকট চলে আস।’ রানি তার সর্দারদের সাথে পরামর্শ করে উপঢৌকন পাঠিয়ে সুলাইমান আ.-এর প্রভাব পরীক্ষা করতে চাইলেন। কিন্তু সুলাইমান আ. তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদের দেওয়া সম্পদের চেয়ে অনেক উত্তম।’ অবশেষে রানি নিজে তাঁর দরবারে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। রানি আত্মসমর্পণ করে আসার পূর্বেই সুলাইমান আ. জিনের মাধ্যমে রানির সেই বিখ্যাত সিংহাসনটি মুহূর্তের মধ্যে নিজ দরবারে আনিয়ে নিলেন। রানি উপস্থিত হয়ে সেই সিংহাসন এবং কাঁচ নির্মিত প্রাসাদের স্বচ্ছতা দেখে অভিভূত হলেন এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনলেন।
📄 ‘সাবা’র পরিচয়
‘সাবা’ শব্দের বিস্তারিত বিশ্লেষণ 'সাইলে আরেম' এর আলোচনা প্রসঙ্গে পরে আসবে। এখানে শুধু এতটুকু জেনে নেওয়া যথেষ্ট, কাহতানি বংশের একটি বিখ্যাত শাখার নাম 'সাবা'। 'সাবা' নামক এই লোক স্ব গোত্রের আদিপুরুষ ছিল। সাবা রাজত্বের মূল কেন্দ্রস্থল ছিল আরবের দক্ষিণাংশে ইয়ামানের পূর্বাঞ্চল। এর রাজধানী ছিল মাআরেব। একে তারা সাবা শহর বলত। সাবায়ি শাসকগণ সাবার রাজা নামে খ্যাত। সাবার রাজাদের সর্বশেষ রাজত্বের যুগ খৃস্টপূর্ব ৫৫০ সন বলা হয়।
📄 সাবার রানীর নাম
কুরআন মাজিদ হযরত সুলাইমান আ. ও সাবার রানির ঘটনায় উল্লেখ করে নি, রানির নাম কী ছিল। কেননা কুরআনের উদ্দেশ্যের জন্য এটা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ইহুদিদের ইসরাঈলী কাহিনিসমূহে উক্ত রানির নাম 'বিলকিস' বলে উল্লেখ রয়েছে। আর আবিসিনিয়াবাসীরা দাবি করে তারা সাবার রানি বিলকিসের বংশধর এবং তারা রানির নাম 'মাকিদা' বর্ণনা করেছে। তত্ত্ববিদগণ বলেন, খাস ইয়ামান অঞ্চলের শিলালিপি ও অন্যান্য চিহ্নসমূহ দ্বারা কোনো নারীশাসক থাকা প্রমাণিত হয় না। তবে ইরাক সংলগ্ন উত্তর আরবে নারীশাসকের নাম পাওয়া যায়। সাবার রানি এ অঞ্চল থেকেই সম্ভবত এসেছিলেন।